📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা সাইয়িদিল আম্বিয়ায়ি ওয়াল-মুরসালিন। ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমাইন।
প্রথমত, আমাদের বইয়ের নাম 'মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা'। মানে, সাধারণত বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ইনস্টিটিউশনে দেখবেন যে, ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং হয়, বিভিন্ন জব অপরচুনিটি নিয়ে কাউন্সেলিং হয়। 'তুমিও জিতবে', 'সময়কে কাজে লাগান' এই জাতীয় কথা বলা হয়। জীবনে উন্নতি করার, নিজেকে আরও উচ্চস্তরে নিয়ে যাওয়ার মোটিভেশন দেওয়া হয়। এই বইয়ে আমরা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ক্যারিয়ার ভাবনার দিকে তাকাব।
ইসলাম প্রচলিত অর্থে 'ধর্ম' নয়, ইসলাম হলো 'দ্বীন'-জীবনব্যবস্থাপনা, Life Management System। [১] সুতরাং আবশ্যিকভাবেই ইসলামে জীবিকা-ক্যারিয়ার-সম্মান বিষয়ে কোনো না কোনো নীতিমালা দেওয়া থাকবে। আমরা দেখব আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে জীবিকা ও ক্যারিয়ারের ব্যাপারে কী বলতে চেয়েছেন। একজন মুমিন, যিনি কালিমা পড়েছেন, لَا إلهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدُ الرَّسُوْلُ اللَّهِ -লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ; এই কালিমা পড়ার পরে তার ক্যারিয়ার-ভাবনাটা কেমন হবে? আমরা তো সবাই মুসলিম। আমরা আল্লাহ তাআলার ওপরে ঈমান এনেছি; ঈমানের যে বিষয়গুলো রয়েছে, যেমন, আল্লাহর ওপরে, রাসুলের ওপরে, (আসমানি) কিতাবসমূহ ও আখেরাতের জীবনের ওপরে আমরা ঈমান এনেছি। এখন এই ঈমানের দৃষ্টিকোণ থেকে আমার ক্যারিয়ারটা কেমন হওয়া উচিত?
এজন্য সবার আগে আমরা একবার কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করব, ইনশাআল্লাহ-
أَشْهَدُ أَنْ لَا إله إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ
'আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ'। একবার কালিমাও পড়ে নিই, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।'
ইসলাম শব্দের অর্থ, আত্মসমর্পণ করা, সাবমিশন অব উইল; মানে, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা। এখানে এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমি যে কালিমাটি পাঠ করলাম, এই কালিমার সামনে আমি আত্মসমর্পণ করেছি কি না। 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পড়া আর এর কাছে আত্মসমর্পণ করার মাঝে পার্থক্য আছে।
'ইলাহ' শব্দের তো অনেক অর্থ রয়েছে। ইলাহ শব্দের এক অর্থ তো হলো, আমি যার জন্য ইবাদত করছি, যার জন্য উপাসনা করছি, তিনি আমার ইলাহ। কিন্তু এ ছাড়াও অনেকগুলো অর্থ রয়েছে। এর মধ্য থেকে একটি হলো-
■ সর্বোচ্চ ভালো যাকে বাসা যায়, যার চেয়ে বেশি ভালো আর কাউকে বাসা যায় না।
■ সর্বোচ্চ আনুগত্য যার করা যায়, যার ওপরে আর কোনো আনুগত্য হয় না। না কোনো গুরুর, কোনো উস্তাজের, কোনো রাষ্ট্রের, বা মতাদর্শের-কারও আনুগত্যই এর ওপরে হয় না।
ইলাহ শব্দের আরেকটি অর্থ হচ্ছে, যাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভয় করা যায় বা ভয় করতে হয়। মোদ্দাকথা, সর্বোচ্চ ভালোবাসা, আনুগত্য ও ভয় যার প্রতি হয়, যার প্রতি হতে হয়, তিনিই হচ্ছেন ইলাহ।
ছোটবেলা থেকে এই পর্যন্ত আমরা পড়াশোনা করে এসেছি স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকে পাঠ্যপুস্তকের মধ্য দিয়ে, বিভিন্ন কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজের মাধ্যমে (যেমন গান-নাচ-ডিবেইট), টিভি-চ্যানেল, নাটক, সিনেমা, কার্টুন ইত্যাদির মাধ্যমে বিভিন্ন চিন্তাধারা-মতাদর্শকে আমাদের মন-মগজে অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে। ইসলামের আদর্শ-দৃষ্টিভঙ্গি এবং এই আমার ভেতরে ইনপুট দেওয়া আদর্শ এক তো নয়ই, ক্ষেত্রবিশেষে বিপরীত। যার কারণে ইসলামের অনেক বিষয়ই আমার কাছে কষ্টকর মনে হয়। ফলে মুখে মুসলিম দাবি করলেও আত্মসমর্পণটা ঠিক হয়ে ওঠে না। আত্মসমর্পণ হচ্ছে—
* আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র কিতাব কুরআনে মাজিদে যে বিধানগুলো পাঠিয়েছেন,
* রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাহ দিয়ে আমাদের সামনে সেই কুরআন ব্যাখ্যা করেছেন এবং
* সেই ব্যাখ্যাকে সাহাবায়ে কেরাম রা. ধারণ করে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
এরপর সেই প্রজন্ম তাঁদের পরবর্তীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এভাবে প্রত্যেক প্রজন্ম তাদের পরবর্তীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তার কাছে নিজের খেয়ালখুশিকে সঁপে দেওয়া। এটিই হচ্ছে ইসলাম। অর্থাৎ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে যা পেয়েছেন এবং সাহাবিদেরকে সেটির যে ব্যাখ্যা শিখিয়েছেন, তা-ই ইসলাম এবং এই ইসলামের কাছেই আমি আত্মসমর্পণ করলাম।
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র জন্য আল্লাহর কিতাব। আর 'মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ'র জন্য রাসুলের সুন্নাহ। এবং আমাদের পরিচয় 'আমরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ'। অর্থাৎ, আমরা রাসুলের সুন্নাহর অনুসরণ করি এবং সাহাবায়ে কেরামের জামাত যা বুঝেছেন, তার অনুসরণ করি। [২]
তাই, সবার আগে এই বিষয়টি আমি আপনাদের সামনে স্পষ্ট করলাম যে, আসলে আমাদের আত্মসমর্পণটা হয়ে ওঠে না। ছোটবেলা থেকে আমরা যেভাবে বড় হয়েছি, যে ধ্যানধারণা, যে পরিবেশ আমাদের মনের মধ্যে চেপে বসেছে, সেটাকে 'সমর্পণ' করতে হবে। অস্ত্র সমর্পণের মতো। কীসের সামনে? আল্লাহ তাআলার কিতাব ও রাসুলুল্লাহর সুন্নাহর সামনে, সাহাবায়ে কেরামের বুঝের সামনে। তাহলেই আমি ভালোভাবে মুসলিম হতে পারলাম। আমার এতদিনের লালিত ধ্যানধারণা, এতকাল ধরে বেড়ে ওঠা আমার ব্যক্তিগত বুঝ, মতাদর্শ, বাছবিচার... সবকিছুকে আমি আল্লাহর সামনে ফেলে দিলাম, সমর্পণ করলাম। আত্মসমর্পণ করলাম যে, ও আল্লাহ! আমার খুশি নয়, বরং আপনার খুশি। আমার মর্যাদা নয়, বরং আপনার মর্যাদা। আমার আদেশ নয়, আপনার আদেশ। আমার নিষেধ নয়, আপনার নিষেধ। আমার জ্ঞান-বুঝ না, বরং আপনার জ্ঞানের কাছে আমি আত্মসমর্পণ করলাম। এই হচ্ছে মুমিনের ঈমান। আমরা এখন মুমিন। মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনাটি কী হবে, সে বিষয়ে আমাদের আজকের আলোচনা। বিসমিল্লাহ বলে আমরা শুরু করছি।

টিকাঃ
[১] সহিহ বুখারিতে আমরা দেখতে পাই, 'দ্বীন'-এর অর্থ ব্যাখ্যা করতে সাহাবিদের থেকে ‘শিরাআ’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। আর মিনহাজ অর্থ হলো, পদ্ধতি, সিস্টেম ইত্যাদি। [সহিহ বুখারি, পৃষ্ঠা ১১] -শরয়ি সম্পাদক
[২] যেমন মুতাজিলা সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় দিত 'আহলুল আদল ওয়াল-আকল'। শিয়ারা ভিন্ন পরিচয় দেয় নিজেদের আহলে বাইতের সাথে সম্পর্কিত করে। মূলত 'আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ' পরিচয়টি এসেছে রাসুলের হাদিস থেকে। রাসুল বলেন, 'তোমরা আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো।' [সুনানু আবি দাউদ: ৪৬০৭; সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২; হাদিসটি সহিহ]
তিনি আরও বলেন, 'তোমরা জামাতকে আঁকড়ে ধরো। অর্থাৎ সাহাবা ও মুসলিমদের জামাতের সাথে একমত ও ঐক্যবদ্ধ থাকো; বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ো না।' [সুনানুত তিরমিজি: ২১৬৫; মুসনাদু আহমাদ: ২৩১৪৫; হাদিসটি সহিহ]
উপারিউক্ত দুটি হাদিসে সুন্নাহ ও জামাতকে আঁকড়ে ধরতে বলা হয়েছে। অতএব যুগে যুগে যারা এই দুটিকে সঠিকভাবে ধারণ করেছে এবং করে, তারাই মূলত 'আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ' তথা সুন্নত ও জামাতের ধারক।

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 ক্যারিয়ার কী?

📄 ক্যারিয়ার কী?


সবার আগে ক্যারিয়ার মানে কী, সেটা স্পষ্ট হওয়া দরকার। বিভিন্ন অভিধান থেকে এ শব্দটির অর্থগুলো যেভাবে এসেছে-
■ a profession, occupation (পেশা), trade (ব্যবসা) or vocation. (কর্ম বা বৃত্তি, যার মাধ্যমে মানুষ আয়-উপার্জন করে।)
■ the progress and actions you have taken throughout the working years of your life, especially as they relate to your occupation. (আমি কর্মজীবনে যে উন্নতি করলাম, পুরো কর্মজীবনজুড়ে আমার যে প্রমোশন হচ্ছে ক্রমান্বয়ে, একেই বলা হচ্ছে ক্যারিয়ার।)
■ the job or series of jobs that you do during your working life, especially if you continue to get better jobs and earn more money. (যেমন, কেউ একটি চাকরি ছেড়ে আরও ভালো কোনো চাকরি করছে; কেউ একটি স্তরের স্যালারি ছেড়ে আরও উচ্চস্তরের স্যালারির কাজে যাচ্ছে, এ বিষয়টিকেই তারা বলছেন 'ক্যারিয়ার'।)
■ doing something regularly for most of your life (কর্মজীবনে আমি যে কাজগুলো করি অর্থ উপার্জনের জন্য), especially as your main way of making money. (নিয়মিত কোনো একটি কাজ করা, জীবনের অধিকাংশ সময় যার পেছনে ব্যয় হয়। অর্থাৎ, এমন একটি কাজ, দিনের বেশি সময় ধরে আমি যা করি, বা, জীবনের বড় একটা সময়জুড়ে টাকা বা জীবিকা উপার্জনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে আমি যা অবলম্বন করি, তা-ই 'ক্যারিয়ার'।)
আমরা এখানে চারটি সংজ্ঞা থেকে দুটো জিনিস পাই—
১. ক্যারিয়ার হলো টাকা উপার্জনের মাধ্যম।
২. এটি একটি উন্নতি ও সামাজিক সম্মানের বিষয়। বা, কর্মজীবনের শেষে আয়নার সামনে আমি নিজেকে যেখানে দেখতে চাই, আত্মমর্যাদা আত্মতুষ্টি ও আত্মতৃপ্তির যে জায়গায় আমি নিজেকে দেখতে চাই সেটিই হলো ক্যারিয়ারের মূল লক্ষ্য। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ক্যারিয়ারে মূল লক্ষ্য দুটি—
এক. টাকা উপার্জন করা।
দুই. নিজের উন্নতি ও আত্মমর্যাদা অর্জন করা।
মানে, ক্যারিয়ারের টাকা ও সম্মান অর্জনের সঙ্গে এখানে আরেকটি বিষয়ও কাজ করে, 'ওপরে ওঠার প্রবণতা'; আরও ওপরে উঠব, তো আরও বেশি টাকা, আরও বেশি সম্মান। এটাকে আমরা বলব 'প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা', 'পার্থিব প্রতিযোগিতা'।

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 পুঁজিবাদ

📄 পুঁজিবাদ


টাকা উপার্জনের সঙ্গে যে সম্মানের একটা সম্পর্ক, এ বিষয়টি (বা ধারণাটি) দুনিয়ায় কবে থেকে শুরু হলো? মাছ জন্মায় পানিতে। পানি তার জন্য স্বাভাবিক বিষয়। সে ভাবে, সারা দুনিয়া বুঝি পানিই। আমরা যে পরিবেশে বড় হই, মনে করি, সব যুগে বুঝি এমনই ছিল; পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে সবকিছু বোধ হয় এরকমই ছিল।
জন্মের পর থেকেই আমরা দেখেছি, দোকানে গিয়ে এক টুকরো কাগজ দিলে, একটি চকলেট পাওয়া যায়। কাগজের নোটের বিনিময়ে পণ্য পাওয়া যায়—এর বাইরে অন্য কোনো সিস্টেম আমরা দেখিনি। জন্মের পর থেকে আমরা দেখে আসছি, প্রতি পাঁচ বছরে একবার ভোট হয়ে কেউ একজন ক্ষমতায় আসে। পাঁচ বছর পরে আবার একটা ভোট হয়, আবার নতুন একটি সরকার গঠিত হয়। আমাদের কাছে মনে হয়, এই পদ্ধতিই বুঝি শ্রেষ্ঠ, এটিই ধ্রুব; এর চেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না; পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে হয়তো এমনই ছিল; এটিই স্বাভাবিক। অর্থাৎ, বাতাসের মধ্যে থাকতে থাকতে আমাদের কাছে বাতাস যেমন স্বাভাবিক হয়ে যায়, আমরা আলাদা কিছু অনুভব করতে পারি না, ঠিক একইভাবে, এ বিষয়গুলোও আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়।
ঠিক তেমনইভাবে ছোটবেলা থেকে যে ধ্যানধারণা আমরা শিখে এসেছি— ‘পড়ালেখা করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’, ‘তোমাকে অনেক বড় হতে হবে, বড় ডাক্তার হতে হবে, বড় ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে’। এভাবেই টাকার ভিত্তিতে সম্মান নির্ধারিত হওয়ার চিন্তা নিয়ে আমরা বড় হই। কিন্তু ব্যাপারটি এমন নয়। পৃথিবীর একটি ইতিহাস আছে। পৃথিবী চিরকাল এমন ছিল না; পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে গেছে, পৃথিবী বদলে গেছে। মানুষ বদলে গেছে; মানুষের মন-চিন্তা-চেতনা, হাসি-খুশি-স্বপ্ন সবকিছু বদলে গেছে। কীভাবে বদলে গেছে, তা দীর্ঘ আলোচনার বিষয়—পৃথিবী একটা সময় কেমন ছিল, আর আজকের পৃথিবী কেমন হয়ে গেছে। [৩]
যে অর্থনীতি বুঝল, সে পৃথিবীকে বুঝল। অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ফাসফেল্ডের একটি বিখ্যাত বই আছে, যেটির বাংলা হচ্ছে 'অর্থনীতিবিদদের যুগ'। এই বইয়ে লেখক বলছেন:
"ষোড়শ শতকে এই নতুন শিশু অর্থনীতি (পুজিবাদ) থেকে জন্ম নিল নতুন মনোভাব—বাজার-মানসিকতা, যার মূল্যবোধগুলো ভিন্ন ধরনের।... ধর্মের শিক্ষা ছিল, আর্থিকভাবেও প্রত্যেকে অপরের জন্য দায়ী। বিপরীতে নতুন এই মানসিকতায় সাফল্য লাভের জন্য প্রয়োজন অন্য সবার চেয়ে ওপরে ওঠা, অপরকে পিছে ফেলা আর টেক্কা দেওয়ার প্রচেষ্টা। ভ্রাতৃভাবের চেয়ে প্রতিযোগিতাই দরকারি মানসিকতা এই নতুন ব্যবস্থাতে।... ব্যবহারের নৈতিকতার চেয়ে সম্পদ সংগ্রহের দ্বারা মানুষের বিচার হতে লাগল।..."
মানে, ১৫০১-১৫৯৯, এই সময়ে মানুষের মধ্যে এক নতুন ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা উদয় হয়েছে, যা মানুষের মূল মানসিকতাকে প্রভাবিত করেছে। সেই নতুন ব্যবস্থা বা মানসিকতাটা কী? তিনি বলছেন, সেটা হলো 'বাজার-মানসিকতা'। যার মূল্যবোধগুলো, মানে নৈতিকতাগুলো ভিন্ন ধরনের। হালাল-হারাম, বৈধ-অবৈধগুলো ভিন্ন, এতদিন যা ছিল, তেমন না। এতদিন নৈতিকতা ছিল ধর্মভিত্তিক। ধর্মের শিক্ষা ছিল, আর্থিকভাবেও প্রত্যেকে অপরের জন্য দায়ী। সমাজে একজন নারী ক্ষুধার জন্য নিজের ইজ্জতকে বিক্রি করছে, এর জন্য পুরো সমাজই দায়ী হবে। পুরো সমাজের কেউ কেন তাকে সহযোগিতা করেনি যে, সে ক্ষুধা নিবারণের আহার জোগাতে এমন একটা জঘন্য কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এটা কিন্তু ইসলামেও আছে; ইসলামে জাকাত, সদকার ব্যবস্থা রয়েছে গরিবের জন্য। এমনকি, রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে খলিফা চাইলে ধনীদের ওপর আলাদা ট্যাক্স আরোপ করতে পারেন। সামাজিক নৈতিকতার বিষয়ে ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্মের নৈতিক নির্দেশনা, মূল্যবোধ, সামাজিক বন্ধনগুলো কাছাকাছি ধরনেরই।
কিন্তু নতুন জন্ম নেওয়া মানসিকতার মূল্যবোধ কেমন? বলা হচ্ছে, বিপরীতে নতুন এই মানসিকতায় সাফল্য লাভের জন্য প্রয়োজন অন্য সবার চেয়ে ওপরে ওঠা, অপরকে পিছে ফেলা আর টেক্কা দেওয়ার প্রচেষ্টা। অর্থাৎ, নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যে মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, তাতে প্রতিযোগিতা আর স্বার্থবাদিতার প্রবণতা প্রাধান্য পাচ্ছে। আরেকজনের কী হলো, তা দেখার বিষয় নয়; অপরের জন্য স্যাক্রিফাইস করা বলতে সেখানে কিছু নেই; বরং আরেকজনকে পেছনে ফেলতে হবে, টেক্কা দিতে হবে।
এরপর ড্যানিয়েল ফ্যাসফেল্ড বলছেন, "...ব্যবহারের নৈতিকতার চেয়ে সম্পদ সংগ্রহের দ্বারা মানুষের বিচার হতে লাগল।" অর্থাৎ, একটা সময় পর্যন্ত মানুষের মর্যাদাটা টাকার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল না; বরং এই মর্যাদা সম্পর্কযুক্ত ছিল তার জ্ঞান, আচারব্যবহার, গরিবের প্রতি দরদি মানসিকতার সঙ্গে; এগুলো দ্বারা মানুষ সম্মানিত হতো। অতিথিপরায়ণতার দ্বারা মানুষ সম্মানিত হতো। তা ছাড়া, বীরত্ব ও নেতৃত্ব দ্বারাও সম্মানিত হতো। যেমন আমরা দেখি, আবু সুফিয়ান জাহিলি যুগেও নেতৃত্বের কারণে সম্মানিত ছিলেন। অর্থাৎ, সামাজিক নানারকম ভূমিকায় মানুষ সম্মানিত হতো। কিন্তু ষোড়শ শতকে যে একটা নতুন মানসিকতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, অধিক লাভ করা, মুনাফা করা। কীভাবে অধিক মুনাফা করছি, তা দেখার বিষয় নয়; বরং লাভ করা দরকার, বেশি বেশি ভোগ করা দরকার। এই যে একটা মানসিকতা, এই মানসিকতা থেকেই 'সম্পদ সংগ্রহ দ্বারা মানুষের বিচার হতে থাকল'; অর্থাৎ, টাকা যে যত কামাবে, তার সম্মান তত বেশি; সম্মান বিষয়টিকে টাকার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলা হলো। কিন্তু একটা সময় এমনটা ছিল না। তাই আমরা বলতে চাই, এটা আমাদের প্রকৃতিজাত পদ্ধতি নয়; মানুষের ফিতরাতের সঙ্গে এ পদ্ধতিটা যায় না। বরং এটা আমাদেরকে নতুন করে শেখানো হয়েছে, আমাদেরকে এতে প্রভাবিত করা হয়েছে।
এখানে আমরা প্রসঙ্গক্রমে শিক্ষার কথা বলতে পারি। Encyclopedia Britannica বলছে-
The new social and economic changes (এনলাইটেনমেন্ট)। also called upon the schools (public and private) to broaden their aims and curricula. Schools were expected not only to promote literacy, mental discipline, and good moral character (শিক্ষার আগের উদ্দেশ্য) but also to help prepare children for citizenship, for jobs, and for individual development and success. (পরের উদ্দেশ্য)
অর্থাৎ, নতুন চিন্তা-মানসিকতা আসার পর সামাজিক ও অর্থনৈতিক একটি চেঞ্জ এসেছে। এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষাবিষয়ক চিন্তাধারাও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আগে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল, লিখতে-পড়তে পারা (promote literacy), শৃঙ্খলা শেখানো (mental discipline)। জীবনে কীভাবে চলতে হবে-সেগুলো শেখানো। আর নৈতিক চরিত্র (good moral character) গঠন করা। কিন্তু সমাজে নতুন যে পরিবর্তন এলো, তাতে এখন শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়ে গেল। এখন শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল-
১. নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য যোগ্য নাগরিক তৈরি (citizenship)। মানে, ইউরোপে নতুন সোশ্যাল ও ইকোনমিক চেঞ্জ আসার পরে (যাকে এনলাইটেনমেন্ট বলা হয়) শিক্ষার উদ্দেশ্য পালটে গেল। [৪] এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাধারার মূল বিষয়গুলো হলো, ধর্মকে পাবলিক লাইফ থেকে, জনপরিসর থেকে দূরে সরিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে আবদ্ধ করে রাখা। ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকবে, এটা রাষ্ট্রে থাকবে না, সমাজে থাকবে না, অর্থব্যবস্থায়ও থাকবে না। এরকম কিছু পরিবর্তন সাধিত হয় এনলাইটেনমেন্ট যুগের পর। এই যুগের আগে শিক্ষার উদ্দেশ্য যা ছিল, এই যুগের পর তা পরিবর্তিত হয়ে শিক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে গেল,
ধর্মকে বাদ দিয়ে নতুন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি হলো, সেটার জন্য উপযুক্ত নাগরিক তৈরি করা, যে ওই ধর্মহীন ব্যবস্থার জন্য কাজ করবে।
২. নতুন অর্থব্যবস্থার (পুঁজিবাদী) জন্য কর্মী তৈরি করা, যারা চাকুরিতে (jobs) আসবে। চাকুরি করে এই নতুন অর্থব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে।
৩. নতুন সংজ্ঞার 'ব্যক্তি' তৈরি (individual development) করা। মানে, আপনি 'ব্যক্তি' (individual/human person) হতে পারবেন তখন, যখন আপনি পূর্ববর্তী যুগের ধর্মীয় ধ্যানধারণা-বিশ্বাস ত্যাগ করতে পারবেন। এগুলোকে বাদ দিয়ে নিজের যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে যখন আপনি চিন্তা করতে শিখবেন, ভালো-মন্দ সবকিছু ধর্ম থেকে নয় বরং নিজেই ঠিক করতে শিখবেন, তখন আপনি 'ব্যক্তি' হতে পারবেন। [৫]
'ইনডিভিজুয়াল', 'হিউম্যান', 'পারসন'- এগুলো মূলত দর্শনশাস্ত্রের পরিভাষা। এনলাইটেনমেন্ট যুগে নতুনভাবে যে দর্শন দেওয়া হচ্ছে, নতুনভাবে যে দৃষ্টিভঙ্গি আনা হচ্ছে, সেখানে বলা হচ্ছে, জীবনে আদর্শ 'ব্যক্তি' হতে হলে, ধর্মকে ত্যাগ করতে হবে, বা, কম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রাখতে হবে। এখানে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়াটা সফলতা নয়, বরং দুনিয়ায় সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোগবিলাস করতে পারাটাই হচ্ছে সফলতা।
ষোড়শ শতকে ইউরোপে যারা দার্শনিক ছিলেন, তারা বলছেন যে, 'হিউম্যান পারসন' আপনি তখনই হবেন, যখন আপনি আগের ধর্মীয় নীতিনৈতিকতা, ধর্মের ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম (বৈধ-অবৈধ) ইত্যাদিকে পাশে রেখে নিজের ভালো-মন্দ, নিজের বৈধ-অবৈধ নিজেই ঠিক করতে পারবেন। এ-ও বলা হচ্ছে যে, আপনি যখন এমন 'ব্যক্তি' হলেন, তখন আপনার সফলতা আর ধর্মের সঙ্গে যুক্ত নয়; বরং তা এই ইহলৌকিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। এখানকার সফলতাই আপনার সফলতা। আপনি যখন ধর্মের বন্ধন থেকে স্বাধীন হতে পারবেন, নিজের ভালো-মন্দ যখন নিজেই ঠিক করতে পারবেন এবং এর মাধ্যমে যখন এই দুনিয়ায় সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবেন, তখনই আপনি একজন সফল মানুষ। অর্থাৎ, আপনার সফলতার মাপকাঠি পরিবর্তন হয়ে গেল। আগে সফলতার মাপকাঠি ছিল, আমি যদি নীতিনৈতিকতায় ভালো হতে পারি, আচার-আচরণে ভালো হতে পারি এবং এর ফলে পরকালে মুক্তি পেতে পারি, তাহলে আমি সফল। এখন এনলাইটেনমেন্ট পিরিয়ডে এসে তারা বলছে যে, না, আপনি সফল হবেন, যদি আপনি দুনিয়ার জীবনে সর্বোচ্চ ভোগ করে যেতে পারেন, পিতার চেয়ে আরও ওপরের স্তরের ভোক্তা হতে পারেন। [৬]
মোটকথা, শিক্ষার আগের উদ্দেশ্য আর এখনকার উদ্দেশ্যের মধ্যে তফাৎ এসে গেছে। এখনকার শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো-
• যোগ্য নাগরিক তৈরি, যারা নতুন ধর্মহীন রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবে।
• যোগ্য কর্মী তৈরি, যারা নতুন ধর্মহীন অর্থব্যবস্থার জন্য কাজ করবে।
• এবং এমন ব্যক্তি তৈরি, যারা সফলতার নতুন ধর্মহীন সংজ্ঞার জন্য প্রস্তুত হবে।
এই তিনটি হলো নতুন শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য। এই যে আমরা মাঝে মাঝে বলি, ধর্মশিক্ষাকে কেন বাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কেন ইসলাম শিক্ষার পাবলিক পরীক্ষা হবে না, কেন ইসলাম শিক্ষার সঙ্গে আবার নৈতিক শিক্ষা যোগ করা হলো? এগুলো কিন্তু ওই নতুন শিক্ষাব্যবস্থারই অনিবার্য পরিণতি-ধর্মহীন সেক্যুলার শিক্ষা।

টিকাঃ
[৩] লেখকের লিখিত 'অবাধ্যতার ইতিহাস' বইটি দেখতে পারেন।
[৪] Enlightenment হলো সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন। এর ফলে ঈশ্বর, যুক্তি, প্রকৃতি এবং মানবতার ধারণা নতুনভাবে তৈরি হয়; যার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে এক নতুন worldview বা বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত পশ্চিমে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং শিল্প-দর্শন-রাজনীতির ছাঁচ গড়ে দেয়। এই চিন্তাধারার কেন্দ্র হচ্ছে-যুক্তির প্রয়োগ। আর মানুষের মূল লক্ষ্য এখানে-জ্ঞান, স্বাধীনতা আর সুখ। ফ্রান্সে Voltaire, D'Alembert, Diderot, Montesquieu; স্কটল্যান্ডে Frances Hutcheson, Adam Smith, David Hume, Thomas Reid; জার্মানিতে Christian Wolff, Moses Mendelssohn, G.E. Lessing, Immanuel Kant প্রমুখ। এঁদের চিন্তাধারা গড়ে উঠেছিল আরও আগের Hobbes, Locke, Descartes, Bayle, Leibniz, Spinoza-দের চিন্তাকে ঘিরে। [plato.stanford.edu]
[৫] 'ব্যক্তি'র (human person) প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্বাধীনতা। প্রাণিসত্তাকে অতিক্রম করে ব্যক্তিসত্তায় যাবার রাস্তা হলো 'পরিপূর্ণ স্বাধীনতা'। [Jean-Paul Sartre, L'Etre et le Néant] একজন লোক 'ব্যক্তি' হতে পারবে, যখন সে নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত চর্চা করবে। স্বাধীনভাবে নিজের জীবনকে গড়ে নেবে এবং জীবন কীভাবে চালাবে সে নির্দেশনা নিজেই স্বাধীনভাবে দেবে। [Kierkegaard] সে-ই স্বাধীন 'ব্যক্তি' যে নৈতিকতার স্রষ্টা, নিজের নৈতিকতা নিজেই ঠিক করে (creator of values)। স্বাধীন ব্যক্তি আগের কোনো মূল্যবোধকে মেনে নেয় না। সে মূল্যবোধ-নৈতিকতা নিজে ঠিক করে। [Frederick C. Copleston: The Human Person in Contemporary Philosophy, PHILOSOPHY, Vol. 25, No. 92 (Jan. 1950), pp. 3-19]
[৬] জীবনের লক্ষ্য হলো সর্বাধিক সুখ চরিতার্থ করা (ভোগ) এবং সর্বনিম্ন কষ্ট পাওয়া (maximizing pleasure and minimizing pain) [hedonistic principle, John Locke]

📘 মুমিনের ক্যারিয়ার ভাবনা 📄 ইসলামে সম্মানের ধারণা

📄 ইসলামে সম্মানের ধারণা


ইজ্জত-সম্মান আল্লাহর কাছ থেকে আসে। পার্থিব কিছুর সাথে সম্মান জড়িত না। ঠিক যেভাবে রিজিক আল্লাহর কাছ থেকে আসে, সম্মানও আল্লাহর কাছ থেকে আসে। সম্মান শুধু মুমিনদের।

১. কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
"বস্তুত যাবতীয় সম্মান তো আল্লাহরই এবং তাঁর রাসুল ও বিশ্বাসীদের। কিন্তু মুনাফিকরা (কপট) তা জানে না।" [১০০]
मुनाফিকরা এ কথা জানে না যে, তারা যা করছে তার মধ্যে সম্মান নেই। সেক্যুলার-কাফের-মুরতাদদের সমর্থন, তাদের কাছে প্রিয় হওয়া, স্বীকৃতি লাভ, জাতে ওঠার মাঝে সম্মান নেই। এদেরকে ওরা উচ্ছিষ্টভোগী কুকুর বা ধামাধরা চামচা ছাড়া অন্য নজরে দেখে না। নিজেদের মাঝে আলাপচারিতায় এসব মুনাফিককে নিয়ে ওরা হাসি-তামাশাই করে। বরং বিশ্বাসী যারা, ঈমান এনেছে যারা, ইসলামকে যারা ধারণ করছে, ইসলামের বিজয় চায় যারা, ইসলামের সাথে কোনোকিছুকে আপোশ করে না-তারাই সম্মানের, তাদেরকেই আল্লাহ সম্মান দেবেন। কাফের-মুরতাদরা তাদেরকে ভয় করে চলবে, মাথা নামিয়ে চলবে। নিজেদের মাঝে তাদের বীরত্বের আলোচনা করবে। সুতরাং সম্মান টাকার সাথে সম্পর্কযুক্ত না, সম্মান জমিজমার সাথে সম্পর্কযুক্ত না। সম্মান রাজনৈতিক বিষয়গুলোর সাথে জড়িত না। বরং সম্মান একমাত্র ঈমানের সাথে জড়িত। যে ঈমানকে পরিপূর্ণ করেছে, সে সম্মান পাবে। সম্মান ইসলামে অটলতার সাথে জড়িত। যে আল্লাহকে রাজি করতে পেরেছেন, সম্মান ইসলামে অটলতার সাথে জড়িত।

আল্লাহ তাআলা আমাকে করতে বলেছেন বিধায়, আমরা জীবিকার্জন করি। আল্লাহ করতে না বললে, করতাম না। রাসুলের সুন্নত বলে, তাই আমরা জীবিকার্জন করি। কিন্তু দেবেন কে? একমাত্র আল্লাহ তাআলা। একইভাবে সম্মানও আল্লাহই দেবেন। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার দ্বারা, আল্লাহকে রাজি-খুশি করার দ্বারাই আমি সম্মান পাব। এ ছাড়া অন্য কোনো দিকে যদি আমি সম্মান তালাশ করি, এবং সেখানে যদি আমি আল্লাহকে নারাজ করি, তাহলে সম্মান আমার নাগালে ধরা দেবে না, বরং আমি বেইজ্জত হব।

২. সুরা আলে-ইমরানের ২৬ নম্বর আয়াতটি দেখুন। আমার প্রিয় একটি আয়াত, যখন আমি ইসলাম বুঝতাম না, তখনও এই আয়াতটি ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়।
"বলো, হে আল্লাহ! হে রাজত্বের মালিক! আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান, রাজত্ব কেড়ে নেন। আর আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন। আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।" [১০৪]

আল্লাহ যাকে চান, তাকে অপমানিত করেন। কারও সবকিছু আছে—বড় ক্যারিয়ার আছে, বড় কোম্পানির সিইও, তার টাকার অভাব নেই, ক্রেডিট কার্ড আছে, কোনো চাহিদা পূরণের অভাব নেই। কিন্তু এরপরও সে বেইজ্জত হবে, যদি আল্লাহ চান। কারণ এগুলোর সাথে মান-অপমান নিশ্চিত নয়, মান-অপমান জড়িত একমাত্র আল্লাহ তাআলার সাথে। আল্লাহ যে দ্বীন পাঠিয়েছেন, সেই ইসলামের সাথে, আল্লাহর ওপর ঈমান আনার সাথে। আমি যত ইসলামের ওপর মজবুত, তত আমার সম্মান বাড়তে থাকবে। আর আমি যত ইসলামের ব্যাপারে আপোশকামী, তত আমার লাঞ্ছনা বাড়বে।

তাহলে বোঝা গেল, ক্যারিয়ার দ্বারা আমরা যে দুটি বিষয় চাচ্ছিলাম—
১. রিজিক, এটাও ক্যারিয়ারের সাথে জড়িত না।
২. ইজ্জত বা সম্মান, এটাও ক্যারিয়ারের সাথে জড়িত না।
দুটোই জড়িত আল্লাহ তাআলাকে রাজি-খুশি করার সাথে।

৩. খলিফা উমর রা.-এর সেনাপতি ছিলেন আবু উবাইদা রা.। তিনি বলছিলেন, "হে খলিফা, আপনি এই তালি দেওয়া জামাটাকে রেখে সুন্দর একটা জামা পরুন। আর যে উটে করে এসেছেন, উটটাকে রেখে একটা ঘোড়ায় চড়ুন। অনারবদের সমাজে এগুলো মানায় না।" উমর রা. সেনাপতি আবু উবাইদার বুকে থাপ্পড় দিয়ে বলেছিলেন,
"ওহ আবু উবাইদা, যদি তুমি ছাড়া আর কেউ এ কথা বলত, আমি তাকে এমন শাস্তি দিতাম, পুরো উম্মত তা মনে রাখত। আমরা তো লাঞ্ছিত জাতি ছিলাম, আল্লাহ ইসলামের দ্বারা আমাদেরকে সম্মান দিয়েছেন। আজ সেই ইসলাম ছেড়ে অন্যকিছুতে সম্মান খুঁজতে গেলে, আল্লাহ আবারও আমাদের লাঞ্ছিত করে দেবেন।" [১০৫]
সম্মান-ইজ্জত, এটা ইসলামের সাথে জড়িত। ইসলামকে যথাযথ পালন করার সাথে জড়িত। আরেকবার উমর রা. বলেন, "তোমরা ভাবছ সম্মান এগুলো থেকে আসে? (দুনিয়ার বস্তু দ্বারা) কখনো না। বরং সম্মান আসে ওখান থেকে (আকাশের দিকে ইশারা করে)।"

সুতরাং ক্যারিয়ারের দ্বারাই যে সম্মান পেতে হবে, এ বিষয়টা পশ্চিম আমাদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। বিষয়টা সত্য নয়, বরং সম্মান আসে আল্লাহকে রাজি-খুশি করার মাধ্যমে।

সম্মান আসে জিহাদে
সম্মান আসে জিহাদের দ্বারা, অসম্মান আসে জিহাদ ছেড়ে দেওয়ার দ্বারা।
১. ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, আমি শুনেছি, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“যখন তোমরা ‘ইনাহ’ ব্যবসা করবে, এবং গরুর লেজ ধরে কেবল চাষবাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে, আর জিহাদ ত্যাগ করে বসবে, তখন আল্লাহ তোমাদের ওপর এমন হীনতা চাপিয়ে দেবেন; যা তোমাদের হৃদয় থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত দূর করবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তোমাদের দ্বীনের প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছ।” [১০৬]
এর ব্যাখ্যা হলো, একটি জাতির সকল লোক যদি জিহাদবিমুখ হয়ে চাষাবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন একপর্যায়ে শত্রুদেরকে তাদের ওপর লেলিয়ে দেওয়া হবে। আবু বাকরা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “...এক জাতি হবে যারা গরুর লেজ ধরে চাষাবাদ করবে এবং জিহাদে বিমুখতা প্রকাশ করবে, তারা ধ্বংস হবে।” [১০৭]

আজকে দেখুন, ছাগলের রক্তের যে পরিমাণ দাম আছে, মুসলমানের রক্তের সেই পরিমাণ দামও নেই। একটা মশার রক্তের যে পরিমাণ দাম, মুসলমানের রক্তের সে পরিমাণ দাম নেই। আমাদের ইতিহাসে এতটা লাঞ্ছিত আমরা কখনো ছিলাম না। তাহলে এই অবস্থা হওয়ার কারণ হলো, সম্মানের দরজা আমরা বন্ধ করে রেখেছি, আমরা জিহাদ ছেড়ে দিয়েছি। 'ফরজে আইন' [১০৮] যে আমল, তা ছেড়ে দেওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা আমাদের ওপর বেইজ্জতি চাপিয়ে দিয়েছেন। ইজ্জত যদি পেতে হয়, এই ফরজে আইনকে আবার জিন্দা করতে হবে।

২. দেখুন সুরা তাওবার ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
"বলো, যদি তোমাদের পিতারা, আর তোমাদের সন্তানেরা, আর তোমাদের ভাইয়েরা, আর তোমাদের স্ত্রীরা, আর তোমাদের গোষ্ঠীর লোকেরা, আর ধনসম্পদ যা তোমরা উপার্জন করেছ, আর ব্যবসা তোমরা যার মন্দার ভয় করো, আর বাসস্থান যা তোমরা ভালোবাসো, (এসব) যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তার পথে জিহাদ করা হতে অধিক প্রিয় হয়; তাহলে অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তার চূড়ান্ত ফয়সালা তোমাদের কাছে নিয়ে আসেন। আর আল্লাহ অবাধ্য আচরণকারীদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন না।" [১০৯]
অর্থাৎ, ওই আটটা জিনিস যদি তোমাদের কাছে প্রিয়তর হয় তিনটা জিনিসের চেয়ে (আল্লাহর চেয়ে, আল্লাহর রাসুলের চেয়ে এবং জিহাদ করার চেয়ে), তাহলে অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর আজাব তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। যে অবাধ্য আচরণ তোমরা করছ, এর দ্বারা সঠিক পথ তোমরা পাবে না। আমরা ওই তিনটা তথা—আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও তাঁর পথে জিহাদ করা ছেড়ে দিয়েছি এবং বাকি আটটা বিষয় সম্পর্কে আমরা সন্তুষ্ট হয়ে গিয়েছি, সেগুলো আমাদের প্রিয় হয়ে গেছে। যার কারণে আজকে আমরা এই বেইজ্জতির মধ্যে পড়ে গেছি। সুতরাং ইজ্জত হচ্ছে আল্লাহর সাথে। ইজ্জত ইসলামের সাথে। ইজ্জত জিহাদের সাথে।

৩. উম্মে মুবাশশির রা. থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
"মর্যাদায় সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সে, যে নিজ ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে শত্রুকে সন্ত্রস্ত করে। এবং শত্রুরাও তাকে সন্ত্রস্ত করে।" [১১০]
শত্রুকে সন্ত্রস্তকারী সম্মানের পাত্র। অথচ আফসোস, শত্রুকে ‘সন্ত্রস্তকারী’- কে আমরা নিজেরাই ‘সন্ত্রাসী’ বলে গালি দিই, ডিজওন করি। নিঃসন্দেহে এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ-রাসুলের কাছে সে সম্মানিত, আর তাকে অসম্মানিত করার দ্বারা আমরাই হীন হয়ে পড়ে রয়েছি।

৪. সাওবান রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
- অনতিদূরে সকল বিজাতি তোমাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে, যেমন ভোজনকারীরা ভোজনপাত্রের ওপর একত্র হয়। (এবং চারদিক থেকে ভোজন করে থাকে।)
- আমরা কি তখন সংখ্যায় কম থাকব, হে আল্লাহর রাসুল?
- বরং তখন তোমরা সংখ্যায় অনেক থাকবে। কিন্তু তোমরা হবে তরঙ্গতাড়িত আবর্জনার ন্যায় (শক্তিহীন, মূল্যহীন)। আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি ভীতি তুলে নেবেন এবং তোমাদের হৃদয়ে দুর্বলতা সঞ্চার করবেন।
- হে আল্লাহর রাসুল, দুর্বলতা কী?
- দুনিয়াকে ভালোবাসা এবং মরতে না চাওয়া। [১১১]

এই দুটো জিনিসের কারণে সম্মান উঠিয়ে নেবেন আল্লাহ তাআলা। তাহলে দুনিয়াকে যদি আমরা ভালো না বাসি, আখেরাতকে ভালোবাসি এবং মরতে চাই, শহিদ হতে চাই-এই দুটো জিনিস যদি আমরা নিজের মধ্যে আনতে পারি, আল্লাহ আবার আমাদেরকে সম্মান দান করবেন।

সম্মান আসে তাকওয়ায়
আল্লাহ জানাচ্ছেন, "নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।" [১১২]
টাকার সাথে সম্মানের সম্পর্ক নেই, বরং সম্মানের সম্পর্ক হচ্ছে তাকওয়ার সাথে। যত বেশি আমি আল্লাহকে ভয় করব, আল্লাহ আমার সম্মান তত বাড়িয়ে দেবেন। একটা চমৎকার হাদিস আছে, যখন আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর বুকে কাউকে ভালোবাসেন, তখন আল্লাহ তাআলা জিবরিলকে বলেন, হে জিবরিল, অমুককে আমি ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো। জিবরিল আলাইহিস সালাম তখন সমস্ত ফেরেশতার মধ্যে ঘোষণা করেন, হে ফেরেশতাগণ, অমুককে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, আমি ভালোবাসি, তোমরাও তাকে ভালোবাসো। তখন সমস্ত ফেরেশতা দুনিয়াতে সবখানে ঘোষণা করে দেন, হে সমস্ত মাখলুক, শোনো, অমুক গ্রামের অমুক ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, জিবরিল ভালোবাসেন, আমরা ফেরেশতারাও ভালোবাসি, সুতরাং তোমরাও তাকে ভালোবাসো। [১১৩] সবাই তাকে সম্মান করে, ইজ্জত দেয়। সুতরাং ইজ্জত-সম্মান তাকওয়ার সাথে সম্পর্ক।

জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন,
"হে লোকসকল! শোনো, তোমাদের প্রতিপ্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবির ওপর অনারবির এবং অনারবির ওপর আরবির, কৃষ্ণকায়ের ওপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো কেবল, তাকওয়ার কারণেই। [১১৪]

সুতরাং তাকওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা আমার সম্মান দেবেন।

সম্মান আসে ইলমে-আমলে
আলেমদের যে কত সম্মান, চিন্তা করা যায় না। হজরত যাইনুল আবেদিন রহ. (আলি বিন হুসাইন) হাঁটছিলেন, আর রাস্তায় সকল মানুষ রাস্তা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াচ্ছে। তখন ওই সময়কার খলিফা সুলাঈমান বিন আবদুল মালিক (সম্ভবত), জিজ্ঞেস করলেন, এই ব্যক্তি কে? মানুষ একে এত সম্মান করছে কেন? আমি খলিফা মক্কায় তওয়াফ করি, আমাকে কেউ সম্মান করে না, আর এই লোককে এত সম্মান করছে। তখন বলা হলো, এই লোক হচ্ছে আলি বিন হুসাইন রা.
এর মানে, ইলম ও আখলাকের দ্বারা খলিফার চেয়ে বেশি সম্মান হয়ে যায়। হাসান বসরি রহ.-এর একটা ঘটনা আছে। একবার খলিফা বসে আছেন, খলিফার আশেপাশে অনেক মানুষ। এমন সময় সেখানে হাসান বসরি এসেছেন। সমস্ত মানুষ খলিফাকে ছেড়ে ওখানে চলে গেছে। হাসান বসরির কাছে চলে গেছে। তখন একজন দাসি বলছে, দেখো, এটাই হচ্ছে বাদশাহি। খলিফা যে মর্যাদা পায়নি, হাসান বসরি সেই মর্যাদা পেয়েছে। এটা আসে ইলমের দ্বারা।

সুতরাং সম্মান আসে-
• ইলমের দ্বারা।
• আখলাকের দ্বারা।
• খেদমতের দ্বারা। মানুষের খেদমত করবেন, আল্লাহ সম্মান বাড়িয়ে দেবেন। আখলাকওয়ালা ব্যক্তি, হতে পারে সে গরিব, কিন্তু তার সম্মান আল্লাহ বাড়িয়ে দেন।
• খেদমতের দ্বারা, মানুষের খেদমত করবেন, আল্লাহ সম্মান বাড়িয়ে দেবেন।
• বীরত্বের দ্বারা সম্মান বাড়ে, যে বীর তার সম্মান আল্লাহ বাড়িয়ে দেবেন।
• নেতৃত্বের দ্বারা সম্মান বাড়ে।
• রাজত্বের দ্বারা সম্মান বাড়ে। যেমন, মুসলিমদের কাছে এখন রাজত্ব নেই, ফলে তারা বেইজ্জত হচ্ছেন।

এই বিষয়গুলো হলো সম্মানের আসবাব। টাকা সম্মানের মাধ্যম কখনোই ছিল না। ইউরোপে যখন পুঁজিবাদের উত্থান ঘটেছে, এই পুঁজিবাদের উত্থানের কারণে টাকার দ্বারা মানুষকে মূল্যায়ন করা শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল ফ্যাসফেল্ড বলেছেন: (১৫শ শতকে নতুন অর্থনীতির বিকাশের পর) ....ব্যবহারের নৈতিকতার চেয়ে সম্পদ সংগ্রহের দ্বারা মানুষের বিচার হতে লাগল।...

এর আগ পর্যন্ত উল্লেখিত বিষয়গুলো দ্বারা মানুষদের মূল্যায়ন করা হতো। নারী হোক, পুরুষ হোক। ইলমের কারণে নারী বিখ্যাত হতো, আখলাকের কারণে, খেদমতের কারণে, বীরত্বের কারণে, এগুলোর কারণে নারী- পুরুষ সবাই সম্মানিত হতো। এগুলোই ছিল সম্মান আসার মাধ্যম। কিন্তু আজকে আমরা টাকার মধ্যে সবকিছু নিয়ে গেছি। কারণ আমরা নিজেরাই ইউরোপিয়ানাইজড। আমরা নিজে ইউরোপীয় হয়ে গেছি।

সুতরাং, যে মুমিন না, তার ক্যারিয়ার হলো-টাকা ও সম্মান। আমরা দেখলাম, টাকাও ক্যারিয়ারের সাথে সম্পর্কিত না, সম্মানও ক্যারিয়ারের সাথে সম্পর্কিত না। দুটো জিনিসই আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত। ফলে মুমিনের ক্যারিয়ার হবে-দাওয়া ও সদকা। আমাদের ক্যারিয়ারের উদ্দেশ্যই হবে এই দুটো। আমার ক্যারিয়ারটা হবে আল্লাহর জন্য; আর টাকা-সম্মান তো আল্লাহ থেকেই আসে।

আমার ক্যারিয়ারটাকে ব্যয় করব আমার আসল জীবন, আখেরাতের জীবনকে পরিপূর্ণ করার জন্য। আর ওরা তাদের ক্যারিয়ারটা ব্যয় করে দুনিয়ার জীবন পরিপূর্ণ করার জন্য। আমার ক্যারিয়ারের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমি এই ক্যারিয়ারটাকে ব্যবহার করে দাওয়া ও সদকার কাজ করব। যদি এটা করতে পারি, তাহলে এটাই হচ্ছে মুমিনের ক্যারিয়ার। একজন ঈমানওয়ালার ক্যারিয়ার। একজন আখেরাতে বিশ্বাসীর ক্যারিয়ার। একজন আল্লাহওয়ালার ক্যারিয়ার।

টিকাঃ
[১০০] সূরা আহযাব: ৩৩
[১০৪] সুরা আলে-ইমরান: ২৬
[১০৫] মাহজুস সাওয়াব: ২/৫৯০ (সনদ বিশুদ্ধ) সূত্রে আলি সাল্লাবি
[১০৬] সুনানু আবি দাউদ: ৩৪৬২; মুসনাদু আহমাদ: ৫৫৬২; বাইহাকি: ১০৪৮৪; হাদিসটি সহিহ
[১০৭] সুনানু আবি দাউদ: ৪৩০৬, মিশকাত: ৫৪৩২; হাদিসটি হাসান
[১০৮] যুদ্ধ বা জিহাদ দুই প্রকার: আক্রমণাত্মক এবং রক্ষণাত্মক। আক্রমণাত্মক জিহাদ ফরজে কিফায়া (সামষ্টিক ফরজ) এবং রক্ষণাত্মক জিহাদ ফরজে আইন (ব্যক্তিগত ফরজ)। এই আয়াতের যেকোনো বিস্তারিত তাফসিরেই আপনি পাবেন এই কথাগুলো: মুসলিম ভূখণ্ড এক বিঘত পরিমাণও কাফেরদের অধীনে চলে গেলে ওই অঞ্চলের মুসলিমদের ওপর জিহাদ ফরজে আইন, বাকি মুসলিমদের জন্য ফরজে কিফায়া। তারা শত্রুর বিরুদ্ধে অপারগ হলে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জন্য ফরজে আইন, বাকিদের জন্য কিফায়া। এভাবে ক্রমান্বয়ে পাশের এলাকা, তারা না পারলে তার পাশের এলাকা, এভাবে ফরজে আইনের হুকুম বর্তাবে। এটা গেল রক্ষণাত্মক জিহাদ। কোনো আলেম বলে দিক বা না দিক, কেউ যাক বা না যাক, প্রত্যেকের ওপর এই হুকুম। (মাআরেফুল কুরআন, সুরা বাকারার ২১৬ নং আয়াতের তাফসির দ্রষ্টব্য)
আর আক্রমণাত্মক জিহাদ ফরজে কিফায়া। [দুটোই বিস্তারিত দেখুন, আল-হিদায়া, ই. ফা., ২/৪২১-৪৩০]
[১০৯] সুরা তাওবা: ২৪
[১১০] শুআবুল ঈমান, বাইহাকি: ৪২৯১, সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা: ৩৩৩৩; এর সনদ বিশুদ্ধ
[১১১] সুনানু আবি দাউদ: ৪২৯৯; মুসনাদে আহমাদ: ২২৩৯৭; হাদিসটি সহিহ
[১১২] সুরা হুজুরাত: ১৪
[১১৩] সুনানু আবি দাউদ: ৪২৯৭; মুসনাদু আহমাদ: ২২৩৯৭; হাদিসটি সহিহ
[১১৪] সুনানু আবি দাউদ: ৪২৯৭; মুসনাদু আহমাদ: ২২৩৯৭; হাদিসটি সহিহ

ফন্ট সাইজ
15px
17px