📄 বিপদজনক পদস্খলন
এই উপন্যাস ও গল্পগুলোর সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, লেখক ও পাঠকের মাঝে অলিখিত একটি ঐকমত্য সৃষ্টি হয়। এ ঐকমত্যের সারকথা হলো, 'লেখক যেন বলছে, আমাকে সুযোগ দাও আমি ধোঁকা দেবো, আর পাঠক (যেন) বলছে, আমাকে ছেড়ে দাও আমি ধোঁকা খাব।'
অর্থাৎ লেখক এ কথা খুব ভালোভাবে জানে যে, আমি যা লিখছি তা অবশ্যই ভুয়া। এমনিভাবে পাঠকও জানে যে, আমি যা কিছু পাঠ করছি তা নিশ্চিতভাবেই ভুল ও কাল্পনিক। কিন্তু লেখক ও পাঠক এ বিষয়ে একমত হয়েছে যে, লেখক যা কিছু লিখবে, পাঠক তার সবটুকুকেই সত্যায়ন করবে।
এই ঐকমত্যের লাভ হলো, এই উপন্যাস থেকে সে লাভবান হতে পারবে। যেমন : কোনো গল্পের মাঝে পড়ছিল যে, অপরাধী কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করার জন্য তার কাছে পৌঁছে যায়। লেখক এখানে আপনার ভেতর এই কামনা ও অনুভূতি জাগানোর চেষ্টা করবে যে, অপরাধী সেই লোকটিকে যেন হত্যা করতে না পারে। যদি এই অনুভূতি জাগ্রত না হয়, তাহলে পাঠকের লাভ হবে না, কারণ তার অনুভূতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এরপরও পাঠকের সেই গল্প শেষ পর্যন্ত পাঠ করা মূলত এই চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া, লোকটির নিহত হওয়া উচিত না হলেও আমি তার হত্যাকে সমর্থন করলাম। এটা কি ধোঁকা নয়? উপরন্তু সে জানে, এখানে কেউ হত্যাও করবে না, কেউ নিহতও হবে না। তারপরও মন থেকে হত্যা হওয়া বা না হওয়ার প্রত্যাশা করার হেতুটা কী? নিশ্চয় অলীক কল্পনা এবং সত্যের সাথে প্রবঞ্চনা।
এখানে পদস্খলনের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। যেমন: যখন আপনি গল্পের নায়ককে দেখবেন, তার সাথে ক্রুস রয়েছে। এদিকে ভ্যাম্পায়াররা নায়কের ওপর আক্রমণ করার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আক্রমণ করে বসেছে। ঠিক এই সময় আপনার মাঝে একটি কল্পনা, একটি অনুভূতি এবং একটি আবেগ ও কাল্পনিক পরামর্শ কাজ করবে, যদি সে ক্রশের সাহায্য গ্রহণ করত তাহলে তাকে প্রতিরোধ করতে পারত!
তো এই কল্পনাটি ভয়ংকর ও বিপজ্জনক পদস্খলন। একজন মুসলিম কীভাবে ক্রুসকে সাহায্যকারী ভাবতে পারে; অথচ তা খ্রিষ্টানরা আবিষ্কার করেছে? একজন মুসলিম কীভাবে মানতে পারে যে, ক্রুশ ভ্যাম্পায়ারকে প্রতিরোধ করতে পারবে? উপরন্তু এই উপমায় কল্যাণ ও অনিষ্টতার মাঝে রয়েছে মহাযুদ্ধ, যেমনটি লেখক চিত্রায়ণ করেছে। আর এখানে বলা হয়েছে, কল্যাণ হলো ক্রুশ, যা বিশ্বাস করলে ইমান থাকবে না। আল্লাহ তাআলা এসব কুফরি থেকে আমাদের হিফাজত করুন।
সাধারণ মানুষ তো আছেই, বর্তমান যুগের তালিবুল ইলম ও দ্বীনের দাঈরা পর্যন্ত এই বিপজ্জনক পদস্খলনের শিকার। তারা এই উপন্যাসগুলোর ভুল বের করার জন্য এগুলো পাঠ করে। তবুও অনেক সময় দেখা যায়, কিছু লেখকের জাদুকরী ভাষা ও উপস্থাপনার কাছে সে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তার হৃদয়ে ক্রুসধারী নায়ককে সাহায্য করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়েছে; যদিও সেই নায়ক শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে অপরাধী।
অতএব, হে মুসলিম ভাই, এই বিপজ্জনক পদস্খলন থেকে সতর্ক থাকুন!
📄 পরিশিষ্ট
বিনোদন ভয়ংকর এক শিল্প, যা তার সীমারেখা ও মূলনীতি লঙ্ঘন করেছে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য সকলেই এর ওপর হামলে পড়েছে। বর্তমানে তো থিয়েটার বিনোদন বহুরকম অবৈধ বিষয়ের বিস্তার ঘটিয়েছে।
মুসলিমদের এই সর্বনাশা তুফানের সামনে দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে একে প্রতিহত করতে হবে। খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে এবং মনে রাখতে হবে, তাদের সন্তানদের অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি; বরং তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে এক আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার জন্য এবং পৃথিবীকে কল্যাণে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য।
📄 গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
এখানে আমি এমন কিছু নির্দেশনা উল্লেখ করব, বিনোদনের জন্য যদি আমাদের যুবক-যুবতীরা কোনো গল্প ও উপন্যাসের বই নির্বাচন করার সময় সেগুলোর প্রতি যত্নবান হয়, তাহলে ইনশাআল্লাহ বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশেই কমে যাবে।
📄 বই নির্বাচন করার সময়
প্রথম নির্দেশনা: বিজ্ঞ কোনো আলিমকে জিজ্ঞেস করা এবং এমন অভিজ্ঞ লোকদের জিজ্ঞেস করা, যারা উপন্যাসের গোপন তথ্য সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবহিত এবং উপন্যাসের যাবতীয় প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার বিষয়গুলো তাদের নখদর্পণে রয়েছে।
দ্বিতীয় নির্দেশনা: এমন গল্প-উপন্যাস পড়া বন্ধ করে দেওয়া ও দূরে থাকা, যেগুলো আমাদের অবিচলতা ও স্থিতিশীলতাকে লক্ষ্য বানিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে, শরিয়তের বিধান নিয়ে তিরস্কার করে এবং যেগুলো প্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করে। কেননা, আমাদের অন্তরসমূহ দুর্বল; অথচ এর বিপরীতে সংশয়গুলো প্রকট। অনেক সময় এমন প্রকট সংশয়গুলো পড়া হয়, কিন্তু সেগুলো প্রতিহত করা যায় না, যা ইমানের মাঝে ক্ষত সৃষ্টি করে।
তৃতীয় নির্দেশনা: কোনো প্রকার প্রচারণার পিছে না দৌড়ানো। প্রচারিত বিষয়টি আপনার লক্ষ্য হোক বা না হোক। খুব ভালোভাবে জানতে হবে, ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইটে প্রচারিত উপন্যাসগুলো নির্ভেজাল হয় না বললেই চলে। কেননা, মুসলিমবিদ্বেষী অসাধু চক্র সাধারণত উপন্যাসের ওপর ইমানবিধ্বংসী রং লাগানোর অপপ্রয়াস চালায় এবং সেগুলো ভার্চুয়াল জগতে প্রচার-প্রসার করতে থাকে।
চতুর্থ নির্দেশনা : ওই কিতাবগুলো অধ্যয়নের তালিকায় সর্বাগ্রে রাখা, যেগুলো আমাদের পূর্বসূরি আলিমরা রচনা করেছেন এবং যেসব গ্রন্থে উলামায়ে কিরাম ও নেককার মানুষদের জীবনচরিত বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন: হাফিজুল হাদিস জাহাবি রহ. বিরচিত সিয়ারু আলামিন-নুবালা, তাজকিরাতুল হুফফাজ, ইমাম তাবারি রহ. রচিত তারিখুল উমাম ওয়ালা মুলুক, ইমাম ইবনে কাসির রহ. রচিত আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, এভাবে তারিখে ইবনে খালদুন ও তারিখুল জাবরাতি ইত্যাদি।