📘 মুমিনের বিনোদন 📄 আমাদের ও তাদের কর্মপদ্ধতি

📄 আমাদের ও তাদের কর্মপদ্ধতি


ধর্মদ্রোহীদের কর্মধারা: যারা পৃথিবীর ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের ব্যাপারে জানেন, তারা দেখেছেন, এই ধর্মদ্রোহীরা মুসলিম উম্মাহকে পশ্চিমা ধ্যান-ধারণায় রূপান্তরিত করতে মরিয়া হয়ে আছে। এ বিষয়ে তারা সম্ভাব্য এমন কোনো পথ ও পদ্ধতি অবশিষ্ট রাখেনি, যা ব্যবহার করে এই উদ্দেশ্যে সফল হওয়া যেতে পারে। নানা প্রকার বাহনে আরোহী হয়ে বিভিন্ন দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ছে এবং অনেকাংশে সফলতাও পাচ্ছে।
এই উদ্দেশ্যে তারা সাহিত্যের জগতে নোংরা লেখকদের নিয়োগ করেছে। তাদের চিন্তা- চেতনা ও কর্মপদ্ধতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নতজানুমূলক কর্মনীতি ও সাহিত্যের বিভিন্ন প্রকার কাজে লাগিয়েছে। সুতরাং আমরা দেখছি যে, তাদের ছড়া-ছন্দ থেকে নষ্টামি টপকে পড়ছে এবং নিত্যনতুন কবিতার পঙতি থেকে কুফরি ও নাস্তিকতা উপচে পড়ছে।
যেভাবে তারা নিজেদের পক্ষ থেকে গল্প বানিয়ে এই অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের পথটি পূর্ণরূপে কাজে লাগিয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে কুফরি, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাস্তিকতা ও বিদআতসহ নানা প্রকার অপরাধ ছড়িয়ে দেওয়ার সুবিধাও গ্রহণ করছে। যেগুলোর মাঝে রয়েছে মুসলিম উম্মাহর জন্য কঠিন বিপদের অশনি সংকেত।
কারণ, তারা এই গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে নিজেদের চিন্তা-চেতনা ও মতাদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। এই পথেই তারা মুসলিম উম্মাহর সদস্যদের করতে পারবে পথহারা, তাদের শুনাতে পারবে নিকৃষ্ট ও বাজে কথা এবং পথভ্রষ্টতামূলক এমন পরিষ্কার আলোচনাও তাদের কর্ণকুহরে পৌঁছাতে পারবে, যেগুলো অন্য কোনো পথে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা ও প্রচার করা সম্ভব নয়।
তো এই লোকগুলো কারা, যারা প্রকাশ্যে নাস্তিকতা প্রচার করার এবং তার সাথে সম্পর্ক রাখার দুঃসাহস দেখায়? তারা কারা, যারা নোংরা ও পাপাচারপূর্ণ গল্প ও নিজেদের ভ্রষ্ট মতাদর্শ দিবালোকে প্রচার করার দুঃসাহস দেখায়? এগুলো খুঁজে বের করে তাদের প্রতিকার করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
তাদের লিখিত উপন্যাসগুলো একদিক থেকে যেমন মুসলিম উম্মাহর আকিদা-বিশ্বাসকে মূলোৎপাটন করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সুন্দর চরিত্রকে সেকেলে বলে উপস্থাপন করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। একদিক থেকে আমাদের ইমানহারা করার ষড়যন্ত্র করছে, অন্যদিকে অসচ্চরিত্রে লিপ্ত করার পাঁয়তারা চলছে। অথচ এগুলোর নাম দিচ্ছে মানবতার সংস্কৃতি বলে। তাদের এই চক্রান্তের মৌলিক সূত্রটির ব্যাপারে কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
وَدُّوا لَوْ تَكْفُرُوْنَ كَمَا كَفَرُوا فَتَكُوْنُوْنَ سَوَاءٌ .
‘তারা চায়, তারা যেমন কাফির তোমরাও তেমনই কাফির হয়ে যাও। [সুরা আন-নিসা : ৮৯]
وَ يُرِيدُ الَّذِينَ يَتَّبِعُوْنَ الشَّهَوَاتِ أَنْ تَمِيلُوْا مَيْلًا عَظِيمًا .
আর যারা প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তারা চায় তোমাদের বড় রকম লক্ষ্যচ্যুতি ঘটুক। [সুরা আন-নিসা : ২৭]
এ কারনেই তাদের গল্পগুলো অধিকাংশ সময় বিকৃত চিন্তার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। মুসলিম নারী-পুরুষ সকাল-সন্ধ্যা লাইব্রেরিসমূহে সেগুলো দেখত ও পড়ত।
বিষয়টি কেবল লাইব্রেরি পর্যন্ত সীমিত থাকেনি; বরং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটগুলোতে ও ভার্চুয়াল জগতে ছড়িয়ে পড়েছে। সাহিত্যের নামের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি স্থানে পৌঁছে গেছে। এমন নিকৃষ্ট ও হীন কোনো পদ্ধতি নেই, এগুলোর প্রসারে যে পদ্ধতি তারা গ্রহণ করেনি।
আমাদের করণীয়
আমাদের কাজ হলো ভেবে-চিন্তে শরয়িভাবে কার্যকরি পদ্ধতিতে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা। আল্লাহর দ্বীনকে প্রচার-প্রসার করার জন্য সাহিত্য, উপন্যাস ও গল্পকে ব্যবহার করা এবং শরিয়তসম্মত পদ্ধতিগুলো কাজে লাগানো। শর্ত হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে ইসলামি বিধি-নিষেধ এবং বিধেয় বিষয়গুলোর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

📘 মুমিনের বিনোদন 📄 প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইসলামি উপন্যাসের ভূমিকা

📄 প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইসলামি উপন্যাসের ভূমিকা


এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইসলামি উপন্যাসের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও অপরিহার্য কর্তব্য; যেন আমাদের যুবক-যুবতীদের সামনে বিকল্প কিছু পেশ করা যায়। আমরা যে যুগে অবস্থান করছি, সেখানে উপন্যাসের জয়জয়কার চলছে। সেগুলো হোক ধর্মনিরপেক্ষতার ছায়ায়, হোক কুফরির পতাকাতলে, অথবা হোক সেগুলো রোমাঞ্চকর, কাল্পনিক, ডিজিটাল ও অ্যাকশনধর্মী অন্য কোনো বিষয় নিয়ে।
অতএব, ইসলামি উপন্যাস সম্পর্কেও আমাদের সম্যক ধারণা থাকতে হবে। যেন লাইব্রেরি, ওয়েবসাইটসহ ভার্চুয়ালজগতের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামি উপন্যাস উপস্থিত থাকে। কোনো একটি স্থানও যেন এমন খালি পড়ে না থাকে, যেখানে ইসলামি উপন্যাস থাকবে না।
মুসলিম উম্মাহ বহু রকম প্রতিভার আধার। সত্যিকারের ইসলামি গল্প ও উপন্যাস লেখার পূর্ণ যোগ্যতা তাদের মাঝে আছে। প্রয়োজন শুধু নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজে লাগানোর।

📘 মুমিনের বিনোদন 📄 গল্পচ্ছলে ইসলামের দাওয়াত

📄 গল্পচ্ছলে ইসলামের দাওয়াত


কোনো গল্প যখন সুন্দরভাবে সাজানো হয়, উপন্যাসকে যখন হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপন করা হয়, এর মধ্য দিয়েই সুকৌশলে এত সুন্দরভাবে বড় একটি সমাজকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা সম্ভব, গতানুগতিক খুতবা, ওয়াজ কিংবা দারসের মাধ্যমে যে পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব নয়।
গল্পের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এর মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্পৃহা, আকর্ষণ ও বৈধ সম্ভোগের ভাব সৃষ্টি করা যায়। আমাদের নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ مِنَ الْبَيَانِ لَسِحْرًا .
[৭৭] নিশ্চয় কথার মাঝে রয়েছে জাদু।
সুতরাং গল্প হতে পারে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার বড় একটি অস্ত্র ও আকর্ষণীয় মাধ্যম, যার মাধ্যমে মানুষকে বিষণ্ণতা, বিরক্তি ও গতানুগতিক একঘেয়েমি থেকে বের করে আনা সম্ভব হবে এবং যৌক্তিক ও হৃদয়গ্রাহী বর্ণনাধারার মাধ্যমে তাদের মানসিকভাবে দ্বীনের পথে আকৃষ্ট করা সহজ হবে।
জাদুর তো সত্তাগতভাবেই মজবুত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। আপনি দেখবেন, পাঠক তার অস্তিত্ব ও অনুভূতি নিয়ে কীভাবে গল্পের সাথে মিশে যায়, কীভাবে প্রভাবিত হতে থাকে! গল্প পড়ে কখনও কাঁদে, কখনও হাসে, কখনও আনন্দিত হয়, কখনও আবার চিন্তার সাগরে ভাসে। গল্পের তালে তালে এমনভাবে আলোড়িত হতে থাকে, ঠিক যেমন নৌকারোহী নদীর মৃদু তরঙ্গের সাথে দোল খেতে থাকে।
যেহেতু গল্পের মাঝে উপকার আছে, আছে সাহিত্যিক ঢং, মিষ্টতা ও তরঙ্গময়তা, যেহে: তাতে রয়েছে হৃদয়ে প্রভাব সৃষ্টিকারী অপার শক্তি! অতএব, যার মাঝে আল্লাহ তাআলা, হৃদয়গ্রাহীভাবে, আকর্ষণীয় রূপে, অন্তরে প্রভাবসৃষ্টিকারী গল্প লেখার প্রতিভা ও দক্ষতা দান করেছেন, তার জন্য অপরিহার্য কর্তব্য হলো, ইসলামের প্রচার-প্রসারে দাওয়াত ইলাল্লাহর জন্য সাধ্যের সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে মনের মাধুরি মিশিয়ে কলম চালানো ও গল্প-উপন্যাস লিখতে থাকা।

টিকাঃ
[৭৭] সহিহুল বুখারি: ৪৭৪৯

📘 মুমিনের বিনোদন 📄 ইসলামি গল্প ও উপন্যাসের জন্য জরুরি বিষয়

📄 ইসলামি গল্প ও উপন্যাসের জন্য জরুরি বিষয়


ইসলামি লেখক ও ঔপন্যাসিকগণ, যারা গল্প লেখেন, উপন্যাস লেখেন, তাদের জন্য নিজেদের লেখায় এবং উপন্যাসের মাঝে নিচের বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ রাখা খুব জরুরি-
১. লেখায় যেন এমন ঔদ্ধত্য ও উদ্ভট খেয়াল বা মন্তব্য না থাকে, যা পাঠকের বোধশক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
২. এমন কোনো বিষয় লেখায় স্থান দেওয়া যাবে না, যেগুলো মানুষের স্বভাবজাত আবেদনের পরিপন্থি।
৩. লেখা যেন অবশ্যই ব্যাকরণগত দিক থেকে নির্ভুল হয়, ভাষার নিয়মাবলিতে কোনো অসঙ্গতি না থাকে, অলংকারশাস্ত্রের প্রতি সজাগ দৃষ্টি থাকে এবং আকর্ষণীয় শব্দ চয়নের দিকে গভীর নজর থাকে, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে অনৈসলামি লেখকদের চ্যালেঞ্জ করে বিজয়ী হওয়া যায়। যদি এই বিষয়গুলোতে ইসলামি গল্প ও উপন্যাসগুলো উত্তীর্ণ হতে পারে, তাহলে অন্যান্য ছোটখাট বিষয় অন্তরালে চলে যাবে। সেগুলো নিয়ে এই লেখার ওপর উল্টো প্রতিক্রিয়া, ক্রোধ বা ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার অবকাশ থাকবে না।
৪. কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত ঘটনাগুলোর প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। যেমন : নবিদের ঘটনা, মুজিজা, দাওয়াতের স্তর বর্ণনা করা এবং গোঁড়া লোকদের অবস্থানগুলো পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা, মুমিনদের শেষ ফলাফল কী, সেগুলোও আলোচনা করা।
উদাহরণত, ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ঘটনা, মুসা আলাইহিস সালামের ঘটনা, হারুন আলাইহিস সালামের ঘটনা, ইসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামের ঘটনা এবং আমাদের প্রিয়নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ঘটনা ইত্যাদি।
অতীত উম্মাহার ঘটনাও আলোচনায় স্থান পেতে পারে। যেমন: ওই সকল মানুষের কাহিনি, যাদের তাদের আবাস্থল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল; অথচ তাদের সংখ্যা ছিল হাজার হাজার। অনুরূপ তালুত ও জালিম জালুতের ঘটনা, আদম আলাইহিস সালামের পুত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিলের ঘটনা, আসহাবে কাহফের ঘটনা, জুলকারনাইনের ঘটনা, কৃপণ কারুনের ঘটনা, আসহাবুস সাত্ত তথা দাউদ আলাইহিস সালামের নাফরমান উম্মতের ঘটনা, মারইয়াম আলাইহাস সালামের ঘটনা, আসহাবুর রাকিম ও হস্তিবাহিনীর ঘটনা ইত্যাদি।
ওই সমস্ত সংগ্রাম ও আন্দোলনের ঘটনাগুলোও উপস্থাপন করা যেতে পারে, নবিদের যুগে যেগুলো সংঘটিত হয়েছে। যেমন: গাজওয়ায়ে বদর, গাজওয়ায়ে উহুদ, গাজওয়ায়ে হুনাইন, গাজওয়ায়ে তাবুক, গাজওয়ায়ে খন্দক, হিজরতের ঘটনা, মিরাজের ঘটনা ইত্যাদি।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমেও অতীত উম্মতের ঘটনা পেশ করে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে—
وَاضْرِبْ لَّهُم مَّثَلًا رَّجُلَيْنِ جَعَلْنَا لِأَحَدِهِمَا جَنَّتَيْنِ مِنْ أَعْنَابٍ وَ حَفَفْتُهُمَا بِنَخْلٍ وَ جَعَلْنَا بَيْنَهُمَا زَرْعًا.
আপনি তাদের কাছে দু'ব্যক্তির উদাহরণ বর্ণনা করুন। আমি তাদের একজনকে দুটি আঙুরের বাগান দিয়েছি। এ দুটিকে খেজুর গাছ দ্বারা পরিবেষ্টিত করেছি এবং এর মাঝখানে করেছি শস্যক্ষেত্র। [সুরা আল-কাহফ : ৩২]
উলামায়ে কিরামের মাঝে এ বিষয়টি নিয়ে মতপার্থক্য আছে যে, বাস্তবেই এমন ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, না কি সম্ভাব্য সংঘটিতব্য ঘটনা অগ্রিম বর্ণনা করেছেন, কিংবা আমাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য কাল্পনিকভাবে ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ আলিম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বাস্তবে সংঘটিত ঘটনাই বর্ণনা করেছেন। তবে এই বিষয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই যে, সবগুলো ঘটনা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য ওয়াজ ও উপদেশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
উপদেশগুলো এমন কার্যকরি যে, সেগুলো হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটে। আল্লাহর একত্ববাদ, নবিদের সত্যায়ন ও বাতিলের মোকাবিলায় প্রমাণ পেশ করার ক্ষেত্রে এগুলো খুবই শক্তিশালী ও অব্যর্থ মাধ্যম।
এটা খুব সুন্দর ও পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে দেয়, সৃষ্টির প্রতি আল্লাহ শত ভাগ ইনসাফ করেছেন। বিশেষভাবে অপরাধীদের প্রতি তিনি অণুপরিমাণও বাড়তি শাস্তি চাপিয়ে দেননি। খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়, আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের সাহায্য করেন এবং তাঁর নবি ও নেককার বান্দাদের ছোট-বড় সর্বপ্রকার বিপদের সময় সান্ত্বনা প্রদান করেন। মমতাভরা কৌশলে হৃদয়স্পর্শীভাবে ইমান ও কল্যাণের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেন এবং কুফরি, পাপাচার ও নাফরমানির প্রতি নিরুৎসাহিত করেন।
এতে কাফিরদের জন্যও রয়েছে অলংকারপূর্ণ মমতামাখানো ওয়াজ।
আকিদা-বিশ্বাস, চরিত্র ও ফাজায়িলের ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহয় মজবুতভাবে বর্ণিত হয়েছে। আর কল্যাণকর কাজের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে চিত্তাকর্ষক পদ্ধতিতে।
এমনিভাবে আমরা দেখি, আমাদের কাছে এমন অসংখ্য গল্পের ভান্ডার রয়েছে, যেগুলো হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা হৃদয়জগতে ভালো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং সহজেই বোধগম্য হয়।
ইতালিয়ান লেখক আলবার্তোম মোরাভিয়া বলেছে, 'মুসলমানদের কুরআনে কারিমে এত ঘটনা বর্ণিত আছে, যেগুলো থেকে তারা এখন পর্যন্ত পূর্ণরূপে উপকৃত হতে পারেনি।'
৫. কুরআন-সুন্নাহ থেকে কোনো ঘটনা বর্ণনা করার সময় সেখানে নিজের পক্ষ থেকে এমন কোনো বিষয় সংযোজন করা জায়িজ নেই, যা প্রকৃতপক্ষে ঘটেনি। এমন কোনো ব্যক্তিকে সেখানে অনুপ্রবেশ করানো যাবে না, যে প্রকৃতপক্ষে মূল ঘটনার মাঝে ছিল না। কেননা, এর মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর কথাকে এমন ব্যক্তি বা বস্তুর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, যার সাথে তার আদৌ সম্পর্ক নেই। এটা হবে কুরআন-সুন্নাহর ওপর স্পষ্ট মিথ্যাচার।
৬. পাশ্চাত্যের কিছু কিছু লেখক অন্যান্য ভ্রষ্ট লেখকদের থেকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন, যারা লেখার সময় নিজেদের অকৃপণ উদারতা এবং পক্ষপাতদুষ্টতা থেকে মুক্ত থাকার কারণে সফলতার উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছেন; যা তাদের লেখাগুলো করেছে সম্মানিত, জনপ্রিয় ও সর্বমহলে বরণীয়।
যেমন : প্রাচীন লেখক জুলস ভার্নে যখন 'পৃথিবী থেকে চাঁদে' গল্পটি লিখেছিলেন, তখনও মানববিশ্ব মহাশূন্যে যেতে পারেনি; কিন্তু এই গল্পকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো জ্ঞানগর্ভ আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। যেগুলোর প্রত্যেকটিতে তার গল্পটিকে মূল্যায়ন ও মর্যাদা দান করা হয়।
গল্পটি লেখার ১০০ বছর পর এবং গল্পকারের মৃত্যুর ৬৫ বছর পর আমেরিকা চাঁদে পৌঁছার দাবি করে। অনেক মানুষ তখন জুলস ভার্নের কাল্পনিক গল্প এবং আমেরিকার 'দে ভ্রমণের বাস্তব গল্পের মাঝে অসাধারণ সাদৃশ্য পেয়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। স্মিত হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ, গল্পকার নিজেকে পাঠকের স্থানে বিচার করে গল্পের মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানকে সম্মান করার চেষ্টা করেছেন। তিনি কেবল অনুমাননির্ভর হয়েই গল্পটি তৈরি করেননি; বরং তিনি বিষয়টির বিভিন্ন দিক নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন, তারপর গল্পটি লিখেছেন।
আমাদের যুগে এসে দ্য ভি ভিঞ্চি কোড বইটির লেখক ড্যান ব্রাউন মানুষের চন্দ্রভ্রমণ সম্পর্কে আরেকটি গল্প লিখেছেন। বইটির ৬০ মিলিয়নের অধিকসংখ্যক কপি বিক্রি হয়েছে। তিনি এই গল্প লেখার উদ্দেশ্যে প্রায় আড়াই বছর খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন, যার প্রভাব তার গল্পকে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তুলেছে।
ইসলামি লেখকদের জন্য এগুলো থেকে উপকৃত হওয়া জরুরি। পাঠকদের জ্ঞানকে সম্মান করে এবং ইসলামি ও পাশ্চাত্য লেখনীর প্রতিযোগিতার ময়দানে ইসলামি লেখাকে উত্তীর্ণ করার জন্য পশ্চিমা এই লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা খুব ভালোভাবে অধ্যয়ন করতে হবে।
গল্প-উপন্যাস লেখার পূর্বে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান করলে আরও দুটি উপকার হয়। যথা :
ক. গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে সমাজকে শিক্ষিত ও সভ্য করে তোলা যায়। কারণ, এসব গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে তাদেরকে ইতিহাস, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিষয়ক সঠিক ধারণা দেওয়া সম্ভব।
খ. দ্বীনি বিধি-নিষেধের ক্ষেত্রে ভুলের আশঙ্কা থাকে না; যেমনটি অনেক লেখনীতে দেখা যায়। কারণ, সাধারণত নিজের দ্বীনের নলেজের ওপর ভিত্তি করেই গল্প-উপন্যাস লেখা হয়। আর দেখা যায়, লেখক এ দ্বীনি নলেজ অর্জন করেছেন কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেল, ম্যাগাজিন বা পত্রিকা থেকে। কিন্তু শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলো সঠিক নয়; যার কারণে লেখক পাঠকদের দ্বীনি বিষয়ে ভুল বার্তা প্রদান করেন।
৭. ভ্রান্ত আকিদায় আঘাত করার জন্য গল্প ও উপন্যাসের সদ্ব্যবহার করা এবং সেই ভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাসীদেরকে সুকৌশলে ইসলামি আকিদা ও সহিহ সুন্নাহর দিকে আহ্বান করা।
দ্য ভি ভিঞ্চি কোডের গল্পের মাঝে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় উপমা রয়েছে; যদিও তার লেখক একজন কাফির। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, 'হিকমত মুসলমানের হৃতসম্পদ, যেখানে পাবে সেখান থেকেই উদ্ধার করবে।[৭৮]
এই উপন্যাসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক লেখক ড্যান ব্রাউন তার চিন্তা-চেতনা প্রতিষ্ঠা করেছে; অথচ তার ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে, সে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংস্থাগুলোর সাথে জড়িত, যা ধর্মীয় ভাবাবেগ থেকে মুক্ত। এজন্য সে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও ধর্মের অনেক আকিদা-বিশ্বাস নিয়ে সমালোচনা করে এবং এমন কিছু সংগঠনেরও সমালোচনা করেছে, যারা তাদের দ্বীনি বিষয়কে বিবৃ করে ফেলেছে। ফলে অন্যান্য যাজকেরা তার চরম বিরোধিতা করেছিল।
তার সে উপন্যাস গোটা আমেরিকান সোসাইটিতে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। সেখানকার প্রতি ১০জনের একজন সেই উপন্যাসটি পড়েছে। ৫% ভাগ লোক এ কথা বলেছে যে, এই বইটি তাদের আকিদা-বিশ্বাসের বিকৃতি ঘটিয়েছে। এরপর সেই উপন্যাসের আলোকে সিনেমা তৈরি করা হয়েছে। তবে সেখানে খ্রিষ্টধর্মের ওপর থেকে তিরস্কারের পরিমাণ সিনেমায় অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে। এতৎসত্ত্বেও চলচ্চিত্র কুশলীদের অনেক সমালোচনা করা হয়েছে।
এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, যদি ভালোবাসার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়, সুন্দর করে সাজানো হয় এবং হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপনা করা হয়, তাহলে এই প্রকারের উপন্যাসের মাধ্যমে অনেক মানুষের আকিদা-বিশ্বাস বিকৃত করে নষ্ট করে দেওয়া সম্ভব; যেমনটি ড্যান ব্রাউন করেছিল।
আবদুল মুনইম জাদাবি 'কুনতু কুবুরিয়‍্যান' বা আমি কবরস্থ ছিলাম নামে একটি বই লিখেছেন, যা অনেকটা উপন্যাসধর্মী বই। বইটিতে সুফিবাদের কেলেঙ্কারিগুলো বর্ণনা করা হয়েছে এবং হৃদয়গ্রাহী ও জাদুকরী ঢঙে তাদের প্রতিবাদ ও তিরস্কার করা হয়েছে।
এটার মাধ্যমে দ্য ভি ভিঞ্চি কোডের প্রচারণা করা উদ্দেশ্য নয় যে, লোকজন তার থেকে নিরাপদ থাকবে। কেননা, এই উপন্যাস তো তাদের ভ্রান্ত আকিদার বিশাল সমুদ্রের কয়েক বিন্দু মাত্র।
ড্যান ব্রাউন তো প্রতিমাপূজার দাওয়াত দেয়। সে এই বিশ্বাসও লালন করে যে, মহিলারা ঐশী দ্বীনগুলোর আলোকে প্রভুত্বের বাস্তবতাকে যখন অস্বীকার করেছে তখন তাদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। এই দাবিও করেছে, প্রতিমাপূজার ধর্মে মহিলারা অধিক সম্মানিত ছিল। কেননা, তারা সেখানে দেবীর আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। তাই ড্যান ব্রাউনরা এখন মহিলাদের সাহায্য করে তাদের প্রভুত্ব ও দেবিত্ব ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছে!

টিকাঃ
[৭৮] আমাদের সমাজে অনেকে এটাকে হাদিস বলে প্রচার করে, কিন্তু এটা রাসুলের হাদিস হিসেবে প্রমাণিত নয়। তাই আমাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। অবশ্য এটা হাদিস না হলেও অর্থগত দিক থেকে এতে কোনো অসুবিধা নেই। তাই হাদিস মনে না করে সাধারণ নসিহত হিসেবে এটা বলা যাবে। -সম্পাদক

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية