📄 আকিদা ও চরিত্রে আঘাত
পাশ্চাত্যবাদী এই লেখকরা যে উপন্যাসগুলো রচনা করেছে, মানুষের মাঝে ফিতনা সৃষ্টি করাকে যেভাবে নিজেদের দায়িত্ব মনে করে বসে আছে, যদি কোনো পাঠক সেগুলো দেখে, তাহলে দেখতে পারবে যে, সেগুলোতে দুটি বিষয়ের ওপর আঘাত করা হয়েছে। প্রথমত, আকিদা-বিশ্বাসের ওপর, আর দ্বিতীয়ত উত্তম চরিত্র-আখলাকের ওপর। এই দুটি বিষয়েই আমি বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
📄 তাওহিদের বিরুদ্ধে ও নাস্তিকতার আবিষ্কার
এই গ্রন্থগুলোর অধিকাংশ লেখক সঠিক পথ থেকে পদস্খলিত হয়ে কুফরি ও নাস্তিকতার জলাশয়ে পড়ে গেছে। ফলে তারা শরিয়তের সর্বসম্মত বিষয় এবং দ্বীনের মূলনীতি সম্পর্কে আজে-বাজে কথা বলা আরম্ভ করেছে।
আমরা দেখতে পাই, তাদের লেখাগুলোতে নাস্তিকতার প্রতি দাওয়াত, আল্লাহর সত্তার প্রতি উপহাস ও নিষ্পাপ নবিদের প্রতি ঠাট্টার বিষবাষ্পে ভরপুর। বরং সেই গ্রন্থগুলোর প্রতিটি পরতে পরতে কুফরি, ধর্মদ্রোহিতা, ভ্রষ্টতা ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার জীবাণু গিজগিজ করছে।
জনৈক লেখক তার উপন্যাসের নায়কের ভাষায় বলেছে যে, 'এটা তখনই সম্ভব, যখন সেখানে একজন প্রভু থাকবে।' নাউজুবিল্লাহ।
এই কথার মাঝে নাস্তিকতার পরিষ্কার প্রমাণ রয়েছে।
আরেকজন নাস্তিক তার উপন্যাসে লিখেছে, 'হে আল্লাহ, তুমি তো মিসকিন।' নাউজুবিল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা ক্ষমতাধর, পরাক্রমশালী ও পরাক্রান্ত, যিনি আকাশ জমিন সৃষ্টি করেছেন। তিনি তো এমন যে, যখন কিছু করতে চান শুধু বলেন 'হও', আর সাথে সাথে হয়ে যায়। আর এই নাস্তিক সে সত্তাকেই বলছে 'মিসকিন'!
আল্লাহ তাআলা ও তাঁর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যিই বলেছেন। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে-
قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أُرَاهُ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى يَشْتِمُنِي ابْنُ آدَمَ وَمَا يَنْبَغِي لَهُ أَنْ يَشْتِمَنِي وَيُكَذِّبُنِي وَمَا يَنْبَغِي لَهُ .
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমাকে আদমসন্তান গালি দেয়, কিন্তু আমাকে তার গালি দেওয়া সমীচীন নয়। সে আমাকে মিথ্যারোপ করে, তবে তার জন্য এই মিথ্যারোপ সমীচীন নয়।[৬৮]
আরেকটি বর্ণনায় আছে—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اللَّهُ تَعَالَى يُؤْذِينِي ابْنُ آدَمَ .
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আদমসন্তান আমাকে কষ্ট দেয়...।[৬৯]
হাদিসগুলো দেখুন, আর এই হতভাগা দোপায়া পশুদের দিকে তাকান! তারা কীভাবে আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করছে এবং গালি দিচ্ছে!
ঔপন্যাসিক নাওয়াল সাদাবি এক ছাত্রের কথা বর্ণনা করেছে, যে কথা বলার সময় তোতলামি করত আর এটা দেখে ছাত্ররা হাসাহাসি করত। তখন সে বলল, 'যদি আল্লাহর কাছে ইনসাফ থাকত, তাহলে তিনি আমাকে তোতলা করে বানাতেন না, যার কারণে আমি তোতলামি করে কথা বলছি, আর অন্য সবাই ভালোভাবে কথা বলছে।' নাউজুবিল্লাহ। এটা কি আল্লাহর ইনসাফকে অস্বীকার করা নয়?
কেউ কেউ তো আল্লাহর বিচারেরও বিচার করার জন্য দাঁড়িয়ে গেছে। তার উপন্যাসে বলেছে, 'হে প্রকৃতির প্রতিপালক, তোমার রহমত তো একরকম নয়। তুমি সামের ওপর কেন অনুগ্রহ করলে? হামের ওপর কেন অভিসম্পাত ঢেলে দিলে? আর অমুক কী দোষ করেছিল?
অথচ আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার ইরশাদ করেছেন-
لَا يُسْلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْلُوْنَ
আল্লাহ তাআলা তার কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন না, কিন্তু তারা তো জিজ্ঞাসিত হবে। [সুরা আল-আম্বিয়া : ২৩]
ঔপন্যাসিক নাওয়াল সাদাবি আরও বলেছে, 'কিয়ামতের সমাবেশে প্রভু আগে পদত্যাগ করবেন।' নাউজুবিল্লাহ।
এ ধরনের ভয়ংকর কথার পরিপ্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
تَكَادُ السَّمُوتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنْشَقُ الْأَرْضُ وَ تَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًا .
যার কারণে হয়তো আসমানসমূহ ফেটে পড়বে, পৃথিবী খণ্ড-বিখণ্ড হবে এবং পর্বতমালা ভেঙে পড়বে। [সুরা মারয়াম: ৯০]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-
وَ مَا قَدَرُوا اللهَ حَقَّ قَدْرِهِ، وَ الْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيمَةِ وَ السَّمُوتُ مَطْوِيتُ بِيَمِينِهِ سُبْحَنَهُ وَتَعْلَى عَمَّا يُشْرِكُونَ .
আর তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবীই থাকবে তার মুষ্টিতে এবং আকাশসমূহ তার ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে। তিনি পবিত্র, আর তারা যাদেরকে শরিক করে তিনি তাদের ঊর্ধ্বে। [সুরা আজ-জুমার: ৬৭]
জামিআ আজহারের ফাতাওয়া থেকে পালাতে গিয়ে নাওয়াল সাদাবি পাশ্চাত্যের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। জামিআ আজহার তাকে হাইলাইট করেছে এবং প্রচারের জন্য টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারও নিয়েছে। তখনই সে এ জঘন্য উক্তি করে যে, 'কিয়ামতের সমাবেশে প্রভু আগে পদত্যাগ করবেন।' নাউজুবিল্লাহ। এখানেই শেষ নয়; বরং সে তো সালাত ও হজকেও অস্বীকার করেছে। সে বলে, 'আমার হজ তো গল্প-উপন্যাসের মাঝে, আর আমার সালাত ও ইবাদতগৃহ রয়েছে লেখনীতে।'
কিছু ঔপন্যাসিক তো পরিষ্কারভাবে এ কথাও বলেছে যে, 'বিজ্ঞানীরা আজ রবের স্থান দখল করে নিয়েছে।' নাউজুবিল্লাহ।
অর্থাৎ তাদের জ্ঞানের সীমানায় দ্বীন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এই লেখক কুরআনে কারিমের নিম্নোক্ত আয়াতের ওপর কখনও বিশ্বাস স্থাপন করে না, যেখানে আল্লাহ বলছেন-
لَوْ كَانَ فِيْهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا.
যদি আসমানে ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া অনেক ইলাহ থাকত, তাহলে উভয়টিই ধ্বংস হয়ে যেত। [সুরা আল-আম্বিয়া : ২২]
কুরআনে কারিমের নিম্নোক্ত আয়াতটিকেও তারা অস্বীকার করে, যেখানে আল্লাহ বলছেন-
إِنَّ اللهَ يُمْسِكُ السَّمَوتِ وَ الْأَرْضَ أَنْ تَزُولًا ، وَ لَبِنْ زَالَتَا إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ أَحَدٍ مِّنْ بَعْدِهِ .
নিশ্চয় আল্লাহ, আসমান ও জমিনকে স্থির রাখেন, যাতে টলে না যায়। যদি এগুলো টলে যায়, তবে তিনি ব্যতীত কে এগুলোকে স্থির রাখবে? [সুরা আল-ফাতির : ৪১]
আল্লাহর কসম, যদি তিনি আকাশকে জমিনের ওপর চাপিয়ে দিতে চান, তাহলে তাদের জ্ঞান ও ধর্মদ্রোহিতা তাদের কোনো উপকারে আসবে না।
নবিরা পর্যন্ত এই ধর্মদ্রোহী নাস্তিকদের বেয়াদবি থেকে মুক্তি পাননি। জনৈক ঔপন্যাসিক তার উপন্যাসের নায়ক হিশামের ভাষায় বলেছে, 'কাবিল নারীর কারণে হাবিলকে হত্যা করেছে। আদম নারীর কারণে জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন এবং নারীর কারণেই অপরাধ করেছেন। সুলাইমান নারীর কারণেই জিনকে বশীভূত করেছেন। দাউদের বাদ্যযন্ত্র নারীর কারণেই এবং লুতের নেশাগ্রস্ততাও এ নারীর কারণেই হয়েছে; যেমনটি তাওরাতে বর্ণিত আছে। এমনকি ইসা মাসিহ ইহুদিদের হদ (শরয়ি শাস্তি) ঝগড়াটে মারইয়ামের কারনেই বাতিল করে দিয়েছেন।'
তাহলে কি সে আমাদের নবির ওপরও অপবাদ দিতে চায়; যেখানে স্বয়ং রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
حُبَّبَ إِلَيَّ مِنَ الدُّنْيَا النِّسَاءُ وَالطَّيبُ وَجُعِلَ قُرَّةُ عَيْنِي فِي الصَّلَاةِ .
দুনিয়া থেকে তিনটি বস্তু আমার প্রিয় করে দেওয়া হয়েছে: নারী, সুগন্ধি এবং আমার চোখের শীতলতা বানানো হয়েছে সালাতকে।[৭০]
আমি জানি না, সে কি এ হাদিসটির কথা জানত না, নাকি মুসলিম সমাজে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হওয়ার আশঙ্কায় জানা থাকলেও উল্লেখ করেনি!
সে যতগুলো কথা বলেছে সবই নবিদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ। আদম আলাইহিস সালাম কি নারীর কারণে অপরাধ করেছিলেন? সুলাইমান আলাইহিস সালাম নারীর কারণে জিনকে অনুগত করেছিলেন? লুত আলাইহিস সালাম নিষ্পাপ নবি হয়েও কি নেশাগ্রস্ত হয়েছিলেন? ইসা আলাইহিস সালাম কি আল্লাহর দেওয়া কোনো হদ রহিত করেছিলেন?
তাদের কারও বক্তব্য হলো, 'সমস্ত ধর্ম এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে, মানুষ মূলত কী ছিল? কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? এ বিষয়ে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি অলীক কল্পনার ঘূর্ণাবর্তে ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে।'
বস্তুত এ কথার মাধ্যমে তারা সমস্ত দ্বীন-ধর্মকে উপহাস করেছে।
তাদের কেউ একজন বলেছে, 'সওয়াব, শান্তি, জান্নাত, জাহান্নাম এবং সাদা ও সবুজ ফেরেশতা বলতে কিছু নেই।'
যা আমাদের প্রতিষ্ঠিত আকিদা-বিশ্বাসের প্রতি স্পষ্ট তিরস্কার। কারণ, ইমানের সাতটি শাখার মাঝে ফেরেশতা ও পরকাল দিবসের প্রতি ইমান রাখা অন্যতম।
একজন বলেছে, 'আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম। কেননা, আমি জাহান্নামকে নিজের জন্য নির্বাচন করেছি।'
জাহান্নামের অস্তিত্বকে অস্বীকারকারী কোনো ব্যক্তি কি জাহান্নামকে নিজের জন্য নির্বাচন করতে পারে! নাকি সে প্রকারান্তরে সেই আয়াতকে অস্বীকার করেছে, যাতে বলা হয়েছে, আত্মহত্যাকারীর প্রতিদান হলো জাহান্নাম?
তাদের একটি উপন্যাসে এর দলিলও রয়েছে। তারা মুসলিমদের সর্বস্বীকৃত আকিদার ওপর প্রশ্ন করে বলে, 'মুসলিমরা কি বলে না যে, কিয়ামতের দিন হিসাব শেষ হওয়ার পর মৃত্যুকে একটি দুম্বার আকারে হাজির করা হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি স্থানে জবাই করা হবে? তারপর হাসতে হাসতে বলেছে, আমার কাছে এগুলো উদ্ভট কবিতা মনে হলো!'
এরপর বলেছে, 'হে অলিদ, তুমি কি জানো, আমাকে কোন বিষয় খুব বেশি অবাক করেছে? মৃত্যুরও কি মৃত্যু হতে পারে? যে প্রকৃত অর্থে মৃত্যু, তার মৃত্যু কীভাবে সম্ভব? যে মৃত্যু আমাদের মৃত্যু দেবে, সে কীভাবে নিজেই মারা যাবে?'
তারা মূলত এই উপন্যাসের মাধ্যমে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থলে মৃত্যুর জবাইসংক্রান্ত হাদিসের মাঝে সংশয় সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালিয়েছে, উপহাস করেছে এবং হাদিসটিকে উদ্ভট কবিতার সাথে তুলনা করেছে। অথচ হাদিসটি সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে-
عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا صَارَ أَهْلُ الْجَنَّةِ إِلَى الْجَنَّةِ وَأَهْلُ النَّارِ إِلَى النَّارِ جِيءَ بِالْمَوْتِ حَتَّى يُجْعَلَ بَيْنَ الْجَنَّةِ وَالنَّارِ ثُمَّ يُذْبَحُ ثُمَّ يُنَادِي مُنَادٍ يَا أَهْلَ الْجَنَّةِ لَا مَوْتَ وَيَا أَهْلَ النَّارِ لَا مَوْتَ فَيَزْدَادُ أَهْلُ الْجَنَّةِ فَرَحًا إِلَى فَرَحِهِمْ وَيَزْدَادُ أَهْلُ النَّارِ حُزْنًا إِلَى حُزْنِهِمْ .
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যখন জান্নাতিরা জান্নাতে এবং জাহান্নামিরা জাহান্নামে চলে যাবে, তখন মৃত্যুকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝামাঝি স্থানে হাজির করে জবাই করা হবে। তারপর একজন ঘোষক ঘোষণা করবে, হে জান্নাতিরা, আর কোনো মৃত্যু নেই। হে জাহান্নামিরা, আর কোনো মৃত্যু নেই। এই ঘোষণা শুনে জান্নাতিদের আনন্দ বৃদ্ধি পাবে এবং জাহান্নামিদের বিষাদ বেড়ে যাবে।[৭১]
হাদিসটি যে কেবল বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে এতটুকুই নয়; বরং গোটা উম্মত হাদিসটিকে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং প্রতিটি মুমিন এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেই মুমিন হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সর্ববিষয়ে শক্তিমান। তিনি চাইলে কোনো অন্তর্গত বিষয়কে বস্তুনিষ্ঠ এবং কোনো বস্তুনিষ্ঠ বিষয়কে অন্তর্গত বানাতে পারেন। তিনি যেভাবে চান বস্তুর আকৃতি দান করেন।
কিন্তু এই নাস্তিক লেখক উপন্যাসের মাঝে দুজন ব্যক্তির কথোপকথনে কুফরকে সংশয়ের আকারে উপস্থাপন করছে, যেন এটা পড়ে তরুণ প্রজন্ম সন্দেহে নিপতিত হয়।
'বানাতুর রিয়াজ' বা রিয়াদকন্যা উপন্যাসে বলা হয়েছে, 'লামিস নিশ্চিত, তার কোনো বান্ধবীই এ ব্যাপারে কোনো গুরুত্বারোপ করে না যে, ফাতিমা সুন্নি, সুফি, খ্রিষ্টান নাকি ইহুদি হবে; যে পরিমাণ গুরুত্বারোপ করে তাদের মধ্যে থেকে ভিন্ন ও আলাদা কিছু হওয়ার ব্যাপারে।'
ধর্মের বিভিন্নতার কারণে এবং দায়িত্ববোধ ও পাপমুক্ত না থাকার কারণে তাদের মাঝে এই অবজ্ঞাভাব সৃষ্টি হয়েছে।
আরেক ধর্মদ্রোহী মন্তব্য করেছে, 'গোটা মুসলিম সমাজ কপটতায় আক্রান্ত এবং দ্বীনদারির কলঙ্ক।' নাউজবিল্লাহ।
এই উপন্যাসগুলোর মাঝে এমন অবাককরা নানা বিষয় রয়েছে! নিজেরা মুনাফিক হয়ে গোটা মুসলিম সমাজের ওপর সেই অপবাদ চাপিয়ে নিজেদের দোষগুলো আড়াল করার চেষ্টা করছে। যাকে বলে চোরের মায়ের বড় গলা।
কেউ তো দ্বীনের ইলম নিয়েও বিষোদগার করেছে। হিশাম ও তার বন্ধু আদনানের পারে সে বলেছে, 'তারা দুজন ছিল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। আর কুরআনে কারিম ও জবিদের পাঠ ছাত্রদের কাছে সবচেয়ে দুর্বোধ্য ও অপছন্দনীয়।'
কুরআন নিয়ে এই জ্ঞানপাপী মিথ্যুকের মিথ্যাচারের প্রতি লক্ষ করুন। সে দাবি করেছে যে, মৌলিকভাবে কুরআন কারিম খুব কঠিন। অথচ আল্লাহ তাআলা পরিষ্কার ইরশাদ করেছেন-
وَ لَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ.
আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি বোঝার জন্যে। অতএব, আছে কি কোনো চিন্তাশীল? [সুরা আল-কামার: ১৭]
আল্লাহর বান্দার কাছে কুরআন কারিম মৌলিকভাবে প্রাণের চেয়েও প্রিয়গ্রন্থ। এই ধর্মদ্রোহী নাস্তিকরা কীভাবে আল্লাহর কিতাবকে ভালোবাসবে? আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةً لِّلْمُؤْمِنِينَ * وَلَا يَزِيدُ الظَّلِمِينَ إِلَّا خَسَارًا .
আমি কুরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনদের জন্য রহমত। গুনাহগারের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।' [সুরা বনি ইসরাইল: ৮২]
অতএব, কুরআন কারিম দ্বারা এই জালিম পাপীদের কেবল ক্ষতিই বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তাআলার তাদের কথা ও কাজ থেকে আমাদেরকে হিফাজত করুন। আমিন।
জনৈকা আঞ্চলিক লেখিকা লিখেছে, 'দ্বীনের বিধানগুলো মানবজীবনের চারণভূমিতে দাবার গুটি চালা বৈ কিছু নয়।' নাউজুবিল্লাহ।
এটাকে ধর্মদ্রোহিতা, নাস্তিকতা ও কুফরি ছাড়া আর কীইবা বলা যেতে পারে?
আল্লাহ তাআলা এমন কথার নিন্দা করে ইরশাদ করেছেন-
كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ إِنْ يَقُوْلُوْنَ إِلَّا كَذِبًا
কত কঠিন তাদের মুখের কথা! তারা যা বলে তা তো সবই মিথ্যা। [সুরা আল-কাহফ : ৫]
অন্যত্র তাদের এমন অপরাধের পরও আল্লাহ ধৈর্যধারণ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন-
وَأُمْلِي لَهُمْ إِنَّ كَيْدِي مَتِينُ
আর আমি তাদের সময় দিই। নিশ্চয় আমার কৌশল মজবুত। [সুরা আল-কলাম : ৪৫]
তারা কি আল্লাহর এই কথাগুলো পড়ে না ও বোঝার চেষ্টা করে না? ইরশাদ হয়েছে—
إِنَّ بَطْشَ رَبَّكَ لَشَدِيدُ .
'নিশ্চয় তোমার পালনকর্তার পাকড়াও অত্যন্ত কঠিন। [সুরা আল-বুরুজ : ১২]
আরও ইরশাদ হয়েছে-
وَهُوَ شَدِيدُ الْمِحَالِ .
আর তিনি প্রচণ্ড প্রতাপশালী।' [সুরা আর-রাদ : ১৩]
আল্লাহকে নিয়ে তারা এমন দুঃসাহসে কেন দেখাচ্ছে? আল্লাহর ফেরেশতাদের নিয়ে তারা এমন দুঃসাহস কেন দেখাচ্ছে? কেন এই দুঃসাহস দেখাচ্ছে আল্লাহর নাইনে নিয়ে? কেন তারা আল্লাহর আজাবকে তুচ্ছ ভাবছে? আল্লাহর তুলনায় সৃষ্টির কী এমন ক্ষমতা আছে?
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
وَ لَا تَحْسَبَنَّ اللهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّلِمُوْنَ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيْهِ الْأَبْصَارُ .
জালিমরা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনও বেখবর মনে করো না। তাদের তিনি ওই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ বিস্ফোরিত হবে। [সুরা ইবরাহিম : ৪২]
আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
إِنَّ اللَّهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ حَتَّى إِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ قَالَ ثُمَّ قَرَأَ { وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبَّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ }.
আল্লাহ তাআলা জালিমকে অবকাশ দেন। অতঃপর যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন তাকে আর সুযোগ দেন না। তারপর এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন-
আর তোমার রব যখন কোনো পাপপূর্ণ জনপদকে ধরেন, তখন এমনিভাবেই ধরে থাকেন। নিশ্চয় তার পাকড়াও খুবই যন্ত্রণাদায়ক, বড়ই কঠোর।[৭২]
অন্যত্র ইরশাদ করেছেন, যদি তারা তাওবা না করে, তাহলে কাফিরদের বিধানভুক্ত হবে। ইরশাদ হয়েছে-
قُلْ أَبِاللهِ وَ أَيْتِهِ وَ رَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِءُوْنَ، لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيْمَانِكُمْ إِنْ نَّعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِّنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةٌ بِأَنَّهُمْ كَانُوْا مُجْرِمِينَ
আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তার হুকুম-আহকামের সাথে এবং তার রাসুলের সাথে ঠাট্টা-কৌতুক করছিলে? ছলনা করো। তোমরা যে কাফির হয়ে গেছ ইমান প্রকাশ করার পর! তোমাদের মধ্যে কোনো কোনো লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দিইও, তবুও অবশ্যই কিছু লোককে আজাবও দেবো। কারণ, তারা ছিল গুনাহগার। [সুরা আত-তাওবা: ৬৫-৬৬]
টিকাঃ
[৬৮] সহিহুল বুখারি: ১০/৪৬৫, হাদিস: ২৯৫৪
[৬৯] সহিহুল বুখারি: ২৩/১০, হাদিস: ৬৯৩৭, সহিহ মুসলিম: ১১/৩১০, হাদিস: ৪১৬৬
[৭০] নাসায়ি শরিফ: ১২/২৮৮, হাদিস: ৩৮৭৮-হাদিসটিকে শাইখ আলবানি রহ, সহিহ বলেছেন।
[৭১] সহিহুল বুখারি : ৬০৬৬, সহিহ মুসলিম: ৫০৮৯
[৭২] সহিহুল বুখারি: ৪৩১৮
📄 উত্তম চরিত্রে কালিমা লেপন ও নোংরা চরিত্রের আলোকায়ন
এই উপন্যাসগুলোর মাধ্যমে মুসলিম সমাজে তারা বিভিন্নভাবে নোংরামি ছড়ানোর কাজ করে এবং বিষাক্ত বিষবাষ্প ছড়ায়, যা থেকে বিরত থাকা মুসলিম সমাজের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কেউ কেউ কেবল এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হচ্ছে যে, 'এগুলো পাপাচারপূর্ণ উপন্যাস'। কেউ তো এই বলেই নিজেকে দায়মুক্ত ভাবছেন যে, এগুলো 'হারাম উপার্জন।' এগুলো কি হারামের ডুব দেওয়ার জন্য এবং নোংরা চরিত্রে গা ভাসিয়ে দেওয়ার দিকে স্পষ্ট আহ্বান নয়?
মুসলিম সমাজে নোংরামি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যতগুলো পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে তার মধ্যে একটি হলো, মুসলিম সমাজের এমন চিত্রাঙ্কন-ছবি প্রচার করা হচ্ছে, যা গুনাহের নানা প্রকারের কৃষ্ণসাগরে নিমজ্জিত অবস্থায় ধারণ করা হয়েছে। পাপ-পঙ্কিল বিষয়গুলো সেখানে স্বাভাবিক বিষয়ের মতো করে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর প্রচারণা চালানোর বিপক্ষে কারও পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি। এমনকি নেককার নারী-পুরুষ সবাই এ ব্যাপারে এমন নীরব ভূমিকা পালন করেছে, যেন কোনো মানুষই সেখানে বিদ্যমান ছিল না। মনে হচ্ছে এখানে গুনাহের অভয়ারণ্য সৃষ্টি করা হয়েছে। যার কারণে তাদের উপন্যাসগুলোর পাঠকেরা ভাবছে যে, বিষয়টি সাধারণ অভ্যাসগত। অতএব, যখন তুমি নেশা করতে চাও, ব্যভিচার করতে চাও অথবা অন্য কোনো পাপ কাজ করতে চাও; করতে পারো। এগুলো তো অনুমোদিত বিষয়, নিষিদ্ধ কোনো বিষয় নয়।
এখানে এ কথা বলার কোনো অবকাশ নেই যে, এগুলো তো আমাদের জীবনের বাস্তব ঘটনারই চিত্রায়ণ। কেননা, আমাদের সমাজে অনিষ্টতা ছেয়ে গেছে। আমরা এই লেখাগুলোর মাধ্যমে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য ক্ষতস্থানে হাত বুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিমাত্র।
কিন্তু কয়েকটি কারণে এই বক্তব্য বিশুদ্ধ ও প্রত্যাশিত নয়। যথা-
প্রথম কারণ : এই উপন্যাসগুলো বিশেষ কোনো ঘটনার মূল্যায়ন করে না; বরং তারা সমষ্টিগত বিষয়ের মূল্যায়ন করে দোষগুণ আলোচনা করে। সুতরাং তারা নির্বিচারে বলে দেয়, অমুক নোংরা ও পাপাচারে লিপ্ত, বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য। অথচ বাস্তবতার সাথে তাদের এই কথার কোনো মিল নেই।
দ্বিতীয় কারণ: তারা জনসমাগমে নোংরামি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই কোনো বাজে সংবাদ পরিবেশন করে। তাহির বিন আশুর রহ. বলেন, 'সত্য-মিথ্যা নির্বিচারে সকল নোংরা সংবাদ মুমিনদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া মূলত চারিত্রিক অধঃপতন। কেননা, মানুষকে নোংরা কাজে জড়িয়ে পড়া থেকে যেই বিষয়গুলো বাধা দেয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো সেগুলোর সমালোচনা এবং শ্রুতিকটুতার প্রতিক্রিয়া। এভাবে এই সমালোচনার ভয় মানুষকে এই পাপাচারের আলোচনা এবং সেগুলোতে জড়িয়ে পড়া থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখে। একসময় মন থেকে পাপের চাহিদা ও আকৃতি-প্রকৃতি দূর হয়ে যায়।
কিন্তু যখন সমাজে পাপাচার ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্তরে সেগুলোর কল্পনা সৃষ্টি হয়, তখন এসব পাপাচার সংঘটিত হওয়ার সংবাদগুলো আর শ্রুতিকটু ও ভারী মনে হয় না। যার কারণে অন্তরে সেই পাপে লিপ্ত হওয়ার কামনা সৃষ্টি হয়, কানে তার শ্রুতি আর খারাপ লাগে না। ফলে কুপ্রবৃত্তি নফসকে সেদিকে অগ্রসর হতে উদগ্রীব বানিয়ে ফেলে; বরং পাপের সংবাদ যত শোনে, যত বেশি আলোচনা হয়, তার মাঝে পাপে জড়িয়ে পড়ার উদ্দীপনা ততই বৃদ্ধি পায়।[৭৩]
তাহলে উপন্যাসগুলোতে এসব অবৈধ সম্পর্কের বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনা বলার উদ্দেশ্য কী?
প্রথম কারণ : হারামকে মানুষের স্বভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া। ইতিমধ্যেই অনেক হারাম বিষয় মানুষের স্বভাবে পরিণত হয়েছে, যার কারণে তারা সেগুলোকে অপছন্দ করে না, সেগুলো দেখে অবাক হয় না, মানুষের মাঝে এগুলোর অবৈধতা ও হারাম হওয়া সম্পর্কে খুতবা দিতে, আলোচনা করতে এবং তর্কে যোগ দিতে অস্থিরতা দেখা যায় না।
দ্বিতীয় কারণ : আমাদের সমাজে নোংরামি ছড়িয়ে দেওয়া। 'বানাতুর রিয়াজ' বা রিয়াদকন্যা উপন্যাসের লেখিকা বলেছে, 'অন্যান্য শহরের চেয়ে এখানে টেলিফোনসংস্থার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। যেন তারা প্রেমিকযুগলের প্রেমালাপ, তাদের অস্থিরতা, কান্নাকাটি ও চুম্বনসহ বিভিন্ন বিষয় পুরোপুরি সাপ্লাই দিতে পারে।'
এভাবেই অবৈধ সম্পর্কগুলো সমাজে বেগমান করা হচ্ছে এবং তা স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অতঃপর আনন্দচিত্তে প্রতিবেদনাকারে তা উল্লেখও করা হচ্ছে।
লেখিকা তার পুস্তকের প্রারম্ভে লিখেছে, নারীসমাজ মহোদয়া! আপনারা এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে আছেন, যখন একদিকে রয়েছে আভ্যন্তরীণ বিশাল লজ্জা বা কেলেঙ্কারির আশঙ্কা, অন্যদিকে রয়েছে নৈশপার্টির তারুণ্যের হইচই। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আপনাদের এমন এক জগতের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা আপনাদের প্রত্যেকের কামনা ও চাহিদার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবে। এটা এমন এক বাস্তবতা, যা আমরা দেখি, কিন্তু ভোগ করি না। বস্তুত আমরা যতটুকুর অনুমোদন থাকা বিশ্বাস রাখি, ততটুকুতেই বিশ্বাস করি, আর বাকিগুলো অস্বীকার করে থাকি!
তৃতীয় কারণ: মুসলিম সমাজকে এমনভাবে উত্তেজিত করা, যেন সত্যিকারের দ্বীনদার, সচেতন ও নেককার মানুষগুলো অন্যদের উপহাস ও উদাসীনতার বস্তুতে পরিণত হয়।
এখন মুসলিম সমাজের কর্তব্য হলো, এগুলোর অনিষ্টতা প্রকাশ করে দেওয়া। কার উপকারার্থে উপন্যাসগুলো প্রকাশ করা হয়েছে সেগুলো কি ভাবতে হবে না?
এই উপন্যাসের মাধ্যমে আমাদের প্রকৃত সমাজকে ঘৃণিত সমাজ বলে উপস্থাপন করেছে। শহরের নারীদেরকে ওয়ানপিচ কাপড় পরিধান করাচ্ছে। ভাবখানা এমন, যেন তারা সতী নয় এবং তাদের মাঝে নেই সতীত্ব। এদিকে আমাদের শাসকসমাজ রোমান্সের পরিসংখ্যান ও অনৈসলামি কার্যক্রমের পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যস্ত যে, কোথায় কী পরিমাণ ক্ষতি হলো; কিন্তু প্রতিকারের কোনো চিন্তা তাদের মাথায় নেই!
একটি উপন্যাসে বলা হয়েছে, 'বর্তমান যুবসমাজ জীবনের শুরুতেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় না এবং এ বিষয়ে তারা চাপের সম্মুখীনও হয় না। তারা পৃথিবীর নানা রোমাঞ্চকর স্থানে ভ্রমণ করে এবং বিশ্বসুন্দরী তরুণীদের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়।'
ওহে পশ্চিমাদের পা'চাটা সাহিত্যিক নামের কলঙ্ক! তোমাদের প্রতি আল্লাহর দোহায় লাগে, সত্যি করে বলো তো, আমাদের সমস্ত যুবকদেরই কি এই অবস্থা? না, কখনও না! তারপরও তোমরা কীভাবে এমন লিখলে?
ভার্চুয়াল জগতে এমন নোংরা ও নিকৃষ্ট উপন্যাসের ছড়াছড়ি। যেখানে খুলে খুলে দেহাবয়বের বিবরণ দেওয়া হয়েছে, মানুষের গোপন বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে এবং মেয়েদের কেবল ভোগের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
কিছু লেখক নারীদের শরীরের গোপনাংশের বর্ণনা থেকে বিরত থেকেছে, কিন্তু তারা আবার কিশোর-কিশোরীদের প্রতি লিপ্সা সৃষ্টি করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সামাজিক রীতিনীতি ও চরিত্র ধ্বংস করতে তারা অন্যদের তুলনায় একধাপ এগিয়ে রয়েছে।
এমন গল্পও তারা লিখেছে, যেখানে ভিন্ন প্রজাতির দুই জাতির মাঝে মিলনের কথা বারবার বলা হয়েছে। ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীরা নারীদের সাথে সঙ্গম করে, তাদের শরীরে স্পর্শকাতর অংশগুলোতে মর্দন করে। নিজেদের লেখায় মহিলা সমকামীদের নোংরা বিষয়টিও তারা বাদ দেয়নি।
তাদের একজন ঔপন্যাসিক গল্পের একপর্যায়ের ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছে, সে বিভিন্ন প্রাণীর সাথে যৌন চাহিদা মেটাতে অভ্যস্ত। যেমন: মুরগি, ছাগল, কুকুর ইত্যাদি। সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণও সেখানে পেশ করেছে। এমনকি সে যে সমকামী তাও দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করেছে। এখানেই শেষ নয়, আলোচনার একপর্যায়ের সে নিজের এমন আত্মীয়ের সাথে ব্যভিচার করার কথাও স্বীকার করেছে, যার সাথে শরিয়ত বিবাহ হারাম করেছে। এমনকি সেখানে নিজের মেয়ে ও বোনের সাথে ব্যভিচারের বিষয়টিও বাদ যায়নি। নাউজুবিল্লাহ।
তারা কি এর মাধ্যমে হারামকে হালাল করার পাঁয়তারা করছে না? অথচ এটা এমন হারাম, যার কারণে শরিয়ত প্রস্তরাঘাতে হত্যার ফায়সালা দিয়েছে!
অসভ্য যৌনমিলনের বিষয়গুলো ফলাও করে প্রচার করে, এমন অশ্লীল একটি পত্রিকায় একজন ঔপন্যাসিক লিখেছে, 'এই আলোচনার মাঝে আমি বলব, মানুষ তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে যেকোনো সস্তা পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারবে। আমার বলার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সমকামিতায় লিপ্ত হতে পারবে।'
নাউজুবিল্লাহি মিন জালিক! লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সমকামিতায় লিপ্ত হওয়া!? এটাও কি কোনো লক্ষ্য হতে পারে??
এই ধরনের যৌন উত্তেজক উপন্যাস কেবল যৌন ক্ষুধাই বৃদ্ধি করবে। আর সেখান থেকে সৃষ্ট যৌন উত্তেজনা পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করবে হারামের নানামুখী পথ। এর ফলে যে ব্যক্তি তার জৈবিক চাহিদার নিয়ন্ত্রণ হারাবে, তাকে এমন মাশুল দিতে হবে, যার কোনো প্রতিকার নেই।
শাইখ আলি তানতাভি রহ. বলেন, 'যদি আপনাকে কারুনের মতো সম্পদ, হিরাক্লিয়াসের মতো শরীর, প্রত্যেক রঙের, প্রত্যেক ঢঙের ও প্রত্যেক শ্রেণির ১০ হাজার সুন্দরী রমণীও দেওয়া হয়; আপনি কি ভাববেন যে, আপনার চাহিদা পূর্ণ হয়েছে? না, এমনটি কখনও হবে না; বরং চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে। পক্ষান্তরে একটি মাত্র হালাল নারী আপনার চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে কত সুন্দরভাবে।
আমার কাছে প্রমাণ চাবেন না। একটু সচেতন হলেই আপনাদের চারপাশে আপনাদের সমাজে এবং আপনাদের বাস্তব জীবনে আমার এ কথার প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ পেয়ে যাবেন।
ব্যভিচার ও নোংরা প্রচারনার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর কী লাভ হবে? পর্নোগ্রাফি ও অশ্লীলতার গল্প দিয়ে কী উপকার হবে? পাপাচারে ভরা আগ্রাসনের গল্প শুনিয়েই বা কী ফায়দা হবে? মুসলিম যুবকেরা যদি যৌন চাহিদার অভিশপ্ত আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তাহলে তাদের দ্বারা জাতির কী আশা করা যেতে পারে?
জনৈক কবি বলেছেন—
ফিতনা ও বিপদের স্রোতে, শিশুরা বেড়ে ওঠে নোংরামির মাঝে। বিক্রিত কলম হয় দিগভ্রান্ত, সর্বনাশা বিষ ঢুকে নির্বোধের শরীরে। তারা সীমালঙ্ঘনকারী ধর্মদ্রোহী, শত্রুর সাথে আবদ্ধ হয়েছে ঘৃণ্য চুক্তিতে। শত্রুরা লজ্জায় পড়ে বলেনি, বলেছে বরং খুশিতে বুক চেতিয়ে প্রকাশ্যে; শেষ ইচ্ছা মুসলিম উম্মাহকে রিক্ত করা তার দ্বীন, কল্যাণ ও মহান আদর্শ থেকে।
ইবনুল মুকাফফা রহ. বলেছেন, 'যে ব্যক্তি দ্বীনের মাঝে ঢুকিয়েছে নিজের স্বার্থ, শেষ করেছে তাকে শরীরের জন্য, বিক্রি করেছে তাকে সম্পদের লোভে, লজ্জায় কাপুরুষচিতভাবে তাকে করেছে উপেক্ষা, কখনও তা পালন করেছে জশ-খ্যাতির তরে; মনে রাখতে হবে খুব দ্রুতই তার মান-সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তি শেষ হয়ে যাবে! এগুলোর মাঝে সবচেয়ে মারাত্মক হলো নারীর শারীরিক উষ্ণতা প্রাপ্তির ঘৃণ্য প্রত্যাশা।
টিকাঃ
[৭৩] আত-তাহরির ওয়াত-তানবির: ১৮/১৪৮
📄 বড় বিষয়কর কথা!
কোনো মানুষ একজন নারীকে পর্দাবৃত অবস্থায় পোশাকের ওপর দিয়ে দেখবে, তার প্রকৃত সৌন্দর্য অবলোকন করা ছাড়াই অন্তরে তার সৌন্দর্য ও লাবণ্যতার কল্পনা করবে, তাকে না দেখেই নিজের মন-প্রাণ তার জন্য উৎসর্গ করবে, যা পৃথিবীর কেউ জানবে না; এতে কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু সমস্যা পরবর্তী অবস্থা নিয়ে। এরপর অন্তরে নিকৃষ্টতর অনুভূতি লালন করতে শুরু করে, তাকে হৃদয়ের কল্পনায় স্থায়ী করে ফেলে। এ বিষয়ে কোনো ওয়াজ তার মাঝে প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না, কোনো উপমা এর সর্বনাশা ফল থেকে তাকে মুক্ত করতে পারে না। সে কেবল একই চিন্তায় মশগুল থাকে। এমনকি সে ভাবতে থাকে যে, পৃথিবীতে এই একটি নারীই তার প্রয়োজন। ওই নারী ছাড়া তার জীবনের সবকিছু অর্থহীন। এটা একান্তই নির্বুদ্ধিতা, হতভাগ্য ও অসভ্যতার চিহ্ন।
যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির দাসত্ব করে, সে দুনিয়ার মানুষের দাসে পরিণত হয়। যে ব্যক্তি প্রবৃত্তি ও রিপুর কাছে পরাজিত হলো, সে সকল কল্যাণকর বিষয়ের তাওফিক হতে বঞ্চিত হলো।