📄 বহিরাগত অনূদিত উপন্যাসের ব্যাপারে সতর্কবাণী
অনেক পাশ্চাত্য সাহিত্যিক তাদের সমাজ সংস্কারের জন্য এবং তাদের নিজস্ব আবহকে জুলুম ও শত্রুতার নানাপ্রকার জীবাণু থেকে মুক্ত করার জন্য কিছু উপন্যাস রচনা করেছেন। তারা তাদের রচনাবলিতে অসচ্চরিত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধসংক্রান্ত, রাজা কর্তৃক গরিবদের ওপর অত্যাচার প্রতিরোধ বিষয়ক, যথার্থ কোনো কারণ ছাড়া গির্জা কর্তৃক জনগণের কাঁধে বোঝা চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় প্রসঙ্গ ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথা উল্লেখ করেছেন। এমনিভাবে তারা ভুলবশত আভিজাত্য, মর্যাদা, চারিত্রিক ও বাহ্যিক পবিত্রতা বিষয়ে বিশুদ্ধ অনুশাসন মেনে চলার দাবি করে থাকেন। ভুলবশত বললাম এ জন্য যে, তারা এই নীতিকথাগুলোর শূন্যভাগও আমল করে না।
পাশ্চাত্যের যে সকল সাহিত্যিকের উপন্যাসগুলো তাদের সমাজে অনেক বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে; এমনকি পাশ্চাত্যবাদীদের কাছে এগুলো স্বাধীনতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও উন্নয়নের প্রতীকে রূপ নিয়েছে, তাদের মধ্যে শেক্সপিয়র, ফন গ্যোটে, ভলতেয়ার, মুলার, জঁ-জাক রুশো, ভিক্টোর হিগো ও তলস্তয় অন্যতম।
তাদের নিজস্ব সমাজ ও পরিমণ্ডলে তাদের উচ্চাবস্থান এবং সম্মান-মর্যাদা বিস্ময়কর কোনো বিষয় নয়; কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাদের সমাজ থেকে পরিবর্তিত হয়ে আমাদের সমাজ ও শহরে তাদের আকাশছোঁয়া মর্যাদা এবং কোনো চিন্তাভাবনা ও গবেষণা ছাড়াই তাদের উপন্যাসগুলো আমাদের ভাষায় রূপান্তর করা!
এটি কখনো কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ও শরিয়তসম্মত নয়। কারণ, তারা অমুসলিম এবং আল্লাহর একত্ববাদী দ্বীন তারা বিশ্বাস করে না। অতএব, তাদের উপন্যাসগুলোতে অধিকহারে শরিয়ত গর্হিত কথা থাকবে, সেগুলো আমাদের আকিদা-বিশ্বাস বিরোধী হবে, আমাদের অস্তিত্ব ও চরিত্র বিরোধী হবে—এটাই স্বাভাবিক। তারা তাদের লেখনীর মাধ্যমে মহান আল্লাহর কুফরির দিকে, পাপাচারিতা ও অন্যায়ের দিকে আহ্বান করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তো এমন গর্হিত বিষয়গুলো মুসলিমসমাজে প্রচার করা কি কোনোভাবে মেনে নেওয়ার মতো?
যেমন : মানফালুতি পাশ্চাত্যবাদী সাহিত্যিকদের যে উপন্যাসগুলোর আরবি অনুবাদ করেছেন, সেগুলোর কোনো গল্পের কাঠামোতে পরিবর্তন আনেননি, কোনো প্রেক্ষাপটেরও রদবদল করেননি; বরং তারা যে কথা যেভাবে লিখেছেন, মানফালুতি তাদের কথাগুলো ঠিক সেভাবেই কেবল আরবিতে রূপান্তর করে দিয়েছেন। অথচ গল্পের বিষয়বস্তু ছিল খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মাঝে যুদ্ধসংক্রান্ত। ওদিকে গল্পের লেখক একজন খ্রিষ্টান। সে তো তার গল্পের মাঝে খ্রিষ্টবাদ ও খ্রিষ্টানদের পক্ষেই মায়াকান্না জড়িয়ে লেখবে—এটাই স্বাভাবিক। তারা তো চাইবেই যে, খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতির কাছে ইসলামি সংস্কৃতির পরাজিত হোক।
বিষয়টি স্বতন্ত্র ও পরিপূর্ণ মাপের অনেক বড় একটি ফিতনা। আপনি একজন মুসলিম হয়ে কীভাবে এমন কল্পনা করেন যে, আপনার স্বধর্মীয় একজন মুসলিম ক্রুসেডারদের সামনে পরাজিত হবে? এমন উপন্যাসগুলো নিজের মাতৃভাষায় অনুবাদ করা ঠিক নয়, সেগুলোর প্রকাশনা ও প্রচারণা অন্যায় এবং সেগুলো পাঠ করা আমাদের অস্তিত্বের অবক্ষয়।
মানফালুতির পক্ষে দাঁড়িয়ে দুর্বল মেধার কোনো ছাত্র ও অজ্ঞ মানুষদের জন্য এ কথা বলার কোনো অধিকার নেই যে, আমরা এগুলো অধ্যয়ন করে তার প্রতিবাদ করব! কেননা, মানফালুতির অনুবাদের মাঝে একধরনের জাদু আছে, যা হয়তো আপনার পড়াকে নষ্ট করবে, না হয় আপনার দ্বীনকে নষ্ট করবে। যদিও এগুলোর মাঝে সময় কাটানো ও বিনোদনের অনেক রস আছে।
📄 গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে নাস্তিকতার সূচনা
ইসলাম ও মুসলিমদের মাঝে পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, আঞ্চলিকভাবে, জাতীয় পর্যায়ে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রাচীন ও সাম্প্রতিক বিরোধ, দ্বন্দ্ব, কলহ ও দলাদলির সাথে সাথে কিছু মানুষ পাশ্চাত্যবাদীদের বর্বরতা ইসলামবিদ্বেষীয় ধ্যান-ধারণায় প্রভাবিত হয়েছে। এমনকি তাদের বড় একটি সংখ্যা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য তাদের কলেজ ভার্সিটিতে এ্যাডমিশন নিয়েছে ও নিচ্ছে। পাশ্চাত্য সভ্যতায় প্রভাবিত এই লোকগুলো এমন কিছু গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, যেগুলোতে পাশ্চাত্যবাদীয় কর্ণধারদের কথা লেখা হয়েছে। বিজাতীয়দের ভাষায় লিখিত ইমান বিধ্বংসী বিষাক্ত লেখাগুলো তারা আরবি ভাষায় রূপান্তর করে আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ওই উপন্যাসগুলো আমাদের জন্য ভারী বোঝা ও ইসলামি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে বিষফোঁড়ার মতো কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোথাও তো সরাসরি মৌলিক ও শাখাগত উভয় দিক থেকেই ইসলামের ওপর আঘাত করা হয়েছে। এদের অর্বাচিনতা বা স্বার্থপরতার কারণে আমাদের সমাজ পাশ্চাত্য সাহিত্যের ফিতনায় জড়িয়ে পড়ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় মুহাম্মদ হুসাইন হাইকাল 'জয়নাব' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছে। তিনি ফ্রান্সে পড়ালেখা করেছেন। নাজিব কিছু গল্প লিখেছে, যেগুলোর পুরোটাই নষ্টপচা ও নিকৃষ্টতর অনিষ্টতার ভান্ডার।
তাদের ভাষা ও কলম পাশ্চাত্যবাদী লেখকদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাদের গ্রন্থের ব্যাপারে লিখেছে, 'এটা এক মহান কিতাব।' লেখকদের ব্যাপারে লিখেছে, 'বড় কবি, প্রতিভাবান সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক শিল্পী' ইত্যাদি। এমন আকর্ষণীয় ও মোহনীয় ভাষায় এরা পাশ্চাত্যবাদী লেখকদের প্রশংসা করে পরিকল্পিতভাবে মুসলিম সমাজে তাদেরকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা করছে।
📄 উপন্যাসের মাঝে নতুন সমীকরণ
এরপর ধীরে ধীরে আমাদের যুগে এসে মুসলিম উম্মাহকে তাদের দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তাদের লেখনীর মাঝে জোরেসোরে এজেন্ডা বানিয়ে নতুন সমীকরণ আরম্ভ হয়েছে। এই সমীকরণের মাঝে তারা সূক্ষ্ম উপস্থাপনা, তত্ত্ব-উপাত্তের মারপ্যাঁচ, গোপনীয়তা ও ধোঁকাবাজির আশ্রয় গ্রহণ করছে।
এই সমীকরণ বাস্তবায়ন করার জন্য কিছু নতুন লেখক আত্মপ্রকাশ করেছে, যাদের লেখনীর মাঝে অনেক গল্প ও কাহিনি সংযোজন করা হয়েছে। মুসলিমদের প্রকাশনাগুলোতে তাদের জন্য পৃথক অবস্থানও তৈরি করা হয়েছে। এমনকি তাদের নামে ওয়েবসাইটও খোলা হয়েছে।
তাদের এই নতুন সমীকরণের যাবতীয় কার্যক্রম কুফরি ও ধর্মদ্রোহিতায় তো ভরপুর আছেই, উপরন্তু লেখকদের মাঝে না আছে ভাষাগত দক্ষতা, আর না আছে চিন্তার গভীরতা ও পোক্ততা। সমীকরণে অংশগ্রহণকারী লেখকদের মাঝে প্রশংসা পাওয়ার মতো কোনো প্রতিভা বা যোগ্যতার লেশমাত্র নেই। এত কিছুর পরও আমাদের স্বজাতীয় সাহিত্যিকরা তাদের ব্যাপারে বলছে, 'বিদগ্ধ ও প্রতিভাবান সাহিত্যিক'। আমরা অতিসত্বর এই নতুন সমীকরণের অসারতা ও তুচ্ছতার ব্যাপারে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
📄 পাশ্চাত্য দর্শনে আধুনিক গল্পকার হওয়ার উপায়
প্রথম পদক্ষেপ: আপনি এমন চিন্তা করুন, যা কোনো ব্যক্তিকে চিন্তিত করতে পারে না। যেন আপনার সেই চিন্তার জগৎ মানবজগৎ ছাড়া অন্যকিছু নিয়ে হয়। যেমন : দুই চড়ুই পাখির মাঝে গান, মিষ্টির টুকরো বহন করতে গিয়ে পিঁপড়ার মৃত্যু, পতনোন্মুখ গাছের পাতা ইত্যাদি।
দ্বিতীয় পদক্ষেপ : আপনার সামনে ঘটে যাওয়া কোনো দৃশ্য সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলুন। যেমন : আমার সম্মুখ দিয়ে সুন্দর একটি লাল পিঁপড়া চলছিল। তখন তার পিঠে সুস্বাদু মিষ্টির একটি টুকরো ছিল। হঠাৎই সেখানে কুৎসিত কালো কুশ্রী একটি পিঁপড়া এসে লাল পিঁপড়াকে হত্যা করে মিষ্টির টুকরো ছিনতাই করে নিয়ে গেল। এ ঘটনায় আমার খুবই কষ্ট হয়েছে।
তৃতীয় পদক্ষেপ : কোনো কিছুকে নির্দিষ্ট করতে পারে এমন নামগুলো এড়িয়ে চলুন। যেমন : আমার সম্মুখ দিয়ে সুন্দর একটি লাল প্রাণী চলছিল। তখন তার পিঠে সুস্বাদু মিষ্টির একটি টুকরো ছিল। হঠাৎই সেখানে কুৎসিত কালো কুশ্রী একটি প্রাণী এসে লাল প্রাণীকে হত্যা করে মিষ্টির টুকরো ছিনতাই করে নিয়ে গেল। এ ঘটনায় আমার খুবই কষ্ট হয়েছে।
দেখুন, এখানে কিন্তু পিঁপড়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
চতুর্থ পদক্ষেপ: এমন প্রতিটি বিষয় এড়িয়ে চলুন, যার দ্বারা পাঠক মূল ঘটনা বুঝতে পারে। যেমন : আমার সামনে চলছিল। কুশ্রীটি তাকে আক্রমণ করে তার প্রাণবধ করল। এ নিয়ে আমার খুব কষ্ট হয়েছে।
লক্ষ করুন, শুধু এই আলোচনাটুকুর মাধ্যমে মূল ঘটনার কিছুই বোঝা যায় না।
পঞ্চম পদক্ষেপ : ক্রিয়ার কর্তাকে অজ্ঞাত রেখে ঘটনা তুলে ধরুন। এটি একটি মৌলিক বিষয়। যেমন: তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। তার সাথে প্রতারণা করা হলো। তার জীবননাশ করা হলো। এ চিন্তা আমাকে নিস্তব্ধ করে দিয়েছে।
বুঝতে চেষ্টা করুন, এখানে বস্তুকে নির্ধারণ করে কথা বলা হয়নি।
ষষ্ঠ পদক্ষেপ : জাতিগত বৈশিষ্ট্য যুক্ত করুন। যেমন : সে উন্মুক্ত হয়ে মৃত্যুর দিকে ছুটল। মৃত্যু তার বক্ষে আঘাত করল, তার সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ার পূর্বেই। এ চিন্তা আমাকে আঘাতে জর্জরিত করেছে।
সপ্তম পদক্ষেপ : যা লিখেছেন তা পড়ুন। যদি নিজের লেখা নিজে বুঝতে পারেন, তাহলে আবার লেখার চেষ্টা করুন। কারণ, লেখাটি প্রকাশের উপযোগী হয়নি। আর যদি বুঝতে না পারেন, তাহলে চিন্তিত হবেন না। কেননা, লেখাটি প্রকাশের উপযোগী হয়েছে।
অর্থাৎ আপনার কথা যদি বোধগম্য হয়, তাহলে তা প্রকাশের উপযোগী হয়নি। আর যদি বোধগম্য না হয়, তাহলে এই উদ্ভূত বিষয় প্রকাশের উপযোগী হয়েছে।
তারা সাতটি ধারার কথা উল্লেখ করেছে, তাতে এ কথা দিবালোকের ন্যায় পরিষ্কার হয়েছে যে, তাদের প্রথম উদ্দেশ্য হলো সত্যকে গোপন করা। আর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো, মর্ম, মাকসাদ ও অর্থহীন এমন কথা বলা ও প্রচার করা, যেগুলোর মর্ম, মাকসাদ ও অর্থ উদ্ধারের পেছনেই পাঠকের অনেক সময় নষ্ট হয়ে যাবে। অর্থোদ্ধারে সৃষ্টি হবে মতবিরোধ, যাতে কেটে যাবে সময়ের আরও বড় একটি অংশ। তাদের এই প্রবঞ্চনাপূর্ণ কাজগুলো সাহিত্য, ভাষা ও শরিয়ত—সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেই গর্হিত ও পরিত্যাজ্য।