📄 শরিয়তের দৃষ্টিকোণে গল্প শুধু গল্পই নয়
আল্লাহ তাআলা তাঁর নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন জাতির কাছে প্রেরণ করেছেন, যাদের বিশেষ কোনো ব্যবসা, কারিগরি, রাজনীতি কিংবা কৃষির মাধ্যমে বিশেষত্ব প্রদান করেননি; বরং তাদের বিশেষত্ব দান করেছেন সাহিত্যনির্ভর অলংকারপূর্ণ ভাষায়।
যেহেতু আল্লাহ তাআলার নীতি হলো, নবিদের তিনি এমন মুজিজা দিয়ে তার জাতির নিকট প্রেরণ করেন, যে বিষয়ে তাদের জাতি শীর্ষস্থান দখল করে থাকে; ঠিক সেই নীতি অনুসারেই নবিজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মুজিজা হিসেবে এমন একটি গ্রন্থ দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যা তার সাহিত্যের মাধ্যমে আরবের সাহিত্যিকদের হতভম্ব করে দিয়েছে এবং ভাষা অলংকারের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করে তাদের অলংকার শাস্ত্রবিদদের করে দিয়েছে লা-জবাব।
গ্রন্থটি অলংকারশাস্ত্রের প্রতিটি প্রকার ও অভিধানশাস্ত্রের প্রতিটি শাখায় শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত। ইশারা-ইঙ্গিত, মৌলিক-রূপক, সুদীর্ঘ-অদীর্ঘ, উপমাসমৃদ্ধ এবং উপমাহীন ইত্যাদি প্রতিটি বিষয় এতে শত ভাগ প্রাসঙ্গিকতাসহ উল্লিখিত হয়েছে।
এই গ্রন্থটি নিজের মাঝে যতগুলো বিষয় পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে 'কুরআনের কাহিনি' তন্মধ্যে অন্যতম। যেগুলো তার সাহিত্যমান, শব্দচয়ন, শব্দবিন্যাস, অর্থ সঞ্চালন ও লক্ষ্য নির্ধারণে আরবের সাহিত্যিকদের অক্ষম প্রমাণিত করেছে।
কুরআনি গল্পগুলো এমন অলীক কোনো কাহিনি নয় যে, তার দ্বারা কেবল বিনোদন ও সময় কাটানোই উদ্দেশ্য; বরং সেগুলো সত্যের পথে দাওয়াত এবং সত্য-দীক্ষার মাধ্যম হবে। অতএব, সেগুলো উপদেশসমৃদ্ধ ও শিক্ষণীয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেছেন—
لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ .
তাদের কাহিনিতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে শিক্ষণীয় বিষয়। [সুরা ইউসুফ : ১১১]
এই কাহিনিগুলো হয় দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার বলিষ্ঠ মাধ্যম; যেমন : কুরআনে কারিমের অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-
وَكُلًّا نَقُصُّ عَلَيْكَ مِنْ أَنْبَاءِ الرُّسُلِ مَا نُثَبِّتُ بِهِ فُؤَادَكَ .
আর আমি রাসুলগণের সব বৃত্তান্তই আপনাকে বলছি, যদ্বারা আপনার অন্তরকে মজবুত করছি। [সুরা হুদ : ১২০]
এগুলো এমন ঘটনা, যার মাঝে মিথ্যা ও বানোয়াটির কোনো লেশ নেই। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا .
আল্লাহর চেয়ে বেশি সত্যবাদী কে আছে? [সুরা আন-নিসা : ৮৭]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে—
مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَلَكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ .
এটা কোনো বানানো রচনা নয়; বরং এটা আগের গ্রন্থে যা আছে তার সত্যায়ন ও বিশদ বিবরণ, আর মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য নির্দেশনা ও অনুগ্রহ। [সুরা ইউসুফ: ১১১]
এখানেই শেষ নয়; বরং কুরআনে কারিমে বর্ণিত ঘটনাবলিই সবচেয়ে সুন্দর কাহিনি। ইরশাদ হয়েছে—
نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَذَا الْقُرْآنَ، وَإِنْ كُنْتَ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ
অহির মাধ্যমে এ কুরআন অবতীর্ণ করে আমি আপনার কাছে সেরা ঘটনা বর্ণনা করেছি। যদিও এর আগে আপনি অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। [সুরা ইউসুফ: ৩]
যেহেতু কুরআনে কারিমে বর্ণিত গল্পগুলোর মাঝে অনেক উপকার রয়েছে, তাই তিনি স্বীয় নবিকে এই ঘটনাগুলো মানুষের সামনে বর্ণনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে—
فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ .
অতএব, আপনি বর্ণনা করুন এসব কাহিনি, যাতে তারা চিন্তা করে। [সুরা আল-আরাফ : ১৭৬]
📄 মুসলিম জনপদে গল্প ও উপন্যাসের আবির্ভাব
ইসলামি শাসনের মধ্যযুগে এসে বিভিন্ন স্থানের কাহিনি নিয়ে আরবি সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। যেমন: মাকামাতে হামদানি, মাকামাতে হারিরি, রিসালাতুল গুফরান ইত্যাদি এই সময়েই রচিত হয়।
সাথে সাথে মানুষ আরবি সাহিত্য ছাড়াও কিছু গল্প-দাস্তানের সাথে পরিচিত হয়। যেমন : কালিলা ওয়া দিমনা, আলফু লাইলা, লাইলা ইত্যাদি। তবে এ ধরনের গল্পগুচ্ছকে আমি নিয়মতান্ত্রিক বিষয়ভিত্তিক গল্প বলতে পারব না। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আরববিশ্বে এমন কিছু সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটে, যারা গল্প ও উপন্যাসের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। সুতরাং তারা এ বিষয়ে বিশেষ প্রকৃতির গ্রন্থ রচনা করেন এবং অনারব সাহিত্যের কিছু উপন্যাস তারা আরবিতে অনুবাদ করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় মানফালুতি ফ্রান্স সাহিত্যের একটি উপন্যাসের আরবি অনুবাদ করেন, যার নামকরণ করেন 'আল-ফাজিলা'। এমন আরও কিছু উপন্যাস তিনি আরবিতে অনুবাদ করেন। হাফিজ ইবরাহিম হেক্টোর হিগো-রচিত 'আল-বুয়াসা' গ্রন্থের অনুবাদ করেন।
সে সময়ে কোনো কোনো সাহিত্যিক উপন্যাস ও গল্পগুচ্ছের মধ্য দিয়ে ইসলামের কিছু মৌলিক বিষয়ের প্রচারণা করতে সমর্থ হন। অর্থাৎ তারা ওই উপন্যাস ও গল্পগুচ্ছের মাধ্যমে ইসলামের কিছু মৌলিক বিষয় প্রমাণ করে সেগুলো প্রচার করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ কাজ করতে গিয়ে তারা নিজস্ব বা অনূদিত গল্পগুলোর মাধ্যমে কিছু ভালো কাজের সাথে অপ্রত্যাশিতভাবে শরিয়ত-গর্হিত কিছু ভয়ংকর কাজে জাড়িয়ে পড়েন।
মানফালুতি ও হাফিজ ইবরাহিমের সমসাময়িক আলি আহমাদ বাকসির রচিত ইসলামি কাহিনির গ্রন্থটি প্রথম স্তরের গ্রন্থ। তার গল্পসমগ্র ও উপন্যাসের মাঝে ইসলামি আকিদাকেও শক্তভাব ধারণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। যাতে করে সেগুলো পাঠকদের হৃদয়ে বদ্ধমূল হয়ে যায়। তার নিয়ন্ত্রিত ইসলামি থিয়েটারগুলোতেও এর বিশেষ প্রভাব রয়েছে।
এই শ্রেণিতে ইরাকের ইসলামি কলামিস্ট দাউদ বিন সুলাইমান আবিদিও রয়েছেন, যিনি খুব সুন্দর অনেক ঘটনা সংকলন করেছেন। যেমন, 'জাবালুত তাওবাহ' বা তাওবার পাহাড়। তিনি এই গ্রন্থে এমন একজন হত্যাকারীর ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যে নববি যুগেই ১০০টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। গ্রন্থটিতে জাজিরাতুল আরবের জনৈক যুবতীর ঘটনাও বর্ণিত হয়েছে। এটা হলো, নবিজির যুগে সংঘটিত জনৈক জাদুকর গোলামের ঘটনা। ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে চারটি অংশে। প্রতিটি অংশকেই পৃথক-পৃথকভাবে চমৎকার গল্প মনে করা হয়। 'আলকারার', 'শহরজাদ' ও 'হাদিসুশশাইখ' ইত্যাদি গ্রন্থগুলো তারই রচনা।
ইসলামি সাহিত্যিক ও লেখকদের মাঝে অন্যতম হলেন আবদুর রহমান রাফাত পাশা, যিনি 'সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ' ও 'সুয়ারুম মিন হায়াতিত তাবিইন' গ্রন্থ দুটির রচয়িতা। তাদের রচিত গ্রন্থগুলো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ও ইমান জাগানিয়া উপাখ্যানে সজ্জিত। এ জন্য আমি যুবক-যুবতীদের এ ধরনের গল্পগুলো পড়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি।
এ ছাড়া ইসলামি আলোচনা সংবলিত অনেক গ্রন্থ আছে। যেমন : আবদুল আজিজ জাবরিন রচিত 'কিসসাতুর রাজুলিল মাহজুম' বা পরাজিত লোকটির গল্প। এটা বনি ইসরাইলের এমন এক নারীর গল্প, যাকে তার ভাইয়েরা জনৈক পাদরির কাছে রেখে গিয়েছিল। শয়তান পাদরিকে প্ররোচিত করার কারণে ওই নারীর ওপর পৈশাচিক অত্যাচার চালায়।
আল-আরিনি বিরচিত 'দিফউল লায়ালিশ শাতিয়াতি' বা শীতল রাতের উষ্ণতা গ্রন্থটি সর্বোচ্চ প্রচারিত ছিল এবং বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের চাহিদাও ছিল তুঙ্গে। এ ছাড়া রয়েছে আবদুল মালিক আল-কাসিম রচিত 'মুহাওয়ালাতুন ফিজ জামানিল কাদিম বা ভবিষ্যৎ সময়ের সাধনা। [৬৭] এখানে কিছু ঘটনা এমনও রয়েছে, যেগুলো নির্ধারিত ব্যক্তির অভিপ্রায়ে লেখা হয়েছে তার ব্যক্তিগত জীবনচরিত থেকে। যেমন: মালিক আর-রাহবি তার 'রিহলাতুহু ইলানুর বা জ্যোতির পথে ভ্রমণ গ্রন্থে লিখেছেন।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, অনেক ইসলামি লেখক মূল ঘটনার ওপর কিছু অতিরঞ্জিত কথা ও ব্যাখ্যা লেখেন, যা মূল ঘটনার অংশ নয়। অতএব, পাঠকের দায়িত্ব হবে, সাহিত্যবোদ্ধার ন্যায় বিশুদ্ধ ও অশুদ্ধ বিষয়ের মাঝে ব্যবধান নিশ্চিত করার চেষ্টা করা।
অনেক ইসলামি উপন্যাস এমন পাওয়া যাবে, যেগুলোতে অনেক গর্হিত কাজের সমর্থন রয়েছে। যেমন : এমন ঘটনা পাওয়া যাবে, যেখানে নারী-পুরুষের মাঝে অবাধ মেলামেশা ছিল, আবার এমন ঘটনাও পাওয়া যাবে, যেখানে একজন মহিলা ইসলামের সেবা করার জন্য একাকী পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে ভ্রমণ করেছে ইত্যাদি। অথচ ইসলামি শরিয়তে এগুলোর অনুমোদন নেই; যদিও শুনতে বা পড়তে খুবই দারুণ মনে হয়।
টিকাঃ
[৬৭] এ বইটি 'স্বাগতম তোমায় আলোর ভুবনে' নামে বাংলায় অনূদিত হয়েছে।
📄 বহিরাগত অনূদিত উপন্যাসের ব্যাপারে সতর্কবাণী
অনেক পাশ্চাত্য সাহিত্যিক তাদের সমাজ সংস্কারের জন্য এবং তাদের নিজস্ব আবহকে জুলুম ও শত্রুতার নানাপ্রকার জীবাণু থেকে মুক্ত করার জন্য কিছু উপন্যাস রচনা করেছেন। তারা তাদের রচনাবলিতে অসচ্চরিত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধসংক্রান্ত, রাজা কর্তৃক গরিবদের ওপর অত্যাচার প্রতিরোধ বিষয়ক, যথার্থ কোনো কারণ ছাড়া গির্জা কর্তৃক জনগণের কাঁধে বোঝা চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় প্রসঙ্গ ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথা উল্লেখ করেছেন। এমনিভাবে তারা ভুলবশত আভিজাত্য, মর্যাদা, চারিত্রিক ও বাহ্যিক পবিত্রতা বিষয়ে বিশুদ্ধ অনুশাসন মেনে চলার দাবি করে থাকেন। ভুলবশত বললাম এ জন্য যে, তারা এই নীতিকথাগুলোর শূন্যভাগও আমল করে না।
পাশ্চাত্যের যে সকল সাহিত্যিকের উপন্যাসগুলো তাদের সমাজে অনেক বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে; এমনকি পাশ্চাত্যবাদীদের কাছে এগুলো স্বাধীনতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও উন্নয়নের প্রতীকে রূপ নিয়েছে, তাদের মধ্যে শেক্সপিয়র, ফন গ্যোটে, ভলতেয়ার, মুলার, জঁ-জাক রুশো, ভিক্টোর হিগো ও তলস্তয় অন্যতম।
তাদের নিজস্ব সমাজ ও পরিমণ্ডলে তাদের উচ্চাবস্থান এবং সম্মান-মর্যাদা বিস্ময়কর কোনো বিষয় নয়; কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাদের সমাজ থেকে পরিবর্তিত হয়ে আমাদের সমাজ ও শহরে তাদের আকাশছোঁয়া মর্যাদা এবং কোনো চিন্তাভাবনা ও গবেষণা ছাড়াই তাদের উপন্যাসগুলো আমাদের ভাষায় রূপান্তর করা!
এটি কখনো কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ও শরিয়তসম্মত নয়। কারণ, তারা অমুসলিম এবং আল্লাহর একত্ববাদী দ্বীন তারা বিশ্বাস করে না। অতএব, তাদের উপন্যাসগুলোতে অধিকহারে শরিয়ত গর্হিত কথা থাকবে, সেগুলো আমাদের আকিদা-বিশ্বাস বিরোধী হবে, আমাদের অস্তিত্ব ও চরিত্র বিরোধী হবে—এটাই স্বাভাবিক। তারা তাদের লেখনীর মাধ্যমে মহান আল্লাহর কুফরির দিকে, পাপাচারিতা ও অন্যায়ের দিকে আহ্বান করবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তো এমন গর্হিত বিষয়গুলো মুসলিমসমাজে প্রচার করা কি কোনোভাবে মেনে নেওয়ার মতো?
যেমন : মানফালুতি পাশ্চাত্যবাদী সাহিত্যিকদের যে উপন্যাসগুলোর আরবি অনুবাদ করেছেন, সেগুলোর কোনো গল্পের কাঠামোতে পরিবর্তন আনেননি, কোনো প্রেক্ষাপটেরও রদবদল করেননি; বরং তারা যে কথা যেভাবে লিখেছেন, মানফালুতি তাদের কথাগুলো ঠিক সেভাবেই কেবল আরবিতে রূপান্তর করে দিয়েছেন। অথচ গল্পের বিষয়বস্তু ছিল খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মাঝে যুদ্ধসংক্রান্ত। ওদিকে গল্পের লেখক একজন খ্রিষ্টান। সে তো তার গল্পের মাঝে খ্রিষ্টবাদ ও খ্রিষ্টানদের পক্ষেই মায়াকান্না জড়িয়ে লেখবে—এটাই স্বাভাবিক। তারা তো চাইবেই যে, খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতির কাছে ইসলামি সংস্কৃতির পরাজিত হোক।
বিষয়টি স্বতন্ত্র ও পরিপূর্ণ মাপের অনেক বড় একটি ফিতনা। আপনি একজন মুসলিম হয়ে কীভাবে এমন কল্পনা করেন যে, আপনার স্বধর্মীয় একজন মুসলিম ক্রুসেডারদের সামনে পরাজিত হবে? এমন উপন্যাসগুলো নিজের মাতৃভাষায় অনুবাদ করা ঠিক নয়, সেগুলোর প্রকাশনা ও প্রচারণা অন্যায় এবং সেগুলো পাঠ করা আমাদের অস্তিত্বের অবক্ষয়।
মানফালুতির পক্ষে দাঁড়িয়ে দুর্বল মেধার কোনো ছাত্র ও অজ্ঞ মানুষদের জন্য এ কথা বলার কোনো অধিকার নেই যে, আমরা এগুলো অধ্যয়ন করে তার প্রতিবাদ করব! কেননা, মানফালুতির অনুবাদের মাঝে একধরনের জাদু আছে, যা হয়তো আপনার পড়াকে নষ্ট করবে, না হয় আপনার দ্বীনকে নষ্ট করবে। যদিও এগুলোর মাঝে সময় কাটানো ও বিনোদনের অনেক রস আছে।
📄 গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে নাস্তিকতার সূচনা
ইসলাম ও মুসলিমদের মাঝে পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, আঞ্চলিকভাবে, জাতীয় পর্যায়ে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রাচীন ও সাম্প্রতিক বিরোধ, দ্বন্দ্ব, কলহ ও দলাদলির সাথে সাথে কিছু মানুষ পাশ্চাত্যবাদীদের বর্বরতা ইসলামবিদ্বেষীয় ধ্যান-ধারণায় প্রভাবিত হয়েছে। এমনকি তাদের বড় একটি সংখ্যা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য তাদের কলেজ ভার্সিটিতে এ্যাডমিশন নিয়েছে ও নিচ্ছে। পাশ্চাত্য সভ্যতায় প্রভাবিত এই লোকগুলো এমন কিছু গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, যেগুলোতে পাশ্চাত্যবাদীয় কর্ণধারদের কথা লেখা হয়েছে। বিজাতীয়দের ভাষায় লিখিত ইমান বিধ্বংসী বিষাক্ত লেখাগুলো তারা আরবি ভাষায় রূপান্তর করে আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ওই উপন্যাসগুলো আমাদের জন্য ভারী বোঝা ও ইসলামি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে বিষফোঁড়ার মতো কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও কোথাও তো সরাসরি মৌলিক ও শাখাগত উভয় দিক থেকেই ইসলামের ওপর আঘাত করা হয়েছে। এদের অর্বাচিনতা বা স্বার্থপরতার কারণে আমাদের সমাজ পাশ্চাত্য সাহিত্যের ফিতনায় জড়িয়ে পড়ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় মুহাম্মদ হুসাইন হাইকাল 'জয়নাব' নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছে। তিনি ফ্রান্সে পড়ালেখা করেছেন। নাজিব কিছু গল্প লিখেছে, যেগুলোর পুরোটাই নষ্টপচা ও নিকৃষ্টতর অনিষ্টতার ভান্ডার।
তাদের ভাষা ও কলম পাশ্চাত্যবাদী লেখকদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাদের গ্রন্থের ব্যাপারে লিখেছে, 'এটা এক মহান কিতাব।' লেখকদের ব্যাপারে লিখেছে, 'বড় কবি, প্রতিভাবান সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিক শিল্পী' ইত্যাদি। এমন আকর্ষণীয় ও মোহনীয় ভাষায় এরা পাশ্চাত্যবাদী লেখকদের প্রশংসা করে পরিকল্পিতভাবে মুসলিম সমাজে তাদেরকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা করছে।