📄 বাদ্যযন্ত্র আছে, এমন স্থানে খেলাধুলা ও ব্যায়াম করা
প্রশ্ন : যেখানে মিউজিক থাকে, সেখানে খেলাধুলা ও ব্যায়াম অনুশীলনের বিধান কী? যখন আমার নিশ্চিত জানা আছে যে, উপদেশ দিলেও কর্তৃপক্ষ তাতে কোনোরূপ কর্ণপাত করে না। এ জন্য আমি অনুশীলন চলাকালীন কানে ইয়ারফোন দিয়ে রাখি।
উত্তর : প্রথমত বুঝতে হবে যে, শরিয়তের বর্ণিত অগণিত দলিলের ভিত্তিতে এ কথা নিশ্চিত ও অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, মিউজিক শোনা জায়িজ নেই।
দ্বিতীয়ত কোনো সেন্টারে মিউজিক যন্ত্রের উপস্থিতি হারাম, যার প্রতিবাদ করা অপরিহার্য। তাই এ ক্ষেত্রে মিউজিকের আওয়াজ থেকে বাঁচতে কানে ইয়ারফোন রাখা বা কোনো বৈধ জিনিস শ্রবণ করাই যথেষ্ট হবে না; বরং মুখে প্রতিবাদ করতে না পারলে অন্তরের মাধ্যমে ঘৃণা করবে। আর এটা তখনই সম্ভব, যখন নিজে সেই হারাম কাজ থেকে দূরে থাকবে এবং সম্ভব হলে সেখান থেকে বের হয়ে যাবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيَّرُهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ .
তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো অন্যায় হতে দেখবে সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। যদি সম্ভব না হয়, তাহলে মুখ দ্বারা প্রতিবাদ করবে। যদি এটাও সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তরে তা প্রত্যাখ্যান করবে। আর এটাই হলো ইমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।[৪০]
হারام কাজের স্থান থেকে দূরে সরে যাওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَ قَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتٰبِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ أَيْتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَ يُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ، إِنَّكُمْ إِذًا مَّثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنْفِقِينَ وَالْكَفِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا .
আর কুরআনে তোমাদের প্রতি এ বিধান নাজিল করা হয়েছে যে, যখন তোমরা আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহের ওপর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন ও বিদ্রুপ হতে শুনবে, তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যতক্ষণ না তারা প্রসঙ্গান্তরে চলে যায়। তা না হলে তোমরাও তাদেরই মতো হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জাহান্নামের মাঝে মুনাফিক ও কাফিরদের একই জায়গায় সমবেত করবেন।[৪১]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'যতক্ষণ না কাফিররা কুফরি ছেড়ে অন্য কোনো বিষয়ে প্রবৃত্ত হয়, ততক্ষণ তাদের কাছে বোসো না। আয়াতটি প্রমাণ করে, পাপাচারীরা যখন কোনো অন্যায়ে লিপ্ত থাকবে, তখন তাদের কাছ থেকে দূরে সরে থাকা অপরিহার্য। কেননা, যারা সরে না গিয়ে সেখানেই অবস্থান করে, তারা পাপাচারীদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হয় এবং মূল অপরাধীদের সমান অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হয়। যখন তারা কোনো অন্যায় কথা বলবে, তাদের প্রতিবাদ করাও সমীচীন হবে। যদি প্রতিবাদ করতে না পারে, তাহলে সেখান থেকে দূরে সরে যাবে, যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যায়।
উমর বিন আবদুল আজিজ রহ.-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি মদ্যপ কিছু লোককে গ্রেফতার করলেন। তখন উপস্থিত একজনের পক্ষ থেকে তাকে বলা হলো, সে রোজাদার। তখন তাকে আলোচ্য আয়াতের এই অংশ পড়ে শোনানো হলো-
إِنَّكُمْ إِذًا مَّثْلُهُمْ .
তোমরাও তাদেরই মতো। [সুরা আন-নিসা: ১৪০]
ইমাম জাসসাস রহ. বলেছেন, 'এই আয়াত প্রমাণ করে, অন্যায়কারীর অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করা ওয়াজিব। বাধা প্রদানের একটি প্রকার হলো, মনে মনে ঘৃণা করা, যখন সে সরাসরি অন্যায় কাজকে প্রতিরোধ করতে না পারবে। অন্যায় কাজের বৈঠক পরিহার করা এবং সেখান থেকে উঠে অন্য কোনো দিকে চলে যাওয়াও প্রতিবাদ করার অন্তর্ভুক্ত।[৪২]
শাইখ বিন বাজ রহ. বলেছেন, 'অন্তর দ্বারা প্রতিবাদ করা সবার প্রতিই ফরজ। আর তা এভাবে যে, হারাম কাজের প্রতি ক্রোধান্বিত থাকবে এবং ঘৃণা করবে। হাত ও মুখ দ্বারা প্রতিবাদ করতে না পারলে অপরাধের স্থান থেকে দূরে চলে যেতে হবে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা নির্দেশ প্রদান করেছেন—
وَ إِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُوْنَ فِي آيَتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَ إِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَنُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّلِمِينَ .
যখন আপনি তাদের দেখেন, যারা আমার আয়াতসমূহে ছিদ্রান্বেষণ করে, তখন তাদের কাছ থেকে সরে যান, যে পর্যন্ত তারা অন্য কথায় প্রবৃত্ত না হয়। যদি শয়তান আপনাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণ হওয়ার পর জালিমদের সাথে উপবেশন করবেন না। [সুরা আল-আনআম : ৬৮]
মোটকথা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং এই পরিবেশে উপস্থিত লোকদের উপদেশ দেওয়া আপনার ওপর ওয়াজিব। যদি তারা আপনার আহ্বানে সাড়া দেয়, তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। আর যদি সাড়া না দেয়, তাহলে আপনি নিজে অন্য পরিবেশে চলে যান, কোনোক্রমেই তাদের সাথে থেকে গুনাহে শরিক হবেন না।
টিকাঃ
[৪০] সহিহু মুসলিম : ১/১৬৭, হাদিস : ৭০
[৪১] সুরা আন-নিসা: ১৪০
[৪২] আহকামুল কুরআন: ৩/২৭৮
📄 দাবা খেলার বিধান
জিজ্ঞাসা: বর্তমান যুগে দাবা খেলা কি জায়িজ?
জবাব : ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'দাবা যখন বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো ওয়াজিব কাজ থেকে উদাসীন করে ফেলবে, তখন সর্বসম্মতভাবে হারাম। যেমন, নামাজের প্রতি উদাসীন করে, নিজের বা পরিবারের কল্যাণকর কাজ থেকে দূরে রাখে, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে বাধা প্রদান করা থেকে অমনোযোগী করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বা পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ হতে বাধা দেয় কিংবা দায়িত্ব পালন ও নেতৃত্বের এমন কাজ থেকে বিরত রাখে, যা বিধানগতভাবে ওয়াজিব ইত্যাদি।
এমতাবস্থায় দাবা খেলা হারাম হওয়ার ব্যাপারে সকল আলিম একমত। এমনিভাবে দাবা খেলার কারণে যখন মিথ্যা কথা, মিথ্যা শপথ, দুর্নীতি, অত্যাচার বা অন্যান্য অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা হবে, তখনও সর্বসম্মতভাবে দাবا খেলা হারাম।[৪৩]
তবে যদি কোনো ওয়াজিব পালনে উদাসীন না করে বা কোনো হারাম কাজে জড়িত না করে, তাহলে এমতাবস্থায় দাবা খেলার বিধান নিয়ে মুসলিম উম্মাহর ফকিহ উলামায়ে কিরামের মাঝে মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম আহমাদ রহ., ইমাম মালিক রহ. ও ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর কিছু অনুসারীসহ অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম এ অবস্থাতেও দাবা খেলা হারাম বলেছেন। তারা নিজেদের মতের পক্ষে কুরআন কারিম এবং সাহাবায়ে কিরামের কথার মাধ্যমে প্রমাণ পেশ করেছেন।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِنَّمَا ٱلْخَمْرُ وَٱلْمَيْسِرُ وَٱلْأَنصَابُ وَٱلْأَزْلَٰمُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ ٱلشَّيْطَٰنِ فَٱجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ، إِنَّمَا يُرِيدُ ٱلشَّيْطَٰنُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ ٱلْعَدَاوَةَ وَٱلْبَغْضَآءَ فِى ٱلْخَمْرِ وَٱلْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ ٱللَّهِ وَعَنِ ٱلصَّلَوٰةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
হে মুমিনগণ, মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ-এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন কি নিবৃত্ত হবে? [সুরা আল-মায়িদা : ৯০, ৯১]
ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন, 'এই আয়াত প্রমাণ করে যে, পাশা ও দাবা দিয়ে জুয়া খেলাসহ অন্যান্য প্রকারের যাবতীয় জুয়া খেলা হারাম। কেননা, আল্লাহ তাআলা মদকে হারাম করে বলেছেন-
إِنَّمَا يُرِيدُ ٱلشَّيْطَٰنُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ ٱلْعَدَاوَةَ وَٱلْبَغْضَآءَ فِى ٱلْخَمْرِ وَٱلْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ ٱللَّهِ وَعَنِ ٱلصَّلَوٰةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন কি নিবৃত্ত হবে? [সুরা আল-মায়িদা : ৯১]
অতএব, সামান্যতম বাহুল্য কাজ, যার সামান্যটা বেশির প্রতি ধাবিত করে, পরস্পরের মাঝে শত্রুতা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর জিকির ও সালাত থেকে বাধাপ্রদান করে, সেগুলো মদ পান করার মতোই নিশ্চিত হারাম। [৪৪]
আলি বিন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, তিনি দাবা খেলায় রত কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন তাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা এ কেমন প্রতিমাপূজায় লিপ্ত? ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. বলেন, দাবার ব্যাপারে বর্ণিত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর এই বর্ণনাটি অত্যধিক বিশুদ্ধ।
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দাবা খেলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, 'এটা পাশা খেলার চেয়েও অধিক নিকৃষ্ট।'
পাশা খেলার ব্যাপারে হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে-
عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدِ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ وَرَسُولَهُ .
আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি পাশা খেলল সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নাফরমানি করল।[৪৫]
হাদিসটিকে শাইখ আলবানি রহ. সহিহ বলেছেন।[৪৬]
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
مَنْ لَعِبَ بِالنَّرْدَشِيرِ فَكَأَنَّمَا صَبَغَ يَدَهُ فِي لَحْمٍ خِنْزِيرٍ وَدَمِهِ .
যে ব্যক্তি পাশা খেলল সে যেন শূকরের গোশত ও রক্তে নিজের হাত রঞ্জিত করল। [৪৭]
ইমাম নববি রহ. বলেন, 'এই হাদিসটি ইমাম শাফিয়ি রহ. ও অধিকাংশ আলিমদের পক্ষে দলিল যে, পাশা খেলা হারাম। শূকরের রক্ত ও মাংসে হাত রাঙানোর অর্থ হলো, এগুলো খাওয়া যেমন নিকৃষ্টতর হারাম, ঠিক তেমনিভাবে পাশা খেলাও জঘন্যতর হারাম।[৪৮]
ইমাম ইবনে কুদামা রহ. বলেন-
فَأَمَّا الشَّطْرَنْجُ فَهُوَ كَالتَّرْدِ فِي التَّحْرِيمِ .
দাবা খেলাও পাশা খেলার মতো হারাম। [৪৯]
ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেছেন, 'দাবার অনিষ্টতা পাশার অনিষ্টতা থেকেও কঠিন। অতএব, যে দলিলগুলোর মাধ্যমে পাশা খেলা হারাম প্রমাণিত হবে, সেগুলো দ্বারা আরও ভালোভাবে দাবا খেলা হারাম প্রমাণিত হবে। ইমাম মালিক রহ. ও তাঁর অনুসারীগণ ইমাম আবু হানিফা রহ. ও তার অনুসারীগণ, ইমাম আহমাদ রহ. ও তাঁর অনুসারীগণ এবং অধিকাংশ তাবিয়িন দাবা ও পাশা খেলাকে হারাম বলেছেন। এই তিন মাজহাবের কোনো আলিমের পক্ষ থেকে দাবা ও পাশা খেলা হালাল বলা হয়েছে মর্মে কোনো প্রমাণ উল্লেখ নেই।
এমন একজন সাহাবির কথাও জানা নেই, যিনি দাবা খেলেছেন। আল্লাহ তাআলা এমন বাহুল্য কাজ থেকে তাদেরকে হিফাজত করেছেন। তাদের কারও প্রতি এ ধরনের খেলাকে সম্পৃক্ত করা—যেমন আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে, তিনি দাবা খেলেছেন—তো এটি মহান একজন সাহাবির প্রতি ডাহা মিথ্যা অপবাদ। সাহাবায়ে কিরামের জীবনচরিত সম্পর্কে অবহিত প্রতিটি মানুষই এই অপবাদ অস্বীকার করবেন।
আর এটা কীভাবে সম্ভব যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সোনালি যুগের সোনার মানুষগুলো এমন বেহুদা খেলায় জড়াবেন, যা আল্লাহর জিকির থেকে উদাসীন করে দেয় এবং সালাত থেকে এত বেশি অমনোযোগী করে যে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিও এদিক থেকে দাবা খেলায় পূর্ণভাবে মত্ত ব্যক্তির তুলনায় কিছুই নয়। বাস্তবেও এমনটি দেখা যায়। আর শরিয়তপ্রণেতাই বা কীভাবে দাবا খেলা জায়িজ রেখে পাশা খেলা হারাম করবেন; অথচ পাশা খেলার চেয়ে দাবا খেলার ক্ষতি বহুগুণে বেশি! [৫০]
হাফিজুল হাদিস জাহাবি রহ. বলেছেন, 'অধিকাংশ আলিম দাবا খেলা হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। কোনো কিছু বন্ধক রেখে খেলা হোক বা বন্ধক না রেখেই খেলা হোক। বন্ধক রেখে খেলা তো সর্বসম্মতভাবে জুয়া। আর যদি বন্ধক নাও থাকে, তবু অধিকাংশ আলিমের মতে সেটাও হারাম জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।
ইমাম নববি রহ.-কে দাবا খেলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তা হারাম না কি জায়িজ? তিনি জবাব দিলেন, যদি তার কারণে সময়মতো সালাত আদায় না করা যায়, অথবা বিনিময় নিয়ে খেলা হয়, তাহলে হারাম। আর যদি বিনিময় গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর মতে মাকরুহ হলেও অন্য ইমামগণের মতে হারাম।[৫১]
আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন। আমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করব, যেন তিনি তাঁর রেজামন্দি অনুযায়ী চলার এবং তাঁর আনুগত্য করার তাওফিক দান করেন। আমিন।
টিকাঃ
[৪৩] মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া: ৩২/২১৮, ২৪০
[৪৪] তাফসিরুল কুরতুবি: ৬/২৯১
[৪৫] সুনানু আবি দাউদ: ১৩/৯৭
[৪৬] সহিহ জইফ আবু দাউদ: ১০/৪৩৮
[৪৭] সহিহু মুসলিম: ১১/৩৪৫, আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকি: ১০/২১৪
[৪৮] শরহু সহিহি মুসলিম: ৭/৪৪৬
[৪৯] আল-মুগনি : ২৩/১৭৭
[৫০] আল-ফিরুসিয়্যা: ৩০৩
[৫১] আল-কাবায়ির: ৮৮
📄 বিপদজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ খেলার অনুশীলন
জিজ্ঞাসা : ঝুঁকিপূর্ণ খেলাধুলা অনুশীলনের বিধান কী? যেমন: অনেক উঁচুতে রশির ওপর দিয়ে চলা, অনেক উঁচু থেকে লাফ দেওয়া এবং সাপের সাথে একই খাঁচায় অবস্থান করা ইত্যাদি, এগুলোর বিধান কী?
জবাব : শরিয়ত মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছে, তুমি তোমার দ্বীন আঁকড়ে ধরো এবং তা অনুশাসন মেনে চলার ওপর অবিচল থাকো। এমনিভাবে দ্বীনের ক্ষতি করে এ প্রতিটি আচার-আচরণ ও কাজ শরিয়ত হারাম করেছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرار .
(দ্বীনের ব্যাপারে নিজে) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও যাবে না, আবার (অন্যের) ক্ষতিও করা যাবে না।[৫২]
শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি রহ. হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।[৫৩]
ঝুঁকিপূর্ণ খেলার ব্যাপারে আলিমদের অভিমত
ফিকহে হানাফিয়্যাতে আদ্দুররুল মুখতার প্রণেতা বলেন, 'এমনিভাবে প্রত্যেক ঝুঁকিপূর্ণ খেলা কেবল এমন অভিজ্ঞ ব্যক্তির জন্যই জায়িজ, যে নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রবল আস্থা রাখে। যেমন: তিরের সামনে নিজেকে নিক্ষেপ করা এবং সাপ শিকার করা। এগুলো দেখে আনন্দ উপভোগ করাও জায়িজ হবে।' [৫৪]
জায়িজ হওয়ার শর্তসমূহ
প্রথম শর্ত: বিজ্ঞতা, অভিজ্ঞতা এবং এ ধরনের খেলার জন্য পূর্ণ প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। এগুলো তখনই সম্ভব, যখন অধিকহারে অনুশীলন করা হবে, বারবার খেলা হবে এবং কোনো প্রশিক্ষকের নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হবে, যার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, সে আসলেই এ বিষয়ে বিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছে।
তবে যদি এই প্রশিক্ষণের মাঝে কোনো ফরজে বিঘ্নতা সৃষ্টি হয়, কিংবা কোনো সুন্নাত-মুসতাহাব বাদ পড়ে, তাহলে এই প্রশিক্ষণ হারাম বলে সাব্যস্ত হবে। [৫৫] আর যদি এমন কোনো সমস্যা সৃষ্টি হওয়া ছাড়াই প্রশিক্ষণ কমপ্লিট হয় এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে, তাহলে তা জায়িজ এবং এর মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করাও জায়িজ।
দ্বিতীয় শর্ত: নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে খেলোয়ারকে প্রবল বিশ্বাসী হতে হবে। যদি নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে তার বিশ্বাসে দুর্বলতা থাকে, তাহলে এমন বিপজ্জনক খেলা তার জন্য হারাম বলে বিবেচিত হবে। কেননা, সে এর মাধ্যমে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ আমাদের এমন কাজ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে—
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ .
নিজেদের জীবন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না। [সুরা আল-বাকারা : ১৯৫]
তৃতীয় শর্ত: অর্থের বিনিময়ে খেলা যাবে না। এ ধরনের বাহুল্য ও অর্থহীন খেলার বিনিময় গ্রহণ করা হারাম। যদি কেউ এমন অনর্থক খেলার বিনিময় গ্রহণ করে, তাহলে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগকারী হিসেবে গণ্য হবে। [৫৬]
আমি এ শর্তগুলোর সাথে আরেকটি শর্ত যোগ করব, তা হলো সবসময় খেলা যাবে না; বরং আনন্দের সময়গুলোতে খেলা যাবে। আমার এ কথার সমর্থনে হাদিসের কিছু বর্ণনাও পাওয়া যায়। যেমন: মসজিদে নববির আঙিনায় হাবশি গোলামরা ইদের দিনে খেলাধুলা করত। এর সাথে আনন্দঘন অন্যান্য সময়গুলোকেও যোগ করা যেতে পারে।
টিকাঃ
[৫২] সুনানু ইবনি মাজাহ : ২৪৩০
[৫৩] সহিহ জইফ ইবনি মাজাহ: ৫/৩৪০
[৫৪] আদ্দুররুল মুখতার : ৬/৭২৪
[৫৫] ফরজ ছুটে গেলে বা তা আদায়ে বিঘ্ন ঘটলে হারাম হওয়ার বিষয়টি ঠিক আছে। অনুরূপ ওয়াজিবের ক্ষেত্রেও একই বিধানপ্রায়। কিন্তু সুন্নাত বা মুসতাহাব ছুটে গেলে সেটা হারাম হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই; বরং এ ক্ষেত্রে ছুটে যাওয়া বিধানের স্তর অনুযায়ী অপরাধের মাত্রা নির্ধারিত হবে। সুতরাং সুন্নাতে মুআক্কাদা ছুটলে মাকরুহে তাহরিমি, আর মুসতাহাব ছুটলে মাকরুহে তানজিহি হবে। -সম্পাদক
[৫৬] বাগিয়্যাতুল মুশতাক ফি হুকনিল-লাহবি ওয়াল লা'বি ওয়াস সাবাক : ১৫৬-১৫৭
📄 যুক্তিপূর্ণ খেলার ব্যাপারে আলিমদের অভিমত
ফিকহে হানাফিয়্যাতে আদ্দুররুল মুখতার প্রণেতা বলেন, 'এমনিভাবে প্রত্যেক ঝুঁকিপূর্ণ খেলা কেবল এমন অভিজ্ঞ ব্যক্তির জন্যই জায়িজ, যে নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রবল আস্থা রাখে। যেমন: তিরের সামনে নিজেকে নিক্ষেপ করা এবং সাপ শিকার করা। এগুলো দেখে আনন্দ উপভোগ করাও জায়িজ হবে।' [৫৪]
টিকাঃ
[৫৪] আদ্দুররুল মুখতার : ৬/৭২৪