📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 মুসলিম জনপদে বিনোদন

📄 মুসলিম জনপদে বিনোদন


বর্তমান বিশ্বের মুসলিম দেশের শহরগুলো প্রকাশ্য-গোপন, বাহ্যিক-অভ্যন্তরীণভাবে নানা প্রকার অবৈধ খেলাধুলা এবং বেহায়া-বেলেল্লাপনামূলক বাহুল্য কাজে ডুবে গেছে।
মুসলিম সমাজের অশ্লীলতায় ডুবে যাওয়ার কারণ
মুসলিম সমাজের এমন অশ্লীলতা ও নোংরামিতে ডুবে যাওয়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনেক কারণ-উপকরণ রয়েছে। সেগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি হলো-
১. অনুকরণপ্রিয়তা
অনুকরণকারী তার এই কাজে উৎসাহিত ও বাধ্য হওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো, নিজের মাঝে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে নষ্ট করা, ভ্রষ্টতা ও মূর্খতার নগ্ন আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে সেই আঘাতকে বুকে ধারণ করে চলতে থাকা।
পাশ্চাত্যজগত এটা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে যে, বিনোদনের বিষয়গুলোই কেবল এমন মজবুত মাধ্যম, যার মাধ্যমে তারা আমাদের মুসলিমদের দ্বীন-ইসলাম ক্রয় করতে পারবে, মুসলিম উম্মাহর মনোবল ও সুপ্ত প্রতিভা অকেজো করে দিতে পারবে। সুতরাং তারা আমাদের মাঝে সেগুলোর প্রচার-প্রসারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং বাস্তবে তার প্রয়োগও করেছে। আর এর মাধ্যমেই তাদের ভ্রান্ত ও নোংরা আকিদাগুলো মুসলিমদের হৃদয়ে পুশ-ইন করছে।
যার ফলে আমাদের ছেলে-মেয়েরা নিজেদের শরীরে ক্রুসের ছবি অঙ্কন করছে, মদ পান করছে এবং নিজেদের আকিদা-বিশ্বাস নষ্ট করে ফেলছে। কিন্তু এগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার মতো শক্তি-সাহস তাদের হচ্ছে না; বরং উল্টো প্রতিটি বিষয়ে অবলীলায় তারা পাশ্চাত্যের অনুকরণ করছে।
এখানেই শেষ নয়; বরং পশ্চিমাদের অনুকরণ করে সিয়োনের রাষ্ট্রচালকদের প্রোটোকল পর্যন্ত তুলে নেওয়া হয়েছে।[৩১] বিদেশি সভ্যতা আমদানি ও প্রচারের নীতিমালারও তোয়াক্কা করা হচ্ছে না কোনোভাবেই।
এমনকি তারা সিংহভাগ মুসলিম জনগণের হৃদয় থেকে রাজনৈতিক মানসিকতা বের করার জন্য; বরং রাজনৈতির কর্ণধারদের প্রজনন শক্তিহীন খাসির মতো বানিয়ে ফেলার জন্য এবৎ রাজনৈতিক বিষয়টি মুসলিম সমাজে গুরুত্বহীন করে ফেলার জন্য পশ্চিমারা মুসলিম সমাজে নানা রকম বেহুদা কাজকর্মের আয়োজন করেছে। যার মধ্যে বিভিন্ন প্রকার খেলাধুলা, সিনেমা, থিয়েটার, কৌতুক, ম্যাজিকসহ এমনসব আবেদনময়ী বিষয়ের অবতারণা করেছে, যেগুলো মানুষকে বাস্তবতা থেকে ফিরিয়ে কেবল খেয়ালিপনায় অভ্যস্ত করে তোলে। কঠিন থেকে কঠিন বিপদের মুহূর্তে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে কেবল এই খেয়ালেই গা ভাসিয়ে দেয় যে, দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়! যার কারণে তারা জ্যোতিষী, গণক, কবিরাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের কথার ওপর ভরসা করে তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিজেকে কালের স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
সংস্কৃতি ও বিনোদনের নামে এসব বেহুদা কাজ একদিকে মানুষকে যেমন অকর্মণ্য করে ফেলে, অন্যদিকে তাদের মন-মস্তিষ্ককে করে ফেলে বিকারগ্রস্ত। নতুন কিছু তারা ভাবতে পারে না, সৃজনশীল কোনো সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করতে পারে না। কেবল অলৌকিক কিছু হয়ে যাওয়ার আশায় বুক বেঁধে থাকে। যার কারণে মৌখিক বা লিখিত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। জাতীয় পর্যায়ে বা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কিছু করার ব্যাপারটি তারা আর কল্পনা করতে চায় না, কল্পনা করতেও পারে না।
এভাবেই তারা চতুর্মুখী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আমাদের যুবকদের বিবেক-বুদ্ধি নিষ্ক্রিয় করে ফেলার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে পশ্চিমাদের যেকোনো চক্রান্ত প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে চলেছে।
২. মুসলিমদের সম্পদগুলো বিনষ্ট করা
আল্লাহ তাআলা নানা প্রকার নিয়ামত ও সম্পদ দিয়ে মুসলিমদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, যেগুলো তাদের ভূখণ্ড নিজ গর্ভে সংরক্ষণ করে রেখেছে। কাফিররা যেকোনোভাবেই হোক অবিরত সেগুলো দখল করার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তারা বহুবার যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চরমভাবে। তাই তারা মুসলিমদের এই সম্পদগুলো দখল করার জন্য ভিন্ন পথে দাবার গুটি চালছে; এর প্রধান ও প্রথম গুটি হলো, মুসলিম জনপদগুলোকে এমনসব বেহুদা কাজে আটকে দেওয়া, যার অণুপরিমাণ প্রয়োজনও কোনো মুসলিম এবং তাদের জনপদগুলোর নেই।
এই পথে তারা অতীতের যুদ্ধগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সফল হয়েছে। ফলে তারা বাহারি রূপে সাজিয়ে আমাদের সামনে কল্যাণ ও অকল্যাণের এমন বহু দরজা খুলে দিয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে তারা আমাদের ওই সম্পদগুলো কুক্ষিগত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যেই সম্পদগুলো আমরা জীবন দিয়ে সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম শতাব্দীর পর শতাব্দী।
৩. চারিত্রিক অবকাঠামোর দুর্বলতা বৃদ্ধি করা
পশ্চিমারা সর্বানাশা বিষ হিসেবে যেই জীবানুগুলো সর্বাগ্রে উপস্থাপন করেছে তা হলো, থিয়েটার, টিভিচ্যানেল, গান-বাজনা ও এমন সব বিনোদনমূলক ও ফুর্তিবাহক যন্ত্র, যেগুলো একদিকে তো চারিত্রিক অবক্ষয়ের দিকে ডাকে, অন্যদিকে আহ্বান করে আকিদা ও বিশ্বাসগত বিকৃতি ও পদস্খলনের দিকে।
অধিকাংশ ফিল্ম ও মুভি, যেগুলোর মাধ্যমে এই অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে, সেগুলোর নির্মাতা ও স্বত্বাধিকারী হলো ইহুদি সম্প্রদায়। এই নোংরা শিল্পের মাধ্যমে তাদের বড় টার্গেট, মুসলিমদের আখলাক নষ্ট করা এবং চারিত্রিক অবক্ষয় নিশ্চিত করা।
৪. খেলাধুলার মাধ্যমে মুক্তি ও দায়িত্বশীলতার বিশ্বাস চুরমার করা
খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে ও মনে রাখতে হবে যে, বিনোদনমূলক খেলাধুলার মাধ্যমে তারা যে অপপ্রয়াস চালাচ্ছে, এগুলো মুসলিমদের গুনাহমুক্ত থাকার ও দায়িত্বশীলতার চাবিকাঠি ইমান-আকিদা নষ্ট করার মূল নীলনকশার একটি রেখামাত্র।
মি. ওয়ালবার্ট স্মিথ বলেন, 'খেলাধুলা এটা প্রমাণ করেছে যে, তা দর্শনগতভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর গোঁড়া দুটি দলকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে এবং পরস্পরকে একে অপরের প্রতি দুর্বল করতে সহযোগী হয়। ১৯৫৯ সালে ইহুদিদের ইংরেজি পত্রিকার সংবাদের ভিত্তিতে আরবরা যখন সাধারণভাবে কুদস (বাইতুল মুকাদ্দাস) উদ্ধারের ঘোষণা দিল, ঠিক সেই সময় 'জামইয়্যাতুশ শুব্বানিল মাসিহিয়্যা' প্রতিষ্ঠিত হয়। যার এজেন্ডা ছিল আরব ও ইহুদিদের পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ করা; এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে উভয়ের মাঝে টেনিস খেলার আয়োজন করা হয়।
যেই খেলায় অংশগ্রহণকারী খেলোয়ারদের মাঝে মুসলিম ও ইহুদি উভয় জাতিই ছিল। খেলা উপভোগ করার জন্য সেখানে মাজলুম ফিলিস্তিনিরাও দর্শকদের কাতারে ছিল। শুধু কি তাই? না; বরং ফিলিস্তিনিরা ইংরেজ, আমেরিকান, আলমেনীয় ও রিয়াদের কর্ণধারদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে খেলা দেখেছে। খেলোয়াররা যখনই কোনো ভালো খেলা উপহার দিচ্ছিল, ইহুদিরা চিৎকার করে আরবদের সাধুবাদ জানাচ্ছিল। আবার ইহুদি খেলোয়াররা যখন ভালো কোনো খেলা উপহার দিচ্ছিল, আরবরা চিৎকার করে তাদের সাধুবাদ জানাচ্ছিল। এভাবে একসময় চা চক্রও চলেছিল। যেখানে প্রায় ৫০জন ফিলিস্তিনি, ইংরেজ ও সিয়োনিয়ান অংশগ্রহণ করেছিল। ৩২

টিকাঃ
[৩১] সিয়োনের ত্রিয়োদশ শাসকের প্রোটোকল তুলে নেওয়া হয়েছিল। মাউন্ট সিয়োন মূলত একটি পর্বতের নাম ছিল, যেখানে এখন জেবুসাইট দুর্গটি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু নামটি পরে দুর্গটির উত্তরে শুধু টেম্পল মাউন্টে প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা 'মাউন্ট মরিয়া' নামেও পরিচিত। মূলত 'সিয়োন কন্যা' অর্থাৎ, সিয়োন পাহাড়ের একটি প্রসারক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক পরে দ্বিতীয় মন্দির যুগে নামটি শুধু একটি প্রাচীরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি পাহাড়ে প্রয়োগ করা হয়েছিল। পরবর্তী এই পর্বতটি এখনো 'সিয়োন মাউন্ট' হিসেবে পরিচিত। ব্যাবিলনীয় নির্বাসন-এর দৃষ্টিকোণ থেকে সিয়োন সমগ্র জেরুসালেম শহরটির সমর্থক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। [উইকিপিডিয়া, সামান্য পরিমার্জিত] • সম্পাদক

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 বিকল্প বিনোদন কি শরিয়তের অভিপ্রায়?

📄 বিকল্প বিনোদন কি শরিয়তের অভিপ্রায়?


শরিয়ত বিনোদনকে অনুমোদন দেওয়ার কারণে কিছু মূলনীতিও নির্ধারণ করে দিয়েছে। অতএব, বিকল্প বিনোদনের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। বিশেষকরে এই যুগে, যখন হারাম বিনোদন মহামারি আকার ধারণ করেছে; যেন মানুষ হারাম বিনোদন থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় খুঁজে পায়। কারণ, বর্তমান যুগে বিনোদন ও খেলাধুলার উপকরণগুলো 'সৌন্দর্য লাভের মাধ্যম ও অতিরিক্ত বিষয়' এর স্তর অতিক্রম করে জরুরি বিষয় হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে এবং মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন থাকা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। অতিরিক্ত আকর্ষণের কারণে মানুষ বিনোদনের জন্য স্বতন্ত্র সূচি তৈরি করেছে এবং একাধিক সময় নির্ধারণ করেছে। এখানেই শেষ নয়; বরং বিনোদন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে করতে এখন তা ইসলামি শরিয়তের অনভিপ্রেত কাজের মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
আমাদের আলোচ্য বিষয় সেই বিকল্প বিনোদন, যা গর্হিত ও শরিয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয়াবলি থেকে মুক্ত হবে। বরং আরও পরিষ্কারভাবে বলা যায়, শরিয়তের অনুগামিতাই মূল উদ্দেশ্য, আর বিনোদন তার সহযোগী একটি অনুসঙ্গ মাত্র।
তবে হ্যাঁ, বর্তমান প্রেক্ষাপট বিকল্প হিসেবে এমন বিনোদনের নিবেদন করছে, যা মানুষকে পদস্খলিত করে হারাম বিনোদনে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করবে।
কিন্তু বর্তমান যুগে বিকল্প বিনোদন নিয়েও সমস্যা। কারণ, যেই ব্যবস্থাত মানুষের স্বার্থে করা হয়, আত্মভোলা হয়ে মানুষ সেটাকেই ধ্যান-জ্ঞান ও চাওয়া-পাওয়ার বিষয় বানিয়ে ফেলে। সেটা ছাড়া তারা আর কিছুই বোঝার চেষ্টা করে না।
যার কারণে কোনো খতিব, কোনো দাঈ, কোনো আলিম বা কোনো মুফতি যখন ইসলামি শরিয়তের আলোকে হালাল-হারাম-বিষয়ক কোনো বিষয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত হন, তখনই তার প্রতি যাচিত ও অযাচিত প্রশ্ন ও আপত্তির তুফান আসতে শুরু করে। যেমন-
হুজুর, এর বিকল্প কী হতে পারে? কোথায় পাওয়া যাবে??
হুজুর, যখন এ বিষয়ে কোনো বিকল্প পাওয়া না যাবে, তখন আমরা কী করব?
হুজুর, আপনার কাছে যদি কোনো বিকল্পব্যবব্যবস্থা না থাকে, তাহলে মানুষের জন্য প্রচলিত পথকে রুদ্ধ করা কি ঠিক হবে?
এখানেই শেষ নয়; বরং অনেক গর্হিত কাজেও মানুষ ব্যাপকহারে বিকল্প পদ্ধতির দাবি করে থাকে। তো এই বিকল্প পদ্ধতির বিষয়টি দলিল বানিয়ে অনেকেই মাকরুহ কাজ তো আছেই, হারাম কাজকেও বৈধতা প্রদানের অপচেষ্টা করছে। এমন লোকেরা আলিমদের কাছে প্রশ্ন করছে—
সিনেমা ও নাটকের বিকল্প কী?
টিভি স্টেশনের বিকল্প কী?
গান ও মিউজিক শোনার বিকল্প কী?
রেসলিং খেলা, যেখানে সাধারণত চেহারাতেই আঘাত করা হয়, এর বিকল্প কী?
গানের কনসার্ট, রোমান্টিক মুভি, কমেডি মুভি এবং হাসির নাটকের বিকল্প কী?
গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটানোর জন্য বিভিন্ন স্থানে—দেশের বাইরে বা অভ্যন্তরে ভ্রমণের বিকল্প কী?
সাঁতার কি মৌলিকভাবে জায়িজ নয়?
তাহলে আমরা ছুটির সময়গুলো কোথায় কাটাব?
অতএব, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে যে, আলিম-উলামা ও দায়িদের ওপর কি বর্তমান যুগে প্রচলিত সমস্ত অনিষ্টতা ও হারাম বিষয়ের বিকল্প উদ্ভাবন করা ওয়াজিব? প্রত্যেক হারাম কাজের বিকল্পপন্থা আবিষ্কার করা কি তাদের দায়িত্ব?
মনে রাখতে হবে, একজন প্রকৃত মুসলিম ও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী বুদ্ধিমান মানুষের জন্য বৈধ-শরিয়তসম্মত বিনোদনের অনুসরণই যথেষ্ট।
একটি মূলনীতি খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে যে, কোনো বস্তু যখন সীমালঙ্ঘন করে ফেলে, তখন তার মূলের দিকে ফিরে আসে। ঠিক তেমনিভাবে বিনোদন যখন তার সীমা অতিক্রম করবে, তখন তার মূল 'হারাম'-এর দিকে ফিরে আসবে।
অতএব, মানুষ যখন সমস্ত হারাম বিনোদনেরই বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করবে, খেল-তামাশা, বিনোদন ও কল্পনাজগতের উত্তাল তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে সীমানাহীন ভাটির দিকে ভেসে যাবে, তখন তার পরিসমাপ্তি ঘটে মূল হারামের দিকেই ফিরে আসবে। কারণ, আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টিই করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য; বিনোদন ও খেলাধুলা করার জন্য নয়। আল্লাহই তাদের পরিণতি সম্পর্কে ভালো জানেন।

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 বিকল্প বিনোদনের উত্স

📄 বিকল্প বিনোদনের উত্স


যারা দ্বীনকে আঁকড়ে ধরতে চান বা কমপক্ষে অনিষ্টতা থেকে দূরে থাকতে চান, তাদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি কেবল ইসলামি বিকল্প আবিষ্কারের প্রচেষ্টা ও পাপমুক্ত বিনোদন অন্বেষণের ওপরই ক্ষান্ত নেই; বরং তারা এক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার হারাম বিনোদনের দিকেও অগ্রসর হয়েছে। আমরা কোনোভাবেই এগুলো সমর্থন করি না, সমর্থন করতে পারি না। বরং যারা অনৈসলামি হারাম কালচারকে ইসলামের নামে মুসলিমদের ঘরে পুশ-ইন করার অপপ্রয়াস চালায়, আমরা কঠিনভাবে তাদের এহেন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করি এবং যথাসাধ্য প্রতিরোধ করার চেষ্টা করি।
সুতরাং আমরা বিকল্পব্যবস্থার শিরোনামে অপ্রত্যাশিতভাবে ছড়িয়ে পড়া মুসলিম উম্মাহর ঘাড়ে চেপে বসা ইসলামি ভিডিও, ইসলামি কার্টুন, ইসলামি গান, ইসলামি থিয়েটার ও ইসলামি কমেডি নিয়ে আলোচনা করব।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, অনেকেই বিনোদননামক এই কর্মকাণ্ডে সীমাতিরিক্তভাবে পদস্খলনের শিকার হয়েছেন। বিনোদনজগতের কর্মসূচি প্রণয়ন করতে গিয়ে তাদের অনেকেই এমন স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন, শরিয়তের উলামায়ে রব্বানির সাথে ও সত্যিকারের ইসলামি অনুশাসন মান্যকারী আল্লাহভীরু আলিমদের সাথে যার ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। তারা কোনোভাবেই এগুলো অনুমোদন করেন না।
ইসলামের নামে কিছু ভিডিও ক্লিপ এমন রয়েছে, যেগুলোতে ধিমতালে সুরতরঙ্গ সৃষ্টি করা হয় এবং এমন অঙ্গভঙ্গি করা হয়, যা কোনোভাবেই পুরুষত্বের সাথে যায় না; বরং অনেক ক্ষেত্রেই পাপাচারী গায়কদের সাথে সাদৃশ্য সৃষ্টি হয়। যেমন: হাত-পা নাড়িয়ে জমিনে বা হাতের সীমার মধ্যে থাকা বস্তুতে মৃদু আঘাত করা। উপরন্তু কিশোরীদের মাধ্যমে এসব গান উপস্থাপন করা, যা কোনোভাবেই ইসলামি অভিপ্রায়ের অনুকূল নয়। অথচ এগুলো চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইসলামি সংস্কৃতির নামে।
এগুলো কি কোনোভাবেই সেই শর্তাবলির আওতায় উত্তীর্ণ হতে পারে, ইসলামি শরিয়তের আলোকে যেগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে? কোনোভাবেই কি এগুলো ইসলামি শরিয়তের প্রতিকূল বিষয়গুলো থেকে নিরাপদ হতে পারে?
ইসলামি সংগীতের জন্য যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছে, বাদ্যযন্ত্রের কোনো প্রকারকেই তা সমর্থন করে না। অনুরূপ সেসব সাউন্ড সিস্টেমকেও সমর্থন করে না, যেগুলোর মাধ্যমে আওয়াজকে তার প্রকৃত অবস্থা থেকে বিকৃত করে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। এরপরও এগুলোর ব্যাপারে বলা হচ্ছে যে, বিকল্প ইসলামি বিনোদনের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। কিন্তু আমরা যখন ইসলামি সংগীতকে এই সকল আনুষঙ্গিকতা থেকে মুক্ত করে উপস্থাপন করি, তখন সেগুলোর ভক্ত ও শ্রোতা নিতান্তই কম হয়ে যায়! অথচ সাউন্ড সিস্টেমমুক্ত এসব সংগীতই হলো ইসলামের অভিপ্রায় মোতাবেক নির্ভেজাল ইসলামি সংগীত।
বিশেষ বিশেষ দিবসগুলোতে এমন সংগীতও পরিবেশন করা হয়, যেগুলোতে করতালির খই ফোটে, সৃষ্টি হয় নারী-পুরুষের সংমিশ্রণের অবাধ জোয়ার। অথচ এগুলোকেও আখ্যায়িত করা হয় 'ইসলামি অনুষ্ঠান' হিসেবে!
ওই সমস্ত ফিল্মকেও ইসলামি বলে আখ্যায়িত করা যাবে না, যেগুলো গান ও মিউজিকের সাউন্ড থেকে মুক্ত করা হয়েছে। ওই সমস্ত শিরক, কুফুর ও পাপাচারে ভরা ফিল্মকেও ইসলামি বলে আখ্যায়িত করা যাবে না, যেগুলোতে কেবল ইসলামি কালচারের লেবেল লাগানো হয়েছে।
কেবল ইসলামি কালচারের লেবেল লাগালেই বা গান ও মিউজিকের আওয়াজ মুক্ত করলেই প্রকৃত ইসলামি বিনোদন হয়ে যায় না। কেননা, ইসলামি বিনোদনের ক্ষেত্রে পরিষ্কারভাবে এই শর্তগুলো আরোপিত হয়েছে যে, অনৈসলামি আকিদার প্রলেপ থাকা যাবে না, শিরকি কোনো শব্দের মিশ্রণ থাকা যাবে না, ইসলামের প্রতিষ্ঠিত চিন্তা-চেতনা ও আদর্শের পরিপন্থি কোনো বিষয় থাকা যাবে না। যেমন : বাম হাতে পানাহার করা, উপুড় হয়ে শোয়া, নারী-পুরুষের অবাধ মিশ্রণ, শারীরিক অসঙ্গতি বোঝানোর জন্য চলমান কোনো নারীর প্রদর্শন ইত্যাদি। এই শর্তগুলোর প্রতি কোনো প্রকার ভ্রুক্ষেপ না করেও কোনো বিষয়কে ইসলামি বলা কেবলই পরিহাস!
এমন অনেক ইসলামি ভিডিও ক্লিপও প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে, যেগুলোতে এমন অনেক সুন্দরী ললনাদের উপস্থিতি রয়েছে, যাদের অধিকাংশেরই বয়স ১০ থেকে ১২ বছর। তারা সেখানে ইসলামি গান পরিবেশন করছে। কখনও দফের বাজনার তালে তালে অঙ্গভঙ্গিও প্রদর্শন করছে। আবার কখনও তাদের সাথে সমুদ্রের কিনারে বা পাহাড়ের পাদদেশে যুবকদেরও গান গাইতে দেখা যায়, যেখানে কিশোরীরা রং-বেরঙের পোশাক পরিধান করে যুবকদের সামনে জাদুময় মুচকি হাসির স্বর্গীয় মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি করে তোলে।
বরং অবস্থা তো এত দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে যে, কেউ কেউ এই অনুষ্ঠানগুলোতে ইসলামি ডিস্কো নারীর আবেদনও করে! এমন ইসলামি থিয়েটারের দাবি করে, যেখানে যুবকেরা ব্র্যাঙ্কেট পরিধান করবে! অনেকেই সেখানে কৃত্রিম দাড়ি ও গোঁফ ব্যবহার করে! অনেক যুবক এমন লজ্জাকর ড্যান্স পরিবেশন করে, যা কোনো মুসলিম যুবকের জন্য শোভা পায় না! আবার অনেকে কুকুরের মতো শব্দ করে নানা প্রকার কথা বলে!
থিয়েটারগুলোতে এমন অনেক নাটক পরিবেশন করা হয়, যেখানে কোনো ইসলামি উপাখ্যান বা ইসলামি ব্যক্তিত্বের ইতিহাস তুলে ধরা হয়। কিন্তু সেগুলোতে নারী-পুরুষকে একসাথে উপস্থাপন করা হয় এবং আকর্ষণ বৃদ্ধি করার জন্য মিউজিকও ব্যবহার করা হয়। আবার সাথে এটাও বলা হয় যে, এগুলো ইসলামি থিয়েটার!
এমন অনেক অনুষ্ঠানকেও ইসলামি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেগুলোতে ইসলামের নামে কোনো মেসেজ তো নেই-ই, উপরন্তু হাসি, তামাশা ও শরিয়ত-গর্হিত বিষয়াদি দিয়ে ভরপুর!
আমাদের সন্তানদের নির্ধারিত দর্শনে প্রতিপালন করা হচ্ছে না, তাদের জন্য ইমানি দীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে তাদের মাঝে তো অসচ্চরিত্র বাসা বাঁধবেই।
নাম দেওয়া হচ্ছে ইসলামি নাটক; কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, কিছু নাটকে শরিয়ত-গর্হিত বিষয়ের ছড়াছড়ি রয়েছে, আর কিছু নাটকে রয়েছে ইসলামির আকিদার বিকৃতি ও পদস্খলন। যেগুলো সংস্কার করে পরিশুদ্ধ করা ইসলামের দৃষ্টিতে একান্ত অপরিহার্য। যেমন : কিছু নাটকে কাফির ও মুনাফিকদেরকে মহৎ বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে, পাপমুক্ত থাকা ও দায়িত্বশীলতার বিষয়কে হালকাভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, নারী-পুরুষকে একত্রে পেশ করা হচ্ছে, মিউজিক ও গান পরিবেশন করা হচ্ছে, ভ্রান্ত আকিদা ভাইরাল করা হচ্ছে। অথচ এগুলোর পরিশুদ্ধি অপরিহার্য, যেন সেগুলোকে প্রকৃত অর্থেই ইসলামি মূলনীতির আলোকে গ্রহণ করা যায়।
বিকল্প ইসলামি বিনোদনের মাঝে এই বিঘ্নতার কারণে যে সমস্যাগুলো সৃষ্টি হচ্ছে তা হলো-
এমন নষ্ট ও ভ্রান্ত বিনোদনের প্রতি আকর্ষণ ও প্রতিযোগিতার নেশা তৈরি হচ্ছে, সচেতন নাগরিক ও অধিকাংশ আলিমের মতে যেগুলো নিজেই পরিশুদ্ধ বিকল্পের মুখাপেক্ষী!
একথা অজানা থাকার কথা নয় যে, দ্বীন থেকে ডাইভার্ট হয়ে যাওয়া মূলনীতিগুলোকে সংস্কার করে, স্খলিত বিষয়গুলোকে উদ্ধার করে দ্বীনের অভিপ্রায়ের অনুকূল করে উপস্থাপন করতে হবে। এদিকে প্রচলিত ইসলামি বিকল্পবিনোদনগুলো এত নিচে নেমে গেছে যে, এগুলো দ্বারা হারাম বিনোদনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
উপরন্তু বিনোদন শিল্পের কারিগরেরা, যারা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে এই শিল্পের জন্য কাজ করছে, বিকল্প ইসলামি বিনোদন শিল্পের মাধ্যমে তাদের কাছাকাছি যাওয়া অসম্ভব না হলেও সেটা যে অসম্ভবপ্রায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এখানে একটি উদ্যোগই ফলপ্রসূ হতে পারে, তা হলো, মানুষের হৃদয়ে হারাম বিনোদন ও বিকল্প ইসলামি বিনোদনের পার্থক্যের বিষয়টি প্রবেশ করিয়ে জায়িজ বিনোদনের প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ সৃষ্টি করা এবং হারাম বিনোদনের প্রতি ঘৃণাবোধ জাগানো।
যেমন ধরুন ইসলামি গান। এগুলোর প্রতিষ্ঠাতারা মনে করে, হারাম গানের বিপরীতে এগুলো বিকল্প ইসলামিব্যবস্থাপনা। কিন্তু এগুলোর প্রতি গভীর দৃষ্টি দিলে পরিষ্কার হয়ে যায়, অনেক দিক থেকেই হারাম গানের সাথে এগুলোর সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন : ডেকোরেশন ও লাইটিং করার দিক থেকে ইসলামি অনুষ্ঠান ও অনৈসলামি অনুষ্ঠানের মাঝে সাদৃশ্য, বসার ক্যাটাগরির মাঝে সাদৃশ্য, উপস্থিতির চেয়ারের মাঝে, লিখিত ডায়েরি ও মাইক্রোফোন ইত্যাদির মাঝে প্রায় শত ভাগ সাদৃশ্য রয়েছে।
ইসলামি নীতিমালার সাথে এতগুলো অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও এগুলো কীভাবে হারাম গানের বিকল্প হতে পারে? তারপরও বলতে হবে, নেশা, স্বাদ ও উপভোগের দিক থেকে হারাম গানগুলো অধিক কঠিন ও প্রভাব বিস্তারকারী। আপনি হারাম গানের মাঝে যে আকর্ষণ পাবেন, ইসলামি গানের মাঝে সে আকর্ষণ কখনও পাবেন না। কেননা, হারাম গানের মাঝে প্রভাব বিস্তারকারী এমন মিউজিক থাকে, যা নামকাওয়াস্তে হলেও ইসলামি গানের মাঝে থাকে না, যার কারণে এসব ইসলামি গানকে কিছু আলিম হালাল বলছেন।
খুব ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে, হারাম গান থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য তাদের হৃদয়ে ইমানকে জাগ্রত ও বলিয়ান করতে হবে এবং হারাম গানের নিষিদ্ধতা মজবুতভাবে অন্তরে বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সুতরাং আমি কখনও এ কথা বলব না যে, গান ছাড়ুন এবং গজল ধরুন; বরং আমি বলব, গান ছাড়ুন! কেননা, তা হারাম ও আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ।
তবে আমার কথার অর্থ এই নয় যে, আমাদের কাছে ইসলামি গান এবং এ বিষয়ে বিশুদ্ধ ভবিষ্যৎপরিকল্পনা থাকবে না, যেগুলোর ক্ষেত্রে ইসলামি নীতিমালার অনুসরণ করা হবে, ডেকোরেশন থেকে শুরু করে অন্যান্য যাবতীয় বিষয়ে হারাম গানের সাথে যার কোনোরূপ সাদৃশ্য থাকবে না। পাশাপাশি আমি এটাও বলছি না যে, আমরা বিজাতীয়দের অন্ধ অনুকরণ করব, তাদের ব্যবহৃত জিনিসগুলো ব্যবহার করব, তাদের আবিষ্কৃত বস্তুগুলো গ্রহণ করব এবং তাদের সামনে আত্মসমর্পণ করব।
বরং আমি বলতে চাচ্ছি, হারাম গানের কাছে তো যাবই না, হারামের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নামকাওয়াস্তে ইসলামি গানও শুনব না। যথাসম্ভব এগুলো থেকে দূরে থাকব। -অনুবাদক)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00