📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 বিনোদনের প্রকারভেদ

📄 বিনোদনের প্রকারভেদ


বিনোদনকে মোট তিন প্রকারে ভাগ করা যায়। যথা-
প্রথম প্রকার: ওই সমস্ত বিনোদন, একজন মানুষ তার দ্বীনি প্রয়োজন মেটানোর স্বার্থে যার প্রত্যাশী ও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। যেমন: ইতিপূর্বে হাদিসের আলোকে তিরন্দাজি ও অশ্বারোহণের বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে, যেন এগুলোর মাধ্যমে জিহাদের কলা- কৌশল ও বিচক্ষণতা অর্জন হয়।
এমনিভাবে স্ত্রীর সাথে খেলাধুলা করা। কেননা, এটা তার অধিকার। এর মাধ্যমে স্বামী- স্ত্রী উভয়ের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি হয় এবং হারাম চাহিদা থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।
এগুলোর মাঝে প্রত্যেক ওই আনন্দ-উল্লাসও অন্তর্ভুক্ত হবে, যার দ্বারা দ্বীনি উপকারের ইচ্ছা ও প্রত্যাশা করা হয়। যেমন: সাঁতার কাটা, দৌড় প্রতিযোগিতা, শরীরে শক্তি সঞ্চয়ে সহযোগী প্রতিটি প্রতিযোগিতা, সতর্কতা বৃদ্ধি, বোধগম্য শক্তির গতিবেগ বাড়ানো এবং বুঝশক্তি বৃদ্ধি ইত্যাদি।
সামুদ্রিক যুদ্ধে মুসলিম ডুবুরিরা বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। যেমন : সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির যুগে মুসলিম ডুবুরিরা খ্রিষ্টানদের জাহাজগুলোর পূর্বে কোনো একস্থানে ডুব দিতেন এবং (জাহাজের নিচ দিয়ে বা পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে) অন্য দিকে উপরে উঠে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পত্র, ব্যয়ভারের অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং সামরিক পত্রাদি অবরোধের শিকার আক্কাসহ [২৯] বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিতেন।
দ্বিতীয় প্রকার: ওই সমস্ত বিনোদন, যেগুলো মৌলিকভাবেই হারাম কিংবা তাতে হারামের সংমিশ্রণ থাকে। যেমন: এমন খেলা, যেগুলোতে ক্রুশ থাকে, বাজনা থাকে কিংবা জুয়া ইত্যাদি থাকে।
তো এই সমস্ত খেলা নিঃসন্দেহে হারাম। কোনো অবস্থাতেই এই খেলাগুলো জায়িজ নয়; বরং সর্বাবস্থায়ই হারাম।
তৃতীয় প্রকার: ওই সমস্ত খেলা, যেগুলোর মাঝে হারামের কোনো সংমিশ্রণও নেই, আবার দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো উপকারিতাও নেই। এ ধরনের খেলাকেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাতিল বা অনর্থক বলে অভিহিত করেছেন। অতএব, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কোনো মুসলিম এমন খেলার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে না।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'বাতিল বলে ওই সমস্ত কাজ বুঝানো হয়েছে, যেগুলোর মাঝে কোনো উপকারিতা নেই। এ ধরনের কাজ কেবল তার জন্যই করার অনুমতি আছে, যার উপকারী কাজ করার ধৈর্য নেই।'[৩০]
উদাহরণস্বরূপ আমাদের সন্তানদের হাতে এমন কিছু ইলেকট্রিক খেলনাসামগ্রী দেখা যায়, যাতে হারাম কিছু পাওয়া যায় না, আবার তাতে বাচ্চাদের কোনো উপকারিতাও নিহিত নেই। তাহলে এটা হলো বাতিল খেলার উপকরণ, যাদ্বারা কারোরই খেলা উচিত নয়। অতএব, শিশুসন্তান যখন এ ধরনের খেলনা দেখে তাদ্বারা খেলতে উদগ্রীব হয়ে উঠবে এবং এটা নিয়ে জোরাজুরি করবে, তখন তার অভিভাবক তাকে তা দিয়ে দেবে। অতঃপর চেষ্টা করবে, যেন তা ছেড়ে সে অন্যান্য উপকারী খেলনা দিয়ে খেলে।
সুতরাং একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো, নিজের উন্নতিসাধন করা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখা, সাহসী হওয়া; অতঃপর আমাদের সময়ে বিদ্যমান সব ধরনের গুরুত্বহীন কাজ থেকে বেঁচে থাকা, যাতে কোনোরূপ উপকার নিহিত নেই।
অনুরূপভাবে একজন বুদ্ধিমান মুসলিম উপকারহীন খেলাকে উপকারী খেলায় রূপান্তরিত করে দিতে পারে। যেমন: কেউ দেখল, তার সন্তান হাতে উপকারহীন খেলনা নিয়ে একাকী খেলছে। তাহলে এটাকে সুবর্ণ সুযোগ ভেবে তার সন্তানের সাথে সেও খেলা শুরু করে দেবে। উদ্দেশ্য, তার নিকট প্রিয় হয়ে ওঠা এবং তাকে এটা উপলব্ধি করানো যে, তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাহলে উপকারহীন একটি খেলা থেকে এটি এমন এক খেলায় রূপান্তরিত হয়ে গেল, যেখানে পিতা তার সন্তানের নিকট প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। এতে পিতা কর্তৃক নসিহত, উপদেশ ইত্যাদির ক্ষেত্রে সন্তানের ওপর বেশ প্রভাব ফেলবে।

টিকাঃ
[২৯] একটি জায়গার নাম। নিরীক্ষক।
[৩০] আল-ইসতিকানা: ১/২৭৭

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 হালজামানায বিনোদনের অবস্থা

📄 হালজামানায বিনোদনের অবস্থা


হালজামানার বিনোদনের প্রকৃত অবস্থা নেহায়েত বেদনাদায়ক, যা একাধারে জীবন ধ্বংসের উপকরণ ও অর্থ নষ্টের মাধ্যম। উপরন্তু তা ইসলামি শরিয়তের পরিপূর্ণ লঙ্ঘন ও স্বতন্ত্রভাবে বহু অনর্থের মূল।
পশ্চিমাবিশ্ব কর্তৃক পরিচালিত নিম্নোক্ত পরিসংখ্যান থেকে জীবন ধ্বংসের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, মানুষ খেলাধুলাসহ বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় কাজে তার শৈশবের প্রথম পাঁচ বছরের ৪৪% ধ্বংস করে, ছয় থেকে ১১ বছরের মাঝে ২৬% নষ্ট করে, ১১-১৫ বছরের মাঝে ১৩% নষ্ট করে এবং ১৬ বছর থেকে নিয়ে সর্বোচ্চ বয়স পর্যন্ত ১৭% নষ্ট করে। প্রাচ্যের জনগণও পশ্চিমাদের এই ক্রীড়াআসক্তির অনুসরণ করে।
বর্তমান যুগে বিনোদনের পেছনে অর্থ ব্যয় এবং বাজেটের পরিমাণ থেকে অর্থ নষ্টের বিষয়টিও পরিষ্কার হয়ে যায়। নিচের পরিসংখ্যান থেকে এ বিষয়টিও মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
২০০০ সালের ব্যয় থেকে ৮% বৃদ্ধি পাওয়া ২০০১ সালের পরিসংখ্যান এটি। তো ২০০১ সালে আমেরিকায় কেবল ইলেকট্রিক খেলনাপণ্যের পেছনেই ব্যয় করা হয়েছে ৬,৩৫ বিলিয়ন ডলার এবং বিক্রি করা হয়েছে ২২৫ মিলিয়ন খেলার সরঞ্জামাদি।
বর্তমান যুগে সময় নষ্টকারী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক হচ্ছে ইলেকট্রিক খেলনাপণ্য, যেগুলোর একেকটি ম্যাচ শেষ করতে সুদীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। এই অনর্থক খেলা শেষ পর্যন্ত উপভোগ করতে অনেকেই ইলেকট্রিক যন্ত্রের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে।
হায়! যদি শরয়ি বিধানের প্রয়োগক্ষেত্রের আওতা-বহির্ভূত শিশুদের মাঝেই এই খেলাগুলো সীমিত থাকত, তাহলে আমরা বলতে পারতাম, বিনষ্ট সময় তার মূল্য হারালেও সময় নষ্টকারী শিশুরা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে না।
কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা! সময় নষ্ট করে জীবন বিধ্বংসকারী এই খেলার পেছনে যারা ব্যতিব্যস্ত, তাদের অধিকাংশই যুবক ও পরিণত বয়সের মানুষ। বরং কমার্শিয়াল ওয়াজ-নসিহতও তো কেবল সেসকল খেলোয়ারের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করা হয়, যারা খেলাকে উপার্জনের পেশা হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু শিশু, কিশোর, যুবক ও পরিণত বয়সের যেসকল মানুষ ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে খেলায় মাতোয়ারা থাকে, তাদের উদ্দেশে কোনো প্রকার ওয়াজ-নসিহত উৎসর্গিতই হয় না।
এই খেলা কেবল শিশুদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং পরিসংখ্যান তো বলে, যারা ইলেক্ট্রিক্যাল খেলায় মাতোয়ারা তাদের ৪০%-এর বয়স ৩৬ বছরের ওপর, ২৬%-এর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মাঝামাঝি এবং ৩৪%-এর বয়স ১৮ বছরের নিচে।
তবে খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে, বিনোদন কেবল এই প্রকারের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিসংখ্যান বলে যে, আমেরিকানরা প্রতি বছর ফিল্ম ও শর্ট ফিল্ম ভাড়ার পেছনে ১৬ বিলিয়ন ডলার এবং সিনেমার পেছনে ৮ বিলিয়ন ডলার, গানের ডিভিডি ক্রয় ও ভাড়ার পিছনে ১১ বিলিয়ন ডলার, এগুলো চালানোর যন্ত্রের পেছনে ২৫ বিলিয়ন ডলার, ভিডিও প্লেয়ারের যন্ত্রাংশের পেছনে ৯৬ বিলিয়ন ডলার, বাদ্যযন্ত্রের পেছনে ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এভাবে তারা বিনোদনের পেছনে অপরিমিতি অর্থ ব্যয় করে থাকে।
এর মধ্যে কিছু আছে সম্পূর্ণরূপে শরিয়ত-গর্হিত। যেগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। উপরন্তু সেগুলোর মাঝে সুকৌশলে আকিদাগত ও চারিত্রিক অধঃপতনের জীবাণু ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার শুরু হয় ক্রুশ হতে এবং শেষ হয় বাদ্যযন্ত্রে গিয়ে।
ক্রমাগত এভাবে চলতে চলতে সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে বিনোদন গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের রূপ পরিগ্রহ করেছে এবং স্বতন্ত্র একটি শিল্পের অবকাঠামো তৈরি করে ফেলেছে।
বিলিয়নাররা এখানে মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে আরম্ভ করে এর বহু আকার-প্রকার আবিষ্কার করেছে। তবে এর অধিকাংশই বিনিয়োগ করা হচ্ছে ইলেকট্রিক খেলাধুলার পেছনে, যার মধ্যে রয়েছে চলচ্চিত্র শিল্প, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক খেলা ইত্যাদি। বিশ্বের খ্যাতিমান বিলিয়নার ও মিলিয়নাররা এগুলোতে বিনিয়োগ করে থাকে। এগুলো আবার দু'একটি আকার-প্রকারের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এগুলোর আরও অগণিত কিসিম রয়েছে।
বর্তমানবিশ্বে এগুলোই বিনোদনের মৌলিক উপকরণ, যা নিঃসন্দেহে আমাদের দুর্ভাগ্যের কারণ। কারণ, এগুলো সম্পদ নষ্ট করার মাধ্যম এবং জীবন ধ্বংস করার মারণাস্ত্র।
শরিয়তের মূলনীতির আলোকে এগুলোকে নির্ধারিত সীমার গণ্ডিতে পরিব্যাপ্ত করা অসম্ভবপ্রায়। তদুপরি বেড়েই চলেছে বল্লাহারা, ভীতিহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। সময়-বয়স, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় এবং স্বাধীন-পরাধীন ভেদাভেদ ছাড়িয়ে এগুলো ছড়িয়ে পড়ছে সর্বমহলে-সর্বস্তরে। ইসলামের বিধি-নিষেধের আলোকে সেগুলোকে চালিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, জাগতিক দৃষ্টিকোণ বা যুক্তির আলোকেও এগুলোর বৈধতার কোনো সুযোগ নেই।

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 পাশ্চাত্যে অধিকমাত্রায় নোংরা বিনোদনের কারণ

📄 পাশ্চাত্যে অধিকমাত্রায় নোংরা বিনোদনের কারণ


পশ্চিমারা পরকালীন প্রতিদানের প্রত্যাশা যেমন করে না, পরকালের অস্তিত্বের ওপর বিশ্বাসও রাখে না। যদিও তাদের কেউ কেউ পরকালকে মেনে নেওয়ার দাবি করে, কিন্তু তাদের কর্মনীতি এর উল্টোটা প্রমাণ করে। এটা মুখরোচক কোনো দাবি নয়; বরং আমরা যা বলছি আমাদের প্রিয় কিতাব কুরআনে কারিমে তার সত্যায়ন রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
ذلِكَ بِأَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيٰوةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَ أَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الْكَفِرِينَ .
এটা এজন্য যে, তারা পার্থিব জীবনকে পরকালের চাইতে প্রিয় মনে করেছে এবং আল্লাহ তাআলা অবিশ্বাসীদের পথপ্রদর্শন করেন না। [সুরা আন-নাহল : ১০৭]
অনেকে তো পরিষ্কার ভাষায় বলে, জীবন তো একটাই, তাই মজা করে নাও। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوْتُ وَ نَحْيَا وَ مَا نَحْنُ بِمَبْعُوْثِينَ .
আমাদের পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও বাঁচি এখানেই। আর আমরা পুনরুত্থিত হব না। [সুরা আল-মুমিনুন : ৩৭]
এরাই ওই সকল মানুষ, যারা দুনিয়ার ওপর প্রাধান্য দেয়, দুনিয়ার জীবনেই যথাসম্ভব পরিপূর্ণ প্রাপ্তির লালসা করে এবং পরকালের ব্যাপারে তারা চরম উদাসীন। তারা মনেপ্রাণে কেবল দুনিয়াকেই চায়। জান্নাত ও জাহান্নাম তাদের কাছে গৌণ বিষয়। তাই তারা দৃশ্যমান দুনিয়াকেই চায়, কেবল শ্রুতিনির্ভর পরকালকে তারা অসম্ভব মনে করে। ঠিক যেমন নিকটতর চন্দ্র তাদের দূরবর্তী বিশাল নক্ষত্র থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছে, অনুরূপ তারা দুনিয়া দেখে আখিরাত ভুলে বসেছে। আল্লাহ তাআলাও আজাবস্বরূপ পার্থিব জীবনকে তাদের সামনে মোহনীয় করে উপস্থাপন করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا .
কাফিরদের জন্য পার্থিব জীবন সুশোভিত করে দেওয়া হয়েছে। [সুরা আল-বাকারা: ২১২]
যার কারণে দুনিয়ার পেছনে পড়ে তারা পাপাচারিতায় লিপ্ত হয়, দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদের কৃষ্ণসাগরে হাবুডুবু খায়, সঙ্গত বিষয়কে অসঙ্গত মনে করে, আর অন্যায় কাজকে ন্যায়সঙ্গত ভাবে। তবে হ্যাঁ, তারা কেবল সে অংশটুকুকেই বাস্তবানুগভাবে গ্রহণ করে, যতটুকু তাদের স্বার্থের অনুকূল হয় এবং তাদের খাহেশ পূরণে সহযোগী হয়। যেমন : আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় মুমিন বান্দাদের এই নশ্বর দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন-
وَمَا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ.
আর পার্থিব জীবন ধোঁকার সম্পদ ছাড়া কিছু নয়। [সুরা আলে ইমরান: ১৮৫]
অন্যত্র ইরশাদ করেছেন-
قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُوْنَ فَتِيْلًا .
(হে রাসুল), তাদের বলে দিন, পার্থিব সম্ভোগ তো সীমিত। মুত্তাকিদের জন্য আখিরাতই উত্তম। আর তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হবে না। [সুরা নিসা : ৭৭]
নিশ্চয় স্বভাবগতভাবে মানুষের আকর্ষণ সেসব বাহুল্য ও খেলাধুলার বস্তুর প্রতিই হয়ে থাকে, যেগুলো কাফিরদের হাতে রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অনেক রয়েছে সম্ভোগের ও সুন্দর, যার কারণে নফস সেগুলোর চাকচিক্যের দিকে আকর্ষিত হয়। কিন্তু আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা সেগুলো থেকে আমাদের নিষেধ করেছেন কঠিনভাবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيُوةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيْهِ ۖ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ
আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্যে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেসব বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। আপনার পালনকর্তার দেওয়া রিজিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী। [সুরা তহা: ১৩১]
হ্যাঁ, পার্থিব চাকচিক্য থেকে তাদের সম্ভোগ লাভ করা কেবল একটি পরীক্ষা। আর জান্নাত ও তার অভ্যন্তরীণ নিয়ামতরাজি হলো মৌলিক রিজিক ও উপঢৌকন এবং চিরস্থায়ী প্রতিদান, যা আল্লাহ তাআলা তার মুমিন বান্দাদের দান করবেন। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
أَيَحْسَبُوْنَ أَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِهِ مِنْ مَّالٍ وَبَنِيْنَ * نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ بَلْ لَّا يَشْعُرُونَ
'তারা কি মনে করে যে, তাদের জাগতিক প্রতিপত্তির কারণে আমি তাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে যাচ্ছি, যাতে করে তাদের দ্রুত মঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছি? বরং তারা বোঝে না।' [সুরা আল-মুমিনুন : ৫৫-৫৬]
তারা কি ভাবে, আল্লাহ তাআলা তাদের যেই সুখ-সম্ভোগ, রিজিক, সম্পদ ও সন্তান দান করেছেন, এগুলো তাদের পরিশুদ্ধতা ও আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তাদের ভালোবাসার কারণে? না, বাস্তবতা এমন নয়! বরং তারা পৃথিবীতে যে ভালো কাজগুলো করে, দুনিয়াতেই এগুলো তার নগদ প্রতিদান। আর কিয়ামতের দিন তারা এমনভাবে পুনরুত্থিত হবে, তাদের আমলনামায় কোনো নেকআমল অবশিষ্ট থাকবে না, থাকবে শুধু বদআমলের ফিরিস্তি আর নোংরা কালিমা।
অতএব, হে জ্ঞানী, আপনি যখন জানতে পারবেন, পার্থিব বিনোদন ও স্বাদ-আহ্লাদে ডুবে থাকার মতো গর্হিত কাজটি আখিরাতের প্রতি তাদের ইমান না থাকার ফলেই হচ্ছে, এই জীবনের পর চিরস্থায়ী আরেকটি জীবনের প্রতি বিশ্বাস না থাকার কারণেই নোংরামির এই তুফান চলছে; তাহলে কেন আপনি তাদের অন্ধ অনুকরণ করছেন? কেন তাদের অবৈধ বিনোদনের অনুগামী হচ্ছেন?

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 মুসলিম জনপদে বিনোদন

📄 মুসলিম জনপদে বিনোদন


বর্তমান বিশ্বের মুসলিম দেশের শহরগুলো প্রকাশ্য-গোপন, বাহ্যিক-অভ্যন্তরীণভাবে নানা প্রকার অবৈধ খেলাধুলা এবং বেহায়া-বেলেল্লাপনামূলক বাহুল্য কাজে ডুবে গেছে।
মুসলিম সমাজের অশ্লীলতায় ডুবে যাওয়ার কারণ
মুসলিম সমাজের এমন অশ্লীলতা ও নোংরামিতে ডুবে যাওয়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনেক কারণ-উপকরণ রয়েছে। সেগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি হলো-
১. অনুকরণপ্রিয়তা
অনুকরণকারী তার এই কাজে উৎসাহিত ও বাধ্য হওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো, নিজের মাঝে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে নষ্ট করা, ভ্রষ্টতা ও মূর্খতার নগ্ন আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে সেই আঘাতকে বুকে ধারণ করে চলতে থাকা।
পাশ্চাত্যজগত এটা খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে যে, বিনোদনের বিষয়গুলোই কেবল এমন মজবুত মাধ্যম, যার মাধ্যমে তারা আমাদের মুসলিমদের দ্বীন-ইসলাম ক্রয় করতে পারবে, মুসলিম উম্মাহর মনোবল ও সুপ্ত প্রতিভা অকেজো করে দিতে পারবে। সুতরাং তারা আমাদের মাঝে সেগুলোর প্রচার-প্রসারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং বাস্তবে তার প্রয়োগও করেছে। আর এর মাধ্যমেই তাদের ভ্রান্ত ও নোংরা আকিদাগুলো মুসলিমদের হৃদয়ে পুশ-ইন করছে।
যার ফলে আমাদের ছেলে-মেয়েরা নিজেদের শরীরে ক্রুসের ছবি অঙ্কন করছে, মদ পান করছে এবং নিজেদের আকিদা-বিশ্বাস নষ্ট করে ফেলছে। কিন্তু এগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার মতো শক্তি-সাহস তাদের হচ্ছে না; বরং উল্টো প্রতিটি বিষয়ে অবলীলায় তারা পাশ্চাত্যের অনুকরণ করছে।
এখানেই শেষ নয়; বরং পশ্চিমাদের অনুকরণ করে সিয়োনের রাষ্ট্রচালকদের প্রোটোকল পর্যন্ত তুলে নেওয়া হয়েছে।[৩১] বিদেশি সভ্যতা আমদানি ও প্রচারের নীতিমালারও তোয়াক্কা করা হচ্ছে না কোনোভাবেই।
এমনকি তারা সিংহভাগ মুসলিম জনগণের হৃদয় থেকে রাজনৈতিক মানসিকতা বের করার জন্য; বরং রাজনৈতির কর্ণধারদের প্রজনন শক্তিহীন খাসির মতো বানিয়ে ফেলার জন্য এবৎ রাজনৈতিক বিষয়টি মুসলিম সমাজে গুরুত্বহীন করে ফেলার জন্য পশ্চিমারা মুসলিম সমাজে নানা রকম বেহুদা কাজকর্মের আয়োজন করেছে। যার মধ্যে বিভিন্ন প্রকার খেলাধুলা, সিনেমা, থিয়েটার, কৌতুক, ম্যাজিকসহ এমনসব আবেদনময়ী বিষয়ের অবতারণা করেছে, যেগুলো মানুষকে বাস্তবতা থেকে ফিরিয়ে কেবল খেয়ালিপনায় অভ্যস্ত করে তোলে। কঠিন থেকে কঠিন বিপদের মুহূর্তে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে কেবল এই খেয়ালেই গা ভাসিয়ে দেয় যে, দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়! যার কারণে তারা জ্যোতিষী, গণক, কবিরাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের কথার ওপর ভরসা করে তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিজেকে কালের স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
সংস্কৃতি ও বিনোদনের নামে এসব বেহুদা কাজ একদিকে মানুষকে যেমন অকর্মণ্য করে ফেলে, অন্যদিকে তাদের মন-মস্তিষ্ককে করে ফেলে বিকারগ্রস্ত। নতুন কিছু তারা ভাবতে পারে না, সৃজনশীল কোনো সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করতে পারে না। কেবল অলৌকিক কিছু হয়ে যাওয়ার আশায় বুক বেঁধে থাকে। যার কারণে মৌখিক বা লিখিত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। জাতীয় পর্যায়ে বা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কিছু করার ব্যাপারটি তারা আর কল্পনা করতে চায় না, কল্পনা করতেও পারে না।
এভাবেই তারা চতুর্মুখী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আমাদের যুবকদের বিবেক-বুদ্ধি নিষ্ক্রিয় করে ফেলার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে পশ্চিমাদের যেকোনো চক্রান্ত প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে চলেছে।
২. মুসলিমদের সম্পদগুলো বিনষ্ট করা
আল্লাহ তাআলা নানা প্রকার নিয়ামত ও সম্পদ দিয়ে মুসলিমদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, যেগুলো তাদের ভূখণ্ড নিজ গর্ভে সংরক্ষণ করে রেখেছে। কাফিররা যেকোনোভাবেই হোক অবিরত সেগুলো দখল করার অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তারা বহুবার যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চরমভাবে। তাই তারা মুসলিমদের এই সম্পদগুলো দখল করার জন্য ভিন্ন পথে দাবার গুটি চালছে; এর প্রধান ও প্রথম গুটি হলো, মুসলিম জনপদগুলোকে এমনসব বেহুদা কাজে আটকে দেওয়া, যার অণুপরিমাণ প্রয়োজনও কোনো মুসলিম এবং তাদের জনপদগুলোর নেই।
এই পথে তারা অতীতের যুদ্ধগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সফল হয়েছে। ফলে তারা বাহারি রূপে সাজিয়ে আমাদের সামনে কল্যাণ ও অকল্যাণের এমন বহু দরজা খুলে দিয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে তারা আমাদের ওই সম্পদগুলো কুক্ষিগত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যেই সম্পদগুলো আমরা জীবন দিয়ে সংরক্ষণ করে রেখেছিলাম শতাব্দীর পর শতাব্দী।
৩. চারিত্রিক অবকাঠামোর দুর্বলতা বৃদ্ধি করা
পশ্চিমারা সর্বানাশা বিষ হিসেবে যেই জীবানুগুলো সর্বাগ্রে উপস্থাপন করেছে তা হলো, থিয়েটার, টিভিচ্যানেল, গান-বাজনা ও এমন সব বিনোদনমূলক ও ফুর্তিবাহক যন্ত্র, যেগুলো একদিকে তো চারিত্রিক অবক্ষয়ের দিকে ডাকে, অন্যদিকে আহ্বান করে আকিদা ও বিশ্বাসগত বিকৃতি ও পদস্খলনের দিকে।
অধিকাংশ ফিল্ম ও মুভি, যেগুলোর মাধ্যমে এই অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে, সেগুলোর নির্মাতা ও স্বত্বাধিকারী হলো ইহুদি সম্প্রদায়। এই নোংরা শিল্পের মাধ্যমে তাদের বড় টার্গেট, মুসলিমদের আখলাক নষ্ট করা এবং চারিত্রিক অবক্ষয় নিশ্চিত করা।
৪. খেলাধুলার মাধ্যমে মুক্তি ও দায়িত্বশীলতার বিশ্বাস চুরমার করা
খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে ও মনে রাখতে হবে যে, বিনোদনমূলক খেলাধুলার মাধ্যমে তারা যে অপপ্রয়াস চালাচ্ছে, এগুলো মুসলিমদের গুনাহমুক্ত থাকার ও দায়িত্বশীলতার চাবিকাঠি ইমান-আকিদা নষ্ট করার মূল নীলনকশার একটি রেখামাত্র।
মি. ওয়ালবার্ট স্মিথ বলেন, 'খেলাধুলা এটা প্রমাণ করেছে যে, তা দর্শনগতভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর গোঁড়া দুটি দলকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে এবং পরস্পরকে একে অপরের প্রতি দুর্বল করতে সহযোগী হয়। ১৯৫৯ সালে ইহুদিদের ইংরেজি পত্রিকার সংবাদের ভিত্তিতে আরবরা যখন সাধারণভাবে কুদস (বাইতুল মুকাদ্দাস) উদ্ধারের ঘোষণা দিল, ঠিক সেই সময় 'জামইয়্যাতুশ শুব্বানিল মাসিহিয়্যা' প্রতিষ্ঠিত হয়। যার এজেন্ডা ছিল আরব ও ইহুদিদের পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ করা; এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে উভয়ের মাঝে টেনিস খেলার আয়োজন করা হয়।
যেই খেলায় অংশগ্রহণকারী খেলোয়ারদের মাঝে মুসলিম ও ইহুদি উভয় জাতিই ছিল। খেলা উপভোগ করার জন্য সেখানে মাজলুম ফিলিস্তিনিরাও দর্শকদের কাতারে ছিল। শুধু কি তাই? না; বরং ফিলিস্তিনিরা ইংরেজ, আমেরিকান, আলমেনীয় ও রিয়াদের কর্ণধারদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে খেলা দেখেছে। খেলোয়াররা যখনই কোনো ভালো খেলা উপহার দিচ্ছিল, ইহুদিরা চিৎকার করে আরবদের সাধুবাদ জানাচ্ছিল। আবার ইহুদি খেলোয়াররা যখন ভালো কোনো খেলা উপহার দিচ্ছিল, আরবরা চিৎকার করে তাদের সাধুবাদ জানাচ্ছিল। এভাবে একসময় চা চক্রও চলেছিল। যেখানে প্রায় ৫০জন ফিলিস্তিনি, ইংরেজ ও সিয়োনিয়ান অংশগ্রহণ করেছিল। ৩২

টিকাঃ
[৩১] সিয়োনের ত্রিয়োদশ শাসকের প্রোটোকল তুলে নেওয়া হয়েছিল। মাউন্ট সিয়োন মূলত একটি পর্বতের নাম ছিল, যেখানে এখন জেবুসাইট দুর্গটি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু নামটি পরে দুর্গটির উত্তরে শুধু টেম্পল মাউন্টে প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা 'মাউন্ট মরিয়া' নামেও পরিচিত। মূলত 'সিয়োন কন্যা' অর্থাৎ, সিয়োন পাহাড়ের একটি প্রসারক হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক পরে দ্বিতীয় মন্দির যুগে নামটি শুধু একটি প্রাচীরের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি পাহাড়ে প্রয়োগ করা হয়েছিল। পরবর্তী এই পর্বতটি এখনো 'সিয়োন মাউন্ট' হিসেবে পরিচিত। ব্যাবিলনীয় নির্বাসন-এর দৃষ্টিকোণ থেকে সিয়োন সমগ্র জেরুসালেম শহরটির সমর্থক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। [উইকিপিডিয়া, সামান্য পরিমার্জিত] • সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00