📄 নববি যুগের বিনোদন পরিক্রমা
এবার আমরা জানার চেষ্টা করব যে, ইসলামের প্রথম যুগে বিনোদনের পথ ও পদ্ধতি কেমন ছিল। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কিরামের জীবনে বিনোদনের উপস্থিতি ছিল কি? তখন কি খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল? কোন পরিবেশে কীভাবে ছিল খেলাধুলার অনুমতি?
হাদিসের ভান্ডার অন্বেষণ করলে পাওয়া যায় যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রসিকতা করেছেন সত্য, তবে তা ছিল সত্য কথার মাধ্যমে। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবিগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাদের সাথে রসিকতা করছেন? জবাবে তিনি বললেন—
إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا . আমি সর্বদা সত্যকথাই বলি। [১৫]
তো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদিও রসিকতা ও কৌতুক করতেন, কিন্তু তার এই হাস্যরস ছিল শরিয়তের সীমারেখার ভেতরে অবস্থান করে। অন্যান্য মানুষের মতো মিথ্যার কোনো মিশ্রণ তাতে ছিল না। আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
وَاللَّهِ لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُومُ عَلَى بَابِ حُجْرَتِي وَالْحَبَشَةُ يَلْعَبُونَ بِحِرَابِهِمْ فِي مَسْجِدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتُرُنِي بِرِدَائِهِ لِكَيْ أَنْظُرَ إِلَى لَعِبِهِمْ ثُمَّ يَقُومُ مِنْ أَجْلِي حَتَّى أَكُونَ أَنَا الَّتِي أَنْصَرِفُ .
আল্লাহর কসম, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি, হাবশিরা যখন তার মসজিদে খেলত, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে তাঁর চাদর দ্বারা আমাকে আড়াল করে দাঁড়াতেন, যেন আমি তাদের খেলা দেখতে পারি। আমি ফিরে যাওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতেন। [১৬]
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেছেন, 'যুদ্ধবিষয়ক খেলা শুধু খেলাই ছিল না; বরং তার মাঝে যুদ্ধের ময়দানে বীরত্ব প্রদর্শন এবং শত্রুর মোকাবিলা করার প্রশিক্ষণ ছিল।
মুহাল্লাব রহ. বলেন, মসজিদ তৈরি করা হয়েছে মুসলিম জাতির জন্য। অতএব, দ্বীন ও দ্বীনের অনুসারীদের কল্যাণে যত কাজ হতে পারে, মসজিদে সেগুলোর সব জায়িজ আছে। হাদিস থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয়েছে যে, উপকারী বৈধ খেলা দেখাও জায়িজ। [১৭]
তো নবুওয়াতি যুগে এ ধরনের উপকারী খেলা ছিল। তবে এমন অনর্থক কোনো খেলা ছিল না, যদ্বারা কোনো উপকার হতো না। সে যুগে যদিও বাহ্যিকভাবে এগুলোকে খেলা মনে করা হতো, কিন্তু মৌলিকভাবে এগুলোর মাঝে থাকত সামরিক-কৌশলের প্রশিক্ষণ।
আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সফরে গিয়েছিলাম। তখন আমার বয়স ছিল খুব কম। আমি হালকা গঠনের দুরন্ত কিশোরী ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথিদের বললেন, তোমরা সামনে অগ্রসর হও। তারা সামনে অগ্রসর হলেন। এবার তিনি আমাকে বললেন, এসো, দৌড়পাল্লা দেবো। দৌড়পাল্লায় অংশগ্রহণ করে আমি বিজয়ী হলাম। এরপর এ নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কোনো কথা বললেন না।
কয়েক বছর পর। তখন আর আমি হালকা গড়নের সেই দুরন্ত কিশোরী নই, মোটা হয়ে গেছি। পূর্বের ওই দৌড়ের গল্পটাও তখন আমি মনে রাখিনি। এমন সময়ে আবারও এক সফরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে যাওয়ার সৌভাগ্য হলো আমার। পথিমধ্যে তিনি সাথিদের বললেন, তোমরা সামনে অগ্রসর হও। তারা সামনে অগ্রসর হলেন। এবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, এসো, দৌড়পাল্লা দেবো। আমি দৌড়পাল্লায় অংশগ্রহণ করলাম; কিন্তু এবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজয়ী হলেন। তখন তিনি মুচকি হেসে বললেন, এটা সেই আগের প্রতিযোগিতায় হারের প্রতিশোধ। [১৮]
এখানেই শেষ নয়; বরং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণের সাথে ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা করেছেন।
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রশিক্ষিত পাতলা দ্রুতগামী ঘোড়ার মাঝে প্রতিযোগিতা করেছেন, যার সূচনা হয়েছে হাফিইয়া থেকে এবং শেষ হয়েছে ওয়াদায় গিয়ে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপ্রশিক্ষিত মোটা ঘোড়ার মাঝেও প্রতিযোগিতা করেছেন, যার সূচনা হয়েছে সানিয়্যা থেকে এবং শেষ হয়েছে বনি জুরাইকের মসজিদে গিয়ে। [১৯]
হাদিসের মর্ম হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রকার ঘোড়ার সাথেই প্রতিযোগিতা করেছেন এবং সেগুলোতে বিজয়ীও হয়েছেন।
সালামা বিন আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-
مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى نَفَرٍ مِنْ أَسْلَمَ يَنْتَضِلُونَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ارْمُوا بَنِي إِسْمَاعِيلَ فَإِنَّ أَبَاكُمْ كَانَ رَامِيًا ارْمُوا وَأَنَا مَعَ بَنِي فُلَانٍ قَالَ فَأَمْسَكَ أَحَدُ الْفَرِيقَيْنِ بِأَيْدِيهِمْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَكُمْ لَا تَرْمُونَ قَالُوا كَيْفَ نَرْمِي وَأَنْتَ مَعَهُمْ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ارْمُوا فَأَنَا مَعَكُمْ كُلَّكُمْ .
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসলাম গোত্রের কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যারা পরস্পরে তির চালনা করছিল। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে বনি ইসমাইল, তোমরা তির নিক্ষেপ করো। কেননা, তোমাদের পিতা তিরন্দাজ ছিলেন। আর আমি অমুক বংশের সন্তান। বর্ণনাকারী বলেন, হঠাৎ দুদলের মধ্যে একদল লোক তির চালনা বন্ধ করে দিল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তির চালনা বন্ধ করলে কেন? তারা বলল, আপনি তাদের সাথে থাকা অবস্থায় আমরা কীভাবে তির নিক্ষেপ করতে পারি? তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তির চালাও! আমি তোমাদের সকলের সাথেই আছি।[২০]
তো এখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেলতে তো নিষেধ করলেনই না, উপরন্তু তাদের মাঝে ঢুকে গেলেন এবং পরস্পরকে প্রতিযোগিতায় উদ্বুদ্ধ করলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের দিকগুলো খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সেগুলোকে নখদর্পণে রাখতেন। সে বড় হোক বা ছোট, পুরুষ হোক বা নারী—এতে কোনো ফারাক করতেন না।
অশ্বারোহণ, তিরন্দাজি ও সাঁতার কাটা ইত্যাদি খেলাগুলো পুরুষের সাথে সামঞ্জস্যশীল। আর কিছু খেলা ছিল নারীদের সাথে সামঞ্জস্যশীল। যেমন: পুতুলখেলা, দোল খেলা ইত্যাদি। আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
تَزَوَّجَنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا بِنْتُ سِتَّ سِنِينَ فَقَدِمْنَا الْمَدِينَةَ فَنَزَلْنَا فِي بَنِي الْحَارِثِ بْنِ خَزْرَجٍ فَوُعِكْتُ فَتَمَرَّقَ شَعَرِي ... فَأَتَتْنِي أُنِّي أُمُّ رُومَانَ وَإِنِّي لَفِي أَرْجُوحَةٍ وَمَعِي صَوَاحِبُ لِي .
আমি যখন ছয় বছরের কন্যা ছিলাম তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বিয়ে করেছেন। এরপর আমরা মদিনায় হিজরত করে বনি হারিস বিন খাজরাজের গোত্রে গিয়ে অবস্থান করি। সেখানে আমি জ্বরে আক্রান্ত হলাম। এতে আমার চুল পড়ে গেল। ...অতঃপর আমার আম্মা উম্মে রুমান আমার কাছে এলেন। তখন আমি আমার বান্ধবীদের সাথে দোলনায় দোল খাচ্ছিলাম।
হাদিসটি অনেক দীর্ঘ। এটি বর্ণিত হয়েছে 'আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে বিদায়ের জন্য তৈরি করা' অধ্যায়ে। [২১]
তো আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা নববিযুগে তার বান্ধবীদের সাথে দোলনায় দোল খাচ্ছিলেন, কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিষেধ করেননি। নারীদের সাথে সামঞ্জস্যশীল আরেকটি খেলা হলো, পুতুল খেলা। আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন-
كُنْتُ أَلْعَبُ بِالْبَنَاتِ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانَ لِي صَوَاحِبُ يَلْعَبْنَ مَعِي فَكَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ يَتَقَطَّعْنَ مِنْهُ فَيُسَرِّبُهُنَّ إِلَيَّ فَيَلْعَبْنَ مَعِي .
আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে (তুলা বা কাপড় দিয়ে বানানো) পুতুল দিয়ে খেলা করতাম। আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলা করত। যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসতেন তারা পর্দার আড়ালে গিয়ে লুকাত। তিনি এসে আবারও তাদেরকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। তখন তারা আমার সাথে এসে খেলা করত। [২২]
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, এই হাদিসের মাধ্যমে মেয়েদের তাদের ঘরে পুতুল দিয়ে খেলা জায়িজ হওয়ার ওপর প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। তাদের খেলার এই পুতুলকে শরিয়তে নিষিদ্ধ প্রতিমা ও ছবি থেকে ব্যতিক্রম ধরা হয়েছে। তাদের জন্য পুতুল খেলাকে জায়িজ বলার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, শৈশব থেকেই তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা প্রদান করা হয়েছে যে, বড় হলে এভাবেই সন্তানসন্ততির প্রতিপালন করতে হবে।' [২৩]
এভাবেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার শিশু স্ত্রী আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহার স্বভাবগত আবেদনের প্রতি লক্ষ রেখেছেন এবং তাকে বান্ধবীদের সাথে খেলাধুলা করার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। সে যুগে যে পুতুলগুলো দিয়ে খেলা হতো, সেগুলো তুলা বা পশমের তৈরি হতো। যেগুলোর শুধু দুটি হাত, দুটি পা, মাথা ও শরীর থাকত। বর্তমান যুগের মতো পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তোলা চোখ, কান, নাক, মুখ ও আঙুল ইত্যাদি থাকত না।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে মহিলা সাহাবায়ে কিরামও তাদের সন্তানদেরকে এ ধরনের খেলনা দিয়ে খেলতে দিতেন এবং রোজার সময় ইফতার পর্যন্ত তাদের ভুলিয়ে রাখতেন।
রুবাইয়ি বিনতে মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন সকালে আনসারদের জনপদে এই বলে সংবাদ পাঠাতেন—
مَنْ أَصْبَحَ مُفْطِرًا فَلْيُتِمَّ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ وَمَنْ أَصْبَحَ صَائِمًا فَلْيَصُمْ قَالَتْ فَكُنَّا نَصُومُهُ بَعْدُ وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا وَنَجْعَلُ لَهُمْ اللَّعْبَةَ مِنْ الْعِهْنِ فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الْإِفْطَارِ.
যে ব্যক্তি রোজা রাখেনি সে যেন সারাদিন এভাবেই থাকে। আর যে রোজা রেখেছে সে যেন রোজা রাখে। রুবাইয়ি রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এরপর থেকে আমরা নিজেরাও রোজা রাখতাম এবং সন্তানদেরকেও রোজা রাখাতাম। তাদের জন্য তুলার খেলনা তৈরি করতাম। যখনই কেউ খাবারের জন্য কান্না করত, খেলার জন্য সেই খেলনাগুলো দিতাম। এভাবে ইফতার পর্যন্ত কাটাতাম। [২৪]
সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম দ্বীনি ফিকহের এক মহাসম্পদ পেয়েছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, প্রতিটি মুহূর্তের জন্য ইবাদত রয়েছে। প্রতিটি সময়ের জন্যই উপযোগী আমল রয়েছে, যার কারণে তারা সুযোগ করে বিশ্রাম নিতেন এবং ইবাদত করার জন্য ও ইলম অন্বেষণ করার জন্য নিজেকে সজীব, সতেজ ও স্পৃহমান করে নিতেন।
আলি বিন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—
روحوا القلوب ساعة فإنها إذا أكرهت عميت .
কিছু সময় কলবগুলোকে শান্তি দাও। কেননা, যখন তাকে অতিরিক্ত চাপ দেবে, সে অন্ধ হয়ে যাবে। [২৫]
আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
إني لأستجم ليكون أنشط لي في الحق .
আমি অবশ্যই বিনোদন করি; যেন তা হকের পথে কাজ করতে আমার জন্য অধিক উদ্যমতা সৃষ্টি করে। [২৬]
বকর বিন আবদুল্লাহ মাজানি রহ. বলেন-
كان أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم يتبادحون بالبطيخ ، فإذا كانت الحقائق كانوا هم الرجال .
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবিগণ তরমুজ (যা তৎকালীন যুগে বিরল ও আকর্ষণীয় ফল ছিল) খাওয়ার প্রতিযোগিতা করতেন। আবার বাস্তবজীবনে তারা সুপুরুষও ছিলেন।[২৭]
শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি রহ. এই বর্ণনাটিকে সহিহ বলেছেন। [২৮]
তাদের জীবনটা একেবারে যেমন বাহুল্য কাজে ভরা ছিল না, তেমনিভাবে পরিশ্রমের তিক্ততার জটও ছিল না; বরং উভয়ের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল সুনিপুণভাবে। তারা কর্মক্ষেত্রে সুপুরুষ হয়ে আবর্তিত হতেন, আবার কখনও বিনোদনের প্রয়োজন হলে রস-কৌতুকে মজে যেতেন।
পরবর্তী যুগের সালাফে সালিহিন, উলামায়ে কিরাম ও মাশায়িখে ইজাম সাহাবায়ে কিরামের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই চলেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ফুকাহায়ে কিরাম, মুহাদ্দিসিনে ইজাম তাদের ফিকহ, হাদিস ও ইলমের মজলিসে শাগরিদদেরকে কখনও কখনও বিরল প্রজাতির ফলমূল দ্বারা আপ্যায়ন করতেন, বনভোজনের আয়োজন করতেন, কবিতা ও গল্প-কাহিনির আসর জমাতেন। এগুলোর মাধ্যমে তারা চিত্তবিনোদনের স্বাদ উপভোগ করতেন।
আল্লামা ইরাকি তার 'আলফিয়া' গ্রন্থে লিখেছেন-
واستحسن الانشاد في الأواخر بعد الحكايات مع النوادر
'শেষে সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করা হয়েছে, নানারকম বিরল ঘটনা আলোচনার পর।'
টিকাঃ
[১৫] সুনানুত তিরমিজি শরিফ: ৭/২৬৭, হাদিস : ১৯১৩
[১৬] সহিহু মুসলিম: ৪/৪১৬, হাদিস : ১৪৮১
[১৭] ফাতহুল বারি: ১/৫৪৯
[১৮] মুসনাদু আহমাদ: ৫৩/২৩৩, হাদিস: ২৫০৭৫
[১৯] সহিহুল বুখারি : ২/১৮৮, হাদিস: ৪০৩
[২০] সহিহুল বুখারি : ১০/৩০, হাদিস: ২৬৮৪
[২১] সহিহুল বুখারি : ১২/২৮২, হাদিস : ৩৬০৫
[২২] সহিহুল বুখারি : ১৯/১৩, হাদিস : ৫৬৬৫
[২৩] ফাতহুল বারি: ১০/৫২৬
[২৪] সহিহুল বুখারি: ৭/৬৪, হাদিস: ১৮২৪
[২৫] ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ১/৩৮৫, ৩/৪৬৪
[২৬] সিয়ারু আলামিন-নুবালা : ৫/৪২১
[২৭] আল-আদাবুল মুফরাদ: ১/৪০৭
[২৮] সিলসিলাতুস-সহিহাহ: ১/৭৯৭, হাদিস: ৪৩৫
📄 বিনোদনের প্রকারভেদ
বিনোদনকে মোট তিন প্রকারে ভাগ করা যায়। যথা-
প্রথম প্রকার: ওই সমস্ত বিনোদন, একজন মানুষ তার দ্বীনি প্রয়োজন মেটানোর স্বার্থে যার প্রত্যাশী ও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। যেমন: ইতিপূর্বে হাদিসের আলোকে তিরন্দাজি ও অশ্বারোহণের বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে, যেন এগুলোর মাধ্যমে জিহাদের কলা- কৌশল ও বিচক্ষণতা অর্জন হয়।
এমনিভাবে স্ত্রীর সাথে খেলাধুলা করা। কেননা, এটা তার অধিকার। এর মাধ্যমে স্বামী- স্ত্রী উভয়ের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি হয় এবং হারাম চাহিদা থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।
এগুলোর মাঝে প্রত্যেক ওই আনন্দ-উল্লাসও অন্তর্ভুক্ত হবে, যার দ্বারা দ্বীনি উপকারের ইচ্ছা ও প্রত্যাশা করা হয়। যেমন: সাঁতার কাটা, দৌড় প্রতিযোগিতা, শরীরে শক্তি সঞ্চয়ে সহযোগী প্রতিটি প্রতিযোগিতা, সতর্কতা বৃদ্ধি, বোধগম্য শক্তির গতিবেগ বাড়ানো এবং বুঝশক্তি বৃদ্ধি ইত্যাদি।
সামুদ্রিক যুদ্ধে মুসলিম ডুবুরিরা বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। যেমন : সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির যুগে মুসলিম ডুবুরিরা খ্রিষ্টানদের জাহাজগুলোর পূর্বে কোনো একস্থানে ডুব দিতেন এবং (জাহাজের নিচ দিয়ে বা পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে) অন্য দিকে উপরে উঠে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পত্র, ব্যয়ভারের অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং সামরিক পত্রাদি অবরোধের শিকার আক্কাসহ [২৯] বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিতেন।
দ্বিতীয় প্রকার: ওই সমস্ত বিনোদন, যেগুলো মৌলিকভাবেই হারাম কিংবা তাতে হারামের সংমিশ্রণ থাকে। যেমন: এমন খেলা, যেগুলোতে ক্রুশ থাকে, বাজনা থাকে কিংবা জুয়া ইত্যাদি থাকে।
তো এই সমস্ত খেলা নিঃসন্দেহে হারাম। কোনো অবস্থাতেই এই খেলাগুলো জায়িজ নয়; বরং সর্বাবস্থায়ই হারাম।
তৃতীয় প্রকার: ওই সমস্ত খেলা, যেগুলোর মাঝে হারামের কোনো সংমিশ্রণও নেই, আবার দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো উপকারিতাও নেই। এ ধরনের খেলাকেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাতিল বা অনর্থক বলে অভিহিত করেছেন। অতএব, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কোনো মুসলিম এমন খেলার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে না।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'বাতিল বলে ওই সমস্ত কাজ বুঝানো হয়েছে, যেগুলোর মাঝে কোনো উপকারিতা নেই। এ ধরনের কাজ কেবল তার জন্যই করার অনুমতি আছে, যার উপকারী কাজ করার ধৈর্য নেই।'[৩০]
উদাহরণস্বরূপ আমাদের সন্তানদের হাতে এমন কিছু ইলেকট্রিক খেলনাসামগ্রী দেখা যায়, যাতে হারাম কিছু পাওয়া যায় না, আবার তাতে বাচ্চাদের কোনো উপকারিতাও নিহিত নেই। তাহলে এটা হলো বাতিল খেলার উপকরণ, যাদ্বারা কারোরই খেলা উচিত নয়। অতএব, শিশুসন্তান যখন এ ধরনের খেলনা দেখে তাদ্বারা খেলতে উদগ্রীব হয়ে উঠবে এবং এটা নিয়ে জোরাজুরি করবে, তখন তার অভিভাবক তাকে তা দিয়ে দেবে। অতঃপর চেষ্টা করবে, যেন তা ছেড়ে সে অন্যান্য উপকারী খেলনা দিয়ে খেলে।
সুতরাং একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো, নিজের উন্নতিসাধন করা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখা, সাহসী হওয়া; অতঃপর আমাদের সময়ে বিদ্যমান সব ধরনের গুরুত্বহীন কাজ থেকে বেঁচে থাকা, যাতে কোনোরূপ উপকার নিহিত নেই।
অনুরূপভাবে একজন বুদ্ধিমান মুসলিম উপকারহীন খেলাকে উপকারী খেলায় রূপান্তরিত করে দিতে পারে। যেমন: কেউ দেখল, তার সন্তান হাতে উপকারহীন খেলনা নিয়ে একাকী খেলছে। তাহলে এটাকে সুবর্ণ সুযোগ ভেবে তার সন্তানের সাথে সেও খেলা শুরু করে দেবে। উদ্দেশ্য, তার নিকট প্রিয় হয়ে ওঠা এবং তাকে এটা উপলব্ধি করানো যে, তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাহলে উপকারহীন একটি খেলা থেকে এটি এমন এক খেলায় রূপান্তরিত হয়ে গেল, যেখানে পিতা তার সন্তানের নিকট প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। এতে পিতা কর্তৃক নসিহত, উপদেশ ইত্যাদির ক্ষেত্রে সন্তানের ওপর বেশ প্রভাব ফেলবে।
টিকাঃ
[২৯] একটি জায়গার নাম। নিরীক্ষক।
[৩০] আল-ইসতিকানা: ১/২৭৭
📄 হালজামানায বিনোদনের অবস্থা
হালজামানার বিনোদনের প্রকৃত অবস্থা নেহায়েত বেদনাদায়ক, যা একাধারে জীবন ধ্বংসের উপকরণ ও অর্থ নষ্টের মাধ্যম। উপরন্তু তা ইসলামি শরিয়তের পরিপূর্ণ লঙ্ঘন ও স্বতন্ত্রভাবে বহু অনর্থের মূল।
পশ্চিমাবিশ্ব কর্তৃক পরিচালিত নিম্নোক্ত পরিসংখ্যান থেকে জীবন ধ্বংসের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, মানুষ খেলাধুলাসহ বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় কাজে তার শৈশবের প্রথম পাঁচ বছরের ৪৪% ধ্বংস করে, ছয় থেকে ১১ বছরের মাঝে ২৬% নষ্ট করে, ১১-১৫ বছরের মাঝে ১৩% নষ্ট করে এবং ১৬ বছর থেকে নিয়ে সর্বোচ্চ বয়স পর্যন্ত ১৭% নষ্ট করে। প্রাচ্যের জনগণও পশ্চিমাদের এই ক্রীড়াআসক্তির অনুসরণ করে।
বর্তমান যুগে বিনোদনের পেছনে অর্থ ব্যয় এবং বাজেটের পরিমাণ থেকে অর্থ নষ্টের বিষয়টিও পরিষ্কার হয়ে যায়। নিচের পরিসংখ্যান থেকে এ বিষয়টিও মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
২০০০ সালের ব্যয় থেকে ৮% বৃদ্ধি পাওয়া ২০০১ সালের পরিসংখ্যান এটি। তো ২০০১ সালে আমেরিকায় কেবল ইলেকট্রিক খেলনাপণ্যের পেছনেই ব্যয় করা হয়েছে ৬,৩৫ বিলিয়ন ডলার এবং বিক্রি করা হয়েছে ২২৫ মিলিয়ন খেলার সরঞ্জামাদি।
বর্তমান যুগে সময় নষ্টকারী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক হচ্ছে ইলেকট্রিক খেলনাপণ্য, যেগুলোর একেকটি ম্যাচ শেষ করতে সুদীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। এই অনর্থক খেলা শেষ পর্যন্ত উপভোগ করতে অনেকেই ইলেকট্রিক যন্ত্রের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে।
হায়! যদি শরয়ি বিধানের প্রয়োগক্ষেত্রের আওতা-বহির্ভূত শিশুদের মাঝেই এই খেলাগুলো সীমিত থাকত, তাহলে আমরা বলতে পারতাম, বিনষ্ট সময় তার মূল্য হারালেও সময় নষ্টকারী শিশুরা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে না।
কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা! সময় নষ্ট করে জীবন বিধ্বংসকারী এই খেলার পেছনে যারা ব্যতিব্যস্ত, তাদের অধিকাংশই যুবক ও পরিণত বয়সের মানুষ। বরং কমার্শিয়াল ওয়াজ-নসিহতও তো কেবল সেসকল খেলোয়ারের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করা হয়, যারা খেলাকে উপার্জনের পেশা হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু শিশু, কিশোর, যুবক ও পরিণত বয়সের যেসকল মানুষ ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে খেলায় মাতোয়ারা থাকে, তাদের উদ্দেশে কোনো প্রকার ওয়াজ-নসিহত উৎসর্গিতই হয় না।
এই খেলা কেবল শিশুদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং পরিসংখ্যান তো বলে, যারা ইলেক্ট্রিক্যাল খেলায় মাতোয়ারা তাদের ৪০%-এর বয়স ৩৬ বছরের ওপর, ২৬%-এর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মাঝামাঝি এবং ৩৪%-এর বয়স ১৮ বছরের নিচে।
তবে খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে, বিনোদন কেবল এই প্রকারের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিসংখ্যান বলে যে, আমেরিকানরা প্রতি বছর ফিল্ম ও শর্ট ফিল্ম ভাড়ার পেছনে ১৬ বিলিয়ন ডলার এবং সিনেমার পেছনে ৮ বিলিয়ন ডলার, গানের ডিভিডি ক্রয় ও ভাড়ার পিছনে ১১ বিলিয়ন ডলার, এগুলো চালানোর যন্ত্রের পেছনে ২৫ বিলিয়ন ডলার, ভিডিও প্লেয়ারের যন্ত্রাংশের পেছনে ৯৬ বিলিয়ন ডলার, বাদ্যযন্ত্রের পেছনে ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এভাবে তারা বিনোদনের পেছনে অপরিমিতি অর্থ ব্যয় করে থাকে।
এর মধ্যে কিছু আছে সম্পূর্ণরূপে শরিয়ত-গর্হিত। যেগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। উপরন্তু সেগুলোর মাঝে সুকৌশলে আকিদাগত ও চারিত্রিক অধঃপতনের জীবাণু ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার শুরু হয় ক্রুশ হতে এবং শেষ হয় বাদ্যযন্ত্রে গিয়ে।
ক্রমাগত এভাবে চলতে চলতে সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে বিনোদন গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের রূপ পরিগ্রহ করেছে এবং স্বতন্ত্র একটি শিল্পের অবকাঠামো তৈরি করে ফেলেছে।
বিলিয়নাররা এখানে মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে আরম্ভ করে এর বহু আকার-প্রকার আবিষ্কার করেছে। তবে এর অধিকাংশই বিনিয়োগ করা হচ্ছে ইলেকট্রিক খেলাধুলার পেছনে, যার মধ্যে রয়েছে চলচ্চিত্র শিল্প, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক খেলা ইত্যাদি। বিশ্বের খ্যাতিমান বিলিয়নার ও মিলিয়নাররা এগুলোতে বিনিয়োগ করে থাকে। এগুলো আবার দু'একটি আকার-প্রকারের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এগুলোর আরও অগণিত কিসিম রয়েছে।
বর্তমানবিশ্বে এগুলোই বিনোদনের মৌলিক উপকরণ, যা নিঃসন্দেহে আমাদের দুর্ভাগ্যের কারণ। কারণ, এগুলো সম্পদ নষ্ট করার মাধ্যম এবং জীবন ধ্বংস করার মারণাস্ত্র।
শরিয়তের মূলনীতির আলোকে এগুলোকে নির্ধারিত সীমার গণ্ডিতে পরিব্যাপ্ত করা অসম্ভবপ্রায়। তদুপরি বেড়েই চলেছে বল্লাহারা, ভীতিহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। সময়-বয়স, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় এবং স্বাধীন-পরাধীন ভেদাভেদ ছাড়িয়ে এগুলো ছড়িয়ে পড়ছে সর্বমহলে-সর্বস্তরে। ইসলামের বিধি-নিষেধের আলোকে সেগুলোকে চালিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, জাগতিক দৃষ্টিকোণ বা যুক্তির আলোকেও এগুলোর বৈধতার কোনো সুযোগ নেই।
📄 পাশ্চাত্যে অধিকমাত্রায় নোংরা বিনোদনের কারণ
পশ্চিমারা পরকালীন প্রতিদানের প্রত্যাশা যেমন করে না, পরকালের অস্তিত্বের ওপর বিশ্বাসও রাখে না। যদিও তাদের কেউ কেউ পরকালকে মেনে নেওয়ার দাবি করে, কিন্তু তাদের কর্মনীতি এর উল্টোটা প্রমাণ করে। এটা মুখরোচক কোনো দাবি নয়; বরং আমরা যা বলছি আমাদের প্রিয় কিতাব কুরআনে কারিমে তার সত্যায়ন রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
ذلِكَ بِأَنَّهُمُ اسْتَحَبُّوا الْحَيٰوةَ الدُّنْيَا عَلَى الْآخِرَةِ وَ أَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِى الْقَوْمَ الْكَفِرِينَ .
এটা এজন্য যে, তারা পার্থিব জীবনকে পরকালের চাইতে প্রিয় মনে করেছে এবং আল্লাহ তাআলা অবিশ্বাসীদের পথপ্রদর্শন করেন না। [সুরা আন-নাহল : ১০৭]
অনেকে তো পরিষ্কার ভাষায় বলে, জীবন তো একটাই, তাই মজা করে নাও। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
إِنْ هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوْتُ وَ نَحْيَا وَ مَا نَحْنُ بِمَبْعُوْثِينَ .
আমাদের পার্থিব জীবনই একমাত্র জীবন। আমরা মরি ও বাঁচি এখানেই। আর আমরা পুনরুত্থিত হব না। [সুরা আল-মুমিনুন : ৩৭]
এরাই ওই সকল মানুষ, যারা দুনিয়ার ওপর প্রাধান্য দেয়, দুনিয়ার জীবনেই যথাসম্ভব পরিপূর্ণ প্রাপ্তির লালসা করে এবং পরকালের ব্যাপারে তারা চরম উদাসীন। তারা মনেপ্রাণে কেবল দুনিয়াকেই চায়। জান্নাত ও জাহান্নাম তাদের কাছে গৌণ বিষয়। তাই তারা দৃশ্যমান দুনিয়াকেই চায়, কেবল শ্রুতিনির্ভর পরকালকে তারা অসম্ভব মনে করে। ঠিক যেমন নিকটতর চন্দ্র তাদের দূরবর্তী বিশাল নক্ষত্র থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছে, অনুরূপ তারা দুনিয়া দেখে আখিরাত ভুলে বসেছে। আল্লাহ তাআলাও আজাবস্বরূপ পার্থিব জীবনকে তাদের সামনে মোহনীয় করে উপস্থাপন করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا .
কাফিরদের জন্য পার্থিব জীবন সুশোভিত করে দেওয়া হয়েছে। [সুরা আল-বাকারা: ২১২]
যার কারণে দুনিয়ার পেছনে পড়ে তারা পাপাচারিতায় লিপ্ত হয়, দুনিয়ার স্বাদ-আহ্লাদের কৃষ্ণসাগরে হাবুডুবু খায়, সঙ্গত বিষয়কে অসঙ্গত মনে করে, আর অন্যায় কাজকে ন্যায়সঙ্গত ভাবে। তবে হ্যাঁ, তারা কেবল সে অংশটুকুকেই বাস্তবানুগভাবে গ্রহণ করে, যতটুকু তাদের স্বার্থের অনুকূল হয় এবং তাদের খাহেশ পূরণে সহযোগী হয়। যেমন : আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় মুমিন বান্দাদের এই নশ্বর দুনিয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন-
وَمَا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ.
আর পার্থিব জীবন ধোঁকার সম্পদ ছাড়া কিছু নয়। [সুরা আলে ইমরান: ১৮৫]
অন্যত্র ইরশাদ করেছেন-
قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُوْنَ فَتِيْلًا .
(হে রাসুল), তাদের বলে দিন, পার্থিব সম্ভোগ তো সীমিত। মুত্তাকিদের জন্য আখিরাতই উত্তম। আর তোমাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও জুলুম করা হবে না। [সুরা নিসা : ৭৭]
নিশ্চয় স্বভাবগতভাবে মানুষের আকর্ষণ সেসব বাহুল্য ও খেলাধুলার বস্তুর প্রতিই হয়ে থাকে, যেগুলো কাফিরদের হাতে রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অনেক রয়েছে সম্ভোগের ও সুন্দর, যার কারণে নফস সেগুলোর চাকচিক্যের দিকে আকর্ষিত হয়। কিন্তু আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলা সেগুলো থেকে আমাদের নিষেধ করেছেন কঠিনভাবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيُوةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيْهِ ۖ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ
আমি এদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্যে পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেসব বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। আপনার পালনকর্তার দেওয়া রিজিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী। [সুরা তহা: ১৩১]
হ্যাঁ, পার্থিব চাকচিক্য থেকে তাদের সম্ভোগ লাভ করা কেবল একটি পরীক্ষা। আর জান্নাত ও তার অভ্যন্তরীণ নিয়ামতরাজি হলো মৌলিক রিজিক ও উপঢৌকন এবং চিরস্থায়ী প্রতিদান, যা আল্লাহ তাআলা তার মুমিন বান্দাদের দান করবেন। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
أَيَحْسَبُوْنَ أَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِهِ مِنْ مَّالٍ وَبَنِيْنَ * نُسَارِعُ لَهُمْ فِي الْخَيْرَاتِ بَلْ لَّا يَشْعُرُونَ
'তারা কি মনে করে যে, তাদের জাগতিক প্রতিপত্তির কারণে আমি তাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে যাচ্ছি, যাতে করে তাদের দ্রুত মঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছি? বরং তারা বোঝে না।' [সুরা আল-মুমিনুন : ৫৫-৫৬]
তারা কি ভাবে, আল্লাহ তাআলা তাদের যেই সুখ-সম্ভোগ, রিজিক, সম্পদ ও সন্তান দান করেছেন, এগুলো তাদের পরিশুদ্ধতা ও আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তাদের ভালোবাসার কারণে? না, বাস্তবতা এমন নয়! বরং তারা পৃথিবীতে যে ভালো কাজগুলো করে, দুনিয়াতেই এগুলো তার নগদ প্রতিদান। আর কিয়ামতের দিন তারা এমনভাবে পুনরুত্থিত হবে, তাদের আমলনামায় কোনো নেকআমল অবশিষ্ট থাকবে না, থাকবে শুধু বদআমলের ফিরিস্তি আর নোংরা কালিমা।
অতএব, হে জ্ঞানী, আপনি যখন জানতে পারবেন, পার্থিব বিনোদন ও স্বাদ-আহ্লাদে ডুবে থাকার মতো গর্হিত কাজটি আখিরাতের প্রতি তাদের ইমান না থাকার ফলেই হচ্ছে, এই জীবনের পর চিরস্থায়ী আরেকটি জীবনের প্রতি বিশ্বাস না থাকার কারণেই নোংরামির এই তুফান চলছে; তাহলে কেন আপনি তাদের অন্ধ অনুকরণ করছেন? কেন তাদের অবৈধ বিনোদনের অনুগামী হচ্ছেন?