📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 ইসলামি শরিয়তে বিনোদন

📄 ইসলামি শরিয়তে বিনোদন


মনুষ্যস্বভাব সর্বদা একই ব্যস্ততার মাঝে জড়িয়ে থাকতে ভালোবাসে না। এটা সে মেনে নিতে পারে না; বরং চেষ্টা ও সাধনার বিভিন্ন দিকে ঘুরতে-ফিরতে ভালোবাসে। কখনও এখানে, তো কখনও সেখানে; এভাবে পরিবর্তন হতে তার ভালো লাগে। আবার সর্বদা শুধু কাজ করতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। যেমন : সর্বদা সে রসিকতা পছন্দ করে না; বরং কখনও কাজ করবে, আবার কখনও রসিকতা করবে। এটাই মানুষের স্বভাবজাত কামনা-বাসনা, আর এভাবেই সে সফলতার পথ বেয়ে চলবে।
হানজালা উসাইদি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার সাথে সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ হানজালা? আমি বললাম, হানজালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে!
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তুমি কী বলছ এটা?
আমি বললাম, আমরা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে থাকি, তখন তিনি আমাদেরকে জান্নাত-জাহান্নামের কথা এমনভাবে স্মরণ করিয়ে দেন, যেন আমরা স্বচক্ষে তা দেখি। আর যখন তাঁর দরবার থেকে চলে আসি তখন স্ত্রী, সন্তান ও দুনিয়ার মোহ আমাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তখন আমরা অধিকাংশই জান্নাত-জাহান্নামের কথা ভুলে যাই।
আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর শপথ, আমারও তো এমন হয়। অতঃপর আমি এবং আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে হাজির হলাম। অতঃপর বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, হানজালা তো মুনাফিক হয়ে গেছে!
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কী?
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা যখন আপনার কাছে অবস্থান করি, তখন আপনি আমাদেরকে জান্নাত-জাহান্নামের কথা এমনভাবে স্মরণ করিয়ে দেন, যেন আমরা তা স্বচক্ষে দেখি। কিন্তু যখন আপনার দরবার থেকে চলে যাই, তখন স্ত্রী, সন্তান ও দুনিয়ার মোহে পড়ে সবকিছু ভুলে যাই। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ إِنْ لَوْ تَدُومُونَ عَلَى مَا تَكُونُونَ عِنْدِي وَفِي الذِّكْرِ لَصَافَحَتْكُمُ الْمَلَائِكَةُ عَلَى فُرُشِكُمْ وَفِي طُرُقِكُمْ وَلَكِنْ يَا حَنْظَلَةُ سَاعَةً وَسَاعَةً ثَلَاثَ مَرَّاتٍ .
ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আমার কাছে অবস্থানকালে তোমরা যে অবস্থায় থাকো, যদি সর্বদাই এমন অবস্থায় থাকতে এবং আখিরাতের স্মরণ করতে, তাহলে ফেরেশতারা তোমাদের বিছানায় ও রাস্তায় তোমাদের সাথে মুসাফাহা করত। কিন্তু হে হানজালা, (মনে রেখো, এটা সম্ভব নয়; বরং) কিছু সময় এমন হবে, আর কিছু সময় অমন হবে। কথাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনবার বললেন।[১২]
আল্লামা মুবারকপুরি রহ. বলেন, 'অতএব, কোনো বান্দা কখনও মনোযোগসম্পন্ন থাকলে এবং কখনও অমনোযোগী থাকলে মুনাফিক হয়ে যায় না। মনোযোগের সময় আপনারা নিজেদের প্রতিপালকের হক আদায় করুন এবং অমনোযোগিতার সময় নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয় পূরণ করুন।[১৩]
অতএব, আলোচ্য হাদিসের মাঝে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরিষ্কার স্বীকারোক্তি রয়েছে যে, মানুষের হৃদয় কষ্ট ও সাধনার প্রাক্কালে এবং ইবাদতের সময়ে একদিকে আবিষ্ট থাকে, আর বিরক্তিপূর্ণ অবকাশের সময় অন্য দিকে ঝুঁকে থাকে।
নিশ্চয় নফসের কর্মক্ষমতারও একটি নির্ধারিত সীমারেখা রয়েছে। সেই সীমা যখন পার হয়ে যায়, তখন সে বিনোদন ও ফুর্তির মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।
ইবনে মুফলিহ রহ. বলেন, 'আল-ফুনুন' গ্রন্থে বলা হয়েছে, কোনো কোনো গবেষক বলেছেন যে, শরিয়তের ব্যাপারে অর্বাচিন ওই লোকদের ব্যাপারে কী বলব তা আমি জানি না, যারা শরিয়তের ব্যাপারে এমন এমন কথা বলে, শরিয়ত ও যুক্তি কোনোটিই যার আবেদন সমর্থন করে না। তারা অধিকাংশ জায়িজ বিষয়ের নিন্দাবাদ জ্ঞাপন করে এবং সেগুলো পরিহারকারীদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকে।
এমনকি তারা অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়াকে, বিবাহ-শাদি করাকে, শরিয়ত ও যুক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে মেধাশক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করাকে, গবেষণা করাকে, কুরআন-সুন্নাহ এবং যুক্তির আলোকে প্রমাণ উপস্থাপন করাকে, সাধনা ও ধ্যান করাকে, মজবুতরূপে কুরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরাকে এবং শেষ প্রতিফলের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাকে বাহুল্য মনে করে পরিত্যাগ করেছে।
অথচ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমার সাথে খেলেছেন, তাদের সাথে রসিকতা করেছেন, আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা সাথে দৌড়াদৌড়ি করেছেন এবং অন্যান্য স্ত্রীদের সাথেও আনন্দ-ফুর্তি করেছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, জ্ঞানী মানুষ যখন তার স্ত্রী ও দাসীদের সাথে একান্তে মিলিত হয়, তখন জ্ঞানকে ঘরের কোণে রেখে দিয়ে তাদের সাথে রসিকতা করে, কৌতুক করে এবং আনন্দ-ফুর্তি করে। এমন আচরণের মাধ্যমে সে স্ত্রী ও দাসীদের অধিকার প্রদান করে। আর যখন সে শিশুদের মাঝে যায় তখন সে নিজেও শিশুদের মতো হয়ে যায়।' [১৪]
তবে আমার আলোচনার মর্ম কখনও এমন নয় যে, মানুষ পাগলের রূপ ধারণ করবে। বরং আমার কথার উদ্দেশ্য হলো, সে যখন তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব মূলতবি রাখবে তখন স্ত্রী ও সন্তানদের অনুকূল রূপ ধারণ করবে।
সুতরাং ওই আলিম, যার মাঝে মায়া-মমতা ও ভাব-গাম্ভীর্যের সমাহার থাকবে, সে নিজ দায়িত্ব পূর্ণ করে যখন পরিবারের মাঝে ফিরবে, তখন মায়া-মমতার দিক অবলম্বন করবে নাকি ভাব-গাম্ভীর্যের দিক অবলম্বন করবে? তো এমতাবস্থায় তার কর্তব্য হবে, শিশুদের অনুকূল রূপ ধারণ করা এবং ভাব-গাম্ভীর্যের দিককে উপেক্ষা করে শিশুদের সাথে রসিকতা ও হাসি-ঠাট্টা করা।
এমনিভাবে নারীরাও স্বামীদের সাথে খোলা মনে কথাবার্তা বলার, গল্পগুজব করার, হাসি-রসিকতা করার এবং তাদের মাঝে নির্বিঘ্ন সময় কাটানোর মুখাপেক্ষী হয়। কেননা, পুরুষদের তুলনায় নারীদের জ্ঞান কম। তারা দীর্ঘ সময় কষ্ট সহ্য করতে পারে না। অতএব, পুরুষদের দায়িত্ব হলো, তাদের সাথে কাটানোর জন্য আলাদা সময় বের করে তাদের মাঝে ব্যয় করা।
এ জন্যই তো শরিয়ত বিয়ের মুহূর্তে ছোট শিশুদের মাধ্যমে দফ বাজানোর বৈধতা প্রদান করেছে। কারণ, তাদের স্বভাবকে স্বামীর অনুকূল করে তৈরি করার জন্য কিছুটা আনন্দ-ফুর্তির প্রয়োজন রয়েছে, যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। এ জন্যেই শরিয়ত তাদের জন্য সীমিত পর্যায়ে এই শিথিলতা প্রদান করেছে।
অতএব, ইসলাম বিনোদনের ব্যাপারে মধ্যমপন্থার সমর্থক ও আহ্বায়ক, যা একদিকে যেমন নির্ধারিত সীমারেখার প্রতি লক্ষ রাখবে, তেমনিভাবে আত্মিক প্রয়োজনের প্রতিও লক্ষ রাখবে।
ইসলাম কখনও এই অবাধ-অধিকারকে সমর্থন করে না যে, কোনো মানুষ শাহেনশাহের ন্যায় বুক ফুলিয়ে যথেচ্ছা জমিনে বিচরণ করবে; বরং তার ধাতুগত অবকাঠামো, আত্মিক ও জ্ঞানগত মাত্রা এবং প্রবৃত্তিগত গঠনপ্রণালীর প্রতি লক্ষ রেখে নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতার অধীনে চলার অনুমতি দেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَ الْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَ الْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَ الْأَنْعَامِ وَ الْحَرْثِ ذُلِكَ مَتَاعُ الْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَاللهُ عِنْدَهُ حُسْنُ الْمَابِ.
মানবকুলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তানসন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য, চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত-খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এ সবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর নিকটই রয়েছে উত্তম আশ্রয়। [সুরা আলে ইমরান : ১৪]
কিন্তু মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা আয়াতের শেষদিকে খুব ভালোভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, এ সবই হচ্ছে পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই রয়েছে উত্তম আশ্রয় ও বিনিময়।
অতএব, হারাম প্রবৃত্তির মাঝে ডুব দেওয়া তো যাবেই না, অনুরূপ আল্লাহর জিকির থেকে দূরে গিয়ে হালাল প্রবৃত্তিতেও ডুব দেওয়া যাবে না; বরং আল্লাহর বিধি-নিষেধ ঠিক রেখে তবেই হালাল প্রবৃত্তির ছোট্ট সরোবরে আনন্দ করবে।

টিকাঃ
[১২] সহিহ মুসলিম: ১৩/৩০৩-হাদিস: ৪৯৩৭
[১৩] তুহফাতুল আহওয়াজি : ৭/১৮৪
[১৪] আল-আদাবুশ শারইয়্যা: ৩/২২৮

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 নববি যুগের বিনোদন পরিক্রমা

📄 নববি যুগের বিনোদন পরিক্রমা


এবার আমরা জানার চেষ্টা করব যে, ইসলামের প্রথম যুগে বিনোদনের পথ ও পদ্ধতি কেমন ছিল। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কিরামের জীবনে বিনোদনের উপস্থিতি ছিল কি? তখন কি খেলাধুলার ব্যবস্থা ছিল? কোন পরিবেশে কীভাবে ছিল খেলাধুলার অনুমতি?
হাদিসের ভান্ডার অন্বেষণ করলে পাওয়া যায় যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রসিকতা করেছেন সত্য, তবে তা ছিল সত্য কথার মাধ্যমে। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবিগণ আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাদের সাথে রসিকতা করছেন? জবাবে তিনি বললেন—
إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا . আমি সর্বদা সত্যকথাই বলি। [১৫]
তো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদিও রসিকতা ও কৌতুক করতেন, কিন্তু তার এই হাস্যরস ছিল শরিয়তের সীমারেখার ভেতরে অবস্থান করে। অন্যান্য মানুষের মতো মিথ্যার কোনো মিশ্রণ তাতে ছিল না। আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—
وَاللَّهِ لَقَدْ رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُومُ عَلَى بَابِ حُجْرَتِي وَالْحَبَشَةُ يَلْعَبُونَ بِحِرَابِهِمْ فِي مَسْجِدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْتُرُنِي بِرِدَائِهِ لِكَيْ أَنْظُرَ إِلَى لَعِبِهِمْ ثُمَّ يَقُومُ مِنْ أَجْلِي حَتَّى أَكُونَ أَنَا الَّتِي أَنْصَرِفُ .
আল্লাহর কসম, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি, হাবশিরা যখন তার মসজিদে খেলত, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে তাঁর চাদর দ্বারা আমাকে আড়াল করে দাঁড়াতেন, যেন আমি তাদের খেলা দেখতে পারি। আমি ফিরে যাওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতেন। [১৬]
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেছেন, 'যুদ্ধবিষয়ক খেলা শুধু খেলাই ছিল না; বরং তার মাঝে যুদ্ধের ময়দানে বীরত্ব প্রদর্শন এবং শত্রুর মোকাবিলা করার প্রশিক্ষণ ছিল।
মুহাল্লাব রহ. বলেন, মসজিদ তৈরি করা হয়েছে মুসলিম জাতির জন্য। অতএব, দ্বীন ও দ্বীনের অনুসারীদের কল্যাণে যত কাজ হতে পারে, মসজিদে সেগুলোর সব জায়িজ আছে। হাদিস থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয়েছে যে, উপকারী বৈধ খেলা দেখাও জায়িজ। [১৭]
তো নবুওয়াতি যুগে এ ধরনের উপকারী খেলা ছিল। তবে এমন অনর্থক কোনো খেলা ছিল না, যদ্বারা কোনো উপকার হতো না। সে যুগে যদিও বাহ্যিকভাবে এগুলোকে খেলা মনে করা হতো, কিন্তু মৌলিকভাবে এগুলোর মাঝে থাকত সামরিক-কৌশলের প্রশিক্ষণ।
আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সফরে গিয়েছিলাম। তখন আমার বয়স ছিল খুব কম। আমি হালকা গঠনের দুরন্ত কিশোরী ছিলাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাথিদের বললেন, তোমরা সামনে অগ্রসর হও। তারা সামনে অগ্রসর হলেন। এবার তিনি আমাকে বললেন, এসো, দৌড়পাল্লা দেবো। দৌড়পাল্লায় অংশগ্রহণ করে আমি বিজয়ী হলাম। এরপর এ নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কোনো কথা বললেন না।
কয়েক বছর পর। তখন আর আমি হালকা গড়নের সেই দুরন্ত কিশোরী নই, মোটা হয়ে গেছি। পূর্বের ওই দৌড়ের গল্পটাও তখন আমি মনে রাখিনি। এমন সময়ে আবারও এক সফরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে যাওয়ার সৌভাগ্য হলো আমার। পথিমধ্যে তিনি সাথিদের বললেন, তোমরা সামনে অগ্রসর হও। তারা সামনে অগ্রসর হলেন। এবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, এসো, দৌড়পাল্লা দেবো। আমি দৌড়পাল্লায় অংশগ্রহণ করলাম; কিন্তু এবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিজয়ী হলেন। তখন তিনি মুচকি হেসে বললেন, এটা সেই আগের প্রতিযোগিতায় হারের প্রতিশোধ। [১৮]
এখানেই শেষ নয়; বরং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণের সাথে ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা করেছেন।
ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রশিক্ষিত পাতলা দ্রুতগামী ঘোড়ার মাঝে প্রতিযোগিতা করেছেন, যার সূচনা হয়েছে হাফিইয়া থেকে এবং শেষ হয়েছে ওয়াদায় গিয়ে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপ্রশিক্ষিত মোটা ঘোড়ার মাঝেও প্রতিযোগিতা করেছেন, যার সূচনা হয়েছে সানিয়্যা থেকে এবং শেষ হয়েছে বনি জুরাইকের মসজিদে গিয়ে। [১৯]
হাদিসের মর্ম হলো, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রকার ঘোড়ার সাথেই প্রতিযোগিতা করেছেন এবং সেগুলোতে বিজয়ীও হয়েছেন।
সালামা বিন আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-
مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى نَفَرٍ مِنْ أَسْلَمَ يَنْتَضِلُونَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ارْمُوا بَنِي إِسْمَاعِيلَ فَإِنَّ أَبَاكُمْ كَانَ رَامِيًا ارْمُوا وَأَنَا مَعَ بَنِي فُلَانٍ قَالَ فَأَمْسَكَ أَحَدُ الْفَرِيقَيْنِ بِأَيْدِيهِمْ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا لَكُمْ لَا تَرْمُونَ قَالُوا كَيْفَ نَرْمِي وَأَنْتَ مَعَهُمْ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ارْمُوا فَأَنَا مَعَكُمْ كُلَّكُمْ .
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসলাম গোত্রের কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন, যারা পরস্পরে তির চালনা করছিল। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে বনি ইসমাইল, তোমরা তির নিক্ষেপ করো। কেননা, তোমাদের পিতা তিরন্দাজ ছিলেন। আর আমি অমুক বংশের সন্তান। বর্ণনাকারী বলেন, হঠাৎ দুদলের মধ্যে একদল লোক তির চালনা বন্ধ করে দিল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তির চালনা বন্ধ করলে কেন? তারা বলল, আপনি তাদের সাথে থাকা অবস্থায় আমরা কীভাবে তির নিক্ষেপ করতে পারি? তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তির চালাও! আমি তোমাদের সকলের সাথেই আছি।[২০]
তো এখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেলতে তো নিষেধ করলেনই না, উপরন্তু তাদের মাঝে ঢুকে গেলেন এবং পরস্পরকে প্রতিযোগিতায় উদ্বুদ্ধ করলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের দিকগুলো খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সেগুলোকে নখদর্পণে রাখতেন। সে বড় হোক বা ছোট, পুরুষ হোক বা নারী—এতে কোনো ফারাক করতেন না।
অশ্বারোহণ, তিরন্দাজি ও সাঁতার কাটা ইত্যাদি খেলাগুলো পুরুষের সাথে সামঞ্জস্যশীল। আর কিছু খেলা ছিল নারীদের সাথে সামঞ্জস্যশীল। যেমন: পুতুলখেলা, দোল খেলা ইত্যাদি। আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
تَزَوَّجَنِي النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَا بِنْتُ سِتَّ سِنِينَ فَقَدِمْنَا الْمَدِينَةَ فَنَزَلْنَا فِي بَنِي الْحَارِثِ بْنِ خَزْرَجٍ فَوُعِكْتُ فَتَمَرَّقَ شَعَرِي ... فَأَتَتْنِي أُنِّي أُمُّ رُومَانَ وَإِنِّي لَفِي أَرْجُوحَةٍ وَمَعِي صَوَاحِبُ لِي .
আমি যখন ছয় বছরের কন্যা ছিলাম তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বিয়ে করেছেন। এরপর আমরা মদিনায় হিজরত করে বনি হারিস বিন খাজরাজের গোত্রে গিয়ে অবস্থান করি। সেখানে আমি জ্বরে আক্রান্ত হলাম। এতে আমার চুল পড়ে গেল। ...অতঃপর আমার আম্মা উম্মে রুমান আমার কাছে এলেন। তখন আমি আমার বান্ধবীদের সাথে দোলনায় দোল খাচ্ছিলাম।
হাদিসটি অনেক দীর্ঘ। এটি বর্ণিত হয়েছে 'আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে বিদায়ের জন্য তৈরি করা' অধ্যায়ে। [২১]
তো আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা নববিযুগে তার বান্ধবীদের সাথে দোলনায় দোল খাচ্ছিলেন, কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিষেধ করেননি। নারীদের সাথে সামঞ্জস্যশীল আরেকটি খেলা হলো, পুতুল খেলা। আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন-
كُنْتُ أَلْعَبُ بِالْبَنَاتِ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَانَ لِي صَوَاحِبُ يَلْعَبْنَ مَعِي فَكَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ يَتَقَطَّعْنَ مِنْهُ فَيُسَرِّبُهُنَّ إِلَيَّ فَيَلْعَبْنَ مَعِي .
আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে (তুলা বা কাপড় দিয়ে বানানো) পুতুল দিয়ে খেলা করতাম। আমার বান্ধবীরাও আমার সাথে খেলা করত। যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসতেন তারা পর্দার আড়ালে গিয়ে লুকাত। তিনি এসে আবারও তাদেরকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। তখন তারা আমার সাথে এসে খেলা করত। [২২]
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, এই হাদিসের মাধ্যমে মেয়েদের তাদের ঘরে পুতুল দিয়ে খেলা জায়িজ হওয়ার ওপর প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। তাদের খেলার এই পুতুলকে শরিয়তে নিষিদ্ধ প্রতিমা ও ছবি থেকে ব্যতিক্রম ধরা হয়েছে। তাদের জন্য পুতুল খেলাকে জায়িজ বলার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, শৈশব থেকেই তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা প্রদান করা হয়েছে যে, বড় হলে এভাবেই সন্তানসন্ততির প্রতিপালন করতে হবে।' [২৩]
এভাবেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার শিশু স্ত্রী আয়িশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহার স্বভাবগত আবেদনের প্রতি লক্ষ রেখেছেন এবং তাকে বান্ধবীদের সাথে খেলাধুলা করার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। সে যুগে যে পুতুলগুলো দিয়ে খেলা হতো, সেগুলো তুলা বা পশমের তৈরি হতো। যেগুলোর শুধু দুটি হাত, দুটি পা, মাথা ও শরীর থাকত। বর্তমান যুগের মতো পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তোলা চোখ, কান, নাক, মুখ ও আঙুল ইত্যাদি থাকত না।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে মহিলা সাহাবায়ে কিরামও তাদের সন্তানদেরকে এ ধরনের খেলনা দিয়ে খেলতে দিতেন এবং রোজার সময় ইফতার পর্যন্ত তাদের ভুলিয়ে রাখতেন।
রুবাইয়ি বিনতে মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন সকালে আনসারদের জনপদে এই বলে সংবাদ পাঠাতেন—
مَنْ أَصْبَحَ مُفْطِرًا فَلْيُتِمَّ بَقِيَّةَ يَوْمِهِ وَمَنْ أَصْبَحَ صَائِمًا فَلْيَصُمْ قَالَتْ فَكُنَّا نَصُومُهُ بَعْدُ وَنُصَوِّمُ صِبْيَانَنَا وَنَجْعَلُ لَهُمْ اللَّعْبَةَ مِنْ الْعِهْنِ فَإِذَا بَكَى أَحَدُهُمْ عَلَى الطَّعَامِ أَعْطَيْنَاهُ ذَاكَ حَتَّى يَكُونَ عِنْدَ الْإِفْطَارِ.
যে ব্যক্তি রোজা রাখেনি সে যেন সারাদিন এভাবেই থাকে। আর যে রোজা রেখেছে সে যেন রোজা রাখে। রুবাইয়ি রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এরপর থেকে আমরা নিজেরাও রোজা রাখতাম এবং সন্তানদেরকেও রোজা রাখাতাম। তাদের জন্য তুলার খেলনা তৈরি করতাম। যখনই কেউ খাবারের জন্য কান্না করত, খেলার জন্য সেই খেলনাগুলো দিতাম। এভাবে ইফতার পর্যন্ত কাটাতাম। [২৪]
সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম দ্বীনি ফিকহের এক মহাসম্পদ পেয়েছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, প্রতিটি মুহূর্তের জন্য ইবাদত রয়েছে। প্রতিটি সময়ের জন্যই উপযোগী আমল রয়েছে, যার কারণে তারা সুযোগ করে বিশ্রাম নিতেন এবং ইবাদত করার জন্য ও ইলম অন্বেষণ করার জন্য নিজেকে সজীব, সতেজ ও স্পৃহমান করে নিতেন।
আলি বিন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—
روحوا القلوب ساعة فإنها إذا أكرهت عميت .
কিছু সময় কলবগুলোকে শান্তি দাও। কেননা, যখন তাকে অতিরিক্ত চাপ দেবে, সে অন্ধ হয়ে যাবে। [২৫]
আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-
إني لأستجم ليكون أنشط لي في الحق .
আমি অবশ্যই বিনোদন করি; যেন তা হকের পথে কাজ করতে আমার জন্য অধিক উদ্যমতা সৃষ্টি করে। [২৬]
বকর বিন আবদুল্লাহ মাজানি রহ. বলেন-
كان أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم يتبادحون بالبطيخ ، فإذا كانت الحقائق كانوا هم الرجال .
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবিগণ তরমুজ (যা তৎকালীন যুগে বিরল ও আকর্ষণীয় ফল ছিল) খাওয়ার প্রতিযোগিতা করতেন। আবার বাস্তবজীবনে তারা সুপুরুষও ছিলেন।[২৭]
শাইখ নাসিরুদ্দিন আলবানি রহ. এই বর্ণনাটিকে সহিহ বলেছেন। [২৮]
তাদের জীবনটা একেবারে যেমন বাহুল্য কাজে ভরা ছিল না, তেমনিভাবে পরিশ্রমের তিক্ততার জটও ছিল না; বরং উভয়ের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল সুনিপুণভাবে। তারা কর্মক্ষেত্রে সুপুরুষ হয়ে আবর্তিত হতেন, আবার কখনও বিনোদনের প্রয়োজন হলে রস-কৌতুকে মজে যেতেন।
পরবর্তী যুগের সালাফে সালিহিন, উলামায়ে কিরাম ও মাশায়িখে ইজাম সাহাবায়ে কিরামের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই চলেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ফুকাহায়ে কিরাম, মুহাদ্দিসিনে ইজাম তাদের ফিকহ, হাদিস ও ইলমের মজলিসে শাগরিদদেরকে কখনও কখনও বিরল প্রজাতির ফলমূল দ্বারা আপ্যায়ন করতেন, বনভোজনের আয়োজন করতেন, কবিতা ও গল্প-কাহিনির আসর জমাতেন। এগুলোর মাধ্যমে তারা চিত্তবিনোদনের স্বাদ উপভোগ করতেন।
আল্লামা ইরাকি তার 'আলফিয়া' গ্রন্থে লিখেছেন-
واستحسن الانشاد في الأواخر بعد الحكايات مع النوادر
'শেষে সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করা হয়েছে, নানারকম বিরল ঘটনা আলোচনার পর।'

টিকাঃ
[১৫] সুনানুত তিরমিজি শরিফ: ৭/২৬৭, হাদিস : ১৯১৩
[১৬] সহিহু মুসলিম: ৪/৪১৬, হাদিস : ১৪৮১
[১৭] ফাতহুল বারি: ১/৫৪৯
[১৮] মুসনাদু আহমাদ: ৫৩/২৩৩, হাদিস: ২৫০৭৫
[১৯] সহিহুল বুখারি : ২/১৮৮, হাদিস: ৪০৩
[২০] সহিহুল বুখারি : ১০/৩০, হাদিস: ২৬৮৪
[২১] সহিহুল বুখারি : ১২/২৮২, হাদিস : ৩৬০৫
[২২] সহিহুল বুখারি : ১৯/১৩, হাদিস : ৫৬৬৫
[২৩] ফাতহুল বারি: ১০/৫২৬
[২৪] সহিহুল বুখারি: ৭/৬৪, হাদিস: ১৮২৪
[২৫] ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ১/৩৮৫, ৩/৪৬৪
[২৬] সিয়ারু আলামিন-নুবালা : ৫/৪২১
[২৭] আল-আদাবুল মুফরাদ: ১/৪০৭
[২৮] সিলসিলাতুস-সহিহাহ: ১/৭৯৭, হাদিস: ৪৩৫

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 বিনোদনের প্রকারভেদ

📄 বিনোদনের প্রকারভেদ


বিনোদনকে মোট তিন প্রকারে ভাগ করা যায়। যথা-
প্রথম প্রকার: ওই সমস্ত বিনোদন, একজন মানুষ তার দ্বীনি প্রয়োজন মেটানোর স্বার্থে যার প্রত্যাশী ও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। যেমন: ইতিপূর্বে হাদিসের আলোকে তিরন্দাজি ও অশ্বারোহণের বিষয়টি বর্ণনা করা হয়েছে, যেন এগুলোর মাধ্যমে জিহাদের কলা- কৌশল ও বিচক্ষণতা অর্জন হয়।
এমনিভাবে স্ত্রীর সাথে খেলাধুলা করা। কেননা, এটা তার অধিকার। এর মাধ্যমে স্বামী- স্ত্রী উভয়ের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি হয় এবং হারাম চাহিদা থেকে দূরে থাকা সহজ হয়।
এগুলোর মাঝে প্রত্যেক ওই আনন্দ-উল্লাসও অন্তর্ভুক্ত হবে, যার দ্বারা দ্বীনি উপকারের ইচ্ছা ও প্রত্যাশা করা হয়। যেমন: সাঁতার কাটা, দৌড় প্রতিযোগিতা, শরীরে শক্তি সঞ্চয়ে সহযোগী প্রতিটি প্রতিযোগিতা, সতর্কতা বৃদ্ধি, বোধগম্য শক্তির গতিবেগ বাড়ানো এবং বুঝশক্তি বৃদ্ধি ইত্যাদি।
সামুদ্রিক যুদ্ধে মুসলিম ডুবুরিরা বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। যেমন : সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির যুগে মুসলিম ডুবুরিরা খ্রিষ্টানদের জাহাজগুলোর পূর্বে কোনো একস্থানে ডুব দিতেন এবং (জাহাজের নিচ দিয়ে বা পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে) অন্য দিকে উপরে উঠে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির পত্র, ব্যয়ভারের অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং সামরিক পত্রাদি অবরোধের শিকার আক্কাসহ [২৯] বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিতেন।
দ্বিতীয় প্রকার: ওই সমস্ত বিনোদন, যেগুলো মৌলিকভাবেই হারাম কিংবা তাতে হারামের সংমিশ্রণ থাকে। যেমন: এমন খেলা, যেগুলোতে ক্রুশ থাকে, বাজনা থাকে কিংবা জুয়া ইত্যাদি থাকে।
তো এই সমস্ত খেলা নিঃসন্দেহে হারাম। কোনো অবস্থাতেই এই খেলাগুলো জায়িজ নয়; বরং সর্বাবস্থায়ই হারাম।
তৃতীয় প্রকার: ওই সমস্ত খেলা, যেগুলোর মাঝে হারামের কোনো সংমিশ্রণও নেই, আবার দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো উপকারিতাও নেই। এ ধরনের খেলাকেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাতিল বা অনর্থক বলে অভিহিত করেছেন। অতএব, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কোনো মুসলিম এমন খেলার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে না।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'বাতিল বলে ওই সমস্ত কাজ বুঝানো হয়েছে, যেগুলোর মাঝে কোনো উপকারিতা নেই। এ ধরনের কাজ কেবল তার জন্যই করার অনুমতি আছে, যার উপকারী কাজ করার ধৈর্য নেই।'[৩০]
উদাহরণস্বরূপ আমাদের সন্তানদের হাতে এমন কিছু ইলেকট্রিক খেলনাসামগ্রী দেখা যায়, যাতে হারাম কিছু পাওয়া যায় না, আবার তাতে বাচ্চাদের কোনো উপকারিতাও নিহিত নেই। তাহলে এটা হলো বাতিল খেলার উপকরণ, যাদ্বারা কারোরই খেলা উচিত নয়। অতএব, শিশুসন্তান যখন এ ধরনের খেলনা দেখে তাদ্বারা খেলতে উদগ্রীব হয়ে উঠবে এবং এটা নিয়ে জোরাজুরি করবে, তখন তার অভিভাবক তাকে তা দিয়ে দেবে। অতঃপর চেষ্টা করবে, যেন তা ছেড়ে সে অন্যান্য উপকারী খেলনা দিয়ে খেলে।
সুতরাং একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো, নিজের উন্নতিসাধন করা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখা, সাহসী হওয়া; অতঃপর আমাদের সময়ে বিদ্যমান সব ধরনের গুরুত্বহীন কাজ থেকে বেঁচে থাকা, যাতে কোনোরূপ উপকার নিহিত নেই।
অনুরূপভাবে একজন বুদ্ধিমান মুসলিম উপকারহীন খেলাকে উপকারী খেলায় রূপান্তরিত করে দিতে পারে। যেমন: কেউ দেখল, তার সন্তান হাতে উপকারহীন খেলনা নিয়ে একাকী খেলছে। তাহলে এটাকে সুবর্ণ সুযোগ ভেবে তার সন্তানের সাথে সেও খেলা শুরু করে দেবে। উদ্দেশ্য, তার নিকট প্রিয় হয়ে ওঠা এবং তাকে এটা উপলব্ধি করানো যে, তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাহলে উপকারহীন একটি খেলা থেকে এটি এমন এক খেলায় রূপান্তরিত হয়ে গেল, যেখানে পিতা তার সন্তানের নিকট প্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। এতে পিতা কর্তৃক নসিহত, উপদেশ ইত্যাদির ক্ষেত্রে সন্তানের ওপর বেশ প্রভাব ফেলবে।

টিকাঃ
[২৯] একটি জায়গার নাম। নিরীক্ষক।
[৩০] আল-ইসতিকানা: ১/২৭৭

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 হালজামানায বিনোদনের অবস্থা

📄 হালজামানায বিনোদনের অবস্থা


হালজামানার বিনোদনের প্রকৃত অবস্থা নেহায়েত বেদনাদায়ক, যা একাধারে জীবন ধ্বংসের উপকরণ ও অর্থ নষ্টের মাধ্যম। উপরন্তু তা ইসলামি শরিয়তের পরিপূর্ণ লঙ্ঘন ও স্বতন্ত্রভাবে বহু অনর্থের মূল।
পশ্চিমাবিশ্ব কর্তৃক পরিচালিত নিম্নোক্ত পরিসংখ্যান থেকে জীবন ধ্বংসের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, মানুষ খেলাধুলাসহ বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় কাজে তার শৈশবের প্রথম পাঁচ বছরের ৪৪% ধ্বংস করে, ছয় থেকে ১১ বছরের মাঝে ২৬% নষ্ট করে, ১১-১৫ বছরের মাঝে ১৩% নষ্ট করে এবং ১৬ বছর থেকে নিয়ে সর্বোচ্চ বয়স পর্যন্ত ১৭% নষ্ট করে। প্রাচ্যের জনগণও পশ্চিমাদের এই ক্রীড়াআসক্তির অনুসরণ করে।
বর্তমান যুগে বিনোদনের পেছনে অর্থ ব্যয় এবং বাজেটের পরিমাণ থেকে অর্থ নষ্টের বিষয়টিও পরিষ্কার হয়ে যায়। নিচের পরিসংখ্যান থেকে এ বিষয়টিও মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
২০০০ সালের ব্যয় থেকে ৮% বৃদ্ধি পাওয়া ২০০১ সালের পরিসংখ্যান এটি। তো ২০০১ সালে আমেরিকায় কেবল ইলেকট্রিক খেলনাপণ্যের পেছনেই ব্যয় করা হয়েছে ৬,৩৫ বিলিয়ন ডলার এবং বিক্রি করা হয়েছে ২২৫ মিলিয়ন খেলার সরঞ্জামাদি।
বর্তমান যুগে সময় নষ্টকারী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকারক হচ্ছে ইলেকট্রিক খেলনাপণ্য, যেগুলোর একেকটি ম্যাচ শেষ করতে সুদীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। এই অনর্থক খেলা শেষ পর্যন্ত উপভোগ করতে অনেকেই ইলেকট্রিক যন্ত্রের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে।
হায়! যদি শরয়ি বিধানের প্রয়োগক্ষেত্রের আওতা-বহির্ভূত শিশুদের মাঝেই এই খেলাগুলো সীমিত থাকত, তাহলে আমরা বলতে পারতাম, বিনষ্ট সময় তার মূল্য হারালেও সময় নষ্টকারী শিশুরা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে না।
কিন্তু বাস্তবতা বলে ভিন্ন কথা! সময় নষ্ট করে জীবন বিধ্বংসকারী এই খেলার পেছনে যারা ব্যতিব্যস্ত, তাদের অধিকাংশই যুবক ও পরিণত বয়সের মানুষ। বরং কমার্শিয়াল ওয়াজ-নসিহতও তো কেবল সেসকল খেলোয়ারের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করা হয়, যারা খেলাকে উপার্জনের পেশা হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু শিশু, কিশোর, যুবক ও পরিণত বয়সের যেসকল মানুষ ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে খেলায় মাতোয়ারা থাকে, তাদের উদ্দেশে কোনো প্রকার ওয়াজ-নসিহত উৎসর্গিতই হয় না।
এই খেলা কেবল শিশুদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং পরিসংখ্যান তো বলে, যারা ইলেক্ট্রিক্যাল খেলায় মাতোয়ারা তাদের ৪০%-এর বয়স ৩৬ বছরের ওপর, ২৬%-এর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মাঝামাঝি এবং ৩৪%-এর বয়স ১৮ বছরের নিচে।
তবে খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে, বিনোদন কেবল এই প্রকারের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিসংখ্যান বলে যে, আমেরিকানরা প্রতি বছর ফিল্ম ও শর্ট ফিল্ম ভাড়ার পেছনে ১৬ বিলিয়ন ডলার এবং সিনেমার পেছনে ৮ বিলিয়ন ডলার, গানের ডিভিডি ক্রয় ও ভাড়ার পিছনে ১১ বিলিয়ন ডলার, এগুলো চালানোর যন্ত্রের পেছনে ২৫ বিলিয়ন ডলার, ভিডিও প্লেয়ারের যন্ত্রাংশের পেছনে ৯৬ বিলিয়ন ডলার, বাদ্যযন্ত্রের পেছনে ১১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এভাবে তারা বিনোদনের পেছনে অপরিমিতি অর্থ ব্যয় করে থাকে।
এর মধ্যে কিছু আছে সম্পূর্ণরূপে শরিয়ত-গর্হিত। যেগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। উপরন্তু সেগুলোর মাঝে সুকৌশলে আকিদাগত ও চারিত্রিক অধঃপতনের জীবাণু ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার শুরু হয় ক্রুশ হতে এবং শেষ হয় বাদ্যযন্ত্রে গিয়ে।
ক্রমাগত এভাবে চলতে চলতে সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে বিনোদন গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের রূপ পরিগ্রহ করেছে এবং স্বতন্ত্র একটি শিল্পের অবকাঠামো তৈরি করে ফেলেছে।
বিলিয়নাররা এখানে মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে আরম্ভ করে এর বহু আকার-প্রকার আবিষ্কার করেছে। তবে এর অধিকাংশই বিনিয়োগ করা হচ্ছে ইলেকট্রিক খেলাধুলার পেছনে, যার মধ্যে রয়েছে চলচ্চিত্র শিল্প, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক খেলা ইত্যাদি। বিশ্বের খ্যাতিমান বিলিয়নার ও মিলিয়নাররা এগুলোতে বিনিয়োগ করে থাকে। এগুলো আবার দু'একটি আকার-প্রকারের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এগুলোর আরও অগণিত কিসিম রয়েছে।
বর্তমানবিশ্বে এগুলোই বিনোদনের মৌলিক উপকরণ, যা নিঃসন্দেহে আমাদের দুর্ভাগ্যের কারণ। কারণ, এগুলো সম্পদ নষ্ট করার মাধ্যম এবং জীবন ধ্বংস করার মারণাস্ত্র।
শরিয়তের মূলনীতির আলোকে এগুলোকে নির্ধারিত সীমার গণ্ডিতে পরিব্যাপ্ত করা অসম্ভবপ্রায়। তদুপরি বেড়েই চলেছে বল্লাহারা, ভীতিহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। সময়-বয়স, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় এবং স্বাধীন-পরাধীন ভেদাভেদ ছাড়িয়ে এগুলো ছড়িয়ে পড়ছে সর্বমহলে-সর্বস্তরে। ইসলামের বিধি-নিষেধের আলোকে সেগুলোকে চালিয়ে নেওয়া তো দূরের কথা, জাগতিক দৃষ্টিকোণ বা যুক্তির আলোকেও এগুলোর বৈধতার কোনো সুযোগ নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00