📄 অবসর সময় কীভাবে কাটাবেন?
মুসলিমসমাজের প্রতিটি সদস্য যেহেতু একই শ্রেণির নয়, তাদের প্রত্যেকের অবসর সময়ের মাঝে তাই কম-বেশ হয়। কিছু মানুষ এমন হয়, যারা খুব অল্প সময়ই কর্মব্যস্ত রয়, আর বেশির ভাগ সময়ই অবসরে কাটায়। আর কিছু মানুষ তো রয়েছে এমন যে, সুদীর্ঘ ব্যস্ততা এবং কাজের অত্যধিক চাপের কারণে বিশ্রামের সময় পর্যন্ত অধরা থাকে。
একজন মুসলিম যখন কোনো কাজ শেষ করে, তখন তার সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। হয়তো সে জাগতিক কল্যাণে অন্য কোনো কাজে আত্মনিয়োগ করবে, কিংবা পরলৌকিক কল্যাণে দ্বীনি কোনো কাজে ব্যাপৃত হবে।
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন-
إني لأكره أن أرى الرجل فارغا لا في عمل دنياه ولا في عمل أخرة .
'আমি মানুষকে কর্মহীন দেখতে অপছন্দ করি; যে দুনিয়ার কোনো কাজও করে না, আবার পরকালীন কোনো কাজেও আত্মনিয়োগ করে না।[৯]
প্রখ্যাত এই সাহাবি কৌশলসমৃদ্ধ চমৎকার একটি কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য দুটি জগতের ব্যবস্থা করেছেন, যেখানে আমাদেরকে বসবাস করতে হবে-ইহজগৎ ও পরজগৎ। আমাদের নির্দেশ করেছেন উভয় জগৎ বিনির্মাণ করার। অতএব, অবসরের বাহানায় উভয় জগতের কাজ থেকে বিরত থাকা হবে চরম বাড়াবাড়ির নামান্তর।
আল্লাহ তাআলা আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন-
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا .
আল্লাহ তাআলা তোমাকে যা দান করেছেন, তার মাধ্যমে পরকাল অন্বেষণ করো। আর তোমার দুনিয়ার অংশকেও ভুলে যেয়ো না। [সুরা আল-কাসাস : ৭৭]
পরকালের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা অন্যত্র নির্দেশ করেছেন-
فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ .
আল্লাহর জিকিরের প্রতি ধাবিত হও! [সুরা আল-জুমআ : ৯]
আর দুনিয়ার ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন-
فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا .
সুতরাং দুনিয়ার বক্ষের ওপর হেঁটে চলো! [সুরা আল-মুলক : ১৫]
তো এই আয়াত দুটিতে আল্লাহ তাআলা পরকালের দিকে গমনের ক্ষেত্রে 'দৌড়' শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং ইহকালের দিকে গমনের ক্ষেত্রে 'হেঁটে চলা' শব্দ ব্যবহার করেছেন। এটা প্রমাণ করে যে, পরকালীন কাজের দিকে খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে হবে এবং ইহকালীন কাজের দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।
অতএব, প্রতিটি মুসলিমের জন্য অতীব জরুরি হলো, যখনই সে অবসর সময় পাবে, খুব দ্রুত দুনিয়াবি কাজগুলো সেরে ফেলবে, যেগুলোর দিকে তার মনমস্তিষ্ক জড়িয়ে থাকে। যেমন: রাষ্ট্রীয় কাজ-কর্ম, সাংগঠনিক কর্মপরিক্রমা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কার্যাবলি; কেনাবেচা ইত্যাদিসহ অন্যান্য যাবতীয় পার্থিব কাজ সম্পাদন।
অতঃপর যখন এ সকল ঝামেলা থেকে অবসর হবে, দুনিয়াবি কোনো কাজ থাকবে না, তখন পরকালীন কাজে আত্মনিয়োগ করবে। যেমন: ইলম অর্জন, কুরআন তিলাওয়াত, মসজিদে গিয়ে সালাতের প্রতীক্ষায় থাকাসহ অন্যান্য ইবাদতে মগ্ন হওয়া।
একবার কাজি শুরাইহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এমন এক জনপদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যারা খেলাধুলা করছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কী হলো, তোমরা খেলায় মত্ত কেন? তারা জবাব দিল, আমরা এখন অবসর পেয়েছি তাই একটু খেলাধুলা করছি। আমাদের দায়িত্বে কিছু কাজ ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে, এখন কোনো কাজ নেই। কাজি শুরাইহ রহ. বললেন, অবসর সময়ে তোমাদেরকে খেলার নির্দেশ প্রদান করা হয়নি।[১০]
অবসরপ্রাপ্ত মানুষকে তো নির্দেশ করা হয়েছে, সে যেন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আল্লাহর আনুগত্য করে পরকাল বিনির্মাণ করে, কিংবা দুনিয়াবি অন্য কোনো কাজ করে ইহকাল বিনির্মাণ করে। মুসলিমজীবনে খেলাধুলার অনুমতি রয়েছে, তবে তা একান্তই সীমিত পরিসরে। মৌলিকভাবে বা পেশা হিসেবে খেলাধুলা কীভাবে প্রকৃত কোনো মুসলিমের কাজ হতে পারে?
টিকাঃ
[৯] হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/১৩০
[১০] হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/১৩৪, সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৪০
📄 বিনোদনের উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা
বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলেছেন, খেলাধুলা ও বিনোদনের কয়েকটি উপকার রয়েছে। যেমন-
১. শিরা-উপশিরাগুলোর মাঝে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়।
২. শারীরিক ও আত্মিক শক্তি বিকশিত হয়।
৩. শিশুরা ভবিষ্যৎজীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার শক্তি লাভ করে।
৪. বিরক্তি, একঘেয়েমি ও অন্তরের সংকীর্ণ ভাব দূর হয়।
৫. জীবনচলার পথে সৃষ্ট চাপ কমে যায়।
ইবনুল জাওজি রহ. বলেছেন, 'আমার পাশ দিয়ে দুজন কুলি ভারী বোঝা নিয়ে অতিক্রম করছিল এবং চলন্ত অবস্থায় দুজনে কবিতার প্রতিযোগিতা করছিল। একজন তার কবিতা যেখানে যে কথার মাধ্যমে শেষ করছিল, অপরজন সেখান থেকে সেই কবিতার জবাব দিচ্ছিল। এভাবেই তারা এগিয়ে চলছিল। আমার মনে হলো, যদি তারা এমন না করত, তাহলে বোঝার কষ্ট আরও বেশি অনুভব করত এবং বোঝাকে আরও অধিক ভারী মনে হতো। কিন্তু যখন তারা এভাবে কবিতার প্রতিযোগিতা করছিল, তাদের বোঝা হালকা মনে হচ্ছিল।
পরবর্তী সময়ে আমি বিষয়টির উৎস নিয়ে ভাবলাম। তখন আমার কাছে পরিষ্কার হলো, তাদের দুজনের মাঝেই এই ভাবনা কাজ করত যে, অন্যজন কী বলতে পারে এবং তার জবাবে কী বলা যেতে পারে। এভাবে এই ভাবনার মাঝেই তাদের পথ অতিক্রম হচ্ছিল এবং মাথার ওপর থাকা বোঝার কষ্ট হালকা মনে হচ্ছিল।
সুতরাং আমি এখান থেকে একটি বিস্ময়কর ইঙ্গিত লাভ করলাম এবং দেখলাম যে, মানুষ অনেক বোঝা ও কষ্টকর বিষয় বহন করে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ভারী হলো চিন্তার বোঝা এবং আপতিত বিপদের ওপর ধৈর্যধারণ করা। ফলে আমি অনুধাবন করলাম, নফসকে ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে কাজ করানোর মাধ্যমে সবরের কঠিন পথ অতিক্রম করা সহজতর হয়ে যায়।' [১১]
টিকাঃ
[১১] সাইদুল খাতির: ৭১