📄 মুসলিমজীবনে নিয়তের প্রক্রিয়া
এটা কখনও ইসলামের অভিপ্রায় নয় যে, মানুষ তার গোটা জীবন রুকু-সিজদায় কাটিয়ে দেবে এবং পুরো সময় কেবল এ উদ্দেশ্যেই ব্যয় করবে। বরং মানবজীবনে উদ্দেশ্যের বিশাল-বিস্তৃত এক ভান্ডার রয়েছে; পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শরিয়ত আমাদের জন্য যা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছে। যে ব্যক্তি সেগুলো উদঘাটন করবে এবং তা থেকে উপকৃত হবে, সে মহাকল্যাণ লাভ করতে পারবে এবং অফুরন্ত নিয়ামতে ধন্য হতে পারবে।
তো সেই বিশাল ভান্ডারের নাম হলো 'নেক নিয়ত' বা ভালো কাজের সংকল্প। 'নিয়ত' বলা হয় এমন সুদৃঢ় সংকল্পকে, যা মানুষের সাধারণ অভ্যাসকে ইবাদতে রূপান্তরিত করার প্রবল ক্ষমতা রাখে, যার বদৌলতে মানুষ তার প্রাত্যহিক পার্থিব জরুরি কাজের মাধ্যমেও আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারে। পার্থিব উপকার অর্জনের সাথে সাথে অপার্থিব-পারলৌকিক প্রতিদানও লুফে নিতে পারে খুব সহজে।
সুতরাং যদি কোনো মানুষ তার সার্বক্ষণিক সাধারণ কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিয়ত করে এবং মুসলিম সমাজকে এই মানসিকতার ওপর শক্তিশালীরূপে প্রতিষ্ঠা করার নিয়তে কাজ করে যায়, তাহলে এই নিয়ত তার উভয়কালীন কল্যাণের মাধ্যম হবে।
ঠিক তেমনিভাবে মানুষ যদি তার আহার-নিদ্রার প্রাক্কালে এই নিয়ত করে যে, এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করার শক্তি অর্জন করবে, তাহলে এই আহার-নিদ্রাও তার মিজানের পাল্লায় নেকির সাথে যোগ হবে।
একবার মুআজ বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাৎ করে 'কিয়ামুল লাইল' তথা তাহাজ্জুদের সালাত নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন মুআজ বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন-
أَمَّا أَنَا فَأَنَامُ وَأَقُومُ فَأَحْتَسِبُ نَوْمَتِي كَمَا أَحْتَسِبُ قَوْمَتِي .
তবে আমি ঘুমাই এবং কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ) আদায় করি। কিন্তু আমার ঘুমকেও ঠিক তেমনিভাবে ইবাদত মনে করি, যেমনিভাবে আমার সালাতকে ইবাদত মনে করি।[৪]
হাফিজুল হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেছেন, 'এই হাদিসের মর্ম হলো, প্রশান্ত থাকা অবস্থায়ও এমনভাবে সওয়াব অন্বেষণ করবে, ঠিক যেভাবে ক্লান্ত থাকা অবস্থায় সওয়াব কামনা করে থাকো। কেননা, ক্লান্তি দূরকারী প্রশান্তির মাধ্যমে যখন ইবাদতের শক্তি সঞ্চয় করতে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া হয়, তখনো সওয়াব পাওয়া যায়।[৫]
এখানেই শেষ নয়; বরং একজন স্বামী তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার মাধ্যমেও সওয়াব অর্জন করতে পারে। মুসলিম শরিফের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرُ قَالَ أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهَا وِزْرُ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرًا .
তোমাদের স্ত্রীদের লজ্জাস্থানের মাঝেও সাদাকা রয়েছে। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের কেউ নিজের জৈবিক চাহিদা পূরণ করলেও কি সওয়াব পাবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (পাল্টা জিজ্ঞেস করে) জবাব দিলেন, হারামভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণ করলে কি গুনাহ হবে না? ঠিক তেমনিভাবে যখন কেউ হালালভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণ করবে, তখন সে সওয়াব লাভ করবে।[৬]
ইমাম নববি রহ. এই হাদিসে সংযুক্তি করে বলেছেন, 'এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সত্যিকারের নিয়ত দ্বারা জায়িজ কাজ ইবাদতে রূপান্তরিত হয়। অতএব, স্ত্রী সঙ্গমের মাধ্যমে যখন স্ত্রীর অধিকার আদায় করার নিয়ত করা হবে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তার সাথে সদাচরণ করা হবে, নেকসন্তান প্রত্যাশা করা হবে, নিজেকে অবৈধ কাজ থেকে পবিত্র রাখা উদ্দেশ্য হবে, স্ত্রীকে অবৈধ সম্পর্ক থেকে মুক্ত রাখা মাকসাদ হবে, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দৃষ্টি কুপাত্রে পতিত হওয়া থেকে হিফাজত করার সংকল্প থাকবে, এমনিভাবে খারাপ কল্পনা এবং অপাত্রের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া থেকে বিরত থাকা উদ্দেশ্য হবে, কিংবা এমন অন্য কোনো মহৎ উদ্দেশ্য ও নিয়ত থাকবে, তখন এর মাধ্যমে অবশ্যই সওয়াব পাওয়া যাবে।'[৭]
এবার খুব মনোযোগসহ ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ.-এর কথাগুলো শুনুন!
তিনি এই হাদিসের ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'সর্বদা আল্লাহর অভিপ্রায় মোতাবেক চলে তার আনুগত্যে ব্যাপৃত থেকে সময়কে বিনির্মাণ করা, আল্লাহর ইবাদতে সহযোগিতা হয় এমন কাজে আত্মনিয়োগ করে সময়কে অলংকৃত করা; যেমন: পানাহার করা, বিবাহ- শাদি করা, নিদ্রা যাওয়া, বিশ্রাম গ্রহণ করা ইত্যাদি। তো এগুলোকে যখন এমন কাজের শক্তি সঞ্চয়কারী হিসেবে গ্রহণ করা হবে, যেগুলো আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, অথবা যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকায় সাহায্য পাওয়া যায়, সেগুলোর মাধ্যমে সময়কে সাজানো, যদিও তাতে পরিপূর্ণ স্বাদ উপভোগ হয়, তবুও এগুলোর মাধ্যমে সওয়াব লাভ হয়। অতএব, এমন স্বাদের ও তৃপ্তির পবিত্র কাজের দ্বারা সময় সাজানোকে অনর্থক মনে করা যাবে না।[৮]
টিকাঃ
[৪] সহিহুল বুখারি: ১৩/২৪১, হাদিস: ৩৯৯৮, সহিহ মুসলিম: ৯/৩৪৫, হাদিস : ৩৪০৩
[৫] ফাতহল বারি শরহুল বুখারি: ৮/৬২
[৬] সহিহ মুসলিম: ৫/১৭৭, হাদিস: ১৬৭৪
[৭] শারহু সহিহি মুসলিম, নববি : ৭/৯২
[৮] মাদারিজুস সালিকিন: ২/১৭
📄 অবসর সময় কীভাবে কাটাবেন?
মুসলিমসমাজের প্রতিটি সদস্য যেহেতু একই শ্রেণির নয়, তাদের প্রত্যেকের অবসর সময়ের মাঝে তাই কম-বেশ হয়। কিছু মানুষ এমন হয়, যারা খুব অল্প সময়ই কর্মব্যস্ত রয়, আর বেশির ভাগ সময়ই অবসরে কাটায়। আর কিছু মানুষ তো রয়েছে এমন যে, সুদীর্ঘ ব্যস্ততা এবং কাজের অত্যধিক চাপের কারণে বিশ্রামের সময় পর্যন্ত অধরা থাকে。
একজন মুসলিম যখন কোনো কাজ শেষ করে, তখন তার সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। হয়তো সে জাগতিক কল্যাণে অন্য কোনো কাজে আত্মনিয়োগ করবে, কিংবা পরলৌকিক কল্যাণে দ্বীনি কোনো কাজে ব্যাপৃত হবে।
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন-
إني لأكره أن أرى الرجل فارغا لا في عمل دنياه ولا في عمل أخرة .
'আমি মানুষকে কর্মহীন দেখতে অপছন্দ করি; যে দুনিয়ার কোনো কাজও করে না, আবার পরকালীন কোনো কাজেও আত্মনিয়োগ করে না।[৯]
প্রখ্যাত এই সাহাবি কৌশলসমৃদ্ধ চমৎকার একটি কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য দুটি জগতের ব্যবস্থা করেছেন, যেখানে আমাদেরকে বসবাস করতে হবে-ইহজগৎ ও পরজগৎ। আমাদের নির্দেশ করেছেন উভয় জগৎ বিনির্মাণ করার। অতএব, অবসরের বাহানায় উভয় জগতের কাজ থেকে বিরত থাকা হবে চরম বাড়াবাড়ির নামান্তর।
আল্লাহ তাআলা আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন-
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا .
আল্লাহ তাআলা তোমাকে যা দান করেছেন, তার মাধ্যমে পরকাল অন্বেষণ করো। আর তোমার দুনিয়ার অংশকেও ভুলে যেয়ো না। [সুরা আল-কাসাস : ৭৭]
পরকালের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা অন্যত্র নির্দেশ করেছেন-
فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ .
আল্লাহর জিকিরের প্রতি ধাবিত হও! [সুরা আল-জুমআ : ৯]
আর দুনিয়ার ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন-
فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا .
সুতরাং দুনিয়ার বক্ষের ওপর হেঁটে চলো! [সুরা আল-মুলক : ১৫]
তো এই আয়াত দুটিতে আল্লাহ তাআলা পরকালের দিকে গমনের ক্ষেত্রে 'দৌড়' শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং ইহকালের দিকে গমনের ক্ষেত্রে 'হেঁটে চলা' শব্দ ব্যবহার করেছেন। এটা প্রমাণ করে যে, পরকালীন কাজের দিকে খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে হবে এবং ইহকালীন কাজের দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।
অতএব, প্রতিটি মুসলিমের জন্য অতীব জরুরি হলো, যখনই সে অবসর সময় পাবে, খুব দ্রুত দুনিয়াবি কাজগুলো সেরে ফেলবে, যেগুলোর দিকে তার মনমস্তিষ্ক জড়িয়ে থাকে। যেমন: রাষ্ট্রীয় কাজ-কর্ম, সাংগঠনিক কর্মপরিক্রমা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কার্যাবলি; কেনাবেচা ইত্যাদিসহ অন্যান্য যাবতীয় পার্থিব কাজ সম্পাদন।
অতঃপর যখন এ সকল ঝামেলা থেকে অবসর হবে, দুনিয়াবি কোনো কাজ থাকবে না, তখন পরকালীন কাজে আত্মনিয়োগ করবে। যেমন: ইলম অর্জন, কুরআন তিলাওয়াত, মসজিদে গিয়ে সালাতের প্রতীক্ষায় থাকাসহ অন্যান্য ইবাদতে মগ্ন হওয়া।
একবার কাজি শুরাইহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এমন এক জনপদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যারা খেলাধুলা করছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কী হলো, তোমরা খেলায় মত্ত কেন? তারা জবাব দিল, আমরা এখন অবসর পেয়েছি তাই একটু খেলাধুলা করছি। আমাদের দায়িত্বে কিছু কাজ ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে, এখন কোনো কাজ নেই। কাজি শুরাইহ রহ. বললেন, অবসর সময়ে তোমাদেরকে খেলার নির্দেশ প্রদান করা হয়নি।[১০]
অবসরপ্রাপ্ত মানুষকে তো নির্দেশ করা হয়েছে, সে যেন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আল্লাহর আনুগত্য করে পরকাল বিনির্মাণ করে, কিংবা দুনিয়াবি অন্য কোনো কাজ করে ইহকাল বিনির্মাণ করে। মুসলিমজীবনে খেলাধুলার অনুমতি রয়েছে, তবে তা একান্তই সীমিত পরিসরে। মৌলিকভাবে বা পেশা হিসেবে খেলাধুলা কীভাবে প্রকৃত কোনো মুসলিমের কাজ হতে পারে?
টিকাঃ
[৯] হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/১৩০
[১০] হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/১৩৪, সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৪০
📄 বিনোদনের উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা
বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ বলেছেন, খেলাধুলা ও বিনোদনের কয়েকটি উপকার রয়েছে। যেমন-
১. শিরা-উপশিরাগুলোর মাঝে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়।
২. শারীরিক ও আত্মিক শক্তি বিকশিত হয়।
৩. শিশুরা ভবিষ্যৎজীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার শক্তি লাভ করে।
৪. বিরক্তি, একঘেয়েমি ও অন্তরের সংকীর্ণ ভাব দূর হয়।
৫. জীবনচলার পথে সৃষ্ট চাপ কমে যায়।
ইবনুল জাওজি রহ. বলেছেন, 'আমার পাশ দিয়ে দুজন কুলি ভারী বোঝা নিয়ে অতিক্রম করছিল এবং চলন্ত অবস্থায় দুজনে কবিতার প্রতিযোগিতা করছিল। একজন তার কবিতা যেখানে যে কথার মাধ্যমে শেষ করছিল, অপরজন সেখান থেকে সেই কবিতার জবাব দিচ্ছিল। এভাবেই তারা এগিয়ে চলছিল। আমার মনে হলো, যদি তারা এমন না করত, তাহলে বোঝার কষ্ট আরও বেশি অনুভব করত এবং বোঝাকে আরও অধিক ভারী মনে হতো। কিন্তু যখন তারা এভাবে কবিতার প্রতিযোগিতা করছিল, তাদের বোঝা হালকা মনে হচ্ছিল।
পরবর্তী সময়ে আমি বিষয়টির উৎস নিয়ে ভাবলাম। তখন আমার কাছে পরিষ্কার হলো, তাদের দুজনের মাঝেই এই ভাবনা কাজ করত যে, অন্যজন কী বলতে পারে এবং তার জবাবে কী বলা যেতে পারে। এভাবে এই ভাবনার মাঝেই তাদের পথ অতিক্রম হচ্ছিল এবং মাথার ওপর থাকা বোঝার কষ্ট হালকা মনে হচ্ছিল।
সুতরাং আমি এখান থেকে একটি বিস্ময়কর ইঙ্গিত লাভ করলাম এবং দেখলাম যে, মানুষ অনেক বোঝা ও কষ্টকর বিষয় বহন করে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ভারী হলো চিন্তার বোঝা এবং আপতিত বিপদের ওপর ধৈর্যধারণ করা। ফলে আমি অনুধাবন করলাম, নফসকে ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে কাজ করানোর মাধ্যমে সবরের কঠিন পথ অতিক্রম করা সহজতর হয়ে যায়।' [১১]
টিকাঃ
[১১] সাইদুল খাতির: ৭১