📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 দুঃখজনক একটি পরিসংখ্যান

📄 দুঃখজনক একটি পরিসংখ্যান


মানুষের অবসর সময় ও ব্যস্ত সময়ের গতি ও পরিমাণ বেশকম হওয়াকে কেন্দ্র করে ১৩০ বছরের দীর্ঘ সময়ের ওপর গবেষণা করে ১৯৫০ সালের শেষদিকে তুলনামূলক একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, ১৮৭৫ সালে সাধারণত মানুষের কর্মবিমুখ অবসর সময় ছিল ৮-৭%, আর কর্মমুখর সময় ছিল ২৬%। ১৯৫০ সালে এসে মানুষের কর্মবিমুখ অবসরের সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০%-এ, আর কর্মমুখর সময়ের অবনতি হয়ে তা এসে পৌঁছেছে ১৫%-এ। ২০০০ সালে মানবজীবনের কর্মবিমুখ অবসর সময়ের গতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭%-এ, পক্ষান্তরে কর্মমুখর সময়ের গতি পৌঁছেছে আনুমানিক ৮%-এ। এভাবে মানুষের কর্মবিমুখ হয়ে অবসর থাকার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান, আর কর্মমুখর হয়ে ব্যস্ত থাকার প্রবণতা ক্রমহ্রাসমান।
অন্য একটি পরিসংখ্যান পরিচালনা করা হয়েছিল আরববিশ্বের চারটি দেশের ওপর। যার মধ্যে ছিল আরব-আমিরাত, তিউনিসিয়া, সুদান ও মৌরতানিয়া। এই পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, ছাত্রদের শিক্ষানবিশকালীন অবসর মুহূর্ত থাকে ৩-৪%, আর ছুটিকালীন অবসর মুহূর্ত থাকে ৯%।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান চালানো হয়েছিল নারী-পুরুষের ওপর, যাতে বেরিয়ে এসেছে যে, কর্মনবিশকালীন আমাদের শহরে পুরুষদের প্রাত্যহিক কর্মবিমুখ অবসর সময় কাটে চার ঘণ্টা, আর নারীদের কর্মবিমুখ সময় কাটে প্রাত্যহিক প্রায় তিন ঘণ্টা। পক্ষান্তরে ছুটির দিনগুলোতে পুরুষদের কর্মবিমুখ সময় কাটে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টার মাঝামাঝি, আর নারীদের কর্মবিমুখ অবসর সময় কাটে পাঁচ থেকে দশ ঘণ্টার মাঝামাঝি।

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 মুসলিমজীবনে অবসরসময় আছে কি?

📄 মুসলিমজীবনে অবসরসময় আছে কি?


বর্তমানে মানুষ অবসরের অর্থ বলতে যা বোঝায় তা হলো, মানুষ যখন কোনো কাজে ব্যস্ত না থাকবে বা কোনো দায়িত্ব পালন না করবে। যদি অবসরের এই অর্থই গ্রহণ করা হয়, তাহলে মুসলিমজীবনে অবসরের কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না, যার প্রতি তারা যত্নবান হতে পারে। কারণ, একজন মুসলিমের জীবনে কর্মহীন একটি মুহূর্তও অতিক্রান্ত হতে পারে না, যখন সে কোনো দায়িত্ব পালন করবে না। কারণ, তার দায়িত্বে যদি দ্বীনি ওয়াজিব কোনো বিষয় না থাকে, তাহলে দুনিয়াবি কোনো ওয়াজিব দায়িত্ব অবশ্যই থাকবে। যদি এই দুটির কোনোটিই না থাকে, তাহলে একজন মুসলিমের জীবনে সুন্নাতি কাজের তো কোনো সীমারেখা নেই; সেগুলো সে আদায় করবে। যার শুরু হতে পারে 'কিয়ামুল লাইল' তথা তাহাজ্জুদ সালাতের [১] মাধ্যমে এবং শেষ হতে পারে আকাশ-জমিন সৃষ্টির মাঝে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করার মাধ্যমে।
যদি কোনো মুসলমান শরিয়তে বর্ণিত সমস্ত সুন্নাত তার জীবনে প্রতিফলিত করতে চায়, তাহলে এর আধিক্যের কারণে এই ইচ্ছার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। অতএব, মুসলিমজীবনে অবসর সময় কোথায়?!
বর্তমান যুগে মানুষের মাঝে কর্মবিমুখ থাকার যে প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তার মূল কারণ রুহানি-শূন্যতা। মুহাম্মাদি শরিয়ত থেকে দূরে থাকার কারণে যার সৃষ্টি। যাকে আত্মিক, জ্ঞানগত এবং প্রবৃত্তিগত অকর্মণ্যতা বলা যেতে পারে। কেননা, মানুষ সময়কে অর্থহীন করার পূর্বে আত্মিক, জ্ঞানগত এবং প্রবৃত্তিগতভাবে নিজেই অকর্মণ্য হয়ে পড়ে।
একজন মুসলিম তো সর্বদা মনেপ্রাণে এই প্রত্যাশা লালন করবে এবং প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে যে, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হয়। যেমন: আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেছেন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ .
আমি জিন ও মানুষ জাতিকে আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। [সুরা আজ-জারিয়াত: ৫৬]
তো এই ইবাদত তার ব্যাপক ও পরিব্যাপ্তকারী অর্থে প্রত্যেক সেই বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আমলকে পরিব্যাপ্ত করবে, যেগুলো আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন।
সুতরাং একজন মুসলিমের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় হবে এক ইবাদত থেকে আরেক ইবাদতের দিকে এবং এক নেককাজ থেকে আরেক নেককাজের দিকে প্রত্যাবর্তন করার কাজে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَ يَتَفَكَّرُوْنَ فِي خَلْقِ السَّمَوتِ وَ الْأَرْضِ ج رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هُذَا بَاطِلًا : سُبْحُنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহর জিকির করে এবং নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করে। তারপর বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি এগুলো বৃথা সৃষ্টি করোনি। তুমি পবিত্র। অতএব, আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করো। [সুরা আলে ইমরান : ১৯১]
কাতাদা রহ. বলেন, 'হে আদমসন্তান, এসব তোমার অবস্থা। অর্থাৎ তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর জিকির করো। যদি দাঁড়িয়ে না পারো, তাহলে বসে বসে আল্লাহর জিকির করো। যদি বসে না পারো, তাহলে শুয়ে শুয়ে আল্লাহর জিকির করো। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজিকরণ এবং সুবিধাপ্রদান।[২]
মুমিনের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর আনুগত্য এবং তার তাকওয়ার মাধ্যমে সজ্জিত করতে হবে। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ وَ بِذلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মরণ সমগ্র জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি এ বিষয়েই আদিষ্ট হয়েছি এবং সর্বপ্রথম মুসলিম-এগুলোকে মান্যকারী। [সুরা আল-আনআম : ১৬২-১৬৩]
এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা সরাসরি তার নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশ প্রদান করে বলেছেন—
فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ، وَ إِلَى رَبِّكَ فَارْغَبُ .
যখন তুমি অবসর হও তখন আত্মনিয়োগ করো এবং তোমার প্রতিপালকের দিকে মনোনিবেশ করো। [সুরা আল-ইনশিরাহ : ৭-৮]
তো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কাজ থেকে অবসর হবেন এবং কোন কাজে আত্মনিয়োগ করবেন?
ইমাম ইবনু কাসির রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লাহর যা বুঝাতে চেয়েছেন তা পরিষ্কার করে দিয়ে বলেছেন, 'যখন তুমি পার্থিব কাজ থেকে অবসর হবে, তার ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হবে এবং তার সাথে সম্পর্ক কর্তিত হবে, তখন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হবে এবং হৃদয়কে জাগতিক জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট করবে।[৩]
সারকথা হলো, ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় অবসর বলা হয় কেবল দুনিয়াবি কাজ শেষ করাকে, একেবারে কর্মহীন হয়ে বসে থাকাকে নয়; যেমন বর্তমান যুগে মানুষ মনে করে থাকে。
একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য হলো, সে প্রতিটি কাজে সর্বাবস্থায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুগামী হবে। অতএব, যখন তার নিয়মতান্ত্রিক কাজ বা শিক্ষাকার্যক্রম থেকে অবসর হবে, তখন নিজেকে ইলম অন্বেষণের কাজে নিজেকে ব্যাপৃত করবে। যখন ইলম অন্বেষণের কাজ থেকে অবসর হবে, তখন সালাতে আত্মনিয়োগ করবে। যখন সালাত থেকে অবসর হবে, তখন দুআয় মশগুল হবে। এভাবে এককাজ থেকে অবসর হয়ে অন্যকাজে ব্রত হবে। ঠিক যেভাবে আল্লাহ তাআলা তার নবিকে দুনিয়াবি কাজ থেকে অবসর হয়ে আখিরাতের কাজে আত্মনিয়োগ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।

টিকাঃ
[১] উল্লেখ্য, তাহাজ্জুদের সালাত সুন্নাত নয়; বরং নফলের অন্তর্ভুক্ত। তবে নফল আমল যেহেতু সুন্নাত তথা হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত হয়ে থাকে, তাই রূপক অর্থে নফলকে কখনো সুন্নাত বলে অভিহিত করা হয়। -সম্পাদক
[২] তাফসির ইবনি জারির তাবারি: ৩/৫৫০
[৩] তাফসির ইবনি কাসির: ৪/৬৭৭

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 মুসলিমজীবনে নিয়তের প্রক্রিয়া

📄 মুসলিমজীবনে নিয়তের প্রক্রিয়া


এটা কখনও ইসলামের অভিপ্রায় নয় যে, মানুষ তার গোটা জীবন রুকু-সিজদায় কাটিয়ে দেবে এবং পুরো সময় কেবল এ উদ্দেশ্যেই ব্যয় করবে। বরং মানবজীবনে উদ্দেশ্যের বিশাল-বিস্তৃত এক ভান্ডার রয়েছে; পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শরিয়ত আমাদের জন্য যা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছে। যে ব্যক্তি সেগুলো উদঘাটন করবে এবং তা থেকে উপকৃত হবে, সে মহাকল্যাণ লাভ করতে পারবে এবং অফুরন্ত নিয়ামতে ধন্য হতে পারবে।
তো সেই বিশাল ভান্ডারের নাম হলো 'নেক নিয়ত' বা ভালো কাজের সংকল্প। 'নিয়ত' বলা হয় এমন সুদৃঢ় সংকল্পকে, যা মানুষের সাধারণ অভ্যাসকে ইবাদতে রূপান্তরিত করার প্রবল ক্ষমতা রাখে, যার বদৌলতে মানুষ তার প্রাত্যহিক পার্থিব জরুরি কাজের মাধ্যমেও আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে পারে। পার্থিব উপকার অর্জনের সাথে সাথে অপার্থিব-পারলৌকিক প্রতিদানও লুফে নিতে পারে খুব সহজে।
সুতরাং যদি কোনো মানুষ তার সার্বক্ষণিক সাধারণ কাজের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিয়ত করে এবং মুসলিম সমাজকে এই মানসিকতার ওপর শক্তিশালীরূপে প্রতিষ্ঠা করার নিয়তে কাজ করে যায়, তাহলে এই নিয়ত তার উভয়কালীন কল্যাণের মাধ্যম হবে।
ঠিক তেমনিভাবে মানুষ যদি তার আহার-নিদ্রার প্রাক্কালে এই নিয়ত করে যে, এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করার শক্তি অর্জন করবে, তাহলে এই আহার-নিদ্রাও তার মিজানের পাল্লায় নেকির সাথে যোগ হবে।
একবার মুআজ বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাৎ করে 'কিয়ামুল লাইল' তথা তাহাজ্জুদের সালাত নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন মুআজ বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন-
أَمَّا أَنَا فَأَنَامُ وَأَقُومُ فَأَحْتَسِبُ نَوْمَتِي كَمَا أَحْتَسِبُ قَوْمَتِي .
তবে আমি ঘুমাই এবং কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদ) আদায় করি। কিন্তু আমার ঘুমকেও ঠিক তেমনিভাবে ইবাদত মনে করি, যেমনিভাবে আমার সালাতকে ইবাদত মনে করি।[৪]
হাফিজুল হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেছেন, 'এই হাদিসের মর্ম হলো, প্রশান্ত থাকা অবস্থায়ও এমনভাবে সওয়াব অন্বেষণ করবে, ঠিক যেভাবে ক্লান্ত থাকা অবস্থায় সওয়াব কামনা করে থাকো। কেননা, ক্লান্তি দূরকারী প্রশান্তির মাধ্যমে যখন ইবাদতের শক্তি সঞ্চয় করতে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া হয়, তখনো সওয়াব পাওয়া যায়।[৫]
এখানেই শেষ নয়; বরং একজন স্বামী তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার মাধ্যমেও সওয়াব অর্জন করতে পারে। মুসলিম শরিফের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرُ قَالَ أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيهَا وِزْرُ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرًا .
তোমাদের স্ত্রীদের লজ্জাস্থানের মাঝেও সাদাকা রয়েছে। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাদের কেউ নিজের জৈবিক চাহিদা পূরণ করলেও কি সওয়াব পাবে? নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (পাল্টা জিজ্ঞেস করে) জবাব দিলেন, হারামভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণ করলে কি গুনাহ হবে না? ঠিক তেমনিভাবে যখন কেউ হালালভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণ করবে, তখন সে সওয়াব লাভ করবে।[৬]
ইমাম নববি রহ. এই হাদিসে সংযুক্তি করে বলেছেন, 'এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সত্যিকারের নিয়ত দ্বারা জায়িজ কাজ ইবাদতে রূপান্তরিত হয়। অতএব, স্ত্রী সঙ্গমের মাধ্যমে যখন স্ত্রীর অধিকার আদায় করার নিয়ত করা হবে, আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তার সাথে সদাচরণ করা হবে, নেকসন্তান প্রত্যাশা করা হবে, নিজেকে অবৈধ কাজ থেকে পবিত্র রাখা উদ্দেশ্য হবে, স্ত্রীকে অবৈধ সম্পর্ক থেকে মুক্ত রাখা মাকসাদ হবে, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দৃষ্টি কুপাত্রে পতিত হওয়া থেকে হিফাজত করার সংকল্প থাকবে, এমনিভাবে খারাপ কল্পনা এবং অপাত্রের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া থেকে বিরত থাকা উদ্দেশ্য হবে, কিংবা এমন অন্য কোনো মহৎ উদ্দেশ্য ও নিয়ত থাকবে, তখন এর মাধ্যমে অবশ্যই সওয়াব পাওয়া যাবে।'[৭]
এবার খুব মনোযোগসহ ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ.-এর কথাগুলো শুনুন!
তিনি এই হাদিসের ব্যাখ্যা করে বলেছেন, 'সর্বদা আল্লাহর অভিপ্রায় মোতাবেক চলে তার আনুগত্যে ব্যাপৃত থেকে সময়কে বিনির্মাণ করা, আল্লাহর ইবাদতে সহযোগিতা হয় এমন কাজে আত্মনিয়োগ করে সময়কে অলংকৃত করা; যেমন: পানাহার করা, বিবাহ- শাদি করা, নিদ্রা যাওয়া, বিশ্রাম গ্রহণ করা ইত্যাদি। তো এগুলোকে যখন এমন কাজের শক্তি সঞ্চয়কারী হিসেবে গ্রহণ করা হবে, যেগুলো আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, অথবা যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে বেঁচে থাকায় সাহায্য পাওয়া যায়, সেগুলোর মাধ্যমে সময়কে সাজানো, যদিও তাতে পরিপূর্ণ স্বাদ উপভোগ হয়, তবুও এগুলোর মাধ্যমে সওয়াব লাভ হয়। অতএব, এমন স্বাদের ও তৃপ্তির পবিত্র কাজের দ্বারা সময় সাজানোকে অনর্থক মনে করা যাবে না।[৮]

টিকাঃ
[৪] সহিহুল বুখারি: ১৩/২৪১, হাদিস: ৩৯৯৮, সহিহ মুসলিম: ৯/৩৪৫, হাদিস : ৩৪০৩
[৫] ফাতহল বারি শরহুল বুখারি: ৮/৬২
[৬] সহিহ মুসলিম: ৫/১৭৭, হাদিস: ১৬৭৪
[৭] শারহু সহিহি মুসলিম, নববি : ৭/৯২
[৮] মাদারিজুস সালিকিন: ২/১৭

📘 মুমিনের বিনোদন > 📄 অবসর সময় কীভাবে কাটাবেন?

📄 অবসর সময় কীভাবে কাটাবেন?


মুসলিমসমাজের প্রতিটি সদস্য যেহেতু একই শ্রেণির নয়, তাদের প্রত্যেকের অবসর সময়ের মাঝে তাই কম-বেশ হয়। কিছু মানুষ এমন হয়, যারা খুব অল্প সময়ই কর্মব্যস্ত রয়, আর বেশির ভাগ সময়ই অবসরে কাটায়। আর কিছু মানুষ তো রয়েছে এমন যে, সুদীর্ঘ ব্যস্ততা এবং কাজের অত্যধিক চাপের কারণে বিশ্রামের সময় পর্যন্ত অধরা থাকে。
একজন মুসলিম যখন কোনো কাজ শেষ করে, তখন তার সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। হয়তো সে জাগতিক কল্যাণে অন্য কোনো কাজে আত্মনিয়োগ করবে, কিংবা পরলৌকিক কল্যাণে দ্বীনি কোনো কাজে ব্যাপৃত হবে।
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন-
إني لأكره أن أرى الرجل فارغا لا في عمل دنياه ولا في عمل أخرة .
'আমি মানুষকে কর্মহীন দেখতে অপছন্দ করি; যে দুনিয়ার কোনো কাজও করে না, আবার পরকালীন কোনো কাজেও আত্মনিয়োগ করে না।[৯]
প্রখ্যাত এই সাহাবি কৌশলসমৃদ্ধ চমৎকার একটি কথা বলেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য দুটি জগতের ব্যবস্থা করেছেন, যেখানে আমাদেরকে বসবাস করতে হবে-ইহজগৎ ও পরজগৎ। আমাদের নির্দেশ করেছেন উভয় জগৎ বিনির্মাণ করার। অতএব, অবসরের বাহানায় উভয় জগতের কাজ থেকে বিরত থাকা হবে চরম বাড়াবাড়ির নামান্তর।
আল্লাহ তাআলা আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন-
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنْسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا .
আল্লাহ তাআলা তোমাকে যা দান করেছেন, তার মাধ্যমে পরকাল অন্বেষণ করো। আর তোমার দুনিয়ার অংশকেও ভুলে যেয়ো না। [সুরা আল-কাসাস : ৭৭]
পরকালের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা অন্যত্র নির্দেশ করেছেন-
فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ .
আল্লাহর জিকিরের প্রতি ধাবিত হও! [সুরা আল-জুমআ : ৯]
আর দুনিয়ার ব্যাপারে ইরশাদ করেছেন-
فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا .
সুতরাং দুনিয়ার বক্ষের ওপর হেঁটে চলো! [সুরা আল-মুলক : ১৫]
তো এই আয়াত দুটিতে আল্লাহ তাআলা পরকালের দিকে গমনের ক্ষেত্রে 'দৌড়' শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং ইহকালের দিকে গমনের ক্ষেত্রে 'হেঁটে চলা' শব্দ ব্যবহার করেছেন। এটা প্রমাণ করে যে, পরকালীন কাজের দিকে খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে হবে এবং ইহকালীন কাজের দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।
অতএব, প্রতিটি মুসলিমের জন্য অতীব জরুরি হলো, যখনই সে অবসর সময় পাবে, খুব দ্রুত দুনিয়াবি কাজগুলো সেরে ফেলবে, যেগুলোর দিকে তার মনমস্তিষ্ক জড়িয়ে থাকে। যেমন: রাষ্ট্রীয় কাজ-কর্ম, সাংগঠনিক কর্মপরিক্রমা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কার্যাবলি; কেনাবেচা ইত্যাদিসহ অন্যান্য যাবতীয় পার্থিব কাজ সম্পাদন।
অতঃপর যখন এ সকল ঝামেলা থেকে অবসর হবে, দুনিয়াবি কোনো কাজ থাকবে না, তখন পরকালীন কাজে আত্মনিয়োগ করবে। যেমন: ইলম অর্জন, কুরআন তিলাওয়াত, মসজিদে গিয়ে সালাতের প্রতীক্ষায় থাকাসহ অন্যান্য ইবাদতে মগ্ন হওয়া।
একবার কাজি শুরাইহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এমন এক জনপদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যারা খেলাধুলা করছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কী হলো, তোমরা খেলায় মত্ত কেন? তারা জবাব দিল, আমরা এখন অবসর পেয়েছি তাই একটু খেলাধুলা করছি। আমাদের দায়িত্বে কিছু কাজ ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে, এখন কোনো কাজ নেই। কাজি শুরাইহ রহ. বললেন, অবসর সময়ে তোমাদেরকে খেলার নির্দেশ প্রদান করা হয়নি।[১০]
অবসরপ্রাপ্ত মানুষকে তো নির্দেশ করা হয়েছে, সে যেন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আল্লাহর আনুগত্য করে পরকাল বিনির্মাণ করে, কিংবা দুনিয়াবি অন্য কোনো কাজ করে ইহকাল বিনির্মাণ করে। মুসলিমজীবনে খেলাধুলার অনুমতি রয়েছে, তবে তা একান্তই সীমিত পরিসরে। মৌলিকভাবে বা পেশা হিসেবে খেলাধুলা কীভাবে প্রকৃত কোনো মুসলিমের কাজ হতে পারে?

টিকাঃ
[৯] হিলইয়াতুল আওলিয়া: ১/১৩০
[১০] হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/১৩৪, সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৪০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00