📄 অবসর
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 অবসরের উপকারিতা
পশ্চিমারা অবসর ও অকর্মণ্যতার অপকারিতার ব্যাপারে খুব দ্রুতই সতর্ক হয়ে নিজেদের সামলে নিয়েছে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা নতুন এক শিক্ষা আবিষ্কার করে; নাম দেয় 'রিটারমেন্ট নলেজ' বা অবসরের জ্ঞান। এটা সামগ্রিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের একটি শাখা। জ্ঞানের এই শাখাটি বিনোদন ও অবসরের মর্ম ব্যাখ্যা করে। পাশ্চাত্যের লোকজনের মাঝে অহেতুক কাজ এবং বিনোদনমূলক কাজের আকার-প্রকার নির্ধারণ ও প্রণয়ন করে, যার নির্দেশনায় প্রতিটি ব্যক্তির মাঝে সৃজনশীল শক্তি বৃদ্ধি করা এবং সমাজের মধ্যে সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হয়।
কিন্তু তাদের হাতে রোপণকৃত জ্ঞানের এই বৃক্ষ সত্য-মিথ্যার মিশ্রণে সৃষ্ট, যার মধ্যে কিছু বিষয় আছে এমন, যেগুলো গ্রহণ করার উপযুক্ত এবং এগুলোর ওপর নির্ভর করা যায়। আর কিছু বিষয় আছে পরিত্যাজ্য; কোনো অবস্থাতেই যেগুলো গ্রহণ করা যায় না।
এই দ্বিমুখী ও সাংঘর্ষিক সমস্যার সমাধানে সারাবিশ্বের সকল স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষকে উপলক্ষ্য করে আধুনিক বিশ্বের গবেষকরা একটি শিক্ষাপদ্ধতি দাঁড় করিয়েছেন, যার ওপর ভিত্তি করে তারা এই বিষয়ে গোপন একটি সমাধানে পৌঁছেছেন।
📄 দুঃখজনক একটি পরিসংখ্যান
মানুষের অবসর সময় ও ব্যস্ত সময়ের গতি ও পরিমাণ বেশকম হওয়াকে কেন্দ্র করে ১৩০ বছরের দীর্ঘ সময়ের ওপর গবেষণা করে ১৯৫০ সালের শেষদিকে তুলনামূলক একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, ১৮৭৫ সালে সাধারণত মানুষের কর্মবিমুখ অবসর সময় ছিল ৮-৭%, আর কর্মমুখর সময় ছিল ২৬%। ১৯৫০ সালে এসে মানুষের কর্মবিমুখ অবসরের সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০%-এ, আর কর্মমুখর সময়ের অবনতি হয়ে তা এসে পৌঁছেছে ১৫%-এ। ২০০০ সালে মানবজীবনের কর্মবিমুখ অবসর সময়ের গতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭%-এ, পক্ষান্তরে কর্মমুখর সময়ের গতি পৌঁছেছে আনুমানিক ৮%-এ। এভাবে মানুষের কর্মবিমুখ হয়ে অবসর থাকার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান, আর কর্মমুখর হয়ে ব্যস্ত থাকার প্রবণতা ক্রমহ্রাসমান।
অন্য একটি পরিসংখ্যান পরিচালনা করা হয়েছিল আরববিশ্বের চারটি দেশের ওপর। যার মধ্যে ছিল আরব-আমিরাত, তিউনিসিয়া, সুদান ও মৌরতানিয়া। এই পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, ছাত্রদের শিক্ষানবিশকালীন অবসর মুহূর্ত থাকে ৩-৪%, আর ছুটিকালীন অবসর মুহূর্ত থাকে ৯%।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান চালানো হয়েছিল নারী-পুরুষের ওপর, যাতে বেরিয়ে এসেছে যে, কর্মনবিশকালীন আমাদের শহরে পুরুষদের প্রাত্যহিক কর্মবিমুখ অবসর সময় কাটে চার ঘণ্টা, আর নারীদের কর্মবিমুখ সময় কাটে প্রাত্যহিক প্রায় তিন ঘণ্টা। পক্ষান্তরে ছুটির দিনগুলোতে পুরুষদের কর্মবিমুখ সময় কাটে পাঁচ থেকে আট ঘণ্টার মাঝামাঝি, আর নারীদের কর্মবিমুখ অবসর সময় কাটে পাঁচ থেকে দশ ঘণ্টার মাঝামাঝি।
📄 মুসলিমজীবনে অবসরসময় আছে কি?
বর্তমানে মানুষ অবসরের অর্থ বলতে যা বোঝায় তা হলো, মানুষ যখন কোনো কাজে ব্যস্ত না থাকবে বা কোনো দায়িত্ব পালন না করবে। যদি অবসরের এই অর্থই গ্রহণ করা হয়, তাহলে মুসলিমজীবনে অবসরের কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না, যার প্রতি তারা যত্নবান হতে পারে। কারণ, একজন মুসলিমের জীবনে কর্মহীন একটি মুহূর্তও অতিক্রান্ত হতে পারে না, যখন সে কোনো দায়িত্ব পালন করবে না। কারণ, তার দায়িত্বে যদি দ্বীনি ওয়াজিব কোনো বিষয় না থাকে, তাহলে দুনিয়াবি কোনো ওয়াজিব দায়িত্ব অবশ্যই থাকবে। যদি এই দুটির কোনোটিই না থাকে, তাহলে একজন মুসলিমের জীবনে সুন্নাতি কাজের তো কোনো সীমারেখা নেই; সেগুলো সে আদায় করবে। যার শুরু হতে পারে 'কিয়ামুল লাইল' তথা তাহাজ্জুদ সালাতের [১] মাধ্যমে এবং শেষ হতে পারে আকাশ-জমিন সৃষ্টির মাঝে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করার মাধ্যমে।
যদি কোনো মুসলমান শরিয়তে বর্ণিত সমস্ত সুন্নাত তার জীবনে প্রতিফলিত করতে চায়, তাহলে এর আধিক্যের কারণে এই ইচ্ছার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। অতএব, মুসলিমজীবনে অবসর সময় কোথায়?!
বর্তমান যুগে মানুষের মাঝে কর্মবিমুখ থাকার যে প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তার মূল কারণ রুহানি-শূন্যতা। মুহাম্মাদি শরিয়ত থেকে দূরে থাকার কারণে যার সৃষ্টি। যাকে আত্মিক, জ্ঞানগত এবং প্রবৃত্তিগত অকর্মণ্যতা বলা যেতে পারে। কেননা, মানুষ সময়কে অর্থহীন করার পূর্বে আত্মিক, জ্ঞানগত এবং প্রবৃত্তিগতভাবে নিজেই অকর্মণ্য হয়ে পড়ে।
একজন মুসলিম তো সর্বদা মনেপ্রাণে এই প্রত্যাশা লালন করবে এবং প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে যে, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হয়। যেমন: আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেছেন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ .
আমি জিন ও মানুষ জাতিকে আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। [সুরা আজ-জারিয়াত: ৫৬]
তো এই ইবাদত তার ব্যাপক ও পরিব্যাপ্তকারী অর্থে প্রত্যেক সেই বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আমলকে পরিব্যাপ্ত করবে, যেগুলো আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন।
সুতরাং একজন মুসলিমের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় হবে এক ইবাদত থেকে আরেক ইবাদতের দিকে এবং এক নেককাজ থেকে আরেক নেককাজের দিকে প্রত্যাবর্তন করার কাজে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَ عَلَى جُنُوبِهِمْ وَ يَتَفَكَّرُوْنَ فِي خَلْقِ السَّمَوتِ وَ الْأَرْضِ ج رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هُذَا بَاطِلًا : سُبْحُنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ.
যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহর জিকির করে এবং নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করে। তারপর বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি এগুলো বৃথা সৃষ্টি করোনি। তুমি পবিত্র। অতএব, আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করো। [সুরা আলে ইমরান : ১৯১]
কাতাদা রহ. বলেন, 'হে আদমসন্তান, এসব তোমার অবস্থা। অর্থাৎ তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর জিকির করো। যদি দাঁড়িয়ে না পারো, তাহলে বসে বসে আল্লাহর জিকির করো। যদি বসে না পারো, তাহলে শুয়ে শুয়ে আল্লাহর জিকির করো। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজিকরণ এবং সুবিধাপ্রদান।[২]
মুমিনের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর আনুগত্য এবং তার তাকওয়ার মাধ্যমে সজ্জিত করতে হবে। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে—
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ وَ بِذلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মরণ সমগ্র জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি এ বিষয়েই আদিষ্ট হয়েছি এবং সর্বপ্রথম মুসলিম-এগুলোকে মান্যকারী। [সুরা আল-আনআম : ১৬২-১৬৩]
এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা সরাসরি তার নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্দেশ প্রদান করে বলেছেন—
فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ، وَ إِلَى رَبِّكَ فَارْغَبُ .
যখন তুমি অবসর হও তখন আত্মনিয়োগ করো এবং তোমার প্রতিপালকের দিকে মনোনিবেশ করো। [সুরা আল-ইনশিরাহ : ৭-৮]
তো নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কাজ থেকে অবসর হবেন এবং কোন কাজে আত্মনিয়োগ করবেন?
ইমাম ইবনু কাসির রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লাহর যা বুঝাতে চেয়েছেন তা পরিষ্কার করে দিয়ে বলেছেন, 'যখন তুমি পার্থিব কাজ থেকে অবসর হবে, তার ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হবে এবং তার সাথে সম্পর্ক কর্তিত হবে, তখন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হবে এবং হৃদয়কে জাগতিক জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট করবে।[৩]
সারকথা হলো, ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় অবসর বলা হয় কেবল দুনিয়াবি কাজ শেষ করাকে, একেবারে কর্মহীন হয়ে বসে থাকাকে নয়; যেমন বর্তমান যুগে মানুষ মনে করে থাকে。
একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য হলো, সে প্রতিটি কাজে সর্বাবস্থায় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুগামী হবে। অতএব, যখন তার নিয়মতান্ত্রিক কাজ বা শিক্ষাকার্যক্রম থেকে অবসর হবে, তখন নিজেকে ইলম অন্বেষণের কাজে নিজেকে ব্যাপৃত করবে। যখন ইলম অন্বেষণের কাজ থেকে অবসর হবে, তখন সালাতে আত্মনিয়োগ করবে। যখন সালাত থেকে অবসর হবে, তখন দুআয় মশগুল হবে। এভাবে এককাজ থেকে অবসর হয়ে অন্যকাজে ব্রত হবে। ঠিক যেভাবে আল্লাহ তাআলা তার নবিকে দুনিয়াবি কাজ থেকে অবসর হয়ে আখিরাতের কাজে আত্মনিয়োগ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
টিকাঃ
[১] উল্লেখ্য, তাহাজ্জুদের সালাত সুন্নাত নয়; বরং নফলের অন্তর্ভুক্ত। তবে নফল আমল যেহেতু সুন্নাত তথা হাদিস দ্বারাই প্রমাণিত হয়ে থাকে, তাই রূপক অর্থে নফলকে কখনো সুন্নাত বলে অভিহিত করা হয়। -সম্পাদক
[২] তাফসির ইবনি জারির তাবারি: ৩/৫৫০
[৩] তাফসির ইবনি কাসির: ৪/৬৭৭