📄 অন্যকে ভালোবাসা
এক যুবক ইসলাম শেখার জন্য দামেশক যান। তিনি ভিন্ন ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার নাম ছিল আবু ইদরিস আল খাওলানি। পরবর্তী সময়ে তিনি উমাইয়া খিলাফতের প্রধান বিচারপতি হন।
যুবক অবস্থায় তিনি দামেশকের গ্র্যান্ড মসজিদে গিয়ে দেখতে পান, একটি হালাকায় অনেকেই বসে আছেন। আর একজন শাইখ সেখানে দারস দিচ্ছেন বা পড়াচ্ছেন। সেই শাইখ ছিলেন খুব কম বয়সি। তাঁকে দেখামাত্রই তিনি পছন্দ করেন। তিনি অন্যদের জিজ্ঞেস করলেন, উনি কে?
তাকে বলা হলো, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)। আবু ইদরিস আল খাওলালি (রহ.) মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর সাথে দেখা করার জন্য পরদিন আগে আগে মসজিদে যান। উপস্থিত হয়ে দেখতে পান তিনি নামাজ পড়ছেন।
নামাজ শেষে তাঁকে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাকে ভালোবাসি। মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর কসম? অর্থাৎ, এতটা নিশ্চিত হয়ে বলছ যে, তুমি আমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসো?
-জি, আল্লাহর কসম।
-আল্লাহর কসম?
-জি, আল্লাহর কসম।
অতঃপর মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) তাঁর চাদরের আঁচল ধরে টেনে বললেন, তাহলে তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো।
এই বলে মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) আবু ইদরিস আল খাওলানিকে নবিজির একটি হাদিস শোনান। নবিজি বলেন-তাদের ভালোবাসা আমার জন্য অপরিহার্য হয়ে যায়, যারা আমার জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, যারা আমার জন্য একসাথে বসে, যারা আমার জন্য পরস্পর সাক্ষাৎ করে, যারা আমার জন্যই একে অন্যের জন্য ব্যয় করে。
এ আলোচনার মূল উদ্দেশ্য কী? কেন একজন মুমিন আরেকজনের সাথে ভালো আচরণ করবে, এমনটাই তো? হ্যাঁ, এমনটা হলেও এর মূল কারণ হতে হবে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। একজন মুমিন আরেকজনকে ভালোবাসলে তবেই তার সাথে উত্তম আচরণ করতে পারবে। আরেকজনের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে কীভাবে তার প্রতি দানশীল আচরণ করতে পারে? তাকে উত্তম পরামর্শ দিতে পারে? দোষ গোপন রাখতে পারে? ক্ষমা করে দিতে পারে?
বোঝা গেল, উত্তম আখলাকের মূল হলো ভালোবাসা। একে অন্যের প্রতি ভালোবাসাবোধের কারণেই মানুষ অন্যের সাথে উত্তম আচরণ করে। নবিজি বলেন, ঈমানদার ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে。
অপর একজন মুমিন ভাইকে ভালোবাসা নফল কোনো ইবাদত নয়, এটা ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত। আপনি অন্য মুমিনকে যদি না ভালোবাসেন, কখনোই প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবেন না। প্রকৃত ঈমানদার না হলে জান্নাতে প্রবেশ করা অসম্ভব। জান্নাতে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে আপনাকে অবশ্যই অপর মুমিন ভাইয়ের জন্য থাকতে ভালোবাসতে হবে। আর এটা তখন 'আখলাক' থাকে না, হয়ে যায় 'আকিদা'।
নবিজি একজন সাহাবির কথা বললেন, যিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। অন্য একজন সাহাবি জানতে চাইলেন তাঁর আমল কী? তাঁর আমল সম্পর্কে জানতে তিনি গিয়ে ওই সাহাবির বাড়িতে দেখা করলেন। দেখতে পেলেন তিনি অতিরিক্ত নামাজ পড়েন না, ইবাদত করেন না, তাহলে কীসের জন্য তিনি জান্নাত লাভ করবেন?
অতঃপর জানালেন, অন্য মুসলিমের প্রতি তিনি বিদ্বেষ পোষণ করেন না। এই কারণে তিনি জান্নাত লাভ করবেন。
পূর্ববর্তী যুগের এক লোক একবার তাঁর ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আরেক গ্রামে যায়। আল্লাহ মানুষ রূপে ফেরেশতা প্রেরণ করেন। ফেরেশতা গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
-আমি অমুক গ্রামে আমার এক ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।
-তার কাছে কি তোমার কোনো আবদার আছে? কোনো কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্যে তার কাছে যাচ্ছ?
-না, আমি তো কেবল আল্লাহর জন্য তাকে ভালোবাসি।
-ফেরেশতা তাকে জানালেন, আমি আল্লাহর ফেরেশতা, তোমাকে অবহিত করার জন্য এসেছি-আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন, যেমন তুমি তোমার ভাইকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবেসেছ。
লোকটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার ভাইকে পছন্দ করত। ফলে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন এবং তাকে তাঁর প্রিয় বান্দার অন্তর্ভুক্ত করেন। মানুষকে যদি কেবল আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা যায়, আল্লাহর কাছে এরচেয়েও বেশি মর্যাদা রয়েছে। নবিজি বলেন, আল্লাহ বলেন-আমার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য যারা পরস্পরকে ভালোবাসে, তাদের জন্য রয়েছে নুরের মিম্বর। নবি ও শহিদগণ পর্যন্ত তাদের মর্যাদা দেখে ঈর্ষান্বিত হবে。
আপনার ঈমানের পূর্ণতা তখনই পাবে, আপনি যদি কাউকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসেন। ঈমানের মিষ্টতা-প্রশান্তি তখনই অনুভব করতে পারবেন, আপনি যদি কাউকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসেন।
কাউকে অন্তর থেকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসলে, জান্নাতে তার সাথে থাকার সুসংবাদ দিয়েছেন। আপনার জান্নাতে থাকার মর্যাদা হয়তো নিচু স্তরে হতে পারে, কিন্তু কাউকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসার ফলে তার প্রতি দয়া-মমতার জন্য আল্লাহ আপনাকে তার সাথে রাখবেন।
একবার জনৈক বেদুইন এসে নবিজিকে জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন হবে? তিনি পালটা প্রশ্ন করে জানতে চাইলেন, কিয়ামতের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করেছ? সে বলল, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। এ কথা শুনে নবিজি বললেন-যাকে তুমি ভালোবাসো, তাঁর সাথেই তোমার কিয়ামত হবে (অর্থাৎ তোমার সঙ্গী)।
এই হাদিসটি আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি তখন কমবয়সি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে হাদিসটি বর্ণনার সময় বলেন-আমার কাছে এই হাদিসের চেয়ে প্রিয় আর কোনো হাদিস নেই। আমি নবিজিকে, আবু বকর, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে ভালোবাসি। আশা করি, তাঁদের ভালোবাসি বলেই তাঁদের সাথে জান্নাতে বসবাস করতে পারব; যদিও তাঁদের আমলের মতো আমি আমল করতে পারিনি。
আপনি যদি আবু বকর (রা.)-কে ভালোবাসেন, তাহলে তাঁর মতো ইবাদত না করেও জান্নাতে তাঁর সঙ্গী হতে পারেন। এটা হলো অন্যকে ভালোবাসার সবচেয়ে বড়ো ফজিলত। একজন আলিমকে যদি ভালোবাসেন, তাঁর মতো আমল না করেও জান্নাতে তার সঙ্গী হতে পারেন; কেবল তার প্রতি ভালোবাসার কারণে।
আমরা বেশির ভাগ সময়ই শুধু ইবাদত (নামাজ, রোজা, জিকির) নিয়ে কথা বলি। কিন্তু আখলাক এবং মুমিনের ব্যক্তিত্ব কেমন হওয়া উচিত বা এর জন্য কী কী আমল করা প্রয়োজন এ নিয়ে কথা বলি না। ইসলাম যেমন ইবাদতের নাম, তেমনই আখলাকেরও নাম। আমল ও আখলাক এ দুয়ের সমন্বয়েই ইসলাম। আল্লাহ আমাদের উত্তম আমল করার তওফিক দিন, আমিন।
তবে নবিজির একটি হাদিস দিয়ে পুরো বইয়ের ইতি টানতে চাই। নবিজি বলেন-তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটা পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে。
টিকাঃ
২৯৬ মুসনাদে আহমাদ: ২১৫২৫
২৯৭ সহিহ মুসলিম: ৯৮
২৯৮ মুসনাদে আহমাদ: ১২২৮৬
২৯৯ সহিহ মুসলিম: ৬৪৪৩
৩০০ জামে আত-তিরমিজি: ২৩৯০
৩০১ সহিহ বুখারি: ৩৬৮৮
৩০২ সহিহ বুখারি: ১৩