📘 মুমিনের আখলাক > 📄 দানশীলতা

📄 দানশীলতা


মুমিন ব্যক্তিত্বের দানশীলতার এই গুণকে ‘আখলাকের রানি’ বলা যায়। অন্যকে এমনভাবে দান করতে হবে, তার কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করা যাবে না। দান করার পর আশা করতে হবে আল্লাহর কাছে। এর বিনিময়ে আল্লাহ আপনাকে দান করবেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আনসারদের প্রশংসা করেন। তারা মুহাজিরদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিল, খাবারের ব্যবস্থা করেছিল। তিনি বলেন-
‘আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে, তার জন্য তারা (আনসার) তাদের অন্তরে ঈর্ষা অনুভব করে না। নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে প্রাধান্য দেয়।’
আমরা যখন কোনো কিছু দান করি, মনে মনে বলি-টাকাটা থাকলে এটা কিনতে পারতাম। দান করার পরও টাকার প্রতি একধরনের আকর্ষণ থেকে যায়। কিন্তু আনসারদের ব্যাপারটি ছিল পুরোপুরিই ভিন্ন। তাঁরা হাত দিয়ে যেমন দান করে, মন দিয়েও তারা ঢেলে দান করে। ফলে দান করার পর তাঁদের মনের মধ্যে কোনো অশান্তি ছিল না, আফসোস ছিল না!
তাঁরা নিজেরা অভাবগ্রস্ত ছিলেন। নিজেদের এমন অভাব থাকা সত্ত্বেও মুহাজির ভাইদের দান করেন। ধরুন, আজকে আপনার বাসায় বিরিয়ানি রান্না হয়েছে। অনেক দিন ধরে আপনি বিরিয়ানি খান না। কিন্তু রান্নার পর পুরো খাবারটি অন্যকে দিয়ে দিলেন। দেওয়ার পর আপনার মনে কোনো আফসোস নেই, একবারের জন্যও মনে হলো না, ইশ! একটু যদি খেয়ে দেখতাম। আনসারদের দান ছিল ঠিক এমন।
এই আয়াত থেকে দুটি বিষয় বোঝা যায়।
• মন থেকে দান করা এবং
• আপনার কাছে যা পছন্দনীয়, তা দান করা।
পবিত্র কুরআনের আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করতে পারবে না; যতক্ষণ না তা থেকে ব্যয় করবে, যা তোমরা ভালোবাসো।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন সাহাবি ছিলেন আবু তালহা। তিনি ছিলেন আনাস ইবনে মালেক (রা.)-এর সৎ-বাবা। এ আয়াতটি শোনার পর আবু তালহা (রা.) নবিজির কাছে যান। গিয়ে বলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! মসজিদে নববির পাশে 'বায়রুহা' নামক বাগানটি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
আবু তালহা (রা.)-এর অনেকগুলো বাগান ছিল। তার মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বাগান বায়রুহা। উল্লেখ্য, সাহাবিরা তাঁদের পোষা প্রাণী; এমনকি বাগানগুলোর নামকরণ করতেন। নবিজিও পোষা প্রাণীর নাম রাখতেন।
আপনি যদি মসজিদে নববির পেছনের দরজা কিং ফাহাদ গেইট দিয়ে প্রবেশ করেন, সেখান থেকে বামদিকে ১৫০ ফুট হাঁটেন, দেখতে পাবেন বায়রুহা বাগানটি। আবু তালহা (রা.) তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বাগানটি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন। তিনি বলেন-এটা আল্লাহর নামে সাদাকা করা হলো, আমি এর দ্বারা কল্যাণ কামনা করি এবং তা আল্লাহর নিকট আমার জন্য সঞ্চয়রূপে থাকবে। কাজেই, আপনি যাকে দান করলে হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব হয় তাকেই দান করুন।
নবিজি আবু তালহার দানকে স্বাগত জানালেন। তিনি বললেন, তোমাকে ধন্যবাদ। এটা হচ্ছে লাভজনক সম্পদ, এটা হচ্ছে লাভজনক সম্পদ। তুমি যা বলেছ তা শুনলাম। আমি মনে করি, তোমার আপনজনদের মধ্যে তা বণ্টন করে দাও।'
পবিত্র কুরআনের প্রথম দিকের নাজিল হওয়া একটি সূরায় আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রশংসা করেন। কেননা, তারা নিজের খাবার অনাহারির মুখে বিলিয়ে দেয়; যদিও ওই খাবারের প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল। তিনি বলেন- 'তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।'
আর খাবার দেওয়ার পর তারা জানিয়ে দেয়- 'আমরা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের খাদ্য দান করি। তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও কামনা করি না।'
দানশীলতার গুণটি আল্লাহ খুব পছন্দ করেন। আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি নাম হলো-আল কারিম। কুরআনকে 'কারিম' নামেও ডাকা হয়। জিবরাইল (আ.)-কে 'কারিম' নামে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। নবিজিকেও 'কারিম' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। 'কারিম' দুই ধরনের হতে পারে—
• দান-সাদাকা করা এবং
• পরিবারের সাথে, আত্মীয়দের সাথে সুন্দর আচরণ করা।
অন্যের সাথে হাসিমুখে কথা বললে, প্রয়োজনে এগিয়ে গেলে, আন্তরিকতা দেখানোটা দান-সাদাকার সমপর্যায়ের। আপনি যদি আর্থিকভাবে দান-সাদাকা করতে না পারেন, এই কাজগুলোর মাধ্যমেও দান-সাদাকার সমপরিমাণ সওয়াব অর্জন করতে পারেন। আর তা যদি পরিবারের পেছনেও ব্যয় করেন, সাদাকার সওয়াব পাবেন। নবিজি বলেন-আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক দিনার ব্যয় করা, একজন দাস মুক্ত করতে এক দিনার ব্যয় করা, গরিব লোককে এক দিনার দান এবং পরিবারের পেছনে এক দিনার ব্যয় করা; এসবের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো-পরিবারের পেছনে এক দিনার ব্যয় করা।
দানশীলতার গুণটি পরিবার থেকে শুরু করতে হবে, তারপর সমাজ। আমরা পরিবারের লোকদের জন্য যেমন ব্যয় করব, তেমনই ব্যয় করব বাইরের লোকজনের মধ্যে। নবিজির জীবনে দানশীলতার গুণের পরিমাণ বলে শেষ করা যাবে না। তাঁর পুরো জীবনটাই কেটে গেছে অন্যকে দান করার মধ্য দিয়ে। নিজের দিকটা চিন্তা না করে তিনি অন্যের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দিতেন, দান করতেন। তাঁর এমন দানশীলতার বৈশিষ্ট্য একটি হাদিস থেকে সহজে বোঝা যায়। জাবির (রা.) বলেন-নবিজির নিকট কোনো জিনিস চাওয়া হলে, তিনি কখনোই 'না' বলেননি。
অর্থাৎ, নবিজির কাছে কেউ কিছু চাইতে এলে তিনি নিঃসংকোচে সেটা দিয়ে দিতেন; ধমক দেওয়া তো অনেক দূরের কথা!
মনে করুন, আপনি খুব শখ করে একটি মোবাইল কিনলেন। অনেক দিনের জমানো টাকা দিয়েই তা কেনা হলো। টাকা বাঁচাতে গিয়ে অনেক সময় দুই কিলোমিটার রাস্তা গাড়িতে না চড়ে হেঁটেছেন। দুপুরের খাবারে ভালো খাবার খাননি, মন চেয়েছিল এক পিস মুরগির ঝাল ফ্রাই খাই; কিন্তু লোভাতুর জিহ্বা সংবরণ করেছেন। সেই শখের টাকা দিয়ে মোবাইলটি মার্কেট থেকে কেনার পর কিছুক্ষণ ব্যবহার করলেন। নতুন মোবাইল! আপনি খুব উন্মত্ত হয়ে আছেন।
হঠাৎ আপনার এক বন্ধু এসে বলল-দোস্ত, তোর মোবাইলটা তো অনেক সুন্দর। আমাকে দিয়ে দে না, প্লিজ! তখন ঐ বন্ধুর আবদার শুনে আপনার কেমন লাগবে? সে যদি সত্যিই বারবার এমন বলতে থাকে, আমার ধারণা, আপনি তো রাগে গড়গড় করবেন। আবদার বাড়তে থাকলে একসময় হয়তো ধমক দেবেন। এমনটা হওয়াই তো স্বাভাবিক, তাই না?
একবার এক মহিলা নবিজিকে একটি চাদর উপহার দিলেন। চাদরটি ঝালরসহ বোনা। এমনিতেই নবিজির একটি চাদরের খুব প্রয়োজন ছিল। তার মাঝেই মহিলাটিও শখ করে চাদরটি দিলেন। হাতে পাওয়ার পর নবিজি চাদরটি পরলেন। এমন সুন্দর চাদর পরে নবিজি নিশ্চয়ই খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন, সাহাবিরাও নিশ্চয় রাসূলুল্লাহকে এমন চাদর পরতে দেখে খুব আনন্দিত হয়েছিলেন!
এমন সময় একজন সাহাবি এসে নবিজিকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! চাদরটি তো বেশ সুন্দর! আপনি এটি আমাকে দিয়ে দিন।
নবিজি পুরো জীবনে যে কয়বার সুন্দর আর দামি জামা পরেছিলেন, এটি ছিল তার মধ্যে একটি। ঠিক এমন মুহূর্তে এই আবদার শুনে তিনি কী বলবেন, তাঁর কি রাগ করা উচিত? ঐ সাহাবিকে ধমক দেওয়া উচিত? না, এর কোনোটিই করেননি। নবিজি বললেন, হ্যাঁ। তুমি চাদরটি নিয়ে নিয়া। এই বলে তিনি উঠে চলে গেলেন (সাহাবি চাদরটি পেয়ে যান)।
বাকি সাহাবিরা তখন ঐ সাহাবিকে বললেন, তুমি কাজটি ঠিক করোনি। তুমি তো দেখলেই-চাদরটি তাঁর প্রয়োজন, এরপরও সেটা চাইলে? অথচ তুমি জানো, নবিজির কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনোই 'না' করেন না। ঐ সাহাবি জবাব দিলেন-নবিজি যখন এটা পরেছেন, তাঁর বরকত লাভের জন্যই আমি এটা চাই। যেন এই চাদরে আমাকে দাফন করা হয়。
নবিজি এত এত দান করতেন-সাহাবিরাও পর্যন্ত জানতেন, তাঁর কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি কাউকেই কখনো ফিরিয়ে দেন না।
নবিজির ওফাতের পূর্বে তাঁর ঘরে ছিল মাত্র ৭ দিরহাম। আমাদের সময়ে এক দিরহামের মূল্য হবে ৪০০ টাকার মতো। অর্থাৎ নবিজির চলে যাওয়ার পূর্বে ঘরে ছিল মাত্র ২৮০০ টাকার কাছাকাছি। তিনি তাঁর স্ত্রী আয়িশা (রা.)-কে বলেন সেগুলো দান করে দিতে। আল্লাহর কাছে তিনি ফিরে যেতে চান একেবারে খালি হাতে। এই সামান্য মুদ্রাগুলোও রাখতে চান না।
আয়িশা (রা.) যখন বায়তুলমাল থেকে ভাতা পেতেন, সাথে সাথে দান করে দিতেন। নিজের জন্য কিছুই রাখতেন না। সাহাবিদের জীবনী পড়লে এমন দানশীলতার অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। নবিজি অন্যকে দান করা, সম্মান দেখানোকে ঈমানের সাথে যুক্ত করেছেন। তিনি বলেন-
• যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।
• যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে যথাযথ খাতির করে。
আপনি ভালো ঈমানদার হতে চাইলে প্রতিবেশীকে সম্মান করতে হবে, মেহমানকে আদর-আপ্যায়ন করতে হবে, গরিবকে দান-সাদাকা করতে হবে। অন্যকে দান করা বলতে কেবল টাকা দান করাকেই বোঝায় না। আপনি আপনার 'সময়' দান করতে পারেন, 'মেধা' দান করতে পারেন। কেউ বিপদে পড়লে এগিয়ে যান। যেখানে মেধা দিয়ে কারও সমস্যা দূর করা প্রয়োজন, তা দিয়েই তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করুন। এর ফলেও সাদাকার সওয়াব পাবেন।
আপনি যখন মানুষের প্রতি উদার আচরণ করবেন, দান করবেন-আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসবেন, মানুষজন আপনাকে ভালোবাসবে। যখন কোনো ভুল করবেন, মানুষজন সুন্দর করে সংশোধন করে দেবে বা সেগুলো এড়িয়ে যাবে। নবিজি বলেন-আল্লাহ দানশীল, তিনি দানশীলতাকে ভালোবাসেন。

টিকাঃ
২৭৮ সূরা হাশর: ৯
২৭৯ সূরা আলে ইমরান: ৯২
২৮০ সহিহ বুখারি: ১৪৬১
২৮১ সূরা দাহর: ৮
২৮২ সূরা দাহর: ৯
২৮৩ সহিহ মুসলিম: ২২০১
২৮৪ সহিহ বুখারি: ৬০৩৪
২৮৫ সহিহ বুখারি: ৬০৩৬
২৮৬ সহিহ বুখারি: ৬০৩৬
২৮৭ সহিহ বুখারি: ৬০১৯
২৮৮ জামে আত-তিরমিজি: ২৭৯৯

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 অন্যের সাথে পরামর্শ করা

📄 অন্যের সাথে পরামর্শ করা


মুমিন চিন্তাভাবনা ছাড়া, অন্যের সাথে পরামর্শ না করে বড়ো ধরনের কোনো কাজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করতে বলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। '
এই আয়াতে আল্লাহ যেমন নবিজিকে নির্দেশ দেন, তেমনই মুমিনদেরও জানিয়ে দেন কাজে-কর্মে পরামর্শ করতে। মুমিনের গুণাবলির কথা উল্লেখ করে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন- 'যারা তাদের রবের আহ্বানে সাড়া দেয়, নামাজ কায়েম করে, পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে...'
একজন মুমিন একা একা সিদ্ধান্ত নেয় না। সে চারপাশের পরিবেশ অবজ্ঞা-উপেক্ষা করে যেমন মনে চায় তেমন কাজ করে না। কোনো কাজ করতে গেলে সে তার পরিবার, বন্ধু বা আত্মীয়ের সাথে পরামর্শ করে তারপর ওই কাজের দিকে পা বাড়ায়।
নবিজির পুরো জীবনী পড়লে দেখা যায়, তিনি প্রতিটি বড়ো বড়ো ক্ষেত্রে সাহাবিদের পরামর্শ চেয়েছেন। সাহাবিরা কোনো পরামর্শ দিলে তিনি গুরুত্বের সাথে পরামর্শটি গ্রহণ করেন। যেমন:
• বদর যুদ্ধ শুরুর পূর্বে নবিজি আনসার ও মুহাজির সাহাবিদের পরামর্শ চান।
• বদর যুদ্ধের যুদ্ধবন্দিদের কী করা হবে, সে ব্যাপারে সাহাবিদের পরামর্শ চান। তখন আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা পরামর্শ দেন।
• উহুদ যুদ্ধে সাহাবিদের পরামর্শ গ্রহণ করেন।
• খন্দক যুদ্ধে যুদ্ধের রণকৌশল সম্পর্কে সালমান ফারসি (রা.) পরামর্শ দেন।
• হাফসা (রা.) বিধবা হওয়ার পর নবিজি তাঁকে বিয়ে করার ব্যাপারে আবু বকর ও উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুমার সাথে পরামর্শ করেন।
• ইফকের ঘটনার সময় আলি (রা.)-এর সাথে পরামর্শ করেন।
• স্ত্রীদের তালাকের ব্যাপারে জায়েদ ইবনে হারিসা ও আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমার সাথে পরামর্শ করেন।
• তালাকের ব্যাপারে কুরআনের আয়াত নাজিল হলে তিনি আয়িশা (রা.)-কে বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি যেন পরিবারের সাথে পরামর্শ করেন।
তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূল; ওহি দ্বারা পরিচালিত। তারপরও তিনি কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে মানুষের সাথে পরামর্শ করেন। তা ছাড়া আমরা তো মানুষ, যেকোনো কাজে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আমাদের স্বভাবজাত। সেই হিসেবে নবি ও সাহাবিদের তুলনায় আমাদের আরও বেশি পরামর্শ করা দরকার। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আমি নবিজির চেয়ে কাউকে এত বেশি পরামর্শ করতে দেখিনি。
হুদাইবিয়ার সন্ধি ছিল সাহাবিদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। সবাই আশা করে এসেছিলেন কাবা তাওয়াফ করবেন। কিন্তু সন্ধি হওয়ার দরুন সেবারের যাত্রা স্থগিত করা হয়, তাঁরা পরেরবার যাবেন। সাহাবিরা এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। সবচেয়ে কঠোর আপত্তি জানান উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)।
নবিজি সাহাবিদের কুরবানি করার ও মাথা মুণ্ডনের নির্দেশ দেন। এ নির্দেশ তিনি তিনবার দেন, কিন্তু সাহাবিরা কেউ উঠলেন না। তাঁরা খুব হতাশ ছিলেন। সেই সফরে উম্মে সালামা (রা.) রাসূলুল্লাহর সফরসঙ্গী ছিলেন। নবিজি সাহাবিদের এমন আচরণের কথা তাঁকে জানালেন। উম্মে সালামা (রা.) নবিজিকে পরামর্শ দেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যদি তা-ই চান, তাহলে বাইরে গিয়ে তাঁদের সাথে কোনো কথা না বলে আপনার নিজের উট কুরবানি এবং ক্ষুরাকার ডেকে মাথা মুণ্ডন করুন।
নবিজি স্ত্রীর কথামতো তা-ই করলেন। তাঁকে দেখে সাহাবিরা এবার উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁরাও তাঁর অনুসরণ করলেন。
উম্মে সালামা (রা.) নবিজিকে যে ধরনের নেতৃত্বের পরামর্শ দেন, সেটা হলো-'Leading by example' বা উদাহরণের মাধ্যমে নেতৃত্বদান। যিনি কিনা নবি ও রাসূল, যার ওপর সরাসরি আল্লাহর ওহি নাজিল হয়, তিনি পর্যন্ত স্ত্রীর পরামর্শ নেন এবং তা আমলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেন। এই ব্যাপারে স্ত্রীর কাছে পরামর্শ নিতে কোনো ধরনের সংকোচবোধ করেননি।
উম্মে সালামা (রা.)-এর নবিজিকে এত বড়ো পরামর্শ দিতে সামান্য ইতস্ততবোধ করেননি। এটাও মনে করেননি-আমি আর কী বলব, আপনি যা ভালো মনে করেন, তা-ই করুন কিংবা আল্লাহ হয়তো আপনার ওপর ওহি নাজিল মাধ্যমে জানিয়ে দেবেন। না, তিনি বরং নিজ থেকে পরামর্শ দেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছিল এই পরামর্শ কাজে দিতে পারে। ফলে নিঃসংকোচে তিনি নবিজিকে উদাহরণের মাধ্যমে নেতৃত্বদানের পরামর্শ দেন।
নবিজি নিজের স্ত্রীদের সাথে এমনভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলেন, তিনি নবি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর স্ত্রীরা তাঁর সাথে মন খুলে কথা বলতে পারতেন। যেকোনো বিষয় উন্মুক্তভাবে আলোচনা করতে পারতেন।
খুলাফায়ে রাশেদার জীবনীতেও দেখা যায়, তারা সব সময় মানুষের উপদেশ গ্রহণ করতেন। আবু বকর (রা.) তাঁর প্রথম ভাষণে মানুষের পরামর্শ চান; পরবর্তী সময়ে খিলাফত পরিচালনা করতে গিয়ে সাহাবিদের পরামর্শ গ্রহণ করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর পুরো খিলাফতকালই ছিল সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করে। বড়ো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সবার সাথে কথা বলে তারপর সিদ্ধান্ত নিতেন। উসমান ইবনে আফফান (রা.) কুরআনের মুসহাফ সংকলন করতে গিয়ে সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করেন এবং সে অনুযায়ীই কাজ করেন।
যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে পরামর্শ শেষে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যদি এর ফলাফল খারাপ আসে, তাহলে যেন পরামর্শদাতাদের দোষারোপ করা না হয়। কেননা, পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়, আর ভরসা করতে হয় আল্লাহর ওপর। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। '
কেউ যদি আমাদের কাছে কোনো পরামর্শ চাইতে আসে, আমরা যেন পরামর্শ দিই। তবে জেনেবুঝে তাকে কোনো ভুল পরামর্শ দেওয়া যাবে না। নবিজি বলেন-তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের নিকট পরামর্শ চাইলে, সে যেন তাকে সঠিক পরামর্শই দেয়। '
কেউ যখন কোনো ব্যাপারে পরামর্শ চাইতে আসে, তখন সেটা আমানত হয়ে যায়। কেউ একজন এসে একটি ব্যাবসার ব্যাপারে পরামর্শ চাইল, আপনি পরামর্শ দিলেন। তারপর ওই ব্যাবসারই আরেক ব্যবসায়ী প্রতিযোগী এসে আপনার কাছে পরামর্শ চাইলে তাকেও একই পরামর্শের ব্যাপারে বলে ফেললেন। ফলে যে প্রথমে পরামর্শ চাইতে এলো, সে ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এমনটা করা যাবে না। নবিজি বলেন-যে ব্যক্তির নিকট পরামর্শ চাওয়া হয়, সে একজন আমানতদার。
আমানতের খেয়ানত করা মুনাফিকের লক্ষণ। আপনি একজনের পরামর্শ, প্ল্যানের কথা আরেকজনকে জানিয়ে দিচ্ছেন। এটা হলো আমানতের খেয়ানত। এগুলোকে ছোটোখাটো মনে করার কোনো কারণ নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, কোনো একটি পরামর্শ পাওয়ার পর সেটা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক কি না? উত্তর হলো, না। পরামর্শ চাইতে পারেন, কিন্তু ওই অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নিতে হবে; এ রকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পরামর্শটি যদি যৌক্তিক মনে হয় গ্রহণ করবেন, না হলে করবেন না। এটা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
সব মানুষ সর্ববিষয়ে বিশেষজ্ঞ না। একই বিষয়ে সবাই উত্তম পরামর্শ দিতে পারবে না। হতে পারে কারও পরামর্শের একটি অংশ আপনার পছন্দ হয়েছে, সেই অংশের আলোকে আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন। একজন আলিম বলেন, আপনি যখন কারও কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন, তখন তার বুদ্ধিমত্তা ধার নিচ্ছেন।
তার সারাজীবনের জ্ঞান, অভিজ্ঞতার আলোকে সে আপনাকে পরামর্শ দেবে। আপনি সেই পরামর্শ চাইতেই পেয়ে গেলেন। পরামর্শের আরবি হলো 'শুরা'। শুরার সাথে আরেকটি কাজ করতে হবে, তা হলো-ইস্তিখারা। ইস্তিখারা ব্যক্তিগত আমল, শুরা সামষ্টিক আমল। কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই দুটি বিবেচনা করতে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাধান্যও দিতে হবে।
যেকোনো বিষয়ে পরামর্শ কেবল তাদের সাথে করতে হবে, যাদের আপনি ভালোবাসেন, বিশ্বাস করেন। আপনি একজনকে বিশ্বাস করেন, কিন্তু তার ওপর ভরসা করতে পারেন না; এমন লোকের কাছ থেকে পরামর্শ করতে যাবেন না। হতে পারে সে আপনার ক্ষতি করতে বা তার উত্তম পরামর্শ আপনার মনঃপূত হবে না।
ইস্তিখারা ও শুরার পর আপনি যে সিদ্ধান্ত নেন, সেটা সঠিক সিদ্ধান্ত। এরপর দ্বিধা করলে হবে না। আপনাকে আপনার সিদ্ধান্তে অটুট থাকতে হবে। যদি ফলাফল খারাপ আসে, হয়তো এই খারাপ ফলের মধ্যেই কোনো কল্যাণ নিহিত আছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে আপনি বুঝতে পারছেন না। ভালো ফলাফল পাওয়ার জন্য আপনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, এটাই যথেষ্ট। এরপর যে ফলাফল আসে, তা সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করে নেওয়াই উত্তম।
যখন কারও সাথে পরামর্শ করতে যাবেন, এর মাধ্যমে তার প্রতি আপনার ভালোবাসা ও আস্থার জানান দিলেন। ফলে তার সাথে আপনার সম্পর্ক মজবুত হবে। অন্যদিকে কেউ যদি আপনার কাছে পরামর্শ চাইতে আসে, তার ব্যাপারেও আপনি উত্তম ধারণা রাখবেন, সম্পর্ক আরও গভীর হবে।
উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট, পরামর্শ গ্রহণের আমলটি সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যেমন জরুরি, তেমনই পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্যও জরুরি এবং বেশ বরকতময় ও ফলদায়ক।

টিকাঃ
২৮৯ সূরা আলে ইমরান: ১৫৯
২৯০ সূরা শুরা: ৩৮
২৯১ মুসনাদে আহমাদ: ১৭৯২৮
২১২ সহিহ বুখারি: ২৭৩১
২৯৩ সূরা আলে ইমরান: ১৫৯
২৯৪ সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৭৪৭
২৯৫ জামে আত-তিরমিজি: ২৮২২

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 অন্যকে ভালোবাসা

📄 অন্যকে ভালোবাসা


এক যুবক ইসলাম শেখার জন্য দামেশক যান। তিনি ভিন্ন ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার নাম ছিল আবু ইদরিস আল খাওলানি। পরবর্তী সময়ে তিনি উমাইয়া খিলাফতের প্রধান বিচারপতি হন।
যুবক অবস্থায় তিনি দামেশকের গ্র্যান্ড মসজিদে গিয়ে দেখতে পান, একটি হালাকায় অনেকেই বসে আছেন। আর একজন শাইখ সেখানে দারস দিচ্ছেন বা পড়াচ্ছেন। সেই শাইখ ছিলেন খুব কম বয়সি। তাঁকে দেখামাত্রই তিনি পছন্দ করেন। তিনি অন্যদের জিজ্ঞেস করলেন, উনি কে?
তাকে বলা হলো, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)। আবু ইদরিস আল খাওলালি (রহ.) মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-এর সাথে দেখা করার জন্য পরদিন আগে আগে মসজিদে যান। উপস্থিত হয়ে দেখতে পান তিনি নামাজ পড়ছেন।
নামাজ শেষে তাঁকে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহর ওয়াস্তে আপনাকে ভালোবাসি। মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর কসম? অর্থাৎ, এতটা নিশ্চিত হয়ে বলছ যে, তুমি আমাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসো?
-জি, আল্লাহর কসম।
-আল্লাহর কসম?
-জি, আল্লাহর কসম।
অতঃপর মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) তাঁর চাদরের আঁচল ধরে টেনে বললেন, তাহলে তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো।
এই বলে মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) আবু ইদরিস আল খাওলানিকে নবিজির একটি হাদিস শোনান। নবিজি বলেন-তাদের ভালোবাসা আমার জন্য অপরিহার্য হয়ে যায়, যারা আমার জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, যারা আমার জন্য একসাথে বসে, যারা আমার জন্য পরস্পর সাক্ষাৎ করে, যারা আমার জন্যই একে অন্যের জন্য ব্যয় করে。
এ আলোচনার মূল উদ্দেশ্য কী? কেন একজন মুমিন আরেকজনের সাথে ভালো আচরণ করবে, এমনটাই তো? হ্যাঁ, এমনটা হলেও এর মূল কারণ হতে হবে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। একজন মুমিন আরেকজনকে ভালোবাসলে তবেই তার সাথে উত্তম আচরণ করতে পারবে। আরেকজনের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে কীভাবে তার প্রতি দানশীল আচরণ করতে পারে? তাকে উত্তম পরামর্শ দিতে পারে? দোষ গোপন রাখতে পারে? ক্ষমা করে দিতে পারে?
বোঝা গেল, উত্তম আখলাকের মূল হলো ভালোবাসা। একে অন্যের প্রতি ভালোবাসাবোধের কারণেই মানুষ অন্যের সাথে উত্তম আচরণ করে। নবিজি বলেন, ঈমানদার ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে。
অপর একজন মুমিন ভাইকে ভালোবাসা নফল কোনো ইবাদত নয়, এটা ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত। আপনি অন্য মুমিনকে যদি না ভালোবাসেন, কখনোই প্রকৃত ঈমানদার হতে পারবেন না। প্রকৃত ঈমানদার না হলে জান্নাতে প্রবেশ করা অসম্ভব। জান্নাতে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে আপনাকে অবশ্যই অপর মুমিন ভাইয়ের জন্য থাকতে ভালোবাসতে হবে। আর এটা তখন 'আখলাক' থাকে না, হয়ে যায় 'আকিদা'।
নবিজি একজন সাহাবির কথা বললেন, যিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। অন্য একজন সাহাবি জানতে চাইলেন তাঁর আমল কী? তাঁর আমল সম্পর্কে জানতে তিনি গিয়ে ওই সাহাবির বাড়িতে দেখা করলেন। দেখতে পেলেন তিনি অতিরিক্ত নামাজ পড়েন না, ইবাদত করেন না, তাহলে কীসের জন্য তিনি জান্নাত লাভ করবেন?
অতঃপর জানালেন, অন্য মুসলিমের প্রতি তিনি বিদ্বেষ পোষণ করেন না। এই কারণে তিনি জান্নাত লাভ করবেন。
পূর্ববর্তী যুগের এক লোক একবার তাঁর ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আরেক গ্রামে যায়। আল্লাহ মানুষ রূপে ফেরেশতা প্রেরণ করেন। ফেরেশতা গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
-আমি অমুক গ্রামে আমার এক ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।
-তার কাছে কি তোমার কোনো আবদার আছে? কোনো কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্যে তার কাছে যাচ্ছ?
-না, আমি তো কেবল আল্লাহর জন্য তাকে ভালোবাসি।
-ফেরেশতা তাকে জানালেন, আমি আল্লাহর ফেরেশতা, তোমাকে অবহিত করার জন্য এসেছি-আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন, যেমন তুমি তোমার ভাইকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবেসেছ。
লোকটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার ভাইকে পছন্দ করত। ফলে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন এবং তাকে তাঁর প্রিয় বান্দার অন্তর্ভুক্ত করেন। মানুষকে যদি কেবল আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা যায়, আল্লাহর কাছে এরচেয়েও বেশি মর্যাদা রয়েছে। নবিজি বলেন, আল্লাহ বলেন-আমার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য যারা পরস্পরকে ভালোবাসে, তাদের জন্য রয়েছে নুরের মিম্বর। নবি ও শহিদগণ পর্যন্ত তাদের মর্যাদা দেখে ঈর্ষান্বিত হবে。
আপনার ঈমানের পূর্ণতা তখনই পাবে, আপনি যদি কাউকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসেন। ঈমানের মিষ্টতা-প্রশান্তি তখনই অনুভব করতে পারবেন, আপনি যদি কাউকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসেন।
কাউকে অন্তর থেকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসলে, জান্নাতে তার সাথে থাকার সুসংবাদ দিয়েছেন। আপনার জান্নাতে থাকার মর্যাদা হয়তো নিচু স্তরে হতে পারে, কিন্তু কাউকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসার ফলে তার প্রতি দয়া-মমতার জন্য আল্লাহ আপনাকে তার সাথে রাখবেন।
একবার জনৈক বেদুইন এসে নবিজিকে জিজ্ঞেস করল, কিয়ামত কখন হবে? তিনি পালটা প্রশ্ন করে জানতে চাইলেন, কিয়ামতের জন্য তুমি কী প্রস্তুত করেছ? সে বলল, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। এ কথা শুনে নবিজি বললেন-যাকে তুমি ভালোবাসো, তাঁর সাথেই তোমার কিয়ামত হবে (অর্থাৎ তোমার সঙ্গী)।
এই হাদিসটি আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি তখন কমবয়সি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে হাদিসটি বর্ণনার সময় বলেন-আমার কাছে এই হাদিসের চেয়ে প্রিয় আর কোনো হাদিস নেই। আমি নবিজিকে, আবু বকর, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে ভালোবাসি। আশা করি, তাঁদের ভালোবাসি বলেই তাঁদের সাথে জান্নাতে বসবাস করতে পারব; যদিও তাঁদের আমলের মতো আমি আমল করতে পারিনি。
আপনি যদি আবু বকর (রা.)-কে ভালোবাসেন, তাহলে তাঁর মতো ইবাদত না করেও জান্নাতে তাঁর সঙ্গী হতে পারেন। এটা হলো অন্যকে ভালোবাসার সবচেয়ে বড়ো ফজিলত। একজন আলিমকে যদি ভালোবাসেন, তাঁর মতো আমল না করেও জান্নাতে তার সঙ্গী হতে পারেন; কেবল তার প্রতি ভালোবাসার কারণে।
আমরা বেশির ভাগ সময়ই শুধু ইবাদত (নামাজ, রোজা, জিকির) নিয়ে কথা বলি। কিন্তু আখলাক এবং মুমিনের ব্যক্তিত্ব কেমন হওয়া উচিত বা এর জন্য কী কী আমল করা প্রয়োজন এ নিয়ে কথা বলি না। ইসলাম যেমন ইবাদতের নাম, তেমনই আখলাকেরও নাম। আমল ও আখলাক এ দুয়ের সমন্বয়েই ইসলাম। আল্লাহ আমাদের উত্তম আমল করার তওফিক দিন, আমিন।
তবে নবিজির একটি হাদিস দিয়ে পুরো বইয়ের ইতি টানতে চাই। নবিজি বলেন-তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটা পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে。

টিকাঃ
২৯৬ মুসনাদে আহমাদ: ২১৫২৫
২৯৭ সহিহ মুসলিম: ৯৮
২৯৮ মুসনাদে আহমাদ: ১২২৮৬
২৯৯ সহিহ মুসলিম: ৬৪৪৩
৩০০ জামে আত-তিরমিজি: ২৩৯০
৩০১ সহিহ বুখারি: ৩৬৮৮
৩০২ সহিহ বুখারি: ১৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00