📄 সম্পর্ক জোড়া লাগানো
মুমিন ব্যক্তিত্বের অনন্য একটি গুণ ও বৈশিষ্ট্য হলো ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক জোড়া লাগানো, যা পরিবার ও সমাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোতে মাঝেমধ্যে টানাপোড়েন দেখা দেয়। সম্পর্ক ভেঙে যায়। ভাই ভাইয়ের সাথে কথা বলে না। বোন বোনের সাথে কথা বলে না। এক আত্মীয় আরেক আত্মীয়ের সাথে কথা বলে না। তাদের বাসায় বেড়াতে যায় না।
ইসলামি শরিয়াহ আমাদের উৎসাহ দেয়, এমনটি হলে আমরা যেন নিজ থেকেই এগিয়ে যাই। সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ব্যবস্থা নিই। ইসলাম আমাদের এসব ক্ষেত্রে বসে থাকতে নিরুৎসাহিত করে।
আপনি লোকজনকে গিয়ে বলছেন, আমার চাচা আর চাচাতো ভাই কথা বলে না। আমার ফুফাতো ভাই আর আমার ভাইয়ের মধ্যে সমস্যা, তারা কথা বলে না। এই বলাবলির মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। আপনার দায়িত্ব হলো, কী করলে তারা কথা বলবে, সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে সেটা নিশ্চিত করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।'
এখানে 'দুই দল' হতে পারে দুটি গোত্র, দুটি দেশ, দুটি জাতি, দুটি পরিবার; এমনকি দুজন ব্যক্তি। যখনই তারা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে, আপনার কাজ: দর্শক হয়ে সেটা উপভোগ না করে তাদের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দেওয়া। গোপনে বৈঠক করা সাধারণত খারাপ। তবে তিনটি ক্ষেত্রে গোপন বৈঠক প্রশংসনীয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তাদের গোপন পরামর্শের অধিকাংশে কোনো কল্যাণ নেই। তবে (কল্যাণ আছে) যে নির্দেশ দেয় সাদাকার, ভালো কাজ অথবা মানুষের মধ্যে মীমাংসার। আর যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করবে; অচিরেই আমি তাকে মহাপুরস্কার দান করব।'
বেশির ভাগ গোপন বৈঠকের খারাপ উদ্দেশ্যে থাকে। তবে আল্লাহ তিন ধরনের গোপন বৈঠকের প্রশংসা করেছেন; যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সম্পর্ক জোড়া লাগানো।
আপনার দুজন কাজিন পরস্পর কথা বলে না। আপনি অন্য কাজিনদের সাথে মিলে গোপনে বৈঠক করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, সবাইকে নিয়ে একটি পিকনিকে যাবেন। আর যাওয়ার উদ্দেশ্য হলো ওই দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য দূর করে সম্পর্কের মীমাংসা করা। এসব ক্ষেত্রে আল্লাহর তরফ থেকে গোপন বৈঠক প্রশংসনীয়।
মানুষের মাঝে সম্পর্ক ঠিক করে দেওয়াটাও ইবাদত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটা নামাজ, রোজা, সাদাকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরিও বটে। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন-আমি কি তোমাদের নামাজ, রোজা ও সাদাকার চেয়ে উত্তম কাজ সম্পর্কে বলব না? সাহাবিরা জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের বলুন। নবিজি বলেন, পরস্পর সুসম্পর্ক স্থাপন। কেননা, পরস্পর সুসম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অর্থ হলো দ্বীনের বিনাশ হওয়া।
এসব আমল নিয়ে সাধারণভাবে যেভাবে কথা বলা দরকার, প্রচার হওয়া দরকার-আমরা সেভাবে বলি না। আমরা মনে করি, ইসলাম আমাদের আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা করতে বলে। কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবতে বলে। কথাটা সত্য হলেও সকল ক্ষেত্রে তো আর এই কথা প্রযোজ্য না। আপনি অন্যকে নিয়েও ভাববেন, যদি হয় সেটা কল্যাণের উদ্দেশ্যে।
অন্যরা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে আপনি মিটিয়ে দেবেন। কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করলে আপনি সেটা জোড়া লাগানোর ব্যবস্থা করবেন। নবিজি জানান, সেই কাজটি নামাজ-রোজার চেয়েও উত্তম।
আমরা যদি আসলেই সবাইকে ভালোবাসি, তাহলে কারও সম্পর্কচ্ছেদ আমরা পছন্দ করব না। এগিয়ে যাব সম্পর্ক জোড়া লাগাতে।
নবিজি মসজিদে খুতবা দিচ্ছেন। তাঁর আদরের নাতি হাসান (রা.)-কে মসজিদে দেখে কোলে নেন। আর তাঁকে নিয়েই খুতবা দেন। তখন তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আমার এই নাতি নেতা হবে এবং সম্ভবত আল্লাহ তাঁর দ্বারা مسلمانوں দুটি বড়ো দলের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করবেন।
নবিজি জানিয়ে দেন, হাসান (রা.) নেতা হবেন। আর সত্যই তা আমরা ইতিহাস খুললে দেখতে পাই, যখন মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফত দাবি করেন।
অন্যদিকে খিলাফতের দাবিদার ছিলেন হাসান (রা.)। মুয়াবিয়ার কৃত দাবির সংবাদ পেয়ে তিনি নিজের দাবি প্রত্যাহার করে নেন। এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যকার আবশ্যিক সংঘাত এড়ানো যায়। হাসান (রা.) এজন্যই নেতা, তিনি উম্মাহর প্রয়োজনে তাঁর যৌক্তিক দাবি প্রত্যাহার করেন। সন্ধি স্থাপনে, সম্পর্ক রক্ষার জন্য নিজের দাবি থেকে সরে আসেন।
নবিজির সিরাত পড়লে পাওয়া যায়, তিনি অসংখ্যবার মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক জোড়া লাগান। একবার তাঁর মেয়ে ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে গিয়ে দেখেন আলি (রা.) তাঁর মেয়ের ওপর রাগ করে বাইরে চলে গেছেন। তিনি মসজিদে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। নবিজি এমনটি মনে করেননি—এসব তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার, তোমরাই ঠিক করো। তিনি বরং মসজিদে যান, আলি (রা.)-এর অভিমান ভাঙানোর জন্য তাঁকে সুন্দর একটি নামে ডাকেন, হে আবু তুরাব。
নবিজি দেখতে পান, মদিনার অলিগলিতে এক যুবক পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। কপোল বেয়ে পড়ছে অশ্রু-নিনাদ। যে-ই তাঁকে এভাবে দেখছে, অন্তর গলে মায়াময় অনুভূতি নিয়ে পাশ অতিক্রম করে যাচ্ছে। মদিনার সমাজ, যেখানে নবিজি আছেন, সেই সমাজের একজন যুবক একটা মেয়ের জন্য এইভাবে কেঁদে বেড়াচ্ছে!
তাঁর নাম মুগিস। তিনি ছিলেন নবিজির সাহাবি এবং একজন দাস। বারিরা নামের এক মেয়ের পিছু পিছু তিনি ঘুরছেন। বারিরা ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তাঁরা ছিলেন দুজনই দাস-দাসী। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার পর তাদের বিবাহিত সম্পর্ক বজায় রাখবেন কি না, সেটা তাদের এখতিয়ার। মুগিস বিয়ের সম্পর্ক বহাল রাখতে চাইলেন, কিন্তু বারিরা চাইলেন না।
বারিরা মুগিসকে তালাক দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু বারিরার চলে যাওয়া কোনোভাবেই মুগিস মেনে নিতে পারেননি। বাচ্চা, আনাড়ি ছেলেদের মতো বারিরার পিছু পিছু ঘুরছেন। অঝোরে কান্না করতে করতে তাঁর দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গেছে।
মুগিসকে এই অবস্থায় দেখে নবিজিরও মায়া হলো। মুগিসের আবেগ তিনি অনুভব করলেন। তাঁর সাথে থাকা আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ও আব্বাস! বারিরার প্রতি মুগিসের ভালোবাসা এবং মুগিসের প্রতি বারীরার অনাসক্তি দেখে কি তুমি আশ্চর্যান্বিত হও না?
মুগিসের এমন পাগল-কান্না দেখে নবিজি তাঁর পক্ষ নিয়ে বারিরার কাছে গেলেন। তাকে বললেন, তুমি যদি তাঁর কাছে আবার ফিরে যেতে...
বারিরা ছিলেন বেশ বুদ্ধিমতী। তিনি নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি আমাকে আদেশ দিচ্ছেন? নবিজি তাঁর কথাটি পরিষ্কার করেন-না, আমি আমার পক্ষ থেকে তার জন্য কেবল সুপারিশ করছি। বারিরা যখন বুঝলেন এটা নবিজির নির্দেশ না। চাইলে তিনি নিজের মতের ওপর অটল থাকতে পারেন। বারিরা বললেন, আমি তাঁকে (মুগিসকে) চাই না।
নবিজি মানবিক জায়গা থেকে তাঁদের মিলিয়ে দিতে এলেন। মুগিসের পক্ষ হয়ে বারিরার কাছে সুপারিশ করলেন। কিন্তু বারিরা সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ইচ্ছুক ছিলেন না। ফলে নবিজি আর জোরাজুরি করেননি।
সাধারণত মিথ্যা বলা নিষেধ। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বলাকে ইসলাম সমর্থন করে, তন্মধ্যে একটি হলো সম্পর্ক জোড়া লাগানো। দুজন ব্যক্তির মাঝে যদি সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দেয়, তারা একে অপরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, তাহলে তাদের এক করে দিতে আপনি মিথ্যা বলতে পারেন।
যেমন: দুজন মানুষের মধ্যে যদি মন কষাকষি হয়, তাদের একত্র করার জন্য প্রয়োজনে মিথ্যা বলতে পারেন। একজনকে বলতে পারেন, অমুক তো তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে অনুতপ্ত, সে আমাকে বলল-তোমার সাথে কথা বলতে চায়। আবার অন্যজনকে গিয়ে বলুন-অমুক সেদিন যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এটার জন্য পরে কষ্ট পেয়েছে। সে তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। চলো তার সাথে গিয়ে কথা বলি। এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বলতে কোনো অসুবিধা নেই। নবিজি বলেন-সে ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে মানুষের মাঝে আপসের মাধ্যমে সমাধা করে দেয়। সে কল্যাণের জন্যই মিথ্যা বলে এবং কল্যাণের জন্যই চোখলখুরি করে。
মানুষের মধ্যে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে মিথ্যা বলা পর্যন্ত অনুমোদিত। এ থেকে স্পষ্ট হয়-একটি সম্পর্ক ঠিক করা, আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রসিদ্ধ একজন আলিম বলেন, সত্য বলে সম্পর্ক ছিন্ন করা আল্লাহ অপছন্দ করেন। কিন্তু মিথ্যা বলে সম্পর্ক জোড়া লাগানো আল্লাহ পছন্দ করেন।
সমাজে যদি এই আখলাক প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে অসংখ্য সম্পর্ক জোড়া লেগে যাবে। মানুষের মধ্যে মনোমালিন্য হলে সেটা মিটে যাবে। কারণ, এর ফলে অন্যরা উদ্যোগ নেবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস ও মীমাংসা করে দাও।'
টিকাঃ
২৫০ সূরা হুজুরাত : ৯
২৫১ সূরা নিসা: ১১৪
২৫২ জামে আত-তিরমিজি: ২৫০৯
২৫৩ সহিহ বুখারি: ২৭০৪
২৫৪ সহিহ বুখারি: ৪৪১
২৫৫ সহিহ বুখারি: ৫২৮৩
২৫৬ সহিহ মুসলিম: ৬৫২৭
২৫৭ সূরা হুজুরাত: ১০
📄 ক্ষমাশীলতা
ক্ষমাশীলতা মুমিন ব্যক্তিত্বের অন্যতম গুণ। মুমিন আল্লাহর ক্ষমা পেতে চায়, ক্ষমা পাওয়ার জন্য অন্যকেও ক্ষমা করে। সে যেমন চায় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তেমনই সে অন্যের প্রতি ক্ষমাশীল আচরণ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান; যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। '
এরপরের আয়াতেই আল্লাহ জানিয়ে দেন মুত্তাকি কারা। তিনি বলেন-
ক. যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে।
খ. রাগ সংবরণ করে এবং
গ. মানুষকে ক্ষমা করে。
যারা জান্নাত লাভ করবে, তাদের অন্যতম গুণাবলি হলো-তারা মানুষকে ক্ষমা করে। কেউ একজন এমন একটি কাজ করল, আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তা ক্ষমার অযোগ্য, তখন যদি সে তাকে ক্ষমা করে দেয়। এই ক্ষমার বিনিময়ে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।
মানুষকে তখনই ক্ষমা করা হয়, যখন সে আপনার সাথে কোনো অন্যায় করে। অন্যায় না করলে আর তো ক্ষমার প্রশ্নই আসে না। কেউ এমন কিছু করেছে, যা আপনি অপছন্দ করেন বা আপনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে। তখন তার ওপর প্রচণ্ড রাগ অনুভূত হবে। এখন যদি তাকে ক্ষমা করতেই হয়, সেই মুহূর্তে নিজের রাগ সংবরণ করে ক্ষমা করতে হবে।
আপনার অধিকার ছিল তাকে শাস্তি দেওয়ার; শরিয়াহ ও সামাজিক আইনের আলোকে। কিন্তু আপনি তাকে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দিলেন। এটাই হলো ক্ষমাশীলতা। মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যখন রাগান্বিত হয়, তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।
সাধারণত মানুষ যখন রাগান্বিত হয়, তখন প্রতিশোধ গ্রহণ করে। সে অন্যকে শাস্তি দেয়। স্বভাবজাত মানুষ রাগের সময় ক্ষমা করতে পারে না! কিন্তু আল্লাহ মুমিনের গুণের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, তারা রাগান্বিত অবস্থায়ও ক্ষমা করে দেয়।
কেউ যদি আপনাকে রাগিয়ে ফেলে আপনার সাথে মন্দ আচরণ করে, তাহলে প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার আপনার আছে। আপনি চাইলে তাকে শান্তি দিতে পারেন। যতটুকু অপরাধ সে করেছে, ততটুকুর শান্তি দেওয়ার জন্য আইন আপনার পক্ষে আছে। তবে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না。
আল্লাহ এখানে দুটি নিয়মের কথা বলেন।
প্রথমত, কেউ আপনার সাথে মন্দ আচরণ করলে আপনি অনুরূপ তার সাথে মন্দ আচরণ করতে পারেন। কেউ আপনাকে থাপ্পড় মারলে আপনি অনুরূপ তাকে থাপ্পড় মারতে পারেন। কিন্তু এই অনুরূপ কাজকেও আল্লাহ তায়ালা 'মন্দ কাজ' বলে অভিহিত করেছেন।
দ্বিতীয়ত, অথবা আপনি তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। আপনার অধিকার ছিল তাঁকেও অনুরূপ বলার। তার সাথে অনুরূপ আচরণ করার। কিন্তু আপনি মন্দের দিকে না ধাবিত হয়ে উত্তমের দিকে এগিয়ে গেলেন। আপনি তাকে ক্ষমা করে দেন। ফলে আল্লাহ বলছেন, এজন্য আপনাকে পুরষ্কৃত করা হবে। কিন্তু কী পুরস্কার দেওয়া হবে সেটা আল্লাহ বলেননি। তার মানে আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনাকে উত্তম পুরস্কার দান করবেন।
সর্বোত্তম ক্ষমা হলো নিজের পরিবারের সদস্যদের ক্ষমা করে দেওয়া। প্রতিদিনই নানান কারণে আমরা পরিবারের সদস্যদের সাথে রাগারাগি করি। এমনও হয় আত্মীয় আরেক আত্মীয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। এসব ক্ষেত্রে যদি একপক্ষ ক্ষমাশীল আচরণ করতে পারে, তাহলে সম্পর্ক জোড়া লেগে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে মুমিনগণ! তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানসন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদেরই শত্রু। অতএব, তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। আর যদি তোমরা মার্জনা করো, এড়িয়ে যাও এবং ক্ষমা করো; তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু। '
নবিজি তিনটি বিষয়ের কথা বলেন, যেগুলো সম্পর্কে আমরা একধরনের ধারণা পোষণ করি, বাস্তবে সেগুলো ভিন্ন রকম। আমরা মনে করি, দান করলে সম্পদ কমে। ক্ষমা করলে মর্যাদা কমে। বিনয়ী হলে সম্মান কমে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ বলেন-এসব অমূলক ধারণা, একটিও ঠিক নয়। তিনি বলেন-
ক. দান করলে সম্পদ কমে না।
খ. যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন এবং
গ. যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা সমুন্নত করেন。
অর্থাৎ, যে ক্ষমা করে সে দুর্বল নয়; বরং সে তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী, যে প্রতিশোধ নেয়। প্রতিশোধ নেওয়া কোনো গুণ না, কিন্তু অন্যকে ক্ষমা করে দেওয়া একটি অনন্য গুণ। আয়িশা (রা.) নবিজির একটি গুণ বর্ণনা করেন, নবিজি নিজের ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করা হলে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রতিশোধ নিতেন।
নবিজির পুরো জীবনী পড়লে ক্ষমাশীলতার অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি তাঁর বন্ধু-শত্রু সবাইকে ক্ষমা করে দিতেন। তায়েফবাসী, যারা তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিল, তাদেরও ক্ষমা করে দেন। মক্কা বিজয়ের দিন মক্কাবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
তবে একটি জিনিস মনে রাখা প্রয়োজন। ক্ষমা করে দেওয়ার মানে এই না যে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। আপনি যদি কাউকে ক্ষমা করেন, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই, আপনি তার অন্যায়কে অন্যায় মনে করেননি।
অন্যায় অন্যায়ই থেকে যাবে। আপনি কাউকে ক্ষমা করার মানে হলো আপনি তার মতো আচরণ করলেন না, তার চেয়ে উত্তম আচরণ করলেন। ক্ষমা করে দিয়ে উত্তম আচরণ করলে দেখবেন, মানসিক প্রশান্তি অনুভূত হবে। সাইকোলজিস্টরা বলেন, মানসিক প্রশান্তি সহজে হাসিলের অন্যতম উপায় হলো নিঃসংকোচে কাউকে ক্ষমা করে দেওয়া।
ইসলামি শরিয়াহ ক্ষমাশীলতাকে উৎসাহিত করে। তার মানে এই নয়, ক্ষমা করা ওয়াজিব বা করতেই হবে কিংবা আবশ্যক। মাঝেমধ্যে আবার ক্ষমা করতে না পারাটাও বরং উত্তম। যেমন: কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে কটূক্তি করলে আপনি তাকে বলতে পারবেন না, ক্ষমা করে দিলাম। ক্ষমাশীলতার একটি সীমানা আছে। সীমানা বুঝে ক্ষমা করতে হবে। যদি এমন হয়—কাউকে ক্ষমা করার ফলে সে পাপের সুযোগ পাচ্ছে, সরলতা মনে করছে, তখন তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এসব ক্ষেত্রে পাঁচটি অপশন আছে। সেগুলো হলো—
• কেউ আপনার ক্ষতি করল, প্রতিশোধস্বরূপ আপনিও তার কয়েক গুণ ক্ষতি করলেন। কেউ আপনাকে একটি কটু কথা বলল, আপনি তাকে ১০টি কটু কথা বললেন। কেউ অসাবধানতাবশত আপনার সঙ্গে ধাক্কা খেলো, আপনি তাকে ধরে হাত-পা ভেঙে দিলেন। এসব জঘন্য কাজ, এই ধরনের কাজ হারাম।
• কেউ আপনার যেমন ক্ষতি করল, আপনিও তার তেমন ক্ষতি করলেন। এটা ইসলামে অনুমোদিত। কেউ আপনার ক্ষতি করলে আপনি তার জন্য বদদুআ করতে পারেন। নবিজিকে মক্কার কাফিররা যখন শারীরিক নির্যাতন করেছে, তিনি তখন তাদের বিরুদ্ধে বদদুআ করেন। যাদের বিরুদ্ধে বদদুআ করেন, তারা সবাই বদর যুদ্ধে নিহত হয়。
• আপনার ওপর কেউ জুলুম করলে আপনি দুনিয়াতে তাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু কিয়ামতের দিন তার নেক আমলের বিনিময় গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ, আপনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। কিয়ামতের দিন তোমাকে দেখে নেব। এটাও ইসলামে অনুমোদিত। যেসব অত্যাচারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে তেমন কিছু করতে পারবেন না কিংবা তাদের ক্ষমতার প্রাচুর্যের কাছে আপনি অসহায়, তাহলে এমনটা করতে পারেন।
• আপনি তাকে ক্ষমা করে দেন, কিন্তু তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখেন না। এটাও ইসলামে অনুমোদিত। উহুদ যুদ্ধে নবিজির চাচা হামজা (রা.)-কে শহিদ করে ওয়াহশি। যদিও তিনি পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর নবিজির তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, হামজা (রা.)-এর শাহাদাতের কথা। ওয়াহশি (রা.) সেটা বর্ণনা করার পর রাসূলুল্লাহ তাঁকে বলেন, আমার সামনে থেকে কি তোমার চেহারা সরিয়ে রাখতে পারো?
নবিজি তাঁকে ক্ষমা করলেও তাঁর আচরণটি ভুলতে পারেন না। ফলে তিনি ওয়াহশির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখেননি। এ সরকম ক্ষেত্রে কেউ যদি আপনার কাছে ক্ষমা চায়, আর যদি কাউকে ক্ষমা করে দেন, তাহলে তার বিনিময়ে আপনি সওয়াব পাবেন।
• আপনি ক্ষমা করে দেবেন এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন। এটা হলো ক্ষমাশীলতার সর্বোত্তম পদ্ধতি।
মিসতা ইবনে সালামা (রা.)-এর মা উম্মে মিসতা (রা.)। উম্মে মিসতা ছিলেন আবু বকর (রা.)-এর খালা। সেই হিসেবে মিসতা আবু বকর (রা.)-এর খালাতো ভাই। আবু বকর (রা.) তাঁর সম্পূর্ণ ভরণপোষণ দিতেন।
বনু মুস্তালিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মুনাফিকরা আয়িশা (রা.)-কে অপবাদ দেয়। অপবাদের গুজব রটে যায় পুরো মদিনাজুড়ে। মুনাফিকদের প্ররোচনায় পড়ে কয়েকজন সাহাবিও এর সাথে তাল মেলাতে শুরু করেন। তাঁরাও আয়িশা (রা.)-এর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন!
অপবাদ রটনাকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন মিসতা ইবনে সালামা (রা.)। আবু বকর (রা.) যাকে আর্থিক সাহায্য করেন, সেই ব্যক্তিই কিনা তাঁর মেয়ের চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটনা করেন, অপবাদ বলে বলে বেড়ান!
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে আয়িশা (রা.)-এর চারিত্রিক নিষ্কলুষতার ব্যাপারে আয়াত নাজিল করেন। সবাই বুঝতে পারলেন, আয়িশা (রা.) সম্পর্কে যা বলা হয়েছিল এটা স্রেফ অপবাদ; এর মধ্যে কোনো সত্যতা নেই। আয়াত নাজিল হওয়ার পর আবু বকর (রা.) মিসতা (রা.)-এর ব্যাপারে বলেন, আল্লাহর কসম! মিসতা যেহেতু আয়িশা (রা.)-এর ব্যাপারে অপবাদ রটিয়েছে, তাই আমি তাঁর জন্য কখনো কিছু খরচ করব না!
যে ব্যক্তিকে আবু বকর (রা.) আর্থিক সাহায্য করেন, সেই ব্যক্তিই তাঁর মেয়ের বদনাম করেছে! আবু বকর (রা.)-এর এমন প্রতিক্রিয়া দেখানো তো খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ চাইলেন শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ মানুষ যেন শ্রেষ্ঠ আচরণ করেন। আল্লাহ নিজেই ক্ষমাশীল। মানুষও যেন এই ক্ষমাশীলতার গুণটি আয়ত্ত করতে পারে। তাই এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একটা আয়াত নাজিল করেন- 'তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন শপথ না গ্রহণ করে-তাঁরা আত্মীয়স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহ ত্যাগ করেছে, তাঁদের কিছুই দেবে না। তাঁরা যেন ওদের ক্ষমা এবং ওদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।'
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে-যাকে ক্ষমা করার প্রশ্নই ওঠে না, কোনোভাবেই যাকে ক্ষমা করা যায় না, তাঁর ব্যাপারেও আল্লাহ তায়ালা বলছেন-'তাঁকে ক্ষমা করে দাও।' ক্ষমা করে দিলে কী হবে? তারপরই আল্লাহ পালটা প্রতিদানের কথা দিয়ে বলছেন, এতে করে আল্লাহও তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আবু বকর (রা.) আল্লাহর এমন ঘোষণা শুনে বললেন-আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিন, এটা আমি পছন্দ করি। যেই মিসতাকে তিনি আর সাহায্য করবেন না বলেছিলেন, আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্তির ঘোষণা শুনে তাঁকে আগের মতো আর্থিক সাহায্য করা শুরু করেন। তখন তিনি পালটা কসম করেন, আল্লাহর কসম! আমি তাঁর খরচ দেওয়া কখনোই বন্ধ করব না。
আবু বকর (রা.) তাঁর মেয়ের ওপর অপবাদ রটনাকারীকে ক্ষমা করে দেন। এ ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমরাও চাইলে ক্ষমা করতে পারি। আমাদের প্রতি কেউ কি এমন অন্যায় করে, যা আবু বকর (রা.)-এর চেয়ে বেশি? ক্ষমাপ্রদর্শন করে আমরা উত্তম আচরণ করতে পারি। আর অন্যকে ক্ষমা করব এজন্যই, যাতে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করেন। নবিজি আমাদের এর প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেন-অন্যকে ক্ষমা করো, (তাহলে) আল্লাহ তোমাকেও ক্ষমা করবেন。
টিকাঃ
২৫৮ সূরা আলে ইমরান: ১৩৩
২৫৯ সূরা আলে ইমরান: ১৩৪
২৬০ সূরা শুরা: ৩৭
২৬১ সূরা শুরা: ৪০
২৬২ সূরা আত-তাগাবুন: ১৪
২৬৩ সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৬
২৬৪ সহিহ বুখারি: ৩৫৬০
২৬৫ সহিহ বুখারি: ৩৮৫৪
২৬৬ সহিহ বুখারি: ৪০৭২
২৬৭ সূরা নূর ২৪: ২২
২৬৮ সহিহ বুখারি: ৬৬৭৯
২৬৯ মুসনাদে আহমাদ: ৬৫৪১
📄 মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণ
ব্যক্তিত্বপূর্ণ এই গুণের প্রতি উৎসাহ দিয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অনেকগুলো আয়াত নাজিল করেন। তিনি বলেন- 'জমিনে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনো জমিনে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায়ও কখনো পাহাড় সমান পৌঁছাতে পারবে না।'
আল্লাহ আরও জানিয়ে দেন, আমরা যেন সম্মানজনক পদ্ধতিতে হাঁটাচলা করি। এমনভাবে না হাঁটি, যেন হাঁটার মধ্যে অহংকার প্রকাশ পায়। আবার এমনভাবেও যেন না হাঁটি, লোকজন আমাদের দুর্বল ভাবে। কুরআনের আরেকটি আয়াতে দেখা যায় লুকমান (আ.) তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিচ্ছেন- 'আর তোমরা চলার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো। তোমাদের আওয়াজকে নিচু করো। নিশ্চয়ই সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ।'
আমরা যখন কথা বলব, এত জোরে কথা বলব না আবার খুব আস্তেও কথা বলব না। আল্লাহ তায়ালা গাধার উদাহরণ দিয়ে বলেন, গাধার আওয়াজ সবচেয়ে নিকৃষ্ট। আমাদের আওয়াজ যেন এমন না হয়।
কথা বলা, চলার ক্ষেত্রে যেমন মর্যাদাপূর্ণ আচরণ প্রদর্শন করতে হবে, তেমনই ইবাদতের ক্ষেত্রেও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। একবার নবিজি নামাজ পড়াচ্ছিলেন। কয়েকজন সাহাবি মসজিদে এলেন একটু দেরি করে। নামাজের রাকাত পাওয়ার জন্য তারা দৌড়ে মসজিদে আসেন। নামাজ শেষে নবিজি সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন, নামাজের জন্য ইকামত দেওয়া হয়ে গেলে তোমরা দৌড়াদৌড়ি বা তাড়াহুড়ো করে নামাজে এসো না; বরং প্রশান্তিসহ গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে নামাজে শরিক হও। অতঃপর ইমামের সাথে যত রাকাত নামাজ পাও, তা আদায় করো। আর যতটুকু না পাবে, তা পূরণ করে নাও।
কেননা, তোমাদের মধ্যে কেউ যখন নামাজ আদায়ের সংকল্প করে, তখন সে নামাজরত অবস্থায় থাকে বলে গণ্য হয়。
আমরা এখনও দেখতে পাই, মানুষ নামাজে জামাত পাওয়ার জন্য দৌড়ে দৌড়ে মসজিদে আসে, যা দেখতে খুব বিদঘুটে দেখায়। এটা সুন্নত না। সুন্নত হলো-ধীরে-সুস্থে, গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে যাওয়া।
হজের সময় নবিজি আরাফা থেকে মুজদালিফায় যাচ্ছেন। তখন পেছন থেকে খুব বেশি হাঁকডাক ও উট পেটানোর শব্দ শুনতে পেলেন। সাহাবিরা খুব দ্রুতগতিতে উট হাঁকাচ্ছেন। নবিজি তাঁদের দিকে চাবুক উঠিয়ে ইঙ্গিত করে বললেন, হে লোকসকল! তোমরা ধীরস্থিরতা অবলম্বন করো। কেননা, উট দ্রুত হাঁকানোর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।
ধীরস্থিরতা অবলম্বন করলে ভিন্ন রকম এক প্রশান্তি পাওয়া যায়। ইবাদতের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাড়াহুড়ো করতে বলেননি। আমরা যেন ধীরে-সুস্থে ইবাদত করি, তাহলে অন্যের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটবে না।
'সাকিনা' নাজিল হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে। মুমিনের হৃদয়ে সাকিনা প্রদান করেন। সিরাত অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, যেকোনো দুর্যোগের মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা সাহাবিদের অন্তরে সাকিনা নাজিল করেন। যেমন: হুনাইন যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন-
'তারপর আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাজিল করলেন তাঁর রাসূলের ওপর ও মুমিনদের ওপর। '
বাইয়াতুর রিদওয়ানের সময়ও আল্লাহ সাকিনা নাজিল করেন। তিনি বলেন- 'মুমিনরা যখন বৃক্ষতলে আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন। তাদের অন্তরে যা ছিল তা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন, তাদের তিনি দান করলেন প্রশান্তি। '
মক্কা বিজয়ের কথা উল্লেখ করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যখন কাফিররা তাদের অন্তরে জাহেলি যুগের অহমিকা পোষণ করেছিল। তখন আল্লাহ তাঁর রাসূলের ওপর এবং মুমিনদের ওপর তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাজিল করলেন। '
মক্কা বিজয়ের সময় মুসলিমদের প্রতি যদি আল্লাহ প্রশান্তি নাজিল না করতেন, তাহলে হয়তো বেশ কিছু হত্যাযজ্ঞ ঘটে যেত। কারণ, মক্কাবাসীর অত্যাচারের কারণে সাহাবিরা হিজরত করেছেন। এখন বিজয়ীর বেশে তারা মক্কায় ফেরেন। তারা চাইলে মক্কাবাসীকে হত্যা করতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ নবিজি ও সাহাবিদের ওপর আল্লাহ সাকিনা নাজিল করেন।
মর্যাদাপূর্ণ আচরণের দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো শরয়ি দিক, অন্যটি সাংস্কৃতিক। যেমন: ইসলামি শরিয়াহ বলে-আমরা গালাগালি করতে পারব না, কটু কথা বলতে পারব না, মিথ্যা বলতে পারব না ইত্যাদি। পৃথিবীর যে দেশেই আপনি থাকুন না কেন, এগুলো মেনে চলতে হবে।
আবার কিছু দিক আছে সাংস্কৃতিক। যেমন: ভাষা, শব্দ। এক অঞ্চলের খুবই সম্মানজনক ভাষা, আরেক অঞ্চলে সেটা হয়তো তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয়। এজন্য বলা হয়ে থাকে-এক দেশের গালি, আরেক দেশের বুলি।
আপনি যেখানে বসবাস করেন, সেখানকার সংস্কৃতি সম্পর্কে আপনার পর্যাপ্ত জানাশোনা থাকতে হবে, বোঝাপড়া থাকতে হবে। যেমন: কাপড় পরার ক্ষেত্রে। পৃথিবীর একেক দেশের মুসলিম অধিবাসী একেক ধরনের পোশাক পরেন। ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমগণ একধরনের পোশাক পরেন, মধ্যপ্রাচ্য-আরবের মুসলিমগণ আরেক ধরনের পোশাক। উপমহাদেশের মুসলিমগণ একধরনের পোশাক পরেন, ইউরোপ-আমেরিকার মুসলিমগণ আরেক ধরনের পোশাক।
আর উপমহাদেশের মুসলিমরা সাধারণত পাঞ্জাবি, ফতোয়া, শার্ট পরে। অন্যদিকে আরবের মুসলিমরা জোব্বা পরে। আমেরিকা থাকাকালীন যে পোশাক পরে আমি জুমার নামাজে যেতাম, সৌদি আরব দেখি এমন পোশাক পরে তারা কেউ জুমায় আসে না; এমন পোশাক নাকি তারা বাসায় পরে।
আপনি এসব ক্ষেত্রে সেই পোশাক পরুন, যে পোশাকটি আপনার অঞ্চলের মুসলিমরা পরে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন-সেই পোশাকের সাথে ইসলাম পোশাকের ব্যাপারে যে নির্দেশনা দিয়েছে, তার সাথে যেন সাংঘর্ষিক না হয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহর মতে, সুন্নাতসম্মত পোশাক হলো আপনার এলাকার লোকজনের মতো করে পোশাক পরা; যতক্ষণ পর্যন্ত সেই পোশাক পরতে শরিয়াহ অনুমোদন দেয়।
একবার এক লোক নবিজির কাছে আসেন। তার পোশাক ছিল জীর্ণ, আর জায়গায় জোড়াতালি দেওয়া। নবিজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কি অর্থ নেই? তিনি জানালেন, তার কাছে অর্থ আছে।
নবিজি বুঝতে পারলেন, টাকাকড়ি থাকা সত্ত্বেও লোকটি ভালো পোশাক পরে না। এমন কাজ আমাদের আশপাশের অনেকেই করে। তারা মনে করে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও জোড়াতালি দেওয়া জামা পরই উত্তম। এই ধারণা ঠিক নয়। নবিজি লোকটিকে বলেন-আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাকে কোনো নিয়ামত দান করেন, তখন তার (নিয়ামতের) নিদর্শন তার মধ্যে দেখতে পছন্দ করেন।
একজন মুসলিম এমন কোনো পোশাক পরতে পারে না, যা দেখে লোকজন বলে-এই দেখো, ও কী পরেছে! একজন মুসলিম এমনভাবে কথা বলতে পারে না, যা তার জন্য অসম্মান বয়ে আনে। একজন মুসলিম এমন কাজ করতে পারে না, যা তার নিজের জন্য এবং মুসলিম জাতির জন্য লজ্জাজনক। মুসলিম সব সময় সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে জীবনযাপন করে। তার হাঁটাচলা, কথা বলা, চুপ থাকা, জামা পরা-সবকিছু হতে হবে গাম্ভীর্যপূর্ণ, সম্মানজনক। যতটুকু সামর্থ্য আছে, সামর্থ্য যেন তার যাপিত জীবনের সময়ের মধ্যে প্রকাশিত হয়। কারণ, আল্লাহ তাকে যে নিয়ামত দান করেছেন, সেই নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ দেখতে আল্লাহ পছন্দ করেন।
টিকাঃ
২৭০ সূরা বনি ইসরাইল: ৩৭
২৭১ সূরা লুকমান: ১৯
২৭২ সহিহ মুসলিম: ১২৪৭
২৭৩ সহিহ বুখারি: ১৬৭১
২৭৪ সূরা আত-তাওবা: ২৬
২৭৫ সূরা ফাতহ: ১৮
২৭৬ সূরা ফাতহ: ২৬
২৭৭ বুলগুল মারাম: ৫৩০
📄 দানশীলতা
মুমিন ব্যক্তিত্বের দানশীলতার এই গুণকে ‘আখলাকের রানি’ বলা যায়। অন্যকে এমনভাবে দান করতে হবে, তার কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করা যাবে না। দান করার পর আশা করতে হবে আল্লাহর কাছে। এর বিনিময়ে আল্লাহ আপনাকে দান করবেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আনসারদের প্রশংসা করেন। তারা মুহাজিরদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিল, খাবারের ব্যবস্থা করেছিল। তিনি বলেন-
‘আর মুহাজিরদের যা প্রদান করা হয়েছে, তার জন্য তারা (আনসার) তাদের অন্তরে ঈর্ষা অনুভব করে না। নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে প্রাধান্য দেয়।’
আমরা যখন কোনো কিছু দান করি, মনে মনে বলি-টাকাটা থাকলে এটা কিনতে পারতাম। দান করার পরও টাকার প্রতি একধরনের আকর্ষণ থেকে যায়। কিন্তু আনসারদের ব্যাপারটি ছিল পুরোপুরিই ভিন্ন। তাঁরা হাত দিয়ে যেমন দান করে, মন দিয়েও তারা ঢেলে দান করে। ফলে দান করার পর তাঁদের মনের মধ্যে কোনো অশান্তি ছিল না, আফসোস ছিল না!
তাঁরা নিজেরা অভাবগ্রস্ত ছিলেন। নিজেদের এমন অভাব থাকা সত্ত্বেও মুহাজির ভাইদের দান করেন। ধরুন, আজকে আপনার বাসায় বিরিয়ানি রান্না হয়েছে। অনেক দিন ধরে আপনি বিরিয়ানি খান না। কিন্তু রান্নার পর পুরো খাবারটি অন্যকে দিয়ে দিলেন। দেওয়ার পর আপনার মনে কোনো আফসোস নেই, একবারের জন্যও মনে হলো না, ইশ! একটু যদি খেয়ে দেখতাম। আনসারদের দান ছিল ঠিক এমন।
এই আয়াত থেকে দুটি বিষয় বোঝা যায়।
• মন থেকে দান করা এবং
• আপনার কাছে যা পছন্দনীয়, তা দান করা।
পবিত্র কুরআনের আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করতে পারবে না; যতক্ষণ না তা থেকে ব্যয় করবে, যা তোমরা ভালোবাসো।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন সাহাবি ছিলেন আবু তালহা। তিনি ছিলেন আনাস ইবনে মালেক (রা.)-এর সৎ-বাবা। এ আয়াতটি শোনার পর আবু তালহা (রা.) নবিজির কাছে যান। গিয়ে বলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! মসজিদে নববির পাশে 'বায়রুহা' নামক বাগানটি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
আবু তালহা (রা.)-এর অনেকগুলো বাগান ছিল। তার মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বাগান বায়রুহা। উল্লেখ্য, সাহাবিরা তাঁদের পোষা প্রাণী; এমনকি বাগানগুলোর নামকরণ করতেন। নবিজিও পোষা প্রাণীর নাম রাখতেন।
আপনি যদি মসজিদে নববির পেছনের দরজা কিং ফাহাদ গেইট দিয়ে প্রবেশ করেন, সেখান থেকে বামদিকে ১৫০ ফুট হাঁটেন, দেখতে পাবেন বায়রুহা বাগানটি। আবু তালহা (রা.) তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বাগানটি আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন। তিনি বলেন-এটা আল্লাহর নামে সাদাকা করা হলো, আমি এর দ্বারা কল্যাণ কামনা করি এবং তা আল্লাহর নিকট আমার জন্য সঞ্চয়রূপে থাকবে। কাজেই, আপনি যাকে দান করলে হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব হয় তাকেই দান করুন।
নবিজি আবু তালহার দানকে স্বাগত জানালেন। তিনি বললেন, তোমাকে ধন্যবাদ। এটা হচ্ছে লাভজনক সম্পদ, এটা হচ্ছে লাভজনক সম্পদ। তুমি যা বলেছ তা শুনলাম। আমি মনে করি, তোমার আপনজনদের মধ্যে তা বণ্টন করে দাও।'
পবিত্র কুরআনের প্রথম দিকের নাজিল হওয়া একটি সূরায় আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের প্রশংসা করেন। কেননা, তারা নিজের খাবার অনাহারির মুখে বিলিয়ে দেয়; যদিও ওই খাবারের প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল। তিনি বলেন- 'তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।'
আর খাবার দেওয়ার পর তারা জানিয়ে দেয়- 'আমরা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের খাদ্য দান করি। তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও কামনা করি না।'
দানশীলতার গুণটি আল্লাহ খুব পছন্দ করেন। আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি নাম হলো-আল কারিম। কুরআনকে 'কারিম' নামেও ডাকা হয়। জিবরাইল (আ.)-কে 'কারিম' নামে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। নবিজিকেও 'কারিম' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। 'কারিম' দুই ধরনের হতে পারে—
• দান-সাদাকা করা এবং
• পরিবারের সাথে, আত্মীয়দের সাথে সুন্দর আচরণ করা।
অন্যের সাথে হাসিমুখে কথা বললে, প্রয়োজনে এগিয়ে গেলে, আন্তরিকতা দেখানোটা দান-সাদাকার সমপর্যায়ের। আপনি যদি আর্থিকভাবে দান-সাদাকা করতে না পারেন, এই কাজগুলোর মাধ্যমেও দান-সাদাকার সমপরিমাণ সওয়াব অর্জন করতে পারেন। আর তা যদি পরিবারের পেছনেও ব্যয় করেন, সাদাকার সওয়াব পাবেন। নবিজি বলেন-আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এক দিনার ব্যয় করা, একজন দাস মুক্ত করতে এক দিনার ব্যয় করা, গরিব লোককে এক দিনার দান এবং পরিবারের পেছনে এক দিনার ব্যয় করা; এসবের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো-পরিবারের পেছনে এক দিনার ব্যয় করা।
দানশীলতার গুণটি পরিবার থেকে শুরু করতে হবে, তারপর সমাজ। আমরা পরিবারের লোকদের জন্য যেমন ব্যয় করব, তেমনই ব্যয় করব বাইরের লোকজনের মধ্যে। নবিজির জীবনে দানশীলতার গুণের পরিমাণ বলে শেষ করা যাবে না। তাঁর পুরো জীবনটাই কেটে গেছে অন্যকে দান করার মধ্য দিয়ে। নিজের দিকটা চিন্তা না করে তিনি অন্যের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দিতেন, দান করতেন। তাঁর এমন দানশীলতার বৈশিষ্ট্য একটি হাদিস থেকে সহজে বোঝা যায়। জাবির (রা.) বলেন-নবিজির নিকট কোনো জিনিস চাওয়া হলে, তিনি কখনোই 'না' বলেননি。
অর্থাৎ, নবিজির কাছে কেউ কিছু চাইতে এলে তিনি নিঃসংকোচে সেটা দিয়ে দিতেন; ধমক দেওয়া তো অনেক দূরের কথা!
মনে করুন, আপনি খুব শখ করে একটি মোবাইল কিনলেন। অনেক দিনের জমানো টাকা দিয়েই তা কেনা হলো। টাকা বাঁচাতে গিয়ে অনেক সময় দুই কিলোমিটার রাস্তা গাড়িতে না চড়ে হেঁটেছেন। দুপুরের খাবারে ভালো খাবার খাননি, মন চেয়েছিল এক পিস মুরগির ঝাল ফ্রাই খাই; কিন্তু লোভাতুর জিহ্বা সংবরণ করেছেন। সেই শখের টাকা দিয়ে মোবাইলটি মার্কেট থেকে কেনার পর কিছুক্ষণ ব্যবহার করলেন। নতুন মোবাইল! আপনি খুব উন্মত্ত হয়ে আছেন।
হঠাৎ আপনার এক বন্ধু এসে বলল-দোস্ত, তোর মোবাইলটা তো অনেক সুন্দর। আমাকে দিয়ে দে না, প্লিজ! তখন ঐ বন্ধুর আবদার শুনে আপনার কেমন লাগবে? সে যদি সত্যিই বারবার এমন বলতে থাকে, আমার ধারণা, আপনি তো রাগে গড়গড় করবেন। আবদার বাড়তে থাকলে একসময় হয়তো ধমক দেবেন। এমনটা হওয়াই তো স্বাভাবিক, তাই না?
একবার এক মহিলা নবিজিকে একটি চাদর উপহার দিলেন। চাদরটি ঝালরসহ বোনা। এমনিতেই নবিজির একটি চাদরের খুব প্রয়োজন ছিল। তার মাঝেই মহিলাটিও শখ করে চাদরটি দিলেন। হাতে পাওয়ার পর নবিজি চাদরটি পরলেন। এমন সুন্দর চাদর পরে নবিজি নিশ্চয়ই খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন, সাহাবিরাও নিশ্চয় রাসূলুল্লাহকে এমন চাদর পরতে দেখে খুব আনন্দিত হয়েছিলেন!
এমন সময় একজন সাহাবি এসে নবিজিকে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! চাদরটি তো বেশ সুন্দর! আপনি এটি আমাকে দিয়ে দিন।
নবিজি পুরো জীবনে যে কয়বার সুন্দর আর দামি জামা পরেছিলেন, এটি ছিল তার মধ্যে একটি। ঠিক এমন মুহূর্তে এই আবদার শুনে তিনি কী বলবেন, তাঁর কি রাগ করা উচিত? ঐ সাহাবিকে ধমক দেওয়া উচিত? না, এর কোনোটিই করেননি। নবিজি বললেন, হ্যাঁ। তুমি চাদরটি নিয়ে নিয়া। এই বলে তিনি উঠে চলে গেলেন (সাহাবি চাদরটি পেয়ে যান)।
বাকি সাহাবিরা তখন ঐ সাহাবিকে বললেন, তুমি কাজটি ঠিক করোনি। তুমি তো দেখলেই-চাদরটি তাঁর প্রয়োজন, এরপরও সেটা চাইলে? অথচ তুমি জানো, নবিজির কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনোই 'না' করেন না। ঐ সাহাবি জবাব দিলেন-নবিজি যখন এটা পরেছেন, তাঁর বরকত লাভের জন্যই আমি এটা চাই। যেন এই চাদরে আমাকে দাফন করা হয়。
নবিজি এত এত দান করতেন-সাহাবিরাও পর্যন্ত জানতেন, তাঁর কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি কাউকেই কখনো ফিরিয়ে দেন না।
নবিজির ওফাতের পূর্বে তাঁর ঘরে ছিল মাত্র ৭ দিরহাম। আমাদের সময়ে এক দিরহামের মূল্য হবে ৪০০ টাকার মতো। অর্থাৎ নবিজির চলে যাওয়ার পূর্বে ঘরে ছিল মাত্র ২৮০০ টাকার কাছাকাছি। তিনি তাঁর স্ত্রী আয়িশা (রা.)-কে বলেন সেগুলো দান করে দিতে। আল্লাহর কাছে তিনি ফিরে যেতে চান একেবারে খালি হাতে। এই সামান্য মুদ্রাগুলোও রাখতে চান না।
আয়িশা (রা.) যখন বায়তুলমাল থেকে ভাতা পেতেন, সাথে সাথে দান করে দিতেন। নিজের জন্য কিছুই রাখতেন না। সাহাবিদের জীবনী পড়লে এমন দানশীলতার অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। নবিজি অন্যকে দান করা, সম্মান দেখানোকে ঈমানের সাথে যুক্ত করেছেন। তিনি বলেন-
• যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।
• যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে যথাযথ খাতির করে。
আপনি ভালো ঈমানদার হতে চাইলে প্রতিবেশীকে সম্মান করতে হবে, মেহমানকে আদর-আপ্যায়ন করতে হবে, গরিবকে দান-সাদাকা করতে হবে। অন্যকে দান করা বলতে কেবল টাকা দান করাকেই বোঝায় না। আপনি আপনার 'সময়' দান করতে পারেন, 'মেধা' দান করতে পারেন। কেউ বিপদে পড়লে এগিয়ে যান। যেখানে মেধা দিয়ে কারও সমস্যা দূর করা প্রয়োজন, তা দিয়েই তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করুন। এর ফলেও সাদাকার সওয়াব পাবেন।
আপনি যখন মানুষের প্রতি উদার আচরণ করবেন, দান করবেন-আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসবেন, মানুষজন আপনাকে ভালোবাসবে। যখন কোনো ভুল করবেন, মানুষজন সুন্দর করে সংশোধন করে দেবে বা সেগুলো এড়িয়ে যাবে। নবিজি বলেন-আল্লাহ দানশীল, তিনি দানশীলতাকে ভালোবাসেন。
টিকাঃ
২৭৮ সূরা হাশর: ৯
২৭৯ সূরা আলে ইমরান: ৯২
২৮০ সহিহ বুখারি: ১৪৬১
২৮১ সূরা দাহর: ৮
২৮২ সূরা দাহর: ৯
২৮৩ সহিহ মুসলিম: ২২০১
২৮৪ সহিহ বুখারি: ৬০৩৪
২৮৫ সহিহ বুখারি: ৬০৩৬
২৮৬ সহিহ বুখারি: ৬০৩৬
২৮৭ সহিহ বুখারি: ৬০১৯
২৮৮ জামে আত-তিরমিজি: ২৭৯৯