📘 মুমিনের আখলাক > 📄 ন্যায়বিচার

📄 ন্যায়বিচার


আল্লাহ যে কারণে কুরআন নাজিল করেন, তার অন্যতম কারণ হলো ন্যায়বিচারের গুণ প্রতিষ্ঠা করা। মুমিনের অন্যতম একটি গুণ হলো, সে ন্যায়বিচারী; নিজে অন্যায় করে না, অন্যায়কে প্রশ্রয়ও দেয় না। খেয়াল করলে শুনে থাকবেন-পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত জুমুআর খুতবায় খতিব তিলাওয়াত করেন-'ইন্নাল্লাহা ইয়ামুরু বিল আদলি ওয়াল ইহসান...' যার অর্থ করলে দাঁড়ায়-'নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচার ও নিকটাত্মীয়দের দান করার আদেশ দেন।'
খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর সময় থেকে জুমার খুতবায় এই আয়াতটি তিলাওয়াত করা হয়ে থাকে। বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশের খতিব এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতার আদেশ দেন। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
'হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে তোমরা ন্যায়ের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে; যদিও তা তোমাদের কিংবা মা-বাবার অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। যদি সে বিত্তশালী হয় কিংবা দরিদ্র, তবে আল্লাহ উভয়েরই ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে কথা বলো কিংবা এড়িয়ে যাও, তবে (জেনে রাখো) তোমরা যা করো সে বিষয়ে আল্লাহ সম্যক অবগত।'
আপনাকে যদি এমন কিছু বলতে হয়, এমন কোনো বিচার করতে হয়, যা আপনার মা-বাবার বিরুদ্ধে যায়, আপনার ভাই-বোনের বিরুদ্ধে যায়, তখনও আপনি ন্যায়ের পক্ষে থাকবেন। যদিও এই কাজটি সবচেয়ে কঠিন। নিজের পরিবারের সাথে অন্য পরিবারের কোনো ঝামেলা হলে আমরা বুঝে না-বুঝে পরিবারের পক্ষে থাকি। কে ঠিক আর কে ভুল সেটা ভুলে যাই। কিন্তু ন্যায়ের বেলায় নিজের মা-বাবার চেয়ে আল্লাহর হক বেশি। এক্ষেত্রে মা-বাবার কথা না ভেবে ন্যায়ের কথা ভাবতে হবে।
আপনি যখন বিচার করবেন, ঘটনা এবং অপরাধ দেখে বিচার করবেন, ব্যক্তি দেখে নয়। কাজটি 'কী' করা হয়েছে তা দেখে বিচার করবেন, 'কে' করেছে সেটা দেখে নয়। যদি এমন হয়-এই কাজটি অন্য কেউ করলে আপনি একধরনের শান্তি দেন অথচ আপনজনদের মধ্যে কেউ করলে আরেক ধরনের শাস্তি দেন, তাহলে আপনি ন্যায়বিচার করতে পারলেন না। স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিলেন। বিচারের বেলায় এই ধরনের স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
পাশ্চাত্যে ন্যায়বিচারকে প্রতীকী অর্থে বোঝানোর জন্য ভাস্কর্যস্বরূপ একজন চোখবাঁধা নারীকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। রূপকার্থে বোঝানো হয়-চোখ বাঁধলে সে দেখতে পায় না ঘটনাটি কে করেছে, কার সাথে ঘটেছে। বরং সে দেখতে পায়, কী ঘটেছে। ন্যায়পরায়ণতা মানে আইনের চোখে সবাই সমান; আপন-পর বলতে কিছু নেই।
আপনার মা-বাবা যদি কোনো অন্যায় করেন, আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন। এটা আল্লাহর আদেশ। এক্ষেত্রে আপনার জন্মদাতা-জন্মদাত্রী মা-বাবার চেয়ে আল্লাহর আদেশ গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ আরও বলেন-
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা অবিচল থেকো। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের প্ররোচিত না করে : তোমরা ন্যায়বিচার করবে না। তোমরা ন্যায়বিচার করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো।'
পূর্বের আয়াতে আল্লাহ বলেন নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ কোনো অপরাধ করলে ন্যায়বিচার করতে, এই আয়াতে আল্লাহ বলেন-আপনার কোনো শত্রু কোনো অপরাধ করলে তার প্রতিও ন্যায়বিচার করতে। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এই দুটি কাজই সবচেয়ে কঠিন।
ক. নিজের আপনজনের বিপক্ষে ন্যায়বিচার করা এবং
খ. নিজের শত্রুর পক্ষে ন্যায়বিচার করা।
আপনার কোনো শত্রু যদি আপনার কাছে ন্যায়বিচারের জন্য আসে; সে যে আপনার শত্রু এটা ভুলে যেতে হবে। বিচারের সময় তার কাজের ওপর বিচার করতে হবে; বন্ধু নাকি শত্রু সেটা বিবেচ্য নয়। মুমিনের আদর্শিক ব্যক্তিত্বের অন্যতম উপাদান হলো ন্যায়পরায়ণতা। রাসূলুল্লাহকে আল্লাহ ন্যায়বিচারের আদেশ দেন। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নবিজিকে জানিয়ে দিতে বলেন- 'তোমাদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে আমাকে আদেশ দেওয়া হয়েছে।'
আল্লাহ পৃথিবীতে নবি-রাসূল পাঠিয়েছেন ন্যায়বিচারের জন্য। মানুষের মাঝে যেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়, সেই উদ্দেশ্যে নবি-রাসূলগণ পৃথিবীতে আগমন করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'নিশ্চয় আমি রাসূলদের স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে কিতাব ও ন্যায়ের মানদণ্ড নাজিল করেছি, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।'
আরবিতে একটি প্রবাদ আছে, কোনো কিছু চিনতে হলে তার বিপরীতটা দেখতে হবে। ন্যায়বিচারের বিপরীত হলো জুলুম। ন্যায়বিচারের গুরুত্ব কত বেশি, সেটা জুলুমের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। যে একবার প্রতারণার শিকার হয়েছে, জুলুমের শিকার হয়েছে, সে জানে ন্যায়বিচারের মূল্য কী!
জুলুম আর শিরক প্রায় সমার্থক। লুকমান (আ.) তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন-শিরক হলো সবচেয়ে বড়ো জুলুম। আল্লাহ জালিমদের অভিশাপ দিয়েছেন এবং তাদের ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু প্রজন্মকে ধ্বংস করেছি, যখন তারা জুলুম করেছে।'
একই প্রসঙ্গে নবিজি বলেন, জুলুম কিয়ামতের দিন ঘোরতর অন্ধকারে পরিণত হবে। আপনি যদি দুনিয়াতে থাকাবস্থায় কারও ওপর জুলুম করেন, সেটার ফল দুনিয়াতে না পেলেও আখিরাতে পাবেন। দুনিয়াতে কারও ওপর জুলুম করলে বেঁচে থাকাবস্থায় তার কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিন, তার অধিকার ফিরিয়ে দিন। যদি তা না করেন, তাহলে কিয়ামতের দিন আপনার নেক আমল তাকে দেওয়া লাগবে। রাসূলুল্লাহ বলেন-যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ থেকে তা মাফ করিয়ে নেয় সেদিন আসার পূর্বে, যেদিন তার কোনো দিনার/দিরহাম থাকবে না।
সেদিন তার আমলনামায় কোনো সৎকর্ম না থাকলে, তার জুলুমের সমপরিমাণ তার নিকট থেকে নেওয়া হবে। আর যদি তার কোনো সৎকর্ম না থাকে, তবে তার প্রতিপক্ষের পাপ হতে নিয়ে তা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে。
দুনিয়াতে থাকাবস্থায় জুলুমের শোধ করতে না পারলে যার ওপর জুলুম করেছেন, সে আপনার নেক আমল নিয়ে যাবে। আর যদি আপনার কোনো নেক আমল না থাকে, তবে তার গুনাহের ভার আপনার ওপর দেওয়া হবে। আপনি যদি কারও হক আত্মসাৎ করেন, কাউকে টাকা না দিয়ে তার কাছ থেকে কোনো কিছু জোর করে ছিনিয়ে নেন, তাহলে আজই তার নিকট মাফ চান, টাকাগুলো ফেরত দিয়ে দিন। নতুবা কিয়ামতের দিন এই টাকার বিনিময়ে আপনার নেক আমল সে নিয়ে নেবে। আমাদের আলিমগণ বলেন, জুলুম তিন প্রকার। সেগুলো হলো—
ক. আল্লাহর সাথে জুলুম, যা আল্লাহ ক্ষমা করেন না। সেটা হলো শিরক।
খ. বান্দার সাথে জুলুম; কিয়ামতের দিন এক তিল পরিমাণ জিনিসও যদি কারও সাথে লেনদেন থেকে থাকে, এর হিসাব দিয়ে পার পেতে হবে। আপনি কারও সাথে কোনো অন্যায় করে দুনিয়াতে পার পেলেও কিয়ামতের দিন কোনোভাবেই পার পাবেন না।
গ. নিজের সাথে জুলুম। আপনি যদি গোপন পাপ করেন, আল্লাহ চাইলে সেটা ক্ষমা করে দেবেন।
আপনি অন্যের সাথে জুলুম করলে আল্লাহ সেটা ক্ষমা করবেন না, যতক্ষণ না যার সাথে জুলুম করেছেন সে আপনাকে ক্ষমা করে। নবিজি বলেন, মজলুমদের বদদুআকে ভয় করবে। কেননা, তাদের বদদুআ এবং আল্লাহর মাঝখানে কোনো পর্দা থাকে না。
আপনি যার ওপর জুলুম করবেন, সে যদি আপনার বিরুদ্ধে দুআ করে, আল্লাহ সেই দুআ সরাসরি কবুল করে নেন। আল্লাহ জালিমদের ছাড় দেন, কিন্তু ছেড়ে দেন না। তারা যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন, আল্লাহর নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। নবিজি বলেন, আল্লাহ জালিমদের ছাড় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন তাকে ধরেন, তখন আর ছাড়েন না。
একই প্রসঙ্গে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রকে সাহায্য করেন, যদিও তা কাফির রাষ্ট্র হোক না কেন। কিন্তু আল্লাহ জালিম রাষ্ট্রকে সাহায্য করেন না, যদিও তা মুসলিম রাষ্ট্র হোক না কেন। এই কথার প্রমাণ আমরা বর্তমান সময়েও দেখতে পাই। অনেক অমুসলিম রাষ্ট্রকে আল্লাহ সাহায্য করছেন; কিন্তু মুসলিমপ্রধান দেশগুলো জালিম শাসকের দ্বারা শাসিত হওয়ার কারণে আল্লাহর সাহায্য পাচ্ছে না।
ইমাম ইবনে তাইমিয়ার কথার স্বপক্ষে ইমাম তাবরানির বর্ণনায় একটি হাদিস পাওয়া যায়। নবিজি বলেন-যারা ন্যায়পরায়ণ, তাদের ঈমান না থাকলেও আল্লাহ তাদের কিছুটা সুরক্ষা দেন। অন্যদিকে যাদের ঈমান আছে, কিন্তু তারা অত্যাচারী; আল্লাহ তাদের সুরক্ষা করেন না।
মক্কা বিজয়ের পর নবিজির কাছে একটি বিচার নিয়ে আসা হয়। মাখজুম গোত্রের এক নারী চুরি করে। সে ছিল আবু লাহাবের গোত্রের সম্ভ্রান্ত মহিলা। সবাই ভেবেছিল রাসূলুল্লাহ হয়তো তাকে ক্ষমা করে দেবেন। নবিজির কাছে সুপারিশ করার জন্য পাঠানো হয় তাঁর প্রিয় সাহাবি উসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-কে। একজন সম্ভ্রান্ত নারীর পক্ষে সাহাবির সুপারিশ শুনে রাসূলুল্লাহ খুব রাগ করেন। তিনি বলেন-
তোমাদের পূর্বের জাতিসমূহকে এই কাজের জন্য ধ্বংস করা হয়েছে। যখন তাদের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট লোক চুরি করত, বিনা সাজায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো। অন্যদিকে যখন কোনো অসহায়-গরিব এবং সাধারণ লোক চুরি করত, তখন তার ওপর শাস্তি কায়েম করত। আল্লাহর কসম! আজ যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তাহলে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।
ন্যায়বিচারের প্রসঙ্গ উঠলে আমরা বেশির ভাগ সময় অন্যের দিকে তাকাই। বলা শুরু করি-অমুক নেতা ন্যায়বিচার করেন না, অমুক শাসক ন্যায়বিচার করেন না। হ্যাঁ, ওই শাসক ন্যায়বিচার না করলে আল্লাহ তার বিচার করবেন। আমরা নিজেরা ন্যায়বিচার করি কি না, সেটাই হলো আসল প্রশ্ন। আমাদের সন্তান, স্ত্রী, আত্মীয়ের সাথে ন্যায়বিচার করি কি না, সেই বিষয়ে আল্লাহ আমাদের জিজ্ঞেস করবেন। সন্তানদের সাথে যেন ন্যায়বিচার করেন, সেজন্য নবিজি নির্দেশ দিয়ে বলেন-সন্তানদের সাথে তোমরা ন্যায়বিচার করবে, তোমাদের সন্তানদের সাথে সমান আচরণ করবে।

টিকাঃ
২৩৬ সূরা নাহল: ৯০
২৩৭ সূরা নিসা: ১৩৫
২৩৮ সূরা মায়েদা : ৮
২৩৯ সূরা শুরা: ১৫
২৪০ সূরা হাদিদ: ২৫
২৪১ সূরা ইউনুস: ১৩
২৪২ সহিহ মুসলিম: ৬৪৭২
২৪৩ সহিহ বুখারি: ২৪৪৯
২৪৪ সহিহ বুখারি: ৪৩৪৭
২৪৫ সহিহ বুখারি: ৪৬৮৬
২৪৬ ইবনে তাইমিয়া, মাজমুয়ুল ফাতাওয়া: ২৮/৬৩
২৪৭ সহিহ বুখারি: ৩৪৭৫
২৪৮ সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৪৪

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 সম্পর্ক জোড়া লাগানো

📄 সম্পর্ক জোড়া লাগানো


মুমিন ব্যক্তিত্বের অনন্য একটি গুণ ও বৈশিষ্ট্য হলো ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক জোড়া লাগানো, যা পরিবার ও সমাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোতে মাঝেমধ্যে টানাপোড়েন দেখা দেয়। সম্পর্ক ভেঙে যায়। ভাই ভাইয়ের সাথে কথা বলে না। বোন বোনের সাথে কথা বলে না। এক আত্মীয় আরেক আত্মীয়ের সাথে কথা বলে না। তাদের বাসায় বেড়াতে যায় না।
ইসলামি শরিয়াহ আমাদের উৎসাহ দেয়, এমনটি হলে আমরা যেন নিজ থেকেই এগিয়ে যাই। সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ব্যবস্থা নিই। ইসলাম আমাদের এসব ক্ষেত্রে বসে থাকতে নিরুৎসাহিত করে।
আপনি লোকজনকে গিয়ে বলছেন, আমার চাচা আর চাচাতো ভাই কথা বলে না। আমার ফুফাতো ভাই আর আমার ভাইয়ের মধ্যে সমস্যা, তারা কথা বলে না। এই বলাবলির মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। আপনার দায়িত্ব হলো, কী করলে তারা কথা বলবে, সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে সেটা নিশ্চিত করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।'
এখানে 'দুই দল' হতে পারে দুটি গোত্র, দুটি দেশ, দুটি জাতি, দুটি পরিবার; এমনকি দুজন ব্যক্তি। যখনই তারা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে, আপনার কাজ: দর্শক হয়ে সেটা উপভোগ না করে তাদের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দেওয়া। গোপনে বৈঠক করা সাধারণত খারাপ। তবে তিনটি ক্ষেত্রে গোপন বৈঠক প্রশংসনীয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তাদের গোপন পরামর্শের অধিকাংশে কোনো কল্যাণ নেই। তবে (কল্যাণ আছে) যে নির্দেশ দেয় সাদাকার, ভালো কাজ অথবা মানুষের মধ্যে মীমাংসার। আর যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করবে; অচিরেই আমি তাকে মহাপুরস্কার দান করব।'
বেশির ভাগ গোপন বৈঠকের খারাপ উদ্দেশ্যে থাকে। তবে আল্লাহ তিন ধরনের গোপন বৈঠকের প্রশংসা করেছেন; যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সম্পর্ক জোড়া লাগানো।
আপনার দুজন কাজিন পরস্পর কথা বলে না। আপনি অন্য কাজিনদের সাথে মিলে গোপনে বৈঠক করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, সবাইকে নিয়ে একটি পিকনিকে যাবেন। আর যাওয়ার উদ্দেশ্য হলো ওই দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য দূর করে সম্পর্কের মীমাংসা করা। এসব ক্ষেত্রে আল্লাহর তরফ থেকে গোপন বৈঠক প্রশংসনীয়।
মানুষের মাঝে সম্পর্ক ঠিক করে দেওয়াটাও ইবাদত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেটা নামাজ, রোজা, সাদাকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরিও বটে। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন-আমি কি তোমাদের নামাজ, রোজা ও সাদাকার চেয়ে উত্তম কাজ সম্পর্কে বলব না? সাহাবিরা জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের বলুন। নবিজি বলেন, পরস্পর সুসম্পর্ক স্থাপন। কেননা, পরস্পর সুসম্পর্ক নষ্ট হওয়ার অর্থ হলো দ্বীনের বিনাশ হওয়া।
এসব আমল নিয়ে সাধারণভাবে যেভাবে কথা বলা দরকার, প্রচার হওয়া দরকার-আমরা সেভাবে বলি না। আমরা মনে করি, ইসলাম আমাদের আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা করতে বলে। কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবতে বলে। কথাটা সত্য হলেও সকল ক্ষেত্রে তো আর এই কথা প্রযোজ্য না। আপনি অন্যকে নিয়েও ভাববেন, যদি হয় সেটা কল্যাণের উদ্দেশ্যে।
অন্যরা দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে আপনি মিটিয়ে দেবেন। কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করলে আপনি সেটা জোড়া লাগানোর ব্যবস্থা করবেন। নবিজি জানান, সেই কাজটি নামাজ-রোজার চেয়েও উত্তম।
আমরা যদি আসলেই সবাইকে ভালোবাসি, তাহলে কারও সম্পর্কচ্ছেদ আমরা পছন্দ করব না। এগিয়ে যাব সম্পর্ক জোড়া লাগাতে।
নবিজি মসজিদে খুতবা দিচ্ছেন। তাঁর আদরের নাতি হাসান (রা.)-কে মসজিদে দেখে কোলে নেন। আর তাঁকে নিয়েই খুতবা দেন। তখন তিনি বলেন, নিশ্চয়ই আমার এই নাতি নেতা হবে এবং সম্ভবত আল্লাহ তাঁর দ্বারা مسلمانوں দুটি বড়ো দলের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করবেন।
নবিজি জানিয়ে দেন, হাসান (রা.) নেতা হবেন। আর সত্যই তা আমরা ইতিহাস খুললে দেখতে পাই, যখন মুয়াবিয়া (রা.) খিলাফত দাবি করেন।
অন্যদিকে খিলাফতের দাবিদার ছিলেন হাসান (রা.)। মুয়াবিয়ার কৃত দাবির সংবাদ পেয়ে তিনি নিজের দাবি প্রত্যাহার করে নেন। এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যকার আবশ্যিক সংঘাত এড়ানো যায়। হাসান (রা.) এজন্যই নেতা, তিনি উম্মাহর প্রয়োজনে তাঁর যৌক্তিক দাবি প্রত্যাহার করেন। সন্ধি স্থাপনে, সম্পর্ক রক্ষার জন্য নিজের দাবি থেকে সরে আসেন।
নবিজির সিরাত পড়লে পাওয়া যায়, তিনি অসংখ্যবার মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক জোড়া লাগান। একবার তাঁর মেয়ে ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে গিয়ে দেখেন আলি (রা.) তাঁর মেয়ের ওপর রাগ করে বাইরে চলে গেছেন। তিনি মসজিদে গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। নবিজি এমনটি মনে করেননি—এসব তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার, তোমরাই ঠিক করো। তিনি বরং মসজিদে যান, আলি (রা.)-এর অভিমান ভাঙানোর জন্য তাঁকে সুন্দর একটি নামে ডাকেন, হে আবু তুরাব。
নবিজি দেখতে পান, মদিনার অলিগলিতে এক যুবক পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। কপোল বেয়ে পড়ছে অশ্রু-নিনাদ। যে-ই তাঁকে এভাবে দেখছে, অন্তর গলে মায়াময় অনুভূতি নিয়ে পাশ অতিক্রম করে যাচ্ছে। মদিনার সমাজ, যেখানে নবিজি আছেন, সেই সমাজের একজন যুবক একটা মেয়ের জন্য এইভাবে কেঁদে বেড়াচ্ছে!
তাঁর নাম মুগিস। তিনি ছিলেন নবিজির সাহাবি এবং একজন দাস। বারিরা নামের এক মেয়ের পিছু পিছু তিনি ঘুরছেন। বারিরা ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তাঁরা ছিলেন দুজনই দাস-দাসী। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার পর তাদের বিবাহিত সম্পর্ক বজায় রাখবেন কি না, সেটা তাদের এখতিয়ার। মুগিস বিয়ের সম্পর্ক বহাল রাখতে চাইলেন, কিন্তু বারিরা চাইলেন না।
বারিরা মুগিসকে তালাক দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু বারিরার চলে যাওয়া কোনোভাবেই মুগিস মেনে নিতে পারেননি। বাচ্চা, আনাড়ি ছেলেদের মতো বারিরার পিছু পিছু ঘুরছেন। অঝোরে কান্না করতে করতে তাঁর দাড়ি পর্যন্ত ভিজে গেছে।
মুগিসকে এই অবস্থায় দেখে নবিজিরও মায়া হলো। মুগিসের আবেগ তিনি অনুভব করলেন। তাঁর সাথে থাকা আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ও আব্বাস! বারিরার প্রতি মুগিসের ভালোবাসা এবং মুগিসের প্রতি বারীরার অনাসক্তি দেখে কি তুমি আশ্চর্যান্বিত হও না?
মুগিসের এমন পাগল-কান্না দেখে নবিজি তাঁর পক্ষ নিয়ে বারিরার কাছে গেলেন। তাকে বললেন, তুমি যদি তাঁর কাছে আবার ফিরে যেতে...
বারিরা ছিলেন বেশ বুদ্ধিমতী। তিনি নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি আমাকে আদেশ দিচ্ছেন? নবিজি তাঁর কথাটি পরিষ্কার করেন-না, আমি আমার পক্ষ থেকে তার জন্য কেবল সুপারিশ করছি। বারিরা যখন বুঝলেন এটা নবিজির নির্দেশ না। চাইলে তিনি নিজের মতের ওপর অটল থাকতে পারেন। বারিরা বললেন, আমি তাঁকে (মুগিসকে) চাই না।
নবিজি মানবিক জায়গা থেকে তাঁদের মিলিয়ে দিতে এলেন। মুগিসের পক্ষ হয়ে বারিরার কাছে সুপারিশ করলেন। কিন্তু বারিরা সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ইচ্ছুক ছিলেন না। ফলে নবিজি আর জোরাজুরি করেননি।
সাধারণত মিথ্যা বলা নিষেধ। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বলাকে ইসলাম সমর্থন করে, তন্মধ্যে একটি হলো সম্পর্ক জোড়া লাগানো। দুজন ব্যক্তির মাঝে যদি সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দেয়, তারা একে অপরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়, তাহলে তাদের এক করে দিতে আপনি মিথ্যা বলতে পারেন।
যেমন: দুজন মানুষের মধ্যে যদি মন কষাকষি হয়, তাদের একত্র করার জন্য প্রয়োজনে মিথ্যা বলতে পারেন। একজনকে বলতে পারেন, অমুক তো তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে অনুতপ্ত, সে আমাকে বলল-তোমার সাথে কথা বলতে চায়। আবার অন্যজনকে গিয়ে বলুন-অমুক সেদিন যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, এটার জন্য পরে কষ্ট পেয়েছে। সে তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। চলো তার সাথে গিয়ে কথা বলি। এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বলতে কোনো অসুবিধা নেই। নবিজি বলেন-সে ব্যক্তি মিথ্যুক নয়, যে মানুষের মাঝে আপসের মাধ্যমে সমাধা করে দেয়। সে কল্যাণের জন্যই মিথ্যা বলে এবং কল্যাণের জন্যই চোখলখুরি করে。
মানুষের মধ্যে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে মিথ্যা বলা পর্যন্ত অনুমোদিত। এ থেকে স্পষ্ট হয়-একটি সম্পর্ক ঠিক করা, আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রসিদ্ধ একজন আলিম বলেন, সত্য বলে সম্পর্ক ছিন্ন করা আল্লাহ অপছন্দ করেন। কিন্তু মিথ্যা বলে সম্পর্ক জোড়া লাগানো আল্লাহ পছন্দ করেন।
সমাজে যদি এই আখলাক প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে অসংখ্য সম্পর্ক জোড়া লেগে যাবে। মানুষের মধ্যে মনোমালিন্য হলে সেটা মিটে যাবে। কারণ, এর ফলে অন্যরা উদ্যোগ নেবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস ও মীমাংসা করে দাও।'

টিকাঃ
২৫০ সূরা হুজুরাত : ৯
২৫১ সূরা নিসা: ১১৪
২৫২ জামে আত-তিরমিজি: ২৫০৯
২৫৩ সহিহ বুখারি: ২৭০৪
২৫৪ সহিহ বুখারি: ৪৪১
২৫৫ সহিহ বুখারি: ৫২৮৩
২৫৬ সহিহ মুসলিম: ৬৫২৭
২৫৭ সূরা হুজুরাত: ১০

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 ক্ষমাশীলতা

📄 ক্ষমাশীলতা


ক্ষমাশীলতা মুমিন ব্যক্তিত্বের অন্যতম গুণ। মুমিন আল্লাহর ক্ষমা পেতে চায়, ক্ষমা পাওয়ার জন্য অন্যকেও ক্ষমা করে। সে যেমন চায় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তেমনই সে অন্যের প্রতি ক্ষমাশীল আচরণ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- ‘তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান; যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। '
এরপরের আয়াতেই আল্লাহ জানিয়ে দেন মুত্তাকি কারা। তিনি বলেন-
ক. যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে।
খ. রাগ সংবরণ করে এবং
গ. মানুষকে ক্ষমা করে。
যারা জান্নাত লাভ করবে, তাদের অন্যতম গুণাবলি হলো-তারা মানুষকে ক্ষমা করে। কেউ একজন এমন একটি কাজ করল, আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তা ক্ষমার অযোগ্য, তখন যদি সে তাকে ক্ষমা করে দেয়। এই ক্ষমার বিনিময়ে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।
মানুষকে তখনই ক্ষমা করা হয়, যখন সে আপনার সাথে কোনো অন্যায় করে। অন্যায় না করলে আর তো ক্ষমার প্রশ্নই আসে না। কেউ এমন কিছু করেছে, যা আপনি অপছন্দ করেন বা আপনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে। তখন তার ওপর প্রচণ্ড রাগ অনুভূত হবে। এখন যদি তাকে ক্ষমা করতেই হয়, সেই মুহূর্তে নিজের রাগ সংবরণ করে ক্ষমা করতে হবে।
আপনার অধিকার ছিল তাকে শাস্তি দেওয়ার; শরিয়াহ ও সামাজিক আইনের আলোকে। কিন্তু আপনি তাকে শাস্তি না দিয়ে ক্ষমা করে দিলেন। এটাই হলো ক্ষমাশীলতা। মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যখন রাগান্বিত হয়, তখন তারা ক্ষমা করে দেয়।
সাধারণত মানুষ যখন রাগান্বিত হয়, তখন প্রতিশোধ গ্রহণ করে। সে অন্যকে শাস্তি দেয়। স্বভাবজাত মানুষ রাগের সময় ক্ষমা করতে পারে না! কিন্তু আল্লাহ মুমিনের গুণের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, তারা রাগান্বিত অবস্থায়ও ক্ষমা করে দেয়।
কেউ যদি আপনাকে রাগিয়ে ফেলে আপনার সাথে মন্দ আচরণ করে, তাহলে প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার আপনার আছে। আপনি চাইলে তাকে শান্তি দিতে পারেন। যতটুকু অপরাধ সে করেছে, ততটুকুর শান্তি দেওয়ার জন্য আইন আপনার পক্ষে আছে। তবে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না。
আল্লাহ এখানে দুটি নিয়মের কথা বলেন।
প্রথমত, কেউ আপনার সাথে মন্দ আচরণ করলে আপনি অনুরূপ তার সাথে মন্দ আচরণ করতে পারেন। কেউ আপনাকে থাপ্পড় মারলে আপনি অনুরূপ তাকে থাপ্পড় মারতে পারেন। কিন্তু এই অনুরূপ কাজকেও আল্লাহ তায়ালা 'মন্দ কাজ' বলে অভিহিত করেছেন।
দ্বিতীয়ত, অথবা আপনি তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। আপনার অধিকার ছিল তাঁকেও অনুরূপ বলার। তার সাথে অনুরূপ আচরণ করার। কিন্তু আপনি মন্দের দিকে না ধাবিত হয়ে উত্তমের দিকে এগিয়ে গেলেন। আপনি তাকে ক্ষমা করে দেন। ফলে আল্লাহ বলছেন, এজন্য আপনাকে পুরষ্কৃত করা হবে। কিন্তু কী পুরস্কার দেওয়া হবে সেটা আল্লাহ বলেননি। তার মানে আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনাকে উত্তম পুরস্কার দান করবেন।
সর্বোত্তম ক্ষমা হলো নিজের পরিবারের সদস্যদের ক্ষমা করে দেওয়া। প্রতিদিনই নানান কারণে আমরা পরিবারের সদস্যদের সাথে রাগারাগি করি। এমনও হয় আত্মীয় আরেক আত্মীয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। এসব ক্ষেত্রে যদি একপক্ষ ক্ষমাশীল আচরণ করতে পারে, তাহলে সম্পর্ক জোড়া লেগে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে মুমিনগণ! তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানসন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদেরই শত্রু। অতএব, তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। আর যদি তোমরা মার্জনা করো, এড়িয়ে যাও এবং ক্ষমা করো; তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু। '
নবিজি তিনটি বিষয়ের কথা বলেন, যেগুলো সম্পর্কে আমরা একধরনের ধারণা পোষণ করি, বাস্তবে সেগুলো ভিন্ন রকম। আমরা মনে করি, দান করলে সম্পদ কমে। ক্ষমা করলে মর্যাদা কমে। বিনয়ী হলে সম্মান কমে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ বলেন-এসব অমূলক ধারণা, একটিও ঠিক নয়। তিনি বলেন-
ক. দান করলে সম্পদ কমে না।
খ. যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন এবং
গ. যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা সমুন্নত করেন。
অর্থাৎ, যে ক্ষমা করে সে দুর্বল নয়; বরং সে তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী, যে প্রতিশোধ নেয়। প্রতিশোধ নেওয়া কোনো গুণ না, কিন্তু অন্যকে ক্ষমা করে দেওয়া একটি অনন্য গুণ। আয়িশা (রা.) নবিজির একটি গুণ বর্ণনা করেন, নবিজি নিজের ব্যাপারে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তবে আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করা হলে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য প্রতিশোধ নিতেন।
নবিজির পুরো জীবনী পড়লে ক্ষমাশীলতার অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি তাঁর বন্ধু-শত্রু সবাইকে ক্ষমা করে দিতেন। তায়েফবাসী, যারা তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিল, তাদেরও ক্ষমা করে দেন। মক্কা বিজয়ের দিন মক্কাবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
তবে একটি জিনিস মনে রাখা প্রয়োজন। ক্ষমা করে দেওয়ার মানে এই না যে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। আপনি যদি কাউকে ক্ষমা করেন, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই, আপনি তার অন্যায়কে অন্যায় মনে করেননি।
অন্যায় অন্যায়ই থেকে যাবে। আপনি কাউকে ক্ষমা করার মানে হলো আপনি তার মতো আচরণ করলেন না, তার চেয়ে উত্তম আচরণ করলেন। ক্ষমা করে দিয়ে উত্তম আচরণ করলে দেখবেন, মানসিক প্রশান্তি অনুভূত হবে। সাইকোলজিস্টরা বলেন, মানসিক প্রশান্তি সহজে হাসিলের অন্যতম উপায় হলো নিঃসংকোচে কাউকে ক্ষমা করে দেওয়া।
ইসলামি শরিয়াহ ক্ষমাশীলতাকে উৎসাহিত করে। তার মানে এই নয়, ক্ষমা করা ওয়াজিব বা করতেই হবে কিংবা আবশ্যক। মাঝেমধ্যে আবার ক্ষমা করতে না পারাটাও বরং উত্তম। যেমন: কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে কটূক্তি করলে আপনি তাকে বলতে পারবেন না, ক্ষমা করে দিলাম। ক্ষমাশীলতার একটি সীমানা আছে। সীমানা বুঝে ক্ষমা করতে হবে। যদি এমন হয়—কাউকে ক্ষমা করার ফলে সে পাপের সুযোগ পাচ্ছে, সরলতা মনে করছে, তখন তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এসব ক্ষেত্রে পাঁচটি অপশন আছে। সেগুলো হলো—
• কেউ আপনার ক্ষতি করল, প্রতিশোধস্বরূপ আপনিও তার কয়েক গুণ ক্ষতি করলেন। কেউ আপনাকে একটি কটু কথা বলল, আপনি তাকে ১০টি কটু কথা বললেন। কেউ অসাবধানতাবশত আপনার সঙ্গে ধাক্কা খেলো, আপনি তাকে ধরে হাত-পা ভেঙে দিলেন। এসব জঘন্য কাজ, এই ধরনের কাজ হারাম।
• কেউ আপনার যেমন ক্ষতি করল, আপনিও তার তেমন ক্ষতি করলেন। এটা ইসলামে অনুমোদিত। কেউ আপনার ক্ষতি করলে আপনি তার জন্য বদদুআ করতে পারেন। নবিজিকে মক্কার কাফিররা যখন শারীরিক নির্যাতন করেছে, তিনি তখন তাদের বিরুদ্ধে বদদুআ করেন। যাদের বিরুদ্ধে বদদুআ করেন, তারা সবাই বদর যুদ্ধে নিহত হয়。
• আপনার ওপর কেউ জুলুম করলে আপনি দুনিয়াতে তাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু কিয়ামতের দিন তার নেক আমলের বিনিময় গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ, আপনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। কিয়ামতের দিন তোমাকে দেখে নেব। এটাও ইসলামে অনুমোদিত। যেসব অত্যাচারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে তেমন কিছু করতে পারবেন না কিংবা তাদের ক্ষমতার প্রাচুর্যের কাছে আপনি অসহায়, তাহলে এমনটা করতে পারেন।
• আপনি তাকে ক্ষমা করে দেন, কিন্তু তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখেন না। এটাও ইসলামে অনুমোদিত। উহুদ যুদ্ধে নবিজির চাচা হামজা (রা.)-কে শহিদ করে ওয়াহশি। যদিও তিনি পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর নবিজির তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, হামজা (রা.)-এর শাহাদাতের কথা। ওয়াহশি (রা.) সেটা বর্ণনা করার পর রাসূলুল্লাহ তাঁকে বলেন, আমার সামনে থেকে কি তোমার চেহারা সরিয়ে রাখতে পারো?
নবিজি তাঁকে ক্ষমা করলেও তাঁর আচরণটি ভুলতে পারেন না। ফলে তিনি ওয়াহশির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখেননি। এ সরকম ক্ষেত্রে কেউ যদি আপনার কাছে ক্ষমা চায়, আর যদি কাউকে ক্ষমা করে দেন, তাহলে তার বিনিময়ে আপনি সওয়াব পাবেন।
• আপনি ক্ষমা করে দেবেন এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন। এটা হলো ক্ষমাশীলতার সর্বোত্তম পদ্ধতি।
মিসতা ইবনে সালামা (রা.)-এর মা উম্মে মিসতা (রা.)। উম্মে মিসতা ছিলেন আবু বকর (রা.)-এর খালা। সেই হিসেবে মিসতা আবু বকর (রা.)-এর খালাতো ভাই। আবু বকর (রা.) তাঁর সম্পূর্ণ ভরণপোষণ দিতেন।
বনু মুস্তালিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে মুনাফিকরা আয়িশা (রা.)-কে অপবাদ দেয়। অপবাদের গুজব রটে যায় পুরো মদিনাজুড়ে। মুনাফিকদের প্ররোচনায় পড়ে কয়েকজন সাহাবিও এর সাথে তাল মেলাতে শুরু করেন। তাঁরাও আয়িশা (রা.)-এর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন!
অপবাদ রটনাকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন মিসতা ইবনে সালামা (রা.)। আবু বকর (রা.) যাকে আর্থিক সাহায্য করেন, সেই ব্যক্তিই কিনা তাঁর মেয়ের চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটনা করেন, অপবাদ বলে বলে বেড়ান!
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে আয়িশা (রা.)-এর চারিত্রিক নিষ্কলুষতার ব্যাপারে আয়াত নাজিল করেন। সবাই বুঝতে পারলেন, আয়িশা (রা.) সম্পর্কে যা বলা হয়েছিল এটা স্রেফ অপবাদ; এর মধ্যে কোনো সত্যতা নেই। আয়াত নাজিল হওয়ার পর আবু বকর (রা.) মিসতা (রা.)-এর ব্যাপারে বলেন, আল্লাহর কসম! মিসতা যেহেতু আয়িশা (রা.)-এর ব্যাপারে অপবাদ রটিয়েছে, তাই আমি তাঁর জন্য কখনো কিছু খরচ করব না!
যে ব্যক্তিকে আবু বকর (রা.) আর্থিক সাহায্য করেন, সেই ব্যক্তিই তাঁর মেয়ের বদনাম করেছে! আবু বকর (রা.)-এর এমন প্রতিক্রিয়া দেখানো তো খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ চাইলেন শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের শ্রেষ্ঠ মানুষ যেন শ্রেষ্ঠ আচরণ করেন। আল্লাহ নিজেই ক্ষমাশীল। মানুষও যেন এই ক্ষমাশীলতার গুণটি আয়ত্ত করতে পারে। তাই এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একটা আয়াত নাজিল করেন- 'তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন শপথ না গ্রহণ করে-তাঁরা আত্মীয়স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহ ত্যাগ করেছে, তাঁদের কিছুই দেবে না। তাঁরা যেন ওদের ক্ষমা এবং ওদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।'
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে-যাকে ক্ষমা করার প্রশ্নই ওঠে না, কোনোভাবেই যাকে ক্ষমা করা যায় না, তাঁর ব্যাপারেও আল্লাহ তায়ালা বলছেন-'তাঁকে ক্ষমা করে দাও।' ক্ষমা করে দিলে কী হবে? তারপরই আল্লাহ পালটা প্রতিদানের কথা দিয়ে বলছেন, এতে করে আল্লাহও তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
আবু বকর (রা.) আল্লাহর এমন ঘোষণা শুনে বললেন-আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দিন, এটা আমি পছন্দ করি। যেই মিসতাকে তিনি আর সাহায্য করবেন না বলেছিলেন, আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্তির ঘোষণা শুনে তাঁকে আগের মতো আর্থিক সাহায্য করা শুরু করেন। তখন তিনি পালটা কসম করেন, আল্লাহর কসম! আমি তাঁর খরচ দেওয়া কখনোই বন্ধ করব না。
আবু বকর (রা.) তাঁর মেয়ের ওপর অপবাদ রটনাকারীকে ক্ষমা করে দেন। এ ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমরাও চাইলে ক্ষমা করতে পারি। আমাদের প্রতি কেউ কি এমন অন্যায় করে, যা আবু বকর (রা.)-এর চেয়ে বেশি? ক্ষমাপ্রদর্শন করে আমরা উত্তম আচরণ করতে পারি। আর অন্যকে ক্ষমা করব এজন্যই, যাতে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করেন। নবিজি আমাদের এর প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেন-অন্যকে ক্ষমা করো, (তাহলে) আল্লাহ তোমাকেও ক্ষমা করবেন。

টিকাঃ
২৫৮ সূরা আলে ইমরান: ১৩৩
২৫৯ সূরা আলে ইমরান: ১৩৪
২৬০ সূরা শুরা: ৩৭
২৬১ সূরা শুরা: ৪০
২৬২ সূরা আত-তাগাবুন: ১৪
২৬৩ সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৬
২৬৪ সহিহ বুখারি: ৩৫৬০
২৬৫ সহিহ বুখারি: ৩৮৫৪
২৬৬ সহিহ বুখারি: ৪০৭২
২৬৭ সূরা নূর ২৪: ২২
২৬৮ সহিহ বুখারি: ৬৬৭৯
২৬৯ মুসনাদে আহমাদ: ৬৫৪১

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণ

📄 মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানজনক আচরণ


ব্যক্তিত্বপূর্ণ এই গুণের প্রতি উৎসাহ দিয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অনেকগুলো আয়াত নাজিল করেন। তিনি বলেন- 'জমিনে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনো জমিনে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায়ও কখনো পাহাড় সমান পৌঁছাতে পারবে না।'
আল্লাহ আরও জানিয়ে দেন, আমরা যেন সম্মানজনক পদ্ধতিতে হাঁটাচলা করি। এমনভাবে না হাঁটি, যেন হাঁটার মধ্যে অহংকার প্রকাশ পায়। আবার এমনভাবেও যেন না হাঁটি, লোকজন আমাদের দুর্বল ভাবে। কুরআনের আরেকটি আয়াতে দেখা যায় লুকমান (আ.) তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিচ্ছেন- 'আর তোমরা চলার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো। তোমাদের আওয়াজকে নিচু করো। নিশ্চয়ই সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার আওয়াজ।'
আমরা যখন কথা বলব, এত জোরে কথা বলব না আবার খুব আস্তেও কথা বলব না। আল্লাহ তায়ালা গাধার উদাহরণ দিয়ে বলেন, গাধার আওয়াজ সবচেয়ে নিকৃষ্ট। আমাদের আওয়াজ যেন এমন না হয়।
কথা বলা, চলার ক্ষেত্রে যেমন মর্যাদাপূর্ণ আচরণ প্রদর্শন করতে হবে, তেমনই ইবাদতের ক্ষেত্রেও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করতে হবে। একবার নবিজি নামাজ পড়াচ্ছিলেন। কয়েকজন সাহাবি মসজিদে এলেন একটু দেরি করে। নামাজের রাকাত পাওয়ার জন্য তারা দৌড়ে মসজিদে আসেন। নামাজ শেষে নবিজি সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন, নামাজের জন্য ইকামত দেওয়া হয়ে গেলে তোমরা দৌড়াদৌড়ি বা তাড়াহুড়ো করে নামাজে এসো না; বরং প্রশান্তিসহ গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে নামাজে শরিক হও। অতঃপর ইমামের সাথে যত রাকাত নামাজ পাও, তা আদায় করো। আর যতটুকু না পাবে, তা পূরণ করে নাও।
কেননা, তোমাদের মধ্যে কেউ যখন নামাজ আদায়ের সংকল্প করে, তখন সে নামাজরত অবস্থায় থাকে বলে গণ্য হয়。
আমরা এখনও দেখতে পাই, মানুষ নামাজে জামাত পাওয়ার জন্য দৌড়ে দৌড়ে মসজিদে আসে, যা দেখতে খুব বিদঘুটে দেখায়। এটা সুন্নত না। সুন্নত হলো-ধীরে-সুস্থে, গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে যাওয়া।
হজের সময় নবিজি আরাফা থেকে মুজদালিফায় যাচ্ছেন। তখন পেছন থেকে খুব বেশি হাঁকডাক ও উট পেটানোর শব্দ শুনতে পেলেন। সাহাবিরা খুব দ্রুতগতিতে উট হাঁকাচ্ছেন। নবিজি তাঁদের দিকে চাবুক উঠিয়ে ইঙ্গিত করে বললেন, হে লোকসকল! তোমরা ধীরস্থিরতা অবলম্বন করো। কেননা, উট দ্রুত হাঁকানোর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।
ধীরস্থিরতা অবলম্বন করলে ভিন্ন রকম এক প্রশান্তি পাওয়া যায়। ইবাদতের ক্ষেত্রেও আল্লাহ তাড়াহুড়ো করতে বলেননি। আমরা যেন ধীরে-সুস্থে ইবাদত করি, তাহলে অন্যের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটবে না।
'সাকিনা' নাজিল হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে। মুমিনের হৃদয়ে সাকিনা প্রদান করেন। সিরাত অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, যেকোনো দুর্যোগের মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা সাহাবিদের অন্তরে সাকিনা নাজিল করেন। যেমন: হুনাইন যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন-
'তারপর আল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাজিল করলেন তাঁর রাসূলের ওপর ও মুমিনদের ওপর। '
বাইয়াতুর রিদওয়ানের সময়ও আল্লাহ সাকিনা নাজিল করেন। তিনি বলেন- 'মুমিনরা যখন বৃক্ষতলে আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন। তাদের অন্তরে যা ছিল তা সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন, তাদের তিনি দান করলেন প্রশান্তি। '
মক্কা বিজয়ের কথা উল্লেখ করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যখন কাফিররা তাদের অন্তরে জাহেলি যুগের অহমিকা পোষণ করেছিল। তখন আল্লাহ তাঁর রাসূলের ওপর এবং মুমিনদের ওপর তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাজিল করলেন। '
মক্কা বিজয়ের সময় মুসলিমদের প্রতি যদি আল্লাহ প্রশান্তি নাজিল না করতেন, তাহলে হয়তো বেশ কিছু হত্যাযজ্ঞ ঘটে যেত। কারণ, মক্কাবাসীর অত্যাচারের কারণে সাহাবিরা হিজরত করেছেন। এখন বিজয়ীর বেশে তারা মক্কায় ফেরেন। তারা চাইলে মক্কাবাসীকে হত্যা করতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ নবিজি ও সাহাবিদের ওপর আল্লাহ সাকিনা নাজিল করেন।
মর্যাদাপূর্ণ আচরণের দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো শরয়ি দিক, অন্যটি সাংস্কৃতিক। যেমন: ইসলামি শরিয়াহ বলে-আমরা গালাগালি করতে পারব না, কটু কথা বলতে পারব না, মিথ্যা বলতে পারব না ইত্যাদি। পৃথিবীর যে দেশেই আপনি থাকুন না কেন, এগুলো মেনে চলতে হবে।
আবার কিছু দিক আছে সাংস্কৃতিক। যেমন: ভাষা, শব্দ। এক অঞ্চলের খুবই সম্মানজনক ভাষা, আরেক অঞ্চলে সেটা হয়তো তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয়। এজন্য বলা হয়ে থাকে-এক দেশের গালি, আরেক দেশের বুলি।
আপনি যেখানে বসবাস করেন, সেখানকার সংস্কৃতি সম্পর্কে আপনার পর্যাপ্ত জানাশোনা থাকতে হবে, বোঝাপড়া থাকতে হবে। যেমন: কাপড় পরার ক্ষেত্রে। পৃথিবীর একেক দেশের মুসলিম অধিবাসী একেক ধরনের পোশাক পরেন। ইন্দোনেশিয়ার মুসলিমগণ একধরনের পোশাক পরেন, মধ্যপ্রাচ্য-আরবের মুসলিমগণ আরেক ধরনের পোশাক। উপমহাদেশের মুসলিমগণ একধরনের পোশাক পরেন, ইউরোপ-আমেরিকার মুসলিমগণ আরেক ধরনের পোশাক।
আর উপমহাদেশের মুসলিমরা সাধারণত পাঞ্জাবি, ফতোয়া, শার্ট পরে। অন্যদিকে আরবের মুসলিমরা জোব্বা পরে। আমেরিকা থাকাকালীন যে পোশাক পরে আমি জুমার নামাজে যেতাম, সৌদি আরব দেখি এমন পোশাক পরে তারা কেউ জুমায় আসে না; এমন পোশাক নাকি তারা বাসায় পরে।
আপনি এসব ক্ষেত্রে সেই পোশাক পরুন, যে পোশাকটি আপনার অঞ্চলের মুসলিমরা পরে। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন-সেই পোশাকের সাথে ইসলাম পোশাকের ব্যাপারে যে নির্দেশনা দিয়েছে, তার সাথে যেন সাংঘর্ষিক না হয়। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহর মতে, সুন্নাতসম্মত পোশাক হলো আপনার এলাকার লোকজনের মতো করে পোশাক পরা; যতক্ষণ পর্যন্ত সেই পোশাক পরতে শরিয়াহ অনুমোদন দেয়।
একবার এক লোক নবিজির কাছে আসেন। তার পোশাক ছিল জীর্ণ, আর জায়গায় জোড়াতালি দেওয়া। নবিজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কি অর্থ নেই? তিনি জানালেন, তার কাছে অর্থ আছে।
নবিজি বুঝতে পারলেন, টাকাকড়ি থাকা সত্ত্বেও লোকটি ভালো পোশাক পরে না। এমন কাজ আমাদের আশপাশের অনেকেই করে। তারা মনে করে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও জোড়াতালি দেওয়া জামা পরই উত্তম। এই ধারণা ঠিক নয়। নবিজি লোকটিকে বলেন-আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাকে কোনো নিয়ামত দান করেন, তখন তার (নিয়ামতের) নিদর্শন তার মধ্যে দেখতে পছন্দ করেন।
একজন মুসলিম এমন কোনো পোশাক পরতে পারে না, যা দেখে লোকজন বলে-এই দেখো, ও কী পরেছে! একজন মুসলিম এমনভাবে কথা বলতে পারে না, যা তার জন্য অসম্মান বয়ে আনে। একজন মুসলিম এমন কাজ করতে পারে না, যা তার নিজের জন্য এবং মুসলিম জাতির জন্য লজ্জাজনক। মুসলিম সব সময় সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে জীবনযাপন করে। তার হাঁটাচলা, কথা বলা, চুপ থাকা, জামা পরা-সবকিছু হতে হবে গাম্ভীর্যপূর্ণ, সম্মানজনক। যতটুকু সামর্থ্য আছে, সামর্থ্য যেন তার যাপিত জীবনের সময়ের মধ্যে প্রকাশিত হয়। কারণ, আল্লাহ তাকে যে নিয়ামত দান করেছেন, সেই নিয়ামতের বহিঃপ্রকাশ দেখতে আল্লাহ পছন্দ করেন।

টিকাঃ
২৭০ সূরা বনি ইসরাইল: ৩৭
২৭১ সূরা লুকমান: ১৯
২৭২ সহিহ মুসলিম: ১২৪৭
২৭৩ সহিহ বুখারি: ১৬৭১
২৭৪ সূরা আত-তাওবা: ২৬
২৭৫ সূরা ফাতহ: ১৮
২৭৬ সূরা ফাতহ: ২৬
২৭৭ বুলগুল মারাম: ৫৩০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00