📘 মুমিনের আখলাক > 📄 উচ্চারণভঙ্গী

📄 উচ্চারণভঙ্গী


মুমিন গড়পড়তা কিছু পছন্দ করতে পারে না। তার আকাঙ্ক্ষা থাকতে হয় উঁচু। নিতান্তই সাধারণ মানুষ হিসেবে সে জীবন কাটাতে চায় না। সে চায় শ্রেষ্ঠ হতে। দুনিয়াতেও শ্রেষ্ঠ, আখিরাতেও শ্রেষ্ঠ। একজন মুমিনের ভিশন বহুদূর। সমাজ পরিবর্তনে সে মুখ্য ভূমিকা রাখে। নেতৃত্ব কামনা করে না, কিন্তু নেতার মতো জীবনযাপন করে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিদের জীবনী পড়লে আমরা দেখতে পাই-তারা ছিলেন দুনিয়াতেও সফল, আখিরাতেও সফল। একই সাথে দুনিয়ার মানুষদের নেতা, আখিরাতের মানুষদেরও নেতা।
কোনো কোনো সাহাবি ছিলেন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, কেউ ছিলেন শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, কোনো সাহাবি ছিলেন শ্রেষ্ঠ কবি, কেউ কেউ ছিলেন শ্রেষ্ঠ ফকিহ। তাদের মধ্যে আবার অনেকেই ছিলেন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। কোনো সাহাবি ছিলেন সেরা ব্যবসায়ী। এমন বৈচিত্র্যময় চারিত্রিক গুণ দেখেই আমরা বুঝতে পারি, তারা একেকজন একেক দিক থেকে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন- 'তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে।'
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- 'তোমরা আল্লাহর দিকে ছুটে চলো।'
অলস হয়ে বসে থাকার জন্য আমরা পৃথিবীতে আসিনি। কোনো কিছু চাইতে যদি হয়ই, তাহলে ছোটো কিছু চাইব কেন? চাইলে সব সময় বড়ো কিছুই চাইব; এমনকি জান্নাতের বেলায়ও। নবিজি বলেন, আল ফিরদাউস হলো জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর। তোমরা যখন জান্নাতপ্রাপ্তির দুআ করবে, তখন আল ফিরদাউসের জন্য দুআ করবে।
নবিজি আমাদের শেখাচ্ছেন, আমরা যেন সর্বোচ্চটা অর্জনের চেষ্টা এবং এর জন্য দুআ করি। মুসলমানরা হলো ভিশনওয়ালা জাতি। তারা কখনো ছোটোখাটো স্বপ্ন দেখে না। সাহাবিরাও দেখেননি। তারা দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে ছুটে চলেন দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে। সেই মুসলিম জাতি কীভাবে ছোটোখাটো স্বপ্ন দেখবে? তারা বড়ো কেন স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় না।
আল্লাহ পৃথিবীতে আমাদের প্রেরণ করেছেন নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। সারাজীবন কারও অনুসারী হয়ে থাকার জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রেরণ করেননি।
রাবিয়া ইবনে কাব আল আসলামি (রা.) নামের নবিজির একজন মুক্ত দাস ছিলেন। তাহাজ্জুদের সময় তিনি একবার নবিজিকে অজুর পানি এনে দেন। নবিজি তাঁকে বললেন, তুমি আমার কাছে কিছু চাও।
-রাবিয়া বললেন, জান্নাতে আপনার সাহচর্য চাই।
-নবিজি আবার জিজ্ঞেস করলেন, আর কিছু?
-তিনি জবাব দিলেন, আর কিছু না, কেবল এটাই চান।
দুনিয়াতে এত কিছু থাকা সত্ত্বেও রাবিয়া ইবনে কাব (রা.) নবিজির কাছে এই জিনিসটাই চান-রাসূলের সাথে জান্নাতে থাকা। এ থেকেই বোঝা যায় তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে, আর জীবনে কতটুকু তার প্রত্যাশা।
নবিজি সাহাবিদের নিয়ে এক মজলিসে বসা ছিলেন। এমন সময় তিনি বলেন, আমার উম্মতের মধ্য থেকে ৭০ হাজারের একটি দল বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাদিসটি শোনার সাথে সাথে উকাশা ইবনে মিহসান (রা.) বললেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্য দুআ করুন, আমাকে যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। নবিজি দুআ করলেন, হে আল্লাহ! তাঁকে তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করুন।
লক্ষ করুন, উকাশা (রা.) সামান্য সময়ও অপেক্ষা করেননি। নবিজির হাদিসটি শোনামাত্রই বলে উঠলেন তাঁর জন্য যেন দুআ করা হয়। এরপর আরেকজন সাহাবি বলেন তাঁর জন্যও একই দুআ করতে। কিন্তু নবিজি জানিয়ে দেন, উকাশা আগে চেয়ে তাঁকে পরাজিত করেছেন।
জান্নাতের মোট আটটি দরজা। একেক দরজা দিয়ে একেকজন আমলকারী প্রবেশ করবে। যে আল্লাহর পথে নিঃসংকোচে জোড়ায় জোড়ায় ব্যয় করবে, জান্নাতের দরজাসমূহ থেকে তাকে ডাকা হবে। যে বেশি বেশি সালাত আদায় করবে, তাঁকে সালাতের দরজা থেকে ডাকা হবে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণকারীকে ডাকা হবে জিহাদের দরজা থেকে। রোজাদার ব্যক্তিকে ডাকা হবে রাইয়্যান নামের দরজা থেকে। যে সাদাকা করেছে, তাঁকে সাদাকার দরজা থেকে ডাকা হবে।
নবিজি তাঁর সাহাবিদের এতটুকু বলার পর আবু বকর (রা.)-এর মনে একটা প্রশ্ন জাগল। তিনি জানতে চাইলেন-যে নামাজ পড়বে তাঁকে নামাজের দরজা থেকে ডাকা হবে, যে রোজা রাখবে তাঁকে রোজার দরজা থেকে ডাকা হবে, যে জিহাদ করবে, তাঁকে জিহাদের দরজা থেকে ডাকা হবে। তাহলে এমন যদি হয়, একজন ব্যক্তি সবগুলোই করে, তাহলে কি তাঁকে সবগুলো দরজা থেকে ডাকা হবে? আবু বকর (রা.)-এর প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ বলেন, হ্যাঁ। আর আমি আশা করি তুমিও তাঁদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে।
আবু বকর (রা.) জান্নাত পাওয়ার ব্যাপারে এতটাই আশাবাদী ছিলেন-তিনি কেবল জান্নাতের একটি দরজা দিয়ে প্রবেশের আমন্ত্রণ পাবেন, তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। জানতে চাইলেন, সবগুলো দরজা থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া সম্ভব কি না। আর নবিজি আবু বকর (রা.)-এর বেলায় আশাও প্রকাশ করেন।
এই হাদিসটি শোনার পর আমরা হয়তো বলতাম, আমাদের একটি দরজা থেকেই যেন ডাকা হয়। কিন্তু আবু বকর (রা.) চিন্তা করছেন, এমন কি হতে পারে, যাকে সবগুলো দরজা থেকে ডাকা হবে? একটু ভাবুন, জান্নাত লাভের জন্য তিনি কতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। পবিত্র কুরআনের সূরা ফুরকানে আল্লাহ তায়ালা আমাদের একটি দুআ শেখান। সেই দুআয় আমরা বলি- 'হে আমাদের রব !... আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানান।'
ভালো যা কিছুই আছে, তা অর্জনের জন্য আমরা আকাঙ্ক্ষা করব, চেষ্টা করব। প্রয়োজনে নিজেকে ওই জিনিসের প্রতি সমর্পণ করে দেবো। তবুও আমরা সেরাদের সেরা হতে চাই। অতি সাধারণভাবে কোনো রকম বেঁচে থাকতে চাই না। কেবল দুনিয়াবি ক্ষমতা নয়, আমল-আখলাক-চরিত্র সকল দিক থেকেই আমরা সমাজে প্রভাবশালী হতে চাই। নবিজি বলেন, তুমি তোমার জন্য উপকারী জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করো, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং কখনো অক্ষমতা প্রকাশ করো না।
অলসতা হলো মুনাফিকের লক্ষণ। প্রবল কর্মক্ষমতা হলো মুমিনের গুণ। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের নামাজ সম্পর্কে বলেন- 'তারা যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে লোকদেখানোর জন্য দাঁড়ায়। '
মুনাফিকরা নামাজে দাঁড়ানোর সময় আত্মমনোবল পায় না। সঞ্চারিত শক্তি কাজে দেয় নাভ অলস হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে নবিজি এইসব অলসতা, অক্ষমতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। তিনি দুআ করেন- 'হে আল্লাহ! আমি অক্ষমতা, ভীরুতা ও বার্ধক্য থেকে আপনার কাছে পানাহ চাই।'
নেতা ও কর্মীর মাঝে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। তার মধ্যে একটি হলো-নেতার কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষাই থাকে না, সেটা কীভাবে লাভ করতে হয় তিনি প্রচেষ্টা চালান এবং অন্যকেও তাতে উদ্বুদ্ধ করেন। একজন মুমিন যেমন পরিকল্পনা করে, তেমনই তা কাজে পরিণত এবং এর ফলাফল প্রত্যাশা করে। মুমিন শুধু এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া নিয়ে পরিকল্পনা করে না, সে আখিরাত নিয়েও পরিকল্পনা করে।
আপনি যখন কোনো কাজ করবেন, সেটা ভালোভাবে করবেন। আল্লাহ তাঁদেরই পছন্দ করেন, যারা কোনো কাজের ইচ্ছা পোষণ করলে তা যথাযথভাবে শেষ করে। পরীক্ষায় সি-গ্রেড পাওয়ার জন্য পরীক্ষা দেবেন না। পরীক্ষা দেবেন এ+ পাওয়ার জন্য। আপনি যে কাজ করবেন, সেটা নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে করবেন। নবিজি বলেন-আল্লাহ সেই কাজটি পছন্দ করেন, যা যথাযথভাবে করা হয়।
আপনি যখন যুদ্ধে যাবেন, তখন নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে যুদ্ধ করুন। যখন পশু জবাই করবেন, তখন সেটা ভালোভাবে জবাই করুন। জবাই করার পূর্বে অস্ত্র ভালোভাবে ধার করে নিন। মুরগি, ছাগল বা গরুটা যেন কম কষ্ট পায়, এই দিকগুলোও আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে। হ্যাঁ, এটাই ইসলামের বিধান।
চিন্তা করুন-একটি মুরগি জবাই করতেই যদি এর যথার্থতা ভালোভাবে আদায় করতে হয়, তাহলে আমরা যে চাকরি করি, ব্যাবসা করি, তা কীভাবে করা উচিত? কতটুকু আমানতদার হওয়া প্রয়োজন? মুমিনরা 'কোনো রকমে' কোনো কাজ করতে পারে না। মুমিন যে কাজটি করে কিংবা করার প্রয়াস চালায়, তা সবচেয়ে ভালোভাবে করে। নবিজি বলেন-যদি কিয়ামত সংঘটিত হয়, আর এটা অবশ্যম্ভাবী, তখন যদি হাতে একটি চারাগাছ থাকে, সেটাও রোপণ করো।
অর্থাৎ, আপনার হাতে একটি চারাগাছ, কিন্তু মনে হচ্ছে কিয়ামত সংঘটিত হবে। গাছটি রেখে কি আপনি দৌড়ে পালাবেন? না, কিয়ামত সংঘটিত হলে আপনি দৌড়-ঝাঁপ করে এদিক-সেদিক কোথাও পালাতে পারবেন না। যার দরুন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইসলাম আপনাকে আশা সঞ্চার করে কাজ চালিয়ে যেতে বলেছে। গাছ লাগানো, সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ইসলাম এতটা গুরুত্ব দিয়েছে যে, উদাহরণস্বরূপ বুঝিয়ে দিচ্ছে-কিয়ামতের মতো মহাবিপর্যয়ের মুহূর্তেও আপনি হাল ছাড়বেন না, মানুষের তরে কাজ করে যাবেন।

টিকাঃ
২০৪ সূরা আলে ইমরান: ১৩৩
২০৫ সূরা জারিয়াত: ৫০
২০৬ মুসনাদে আহমাদ: ২২২৩২
২০৭ সহিহ মুসলিম: ৯৮১
২০৮ সহিহ বুখারি: ৫৮১১
২০৯ সহিহ বুখারি: ১৮৯৭
২১০ সূরা ফুরকান: ৭৪
২১১ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৭৯
২১২ সূরা নিসা: ১৪২
২১৩ সহিহ বুখারি: ২৮২৩
২১৪ তাবরানি: ৯০১
২১৫ মুসনাদে আহমাদ : ১২৪৯১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00