📘 মুমিনের আখলাক > 📄 অন্যের সম্মান রক্ষা

📄 অন্যের সম্মান রক্ষা


একজন মুমিন যখন শুনতে পায়, তার আরেকজন ভাই অথবা বোনকে অপমান করা হচ্ছে, তাকে নিয়ে ঠাট্টা-উপহাস করা হচ্ছে, তখন সে বসে থাকতে পারে না। চুপ থেকে নিজেকে শান্ত রেখে ওই সব শুনে যেতে পারে না। সে প্রতিবাদ করে। তার ভাই অথবা বোনের সম্মান রক্ষার জন্য সে দাঁড়িয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের মান-সম্মানের ওপর আঘাত প্রতিরোধ করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার মুখমণ্ডল জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিরোধ করবেন।
আপনি বন্ধুদের মজলিসে বসে শুনতে পেলেন আপনার কয়েকজন বন্ধু আরেক অনুপস্থিত বন্ধুকে নিয়ে মজা করছে, ঠাট্টা করছে, তার সম্মানহানি করছে কিংবা ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে আরেকজনকে নিয়ে ঠাট্টা করছে। এখন আপনার দায়িত্ব, সেই জায়গায় ওই অনুপস্থিত ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করা। সবাই তাকে নিয়ে মজা করলেও আপনি সেখানে অংশগ্রহণ করতে পারেন না। আদর্শবান মুমিন হিসেবে আপনি এই কাজে বাধা দেবেন।
ওই মজলিস বা চ্যাট গ্রুপে যদি আপনি আরেকজনের সম্মান রক্ষা করেন, উপহাসকারীদের আলোচনা থামিয়ে দেন, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ আপনাকে জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিরোধ করবেন।
অন্যের অনুপস্থিতিতে যদি তার সম্মান রক্ষা করেন, দেখা যাবে আপনার অনুপস্থিতিতেও অন্য কেউ আপনার সম্মান রক্ষা করবে। আর যদি আপনি নিজেই সারাক্ষণ অন্যের সমালোচনা করতে থাকেন, অন্যকে নিয়ে গিবত-পরনিন্দায় মেতে থাকেন, তাহলে কীভাবে আশা করেন আপনার অনুপস্থিতিতে আরেকজন আপনার পক্ষে দাঁড়াবে? কীভাবে আপনার সম্মান রক্ষা করবে? এই প্রসঙ্গে ফিকহের কিতাবে কিছু মূলনীতি পাওয়া যায়। তন্মধ্যে দুটি হলো-
ক. আপনি যা করবেন, তা-ই পাবেন এবং
খ. পাপ-পুণ্য সে রকম হবে, আপনি যে রকম করবেন।
ইমাম বুখারি (রহ.) মোট ২২টি কিতাব লেখেন। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রসিদ্ধ হলো সহিহ বুখারি। এরপর দ্বিতীয় স্থানে আছে আল আদাবুল মুফরাদ। এই কিতাবের একটি অনুচ্ছেদ হলো, ভাইয়ের সম্মান রক্ষা। সেখানে তিনি একটি হাদিস উল্লেখ করেন। নবিজি বলেন, কারও উপস্থিতিতে কোনো মুমিন ব্যক্তির গিবত করা হলে এবং সে তার অনুপস্থিতিতে মুমিনের সাহায্য করলে আল্লাহ এর জন্য তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে পুরস্কৃত করবেন। (অন্যদিকে) কারও উপস্থিতিতে কোনো মুমিন ব্যক্তির গিবত করা হলো এবং সে তার সাহায্য না করলে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে এর মন্দ ফল ভোগ করাবেন।
একটি মজলিসে আপনি সবার সাথে বসে আছেন। লোকজন অন্যের গিবত করছে, আপনি তাতে অংশ নিচ্ছেন না। কেবল শুনছেন। একপর্যায়ে তাদের থামিয়ে দিয়ে যদি বলেন-'ভাই! এসব বাদ দিন, গিবত করে কী হবে? আমরা ভালো কথা বলি...' তাহলে আল্লাহ আপনাকে দুনিয়া ও আখিরাতে পুরস্কৃত করবেন। অন্যদিকে আপনি যদি সবার মতো কথাগুলো শুনে যান, প্রতিবাদ না করেন; দুনিয়া ও আখিরাতে এর মন্দ ফলাফল আপনাকে ভোগ করতে হবে।
নবিজি বিদায় হজের ভাষণে জীবনের সবচেয়ে বড়ো খুতবা দেন। সেই খুতবায় উপস্থিত ছিলেন লাখো সাহাবি। নবিজি সেই খুতবায় বলেন-তোমাদের রক্ত, সম্পদ, তোমাদের ইজ্জত-সম্মান তেমনই সম্মানিত; যেমন সম্মানিত তোমাদের এই দিনটি এবং তোমাদের এই শহর, এই মাস।
সেই ভাষণে নবিজি আরও জানিয়ে দেন-মুসলমানদের কাছে মুসলমানদের রক্ত, সম্পদ যেমন সম্মানিত; আবার চাইলেই কেউ একজন আরেকজনকে হত্যা করতে পারে না। সম্পদ ছিনিয়ে নিতে পারে না। একইভাবে সে আরেকজনের ইজ্জতের ওপর আঘাত করতে পারে না, সম্মানহানি করতে পারে না।
মুসলিম যখন দেখে তার অপর ভাইয়ের ইজ্জতহানি হচ্ছে, সে চুপ করে বসে থাকতে পারে না। কথা বলে, প্রতিবাদ করে। আয়িশা (রা.)-এর নামে যখন অপবাদ রটানো হয়, তখন নবিজি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে আয়িশা (রা.) ও সাফওয়ান (রা.)-এর (যার নামে অপবাদ দেওয়া হয়) অতীতের ভালো গুণের কথা উল্লেখ করেন।
আবদুল্লাহ (রা.) নামে নবিজির একজন মদ্যপায়ী সাহাবি ছিলেন। প্রায়শই মদ পানের অভিযোগে তাকে শাস্তি দেওয়া হতো। একবার তাকে শাস্তি দেওয়ার সময় আরেকজন সাহাবি বললেন, হে আল্লাহ! তার ওপর আপনার লানত বর্ষণ করুন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় যে তাকে কতবার আনা হলো! নবিজি সাহাবির এমন উক্তির প্রতিবাদ করে বললেন, তাকে লানত করো না। আল্লাহর কসম! আমি জানি, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে।
একজন মদ্যপায়ী সাহাবির ভালো গুণের প্রশংসা যেমন নবিজি করেন, তেমনই মদ পানের জন্য তাকে শাস্তিও দেন। অন্যরা তাকে অভিশাপ দিতে চাইলে তিনি সেই সাহাবির পক্ষে কথা বলেন, তাঁর সম্মান রক্ষা করেন।
আয়িশা (রা.)-এর ব্যাপারে যখন অপবাদ রটানো হয়। এই ঘটনা তিনি প্রথমে জানতেন না। অপবাদ রটনাকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন মিসতা (রা.)। তিনি আয়িশা (রা.)-এর দূরসম্পর্কের আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ব্যাপারে অপবাদ ছড়িয়ে দেন।
মিসতা (রা.)-এর মা একদিন আয়িশা (রা.)-কে বললেন, মিসতার জন্য দুর্ভোগ! তিনি বেশ অবাক হলেন। মা হয়ে উম্মে মিসতা তাঁর ছেলেকে বদদুআ করছেন! আয়িশা (রা.) মিসতা (রা.)-এর সম্মান রক্ষা করে বলেন, আপনি খুব খারাপ কথা বলছেন। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এমন এক ব্যক্তিকে আপনি অভিশাপ দিচ্ছেন!
পুরো ঘটনা জানার পূর্বে তিনি মিসতা (রা.)-এর সম্মান রক্ষা করেন। এটা ছিল তাঁর স্বভাবজাত প্রতিক্রিয়া। তিনি কখনোই একজন মুসলিমের সম্মানহানি হতে দিতেন না।
আয়িশা (রা.)-কে যারা অপবাদ দেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন হাসসান ইবনে সাবিত (রা.)। অপবাদ আরোপের প্রায় ২০ বছর পর একদিন হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) উম্মেল মুমিনিন আয়িশা (রা.)-এর ঘরে বেড়াতে যান। যিনি কিনা একসময় তাঁকে অপবাদ দিয়েছিলেন, এখন আয়িশা (রা.) তাঁর সাথে কেমন আচরণ করবেন? সেই দুর্বিষহ ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে অপমান করে ঘর থেকে বের করে দেবেন?
না, আয়িশা (রা.) এমন কিছুই করেননি; বরং মেহমানকে সম্মানের সাথে গদি বিছিয়ে বসতে দেন। প্রায় ২০ বছর আগে যে ব্যক্তি একজন পূত-পবিত্র নারীর চরিত্র নিয়ে অপবাদ দেন, সেই নারীই কিনা তা ভুলে গিয়ে তাকে বসার জন্য আসন পেতে দিচ্ছেন।
উম্মেল মুমিনিন আয়িশা (রা.)-এর ভাই ছিলেন আবদুর রহমান (রা.)। তিনি বোনের এমন সহনশীলতা আর উদারতা দেখে রাগ করলেন। বোনকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি তাঁকে গদির ওপর বসতে দিলেন? আপনি কি ভুলে গেলেন তিনি আপনার চরিত্র নিয়ে অপবাদ দিয়েছিলেন?
আপন ভাই মনে করিয়ে দিলেন। সে তো সত্য কথাই বলছে। আয়িশা (রা.) কি এবার আপন ভাইয়ের পক্ষালম্বন করে একজন মুসলিম ভাইকে তাঁর প্রায় ২০ বছর আগের কর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন? তিনি ভাইকে বললেন, হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) নবিজির পক্ষ থেকে কাফিরদের কবিতার জবাব দিতেন। এতে রাসূল অন্তরে শান্তি পেতেন। এখন তিনি অন্ধ হয়েছেন। আমি আশা করি, আল্লাহ তায়ালা আখিরাতে তাঁকে শান্তি দেবেন না।
আয়িশা (রা.) আপন ভাইয়ের বিপক্ষে গিয়ে আরেকজন মুসলিম ভাইয়ের ইজ্জত হেফাজত করেন, ইতিবাচক গুণের প্রশংসা করেন। যিনি কিনা একসময় তাঁর ইজ্জত নিয়ে অপবাদ দেন।
তাবুক যুদ্ধে নারী এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অক্ষম ব্যতীত সবার জন্য অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল। আজ প্রস্তুতি নেব, কাল প্রস্তুতি নেব বলে কাব ইবনে মালেক (রা.) সময়মতো প্রস্তুতি নিতে পারেননি। ফলে তিনি আর ওই যুদ্ধে অংশগ্রহণই করতে পারেননি।
যুদ্ধের ময়দানে নবিজি খোঁজ নিলেন, কে কে এসেছে আর কে কে অনুপস্থিত। একপর্যায়ে খোঁজ পড়ল কাব ইবনে মালেক (রা.)-এর। একজন বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাঁর ধনসম্পদ ও অহংকার তাঁকে যুদ্ধে আসতে দেয়নি।
কাব ইবনে মালেক (রা.)-এর অনুপস্থিতিতে তাঁর ব্যাপারে একজন সাহাবি নিন্দা করলেন। ঠিক সেই সময় তাঁর পক্ষে দাঁড়ালেন আরেকজন সাহাবি। তিনি হলেন মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)। তিনি বললেন—তুমি যা বললে, তা ঠিক নয়। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তাঁকে উত্তম ব্যক্তি হিসেবেই জানি।
দেখুন, একজন মুসলিম ভাইয়ের অগোচরে মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) সেই ভাইয়ের নিন্দা করতে দিচ্ছেন না। তাঁর ব্যাপারে সুধারণা রাখছেন। মুয়াজ ইবনে জাবাল অজুহাত খুঁজছেন, নিশ্চয়ই কাব ইবনে মালেক (রা.)-এর কিছু একটা হয়েছে যার ফলে তিনি আসতে পারেননি। তিনি তো ভালো মানুষ, আমলদার ব্যক্তি। অহংকার করে পেছনে থাকা তাঁর কাজ না!
উসমান ইবনে আফফান (রা.)-কে হত্যা করা হয়। যারা তাঁকে হত্যা করে, তাদের এক সমর্থক একবার হজ করতে মক্কায় আসে। সে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-কে উসমান (রা.)-এর ব্যাপারে কয়েকটি প্রশ্ন করল।
-বদর যুদ্ধে উসমান অনুপস্থিত থাকেন, সেটা কি আপনি জানেন?
-আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বললেন-হ্যাঁ, জানি।
-উহুদের দিন উসমান যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যান-এ কথা কি আপনি জানেন?
-আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বললেন-হ্যাঁ, জানি।
-বাইয়াতে রিদওয়ানে উসমান অনুপস্থিত ছিলেন, আপনি জানেন?
-আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) আবার বললেন-হ্যাঁ, জানি।
-লোকটি যা চেয়েছিল, তা পেয়ে গেল। সে উসমান (রা.)-এর ব্যাপারে যেমন ধারণা রাখে, এর সত্যতা পেল। আনন্দের আতিশয্যে বলল, আল্লাহু আকবার!
-এবার আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বললেন-এবার আসো, তোমাকে সেই কারণগুলো বলি।
প্রথমত, বদর যুদ্ধে উসমান (রা.)-এর অনুপস্থিতি থাকার কারণ এই-নবিজি তাঁকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন তাঁর স্ত্রী ও রাসূলের মেয়ে রুকাইয়া (রা.)-এর দেখাশোনা করেন। কারণ, তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করেও তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মতো সওয়াব পাবেন এবং গনিমত লাভ করেন।
দ্বিতীয়ত, উহুদের দিন তিনিসহ যারা যারা পালিয়ে যান, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা তাদের ক্ষমাপ্রাপ্তির ঘোষণা করেন।
তৃতীয়ত, বাইয়াতুর রিদওয়ানের কারণই তো ছিল উসমান (রা.)। তিনি মক্কায় গেলে গুজব রটানো হলো, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ফলে উসমান হত্যার বদলা নিতে সবাই বাইয়াত গ্রহণ করে। নবিজি তাঁর ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখে বললেন, এটাই উসমানের হাত। তিনি রূপকার্থে উসমান (রা.)-কেও সেই বাইয়াতে শরিক করেন।
লোকটি উসমান (রা.)-এর ব্যাপারে যেসব অভিযোগ নিয়ে এসেছিল, আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) সেইসব অভিযোগের জবাব দেন এবং উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর সম্মান রক্ষা করেন।
মানুষ সব সময় চায় বিতর্ক তৈরি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে। উসমান (রা.)-এর মতো বিশুদ্ধ ব্যক্তি, যাকে দেখে ফেরেশতারা পর্যন্ত লজ্জা পেত, তাঁর ব্যাপারে মানুষ এমন বিতর্ক উঠিয়ে সম্মানহানি করে। আপনার-আমার বিরুদ্ধে যখন কেউ কুৎসা রটাবে, আমরা কী করব! তাঁদের কথা ভাবা যায়? তারা আমাদের চেয়ে কত উত্তম ছিল; তবুও তাঁদের নিয়ে মানুষজন দুর্নাম রটায়, অপবাদ দেয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তারা ঠিকই স্বসম্মানে আছেন।
এখন প্রশ্ন হলো-আমরা অন্যের সম্মান রক্ষা করব, ঠিক আছে। পাশাপাশি আমরা কি নিজের সম্মান রক্ষা করব না? কেউ যদি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে, সমাজে রটিয়ে দেয় অপবাদ; আমরা কি তখন আত্মসম্মান রক্ষার জন্য কিছু করব না?
ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা থেকে আমরা এর উত্তর পাই। যখন তাঁর ব্যাপারে নারীরা অপবাদ রটিয়েছিল, তিনি আত্মরক্ষা তো করেনই। আবার নিজেকে নির্দোষও প্রমাণ করেন। অন্যদিকে আবার তাঁর আপন ভাইয়েরা চুরির অপবাদ দিলে তিনি এর জবাবে কিছুই বলেননি।
বোঝা গেল-আমাদের মানহানি হলে আমরা যেমন মান রক্ষার জন্য প্রতিবাদ জানাতে পারি, তেমনই কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেদিকে কর্ণপাত না করলেও হবে। তবে কোন ক্ষেত্রে কথা বলব আর কোন ক্ষেত্রে বলব না, এই ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। সারাক্ষণ যদি নিজেকে আত্মরক্ষা করতেই সময় ব্যয় করি, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতেই ব্যস্ত থাকি, তাহলে কোনো কাজে ঠিকভাবে মনোযোগ দিতে পারব না এবং কোনো একটা কাজ পুরোপুরি শেষ করতে পারব না।
একবার নবিজির উপস্থিতিতে এক লোক আবু বকর (রা.)-কে গালি দিলো। নবিজির আশপাশে তখন অন্য সাহাবিরাও ছিলেন। লোকটি একবার গালি দিলো, আবু বকর (রা.) কিছু বললেন না। দ্বিতীয়বার গালি দিলো, তখনও তিনি কিছু বললেন না। তৃতীয়বার গালি দিলে আবু বকর (রা.) প্রতিশোধ নিলেন; অর্থাৎ তিনিও গালি দিলেন।
তখন নবিজি বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং খুব রাগ করলেন। মজলিস থেকে চলে যেতে উদ্যত হলেন। আবু বকর (রা.) তখন জিজ্ঞেস করলেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! লোকটি আমাকে গালি দিলো, আপনি বসা ছিলেন, কিছু বললেন না। কিন্তু আমি যখন তার জবাব দিলাম, আপনি রাগ করে চলে যাচ্ছেন!
আবু বকর (রা.) ব্যাপারটি বুঝলেন না। নবিজি কেন এমন কাজ করলেন। তিনি জবাব দিলেন, (তোমাকে যখন গালি দেওয়া হচ্ছিল) আসমান হতে একজন ফেরেশতা নেমে এসেছিলেন এবং তোমার পক্ষ থেকে জবাব দিচ্ছিলেন। কিন্তু যখনই তুমি তার প্রতিশোধ নিলে, এখানে শয়তান উপস্থিত হয়েছে। শয়তান উপস্থিত হওয়ায় আমি আর বসতে পারছি না।
আমরা যদি দেখি কারও ব্যাপারে নিন্দা করা হচ্ছে, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হচ্ছে, গিবত করা হচ্ছে, তখন আমরা তার পক্ষে কথা বলব। এটা মুমিন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। প্রকৃত মুমিন কখনো পাপ কাজ দেখে বসে থাকতে পারে না। পাপের কথা শুনতে পারে না। আপনি যদি গান শোনা হারাম বুঝতে পারেন, তাহলে গানের আসরে বসেন না; তেমনই গিবতকে হারাম বুঝলে সেই আসরেও বসবেন না। আর যদি কোনো কারণে বসেও থাকেন সেখানকার আলোচকদের গিবত বন্ধের চেষ্টা করবেন।

টিকাঃ
১৯৫ জামে আত-তিরমিজি: ১৯৩১
১৯৬ আল আদাবুল মুফরাদ: ৭৩৯
১৯৭ সহিহ বুখারি: ১৭৩৯
১৯৮ সহিহ বুখারি: ৬৭৮০
১৯৯ সহিহ বুখারি: ২৬৬১
২০০ তাহজিবু ইবনুল আসাকির: ৪/১২৯
২০১ সহিহ বুখারি: ৪৪১৮
২০২ সহিহ বুখারি: ৪০৬৬
২০৩ সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৯৬; মুসনাদে আহমাদ: ৯৪১১

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 উচ্চারণভঙ্গী

📄 উচ্চারণভঙ্গী


মুমিন গড়পড়তা কিছু পছন্দ করতে পারে না। তার আকাঙ্ক্ষা থাকতে হয় উঁচু। নিতান্তই সাধারণ মানুষ হিসেবে সে জীবন কাটাতে চায় না। সে চায় শ্রেষ্ঠ হতে। দুনিয়াতেও শ্রেষ্ঠ, আখিরাতেও শ্রেষ্ঠ। একজন মুমিনের ভিশন বহুদূর। সমাজ পরিবর্তনে সে মুখ্য ভূমিকা রাখে। নেতৃত্ব কামনা করে না, কিন্তু নেতার মতো জীবনযাপন করে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিদের জীবনী পড়লে আমরা দেখতে পাই-তারা ছিলেন দুনিয়াতেও সফল, আখিরাতেও সফল। একই সাথে দুনিয়ার মানুষদের নেতা, আখিরাতের মানুষদেরও নেতা।
কোনো কোনো সাহাবি ছিলেন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, কেউ ছিলেন শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, কোনো সাহাবি ছিলেন শ্রেষ্ঠ কবি, কেউ কেউ ছিলেন শ্রেষ্ঠ ফকিহ। তাদের মধ্যে আবার অনেকেই ছিলেন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। কোনো সাহাবি ছিলেন সেরা ব্যবসায়ী। এমন বৈচিত্র্যময় চারিত্রিক গুণ দেখেই আমরা বুঝতে পারি, তারা একেকজন একেক দিক থেকে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন- 'তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে।'
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- 'তোমরা আল্লাহর দিকে ছুটে চলো।'
অলস হয়ে বসে থাকার জন্য আমরা পৃথিবীতে আসিনি। কোনো কিছু চাইতে যদি হয়ই, তাহলে ছোটো কিছু চাইব কেন? চাইলে সব সময় বড়ো কিছুই চাইব; এমনকি জান্নাতের বেলায়ও। নবিজি বলেন, আল ফিরদাউস হলো জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর। তোমরা যখন জান্নাতপ্রাপ্তির দুআ করবে, তখন আল ফিরদাউসের জন্য দুআ করবে।
নবিজি আমাদের শেখাচ্ছেন, আমরা যেন সর্বোচ্চটা অর্জনের চেষ্টা এবং এর জন্য দুআ করি। মুসলমানরা হলো ভিশনওয়ালা জাতি। তারা কখনো ছোটোখাটো স্বপ্ন দেখে না। সাহাবিরাও দেখেননি। তারা দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে ছুটে চলেন দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে। সেই মুসলিম জাতি কীভাবে ছোটোখাটো স্বপ্ন দেখবে? তারা বড়ো কেন স্বপ্ন দেখতে ভয় পায় না।
আল্লাহ পৃথিবীতে আমাদের প্রেরণ করেছেন নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। সারাজীবন কারও অনুসারী হয়ে থাকার জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রেরণ করেননি।
রাবিয়া ইবনে কাব আল আসলামি (রা.) নামের নবিজির একজন মুক্ত দাস ছিলেন। তাহাজ্জুদের সময় তিনি একবার নবিজিকে অজুর পানি এনে দেন। নবিজি তাঁকে বললেন, তুমি আমার কাছে কিছু চাও।
-রাবিয়া বললেন, জান্নাতে আপনার সাহচর্য চাই।
-নবিজি আবার জিজ্ঞেস করলেন, আর কিছু?
-তিনি জবাব দিলেন, আর কিছু না, কেবল এটাই চান।
দুনিয়াতে এত কিছু থাকা সত্ত্বেও রাবিয়া ইবনে কাব (রা.) নবিজির কাছে এই জিনিসটাই চান-রাসূলের সাথে জান্নাতে থাকা। এ থেকেই বোঝা যায় তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে, আর জীবনে কতটুকু তার প্রত্যাশা।
নবিজি সাহাবিদের নিয়ে এক মজলিসে বসা ছিলেন। এমন সময় তিনি বলেন, আমার উম্মতের মধ্য থেকে ৭০ হাজারের একটি দল বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। হাদিসটি শোনার সাথে সাথে উকাশা ইবনে মিহসান (রা.) বললেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্য দুআ করুন, আমাকে যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। নবিজি দুআ করলেন, হে আল্লাহ! তাঁকে তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করুন।
লক্ষ করুন, উকাশা (রা.) সামান্য সময়ও অপেক্ষা করেননি। নবিজির হাদিসটি শোনামাত্রই বলে উঠলেন তাঁর জন্য যেন দুআ করা হয়। এরপর আরেকজন সাহাবি বলেন তাঁর জন্যও একই দুআ করতে। কিন্তু নবিজি জানিয়ে দেন, উকাশা আগে চেয়ে তাঁকে পরাজিত করেছেন।
জান্নাতের মোট আটটি দরজা। একেক দরজা দিয়ে একেকজন আমলকারী প্রবেশ করবে। যে আল্লাহর পথে নিঃসংকোচে জোড়ায় জোড়ায় ব্যয় করবে, জান্নাতের দরজাসমূহ থেকে তাকে ডাকা হবে। যে বেশি বেশি সালাত আদায় করবে, তাঁকে সালাতের দরজা থেকে ডাকা হবে। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণকারীকে ডাকা হবে জিহাদের দরজা থেকে। রোজাদার ব্যক্তিকে ডাকা হবে রাইয়্যান নামের দরজা থেকে। যে সাদাকা করেছে, তাঁকে সাদাকার দরজা থেকে ডাকা হবে।
নবিজি তাঁর সাহাবিদের এতটুকু বলার পর আবু বকর (রা.)-এর মনে একটা প্রশ্ন জাগল। তিনি জানতে চাইলেন-যে নামাজ পড়বে তাঁকে নামাজের দরজা থেকে ডাকা হবে, যে রোজা রাখবে তাঁকে রোজার দরজা থেকে ডাকা হবে, যে জিহাদ করবে, তাঁকে জিহাদের দরজা থেকে ডাকা হবে। তাহলে এমন যদি হয়, একজন ব্যক্তি সবগুলোই করে, তাহলে কি তাঁকে সবগুলো দরজা থেকে ডাকা হবে? আবু বকর (রা.)-এর প্রশ্নের জবাবে রাসূলুল্লাহ বলেন, হ্যাঁ। আর আমি আশা করি তুমিও তাঁদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে।
আবু বকর (রা.) জান্নাত পাওয়ার ব্যাপারে এতটাই আশাবাদী ছিলেন-তিনি কেবল জান্নাতের একটি দরজা দিয়ে প্রবেশের আমন্ত্রণ পাবেন, তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। জানতে চাইলেন, সবগুলো দরজা থেকে আমন্ত্রণ পাওয়া সম্ভব কি না। আর নবিজি আবু বকর (রা.)-এর বেলায় আশাও প্রকাশ করেন।
এই হাদিসটি শোনার পর আমরা হয়তো বলতাম, আমাদের একটি দরজা থেকেই যেন ডাকা হয়। কিন্তু আবু বকর (রা.) চিন্তা করছেন, এমন কি হতে পারে, যাকে সবগুলো দরজা থেকে ডাকা হবে? একটু ভাবুন, জান্নাত লাভের জন্য তিনি কতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। পবিত্র কুরআনের সূরা ফুরকানে আল্লাহ তায়ালা আমাদের একটি দুআ শেখান। সেই দুআয় আমরা বলি- 'হে আমাদের রব !... আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানান।'
ভালো যা কিছুই আছে, তা অর্জনের জন্য আমরা আকাঙ্ক্ষা করব, চেষ্টা করব। প্রয়োজনে নিজেকে ওই জিনিসের প্রতি সমর্পণ করে দেবো। তবুও আমরা সেরাদের সেরা হতে চাই। অতি সাধারণভাবে কোনো রকম বেঁচে থাকতে চাই না। কেবল দুনিয়াবি ক্ষমতা নয়, আমল-আখলাক-চরিত্র সকল দিক থেকেই আমরা সমাজে প্রভাবশালী হতে চাই। নবিজি বলেন, তুমি তোমার জন্য উপকারী জিনিসের আকাঙ্ক্ষা করো, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং কখনো অক্ষমতা প্রকাশ করো না।
অলসতা হলো মুনাফিকের লক্ষণ। প্রবল কর্মক্ষমতা হলো মুমিনের গুণ। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের নামাজ সম্পর্কে বলেন- 'তারা যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে লোকদেখানোর জন্য দাঁড়ায়। '
মুনাফিকরা নামাজে দাঁড়ানোর সময় আত্মমনোবল পায় না। সঞ্চারিত শক্তি কাজে দেয় নাভ অলস হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে নবিজি এইসব অলসতা, অক্ষমতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান। তিনি দুআ করেন- 'হে আল্লাহ! আমি অক্ষমতা, ভীরুতা ও বার্ধক্য থেকে আপনার কাছে পানাহ চাই।'
নেতা ও কর্মীর মাঝে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। তার মধ্যে একটি হলো-নেতার কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষাই থাকে না, সেটা কীভাবে লাভ করতে হয় তিনি প্রচেষ্টা চালান এবং অন্যকেও তাতে উদ্বুদ্ধ করেন। একজন মুমিন যেমন পরিকল্পনা করে, তেমনই তা কাজে পরিণত এবং এর ফলাফল প্রত্যাশা করে। মুমিন শুধু এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া নিয়ে পরিকল্পনা করে না, সে আখিরাত নিয়েও পরিকল্পনা করে।
আপনি যখন কোনো কাজ করবেন, সেটা ভালোভাবে করবেন। আল্লাহ তাঁদেরই পছন্দ করেন, যারা কোনো কাজের ইচ্ছা পোষণ করলে তা যথাযথভাবে শেষ করে। পরীক্ষায় সি-গ্রেড পাওয়ার জন্য পরীক্ষা দেবেন না। পরীক্ষা দেবেন এ+ পাওয়ার জন্য। আপনি যে কাজ করবেন, সেটা নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে করবেন। নবিজি বলেন-আল্লাহ সেই কাজটি পছন্দ করেন, যা যথাযথভাবে করা হয়।
আপনি যখন যুদ্ধে যাবেন, তখন নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে যুদ্ধ করুন। যখন পশু জবাই করবেন, তখন সেটা ভালোভাবে জবাই করুন। জবাই করার পূর্বে অস্ত্র ভালোভাবে ধার করে নিন। মুরগি, ছাগল বা গরুটা যেন কম কষ্ট পায়, এই দিকগুলোও আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে। হ্যাঁ, এটাই ইসলামের বিধান।
চিন্তা করুন-একটি মুরগি জবাই করতেই যদি এর যথার্থতা ভালোভাবে আদায় করতে হয়, তাহলে আমরা যে চাকরি করি, ব্যাবসা করি, তা কীভাবে করা উচিত? কতটুকু আমানতদার হওয়া প্রয়োজন? মুমিনরা 'কোনো রকমে' কোনো কাজ করতে পারে না। মুমিন যে কাজটি করে কিংবা করার প্রয়াস চালায়, তা সবচেয়ে ভালোভাবে করে। নবিজি বলেন-যদি কিয়ামত সংঘটিত হয়, আর এটা অবশ্যম্ভাবী, তখন যদি হাতে একটি চারাগাছ থাকে, সেটাও রোপণ করো।
অর্থাৎ, আপনার হাতে একটি চারাগাছ, কিন্তু মনে হচ্ছে কিয়ামত সংঘটিত হবে। গাছটি রেখে কি আপনি দৌড়ে পালাবেন? না, কিয়ামত সংঘটিত হলে আপনি দৌড়-ঝাঁপ করে এদিক-সেদিক কোথাও পালাতে পারবেন না। যার দরুন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইসলাম আপনাকে আশা সঞ্চার করে কাজ চালিয়ে যেতে বলেছে। গাছ লাগানো, সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ইসলাম এতটা গুরুত্ব দিয়েছে যে, উদাহরণস্বরূপ বুঝিয়ে দিচ্ছে-কিয়ামতের মতো মহাবিপর্যয়ের মুহূর্তেও আপনি হাল ছাড়বেন না, মানুষের তরে কাজ করে যাবেন।

টিকাঃ
২০৪ সূরা আলে ইমরান: ১৩৩
২০৫ সূরা জারিয়াত: ৫০
২০৬ মুসনাদে আহমাদ: ২২২৩২
২০৭ সহিহ মুসলিম: ৯৮১
২০৮ সহিহ বুখারি: ৫৮১১
২০৯ সহিহ বুখারি: ১৮৯৭
২১০ সূরা ফুরকান: ৭৪
২১১ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৭৯
২১২ সূরা নিসা: ১৪২
২১৩ সহিহ বুখারি: ২৮২৩
২১৪ তাবরানি: ৯০১
২১৫ মুসনাদে আহমাদ : ১২৪৯১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00