📘 মুমিনের আখলাক > 📄 জবানের কৃতজ্ঞতা

📄 জবানের কৃতজ্ঞতা


আপনি যদি অনুভব করেন-কেউ আপনার উপকার করেছে, তাকে কৃতজ্ঞতা জানান। তার নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। আল্লাহ আপনাকে অনেক কিছু দান করেছেন, নিয়মিত আলহামদুলিল্লাহ বলুন।
অনেকেই আছেন, যারা নিয়মিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করলেও মানুষের ব্যাপারে অতটা সচেতন না। তারা মনে করেন-আমার বন্ধু, ভাই বা আব্বা-আম্মাকে ধন্যবাদ, জাজাকাল্লাহ বলে কী হবে? তারা তো আমারই আপনজন। আপনজনের সাথে আবার ফর্মালিটি কীসের?
এটা ভুল ধারণা। মানুষ স্বভাবতই নিজের পক্ষে প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে, সে চায় তার প্রতি কেউ কৃতজ্ঞতা আদায় করুক-এটা তার ভালো লাগে। রিকশা থেকে নেমে একদিন রিকশাওয়ালাকে বলে দেখুন, শুকরিয়া/ধন্যবাদ মামা কিংবা জাজাকাল্লাহু খাইরান মামা। দেখবেন, সেই রিকশাওয়ালা আপনাকে সুন্দর একটি হাসি উপহার দেবেন। কারণ, এভাবে তাকে কেউই কখনো বলে না। এই ধরনের কথা শুনে তিনি অভ্যস্ত নন। যখন আপনার মুখ থেকে শুনবেন, আপনাকে পছন্দ করবেন; মনে মনে হয়তো আপনার জন্য তিনি দুআও করতে পারেন।

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 আমলের কৃতজ্ঞতা

📄 আমলের কৃতজ্ঞতা


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-'হে দাউদ পরিবার! তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমল করে যাও।'
দাউদ (আ.) এত লম্বা নামাজ পড়তেন, নবিজি তাঁর নামাজের প্রশংসা করেন। দাউদ (আ.) এত বেশি রোজা রাখতেন, রাসূলুল্লাহ তাঁর রোজা রাখার প্রশংসা করেন।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে দাউদ (আ.) ও তাঁর পরিবারকে জানিয়ে দেন, তারা যেন কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমল করেন। অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁকে যে নিয়ামত দান করেন, সেগুলোর তিনি সদ্ব্যবহার করবেন। আর আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করবেন। নবিজি বলেন, কাউকে অনুগ্রহ করা হলে সে যদি অনুগ্রহকারীকে বলে-জাজাকাল্লাহু খাইরান অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন, তবে সে উপযুক্ত ও পরিপূর্ণ কৃতজ্ঞতা আদায় করল।
কেউ আমাদের কোনো উপকার করল, আর ওই উপকারের প্রতিদান দিতে কোনোভাবেই দিতে পারছি না, তাহলে আমরা যেন কথার মাধ্যমে অন্তত তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। এ প্রসঙ্গে নবিজি বলেন, কাউকে কিছু দান করা হলে, যদি তার সক্ষমতা থাকে সে যেন তার প্রতিদান দেয়। সক্ষমতা না থাকলে, সে যেন প্রশংসা করে। কেননা, যে লোক প্রশংসা করল, সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। আর যে তা গোপন রাখল, সে অকৃতজ্ঞ হলো।
দুঃখজনক যে, আমাদের পরিবারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি না। কাছের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি না। পরিবারের গৃহিণী যখন ভালো রান্না করে, মুখ ফুটে বলি না-রান্নাটা খুব ভালো হয়েছে, আল্লাহ তোমার/আপনার হাতে বরকত দান করুন। লজ্জা পাই কিংবা মনে করি, বলে কী হবে?
আমরা কাজের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব। শুধু কাজের মাধ্যমেই প্রকাশ করতে হবে, এমন না। কথার মাধ্যমেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়। আপনার ছোট্ট একটি প্রশংসা অনেকের সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে দিতে পারে। নবিজি তাঁর পরিবার থেকে শুরু করে সাহাবিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন। এ ব্যাপারে তিনি কখনোই কার্পণ্য করতেন না; আমরাও যেন কার্পণ্য না করি।
অনেকেই দেখবেন রমজানের শেষে ঈদের রাতে ঈদ মোবারক ম্যাসেজ দেয়। কেউ কেউ সেটা হোয়াটসঅ্যাপে সবাইকে জানিয়ে দেয়, কেউ আবার কপি করে সবাইকে একই ম্যাসেজ পাঠায়। মনে করুন, কেউ আপনাকে কপি-পেস্ট ম্যাসেজ পাঠাল। আরেকজন আপনাকে ফোন করে বলল, ঈদ মোবারক। কোনটা আপনার কাছে বেশি ভালো লাগবে? অবশ্যই, যে আপনাকে ফোন করে বলেছে! কারণ, আপনি তার মধ্যে আন্তরিকতা দেখতে পেয়েছেন।
কৃতজ্ঞতা আদায় হতে পারে সামান্য কিংবা বড়ো জিনিসের জন্য। যে আপনাকে এক লক্ষ টাকা দিলো, তাকে আপনি 'জাজাকাল্লাহু খাইরান' বললেন। অথচ যে আপনাকে ১০ টাকা দিলো, তাকে জাজাকাল্লাহু খাইরান বললেন না; এমনটা হতে পারে না। নবিজি বলেন, যে ছোটো কিছুর জন্য কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে বড়ো কিছুর জন্যও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।
আপনি যদি ছোটো বিপর্যয়ে ধৈর্যধারণ করতে না পারেন, তাহলে বড়ো বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলে ভেঙে পড়বেন। কৃতজ্ঞতা আদায়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এটা অভ্যাসের ব্যাপার, চর্চার ব্যাপার। হুট করেই আপনি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারবেন না। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হওয়ার জন্য শিখতে হবে, অধিক চর্চা করতে হবে।
কেউ যদি আপনাকে হাজার টাকার কোনো উপহার দেয়, আপনি তাকে শ টাকার উপহার দিন। কেউ যদি আপনাকে দুটি বই উপহার দেয়, আপনি তাকে অন্তত একটি বই উপহার দিন। সব সময় অন্যে দেবে, আপনি তার আশায় বসে থাকবেন, এমনটা যেন না হয়।
সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও আপনি অন্যের কৃতজ্ঞতা আদায় করুন। কেউ যদি ১০ বছর পূর্বে আপনার কোনো উপকার করে থাকে, ১০ বছর পরও তার সেই উপকারের কথা স্মরণ করুন। এমনটা ভাববেন না-তখন তো আমি কৃতজ্ঞতা আদায় করেছিই, এখন আর আদায় কী হবে?
নবিজি নিজে পর্যন্ত সাহাবিদের উপকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করতেন। আপনি-আমি কেন করব না? অথচ সাহাবিরা তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এসব করতেন। তারপরও নবিজি তাঁদের অবদান স্মরণ করতেন। নবিজি আবু বকর (রা.) সম্পর্কে বলেন, নিজের সম্পদ এবং সাহচর্য দিয়ে যিনি আমার সবচেয়ে বেশি উপকারে এসেছেন, তিনি হলেন-আবু বকর।
নবিজি ইন্তেকালের কয়েক দিন পূর্বে বলেন, আমি কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করলে অবশ্যই আবু বকরকে গ্রহণ করতাম। আবু বকরের দরজা ব্যতীত এই মসজিদের ছোটো দরজাগুলো সব বন্ধ করে দাও।
কয়েক যুগ পর যখন শায়মা (রা.)-এর সাথে নবিজির দেখা হয়, তিনি তখন তাঁর দুধবোনের প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করেন। ছোটোবেলায় রাসূলুল্লাহকে লালনপালন করেন উম্মে আইমান (রা.)। নবিজি সারাজীবন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকেন। তিনি তাঁকে ডাকতেন 'মায়ের পর মা' বলে।
নবিজির জীবনের সবচেয়ে দুঃসময়ে তাঁর পাশে থাকেন খাদিজা (রা.)। জীবদ্দশায় নবিজি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করেন। ইন্তেকালের পরও তিনি তাঁর কথা প্রবলভাবে স্মরণ করতেন, প্রশংসা করতেন, কৃতজ্ঞ হতেন। কখনো ছাগল জবাই করলে রাসূলুল্লাহ খুঁজে খুঁজে খাদিজা (রা.)-এর বান্ধবীদের কাছে গোশত পাঠাতেন। খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পরও তাঁর প্রতি নবিজির ভালোবাসা অটুট থাকে।
নবিজি যেমন তাঁর স্ত্রী ও সাহাবিদের উপকারের কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন, তেমনই অমুসলিমদের কৃতজ্ঞতার কথাও স্মরণ করতেন। তেমনই একজন অমুসলিম ছিলেন মুতইম ইবনে আদি। নবিজি তায়েফ থেকে ফেরার পর মুতইম ইবনে আদি নবিজিকে আশ্রয় দেন। তিনি নিজে ইসলাম গ্রহণ না করলেও বিভিন্ন সময় মুসলিমদের পাশে দাঁড়াতেন মানবিক কারণে। তাঁর কারণে নানান সময় মুসলিমরা উপকৃত হতো।
দুঃসময়ে উপকার করা মুতইম ইবনে আদির প্রশংসা নবিজি সাহাবিদের সামনে করেন। নবিজি বলেন, মুতইম যদি তখন বেঁচে থাকতেন আর তাঁকে এ ব্যাপারে সুপারিশ করতেন। ইসলামের সুদিনে 'উপকারী বন্ধু'র প্রতিদানস্বরূপ বদর যুদ্ধের বন্দিদের তিনি মুক্ত করে দিতেন বিনা মুক্তিপণে। নবিজি আরও বলেন, যদি মুতইম ইবনে আদি জীবিত থাকতেন আর আমার নিকট এ সকল নোংরা লোকের জন্য সুপারিশ করতেন, তবে আমি তার সম্মানার্থে এদের মুক্ত করে দিতাম।
আমরা যেন সেই অল্পসংখ্যাকদের দলভুক্ত হতে পারি, যে অল্পসংখ্যক লোক আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করে। সুলাইমান (আ.)-এর মতো আমরা আল্লাহর কাছে দুআ করি-
'হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি ও আমার মা-বাবার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, তার জন্য আপনার শুকরিয়া আদায় করার তাওফিক আমাকে দান করুন।'

টিকাঃ
১৭০ সূরা সাবা: ১৩
১৭১ জামে আত-তিরমিজি: ২০৩৫
১৭২ জামে আত-তিরমিজি: ২০৩৪
১৭৩ আল ফিরদাউদ লিল-দায়লামি: ৫৯৬২
১৭৪ সহিহ বুখারি: ৪৬৬
১৭৫ সহিহ বুখারি: ৪৬৭
১৭৬ সহিহ বুখারি: ৬০০৪
১৭৭ সহিহ বুখারি: ৩১৩৯; মুসনাদে আহমাদ: ২৭৫০৬
১৭৮ সূরা নামল: ১৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00