📘 মুমিনের আখলাক > 📄 কৃতজ্ঞতাবোধ

📄 কৃতজ্ঞতাবোধ


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ।
এই গুণটি মুমিনের অন্যতম একটি গুণ। একজন মুমিন স্বভাবতই সব সময় কৃতজ্ঞ থাকে। সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ, যারা তার সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ায় তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ। কিন্তু পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাঁর খুব কমসংখ্যক বান্দাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। যে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, হাত-পা-চোখ দান করেছেন, রিজিক দেন, সেই আল্লাহর প্রতি মানুষ কীভাবে অকৃতজ্ঞ হতে পারে?
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন- 'অবশ্যই আমি তাকে পথপ্রদর্শন করেছি। হয় সে কৃতজ্ঞ, না হয় অকৃতজ্ঞ। '
কৃতজ্ঞতার আরবি হলো 'শুকুর' বিপরীত দিকে অকৃতজ্ঞতার আরবি হলো 'কুফর'। আল্লাহকে অবিশ্বাস করা, অস্বীকার করা যেমন কুফর; তেমনই আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা বোঝাতেও কুফর শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
আমাদের সামনে উন্মুক্ত পথ। হয় আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হব, নতুবা তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ থাকব।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার শুনলেন, এক লোক দুআ করছে, হে আল্লাহ! আমাকে অল্পসংখ্যকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন! উমর (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, অল্পসংখ্যক মানে কী? কারা অল্পসংখ্যক? তখন লোকটি খলিফাকে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান- 'আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। '
লোকটির বুদ্ধিমত্তা দেখে খলিফা বললেন, সবাই আমার চেয়ে কত বেশি জানে! কৃতজ্ঞতাবোধের গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা যে শুধু আল্লাহর প্রতিই কৃতজ্ঞতা আদায় করব, এমন না। মানুষের প্রতিও আমাদের এ বোধ থাকবে। যদি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতার হক আদায় করতে পারি, তাহলে আল্লাহর প্রতিও আমরা আদায় করতে পারব। যে পারে, সে দুটিই পারে। যে পারে না, সে একটিও পারে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
একই হাদিসে নবিজি আরও বলেন-যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়। আপনি যদি আল্লাহর ইবাদত একাগ্রতার সহিতও করেন, কিন্তু বান্দার হক পরিপূর্ণভাবে আদায় না করতে পারেন, মানুষকে কষ্ট দেন; তাহলে এর জন্য পরকালে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। রাসূলুল্লাহর আরেকটি হাদিস থেকে এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়।
জনৈক সাহাবি একবার নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এক নারী অত্যধিক নামাজ-রোজা ও দানের জন্য সুপরিচিত। কিন্তু সে কথার মাধ্যমে তার প্রতিবেশীকে আঘাত করে, কষ্ট দেয়। তার ব্যাপারে আপনি কী বলেন? রাসূলুল্লাহ বললেন, সে জাহান্নামি।
সাহাবি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আরেকজন নারী কম রোজা রাখে, দানও কম করে এবং নামাজও কম পড়ার ব্যাপারে লোকসমাজে সে প্রসিদ্ধ। বলতে গেলে এক টুকরো পনিরই দান করে। কিন্তু প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না, তার ব্যাপারে আপনি কী বলেন? নবিজি বললেন, সে জান্নাতি।
একজন মানুষ কীভাবে নিজেকে আল্লাহর ওলি দাবি করতে পারে? যে কিনা নিয়মিত নামাজ পড়ে, অথচ মানুষের সাথে প্রতারণা করে, কষ্ট দেয়-এমন একজন মানুষ কি ওলি হতে পারে? আল্লাহর প্রিয়ভাজন হওয়ার জন্য তো অবশ্যই ‘অলরাউন্ডার’ হতে হবে। ইবাদত যেমন করতে হবে, পাশাপাশি মানুষের হকও আদায় করতে হবে, যা আদায় করা সম্ভব কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মাধ্যমে। কৃতজ্ঞতা মূলত তিন প্রকার। সেগুলো হলো-
ক. অন্তর। খ. জবান ও গ. আমলের কৃতজ্ঞতা।

টিকাঃ
১৬৩ সূরা সাবা: ১৩
১৬৪ সূরা দাহর: ৩
১৬৫ সূরা সাবা: ১৩
১৬৬ মুসান্নাফে আবি শায়বা: ২৯৫১৪
১৬৭ সুনানে আবু দাউদ: ৪৮১১
১৬৮ সুনানে আবু দাউদ: ৪৮১১
১৬৯ মুসনাদে আহমাদ: ৯২৯৮

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 জবানের হেফাজত

📄 জবানের হেফাজত


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-'অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়াবনত আর যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে বিমুখ। '
একজন মুমিন অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হয় না। কোথাও অনর্থক কথা হচ্ছে শুনলে সে সেখান থেকে উঠে চলে যায়। বসে বসে কান পেতে এসব শোনে না। সূরা ফুরকানে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তারা বলে-সালাম।
আল্লাহ জানিয়ে দেন-যারা মুমিন, তারা মূর্খের কথায় কান দেয় না। তারা তাকে উত্তেজিত করতে চাইলেও সে তাদের সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হয় না। সূরা ফুরকানেই কয়েক আয়াত পর আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যখন তারা অনর্থক কথাকর্মের পাশ দিয়ে চলে, তখন তা পরিহার করে চলে। '
মুমিন যখন দেখতে পায় রাস্তার পাশে মানুষজন অন্যের গিবত করছে, হোটেলে বসে আরেক বাড়ির দোষত্রুটি তুলে ধরছে, তখন ওই মজলিসে সে আর বসে না; বরং সেখান থেকে উঠে যায়।
মুমিন কী শুনবে, কী দেখবে এ ব্যাপারে যেমন সচেতন থাকে, তেমনই কোথায় কী বলবে, এ ব্যাপারেও সে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে। কেননা, তার প্রতিটি কথা প্রতি মুহূর্তে ফেরেশতাগণ লিপিবদ্ধ করছেন। আল্লাহ বলেন- 'সম্মানিত লেখকবৃন্দ! তারা জানে, তোমরা যা করো。
কথা বলার সময় আমরা কী বলছি সেই ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। এর জন্য আমরা নাজাত লাভ করতে পারি আবার আমাদের পাকড়াও করা হতে পারে। একবার নবিজিকে উকবা ইবনে আমর (রা.) জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুক্তির উপায় কী? নবিজি তিনটি মুক্তির উপায় বলেন। সেগুলো হলো-
ক. তুমি তোমার জবানের হেফাজত করো।
খ. তোমার বাসস্থান যেন তোমার জন্য প্রশস্ত হয় এবং
গ. তোমার গুনাহের জন্য কান্না করো。
লক্ষ করুন, নবিজি মুক্তির তিনটি উপায়ের মধ্যে প্রথম উপায় বলেন, জবানের হেফাজত।
-আরেকবার মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) নবিজিকে জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এমন একটি আমল আমাকে জানিয়ে দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং জাহান্নাম হতে দূরে রাখবে।
-নবিজি তাঁকে উপদেশ দেওয়ার পর বললেন, আমি যা বললাম, সেগুলোর সারসংক্ষেপ বলব?
-মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বললেন, জি, বলুন।
-অতঃপর নবিজি তাঁর জিহ্বা ধরে বললেন, এটা সংযত রাখো।
-মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বেশ অবাক হলেন এবং তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যে কথাবার্তা বলি, এগুলোর সম্পর্কেও কি জবাবদিহি করতে হবে?
-নবিজি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে আরবের প্রচলিত একটি প্রবাদ বললেন, হে মুয়াজ! তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! মানুষকে কেবল জিহ্বার উপার্জনের কারণেই জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে!
মানুষ তার জবান দিয়ে মিথ্যা বলে। অন্যকে অপবাদ দেয়। গিবত করে। মানুষকে খোঁটা দেয়। গালাগাল করে। তার জিহ্বার কারণে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে অথবা এই জিহ্বার কারণেই সে জান্নাত লাভ করবে। নবিজি বলেন, তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র ও আচরণ সর্বোত্তম, তারাই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। কিয়ামতের দিন তারা আমার খুব নিকটে থাকবে। (অন্যদিকে) তোমাদের মধ্যে যারা আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণ্য, কিয়ামতের দিন তারা আমার থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে। তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হবে এমন-
ক. বাচাল।
খ. ধৃষ্ট-নির্লজ্জ এবং
গ. অহংকারে মত্ত ব্যক্তি。
বাচাল এবং সব ব্যাপারে যারা কথা বলে, নবিজি তাদের নিন্দা করেন। যে কিনা সব ইস্যুতেই লেখালিখি করে, কথা বলতে চায়—অবশ্যই সেখানে তার ভুল হবে। পরবর্তী সময়ে কথার আর গুরুত্ব থাকবে না। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন—কোনো কিছুকে যদি জেলে নিতে হয়, তাহলে সেটা হলো জিহ্বা。
একজন মুমিন অবশ্যই তার জিহ্বাকে সংযত করবে। সে যা বলে তাকে জেনেবুঝে বলতে হবে। তারপরও কিছু ব্যাপারে তাকে অতিরিক্ত সচেতনতা অবলম্বন করা উচিত। সেগুলো হলো—
মিথ্যা বলা: মিথ্যা বলা কখনোই মুমিনের গুণাবলি হতে পারে না। একজন মুমিন মিথ্যা বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। মিথ্যা বলার পরিণাম নিয়ে পূর্বের একটি অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
বিতর্কে লিপ্ত হওয়া: এই ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হতে হবে। কেউ কিছু বললেই যেন আমরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়ি, বিতর্কে জড়িয়ে না যাই। নবিজি বলেন, কোনো সম্প্রদায় হিদায়াতের রাস্তা পেয়ে আবার পথ ভোলা হয়ে থাকলে, তা শুধু তাদের বিবাদ ও বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার কারণেই。
আপনি প্রয়োজন উপলব্ধি করে মানুষের সাথে বিতর্কে নামুন। আশেপাশের অনেকেই অনেক ভুল কথা বলবে, ভুল বক্তব্য দেবে। তাই বলে সারাক্ষণ যদি আপনি বিতর্কে লিপ্ত থাকেন, দেখা যাবে—আর কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন না। নামাজে গেলেও বিতর্কের কথা বারবার মনে পড়বে।
মানুষকে উপহাস করা: মানুষকে নিয়ে হাসি-তামাশা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেককেই দেখা যায়—কারও সাথে কথা বলা শুরু করলে অন্যের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলে। খোঁচা দেয়। খোঁটা দেয়। মনে রাখবেন, এগুলো কখনোই মুমিনের বৈশিষ্ট্য না।
অন্যকে খোঁটা দেওয়া: অনেকেই এমন আছে, কারও উপকার করলে একসময় স্মরণ করিয়ে দেয়—মনে আছে, তুমি বিপদে পড়েছিলে। আমি টেনে তুলেছিলাম।
আর এখন তুমি আমার মুখের ওপর কথা বলো? সারাজীবন তোমাকে দান করলাম, এখন আমার ওপর কথা বলবে? এগুলোর মাধ্যমে আপনি যে উপকার করেছেন, সেই উপকারের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। নেক আমল ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'হে মুমিনগণ! খোঁটা কিংবা কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের দান নষ্ট করো না।'
গিবত ও নামিমাহ: দুটি আলাদা বিষয়, কিন্তু এখানে আমি একত্রে উল্লেখ করলাম। গিবত করা থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে মনে করি, আমি তো সত্য বলছি। মূলত এই ধরনের সত্য বলে অন্যের নিন্দা করাটাও গিবতের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো।'
তাহলে গিবত কী? নবিজি গিবতের এমন স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়ার পর সেটা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকার কথা নয়। নবিজি একদিন সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন-তোমরা কি জানো, গিবত কী? উত্তরে সাহাবিরা বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। অতঃপর রাসূলুল্লাহ গিবতের সংজ্ঞা দিলেন, গিবত হলো তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে।
এমন স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়ার পরও সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন-আমি যা বলছি, সত্যিই যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে এমন কিছু থাকে? এ কথা শুনে নবিজি সাহাবিদের সন্দেহ দূর করে বললেন-তুমি তার সম্পর্কে যা বলছ, তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থেকে থাকে, তাহলে তো তুমি গিবতই করলে। আর যদি তার মধ্যে না থাকে, তাহলে তো তুমি তার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিলে। কারও গিবত শোনার পর আপনি যদি ওই লোকটিকে গিয়ে বলেন-জানো, অমুক তোমাকে কী বলেছে; তাহলে সেটা হবে নামিমাহ।
অশ্লীল কথা ও গালাগাল: একজন মুমিন কাউকে গালি দেয় না, কটু কথা বলে না; সব সময় সে তার জবানের হেফাজত করে। কেউ তাকে গালি দিলেও প্রত্যুত্তরে সে তা ফিরিয়ে দেয় না। মুমিনের ব্যাক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে নবিজি বলেন-
ক. মুমিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না।
খ. অভিসম্পাতকারী হতে পারে না।
গ. অশ্লীল ও গর্হিত কাজ করতে পারে না এবং
ঘ. কটুভাষীও হয় না。
আবু বকর, উমর, উসমান ও আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের জীবনী পড়লে আমরা দেখতে পাই-তাঁরা কটুভাষী ছিলেন না, কখনোই অন্যকে দোষারোপ করতেন না, গালাগাল করতেন না। অপর দিকে তাঁরা জীবনের নানান প্রান্তে বহু কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন এবং সেসব সামাল দিয়েছেন দৃঢ়তার সহিত। তবুও তারা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাত্রায় ছিলেন মহান।
আমাদের এখনকার তরুণরা মনে করে গালাগাল করাটাও একধরনের স্মার্টনেস। এটা ভুল ধারণা। মুমিনের স্মার্টনেস হলো উত্তম কথা বলা, সুন্দর-কোমল ভাষায় অন্যকে সম্বোধন করা। নবিজি খুব সংক্ষেপে আমাদের জবান হেফাজতের ব্যাপারে একটি উপদেশ দেন। তিনি বলেন-যে নীরব থাকল, সে নাজাত লাভ করল。
মুমিন কখনো বাচাল হতে পারে না। সে নীরবতাকে বেছে নেয়। যখন যেখানে কথা বলার প্রয়োজন, শুধু সেখানেই বলে। এই ব্যাপারে নবিজি আরেকটি হাদিসে বলেন-যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে。
মুমিন নিজে যেমন অনর্থক কথা বলে না, তেমনই অনর্থক কথা শুনতেও পছন্দ করে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-যখন তারা অনর্থক কথা-কর্মের পাশ দিয়ে চলে, তখন তা পরিহার করেই চলে। নবিজি এ ব্যাপারে সতর্ক করে আমাদের বলেন, আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া বেশি কথা বলো না। কেননা, আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া বেশি কথা বললে অন্তর কঠিন হয়ে যায়। আর নিঃসন্দেহে কঠিন অন্তরের লোকই আল্লাহ তায়ালা থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে。

টিকাঃ
১৭৯ সূরা মুমিনুন: ১-৩
১৮০ সূরা ফুরকান: ৬৩
১৮১ সূরা ফুরকান: ৭২
১৮২ সূরা ইনফিতার: ১১-১২
১৮৩ জামে আত-তিরমিজি: ২৪০৬
১৮৪ জামে আত-তিরমিজি: ২৬১৬
১৮৫ জামে আত-তিরমিজি: ২০১৮
১৮৬ আল মাজমু আল কাবির: ৮৭৪৫
১৮৭ জামে আত-তিরমিজি: ৩২৫৩
১৮৮ সূরা বাকারা: ২৬৪
১৮৯ সূরা হুজুরাত: ১২
১৯০ সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৭
১৯১ জামে আত-তিরমিজি: ১৯৭৭
১৯২ জামে আত-তিরমিজি: ২৫০১
১৯৩ সহিহ মুসলিম: ৮০
১৯৪ জামে আত-তিরমিজি: ২৪১১

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 অন্যকে সালাম দেওয়া

📄 অন্যকে সালাম দেওয়া


মুমিনের একটি সহজ গুণ হলো, সে অন্যকে সালাম দেয়। কারও জন্য অপেক্ষা করে না, কেউ তাকে সালাম দেবে। অন্য কেউ তাকে সালাম দেওয়ার আগে সে নিজেই সালামের সূচনা করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর প্রথম যে ভাষণ দেন, সেখানে তিনি বলেন-হে মানুষগণ! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাদ্য দান করো, মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ আদায় করো। তাহলে নিশ্চয়ই তোমরা সহজে জান্নাত লাভ করবে।
মদিনার হিজরতের পর নবিজির প্রথম নির্দেশ ছিল-সালামের প্রসার ঘটাও। যাকে দেখবে, তাকে সালাম দিতে হবে। এমন নির্দেশনাই তিনি দিয়েছেন।
একবার এক সাহাবি নবিজিকে জিজ্ঞেস করেন, ইসলামের কোন কাজ সর্বোত্তম? উত্তরে নবিজি বলেন, তুমি লোকদের খাদ্য খাওয়াবে এবং চেনা-অচেনা সকলকে সালাম দেবে।
আপনি কী রকম পোশাক পরে আছেন এর ওপর নির্ভর করছে না আপনার ইসলাম কেমন, আর শ্রেষ্ঠ কি না। ইসলাম ঠিকমতো পালন হচ্ছে কি না, তা নির্ভর করছে আপনার আমলের ওপর, কর্মের ওপর। অর্থাৎ সর্বোত্তমভাবে আপনি মানুষকে খাওয়াচ্ছেন কি না, খোঁজখবর রাখছেন কি না, মানুষকে সালাম দিচ্ছেন কি না এবং এর প্রসার ঘটাচ্ছেন কি না।
আমরা সাধারণত চেনা-পরিচিত মানুষদের সালাম দিই। অচেনাদের সালাম দিই না। সুড়সুড় করে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাই। এটা ঠিক না। নবিজি জানিয়ে দেন, চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দিতে হবে। আমি যদি বুঝতে পারি যিনি আমার পাশ অতিক্রম করছেন তিনি মুসলিম, তাহলে তাকে সালাম দেবো; তাকে না চিনলেও সালাম দেবো।
মুসলিমের ওপর মুসলিমের হক ছয়টি। তার মধ্যে একটি হক হলো, কারও সাথে দেখা হলে সালাম দেওয়া। কেউ যদি আপনাকে 'আসসালামু আলাইকুম' বলে, তাহলে আপনার ওপর সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব। নবিজি বলেন, এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের হক পাঁচটি। তার মধ্যে একটি হলো- সালামের জবাব দেওয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-
'আর যখন তোমাদের সালাম দেওয়া হবে, তোমরা তারচেয়ে উত্তম সালাম দেবে অথবা জবাবে তা-ই বলবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে পূর্ণ হিসাব গ্রহণকারী।'
কেউ যদি আপনাকে 'আসসালামু আলাইকুম' বলে, জবাবে আপনি বলুন 'ওয়ালাইকুমুস সালাম'। অথবা ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ বা ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আপনি যেভাবে সালাম দেবেন, তার ওপর আপনার সওয়াব নির্ভর করবে।
• আসসালামু আলাইকুম বললে ১০ নেকি
• আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ বললে ২০ নেকি
• আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ বললে ৩০ নেকি পাবেন。
আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ বললেন, তুমি ফেরেশতাদের সালাম দাও এবং তাঁরা সালামের জবাবে কী বলে সেটা মনোযোগের সাথে শুনবে। কারণ, এটাই হবে তোমার ও তোমার বংশধরের সম্ভাষণ。
এজন্য আমরা দেখতে পাই, ইবরাহিমি ধর্মের অনুসারীদের সম্ভাষণ হলো সালাম। ইহুদিরা বলে-সালমালিকুন, খ্রিষ্টানরাও একই কথা বলত বলে জানা যায়। নবিজি বলেন, ঈমানদার ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো না, কী করলে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? শুনে রাখো, তা হলো-তোমরা পরস্পর বেশি বেশি সালাম বিনিময় করবে。
এই হাদিসটি শুরু হয়েছে 'কী করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে' এই কথার মধ্য দিয়ে। শেষ হয়েছে সালাম বিনিময়ের নির্দেশ দিয়ে। অর্থাৎ, জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম একটি সহজ রাস্তা হলো বেশি বেশি সালাম বিনিময় করা। যখন কাউকে সালাম দিই, এর মানে কী দাঁড়ায়?
ক. 'আস-সালাম' হলো আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম। যখন কাউকে সালাম বলি, তার মানে আমি তার জন্য দুআ করি-আল্লাহ তোমাকে শান্তিতে রাখুন, নিরাপদ রাখুন, তোমার কল্যাণ করুন।
খ. সালাম করা মানে তার জন্য দুআ করা। সালাম মানে যেমন শান্তি, তেমনই এর আরেকটি অর্থ হলো ক্ষতি মুক্ত। আমি তাকে জানাচ্ছি-তোমার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, তোমার ওপর যেন কোনো বিপদ না আসে, তোমার দুশ্চিন্তা যেন কমে যায়।
গ. আমি যখন অন্যের বিপদমুক্ত, কষ্টমুক্ত, দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার প্রার্থনা করছি, তখন এমনিতেই তাকে জানিয়ে দিচ্ছি-অন্তত তোমার কোনো ক্ষতি আমি করব না। তুমি আমার দিক থেকে নিরাপদ। একজনকে বললাম, তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এটা বলার পর আমি কীভাবে তার জীবনে অশান্তির কারণ হতে পারি? তার পাওনা টাকা দিচ্ছি না, তার নামে গিবত করছি, তার দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছি, তাকে শারীরিক-মানসিক আঘাত করছি। এমনটা করলে তো বোঝা গেল, আমি বলছি এক আর করছি আরেক!
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) প্রায় সময় বাজারে যেতেন, কিন্তু তেমন কিছু কিনতেন না। লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করত-আপনি তো কিছু কেনেন না, তারপরও বাজারে যান কেন? জবাবে তিনি বলতেন, যাতে আমি আমার ভাইদের সালাম দিতে পারি।
সালাম দেওয়া এমন একটা গুণ, যে কেউ তা অর্জন করতে পারি। এটা খুবই সহজ। আমরা অপেক্ষায় থাকব না, কেউ আমাদের সালাম দিচ্ছে কি দিচ্ছে না। কেউ সালাম দেওয়ার আগেই আমরা তাকে সালাম দেবো।
নবিজি সব সময় আগে সালাম দিতেন; এমনকি শিশুদেরও সালাম দিতেন। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, মদিনার পথে একদল শিশু খেলা করছিল। নবিজি তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দেন。
আল্লাহ হলেন 'আস-সালাম'। তিনি আমাদের দান করবেন-'দারুস সালাম' (জান্নাতের একটি নাম হলো দারুস সালাম; কারণ, সেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই)। আমাদের ধর্মের নামও ইসলাম। নবিজি সব সময় চাইতেন আমরা যেন সালাম দিই।
তার মানে এই কথা প্রমাণ হয়-আমরা যদি সালাম দিই, ইসলামের অনুশাসন মেনে চলি, তাহলে 'আস-সালাম' আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে দারুস সালাম দান করবেন। জান্নাতে প্রবেশের পর ফেরেশতারা জান্নাতিদের অভ্যর্থনা জানাবেন সালামের মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
'আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে, তাদের দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে এসে পৌঁছবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হবে, তখন জান্নাতের রক্ষীরা তাদের বলবে-তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা ভালো ছিলে। অতএব, স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এখানে প্রবেশ করো।'

টিকাঃ
২১৬ জামে আত-তিরমিজি: ২৪৮৫
২১৭ সহিহ বুখারি: ২৮
২১৮ সহিহ মুসলিম: ৫৫৪৪
২১৯ সহিহ বুখারি: ১২৪০
২২০ সূরা নিসা: ৮৬
২২১ জামে আত-তিরমিজি: ২৬৮৯
২২২ সহিহ বুখারি: ৬২২৭
২২৩ সহিহ মুসলিম: ৯৮
২২৪ সহিহ বুখারি: ৬৩৪৭
২২৫ সূরা জুমার: ৭৩

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 সহজতা অবলম্বন

📄 সহজতা অবলম্বন


মুমিনের অন্যতম গুণাবলি হলো, মুমিন সহজ ও কোমল আচরণ করে। অনেক মানুষ আছেন—তারা খুব জটিল, আচরণ উদ্ধত্য। মানুষ তাদের সাথে মিশতে চায় না। সহজ বিষয়কে তারা প্যাঁচাতে থাকে। এমন জটিল প্রকৃতির মানুষ থেকে অন্যরা দূরে থাকে। কিন্তু মুমিনের আখলাক এমন না। মুমিন সহজ প্রকৃতির। সে মানুষের সাথে নম্র আচরণ করে, ভদ্রভাবে কথা বলে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করেছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।’
কথাটি আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন। তিনি যদি সাহাবিদের প্রতি কোমল আচরণ না করতেন, তাহলে সাহাবিরা তাকে ছেড়ে চলে যেত! তা ছাড়া আল্লাহর রহমতের কারণে নবিজি তাঁদের প্রতি কোমল আচরণ করেন।
নবিজি আমাদের আদর্শ। তিনি মানুষের সাথে কোমল আচরণ করতেন, আমরাও নবির আদর্শে পা বন্দি হয়ে মানুষের সাথে কোমল আচরণ করব। কার সাথে আচরণ করব, সেটা ব্যাপার না। বাবা-মা, শিক্ষক, রিকশাওয়ালা, দোকানদার সবার সাথেই আমরা কোমল আচরণ করব। এটা তো মুমিনের স্বাভাবিক আচরণ। তবে হ্যাঁ, প্রয়োজনে কঠোর হব; কিন্তু বাকি সময়টুকু কোমলতা প্রদর্শন করব।
মুসা (আ.)-কে আল্লাহ তায়ালা ফেরাউনের রাজপ্রাসাদে দাওয়াতের জন্য পাঠান। ফেরাউনের মতো নিপীড়ক, কাফিরের সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে আল্লাহ সেটা জানিয়ে দেন। আল্লাহ বলেন—
‘তোমরা (মুসা ও হারুন) তার (ফেরাউন) সাথে নম্রভাবে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’
ফেরাউনের মতো কাফিরকে উপদেশ দেওয়ার জন্য যদি আল্লাহ নম্রভাবে কথা বলতে বলেন, আপনি কীভাবে আপনার মুসলিম ভাইকে কঠোর ভাষায় উপদেশ দেন? কীভাবে রিকশাওয়ালার সাথে কঠোরতা প্রদর্শন করেন? কাজের লোকের সাথে কেন কঠোর ভাষায় কথা বলেন?
একবার নবিজি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন-আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো না, কোন ব্যক্তির জন্য জাহান্নাম হারাম এবং জাহান্নামের জন্য কোন ব্যক্তি হারাম? সাহাবিরা জানতে চাইলে তিনি বলেন-যে ব্যক্তি মানুষের কাছাকাছি, সহজ-সরল, নম্রভাষী ও সদাচারী।'
যে মানুষ খুব সহজ-সরল (বোকা না), তার সাথে মিশতে মানুষের ভালো লাগে। তাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করতেও ভালো লাগে, কেমন আছ? সে যেমন মানুষের সাথে মিশে, অন্যরাও তার সাথে মিশে। যে মানুষ অন্যের সাথে এমন সুন্দর আচরণ করে, অন্যের সাথে মিলেমিশে থাকে; জাহান্নাম তার জন্য হারাম এবং জাহান্নামের জন্যও সে হারাম। নবিজি বলেন-তোমরা তোমাদের কাতারসমূহ সোজা করে নাও, পরস্পর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াও এবং উভয়ের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা বন্ধ করো। আর তোমাদের ভাইদের হাতে নরম হয়ে যাও。
আপনি অবাক হতে পারেন এই ভেবে-নামাজের কাতার সোজা করার ক্ষেত্রে নম্রতার কথা, সহজতার কথা কেন আসছে? খেয়াল করলে দেখবেন, নামাজে ফাঁকা জায়গা থাকলে কাউকে পেছনের কাতার থেকে সামনে আসতে বললে সে আসতে চায় না। হয়তো ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়েছে বা আগে এসে ওই জায়গায় দাঁড়িয়েছে। দু-একবার বলার পর সে অনেকটা রাগ করেই জবাব দেয়, আমাকে বলছেন কেন? আর কেউ নেই? তাদের বলুন!
অর্থাৎ একটা ভালো কথা বলার সময় সে মেজাজ দেখাচ্ছে। তার সঙ্গে বিনয় সুরে কথা বললেও সে কোমল আচরণ করছে না। কেউ হয়তো জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়েছে। আরেকজনের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়নি। কারণ, তার পাশের দুজন তার জায়নামাজে আসছে না। সে তাদের নম্রভাবে বলল, ভাই! আসেন, জায়নামাজে আসেন। তার এই সহজতা, নম্রতার জন্য আরেকজন যদি তার জায়নামাজে দাঁড়ায়, নামাজের কাতার সোজা হয়ে যাবে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো হবে।
মুমিন হবে সহজ প্রকৃতির। যে পরিস্থিতিতে যেমন আচরণ করা উচিত, সে তেমন আচরণই করবে। ছোটো শিশু দেখলে আমরা তার সাথে তেমনভাবে কথা বলি না, কাছে ডাকি না; যেমনভাবে বড়োদের সাথে কথা বলি। বন্ধুদের সাথে যে ভাষায় কথা বলি, একই ভাষায় আবার মা-বাবার সাথে কথা বলি না।
একবার এক লোক নবিজির ঘরে ঢোকার অনুমতি চাইল। নবিজি আয়িশা (রা.)-এর কাছে লোকটির ব্যাপারে মন্তব্য করলেন, সে সমাজের নিকৃষ্ট লোক এবং সমাজের দুষ্ট সন্তান।
কিন্তু লোকটি ঘরে ঢুকলে নবিজি তার সাথে হাসিমুখে কথা বলেন। লোকটি চলে যাবার পর আয়িশা (রা.) রাসূলুল্লাহর এমন অদ্ভুত আচরণের কারণ জানতে চান। অর্থাৎ, লোকটি যদি খারাপই হয়ে থাকে, নবিজি কেন তার সাথে ভালো ব্যবহার করবেন।
আমাদের প্রিয় নবি ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। খারাপ হওয়া সত্ত্বেও তো তিনি লোকদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে পারেন না। তিনি আয়িশা (রা.)-কে বললেন, ও আয়িশা! তুমি কি কখনো আমাকে অশালীন (আচরণ করতে) দেখেছ?
অতঃপর নবিজি এক সতর্কবার্তা দেন। আমরা তো মনে করি শুধু নামাজ পড়ে আর হজ করে এলেই মনে হয় আর কিছু লাগবে না। অথচ মানুষজন আমার সাথে মিশতে চায় না, আমাকে দেখলে এড়িয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে নবিজি বলেন-কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট সেই ব্যক্তি, যার দুষ্টামির কারণে মানুষ তাকে ত্যাগ করে।
সর্বাবস্থায় মানুষের সাথে আমাদের সহজ আচরণ করতে হয়, কোমল ভাষায় হাসিমুখে কথা বলতে হয়; বিশেষ করে কেনাবেচার সময়। আপনি একজন বিক্রেতা। কোনো একটি পণ্য ৮০০ টাকা দাম পেলেই বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু ক্রেতার কাছে দাম হাঁকালেন ৩০০০ টাকা। ক্রেতা দাম বলা শুরু করল ৫০০ টাকা থেকে। এভাবে দামাদামি চলতে চলতে ৫ মিনিট পর ৮০০ টাকায়ই বিক্রি করলেন। অথচ শুরুতে ১০০০-১২০০ টাকা বললে ক্রেতা-বিক্রেতা দুজনের মাঝখানে কথা চালাচালি আর এত ভোগান্তি হতো না। কেনাবেচায় দুজনেরই সহজ হতো। এ প্রসঙ্গে নবিজি বলেন-আল্লাহ এমন ব্যক্তির প্রতি রহমত বর্ষণ করেন, যে নম্রতার সাথে ক্রয়-বিক্রয় করে ও পাওনা ফিরিয়ে চায়।
নবিজি সাহাবিদের একটি ঘটনা বলেন। পূর্ববর্তী যুগের এক লোক ব্যক্তির রুহের সাথে ফেরেশতা সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি কোনো নেক কাজ করেছ।
-সে বলল, না।
-ফেরেশতা বলল, মনে করে দেখো তো।
-তখন সে একটি নেক কাজের কথা উল্লেখ করে, আমি মানুষকে ঋণ দিতাম। তারপর আমার কর্মচারীদের নির্দেশ দিতাম, অসচ্ছল ব্যক্তিদের সুযোগ দিতে ও সচ্ছল ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে। হয়তো এই কারণে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।
লোকটি সবাইকে ঋণ দিত। গরিবরা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাদের ঋণ ক্ষমা করে দিত এই আশায়, আল্লাহ হয়তো এই ওসিলায় তাকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ সত্যি সত্যি এই ওসিলায় তাকে ক্ষমা করে দেন।
নবিজি একবার জনৈক ব্যক্তির কাছে থেকে ঋণ নেন। ঋণের মেয়াদ পূর্তির আগে লোকটি নবিজির কাছে পাওনা দাবি করে। নবিজি সাহাবিদের বললেন, তাকে একটি উট দিতে। সাহাবিরা উট দিতে গিয়ে দেখেন, সে যে সাইজের উট ঋণ হিসেবে দিয়েছিল, এই উট তার চেয়েও বড়ো। তা ছাড়া ওই সাইজের কোনো উট নেই, যা আছে সব বড়ো বড়ো। তখন নবিজি তাকে বড়ো সাইজের উটটিই দিলেন। উট গ্রহণের সময় নিয়েছিলেন ছোটো উট, আর দেওয়ার সময় দিলেন বড়ো উট। নবিজি তখন বলেন-তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় উত্তম।
এটা সুদ নয়। কারণ, ঋণ গ্রহণের সময় এমন কোনো চুক্তি ছিল না। নবিজি তার সাথে কোমল আচরণ করেন, নম্র আচরণ করেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তিনি ঋণ ফিরিয়ে দেওয়ার সময় যে পরিমাণ ঋণ নিতেন, তার চেয়ে বেশি ফিরিয়ে দিতেন। এটা হলো ঋণের উত্তম প্রতিদান, উত্তম পরিশোধ।
উসমান ইবনে আফফান (রা.) একবার একটি জমি কেনেন। কেনার পর পূর্বের মালিক জমিটি তাকে বুঝিয়ে দেয়নি। কারণ, লোকজন তাকে কানপড়া দেওয়ায় সে মনে করে খুব কম দামে জমিটি বিক্রি করে ফেলেছে।
জমি কেনাবেচা শেষ। উসমান (রা.) চাইলে বলতে পারতেন-তুমি বিক্রি করে ফেলছ, তোমার আর কিছু করার নেই, এখন এই জমির মালিক আমি। যদিও এ কথা বলার অধিকার তাঁর ছিল। কিন্তু তিনি তা বলেননি। তিনি নবিজির একটি হাদিস স্মরণ করে জমিটি মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেন। হাদিসটি ছিল এই, নবিজি বলেন-ক্রয়-বিক্রয়ের সময় যে ব্যক্তি সহজতা প্রদর্শন করে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
কোমলতা, সহজতার গুণগুলোকে আমাদের চারিত্রিক গুণাবলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করব। আমরা যদি মানুষের সাথে কোমল আচরণ করি, নরম ভাষায় কথা বলি-আল্লাহ আমাদের সাথে কোমলতা প্রদর্শন করবেন। নবিজি তাঁর স্ত্রী আয়িশা (রা.)-কে বলেন, হে আয়িশা! আল্লাহ কোমল। তিনি সকল কাজে কোমলতা পছন্দ করেন।

টিকাঃ
২২৬ সূরা আলে ইমরান: ১৫৯
২২৭ সূরা ত্বহা: ৪৪
২২৮ জামে আত-তিরমিজি: ২৪৮৮
২২৯ সুনানে আবু দাউদ: ৬৬৬
২৩০ সহিহ বুখারি: ৬০৩২
২৩১ সহিহ বুখারি: ২০৭৬
২৩২ সহিহ বুখারি: ২০৭৭, ৩৪৮০; সহিহ মুসলিম: ৩৮৮৫
২৩৩ সহিহ বুখারি: ২৩০৬
২৩৪ সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২০২
২৩৫ সহিহ বুখারি: ৬৯২৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00