📘 মুমিনের আখলাক > 📄 দয়া ও কোমলতা

📄 দয়া ও কোমলতা


মুমিনের একটি গুণ হলো দয়াশীলতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে এই গুণটি ছিল। আল্লাহ এই গুণের প্রশংসা করে পবিত্র কুরআনে বলেন- 'অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করেছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।'
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- 'নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক যা তোমাদের পীড়া দেয়। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।'
মুমিনের বৈশিষ্ট্যই হলো মুমিন কোমল হৃদয়ের অধিকারী হবে। সে মানুষের প্রতি দয়া দেখাবে। মানুষের কষ্ট দেখে সে কষ্ট পাবে। মুহাদ্দিসগণ একটি হাদিসকে খুব গুরুত্ব দেন। শিক্ষার্থীরা হাদিস শেখা শুরু করে এই হাদিসটির মাধ্যমে। নবিজি বলেন, আল্লাহ দয়ালুদের ওপর দয়া ও অনুগ্রহ করেন। যারা জমিনে বসবাস করছে, তাদের প্রতি তোমরা দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। দয়া রহমান হতে উদ্‌গত। যে লোক দয়ার সাথে সম্পর্ক রাখে, আল্লাহ তার সাথে নিজ সম্পর্ক বজায় রাখেন। যে লোক দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে, আল্লাহ তার সাথে দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
হাসান (রা.) ছিলেন নবিজির আদরের নাতি, ফাতিমা (রা.)-এর পুত্র। জনসম্মুখে নবিজি একদিন হাসান (রা.)-কে চুমো দিলেন। যেখানে একসময় বাবারা নিজেদের মেয়েদের জীবন্ত কবর দিত, সেই সমাজে নবিজি লোকজনের সামনে তাঁর নাতিকে চুমো খাচ্ছেন? সন্তানকে আদর-স্নেহ তো মানুষ ঘরের মধ্যে করে। ঘরের বাইরে কি কেউ সন্তানকে এভাবে চুমো খায়?
আকরা ইবনে হারিস (রা.) নামের এক সাহাবি দৃশ্যটি দেখে দারুণ বিস্মিত হলেন। তিনি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাসই করাতে পারছিলেন না। এ রকম একটা সমাজে নবিজি সবার সামনে তাঁর নাতিকে চুমো দিলেন, ব্যাপারটা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। বাচ্চাকে চুমো দেওয়া তাঁর কাছে কেমন যেন দুর্বলতা-দুর্বলতা আর হীনম্মন্য বলে মনে হচ্ছে।
তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমারও তো দশটা ছেলে আছে। কই, আমি তো কোনো দিন কাউকে চুমো দিইনি!
সন্তানকে চুমো না দেওয়া যেন খুব গর্বের কথা! তাঁর এ কথা শুনে নবিজি বললেন-মাল্লা ইয়ারহামু, লা ইয়োরহাম-যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অন্যের প্রতি দয়া দেখানো। মুমিন আল্লাহর কাছে যেমন দয়াপ্রার্থী, তেমনই মানুষের প্রতিও সে দয়া দেখাবে; কেউ কারও প্রতি দয়া করলে আল্লাহও তাকে দয়া করেন।
নবিজির জীবনে এমন অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। দ্বীন পালন করা যেন কঠিন হয়ে না পড়ে, এজন্য তিনি অনেক ব্যাপারে জোরারোপ করেননি। তিনি সব সময়ই চেয়েছেন, মানুষ সহজে দ্বীনের মাঝে পা বন্দি হোক আর তা পালন করুক।
মিরাজের রাতে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত মুসলিম উম্মাহর ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। মুসা (আ.) নবিজিকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, এত বেশি নামাজ আপনার উম্মত আদায় করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ উম্মতের কথা চিন্তা করে, ভেবে আল্লাহর কাছে যান নামাজের ওয়াক্ত কমাতে। এভাবে তিনি আল্লাহর কাছে যান নয়বার। প্রতিবারই আল্লাহ নামাজের ওয়াক্ত কমাতে কমাতে শেষ পর্যন্ত ৫০ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেন।
নবিজি বলেন, আমার উম্মাহর জন্য যদি কঠিন না মনে করতাম, তাহলে প্রত্যেক নামাজের আগে তাদের মিসওয়াক করার হুকুম করতাম।
যদি এমন হতো-প্রত্যেক নামাজের আগে মিসওয়াক করা আবশ্যক, তাহলে আমাদের জন্য তা কষ্টকর হয়ে যেত। আমাদের কষ্টের হওয়ার কথা ভেবে নবিজি প্রত্যেক নামাজের আগে মিসওয়াক করার নির্দেশ দেননি। কোনোভাবে যেন শরিয়াহ কঠিন হয়ে না যায়, সেদিকে তিনি লক্ষ রাখেন। রাসূলুল্লাহ আরও বলেন, আমি যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর হওয়ার আশঙ্কা না করতাম, তাহলে তাদের বিলম্বে এশার নামাজ পড়তে নির্দেশ দিতাম।
এখন আমরা এশার নামাজ পড়ি রাত আটটায়। শীতকালে সাতটার সময়। যদি এমন হতো-এশার নামাজ রাত বারোটায় পড়া নিয়ম, তাহলে আমাদের জন্য এটা ব্যাপক কষ্টকর হতো। এশা ও ফজর এই দুই নামাজের চিন্তায় ভালোমতো ঘুম হতো না। নবিজি আমাদের কষ্টের কথা ভেবে এমন আদেশ দেননি।
তারাবির ক্ষেত্রেও দেখা যায় নবিজি একটানা তিন দিন মসজিদে যান, তারাবির নামাজ আদায় করেন। কিন্তু চতুর্থ দিন মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। যথা দিনের মতো সাহাবিরা নবিজি মসজিদে আসার অপেক্ষায় বসে রইলেন। রাসূলুল্লাহ বলেন-শোনো, আমি জানতাম তোমরা সারারাত ধরে এখানে আছ, কিন্তু আমি আসিনি। এই নামাজ তোমাদের ওপর 'ফরজ' হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছি (বিধায় হুজরা থেকে বের হইনি)। এমন হতে পারে, তোমরা তা আদায় করতে অপারগ হয়ে পড়তে পারো।
একবার নবিজি মসজিদে নববিতে বসে আছেন। এমন সময় এক বেদুইন এমন সময় প্রবেশ করল। বেদুইনরা সাধারণত শহরতলীর বাইরে থাকত, তাই শহুরে আদব-কায়দার সাথে তারা তেমন পরিচিত ছিল না। তাদের স্বভাবও অনেকটা রূঢ়-রুক্ষ ছিল। কিছুক্ষণ পর বেদুইনটি মসজিদের এক কোণে দাঁড়িয়ে পেশাব করা শুরু করল। যেখানে নবিজি নিজে বসে আছেন, যে মসজিদটি তিনি নিজ হাতে নির্মাণ করেছেন, সেই মসজিদেই কিনা কোথাকার এক বেদুইন এসে পেশাব করা শুরু করল?
সাহাবিরা তো রাগে অগ্নিশর্মা। তেড়ে গেলেন বেদুইনকে শায়েস্তা করতে। এমতাবস্থায় যদিও তাদের রাগ করাটা খুবই যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক ছিল। একে তো বেদুইন, আবার মসজিদে ঢুকে তাদেরই বিরুদ্ধে দুআ করেছে, তার ওপর নবিজি উপস্থিতিতে এমন গর্হিত কাজ শুরু করল। এর শাস্তি তো তাকে পেতেই হবে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের থামালেন। তিনি বললেন-থামো, থামো। তোমরা তাকে বাধা দিয়ো না, ছেড়ে দাও।
নবিজি বেদুইনকে শান্তিমতো পেশাব করতে দিলেন। নিজে যেমন বাধা দিলেন না, তেমনই সাহাবিরা বাধা দিতে গেলে; বরং তাঁদেরও বাধা দিতে নিষেধ করলেন। কারণ, এমন অবস্থায় তার পেশাব আটকালে তার শারীরিক সমস্যা হতে পারে। পেশাব আটকে যেতে পারে। মৃত্যুও হতে পারে। ধীরে-সুস্থে পেশাব করা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ তাকে ডেকে বোঝালেন, এটা হলো মসজিদ। এখানে প্রসাব করা বা ময়লা আবর্জনা ফেলা যায় না; এটি আল্লাহর জিকির, নামাজ পড়া এবং কুরআন তিলাওয়াত করার জায়গা।
নবিজি ধরে নিলেন, বেদুইনটি মসজিদের আদব সম্পর্কে জানে না। সে মসজিদকে অন্য দশ জায়গার মতো ভেবেছে। তাকে ডেকে শাস্তি না দিয়ে উলটো জ্ঞানদান করলেন। পুরো বিষয়টি বোঝানোর পর নবিজি চাইলে তাকে বলতে পারতেন-তুমি যে ভুলটা করেছ, এখন সেটার প্রায়শ্চিত্ত করো। যেখানে পেশাব করেছ, পানি দিয়ে ধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে দাও।
নবিজি তা-ও করেননি। তিনি কী করলেন? সাহাবিদের, যারা বেদুইনের এহেন কাণ্ড দেখে বিরক্ত, রাগান্বিত, তাদের বললেন-পেশাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।
নবিজি সাহাবিদের এই ঘটনার মাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। এত কিছুর পরও রাসূলুল্লাহ বেদুইনকে বকাঝকা না করে, তার প্রতি কঠোর আচরণ না করে উলটো সাহাবিদের বলছেন, তোমাদের কোমল ও সুন্দর আচরণ করার জন্য পাঠানো হয়েছে; রুক্ষ-রূঢ়, কঠোর আচরণের জন্য পাঠানো হয়নি।
বেদুইন লোকটি সাহাবিদের আচরণ খেয়াল করেন, অন্যদিকে নবিজির কোমল আচরণও দেখেন। ফলে তিনি সাহাবিদের জন্য দুআ না করে কেবল রাসূলুল্লাহর জন্য দুআ করেন, হে আল্লাহ! আমার প্রতি দয়া করো ও মুহাম্মাদের প্রতি দয়া করো। এ ছাড়া আর কারও প্রতি দয়া করো না!
বেদুইনের এমন অদ্ভুত দুআ থেকেই বোঝা যায়, তিনি বাকিদের ওপর কতটা বিরক্ত আর অসন্তুষ্ট ছিলেন। নবিজি তাকে সংশোধন করে দিয়ে বললেন, তুমি ব্যাপকতাকে সীমিত করে দিলে।
একবার এক যুবক সাহাবি নবিজির কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জিনা করার অনুমতি দিন!
ওই যুবক সাহাবি নবিজির এমন কোনো বন্ধু নন, মন চাইল, ইচ্ছে হলো- নবিজির কাছে প্রকাশ করে দেবেন। তা-ও আবার তিনি সাহাবিদের নিয়ে তখন মজলিসে বসা। সাহাবিরা তাকে ধমক দিলেন-থামো, থামো। তাঁরা এমনটাই বোঝাতে চাইলেন, তোমার এত্ত বড়ো সাহস? এসব তুমি কী বলছ?
ভাবা যায়, ওই যুবক সাহাবি নবিজিকে কতটা 'আপন মানুষ' হিসেবে চিত্য করেছেন? নিজের এমন ইচ্ছে আর খাহেশাতের কথাও তিনি নবিজির কাছে নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেছেন। এমন কথা তো এক বন্ধুও তার অন্য বন্ধুকে বলে না।
নবিজি তাকে কাছে ডাকলেন, এখানে এসো। খেয়াল করুন, সাহাবিরা তাকে ধমক দিলেন আর নবিজি তাকে কাছে যেতে বললেন। এখন কি তিনি সজোরে তার গালে দুটি চড় মারবেন? কিংবা সাহাবিদের বলবেন-একে ধরো, বেঁধে রাখো। শান্তি দিয়ে দেখিয়ে দাও, এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কেউ করতে চাইলে কী পরিণতি হয়।
না, নবিজি এর কোনোটাই করলেন না। আচ্ছা, ঠিক এই মুহূর্তে একটু ভাবুন তো-আপনি সাহস করে আপনার শিক্ষককে সবার সামনে তার মেয়ের সাথে প্রেম/বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন!
দেখুন, নবিজি কতটা সচেতনভাবে প্রশ্নের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি কোনো প্রকার বাজে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে স্বাভাবিক থাকলেন এবং তাকে পালটা প্রশ্ন করলেন-তুমি কি নিজের মায়ের জন্য এমনটা করতে পছন্দ করো, তুমি কি চাও অবৈধভাবে কেউ তার সাথে এটা করুক? সাহাবি উত্তরে বললেন-তিনি এটা পছন্দ করেন না, চান না। অতঃপর নবিজি তাকে বোঝালেন-তুমি যার সাথে এমনটা করবে, সে-ও তো কারও না কারোর মা।
এবার নবিজি আবার জিজ্ঞেস করলেন-তুমি কি চাও তোমার মেয়ের সাথে এমনটা হোক, সেটা তুমি পছন্দ করো? যুবক সাহাবি আবারও উত্তর দিলেন-না। নবিজি এবারও বোঝালেন, তুমি যার সাথে এমনটা করবে, সে-ও তো কারও না কারোর মেয়ে।
এভাবে নবিজি একে একে বোন, ফুফু, খালার উদাহরণ দিয়ে জিজ্ঞেস করে সমাধান দিলেন-তুমি যার সাথেই এমনটা করো না কেন, সে কারও না কারও মা, বোন, মেয়ে, খালা, ফুফু কিংবা রক্তের সম্পর্কের। তুমি যেমন নিজের কারও সাথে এমনটা হোক চাও না, তেমনই তারাও তো এমনটা চায় না।
কথাগুলো বলার পর নবিজির হাত যুবকের বুকে রাখলেন। এই অনুভূতিটাও খানিক চিন্তা করুন তো। যে কিনা জিনার মতো বড়ো পাপ কাজের অনুমতি প্রার্থনার জন্য নবিজির কাছে এসেছিল। আর তাকে বোঝানোর শেষে আবার নবিজি নিজেই তা বুকে হাত রাখছেন। চিন্তা করুন-নবিজি সেই হাত আমার- আপনার বুকে রাখছেন! কারণ, ওই যুবকের মতো অনুভূতি তো আমাদের প্রত্যেকেরই হয়। কখনো কখনো বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসলে এসব আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করি, নতুবা গোপন রাখি, ছাপিয়ে যাই।
নবিজি যুবকের বুকে হাত রেখে দুআ করলেন-হে আল্লাহ! আপনি তার গুনাহগুলো মাফ করে দিন, তার হৃদয়কে পবিত্র করে দিন এবং তাকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা করুন।
সেদিনের পর থেকে ওই যুবক সাহাবি আর কোনো দিন জিনার দিকে ঝোঁকেননি। নবিজি যে তাকে বুঝিয়েছিলেন, সেটা তার কতটা কাজে লেগেছিল এবং প্রভাবিত করেছিল। একবার ভাবুন, তিনি জিনা করার কথা মাথা থেকে একেবারেই বাদ দিয়ে দেন।
নবিজি কেবল মুসলিমদের দয়া দেখাতেন না। তাঁর সাথে শত্রুতা করত, এমন অমুসলিমদের প্রতিও তিনি দয়াশীল ছিলেন। এক ইহুদি বালক ছিল রাসূলুল্লাহর খাদেম। সে একবার গুরতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। নবিজি সাহাবিদের সাথে নিয়ে তাকে দেখতে গেলেন। অসুস্থ ইহুদি বালকের মাথার পাশে বসলেন এবং তার মাথায় হাত রাখলেন।
সে প্রায় সময় নবিজির খেদমত করত। যার ফলে তার প্রতি নবিজির একধরনের মমতাবোধ জন্মে। তিনি বুঝতে পারলেন ছেলেটি মৃত্যুশয্যায়। বেশিক্ষণ হয়তো বাঁচবে না।
নবিজি তাকে বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো। ইহুদি বালকের সামনে উপস্থিত ছিলেন তার পিতা। যে ছেলে সারাজীবন ইহুদি ছিল, এখন মৃত্যুর আগে পিতার সামনে পিতৃধর্ম পরিবর্তন করবে, কীভাবে সম্ভব?
নবিজি তাঁর ব্যবহারের মাধ্যমে কত মানুষের মন জয় করেছিলেন। এখন আবার তিনি একজন ইহুদির ঘরে গিয়ে তার ছেলেকে ধর্ম পরিবর্তন করতে বলছেন। স্বাভাবিকভাবে ইহুদি তো তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা! কিন্তু না। সেই ইহুদি ব্যক্তিটি নিজেই তার ছেলেকে বলছে, আবুল কাসিমের (নবিজির কুনিয়াত) কথা মেনে নাও।
বাবার কাছ থেকে সম্মতি পেয়ে ছেলে ইসলাম গ্রহণ করল এবং কিছুক্ষণ পর ছেলেটি ইন্তেকাল করল। নবিজি ইহুদির ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বললেন, যাবতীয় প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তাকে (বালকটিকে) জাহান্নাম হতে মুক্তি দিলেন।
একবার নবিজি সাহাবিদের সঙ্গে বসা ছিলেন। এই সময়ে একটি লাশ তাঁদের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর দেখাদেখি সাহাবিরাও দাঁড়িয়ে গেলেন। সাহাবিরা বুঝতে পারলেন, লাশটি একজন ইহুদির। তাঁরা নবিজিকে বললেন, এটা তো একজন ইহুদির লাশ? আপনি ইহুদির লাশের জন্য দাঁড়ালেন? নবিজি বললেন, (তাতে কী?) সে কি মানুষ নয়?
মনে করুন, আমরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। দেখতে পেলাম, মানুষজন লাশ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। হোক সেটা মুসলিম কিংবা অমুসলিমের লাশ। আমাদের উচিত-একপাশে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের সুযোগ করে দেওয়া; যেন লাশ নিয়ে তারা সহজে যেতে পারে।
নবিজির দয়ার কারণে তায়েফ শহরটি আজও ঠিকে আছে। নতুবা যেদিন তায়েফের লোকজন তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল, আল্লাহ সেদিন সেই শহর একেবারেই ধ্বংস করে দিতেন। জিবরাইল (আ.) নবিজিকে বলেন, আপনার কওম আপনাকে যা যা বলেছে তা আল্লাহ শুনেছেন। তিনি আপনার নিকট পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন। এদের সম্পর্কে আপনার যা ইচ্ছা তা-ই হুকুম দিতে পারেন।
পাহাড়ের ফেরেশতা এসে নবিজিকে সালাম দিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! এই ব্যাপারটি একান্তই আপনার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। আপনি যদি চান তাহলে আমি তাদের ওপর দুটি কঠিন শিলা-পাহাড় চাপিয়ে দেবো।
এই তো প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে যারা নবিজিকে রক্তাক্ত করে তাদের শহর থেকে বের করে দিয়েছে, এখন নবিজি চাইলে তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারেন। আল্লাহ নিজেই ফেরেশতা পাঠিয়ে তাঁকে সাহায্য করছেন। কিন্তু জবাবে রহমাতুল্লিল আলামিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-না; বরং আমি আশা করি-আল্লাহ তাঁদের বংশ থেকে এমন সন্তান জন্ম দেবেন, যারা আল্লাহর ইবাদত করবে আর তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।
কাফিররা নবিজিকে আঘাত করে রক্তাক্ত করে। অন্যদিকে কপোল বেয়ে পড়া রক্ত তিনি মুছতে থাকেন আর বলেন, হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন; যেহেতু তারা জানে না।
নবিজি কেবল মানুষের প্রতিই দয়াশীল ছিলেন না, তিনি পশু-প্রাণীদের প্রতিও দয়াশীল ছিলেন। একবার তিনি জনৈক আনসারি সাহাবির খেজুর বাগানে প্রবেশ করলেন। একটি উটের দিকে চোখ পড়তেই তিনি খেয়াল করেন, উটটি তাঁকে দেখে কাঁদতে শুরু করেছে। নবিজি উটের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেন, আর উটটি কান্না থামিয়ে দেয়।
নবিজি জানতে চাইলেন, এই উটের মালিক কে?
উটের মালিক ছিল এক আনসারি যুবক। সে নবিজির কাছে এলে তিনি তাকে বললেন-আল্লাহ যে তোমাকে এই নিরীহ প্রাণীটির মালিক বানালেন, এর অধিকারের ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? উটটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখো এবং কষ্ট দাও।
নবিজি আবার জীবের প্রতিই একপেশেভাবে দয়া করেননি, তিনি জড়পদার্থের প্রতিও দয়া দেখিয়েছেন।
মসজিদে নববিতে একটি খেজুরগাছের মিম্বর ছিল। যেখানে দাঁড়িয়ে নবিজি খুতবা দিতেন। নতুন মিম্বর আসার পর সেখান থেকে পুরোনো মিম্বরটি সরিয়ে রাখা হয়। কিছুক্ষণ বাদে শোনা যায় ওই খেজুরগাছের কাণ্ডটি কান্না করছে! সাহাবিরাও কান্না শুনতে পান। নবিজি নতুন মিম্বর থেকে নেমে খেজুর কাণ্ডের ওপর হাত রাখেন এবং জড়িয়ে ধরেন। অবশেষে সেটা কান্না থামায়!
এই ঘটনা বর্ণনা করে হাসান আল বসরি (রহ.) বলেন-এমনকি একটি খেজুরের কাণ্ড পর্যন্ত রাসূলের বিচ্ছেদে কান্না করেছে, আমরা কি তাঁর বিচ্ছেদে কান্না করব না?
ইসলামি শরিয়াহ আমাদের বলে অন্যের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে। সে হোক মুসলিম-অমুসলিম কিংবা অন্য কোনো প্রাণী। আপনার প্রতিবেশী কোনো অমুসলিম অসুস্থ হয়ে পড়লে, বিপদে পড়লে তাকেও সহযোগিতা করতে হবে। যেকোনো বিপদে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। একইভাবে গৃহপালিত প্রাণীর প্রতিও দয়া প্রদর্শনসহ তাদের ঠিকমতো পরিচর্যা করতে হবে এবং খাবার দিতে হবে।
এখনকার সময়ে কেউ কেউ বলে থাকে-মুমিন কোমল হৃদয়ের অধিকারী হতে পারে না, মুমিনকে কঠিন হৃদয়ের অধিকারী হতে হয়। এটা ভুল কথা, অবশ্যই এটা ভুল কথা। যখন যেখানে কঠোর হওয়া দরকার, আমরা কঠোর হব। কিন্তু আমাদের স্বভাবত গুণ হওয়া উচিত কোমলপ্রাণ। মুমিনের স্বভাবজাত গুণই হলো কোমলতা; কখনোই কঠোরতা নয়। প্রয়োজনসাপেক্ষে আমরা কঠোর হব, কিন্তু আমাদের সার্বক্ষণিক আচরণ হবে নরম-কোমল।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।'
আল্লাহ হলেন রহিম-রহমান, তিনি তাঁর রাসূলকে মানবজাতির হিদায়াতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ নিজে দয়ালু, তিনি দয়াশীলতা পছন্দ করেন। আমরা যদি আল্লাহর অনুগ্রহ পেতে চাই, আমাদেরও মানবজাতির প্রতি দয়াশীল আচরণ করতে হবে।

টিকাঃ
১৪৪ সূরা আলে ইমরান: ১৫৯
১৪৫ সূরা আত-তাওবা: ১২৮
১৪৬ জামে আত-তিরমিজি: ১৯২৪
১৪৭ সহিহ বুখারি: ৫৯৯৭
১৪৮ সহিহ বুখারি: ৩৪৯
১৪৯ সহিহ বুখারি: ৮৮৭
১৫০ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৬৯০
১৫১ সহিহ বুখারি: ২০১২
১৫২ সহিহ মুসলিম: ৫৪৮
১৫৩ সহিহ বুখারি: ২২০
১৫৪ সুনানে আবু দাউদ: ৩৮০
১৫৫ মুসনাদে আহমাদ: ২২২১১
১৫৬ সহিহ বুখারি: ১৩৫৬
১৫৭ সহিহ বুখারি: ১৩১২
১৫৮ সহিহ বুখারি: ৩২৩১
১৫৯ সহিহ বুখারি: ৩৪৭৭
১৬০ সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪৯
১৬১ সহিহ বুখারি: ২০৯৫
১৬২ সূরা আম্বিয়া : ১০৭

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 কৃতজ্ঞতাবোধ

📄 কৃতজ্ঞতাবোধ


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ।
এই গুণটি মুমিনের অন্যতম একটি গুণ। একজন মুমিন স্বভাবতই সব সময় কৃতজ্ঞ থাকে। সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ, যারা তার সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ায় তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ। কিন্তু পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাঁর খুব কমসংখ্যক বান্দাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। যে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, হাত-পা-চোখ দান করেছেন, রিজিক দেন, সেই আল্লাহর প্রতি মানুষ কীভাবে অকৃতজ্ঞ হতে পারে?
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন- 'অবশ্যই আমি তাকে পথপ্রদর্শন করেছি। হয় সে কৃতজ্ঞ, না হয় অকৃতজ্ঞ। '
কৃতজ্ঞতার আরবি হলো 'শুকুর' বিপরীত দিকে অকৃতজ্ঞতার আরবি হলো 'কুফর'। আল্লাহকে অবিশ্বাস করা, অস্বীকার করা যেমন কুফর; তেমনই আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা বোঝাতেও কুফর শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
আমাদের সামনে উন্মুক্ত পথ। হয় আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হব, নতুবা তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ থাকব।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার শুনলেন, এক লোক দুআ করছে, হে আল্লাহ! আমাকে অল্পসংখ্যকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন! উমর (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, অল্পসংখ্যক মানে কী? কারা অল্পসংখ্যক? তখন লোকটি খলিফাকে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান- 'আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। '
লোকটির বুদ্ধিমত্তা দেখে খলিফা বললেন, সবাই আমার চেয়ে কত বেশি জানে! কৃতজ্ঞতাবোধের গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা যে শুধু আল্লাহর প্রতিই কৃতজ্ঞতা আদায় করব, এমন না। মানুষের প্রতিও আমাদের এ বোধ থাকবে। যদি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতার হক আদায় করতে পারি, তাহলে আল্লাহর প্রতিও আমরা আদায় করতে পারব। যে পারে, সে দুটিই পারে। যে পারে না, সে একটিও পারে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
একই হাদিসে নবিজি আরও বলেন-যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়। আপনি যদি আল্লাহর ইবাদত একাগ্রতার সহিতও করেন, কিন্তু বান্দার হক পরিপূর্ণভাবে আদায় না করতে পারেন, মানুষকে কষ্ট দেন; তাহলে এর জন্য পরকালে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। রাসূলুল্লাহর আরেকটি হাদিস থেকে এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়।
জনৈক সাহাবি একবার নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এক নারী অত্যধিক নামাজ-রোজা ও দানের জন্য সুপরিচিত। কিন্তু সে কথার মাধ্যমে তার প্রতিবেশীকে আঘাত করে, কষ্ট দেয়। তার ব্যাপারে আপনি কী বলেন? রাসূলুল্লাহ বললেন, সে জাহান্নামি।
সাহাবি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আরেকজন নারী কম রোজা রাখে, দানও কম করে এবং নামাজও কম পড়ার ব্যাপারে লোকসমাজে সে প্রসিদ্ধ। বলতে গেলে এক টুকরো পনিরই দান করে। কিন্তু প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না, তার ব্যাপারে আপনি কী বলেন? নবিজি বললেন, সে জান্নাতি।
একজন মানুষ কীভাবে নিজেকে আল্লাহর ওলি দাবি করতে পারে? যে কিনা নিয়মিত নামাজ পড়ে, অথচ মানুষের সাথে প্রতারণা করে, কষ্ট দেয়-এমন একজন মানুষ কি ওলি হতে পারে? আল্লাহর প্রিয়ভাজন হওয়ার জন্য তো অবশ্যই ‘অলরাউন্ডার’ হতে হবে। ইবাদত যেমন করতে হবে, পাশাপাশি মানুষের হকও আদায় করতে হবে, যা আদায় করা সম্ভব কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মাধ্যমে। কৃতজ্ঞতা মূলত তিন প্রকার। সেগুলো হলো-
ক. অন্তর। খ. জবান ও গ. আমলের কৃতজ্ঞতা।

টিকাঃ
১৬৩ সূরা সাবা: ১৩
১৬৪ সূরা দাহর: ৩
১৬৫ সূরা সাবা: ১৩
১৬৬ মুসান্নাফে আবি শায়বা: ২৯৫১৪
১৬৭ সুনানে আবু দাউদ: ৪৮১১
১৬৮ সুনানে আবু দাউদ: ৪৮১১
১৬৯ মুসনাদে আহমাদ: ৯২৯৮

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 জবানের হেফাজত

📄 জবানের হেফাজত


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-'অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়াবনত আর যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে বিমুখ। '
একজন মুমিন অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হয় না। কোথাও অনর্থক কথা হচ্ছে শুনলে সে সেখান থেকে উঠে চলে যায়। বসে বসে কান পেতে এসব শোনে না। সূরা ফুরকানে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তারা বলে-সালাম।
আল্লাহ জানিয়ে দেন-যারা মুমিন, তারা মূর্খের কথায় কান দেয় না। তারা তাকে উত্তেজিত করতে চাইলেও সে তাদের সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হয় না। সূরা ফুরকানেই কয়েক আয়াত পর আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যখন তারা অনর্থক কথাকর্মের পাশ দিয়ে চলে, তখন তা পরিহার করে চলে। '
মুমিন যখন দেখতে পায় রাস্তার পাশে মানুষজন অন্যের গিবত করছে, হোটেলে বসে আরেক বাড়ির দোষত্রুটি তুলে ধরছে, তখন ওই মজলিসে সে আর বসে না; বরং সেখান থেকে উঠে যায়।
মুমিন কী শুনবে, কী দেখবে এ ব্যাপারে যেমন সচেতন থাকে, তেমনই কোথায় কী বলবে, এ ব্যাপারেও সে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করে। কেননা, তার প্রতিটি কথা প্রতি মুহূর্তে ফেরেশতাগণ লিপিবদ্ধ করছেন। আল্লাহ বলেন- 'সম্মানিত লেখকবৃন্দ! তারা জানে, তোমরা যা করো。
কথা বলার সময় আমরা কী বলছি সেই ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। এর জন্য আমরা নাজাত লাভ করতে পারি আবার আমাদের পাকড়াও করা হতে পারে। একবার নবিজিকে উকবা ইবনে আমর (রা.) জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মুক্তির উপায় কী? নবিজি তিনটি মুক্তির উপায় বলেন। সেগুলো হলো-
ক. তুমি তোমার জবানের হেফাজত করো।
খ. তোমার বাসস্থান যেন তোমার জন্য প্রশস্ত হয় এবং
গ. তোমার গুনাহের জন্য কান্না করো。
লক্ষ করুন, নবিজি মুক্তির তিনটি উপায়ের মধ্যে প্রথম উপায় বলেন, জবানের হেফাজত।
-আরেকবার মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) নবিজিকে জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! এমন একটি আমল আমাকে জানিয়ে দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং জাহান্নাম হতে দূরে রাখবে।
-নবিজি তাঁকে উপদেশ দেওয়ার পর বললেন, আমি যা বললাম, সেগুলোর সারসংক্ষেপ বলব?
-মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বললেন, জি, বলুন।
-অতঃপর নবিজি তাঁর জিহ্বা ধরে বললেন, এটা সংযত রাখো।
-মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বেশ অবাক হলেন এবং তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা যে কথাবার্তা বলি, এগুলোর সম্পর্কেও কি জবাবদিহি করতে হবে?
-নবিজি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে আরবের প্রচলিত একটি প্রবাদ বললেন, হে মুয়াজ! তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! মানুষকে কেবল জিহ্বার উপার্জনের কারণেই জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে!
মানুষ তার জবান দিয়ে মিথ্যা বলে। অন্যকে অপবাদ দেয়। গিবত করে। মানুষকে খোঁটা দেয়। গালাগাল করে। তার জিহ্বার কারণে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে অথবা এই জিহ্বার কারণেই সে জান্নাত লাভ করবে। নবিজি বলেন, তোমাদের মধ্যে যাদের চরিত্র ও আচরণ সর্বোত্তম, তারাই আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। কিয়ামতের দিন তারা আমার খুব নিকটে থাকবে। (অন্যদিকে) তোমাদের মধ্যে যারা আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণ্য, কিয়ামতের দিন তারা আমার থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে। তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হবে এমন-
ক. বাচাল।
খ. ধৃষ্ট-নির্লজ্জ এবং
গ. অহংকারে মত্ত ব্যক্তি。
বাচাল এবং সব ব্যাপারে যারা কথা বলে, নবিজি তাদের নিন্দা করেন। যে কিনা সব ইস্যুতেই লেখালিখি করে, কথা বলতে চায়—অবশ্যই সেখানে তার ভুল হবে। পরবর্তী সময়ে কথার আর গুরুত্ব থাকবে না। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন—কোনো কিছুকে যদি জেলে নিতে হয়, তাহলে সেটা হলো জিহ্বা。
একজন মুমিন অবশ্যই তার জিহ্বাকে সংযত করবে। সে যা বলে তাকে জেনেবুঝে বলতে হবে। তারপরও কিছু ব্যাপারে তাকে অতিরিক্ত সচেতনতা অবলম্বন করা উচিত। সেগুলো হলো—
মিথ্যা বলা: মিথ্যা বলা কখনোই মুমিনের গুণাবলি হতে পারে না। একজন মুমিন মিথ্যা বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। মিথ্যা বলার পরিণাম নিয়ে পূর্বের একটি অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
বিতর্কে লিপ্ত হওয়া: এই ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হতে হবে। কেউ কিছু বললেই যেন আমরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়ি, বিতর্কে জড়িয়ে না যাই। নবিজি বলেন, কোনো সম্প্রদায় হিদায়াতের রাস্তা পেয়ে আবার পথ ভোলা হয়ে থাকলে, তা শুধু তাদের বিবাদ ও বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার কারণেই。
আপনি প্রয়োজন উপলব্ধি করে মানুষের সাথে বিতর্কে নামুন। আশেপাশের অনেকেই অনেক ভুল কথা বলবে, ভুল বক্তব্য দেবে। তাই বলে সারাক্ষণ যদি আপনি বিতর্কে লিপ্ত থাকেন, দেখা যাবে—আর কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন না। নামাজে গেলেও বিতর্কের কথা বারবার মনে পড়বে।
মানুষকে উপহাস করা: মানুষকে নিয়ে হাসি-তামাশা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেককেই দেখা যায়—কারও সাথে কথা বলা শুরু করলে অন্যের দুর্বলতা নিয়ে কথা বলে। খোঁচা দেয়। খোঁটা দেয়। মনে রাখবেন, এগুলো কখনোই মুমিনের বৈশিষ্ট্য না।
অন্যকে খোঁটা দেওয়া: অনেকেই এমন আছে, কারও উপকার করলে একসময় স্মরণ করিয়ে দেয়—মনে আছে, তুমি বিপদে পড়েছিলে। আমি টেনে তুলেছিলাম।
আর এখন তুমি আমার মুখের ওপর কথা বলো? সারাজীবন তোমাকে দান করলাম, এখন আমার ওপর কথা বলবে? এগুলোর মাধ্যমে আপনি যে উপকার করেছেন, সেই উপকারের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। নেক আমল ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'হে মুমিনগণ! খোঁটা কিংবা কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের দান নষ্ট করো না।'
গিবত ও নামিমাহ: দুটি আলাদা বিষয়, কিন্তু এখানে আমি একত্রে উল্লেখ করলাম। গিবত করা থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে মনে করি, আমি তো সত্য বলছি। মূলত এই ধরনের সত্য বলে অন্যের নিন্দা করাটাও গিবতের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো।'
তাহলে গিবত কী? নবিজি গিবতের এমন স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়ার পর সেটা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকার কথা নয়। নবিজি একদিন সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন-তোমরা কি জানো, গিবত কী? উত্তরে সাহাবিরা বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। অতঃপর রাসূলুল্লাহ গিবতের সংজ্ঞা দিলেন, গিবত হলো তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে।
এমন স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়ার পরও সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন-আমি যা বলছি, সত্যিই যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে এমন কিছু থাকে? এ কথা শুনে নবিজি সাহাবিদের সন্দেহ দূর করে বললেন-তুমি তার সম্পর্কে যা বলছ, তা যদি সত্যিই তার মধ্যে থেকে থাকে, তাহলে তো তুমি গিবতই করলে। আর যদি তার মধ্যে না থাকে, তাহলে তো তুমি তার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দিলে। কারও গিবত শোনার পর আপনি যদি ওই লোকটিকে গিয়ে বলেন-জানো, অমুক তোমাকে কী বলেছে; তাহলে সেটা হবে নামিমাহ।
অশ্লীল কথা ও গালাগাল: একজন মুমিন কাউকে গালি দেয় না, কটু কথা বলে না; সব সময় সে তার জবানের হেফাজত করে। কেউ তাকে গালি দিলেও প্রত্যুত্তরে সে তা ফিরিয়ে দেয় না। মুমিনের ব্যাক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে নবিজি বলেন-
ক. মুমিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না।
খ. অভিসম্পাতকারী হতে পারে না।
গ. অশ্লীল ও গর্হিত কাজ করতে পারে না এবং
ঘ. কটুভাষীও হয় না。
আবু বকর, উমর, উসমান ও আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের জীবনী পড়লে আমরা দেখতে পাই-তাঁরা কটুভাষী ছিলেন না, কখনোই অন্যকে দোষারোপ করতেন না, গালাগাল করতেন না। অপর দিকে তাঁরা জীবনের নানান প্রান্তে বহু কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন এবং সেসব সামাল দিয়েছেন দৃঢ়তার সহিত। তবুও তারা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাত্রায় ছিলেন মহান।
আমাদের এখনকার তরুণরা মনে করে গালাগাল করাটাও একধরনের স্মার্টনেস। এটা ভুল ধারণা। মুমিনের স্মার্টনেস হলো উত্তম কথা বলা, সুন্দর-কোমল ভাষায় অন্যকে সম্বোধন করা। নবিজি খুব সংক্ষেপে আমাদের জবান হেফাজতের ব্যাপারে একটি উপদেশ দেন। তিনি বলেন-যে নীরব থাকল, সে নাজাত লাভ করল。
মুমিন কখনো বাচাল হতে পারে না। সে নীরবতাকে বেছে নেয়। যখন যেখানে কথা বলার প্রয়োজন, শুধু সেখানেই বলে। এই ব্যাপারে নবিজি আরেকটি হাদিসে বলেন-যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে。
মুমিন নিজে যেমন অনর্থক কথা বলে না, তেমনই অনর্থক কথা শুনতেও পছন্দ করে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-যখন তারা অনর্থক কথা-কর্মের পাশ দিয়ে চলে, তখন তা পরিহার করেই চলে। নবিজি এ ব্যাপারে সতর্ক করে আমাদের বলেন, আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া বেশি কথা বলো না। কেননা, আল্লাহ তায়ালার জিকির ছাড়া বেশি কথা বললে অন্তর কঠিন হয়ে যায়। আর নিঃসন্দেহে কঠিন অন্তরের লোকই আল্লাহ তায়ালা থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে。

টিকাঃ
১৭৯ সূরা মুমিনুন: ১-৩
১৮০ সূরা ফুরকান: ৬৩
১৮১ সূরা ফুরকান: ৭২
১৮২ সূরা ইনফিতার: ১১-১২
১৮৩ জামে আত-তিরমিজি: ২৪০৬
১৮৪ জামে আত-তিরমিজি: ২৬১৬
১৮৫ জামে আত-তিরমিজি: ২০১৮
১৮৬ আল মাজমু আল কাবির: ৮৭৪৫
১৮৭ জামে আত-তিরমিজি: ৩২৫৩
১৮৮ সূরা বাকারা: ২৬৪
১৮৯ সূরা হুজুরাত: ১২
১৯০ সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৭
১৯১ জামে আত-তিরমিজি: ১৯৭৭
১৯২ জামে আত-তিরমিজি: ২৫০১
১৯৩ সহিহ মুসলিম: ৮০
১৯৪ জামে আত-তিরমিজি: ২৪১১

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 অন্যকে সালাম দেওয়া

📄 অন্যকে সালাম দেওয়া


মুমিনের একটি সহজ গুণ হলো, সে অন্যকে সালাম দেয়। কারও জন্য অপেক্ষা করে না, কেউ তাকে সালাম দেবে। অন্য কেউ তাকে সালাম দেওয়ার আগে সে নিজেই সালামের সূচনা করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর প্রথম যে ভাষণ দেন, সেখানে তিনি বলেন-হে মানুষগণ! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাদ্য দান করো, মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ আদায় করো। তাহলে নিশ্চয়ই তোমরা সহজে জান্নাত লাভ করবে।
মদিনার হিজরতের পর নবিজির প্রথম নির্দেশ ছিল-সালামের প্রসার ঘটাও। যাকে দেখবে, তাকে সালাম দিতে হবে। এমন নির্দেশনাই তিনি দিয়েছেন।
একবার এক সাহাবি নবিজিকে জিজ্ঞেস করেন, ইসলামের কোন কাজ সর্বোত্তম? উত্তরে নবিজি বলেন, তুমি লোকদের খাদ্য খাওয়াবে এবং চেনা-অচেনা সকলকে সালাম দেবে।
আপনি কী রকম পোশাক পরে আছেন এর ওপর নির্ভর করছে না আপনার ইসলাম কেমন, আর শ্রেষ্ঠ কি না। ইসলাম ঠিকমতো পালন হচ্ছে কি না, তা নির্ভর করছে আপনার আমলের ওপর, কর্মের ওপর। অর্থাৎ সর্বোত্তমভাবে আপনি মানুষকে খাওয়াচ্ছেন কি না, খোঁজখবর রাখছেন কি না, মানুষকে সালাম দিচ্ছেন কি না এবং এর প্রসার ঘটাচ্ছেন কি না।
আমরা সাধারণত চেনা-পরিচিত মানুষদের সালাম দিই। অচেনাদের সালাম দিই না। সুড়সুড় করে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাই। এটা ঠিক না। নবিজি জানিয়ে দেন, চেনা-অচেনা সবাইকে সালাম দিতে হবে। আমি যদি বুঝতে পারি যিনি আমার পাশ অতিক্রম করছেন তিনি মুসলিম, তাহলে তাকে সালাম দেবো; তাকে না চিনলেও সালাম দেবো।
মুসলিমের ওপর মুসলিমের হক ছয়টি। তার মধ্যে একটি হক হলো, কারও সাথে দেখা হলে সালাম দেওয়া। কেউ যদি আপনাকে 'আসসালামু আলাইকুম' বলে, তাহলে আপনার ওপর সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব। নবিজি বলেন, এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের হক পাঁচটি। তার মধ্যে একটি হলো- সালামের জবাব দেওয়া। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-
'আর যখন তোমাদের সালাম দেওয়া হবে, তোমরা তারচেয়ে উত্তম সালাম দেবে অথবা জবাবে তা-ই বলবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে পূর্ণ হিসাব গ্রহণকারী।'
কেউ যদি আপনাকে 'আসসালামু আলাইকুম' বলে, জবাবে আপনি বলুন 'ওয়ালাইকুমুস সালাম'। অথবা ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ বা ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আপনি যেভাবে সালাম দেবেন, তার ওপর আপনার সওয়াব নির্ভর করবে।
• আসসালামু আলাইকুম বললে ১০ নেকি
• আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ বললে ২০ নেকি
• আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ বললে ৩০ নেকি পাবেন。
আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ বললেন, তুমি ফেরেশতাদের সালাম দাও এবং তাঁরা সালামের জবাবে কী বলে সেটা মনোযোগের সাথে শুনবে। কারণ, এটাই হবে তোমার ও তোমার বংশধরের সম্ভাষণ。
এজন্য আমরা দেখতে পাই, ইবরাহিমি ধর্মের অনুসারীদের সম্ভাষণ হলো সালাম। ইহুদিরা বলে-সালমালিকুন, খ্রিষ্টানরাও একই কথা বলত বলে জানা যায়। নবিজি বলেন, ঈমানদার ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো না, কী করলে তোমাদের পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? শুনে রাখো, তা হলো-তোমরা পরস্পর বেশি বেশি সালাম বিনিময় করবে。
এই হাদিসটি শুরু হয়েছে 'কী করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে' এই কথার মধ্য দিয়ে। শেষ হয়েছে সালাম বিনিময়ের নির্দেশ দিয়ে। অর্থাৎ, জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম একটি সহজ রাস্তা হলো বেশি বেশি সালাম বিনিময় করা। যখন কাউকে সালাম দিই, এর মানে কী দাঁড়ায়?
ক. 'আস-সালাম' হলো আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম। যখন কাউকে সালাম বলি, তার মানে আমি তার জন্য দুআ করি-আল্লাহ তোমাকে শান্তিতে রাখুন, নিরাপদ রাখুন, তোমার কল্যাণ করুন।
খ. সালাম করা মানে তার জন্য দুআ করা। সালাম মানে যেমন শান্তি, তেমনই এর আরেকটি অর্থ হলো ক্ষতি মুক্ত। আমি তাকে জানাচ্ছি-তোমার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, তোমার ওপর যেন কোনো বিপদ না আসে, তোমার দুশ্চিন্তা যেন কমে যায়।
গ. আমি যখন অন্যের বিপদমুক্ত, কষ্টমুক্ত, দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার প্রার্থনা করছি, তখন এমনিতেই তাকে জানিয়ে দিচ্ছি-অন্তত তোমার কোনো ক্ষতি আমি করব না। তুমি আমার দিক থেকে নিরাপদ। একজনকে বললাম, তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। এটা বলার পর আমি কীভাবে তার জীবনে অশান্তির কারণ হতে পারি? তার পাওনা টাকা দিচ্ছি না, তার নামে গিবত করছি, তার দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছি, তাকে শারীরিক-মানসিক আঘাত করছি। এমনটা করলে তো বোঝা গেল, আমি বলছি এক আর করছি আরেক!
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) প্রায় সময় বাজারে যেতেন, কিন্তু তেমন কিছু কিনতেন না। লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করত-আপনি তো কিছু কেনেন না, তারপরও বাজারে যান কেন? জবাবে তিনি বলতেন, যাতে আমি আমার ভাইদের সালাম দিতে পারি।
সালাম দেওয়া এমন একটা গুণ, যে কেউ তা অর্জন করতে পারি। এটা খুবই সহজ। আমরা অপেক্ষায় থাকব না, কেউ আমাদের সালাম দিচ্ছে কি দিচ্ছে না। কেউ সালাম দেওয়ার আগেই আমরা তাকে সালাম দেবো।
নবিজি সব সময় আগে সালাম দিতেন; এমনকি শিশুদেরও সালাম দিতেন। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, মদিনার পথে একদল শিশু খেলা করছিল। নবিজি তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দেন。
আল্লাহ হলেন 'আস-সালাম'। তিনি আমাদের দান করবেন-'দারুস সালাম' (জান্নাতের একটি নাম হলো দারুস সালাম; কারণ, সেখানে কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই)। আমাদের ধর্মের নামও ইসলাম। নবিজি সব সময় চাইতেন আমরা যেন সালাম দিই।
তার মানে এই কথা প্রমাণ হয়-আমরা যদি সালাম দিই, ইসলামের অনুশাসন মেনে চলি, তাহলে 'আস-সালাম' আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে দারুস সালাম দান করবেন। জান্নাতে প্রবেশের পর ফেরেশতারা জান্নাতিদের অভ্যর্থনা জানাবেন সালামের মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
'আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে, তাদের দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে এসে পৌঁছবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হবে, তখন জান্নাতের রক্ষীরা তাদের বলবে-তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা ভালো ছিলে। অতএব, স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এখানে প্রবেশ করো।'

টিকাঃ
২১৬ জামে আত-তিরমিজি: ২৪৮৫
২১৭ সহিহ বুখারি: ২৮
২১৮ সহিহ মুসলিম: ৫৫৪৪
২১৯ সহিহ বুখারি: ১২৪০
২২০ সূরা নিসা: ৮৬
২২১ জামে আত-তিরমিজি: ২৬৮৯
২২২ সহিহ বুখারি: ৬২২৭
২২৩ সহিহ মুসলিম: ৯৮
২২৪ সহিহ বুখারি: ৬৩৪৭
২২৫ সূরা জুমার: ৭৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00