📘 মুমিনের আখলাক > 📄 ইসলাম নিয়ে গর্ববোধ করা

📄 ইসলাম নিয়ে গর্ববোধ করা


একজন মুমিন সব সময়ই তার ধর্ম নিয়ে গর্ববোধ করে। ইসলাম নিয়ে কখনোই হীনম্মন্যতায় ভোগে না। এটি মুমিনের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। কেউ কেউ মনে করতে পারেন-ইতঃপূর্বে আমি মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য বলেছি বিনয় দেখান। এখন যদি বলি আরেকটি বৈশিষ্ট্য গর্ব করা। তাহলে দুটি বৈশিষ্ট্য বিপরীত হয়ে গেল না?
না, এই দুটি বৈশিষ্ট্য পরস্পর বিপরীত না। মুমিন যখন নিজের ধর্ম নিয়ে গর্ব করবে, তখন সে নিজেকে নিয়ে গর্ব করবে না। সে বলবে না, আমি অন্যের চেয়ে ভালো মুসলিম বা বেশি আমলদার। সে গর্ব করবে এই ভেবে-আমি যে ধর্মের অনুসরণ করি, এই ধর্মই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। সে বলবে-আল্লাহ আমাকে এমন এক ধর্মের অনুসারী বানিয়েছেন, যে ধর্ম তাঁর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য। এই গর্বের কারণ সে নিজে না; বরং সে যা অনুসরণ করে তা। কুরআনে আল্লাহ বলেন- 'যে সম্মান চায়, তার জানা উচিত-আল্লাহর জন্যই সকল সম্মান।
সকল সম্মান আল্লাহর কাছেই। এই সম্মান আল্লাহ কাকে দেন? পবিত্র কুরআনে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন- 'সম্মান তো আল্লাহরই; আর তাঁর রাসূল ও মুমিনদের।'
সম্মানবোধ আর অহংকারের মধ্যে পার্থক্য আছে। ইসলাম নিয়ে গর্ব করা, নিজেকে সম্মানিত মনে করা আর অহংকার করা এক না। আমি যখন ইসলাম নিয়ে গর্ব করব, এর মানে দাঁড়ায়, আমি বলছি-আল্লাহ আমাকে ইসলামের পথ দেখিয়েছেন। আমি সুমহান দ্বীনের পথ অনুসরণ করছি, যে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে নবি-রাসূলগণ এসেছিলেন। এটা আমার কৃতিত্ব না। আমি এর জন্য অহংকার করছি না; বরং গর্ববোধ করছি। অহংকারের সঙ্গে 'আমার' কোনো সম্পর্ক নেই, আমি কীসের অনুসরণ করছি সম্পর্ক সেটার সাথে। এই ধরনের গর্ববোধ, আত্মসম্মান প্রত্যেক মুমিনের থাকা উচিত। একজন মুমিন কখনোই তার ধর্ম নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে না। নবিজি বলেন, কোনো মুমিন ব্যক্তির জন্য নিজেকে অপমানিত করাটা শোভনীয় নয়।
কেউ যদি কখনো ইসলাম নিয়ে হাসি-তামাশা করে, ধর্মের অবমাননা করে, অবশ্যই আমরা এর বিরুদ্ধে কথা বলব। কেউ যদি ধর্ম নিয়ে খোঁটা দেয়, সেখানে মুমিন কখনো লজ্জিত হতে পারে না। কারণ, তার ধর্ম নিয়ে সে আত্মবিশ্বাসী, প্রজ্ঞার সাথে এসব অপপ্রচারের জবাব দেবে।
অনেকেই দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য নিজের নাম, সন্তানের নামের সাথে ইসলামি কোনো নাম সন্নিবেশ করতে হীনম্মন্যতায় ভোগে। তারা মনে করে, যদি নামের সাথে ইসলামের কোনো নিদর্শন থাকে, তাহলে যদি ওই দেশে ঢুকতে না দেয়? দাড়ি রাখার দরুন যদি 'জঙ্গি' বলে, এই ভেবে অনেকেই দাড়ি রাখতে ভয় পায়। নামাজ পড়লে স্যার যদি কিছু মনে করেন, অফিসের বস যদি নারাজ হন-এই ভয়ে কেউ কেউ নামাজ পড়া বাদ দিয়ে দেয়।
তারা দ্বীনের চেয়ে মানুষকে বেশি মূল্য দেয়। দ্বীনের ব্যাপারে তারা আত্মবিশ্বাসী না। বিধিবিধান মানার ব্যাপারে গর্ববোধ করে না, কেমন যেন লজ্জাবোধ করে। এই ধরনের মনোভাব কোনো মুমিনের হতে পারে না।
রাসূল ও সাহাবিদের জীবনী পড়লে আমরা এমন দৃশ্য দেখতে পাই। তাঁদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। নামাজরত অবস্থায় ময়লা-আবর্জনা তাঁদের ওপর ঢেলে দেওয়া হয়েছে। আত্মীয়স্বজনকে করুণভাবে হত্যা করা হয়েছে। শারীরিক-মানসিক সব দিক থেকেই নির্যাতন করা হয়েছে। তবুও তাঁরা দ্বীনের ওপর অটল ছিলেন। কেউ তাঁদের আত্মবিশ্বাস থেকে সামান্য পরিমাণও টলাতে পারেনি।
এখনকার সময়ে দেখা যায়, ব্যক্তি তার সমাজ এবং দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করে। সব সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, অপ্রথম ও প্রধান পরিচয় হলো আমরা মুসলিম। বাকি অন্যান্য পরিচয় হলো মুসলিম পরিচয়ের পরের পরিচয়। এখন কেউ কেউ ভাবতে পারেন, তাই বলে কি আমরা দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করব না?
হ্যাঁ, অবশ্যই করবেন। তবে সেটা শর্তযুক্ত। ইসলাম আপনাকে যতটুকুর অনুমোদন দিয়েছে, ঠিক ততটুকুই। ধরুন, বাংলাদেশে পদ্মার ইলিশ পাওয়া যায়। এই ইলিশ খেতে এতই সুস্বাদু, পৃথিবীর অনেক দেশে নানান নদীর ইলিশ খেয়ে আপনি এতটা মজা পাননি। এজন্য গর্ববোধ করতে পারেন- আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে এমন এক দেশে বসবাসের সুযোগ দিয়েছেন, যে দেশের ইলিশ পৃথিবীর সব দেশের ইলিশের চেয়ে সুস্বাদু।
কিন্তু আপনি যেই মুহূর্তে আরেকটি দেশের মানুষের চেয়ে নিজেকে উত্তম মনে করবেন, অমুক লোকটি আরেক দেশে জন্মগ্রহণ করেছে বলে তাকে আপনার চেয়ে হীন মনে করবেন-সেটা সমস্যাজনক, ভেতরে অহংবোধের জন্ম নেবে।
ধরুন, আপনি ভাবছেন-অমুক ব্যক্তি পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছে বলে খারাপ বা সৌদি আরবের কেউ যদি মনে করে অমুক মুসলিম লোকটা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে বিধায় সে খারাপ মুসলিম; এটা বর্ণবাদী মনোভাব। আবার আপনি যদি মনে করেন-আপনার গায়ের রঙের কারণে আপনি নাইজেরিয়ার মানুষের চেয়ে উত্তম, তাহলে আপনি বর্ণবাদী। তেমনই ইউরোপের কেউ যদি মনে করে তারা তাদের গায়ের রঙের কারণে পৃথিবীর বাকিদের চেয়ে উত্তম এবং সেরা; এটাও বর্ণবাদী মনোভাব। আমাদের একমাত্র শর্তহীন আনুগত্য ইসলামের জন্য। অন্য কোনো পরিচয়ের ক্ষেত্রে আমরা এমন আনুগত্য দেখাব না।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার জেরুজালেম যাবেন বলে প্রস্তুতি নেন। তাঁর হাতে হস্তান্তর করা হবে বায়তুল মুকাদ্দাসের চাবি। রওনা হন জীর্ণশীর্ণ জামা পরে। সাহাবিরা তাঁকে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন একটি ভালো জামা পরেন। কারণ, তিনি একটি বিত্ত ও সমৃদ্ধশালী অঞ্চলে যাচ্ছেন, সেখানে অনেক লোক আসবে তাঁর সাথে দেখা করতে। এমন পোশাক দেখে বাকিরা হয়তো তাঁকে অবজ্ঞা করতে পারে। সাহাবিদের পরামর্শ উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আমলে নিলেন না। তিনি বললেন, আমরা ছিলাম সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি। আল্লাহ আমাদের ইসলাম দ্বারা সম্মান দান করেছেন। সুতরাং, আল্লাহ আমাদের যা দ্বারা সম্মান দান করেছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো জিনিস দ্বারা যখন আমরা সম্মান অনুসন্ধান করব, তখনই তিনি আমাদের লাঞ্ছিত করবেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ, সম্মানিত, বিপুল সম্পদে ভরপুর অঞ্চলে যাওয়ার সময় পোশাক পরিবর্তন করেননি। যে ধরনের পোশাক পরে নবিজির যুগ, সাহাবিদের যুগ কাটান, সেই ধরনের পোশাক পরেই তিনি জেরুজালেম যান। কারণ, তিনি মনে করতেন, পোশাকের সাথে সম্মানের সম্পর্ক নেই। সম্মানের সম্পর্ক ইসলামের সাথে।
ইসলাম নিয়ে কখনোই হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না। ইসলাম এমন কোনো ধর্ম না যে, হীনম্মন্যতায় ভুগবেন। কেননা, আমরা যখন ইসলাম মেনে চলব, আল্লাহ আমাদের সম্মান দান করবেন। ইসলাম ছাড়া অন্য কোথাও সম্মান তালাশ করলে সম্মান খুঁজে পাব না; বরং আল্লাহ আমাদের অপদস্থ করবেন।
নামাজের সময় হলে নামাজে যান। আপনার 'বস' কী মনে করবেন, শিক্ষক কী মনে করবে এটা ভাবলে তো হবে না। যানবাহনে নামাজ পড়া লাগলে সেখানেই নামাজ শুরু করুন। লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
আজ থেকে ২০ বছর আগের ঘটনা। আমি একবার এয়ারপোর্ট যাই এক জায়গায় যাব বলে। দেখলাম একজন মহিলা 'ইয়োগা' (ব্যায়ام) করছে। যাত্রা শুরুর আগে আধা ঘণ্টা বিরতি পেয়েছিল, বিরতির সময়টা সে কাজে লাগাচ্ছে ব্যায়াম করে।
সেদিনই আমার ভেতর এ কথার উদ্রেক হয়-একজন মহিলা দুনিয়াবি একটি কাজ জনসম্মুখে করতে ভয় পাচ্ছে না, তার সংকোচ হচ্ছে না, সামান্য লজ্জাও পাচ্ছে না। আমি কেন শ্রেষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের প্রয়োজনে জনসম্মুখে নামাজ পড়তে পারব না?
এমন কোনো পরিস্থিতি যদি আসে, যেখানে রাস্তার পাশে আমাকে নামাজ পড়তে হবে, দাঁড়িয়ে যাব। কে কী বলবে, কে কী মনে করবে ভাবলে চলবে না। তবে কাজটা আমার ধর্মে প্রতি অনুরাগ ও প্রজ্ঞার সাথে করতে হবে। আশপাশে কোনো সিকিউরিটি থাকলে তাদের জানিয়ে দেবো, আমি নামাজ পড়ছি। অন্য কিছু মনে করার কারণ নেই।
আপনি নামাজ পড়লে এ নিয়ে অনেকেই ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে পারে। এমনটা ভাববেন না যে, আপনিই প্রথম। ইসলামের শুরু থেকেই এহেন কর্ম হয়ে আসছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যখন তোমরা নামাজের দিকে আহ্বান করো, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। এর কারণ-তারা নির্বোধ। '
নির্বোধরা ইসলাম নিয়ে সমালোচনা করবে, নামাজ পড়া নিয়ে সমালোচনা করবে। তাই বলে নির্বোধের কথায় পাত্তা দিলে চলবে না। আমরা এমন এক ধর্মের অনুসরণ করি, যেই ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং এই ধর্ম নিয়ে আমরা গর্বিত।

টিকাঃ
১৩১ সূরা ফাতির : ১০
১৩২ সূরা মুনাফিকুন: ৮
১৩৩ জামে আত-তিরমিজি: ২২৫৪
১৩৪ মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪৪৮১
১৩৫ সূরা মায়েদা: ৫৮

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 লজ্জা : ঈমানের অঙ্গ

📄 লজ্জা : ঈমানের অঙ্গ


মুমিনের গুণাবলির মধ্যে অন্যতম একটি গুণ হলো লজ্জাশীলতা। যার মধ্যে লজ্জাবোধ নেই, তার ঈমান নেই। একজন মুমিনের মধ্যে অবশ্যই লজ্জাবোধ থাকা প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুসা (আ.)-এর ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে দুজন নারীর কথা উল্লেখ করেন। মুসা (আ.) ফেরাউনের দরবার থেকে পালিয়ে যখন মাদায়েন যান, তখন তাদের দেখতে পান। নারীদের একজনের হাঁটার ধরনের কথা উল্লেখ করে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অতঃপর নারীদ্বয়ের একজন লাজুকভাবে হেঁটে তার কাছে এসে বলল, আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন।'
এই নারী পরবর্তী সময়ে মুসা (আ.)-এর স্ত্রী হন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর লজ্জাশীলতার প্রশংসা করেন। তিনি যখন মুসা (আ.)-এর সাথে কথা বলতে আসেন, তখন এমনভাবে হেঁটে আসেন, তাঁর হাঁটার মধ্যে লাজুকতা প্রকাশ পাচ্ছিল। এই গুণটি আল্লাহ তায়ালা ভীষণ পছন্দ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ লজ্জাশীল, গোপনীয়তা অবলম্বনকারী। তিনি লজ্জা ও গোপনীয়তা পছন্দ করেন।
আমাদের সকল নবিই লজ্জাশীল ছিলেন। লজ্জাশীল ছিলেন স্ত্রীরাও। এ গুণ আল্লাহর কাছে প্রশংসনীয়। নবিজি বলেন, ঈমানের শাখা ৭০টিরও বেশি। আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।
একবার নবিজি সাহাবিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন এক সাহাবি আরেক সাহাবিকে বললেন, তুমি এত লজ্জা পাও, কীসের এত লজ্জা তোমার? রাসূলুল্লাহ তখন লজ্জাশীল সাহাবির প্রশংসা করে বলেন, লজ্জাশীলতায় কল্যাণ ছাড়া কোনো কিছু নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, লজ্জাশীলতা কী?
এমন কিছু থেকে বিরত থাকা, যে কাজ করলে অন্য কেউ আপনার সমালোচনা করতে পারে। সে তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ত্রুটি ঢেকে রাখতে চায়। অন্যের সামনে সেগুলো প্রকাশ করতে চায় না। নবিজি বলেন, প্রথম যুগের নবি-রাসূলগণের উক্তিসমূহের মধ্যে যা মানবজাতি লাভ করেছে, তন্মধ্যে একটি- যদি তোমার লজ্জা না থাকে, তাহলে তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করো।
নিম্নস্তরের কোনো কিছু করার শেষ লাইন হলো লজ্জা। আপনি কোনো পাপ কাজ করতে পারছেন সেটা এজন্য, কারণ লজ্জার সীমা অতিক্রম করেছেন। মানুষ যখন লজ্জার সীমা অতিক্রম করে, তখন খুব সহজেই পাপাচারে লিপ্ত হতে পারে।
আমরা এমন একসময়ে বসবাস করছি, যখন মানুষের মধ্য থেকে লজ্জা-শরম একেবারেই উবে গিয়েছে। এখনকার সময়ে লোকসম্মুখে স্বভাবতই কেউ যদি কোনো কিছু নিয়ে লজ্জা পায়, তাকে নিয়ে মানুষ ঠাট্টা করে। কেউ যদি বলে, আমি মেয়েদের দিকে তাকাই না। এ কথা শুনে তার বন্ধুরা হাসিতে ফেটে পড়ে। কারণ, যে বন্ধুটা লজ্জা পায়, তারা তাকে অদ্ভুত মনে করে! অথচ হওয়ার কথা ছিল এর উলটো। হাসিঠাট্টা নয়, বন্ধুকে কাছে ডেকে তার প্রশংসা করা উচিত ছিল।
আমি বড়ো হই আশির দশকে। যারা টিভি দেখত, আমার আম্মা-আব্বা তাদের সমালোচনা করতেন। বলতেন, আস্তাগফিরুল্লাহ! দেখো সে টিভি দেখছে।
অথচ আমাদের এই সময়ে এসে টিভি দেখা খাবার খাওয়ার মতো স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। চিন্তা করি-আমার সন্তানেরা যা দেখছে, যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযুক্ত হচ্ছে-ভবিষ্যৎ কেমন হবে, ভয় হয় তাদের নিয়ে। টিভি দেখাকে আমার আব্বা-আম্মা ভয় পেতেন। আর আমরা এখন ভয় পাচ্ছি তার চেয়েও কঠিন এবং বেশি কিছু নিয়ে।
এক প্রজন্মের মধ্যেই এত কিছুর বদল! মোটামুটি সবার মধ্য থেকে লজ্জাবোধ উবে গেল। ছোটোবেলায় দেখতাম সিনেমা দেখতে গিয়ে গানের সিন এলে টিভি বন্ধ করা হতো। আবার কয়েকজন উঠেও যেত। এখন টিভিতে পরিবারসহ সবাই মিলে যা যা দেখে, সেটা তখনকার সময়ের সাথে মেলালে কল্পনাই করা যায় না। আজ থেকে দুই যুগ আগের মানুষ এমনটা ভাবতেই জানত না।
আপনার ঘরে টিভি, মোবাইল না থাকলেও আপনি এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাবেন না। পরিবার-সন্তানদের নিয়ে যখন কোথাও বেড়াতে যাবেন, বিকেলে হাঁটতে রাস্তায় বেরোবেন, ভয়ংকর বিলবোর্ডের দিকে চোখ যাবে। স্মরণ করলে দেখা যাবে, বিলবোর্ডের এমন দৃশ্য আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগেও ছিল না।
হে মুসলিম সম্প্রদায়! আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই-আমরাই শেষ প্রজন্ম, যারা লজ্জাশীলতাকে ধারণ করে আছি। এক্ষেত্রে যদি আমরা ভুল করি, চর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারি, তাহলে মানবজাতির মাঝে যে লজ্জাশীলতা বলে একটা কিছু আছে, তা একেবারেই মুছে যাবে। পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীরা আমাদের মতো লজ্জাশীলতার চর্চা করে না। তাদের মাঝে লজ্জাবোধের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি যারা মূলধারা হিসেবে নিজেদের দাবি করে, ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মধ্যেও পাওয়া যায় না।
যখন সবার মাঝেই লজ্জাশীলতার অনুপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তখন আমাদের দায়িত্ব বেড়ে যায়। মানবজাতিকে জানিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় লজ্জাশীলতা কী? আমাদের সন্তানদের লজ্জার বিষয়টি শেখাতে হবে। যদিও নিজেদের মধ্যে এর চর্চা অব্যাহত রাখলেই সন্তানরা সহজে বুঝবে, ধারণ করতে পারবে।
আরেকটি জিনিস আমাদের বুঝতে হবে। যারা অমুসলিম, তারা হয়তো লজ্জাশীলতার চর্চা ওভাবে করে না। কিন্তু তাদের ফিতরাত তাদের জানিয়ে দেয়, লজ্জাশীলতা একটি ভালো গুণ। ফলে তাদের কেউ যখন এমন গুণ দেখতে পায়, তখন প্রশংসা করে।
অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার অন্যতম সহজ উপায় হলো লজ্জাশীলতার গুণ অর্জন করা। আপনি যখন এই গুণের মাধ্যমে তাদের দাওয়াত দেবেন, সন্তুষ্টচিত্তে তারা সেই গুণের প্রশংসা করবে। কারণ, আশেপাশে এমন গুণসম্পন্ন মানুষ সচরাচর তারা দেখতে পায় না। প্রাথমিকভাবে হয়তো লজ্জাশীলতা নিয়ে হাসি-তামাশা করতে পারে, কিন্তু এর অন্ধত্ব শেষ হলে ঠিকই তারা এই গুণের স্বীকৃতি দেবে।
আমি একজন নারীর পরিচয় জানি এবং ব্যক্তিগতভাবেও তাকে চিনি। সেই নারী একজন মুসলিমের লজ্জাশীলতার এই গুণ দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি খেয়াল করেন অফিসের সবাই তার সাথে ফ্ল্যার্ট করে, পটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু একজন পুরুষ তাকে এড়িয়ে চলে। এতদিনে একবারও তার দিকে তাকায়নি। সেই নারী অবাক হলেন। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমার দিকে তাকান না কেন?
তার ওই কলিগ উত্তর দিলেন, আমি মুসলিম। ইসলাম আমাকে বলে দিয়েছে, কোনো নারী যদি সামনে পড়ে, তোমার দৃষ্টিকে হেফাজত করো। দৃষ্টিকে নত করো। আর তাদের সাথে যদি কথা বলার প্রয়োজন হয়, সম্মানের সাথে কথা বলো। মুসলিম পুরুষের এমন লজ্জাশীল আচরণ দেখে সেই নারী ইসলাম গ্রহণ করেন। এখন তিনি নিয়মিত ইসলাম অনুশীলনসহ বেশ ভালোভাবে ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
আপনি যা বলবেন, পরিবেশ খেয়াল করে বুঝেশুনে বলুন। এমন কোনো কথা বলবেন না, যা শুনতে খারাপ লাগে এবং এর মধ্যে অশ্লীলতা আছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব বিষয়ে কখনোই খোলামেলা আলোচনা করেননি। আল্লাহ বলেন-যখন তারা হুজরা থেকে বের হয়; ভেতরে কী কী করে, কী কী হয়, সেটা তিনি বলেননি। আল্লাহ বলেন-যখন তোমরা স্ত্রীদের স্পর্শ করো, স্বামী কিন্তু স্ত্রীদের কেবল স্পর্শই করে না। আল্লাহ এসব ব্যাপার খোলামেলা আলোচনা না করার জন্য এমন প্রতীকী কথা বলে এর প্রতি নিরুৎসাহিত করেছেন।
এসব বিষয় আমরা যত বেশি খোলামেলা আলোচনা করব, অশ্লীলতার প্রচার তত বেশি হবে। অশ্লীলতা থামানোর জন্য এর প্রচার করতে হয় না, সেগুলোর কথা বিস্তারিত উল্লেখ করতে হয় না। যখন আপনি বিস্তারিত উল্লেখ করবেন, তখন 'লজ্জাশীল' গুণটির কথা আপনি ভুলে গেলেন। নবিজি বা সাহাবিগণ এই ধরনের কথা আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন, বিস্তারিত বলেননি।
একবার জনৈক মহিলা নবিজির কাছে গিয়ে হায়েজের গোসল সম্পর্কে মাসয়ালা জানতে চান। রাসূলুল্লাহ গোসলের নিয়ম বলে দেন-এক টুকরো কস্তুরী লাগানো নেকড়া দিয়ে পবিত্রতা হাসিল করো। মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে পবিত্রতা হাসিল করব? নবিজিকে একই প্রশ্ন তিনবার করা হলে প্রত্যেকবার তিনি একই উত্তর দেন। অতঃপর আয়িশা (রা.) মহিলাকে ডেকে নিয়ে বিস্তারিত বলেন।
নবিজি কিছু শব্দ উহ্য রেখে তাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মহিলা বুঝলেন না। ফলে আয়িশা (রা.) তাকে ব্যাপারটি বিস্তারিত বুঝিয়ে দেন। এ থেকে রাসূলুল্লাহর লজ্জাবোধের বিষয়টিও বোঝা যায়।
আপনি কীভাবে, কী রকম পোশাক পরছেন, তা থেকে আপনার লজ্জাবোধ সম্পর্কে অনুমান করা। আপনি কতটা ভদ্র-শালীন সেটা বোঝার প্রথম লক্ষণ হলো, আপনি কেমন পোশাক পরেছেন। নারী ও পুরুষ কেমন পোশাক পরবে এ নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা দেওয়া আছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- 'হে বনি আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবে এবং সৌন্দর্যস্বরূপ প্রকাশ করবে। আর তাকওয়ার পোশাক, তা উত্তম। এগুলো আল্লাহর নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।'
আল্লাহর সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাতের মধ্যে আমরাই একমাত্র প্রাণী, যারা পোশাক পরি। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে এ নিয়ম নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য একে বিধান করে পাঠিয়েছেন লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য। আর এই পোশাকই যদি লজ্জাস্থান ঢাকতে না পারে, তাহলে পোশাকের কোনো মূল্য নেই। মা-বোনদের নিকট আমার অনুরোধ। আল্লাহ আপনাদের এমন কিছু দান করেছেন, যা আমাদের দান করেননি। আপনাদের যে সক্ষমতা দান করা হয়েছে, দায়িত্বও আপনাদের অনেক বেশি। যখন লজ্জাশীল আচরণ করবেন, তখন কোটি কোটি টাকার কসমেটিক্স শিল্পকে আপনি তোয়াক্কা করছেন না; এড়িয়ে চলছেন, অশ্লীলতাকে 'না' বলছেন।
তবে সবকিছুতেই আবার লজ্জাশীলতাকে প্রাধান্য দেবেন না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লজ্জাশীলতা শোভা পায় না। যেমন: দ্বীনি ইলম বা যেকোনো জ্ঞানের ব্যাপারে কোনো কিছু জানা। একটি বিষয় সম্বন্ধে আপনি বিস্তারিত জানেন না, জানার আগ্রহবোধ করছেন এবং দরকারও; কিন্তু কাউকে জিজ্ঞেস করতে লজ্জা পাচ্ছেন, সংকোচবোধ করছেন। তার মানে এই না, লজ্জার কারণে তা জানতে চাইবেন না; বরং লজ্জা ভেঙে ভদ্রভাবে যা যা জানা দরকার জিজ্ঞেস করবেন। এই সম্পর্কিত নবিজির একটি হাদিস দিয়েই আলোচনার ইতি টানছি। হাদিসটি আমাদের মুখস্থ রাখা উচিত। নবিজি বলেন, প্রতিটি ধর্মের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। আর ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো লজ্জাশীলতা।

টিকাঃ
১৩৬ সূরা কাসাস: ২৫
১৩৭ সুনানে আবু দাউদ: ৪০১২
১৩৮ সহিহ মুসলিম: ৫৮
১৩৯ সহিহ বুখারি: ৬১১৭
১৪০ সহিহ বুখারি: ৩৪৮৪
১৪১ সহিহ বুখারি: ৩১৪
১৪২ সূরা আরাফ: ২৬
১৪৩ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৮১

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 দয়া ও কোমলতা

📄 দয়া ও কোমলতা


মুমিনের একটি গুণ হলো দয়াশীলতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্যে এই গুণটি ছিল। আল্লাহ এই গুণের প্রশংসা করে পবিত্র কুরআনে বলেন- 'অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করেছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত।'
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- 'নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন, তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক যা তোমাদের পীড়া দেয়। তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।'
মুমিনের বৈশিষ্ট্যই হলো মুমিন কোমল হৃদয়ের অধিকারী হবে। সে মানুষের প্রতি দয়া দেখাবে। মানুষের কষ্ট দেখে সে কষ্ট পাবে। মুহাদ্দিসগণ একটি হাদিসকে খুব গুরুত্ব দেন। শিক্ষার্থীরা হাদিস শেখা শুরু করে এই হাদিসটির মাধ্যমে। নবিজি বলেন, আল্লাহ দয়ালুদের ওপর দয়া ও অনুগ্রহ করেন। যারা জমিনে বসবাস করছে, তাদের প্রতি তোমরা দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। দয়া রহমান হতে উদ্‌গত। যে লোক দয়ার সাথে সম্পর্ক রাখে, আল্লাহ তার সাথে নিজ সম্পর্ক বজায় রাখেন। যে লোক দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে, আল্লাহ তার সাথে দয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
হাসান (রা.) ছিলেন নবিজির আদরের নাতি, ফাতিমা (রা.)-এর পুত্র। জনসম্মুখে নবিজি একদিন হাসান (রা.)-কে চুমো দিলেন। যেখানে একসময় বাবারা নিজেদের মেয়েদের জীবন্ত কবর দিত, সেই সমাজে নবিজি লোকজনের সামনে তাঁর নাতিকে চুমো খাচ্ছেন? সন্তানকে আদর-স্নেহ তো মানুষ ঘরের মধ্যে করে। ঘরের বাইরে কি কেউ সন্তানকে এভাবে চুমো খায়?
আকরা ইবনে হারিস (রা.) নামের এক সাহাবি দৃশ্যটি দেখে দারুণ বিস্মিত হলেন। তিনি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাসই করাতে পারছিলেন না। এ রকম একটা সমাজে নবিজি সবার সামনে তাঁর নাতিকে চুমো দিলেন, ব্যাপারটা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। বাচ্চাকে চুমো দেওয়া তাঁর কাছে কেমন যেন দুর্বলতা-দুর্বলতা আর হীনম্মন্য বলে মনে হচ্ছে।
তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমারও তো দশটা ছেলে আছে। কই, আমি তো কোনো দিন কাউকে চুমো দিইনি!
সন্তানকে চুমো না দেওয়া যেন খুব গর্বের কথা! তাঁর এ কথা শুনে নবিজি বললেন-মাল্লা ইয়ারহামু, লা ইয়োরহাম-যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অন্যের প্রতি দয়া দেখানো। মুমিন আল্লাহর কাছে যেমন দয়াপ্রার্থী, তেমনই মানুষের প্রতিও সে দয়া দেখাবে; কেউ কারও প্রতি দয়া করলে আল্লাহও তাকে দয়া করেন।
নবিজির জীবনে এমন অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। দ্বীন পালন করা যেন কঠিন হয়ে না পড়ে, এজন্য তিনি অনেক ব্যাপারে জোরারোপ করেননি। তিনি সব সময়ই চেয়েছেন, মানুষ সহজে দ্বীনের মাঝে পা বন্দি হোক আর তা পালন করুক।
মিরাজের রাতে আল্লাহ তায়ালা সমস্ত মুসলিম উম্মাহর ওপর ৫০ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। মুসা (আ.) নবিজিকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, এত বেশি নামাজ আপনার উম্মত আদায় করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ উম্মতের কথা চিন্তা করে, ভেবে আল্লাহর কাছে যান নামাজের ওয়াক্ত কমাতে। এভাবে তিনি আল্লাহর কাছে যান নয়বার। প্রতিবারই আল্লাহ নামাজের ওয়াক্ত কমাতে কমাতে শেষ পর্যন্ত ৫০ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেন।
নবিজি বলেন, আমার উম্মাহর জন্য যদি কঠিন না মনে করতাম, তাহলে প্রত্যেক নামাজের আগে তাদের মিসওয়াক করার হুকুম করতাম।
যদি এমন হতো-প্রত্যেক নামাজের আগে মিসওয়াক করা আবশ্যক, তাহলে আমাদের জন্য তা কষ্টকর হয়ে যেত। আমাদের কষ্টের হওয়ার কথা ভেবে নবিজি প্রত্যেক নামাজের আগে মিসওয়াক করার নির্দেশ দেননি। কোনোভাবে যেন শরিয়াহ কঠিন হয়ে না যায়, সেদিকে তিনি লক্ষ রাখেন। রাসূলুল্লাহ আরও বলেন, আমি যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর হওয়ার আশঙ্কা না করতাম, তাহলে তাদের বিলম্বে এশার নামাজ পড়তে নির্দেশ দিতাম।
এখন আমরা এশার নামাজ পড়ি রাত আটটায়। শীতকালে সাতটার সময়। যদি এমন হতো-এশার নামাজ রাত বারোটায় পড়া নিয়ম, তাহলে আমাদের জন্য এটা ব্যাপক কষ্টকর হতো। এশা ও ফজর এই দুই নামাজের চিন্তায় ভালোমতো ঘুম হতো না। নবিজি আমাদের কষ্টের কথা ভেবে এমন আদেশ দেননি।
তারাবির ক্ষেত্রেও দেখা যায় নবিজি একটানা তিন দিন মসজিদে যান, তারাবির নামাজ আদায় করেন। কিন্তু চতুর্থ দিন মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। যথা দিনের মতো সাহাবিরা নবিজি মসজিদে আসার অপেক্ষায় বসে রইলেন। রাসূলুল্লাহ বলেন-শোনো, আমি জানতাম তোমরা সারারাত ধরে এখানে আছ, কিন্তু আমি আসিনি। এই নামাজ তোমাদের ওপর 'ফরজ' হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছি (বিধায় হুজরা থেকে বের হইনি)। এমন হতে পারে, তোমরা তা আদায় করতে অপারগ হয়ে পড়তে পারো।
একবার নবিজি মসজিদে নববিতে বসে আছেন। এমন সময় এক বেদুইন এমন সময় প্রবেশ করল। বেদুইনরা সাধারণত শহরতলীর বাইরে থাকত, তাই শহুরে আদব-কায়দার সাথে তারা তেমন পরিচিত ছিল না। তাদের স্বভাবও অনেকটা রূঢ়-রুক্ষ ছিল। কিছুক্ষণ পর বেদুইনটি মসজিদের এক কোণে দাঁড়িয়ে পেশাব করা শুরু করল। যেখানে নবিজি নিজে বসে আছেন, যে মসজিদটি তিনি নিজ হাতে নির্মাণ করেছেন, সেই মসজিদেই কিনা কোথাকার এক বেদুইন এসে পেশাব করা শুরু করল?
সাহাবিরা তো রাগে অগ্নিশর্মা। তেড়ে গেলেন বেদুইনকে শায়েস্তা করতে। এমতাবস্থায় যদিও তাদের রাগ করাটা খুবই যৌক্তিক এবং স্বাভাবিক ছিল। একে তো বেদুইন, আবার মসজিদে ঢুকে তাদেরই বিরুদ্ধে দুআ করেছে, তার ওপর নবিজি উপস্থিতিতে এমন গর্হিত কাজ শুরু করল। এর শাস্তি তো তাকে পেতেই হবে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাহাবিদের থামালেন। তিনি বললেন-থামো, থামো। তোমরা তাকে বাধা দিয়ো না, ছেড়ে দাও।
নবিজি বেদুইনকে শান্তিমতো পেশাব করতে দিলেন। নিজে যেমন বাধা দিলেন না, তেমনই সাহাবিরা বাধা দিতে গেলে; বরং তাঁদেরও বাধা দিতে নিষেধ করলেন। কারণ, এমন অবস্থায় তার পেশাব আটকালে তার শারীরিক সমস্যা হতে পারে। পেশাব আটকে যেতে পারে। মৃত্যুও হতে পারে। ধীরে-সুস্থে পেশাব করা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ তাকে ডেকে বোঝালেন, এটা হলো মসজিদ। এখানে প্রসাব করা বা ময়লা আবর্জনা ফেলা যায় না; এটি আল্লাহর জিকির, নামাজ পড়া এবং কুরআন তিলাওয়াত করার জায়গা।
নবিজি ধরে নিলেন, বেদুইনটি মসজিদের আদব সম্পর্কে জানে না। সে মসজিদকে অন্য দশ জায়গার মতো ভেবেছে। তাকে ডেকে শাস্তি না দিয়ে উলটো জ্ঞানদান করলেন। পুরো বিষয়টি বোঝানোর পর নবিজি চাইলে তাকে বলতে পারতেন-তুমি যে ভুলটা করেছ, এখন সেটার প্রায়শ্চিত্ত করো। যেখানে পেশাব করেছ, পানি দিয়ে ধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে দাও।
নবিজি তা-ও করেননি। তিনি কী করলেন? সাহাবিদের, যারা বেদুইনের এহেন কাণ্ড দেখে বিরক্ত, রাগান্বিত, তাদের বললেন-পেশাবের ওপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও।
নবিজি সাহাবিদের এই ঘটনার মাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন। এত কিছুর পরও রাসূলুল্লাহ বেদুইনকে বকাঝকা না করে, তার প্রতি কঠোর আচরণ না করে উলটো সাহাবিদের বলছেন, তোমাদের কোমল ও সুন্দর আচরণ করার জন্য পাঠানো হয়েছে; রুক্ষ-রূঢ়, কঠোর আচরণের জন্য পাঠানো হয়নি।
বেদুইন লোকটি সাহাবিদের আচরণ খেয়াল করেন, অন্যদিকে নবিজির কোমল আচরণও দেখেন। ফলে তিনি সাহাবিদের জন্য দুআ না করে কেবল রাসূলুল্লাহর জন্য দুআ করেন, হে আল্লাহ! আমার প্রতি দয়া করো ও মুহাম্মাদের প্রতি দয়া করো। এ ছাড়া আর কারও প্রতি দয়া করো না!
বেদুইনের এমন অদ্ভুত দুআ থেকেই বোঝা যায়, তিনি বাকিদের ওপর কতটা বিরক্ত আর অসন্তুষ্ট ছিলেন। নবিজি তাকে সংশোধন করে দিয়ে বললেন, তুমি ব্যাপকতাকে সীমিত করে দিলে।
একবার এক যুবক সাহাবি নবিজির কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জিনা করার অনুমতি দিন!
ওই যুবক সাহাবি নবিজির এমন কোনো বন্ধু নন, মন চাইল, ইচ্ছে হলো- নবিজির কাছে প্রকাশ করে দেবেন। তা-ও আবার তিনি সাহাবিদের নিয়ে তখন মজলিসে বসা। সাহাবিরা তাকে ধমক দিলেন-থামো, থামো। তাঁরা এমনটাই বোঝাতে চাইলেন, তোমার এত্ত বড়ো সাহস? এসব তুমি কী বলছ?
ভাবা যায়, ওই যুবক সাহাবি নবিজিকে কতটা 'আপন মানুষ' হিসেবে চিত্য করেছেন? নিজের এমন ইচ্ছে আর খাহেশাতের কথাও তিনি নবিজির কাছে নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেছেন। এমন কথা তো এক বন্ধুও তার অন্য বন্ধুকে বলে না।
নবিজি তাকে কাছে ডাকলেন, এখানে এসো। খেয়াল করুন, সাহাবিরা তাকে ধমক দিলেন আর নবিজি তাকে কাছে যেতে বললেন। এখন কি তিনি সজোরে তার গালে দুটি চড় মারবেন? কিংবা সাহাবিদের বলবেন-একে ধরো, বেঁধে রাখো। শান্তি দিয়ে দেখিয়ে দাও, এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ কেউ করতে চাইলে কী পরিণতি হয়।
না, নবিজি এর কোনোটাই করলেন না। আচ্ছা, ঠিক এই মুহূর্তে একটু ভাবুন তো-আপনি সাহস করে আপনার শিক্ষককে সবার সামনে তার মেয়ের সাথে প্রেম/বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন!
দেখুন, নবিজি কতটা সচেতনভাবে প্রশ্নের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি কোনো প্রকার বাজে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে স্বাভাবিক থাকলেন এবং তাকে পালটা প্রশ্ন করলেন-তুমি কি নিজের মায়ের জন্য এমনটা করতে পছন্দ করো, তুমি কি চাও অবৈধভাবে কেউ তার সাথে এটা করুক? সাহাবি উত্তরে বললেন-তিনি এটা পছন্দ করেন না, চান না। অতঃপর নবিজি তাকে বোঝালেন-তুমি যার সাথে এমনটা করবে, সে-ও তো কারও না কারোর মা।
এবার নবিজি আবার জিজ্ঞেস করলেন-তুমি কি চাও তোমার মেয়ের সাথে এমনটা হোক, সেটা তুমি পছন্দ করো? যুবক সাহাবি আবারও উত্তর দিলেন-না। নবিজি এবারও বোঝালেন, তুমি যার সাথে এমনটা করবে, সে-ও তো কারও না কারোর মেয়ে।
এভাবে নবিজি একে একে বোন, ফুফু, খালার উদাহরণ দিয়ে জিজ্ঞেস করে সমাধান দিলেন-তুমি যার সাথেই এমনটা করো না কেন, সে কারও না কারও মা, বোন, মেয়ে, খালা, ফুফু কিংবা রক্তের সম্পর্কের। তুমি যেমন নিজের কারও সাথে এমনটা হোক চাও না, তেমনই তারাও তো এমনটা চায় না।
কথাগুলো বলার পর নবিজির হাত যুবকের বুকে রাখলেন। এই অনুভূতিটাও খানিক চিন্তা করুন তো। যে কিনা জিনার মতো বড়ো পাপ কাজের অনুমতি প্রার্থনার জন্য নবিজির কাছে এসেছিল। আর তাকে বোঝানোর শেষে আবার নবিজি নিজেই তা বুকে হাত রাখছেন। চিন্তা করুন-নবিজি সেই হাত আমার- আপনার বুকে রাখছেন! কারণ, ওই যুবকের মতো অনুভূতি তো আমাদের প্রত্যেকেরই হয়। কখনো কখনো বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসলে এসব আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করি, নতুবা গোপন রাখি, ছাপিয়ে যাই।
নবিজি যুবকের বুকে হাত রেখে দুআ করলেন-হে আল্লাহ! আপনি তার গুনাহগুলো মাফ করে দিন, তার হৃদয়কে পবিত্র করে দিন এবং তাকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা করুন।
সেদিনের পর থেকে ওই যুবক সাহাবি আর কোনো দিন জিনার দিকে ঝোঁকেননি। নবিজি যে তাকে বুঝিয়েছিলেন, সেটা তার কতটা কাজে লেগেছিল এবং প্রভাবিত করেছিল। একবার ভাবুন, তিনি জিনা করার কথা মাথা থেকে একেবারেই বাদ দিয়ে দেন।
নবিজি কেবল মুসলিমদের দয়া দেখাতেন না। তাঁর সাথে শত্রুতা করত, এমন অমুসলিমদের প্রতিও তিনি দয়াশীল ছিলেন। এক ইহুদি বালক ছিল রাসূলুল্লাহর খাদেম। সে একবার গুরতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। নবিজি সাহাবিদের সাথে নিয়ে তাকে দেখতে গেলেন। অসুস্থ ইহুদি বালকের মাথার পাশে বসলেন এবং তার মাথায় হাত রাখলেন।
সে প্রায় সময় নবিজির খেদমত করত। যার ফলে তার প্রতি নবিজির একধরনের মমতাবোধ জন্মে। তিনি বুঝতে পারলেন ছেলেটি মৃত্যুশয্যায়। বেশিক্ষণ হয়তো বাঁচবে না।
নবিজি তাকে বললেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো। ইহুদি বালকের সামনে উপস্থিত ছিলেন তার পিতা। যে ছেলে সারাজীবন ইহুদি ছিল, এখন মৃত্যুর আগে পিতার সামনে পিতৃধর্ম পরিবর্তন করবে, কীভাবে সম্ভব?
নবিজি তাঁর ব্যবহারের মাধ্যমে কত মানুষের মন জয় করেছিলেন। এখন আবার তিনি একজন ইহুদির ঘরে গিয়ে তার ছেলেকে ধর্ম পরিবর্তন করতে বলছেন। স্বাভাবিকভাবে ইহুদি তো তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা! কিন্তু না। সেই ইহুদি ব্যক্তিটি নিজেই তার ছেলেকে বলছে, আবুল কাসিমের (নবিজির কুনিয়াত) কথা মেনে নাও।
বাবার কাছ থেকে সম্মতি পেয়ে ছেলে ইসলাম গ্রহণ করল এবং কিছুক্ষণ পর ছেলেটি ইন্তেকাল করল। নবিজি ইহুদির ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বললেন, যাবতীয় প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি তাকে (বালকটিকে) জাহান্নাম হতে মুক্তি দিলেন।
একবার নবিজি সাহাবিদের সঙ্গে বসা ছিলেন। এই সময়ে একটি লাশ তাঁদের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁর দেখাদেখি সাহাবিরাও দাঁড়িয়ে গেলেন। সাহাবিরা বুঝতে পারলেন, লাশটি একজন ইহুদির। তাঁরা নবিজিকে বললেন, এটা তো একজন ইহুদির লাশ? আপনি ইহুদির লাশের জন্য দাঁড়ালেন? নবিজি বললেন, (তাতে কী?) সে কি মানুষ নয়?
মনে করুন, আমরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। দেখতে পেলাম, মানুষজন লাশ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। হোক সেটা মুসলিম কিংবা অমুসলিমের লাশ। আমাদের উচিত-একপাশে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের সুযোগ করে দেওয়া; যেন লাশ নিয়ে তারা সহজে যেতে পারে।
নবিজির দয়ার কারণে তায়েফ শহরটি আজও ঠিকে আছে। নতুবা যেদিন তায়েফের লোকজন তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল, আল্লাহ সেদিন সেই শহর একেবারেই ধ্বংস করে দিতেন। জিবরাইল (আ.) নবিজিকে বলেন, আপনার কওম আপনাকে যা যা বলেছে তা আল্লাহ শুনেছেন। তিনি আপনার নিকট পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন। এদের সম্পর্কে আপনার যা ইচ্ছা তা-ই হুকুম দিতে পারেন।
পাহাড়ের ফেরেশতা এসে নবিজিকে সালাম দিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! এই ব্যাপারটি একান্তই আপনার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। আপনি যদি চান তাহলে আমি তাদের ওপর দুটি কঠিন শিলা-পাহাড় চাপিয়ে দেবো।
এই তো প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে যারা নবিজিকে রক্তাক্ত করে তাদের শহর থেকে বের করে দিয়েছে, এখন নবিজি চাইলে তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারেন। আল্লাহ নিজেই ফেরেশতা পাঠিয়ে তাঁকে সাহায্য করছেন। কিন্তু জবাবে রহমাতুল্লিল আলামিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-না; বরং আমি আশা করি-আল্লাহ তাঁদের বংশ থেকে এমন সন্তান জন্ম দেবেন, যারা আল্লাহর ইবাদত করবে আর তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।
কাফিররা নবিজিকে আঘাত করে রক্তাক্ত করে। অন্যদিকে কপোল বেয়ে পড়া রক্ত তিনি মুছতে থাকেন আর বলেন, হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন; যেহেতু তারা জানে না।
নবিজি কেবল মানুষের প্রতিই দয়াশীল ছিলেন না, তিনি পশু-প্রাণীদের প্রতিও দয়াশীল ছিলেন। একবার তিনি জনৈক আনসারি সাহাবির খেজুর বাগানে প্রবেশ করলেন। একটি উটের দিকে চোখ পড়তেই তিনি খেয়াল করেন, উটটি তাঁকে দেখে কাঁদতে শুরু করেছে। নবিজি উটের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেন, আর উটটি কান্না থামিয়ে দেয়।
নবিজি জানতে চাইলেন, এই উটের মালিক কে?
উটের মালিক ছিল এক আনসারি যুবক। সে নবিজির কাছে এলে তিনি তাকে বললেন-আল্লাহ যে তোমাকে এই নিরীহ প্রাণীটির মালিক বানালেন, এর অধিকারের ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? উটটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখো এবং কষ্ট দাও।
নবিজি আবার জীবের প্রতিই একপেশেভাবে দয়া করেননি, তিনি জড়পদার্থের প্রতিও দয়া দেখিয়েছেন।
মসজিদে নববিতে একটি খেজুরগাছের মিম্বর ছিল। যেখানে দাঁড়িয়ে নবিজি খুতবা দিতেন। নতুন মিম্বর আসার পর সেখান থেকে পুরোনো মিম্বরটি সরিয়ে রাখা হয়। কিছুক্ষণ বাদে শোনা যায় ওই খেজুরগাছের কাণ্ডটি কান্না করছে! সাহাবিরাও কান্না শুনতে পান। নবিজি নতুন মিম্বর থেকে নেমে খেজুর কাণ্ডের ওপর হাত রাখেন এবং জড়িয়ে ধরেন। অবশেষে সেটা কান্না থামায়!
এই ঘটনা বর্ণনা করে হাসান আল বসরি (রহ.) বলেন-এমনকি একটি খেজুরের কাণ্ড পর্যন্ত রাসূলের বিচ্ছেদে কান্না করেছে, আমরা কি তাঁর বিচ্ছেদে কান্না করব না?
ইসলামি শরিয়াহ আমাদের বলে অন্যের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে। সে হোক মুসলিম-অমুসলিম কিংবা অন্য কোনো প্রাণী। আপনার প্রতিবেশী কোনো অমুসলিম অসুস্থ হয়ে পড়লে, বিপদে পড়লে তাকেও সহযোগিতা করতে হবে। যেকোনো বিপদে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। একইভাবে গৃহপালিত প্রাণীর প্রতিও দয়া প্রদর্শনসহ তাদের ঠিকমতো পরিচর্যা করতে হবে এবং খাবার দিতে হবে।
এখনকার সময়ে কেউ কেউ বলে থাকে-মুমিন কোমল হৃদয়ের অধিকারী হতে পারে না, মুমিনকে কঠিন হৃদয়ের অধিকারী হতে হয়। এটা ভুল কথা, অবশ্যই এটা ভুল কথা। যখন যেখানে কঠোর হওয়া দরকার, আমরা কঠোর হব। কিন্তু আমাদের স্বভাবত গুণ হওয়া উচিত কোমলপ্রাণ। মুমিনের স্বভাবজাত গুণই হলো কোমলতা; কখনোই কঠোরতা নয়। প্রয়োজনসাপেক্ষে আমরা কঠোর হব, কিন্তু আমাদের সার্বক্ষণিক আচরণ হবে নরম-কোমল।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।'
আল্লাহ হলেন রহিম-রহমান, তিনি তাঁর রাসূলকে মানবজাতির হিদায়াতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ নিজে দয়ালু, তিনি দয়াশীলতা পছন্দ করেন। আমরা যদি আল্লাহর অনুগ্রহ পেতে চাই, আমাদেরও মানবজাতির প্রতি দয়াশীল আচরণ করতে হবে।

টিকাঃ
১৪৪ সূরা আলে ইমরান: ১৫৯
১৪৫ সূরা আত-তাওবা: ১২৮
১৪৬ জামে আত-তিরমিজি: ১৯২৪
১৪৭ সহিহ বুখারি: ৫৯৯৭
১৪৮ সহিহ বুখারি: ৩৪৯
১৪৯ সহিহ বুখারি: ৮৮৭
১৫০ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৬৯০
১৫১ সহিহ বুখারি: ২০১২
১৫২ সহিহ মুসলিম: ৫৪৮
১৫৩ সহিহ বুখারি: ২২০
১৫৪ সুনানে আবু দাউদ: ৩৮০
১৫৫ মুসনাদে আহমাদ: ২২২১১
১৫৬ সহিহ বুখারি: ১৩৫৬
১৫৭ সহিহ বুখারি: ১৩১২
১৫৮ সহিহ বুখারি: ৩২৩১
১৫৯ সহিহ বুখারি: ৩৪৭৭
১৬০ সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪৯
১৬১ সহিহ বুখারি: ২০৯৫
১৬২ সূরা আম্বিয়া : ১০৭

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 কৃতজ্ঞতাবোধ

📄 কৃতজ্ঞতাবোধ


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ।
এই গুণটি মুমিনের অন্যতম একটি গুণ। একজন মুমিন স্বভাবতই সব সময় কৃতজ্ঞ থাকে। সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ, যারা তার সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ায় তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ। কিন্তু পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তাঁর খুব কমসংখ্যক বান্দাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। যে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, হাত-পা-চোখ দান করেছেন, রিজিক দেন, সেই আল্লাহর প্রতি মানুষ কীভাবে অকৃতজ্ঞ হতে পারে?
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন- 'অবশ্যই আমি তাকে পথপ্রদর্শন করেছি। হয় সে কৃতজ্ঞ, না হয় অকৃতজ্ঞ। '
কৃতজ্ঞতার আরবি হলো 'শুকুর' বিপরীত দিকে অকৃতজ্ঞতার আরবি হলো 'কুফর'। আল্লাহকে অবিশ্বাস করা, অস্বীকার করা যেমন কুফর; তেমনই আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা বোঝাতেও কুফর শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
আমাদের সামনে উন্মুক্ত পথ। হয় আমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হব, নতুবা তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ থাকব।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার শুনলেন, এক লোক দুআ করছে, হে আল্লাহ! আমাকে অল্পসংখ্যকদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন! উমর (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, অল্পসংখ্যক মানে কী? কারা অল্পসংখ্যক? তখন লোকটি খলিফাকে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান- 'আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। '
লোকটির বুদ্ধিমত্তা দেখে খলিফা বললেন, সবাই আমার চেয়ে কত বেশি জানে! কৃতজ্ঞতাবোধের গুরুত্ব অনেক বেশি। আমরা যে শুধু আল্লাহর প্রতিই কৃতজ্ঞতা আদায় করব, এমন না। মানুষের প্রতিও আমাদের এ বোধ থাকবে। যদি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতার হক আদায় করতে পারি, তাহলে আল্লাহর প্রতিও আমরা আদায় করতে পারব। যে পারে, সে দুটিই পারে। যে পারে না, সে একটিও পারে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।
একই হাদিসে নবিজি আরও বলেন-যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞ নয়। আপনি যদি আল্লাহর ইবাদত একাগ্রতার সহিতও করেন, কিন্তু বান্দার হক পরিপূর্ণভাবে আদায় না করতে পারেন, মানুষকে কষ্ট দেন; তাহলে এর জন্য পরকালে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। রাসূলুল্লাহর আরেকটি হাদিস থেকে এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়।
জনৈক সাহাবি একবার নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এক নারী অত্যধিক নামাজ-রোজা ও দানের জন্য সুপরিচিত। কিন্তু সে কথার মাধ্যমে তার প্রতিবেশীকে আঘাত করে, কষ্ট দেয়। তার ব্যাপারে আপনি কী বলেন? রাসূলুল্লাহ বললেন, সে জাহান্নামি।
সাহাবি আবারও জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আরেকজন নারী কম রোজা রাখে, দানও কম করে এবং নামাজও কম পড়ার ব্যাপারে লোকসমাজে সে প্রসিদ্ধ। বলতে গেলে এক টুকরো পনিরই দান করে। কিন্তু প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না, তার ব্যাপারে আপনি কী বলেন? নবিজি বললেন, সে জান্নাতি।
একজন মানুষ কীভাবে নিজেকে আল্লাহর ওলি দাবি করতে পারে? যে কিনা নিয়মিত নামাজ পড়ে, অথচ মানুষের সাথে প্রতারণা করে, কষ্ট দেয়-এমন একজন মানুষ কি ওলি হতে পারে? আল্লাহর প্রিয়ভাজন হওয়ার জন্য তো অবশ্যই ‘অলরাউন্ডার’ হতে হবে। ইবাদত যেমন করতে হবে, পাশাপাশি মানুষের হকও আদায় করতে হবে, যা আদায় করা সম্ভব কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মাধ্যমে। কৃতজ্ঞতা মূলত তিন প্রকার। সেগুলো হলো-
ক. অন্তর। খ. জবান ও গ. আমলের কৃতজ্ঞতা।

টিকাঃ
১৬৩ সূরা সাবা: ১৩
১৬৪ সূরা দাহর: ৩
১৬৫ সূরা সাবা: ১৩
১৬৬ মুসান্নাফে আবি শায়বা: ২৯৫১৪
১৬৭ সুনানে আবু দাউদ: ৪৮১১
১৬৮ সুনানে আবু দাউদ: ৪৮১১
১৬৯ মুসনাদে আহমাদ: ৯২৯৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00