📄 কে আপনাকে নিয়ে কী বলল সেটা ভুলে যান
কেউ যদি কোনো কথা বলে, সেটা নিজের ওপর টেনে নেবেন না। আগে কথাটি পরিষ্কারভাবে শুনুন, বুঝুন। কেউ যদি বলে, গরু চোরেরা সাবধান। এখন আপনার বংশেরই কেউ যদি গরুর চোর থাকে, তাহলে সেটা শুনে রাগ করার কিছু নেই। কথাটা একদমই সাধারণ কথা, একে সাধারণভাবে রাখুন। নিজের ওপর টেনে নিলে বোঝা যাবে, কথাটির সাথে আপনি প্রাসঙ্গিক।
অনুমান অনেক ক্ষেত্রে এমন কিছু বোঝায়; যে অনুমান করে, সে একটি জিনিস বোঝে, যে কথাটি বলে সে মূলত সেটা বোঝায়নি। আপনি যদি মনে করেন সবাই বিপথগামী হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়ে গেছে। আদতে দেখা যাবে সবাই ঠিক আছে, আপনিই বিপথগামী হয়ে গেছেন। এজন্য নবিজি বলেন, কোনো ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো অর্থহীন কথা বা কাজ এড়িয়ে চলা।
📄 ভালো ধারণার চেষ্টা করা
কারও কোনো কথা শুনে যদি মনে হয় কথাটি সে আপনাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, কথার মাধ্যমে আঘাত করেছে, তাহলে সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ধরে নিন-সে এই উদ্দেশ্যে বলেনি। কথাটির পেছনে তার কোনো মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে, যা আপনি এখন বুঝতে পারছেন না। জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন-তোমার ভাইয়ের কাছ থেকে এমন কিছু যদি শোনো, যা তোমাকে কষ্ট দিতে পারে, সেক্ষেত্রে তুমি ৭০টি অজুহাত দেখাও। যদি তা না পারো, তাহলে ধরে নাও তার কাছে হয়তো এর কোনো ব্যাখ্যা আছে যা আমি জানি না।
নবিজির জীবনে এ রকম একটি ঘটনা দেখা যায়।
-জনৈক সাহাবি তাঁর কাছে এসে বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান প্রসব করেছে। অথচ আমি কালো নই!
-সেই সাহাবি যা বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট। স্ত্রীর ব্যাপারে তিনি সন্দেহ করেন। তাঁর সন্দেহের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে প্রশ্ন করেন, তোমার কাছে কি কোনো উট আছে?
-সাহাবি বললেন, হ্যাঁ, আমার কাছে উট আছে।
-সেগুলোর রং কী রকম?
-লাল রঙের।
-তাতে কি কালো (মেটে) রঙের উট আছে?
-সাহাবি বললেন, হ্যাঁ, কালো রঙের উটও আছে।
-নবিজি জিজ্ঞেস করেন, এই কালো রং কোত্থেকে এলো?
-সাহাবি বললেন, সম্ভবত তা পূর্ববর্তী বংশধারা থেকে এসেছে।
-অতঃপর নবিজি বললেন, তোমার এই কালো সন্তানটিও সম্ভবত পূর্ববর্তী বংশধারা থেকে এসেছে।
সাহাবি এসেছিলেন স্ত্রীর ব্যাপারে মন্দ ধারণা নিয়ে, নবিজি বাস্তব একটি উদাহরণ দিয়ে সাহাবির মনের সংশয় দূর করেন।
টিকাঃ
১২৪ জামে আত-তিরমিজি: ২৩১৮
১২৫ ইমাম বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ৭৮৫৩
১২৬ সহিহ মুসলিম: ৩৬৫৮
📄 যাচাই করে নেওয়া
কোনো বিষয়ে মনে সন্দেহ দেখা দিলে সেটা যাচাই করে নিন। আপনি মনে করেছেন কেউ আপনাকে নিয়ে কিছু বলেছে। মাথা থেকে এটা দূর করতে পারছেন না। সেই মুহূর্তে আপনি সরাসরি তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন- সেদিন যা বলেছিলে, অল্প হলেও এর ব্যাখ্যা বলো। আমি আসলে বুঝিনি। আপনি তাকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেবেন। এতে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি দূর হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।'
আপনার কাছে যে কেউ যেকোনো সংবাদ নিয়ে এলে আগে তা যাচাই করে নিন। 'চিলে কান নিয়ে গেল' শুনে চিলের পেছনে ছুটবেন না। আগে হাত দিয়ে দেখুন, আপনার কান ঠিক আছে কি না। কারও ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছার আগে তথ্যটি খুব ভালোভাবে যাচাই করে নিন, নিশ্চিত হয়ে নিন। তথ্যের ব্যাপারে বিভিন্ন উৎস থেকে জানার চেষ্টা করুন।
নবিজির জীবনীতে আমরা দেখতে পাই-তিনি কোনো সংবাদ শোনার পর কারও ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে তাকে কথা বলার সুযোগ দিতেন। নিজেকে আত্মরক্ষার সুযোগ দিতেন। সংবাদ বা তথ্যের যথাযথ কারণ জানার চেষ্টা করতেন।
রাসূলুল্লাহর জীবনে এ রকম একটি ঘটনা দেখতে পাই। মক্কা বিজয়ের পূর্বে একজন বদরি সাহাবি মুসলিমদের মক্কা অভিযানের সংবাদ চিঠি আকারে লিখে মক্কায় জানিয়ে দিতে চান। তাঁর নাম ছিল হাতিব ইবনে আবু বালতায়া (রা.)। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটা বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে মক্কায় আগাম সংবাদ জানিয়ে দিচ্ছেন। চিঠিটি তিনি একজন মহিলার কাছে দেন। সে তা নিয়ে মক্কার পথে রওনা দেন।
নবিজি ওহি মারফত খবরটি জানতে পারেন। তারপরও আলি ইবনে আবি তালিব ও জুবাইর ইবনে আবু বালতাআ (রা.)-কে পাঠালেন চিঠিটি উদ্ধার করতে। উদ্ধারের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাম হাতিব (রা.)-এর কাছে কারণ জানতে চান। তিনি বলেন, তাঁর পরিবার মক্কায় আছে। তিনি কুরাইশদের আগাম সংবাদ জানিয়ে দিচ্ছেন এই আশায়, মক্কায় আক্রমণ হলে তারা যেন তাঁর পরিবারকে সুরক্ষা দেয়।
হাতিব (রা.)-এর চিঠি প্রেরণের কারণ জানার আগপর্যন্ত মনে হতে পারে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তবে কারণ বলার পর মনে হয় তিনি মূলত তাঁর পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ায় চিঠি পাঠিয়েছেন। ফলে নবিজি তাঁকে ক্ষমা করে দেন।
আপাতদৃষ্টিতে কেউ যদি শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধ করে, তাহলে তাকে শাস্তি দেওয়ার পূর্বে তার কাছ থেকে এর কারণ সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। শোনার পর কারণটি যথাযথ হলে তাকে ক্ষমা করা যায়। উল্লিখিত ঘটনাটিই এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ। আমরা সবাই কোনো না কোনো ভুল করি। যেহেতু সবারই কমবেশ ভুল হয়, তাই অন্য কেউ কখনো ভুল করলে তা আমলে নিতে হবে। সুযোগ দিতে হবে তাকে, অতঃপর সেটা যদি শাস্তি দেবার মতো ভুল বা অপরাধ হয় তবেই শাস্তি দিতে হবে।
নবিজির একজন সাহাবি ছিলেন মদ্যপায়ী। নাম আবদুল্লাহ (রা.)। প্রায়ই মদ পানের অভিযোগে তাকে শাস্তি দেওয়া হতো। একবার শাস্তি দেওয়ার সময় আরেকজন সাহাবি বললেন, হে আল্লাহ! তার ওপর আপনার লানত বর্ষণ করুন। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাকে কতবার যে আনা হলো! রাসূলুল্লাহ সাহাবির এমন উক্তির প্রতিবাদ করে বললেন, তাকে লানত করো না। আল্লাহর কসম! আমি জানি, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে।
একজন মদ্যপায়ী সাহাবির ভালো গুণের প্রশংসা যেমন নবিজি করেন, তেমনই মদ পানের জন্য তাকে শাস্তিও দেন। অন্যরা তাকে লানত দিতে চাইলে তিনি সেই সাহাবির পক্ষে কথা বলেন। কারণ, সেই সাহাবি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন।
টিকাঃ
১২৭ সূরা হুজুরাত : ৬
১২৮ সহিহ বুখারি: ৬৯৩৯; সিরাত ইবনে হিশাম ৪/৩৭-৩৮; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৪৮৮-৪৮৯
১২৯ সহিহ বুখারি: ৬৭৮০