📘 মুমিনের আখলাক > 📄 ইসলামকে কেন ইতিবাচক ধারণা গ্রহণযোগ্য

📄 ইসলামকে কেন ইতিবাচক ধারণা গ্রহণযোগ্য


এর কারণ হলো, আপনি যখন ইতিবাচক ধারণা করবেন, আপনার এই ধারণাই বলে দেয়, আপনি আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখেন। যার দরুন আপনি নিজে শুধু সুধারণা রাখবেন না, অন্যকেও সুধারণা রাখতে উদ্বুদ্ধ করবেন। নবিজি ও সাহাবিদের জীবনে এমন ঘটনা বারবার দেখা যায়।
হিজরতের সময় নবিজির সাথে ছিলেন আবু বকর (রা.)। সাওর গুহায় তাঁরা আশ্রয় নেন। এমন সময় কাফিররা গুহার নিকটবর্তী হয়ে যায়। আবু বকর (রা.) রাসূলুল্লাহর নিরাপত্তার কথা ভেবে ভয় পেয়ে যান। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি কাফিররা তাদের পায়ের নিচের দিকে তাকায়, তাহলে তো আমাদের দেখে ফেলবে! নবিজি আবু বকর (রা.)-এর উদ্বিগ্নতা কাটানোর জন্য এবং তাঁকে আশাবাদী হওয়ার জন্য বললেন, হে আবু বকর! ওই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, আল্লাহ যাদের তৃতীয়জন?
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও নবিজি তাঁর সাহাবিকে আশার বাণী শোনান, ভেঙে না পড়তে বলেন।
খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের ওপর হামলা চালাতে ১০,০০০ সৈন্য একত্রিত হয়েছে। আরবের নিকট অতীতে এর আগে কখনো এত বড়ো বাহিনী একত্রিত হয়নি। সবাই একত্রিত হয়েছে দুনিয়ার বুক থেকে মুসলিমদের নির্মূল করতে। একবার ভাবুন-আপনি সেই জায়গায় উপস্থিত আছেন, চারিদিক আবদ্ধ, বাইরে ১০,০০০ সৈন্য অস্ত্রসজ্জিত হয়ে অপেক্ষা করছে। আপনার মানসিক অবস্থা তখন কী হবে? মুনাফিকরা সেই অবস্থার কথাই উল্লেখ করে বলেছিল-
'নিশ্চয়ই তোমাদের বিরুদ্ধে লোক সমবেত হয়েছে। তোমরা তাদের ভয় করো।'
এত বিশাল সেনাবাহিনী দেখে মুনাফিকরা ভয় পেয়ে যায়। তারা সাহাবিদের ভয় দেখাতে থাকে। কিন্তু এত বিপুল সৈন্য দেখে সাহাবিদের প্রতিক্রিয়া ছিল বিপরীত। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে তা উল্লেখ করে বলেন-
'কিন্তু তা (বিশাল সেনাবাহিনী) তাদের ঈমান বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং তারা বলছিল-আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই-না উত্তম কর্মবিধায়ক।'
বিশাল সেনাবাহিনী দেখে সবাই ভয় পেলেও মুসলিমরা ভয় পায়নি। তারা সাজ-সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছে, পাশাপাশি আল্লাহর ওপরও ভরসা করেছে। ফলে আল্লাহ তাদের সহযোগিতা করেন।
ফেরাউন ও মুসা (আ.)-এর ঘটনায় দেখা যায়-মুসা (আ.) বনি ইসরাইলকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তারা সমুদ্রের মুখোমুখি, পেছনে ফেরাউনের বিশাল সেনাবাহিনী। সামনে বিপদ, পেছনেও বিপদ। তাদের যাওয়ার এবং আশ্রয়ের কোনো স্থান নেই। তাদের সঙ্গে নৌকা নেই, জাহাজ নেই এবং শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো তেমন অস্ত্রশস্ত্রও ছিল না। সেই মুহূর্তে মুসা (আ.)-এর সাথে থাকা লোকজন বলে উঠল-
'আমরা ধরা পড়ে গেলাম!'
তারা বাঁচার আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিল। ভেবেছিল এখান থেকে আর বেঁচে ফেরা সম্ভব না। কিন্তু মুসা (আ.) হাল ছাড়েননি। সেই কঠিন মুহূর্তে তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন। আর বলেন-
'কখনোই নয়! আমার রব আমার সাথে আছে, নিশ্চয়ই তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।'
আশাবাদী মুসা (আ.)-এর কথা সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আল্লাহ সত্যি সত্যি তাঁদের পথ দেখান। লাঠি দিয়ে সমুদ্রে আঘাত করার সাথে সাথেই সমুদ্রের পানি দুই দিকে ভাগ হয়ে যায়। তাঁরা খুব সহজে সমুদ্র পার হন। শত্রুবাহিনী আর তাঁদের ধাওয়া করতে পারেনি।
আপনি আল্লাহর ওপর ভরসা করলে আল্লাহর তরফ থেকে এমন সাহায্য পাবেন। এমন এমন জায়গা থেকে আল্লাহর সাহায্য আসবে, যা কল্পনাও করতে পারবেন না। আপনার যে শত্রু ছিল, দেখা যাবে সে-ও আপনার বন্ধু হয়ে গেছে। যে সব সময় চাইত আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হোন, দেখবেন সে নিজেই আপনার আসন্ন কোনো বিপদ রক্ষার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এমন বিশ্বাসী আমাদের হতে হবে, যা হওয়ার হোক, অবিরাম চেষ্টা চলবে, আল্লাহর ওপর ভরসা থাকবে; তিনি আমাদের ভাগ্যে যতটুকু রেখেছেন, আমরা ঠিক ততটুকুই পাব। এমন মনোভাবের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে জানিয়ে দেন। তিনি বলেন-
'আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো বিপদ আমাদের ওপর আপতিত হবে না।'
এই ধরনের মনোভাব অন্তরে রোপণ করে রাখলে আমরা কখনোই ভেঙে পড়ব না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
'তোমরা লোকদের সাথে উত্তমভাবে কথা বলবে।'
জনৈক আলিম বলেন-'উত্তমভাবে কথা' বলতে দুটি বিষয় বোঝায়। যেমন:
ক. মানুষকে ইসলামের কথা বলবেন, ধৈর্যধারণ করার উপদেশ দেবেন।
খ. মানুষকে সব সময় উৎসাহ দেবেন, যাতে তারা বিপদের সময় ভেঙে না পড়ে।
একজন ব্যক্তির ওপর দিয়ে প্রবল ঝড় বয়ে গেলেও আপনি তাকে ভেঙে না পড়তে উৎসাহ দিন। নতুন করে আবার সবকিছু শুরু জন্য উদ্দীপনা জোগান। মনে করুন, একজনের বাবা/মা/স্বামী মারা গেছে। আপনি তাকে কী বলবেন?
একবার নবিজি চলার পথে দেখতে পান একজন নারী কবরের পাশে বসে কান্না করছে। নবিজি তাকে বললেন, আল্লাহকে ভয় করো এবং ধৈর্য ধরো।
অনেক সময় আপনার আশপাশের মানুষজন আপনার কাছ থেকে সামান্য হলেও একটি ইতিবাচক কথা শুনতে চায়। আশাবাদী হতে চায়। সেক্ষেত্রে তাঁদের নিরাশ না করে আশার আলো দেখান। কেউ যদি তার জীবনে খুব বেশি পাপ করে, তারপরও আপনি তাকে আশার কথা শোনান। কুরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ পাপীদের আশাবাদী হতে বলেছেন। তারা যেন আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়-আল্লাহ তাদের ক্ষমার কথা বলেছেন, আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন।
একজন মুমিন যদি কোনো কিছু হারিয়ে ফেলে তারপরও সে ধারণা করে-আল্লাহ তাকে এর বিনিময়ে উত্তম কিছু দান করবেন। মুমিন নিজে যেমন আল্লাহর প্রতি ইতিবাচক ধারণা রাখে, তেমনই অন্যদের ইতিবাচক হতে উৎসাহিত করে।

টিকাঃ
১১১ আর-রাহিকুল মাখতুম: ৩৫০
১১২ সহিহ বুখারি: ৩৬৫৩
১১৩ সূরা আলে ইমরান: ১৭৩
১১৪ সূরা আলে ইমরান: ১৭৩
১১৫ সূরা শুআরা: ৬১
১১৬ সূরা শুআরা: ৬২
১১৭ সূরা তাওবা: ৫১
১১৮ সূরা বাকারা: ৮৩
১১৯ সহিহ বুখারি: ১২৫২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00