📄 আশাবাদী হওয়া
মুমিনের অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট হচ্ছে, মুমিন সব সময় আশাবাদী থাকে। তার ওপর যেকোনো বিপদ আসুক না কেন, সে ভেঙে পড়ে না। সে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে। সে জানে, আল্লাহ তাকে পথ দেখাবেন। মুমিন কেবল নিজে নিজেই আশাবাদী থাকে না, অন্যকেও তাতে উদ্বুদ্ধ করে।
এটা তখনই সম্ভব, যখন একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখে। আপনি যত বেশি আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখবেন, জীবনে তত বেশি আশাবাদী হতে পারবেন। আর যদি আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা না রাখেন, তাহলে জীবন সম্পর্কেও আপনি নিরাশ হয়ে যাবেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-আমি সে রকমই, বান্দা আমার প্রতি যে রকম ধারণা রাখে।
আপনি যদি আল্লাহর প্রতি ইতিবাচক ধারণা রাখেন, তাহলে আল্লাহর তরফ থেকে ইতিবাচক কিছুই পাবেন। যদি আশা রাখেন আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেনই। যদি এমনটা মনে করেন- আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন না, তবুও আল্লাহ ক্ষমা করবেন। কিন্তু আপনি যেমনটা ধারণা রাখবেন, আল্লাহকে আপনার জন্য তেমনই পাবেন।
ইসলামপূর্ব আরবের লোকজন অনেক জিনিসকে কুলক্ষণ বলে মনে করত। আমাদের দেশেও দেখবেন, মানুষ অনেক জিনিসকে কুলক্ষণ মনে করে। যেমন : প্যাঁচা দেখা, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হোঁচট খাওয়া, পাখি ডাকা ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব কুলক্ষণ মনে রাখা বা এসব ভাবনায় নিজেকে প্রভাবিত হওয়াকে নিন্দা করেন; তৎকালীন আরবের লোকজন যেগুলোকে কুলক্ষণ বলে মনে করত। তিনি বলেন, প্যাঁচা ও কুধারণা (বিশ্বাসের বৈধতা) নেই। আমি সুধারণা পছন্দ করি।
নবিজির জীবনেও এর প্রয়োগ দেখা যায়। হুদাইবিয়ার সন্ধিতে তিনি যখন সুহাইল ইবনে আমরকে আসতে দেখে বলেন, তোমাদের কাজ তোমাদের জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছে। এই লোকটিকে প্রেরণের অর্থ হচ্ছে কুরাইশরা সন্ধি চায়। সুহাইল ইবনে আমর তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। নবিজি তাকে দেখে আশাবাদী হন, সুধারণা পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, তাকে পাঠানোর অর্থ হচ্ছে কুরাইশরা সন্ধি চায়। পরবর্তী সময়ে তা-ই হয়।
যেকোনো কিছুকে আমরা ইতিবাচকভাবে বা শুভলক্ষণ মনে করব কীভাবে? আলিমগণ দুটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন।
ক. কোনো একটা ঘটনা ঘটলে সেটা নেতিবাচক ধারণা না করে, কুলক্ষণ মনে না করে সুলক্ষণ মনে করতে হবে।
খ. সেটাকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। যেমন: আমার মনে হচ্ছে এর মধ্যে আল্লাহ কোনো কল্যাণ রেখেছেন।
আলিমগণ এ ব্যাপারে আমাদের বেশ কিছু উদাহরণও দিয়েছেন। যেমন: মনে করুন, আপনার ঘরের মধ্যে কিছু একটা হারিয়ে গেছে। সবাই মিলে খুঁজছেন। হঠাৎ আপনার সন্তান বলে উঠল, আমি মনে হয় পেয়ে গেছি। তখন আপনি সুধারণা রাখবেন, হয়তো হারানো জিনিসটি পাওয়া গেছে।
আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। দুআ শেষে বাইরে বের হয়ে দেখলেন, আকাশে রংধনু। এটাকে আপনি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে নিতে পারেন।
টিকাঃ
১০৯ সহিহ বুখারি: ৭৪০৫
১১০ সহিহ মুসলিম: ৫৬৯৬
📄 অন্যের ব্যাপারে সুধারণা
একজন মুমিন তার অস্পষ্ট কথাগুলোকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করে। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সাথে কথা বলি। দেখাসাক্ষাৎ এবং মেইল আদান-প্রদান করি। এসব ক্ষেত্রে কেউ কেউ এমন কথা বলতে পারে, যে কথার নানান অর্থ হতে পারে। কিন্তু মুমিন এসব অস্পষ্ট কথাগুলোর নেতিবাচক অর্থ দাঁড় করায় না। পবিত্র কুরআনে সূরা হুজরাতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কারণ, কোনো কোনো অনুমান পাপ!'
আপনি যখন কোনো বিষয়ে বা কারও ব্যাপারে মন্দ ধারণা করেন, সেটা সত্য কিংবা মিথ্যা হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জানিয়ে দেন, বেশির ভাগ অনুমান থেকে যেন আমরা দূরে থাকি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। ব্যতিক্রমের ব্যাপারটা নিয়ে পরে আলোচনা করছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধারণার ব্যাপার নিয়ে আমাদের সতর্ক করে বলেন, তোমরা কারও প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড়ো মিথ্যা।
ধরুন, আপনার বাসায় কেউ একজন বেড়াতে এলো। সে চলে যাওয়ার পর আপনি আপনার মোবাইল খুঁজে পাচ্ছেন না। ধারণা করে নিচ্ছেন, সে চুরি করেছে। আর এ কথা আশপাশের কয়েকজনকে বললেন। তারপর যে বাসায় এসেছিল, তাকেও জিজ্ঞেস করলেন, আমার মোবাইলটা কি দেখেছ?
দুদিন পর দেখা গেল আপনার বালিশের নিচে মোবাইলটা বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। আপনি বেমালুম ভুলে গিয়েছেন, এটা বিছানার ওপর বালিশের কাছে ছিল। দেখুন, ধারণার বশবর্তী হয়ে একজনের ব্যাপারে অপবাদ দিলেন। তাকে লজ্জা দিলেন। এখন কি আর তার সাথে কখনো ভালো সম্পর্ক হতে পারে?
আয়িশা (রা.)-এর ঘটনায় দেখা যায়, যারা অপবাদ রটিয়েছিল তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। অপবাদ রটনাকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা যেমন শাস্তির কথা উল্লেখ করেন, বাকিদের ব্যাপারেও তিনি বলেন-
'এ কথা শোনার পর মুমিন পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করেনি এবং বলেনি-এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ?'
এই আয়াতে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, ঘটনাটি শোনার পর সাহাবিরা কেন আয়িশা (রা.)-এর ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করেননি। তাঁরা এখনও কেন মন্দ ধারণা করেন?
উম্মে আইয়ুব (রা.) তাঁর স্বামী আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আয়িশা (রা.) সম্পর্কে যেসব কথা বলাবলি হচ্ছে সেগুলো শুনেছেন? আবু আইয়ুব আনসারি স্ত্রীর এমন প্রশ্ন শুনে তার অবস্থান জানিয়ে দিলেন এবং বললেন-হ্যাঁ, শুনলাম। তবে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
এ কথা বলে তিনি উদাহরণ দিলেন, আচ্ছা উম্মে আইয়ুব! বলো তো, তুমি এমন কাজ করতে পারতে? উম্মে আইয়ুব বললেন-নাউজুবিল্লাহ! না, কখনোই না, এমন কাজ আমি করতেই পারি না। এটা আমার জন্য অসম্ভব। আবু আইয়ুব স্ত্রীকে বোঝালেন-দেখো, তোমার চেয়ে আয়িশা (রা.) শতগুণে উত্তম ও মর্যাদাসম্পন্ন। তিনি এমন কাজ কীভাবে করতে পারেন?
আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) এমন উদাহরণের মাধ্যমে শেখালেন, কোনো গুজব বা ধারণাপ্রসূত কথা প্রমাণিত হওয়ার আগপর্যন্ত একজন মানুষের ব্যাপারে কীভাবে সুধারণা করতে হয়। নিজের স্ত্রীর উদাহরণ দিয়ে বোঝালেন-যেখানে তুমি এমন কাজ করতে পারো না, সেখানে আয়িশা (রা.) কীভাবে এমন কাজ করতে পারেন?
এখন প্রশ্ন হতে পারে, কীভাবে আমরা অন্যের ব্যাপারে সুধারণা রাখব?
টিকাঃ
১২০ সূরা হুজুরাত: ১২
১২১ সহিহ বুখারি: ৫১৪৩
১২২ সূরা নূর: ১২
১২৩ তাফসির ইবনে কাসির; সূরা নূরের ১২ নম্বর আয়াতের তাফসির।
📄 ইসলাম নিয়ে গর্ববোধ করা
একজন মুমিন সব সময়ই তার ধর্ম নিয়ে গর্ববোধ করে। ইসলাম নিয়ে কখনোই হীনম্মন্যতায় ভোগে না। এটি মুমিনের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। কেউ কেউ মনে করতে পারেন-ইতঃপূর্বে আমি মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য বলেছি বিনয় দেখান। এখন যদি বলি আরেকটি বৈশিষ্ট্য গর্ব করা। তাহলে দুটি বৈশিষ্ট্য বিপরীত হয়ে গেল না?
না, এই দুটি বৈশিষ্ট্য পরস্পর বিপরীত না। মুমিন যখন নিজের ধর্ম নিয়ে গর্ব করবে, তখন সে নিজেকে নিয়ে গর্ব করবে না। সে বলবে না, আমি অন্যের চেয়ে ভালো মুসলিম বা বেশি আমলদার। সে গর্ব করবে এই ভেবে-আমি যে ধর্মের অনুসরণ করি, এই ধর্মই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। সে বলবে-আল্লাহ আমাকে এমন এক ধর্মের অনুসারী বানিয়েছেন, যে ধর্ম তাঁর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য। এই গর্বের কারণ সে নিজে না; বরং সে যা অনুসরণ করে তা। কুরআনে আল্লাহ বলেন- 'যে সম্মান চায়, তার জানা উচিত-আল্লাহর জন্যই সকল সম্মান।
সকল সম্মান আল্লাহর কাছেই। এই সম্মান আল্লাহ কাকে দেন? পবিত্র কুরআনে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন- 'সম্মান তো আল্লাহরই; আর তাঁর রাসূল ও মুমিনদের।'
সম্মানবোধ আর অহংকারের মধ্যে পার্থক্য আছে। ইসলাম নিয়ে গর্ব করা, নিজেকে সম্মানিত মনে করা আর অহংকার করা এক না। আমি যখন ইসলাম নিয়ে গর্ব করব, এর মানে দাঁড়ায়, আমি বলছি-আল্লাহ আমাকে ইসলামের পথ দেখিয়েছেন। আমি সুমহান দ্বীনের পথ অনুসরণ করছি, যে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে নবি-রাসূলগণ এসেছিলেন। এটা আমার কৃতিত্ব না। আমি এর জন্য অহংকার করছি না; বরং গর্ববোধ করছি। অহংকারের সঙ্গে 'আমার' কোনো সম্পর্ক নেই, আমি কীসের অনুসরণ করছি সম্পর্ক সেটার সাথে। এই ধরনের গর্ববোধ, আত্মসম্মান প্রত্যেক মুমিনের থাকা উচিত। একজন মুমিন কখনোই তার ধর্ম নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে না। নবিজি বলেন, কোনো মুমিন ব্যক্তির জন্য নিজেকে অপমানিত করাটা শোভনীয় নয়।
কেউ যদি কখনো ইসলাম নিয়ে হাসি-তামাশা করে, ধর্মের অবমাননা করে, অবশ্যই আমরা এর বিরুদ্ধে কথা বলব। কেউ যদি ধর্ম নিয়ে খোঁটা দেয়, সেখানে মুমিন কখনো লজ্জিত হতে পারে না। কারণ, তার ধর্ম নিয়ে সে আত্মবিশ্বাসী, প্রজ্ঞার সাথে এসব অপপ্রচারের জবাব দেবে।
অনেকেই দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য নিজের নাম, সন্তানের নামের সাথে ইসলামি কোনো নাম সন্নিবেশ করতে হীনম্মন্যতায় ভোগে। তারা মনে করে, যদি নামের সাথে ইসলামের কোনো নিদর্শন থাকে, তাহলে যদি ওই দেশে ঢুকতে না দেয়? দাড়ি রাখার দরুন যদি 'জঙ্গি' বলে, এই ভেবে অনেকেই দাড়ি রাখতে ভয় পায়। নামাজ পড়লে স্যার যদি কিছু মনে করেন, অফিসের বস যদি নারাজ হন-এই ভয়ে কেউ কেউ নামাজ পড়া বাদ দিয়ে দেয়।
তারা দ্বীনের চেয়ে মানুষকে বেশি মূল্য দেয়। দ্বীনের ব্যাপারে তারা আত্মবিশ্বাসী না। বিধিবিধান মানার ব্যাপারে গর্ববোধ করে না, কেমন যেন লজ্জাবোধ করে। এই ধরনের মনোভাব কোনো মুমিনের হতে পারে না।
রাসূল ও সাহাবিদের জীবনী পড়লে আমরা এমন দৃশ্য দেখতে পাই। তাঁদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। নামাজরত অবস্থায় ময়লা-আবর্জনা তাঁদের ওপর ঢেলে দেওয়া হয়েছে। আত্মীয়স্বজনকে করুণভাবে হত্যা করা হয়েছে। শারীরিক-মানসিক সব দিক থেকেই নির্যাতন করা হয়েছে। তবুও তাঁরা দ্বীনের ওপর অটল ছিলেন। কেউ তাঁদের আত্মবিশ্বাস থেকে সামান্য পরিমাণও টলাতে পারেনি।
এখনকার সময়ে দেখা যায়, ব্যক্তি তার সমাজ এবং দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করে। সব সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, অপ্রথম ও প্রধান পরিচয় হলো আমরা মুসলিম। বাকি অন্যান্য পরিচয় হলো মুসলিম পরিচয়ের পরের পরিচয়। এখন কেউ কেউ ভাবতে পারেন, তাই বলে কি আমরা দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করব না?
হ্যাঁ, অবশ্যই করবেন। তবে সেটা শর্তযুক্ত। ইসলাম আপনাকে যতটুকুর অনুমোদন দিয়েছে, ঠিক ততটুকুই। ধরুন, বাংলাদেশে পদ্মার ইলিশ পাওয়া যায়। এই ইলিশ খেতে এতই সুস্বাদু, পৃথিবীর অনেক দেশে নানান নদীর ইলিশ খেয়ে আপনি এতটা মজা পাননি। এজন্য গর্ববোধ করতে পারেন- আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে এমন এক দেশে বসবাসের সুযোগ দিয়েছেন, যে দেশের ইলিশ পৃথিবীর সব দেশের ইলিশের চেয়ে সুস্বাদু।
কিন্তু আপনি যেই মুহূর্তে আরেকটি দেশের মানুষের চেয়ে নিজেকে উত্তম মনে করবেন, অমুক লোকটি আরেক দেশে জন্মগ্রহণ করেছে বলে তাকে আপনার চেয়ে হীন মনে করবেন-সেটা সমস্যাজনক, ভেতরে অহংবোধের জন্ম নেবে।
ধরুন, আপনি ভাবছেন-অমুক ব্যক্তি পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছে বলে খারাপ বা সৌদি আরবের কেউ যদি মনে করে অমুক মুসলিম লোকটা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে বিধায় সে খারাপ মুসলিম; এটা বর্ণবাদী মনোভাব। আবার আপনি যদি মনে করেন-আপনার গায়ের রঙের কারণে আপনি নাইজেরিয়ার মানুষের চেয়ে উত্তম, তাহলে আপনি বর্ণবাদী। তেমনই ইউরোপের কেউ যদি মনে করে তারা তাদের গায়ের রঙের কারণে পৃথিবীর বাকিদের চেয়ে উত্তম এবং সেরা; এটাও বর্ণবাদী মনোভাব। আমাদের একমাত্র শর্তহীন আনুগত্য ইসলামের জন্য। অন্য কোনো পরিচয়ের ক্ষেত্রে আমরা এমন আনুগত্য দেখাব না।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার জেরুজালেম যাবেন বলে প্রস্তুতি নেন। তাঁর হাতে হস্তান্তর করা হবে বায়তুল মুকাদ্দাসের চাবি। রওনা হন জীর্ণশীর্ণ জামা পরে। সাহাবিরা তাঁকে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন একটি ভালো জামা পরেন। কারণ, তিনি একটি বিত্ত ও সমৃদ্ধশালী অঞ্চলে যাচ্ছেন, সেখানে অনেক লোক আসবে তাঁর সাথে দেখা করতে। এমন পোশাক দেখে বাকিরা হয়তো তাঁকে অবজ্ঞা করতে পারে। সাহাবিদের পরামর্শ উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আমলে নিলেন না। তিনি বললেন, আমরা ছিলাম সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি। আল্লাহ আমাদের ইসলাম দ্বারা সম্মান দান করেছেন। সুতরাং, আল্লাহ আমাদের যা দ্বারা সম্মান দান করেছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো জিনিস দ্বারা যখন আমরা সম্মান অনুসন্ধান করব, তখনই তিনি আমাদের লাঞ্ছিত করবেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ, সম্মানিত, বিপুল সম্পদে ভরপুর অঞ্চলে যাওয়ার সময় পোশাক পরিবর্তন করেননি। যে ধরনের পোশাক পরে নবিজির যুগ, সাহাবিদের যুগ কাটান, সেই ধরনের পোশাক পরেই তিনি জেরুজালেম যান। কারণ, তিনি মনে করতেন, পোশাকের সাথে সম্মানের সম্পর্ক নেই। সম্মানের সম্পর্ক ইসলামের সাথে।
ইসলাম নিয়ে কখনোই হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না। ইসলাম এমন কোনো ধর্ম না যে, হীনম্মন্যতায় ভুগবেন। কেননা, আমরা যখন ইসলাম মেনে চলব, আল্লাহ আমাদের সম্মান দান করবেন। ইসলাম ছাড়া অন্য কোথাও সম্মান তালাশ করলে সম্মান খুঁজে পাব না; বরং আল্লাহ আমাদের অপদস্থ করবেন।
নামাজের সময় হলে নামাজে যান। আপনার 'বস' কী মনে করবেন, শিক্ষক কী মনে করবে এটা ভাবলে তো হবে না। যানবাহনে নামাজ পড়া লাগলে সেখানেই নামাজ শুরু করুন। লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
আজ থেকে ২০ বছর আগের ঘটনা। আমি একবার এয়ারপোর্ট যাই এক জায়গায় যাব বলে। দেখলাম একজন মহিলা 'ইয়োগা' (ব্যায়ام) করছে। যাত্রা শুরুর আগে আধা ঘণ্টা বিরতি পেয়েছিল, বিরতির সময়টা সে কাজে লাগাচ্ছে ব্যায়াম করে।
সেদিনই আমার ভেতর এ কথার উদ্রেক হয়-একজন মহিলা দুনিয়াবি একটি কাজ জনসম্মুখে করতে ভয় পাচ্ছে না, তার সংকোচ হচ্ছে না, সামান্য লজ্জাও পাচ্ছে না। আমি কেন শ্রেষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের প্রয়োজনে জনসম্মুখে নামাজ পড়তে পারব না?
এমন কোনো পরিস্থিতি যদি আসে, যেখানে রাস্তার পাশে আমাকে নামাজ পড়তে হবে, দাঁড়িয়ে যাব। কে কী বলবে, কে কী মনে করবে ভাবলে চলবে না। তবে কাজটা আমার ধর্মে প্রতি অনুরাগ ও প্রজ্ঞার সাথে করতে হবে। আশপাশে কোনো সিকিউরিটি থাকলে তাদের জানিয়ে দেবো, আমি নামাজ পড়ছি। অন্য কিছু মনে করার কারণ নেই।
আপনি নামাজ পড়লে এ নিয়ে অনেকেই ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে পারে। এমনটা ভাববেন না যে, আপনিই প্রথম। ইসলামের শুরু থেকেই এহেন কর্ম হয়ে আসছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যখন তোমরা নামাজের দিকে আহ্বান করো, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। এর কারণ-তারা নির্বোধ। '
নির্বোধরা ইসলাম নিয়ে সমালোচনা করবে, নামাজ পড়া নিয়ে সমালোচনা করবে। তাই বলে নির্বোধের কথায় পাত্তা দিলে চলবে না। আমরা এমন এক ধর্মের অনুসরণ করি, যেই ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং এই ধর্ম নিয়ে আমরা গর্বিত।
টিকাঃ
১৩১ সূরা ফাতির : ১০
১৩২ সূরা মুনাফিকুন: ৮
১৩৩ জামে আত-তিরমিজি: ২২৫৪
১৩৪ মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪৪৮১
১৩৫ সূরা মায়েদা: ৫৮
📄 লজ্জা : ঈমানের অঙ্গ
মুমিনের গুণাবলির মধ্যে অন্যতম একটি গুণ হলো লজ্জাশীলতা। যার মধ্যে লজ্জাবোধ নেই, তার ঈমান নেই। একজন মুমিনের মধ্যে অবশ্যই লজ্জাবোধ থাকা প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুসা (আ.)-এর ঘটনা উল্লেখ করতে গিয়ে দুজন নারীর কথা উল্লেখ করেন। মুসা (আ.) ফেরাউনের দরবার থেকে পালিয়ে যখন মাদায়েন যান, তখন তাদের দেখতে পান। নারীদের একজনের হাঁটার ধরনের কথা উল্লেখ করে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অতঃপর নারীদ্বয়ের একজন লাজুকভাবে হেঁটে তার কাছে এসে বলল, আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন।'
এই নারী পরবর্তী সময়ে মুসা (আ.)-এর স্ত্রী হন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁর লজ্জাশীলতার প্রশংসা করেন। তিনি যখন মুসা (আ.)-এর সাথে কথা বলতে আসেন, তখন এমনভাবে হেঁটে আসেন, তাঁর হাঁটার মধ্যে লাজুকতা প্রকাশ পাচ্ছিল। এই গুণটি আল্লাহ তায়ালা ভীষণ পছন্দ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ লজ্জাশীল, গোপনীয়তা অবলম্বনকারী। তিনি লজ্জা ও গোপনীয়তা পছন্দ করেন।
আমাদের সকল নবিই লজ্জাশীল ছিলেন। লজ্জাশীল ছিলেন স্ত্রীরাও। এ গুণ আল্লাহর কাছে প্রশংসনীয়। নবিজি বলেন, ঈমানের শাখা ৭০টিরও বেশি। আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।
একবার নবিজি সাহাবিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন এক সাহাবি আরেক সাহাবিকে বললেন, তুমি এত লজ্জা পাও, কীসের এত লজ্জা তোমার? রাসূলুল্লাহ তখন লজ্জাশীল সাহাবির প্রশংসা করে বলেন, লজ্জাশীলতায় কল্যাণ ছাড়া কোনো কিছু নেই।
এখন প্রশ্ন হলো, লজ্জাশীলতা কী?
এমন কিছু থেকে বিরত থাকা, যে কাজ করলে অন্য কেউ আপনার সমালোচনা করতে পারে। সে তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ত্রুটি ঢেকে রাখতে চায়। অন্যের সামনে সেগুলো প্রকাশ করতে চায় না। নবিজি বলেন, প্রথম যুগের নবি-রাসূলগণের উক্তিসমূহের মধ্যে যা মানবজাতি লাভ করেছে, তন্মধ্যে একটি- যদি তোমার লজ্জা না থাকে, তাহলে তুমি যা ইচ্ছা তা-ই করো।
নিম্নস্তরের কোনো কিছু করার শেষ লাইন হলো লজ্জা। আপনি কোনো পাপ কাজ করতে পারছেন সেটা এজন্য, কারণ লজ্জার সীমা অতিক্রম করেছেন। মানুষ যখন লজ্জার সীমা অতিক্রম করে, তখন খুব সহজেই পাপাচারে লিপ্ত হতে পারে।
আমরা এমন একসময়ে বসবাস করছি, যখন মানুষের মধ্য থেকে লজ্জা-শরম একেবারেই উবে গিয়েছে। এখনকার সময়ে লোকসম্মুখে স্বভাবতই কেউ যদি কোনো কিছু নিয়ে লজ্জা পায়, তাকে নিয়ে মানুষ ঠাট্টা করে। কেউ যদি বলে, আমি মেয়েদের দিকে তাকাই না। এ কথা শুনে তার বন্ধুরা হাসিতে ফেটে পড়ে। কারণ, যে বন্ধুটা লজ্জা পায়, তারা তাকে অদ্ভুত মনে করে! অথচ হওয়ার কথা ছিল এর উলটো। হাসিঠাট্টা নয়, বন্ধুকে কাছে ডেকে তার প্রশংসা করা উচিত ছিল।
আমি বড়ো হই আশির দশকে। যারা টিভি দেখত, আমার আম্মা-আব্বা তাদের সমালোচনা করতেন। বলতেন, আস্তাগফিরুল্লাহ! দেখো সে টিভি দেখছে।
অথচ আমাদের এই সময়ে এসে টিভি দেখা খাবার খাওয়ার মতো স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। চিন্তা করি-আমার সন্তানেরা যা দেখছে, যেভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযুক্ত হচ্ছে-ভবিষ্যৎ কেমন হবে, ভয় হয় তাদের নিয়ে। টিভি দেখাকে আমার আব্বা-আম্মা ভয় পেতেন। আর আমরা এখন ভয় পাচ্ছি তার চেয়েও কঠিন এবং বেশি কিছু নিয়ে।
এক প্রজন্মের মধ্যেই এত কিছুর বদল! মোটামুটি সবার মধ্য থেকে লজ্জাবোধ উবে গেল। ছোটোবেলায় দেখতাম সিনেমা দেখতে গিয়ে গানের সিন এলে টিভি বন্ধ করা হতো। আবার কয়েকজন উঠেও যেত। এখন টিভিতে পরিবারসহ সবাই মিলে যা যা দেখে, সেটা তখনকার সময়ের সাথে মেলালে কল্পনাই করা যায় না। আজ থেকে দুই যুগ আগের মানুষ এমনটা ভাবতেই জানত না।
আপনার ঘরে টিভি, মোবাইল না থাকলেও আপনি এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাবেন না। পরিবার-সন্তানদের নিয়ে যখন কোথাও বেড়াতে যাবেন, বিকেলে হাঁটতে রাস্তায় বেরোবেন, ভয়ংকর বিলবোর্ডের দিকে চোখ যাবে। স্মরণ করলে দেখা যাবে, বিলবোর্ডের এমন দৃশ্য আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগেও ছিল না।
হে মুসলিম সম্প্রদায়! আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই-আমরাই শেষ প্রজন্ম, যারা লজ্জাশীলতাকে ধারণ করে আছি। এক্ষেত্রে যদি আমরা ভুল করি, চর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারি, তাহলে মানবজাতির মাঝে যে লজ্জাশীলতা বলে একটা কিছু আছে, তা একেবারেই মুছে যাবে। পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীরা আমাদের মতো লজ্জাশীলতার চর্চা করে না। তাদের মাঝে লজ্জাবোধের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি যারা মূলধারা হিসেবে নিজেদের দাবি করে, ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মধ্যেও পাওয়া যায় না।
যখন সবার মাঝেই লজ্জাশীলতার অনুপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তখন আমাদের দায়িত্ব বেড়ে যায়। মানবজাতিকে জানিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় লজ্জাশীলতা কী? আমাদের সন্তানদের লজ্জার বিষয়টি শেখাতে হবে। যদিও নিজেদের মধ্যে এর চর্চা অব্যাহত রাখলেই সন্তানরা সহজে বুঝবে, ধারণ করতে পারবে।
আরেকটি জিনিস আমাদের বুঝতে হবে। যারা অমুসলিম, তারা হয়তো লজ্জাশীলতার চর্চা ওভাবে করে না। কিন্তু তাদের ফিতরাত তাদের জানিয়ে দেয়, লজ্জাশীলতা একটি ভালো গুণ। ফলে তাদের কেউ যখন এমন গুণ দেখতে পায়, তখন প্রশংসা করে।
অমুসলিমদের দাওয়াত দেওয়ার অন্যতম সহজ উপায় হলো লজ্জাশীলতার গুণ অর্জন করা। আপনি যখন এই গুণের মাধ্যমে তাদের দাওয়াত দেবেন, সন্তুষ্টচিত্তে তারা সেই গুণের প্রশংসা করবে। কারণ, আশেপাশে এমন গুণসম্পন্ন মানুষ সচরাচর তারা দেখতে পায় না। প্রাথমিকভাবে হয়তো লজ্জাশীলতা নিয়ে হাসি-তামাশা করতে পারে, কিন্তু এর অন্ধত্ব শেষ হলে ঠিকই তারা এই গুণের স্বীকৃতি দেবে।
আমি একজন নারীর পরিচয় জানি এবং ব্যক্তিগতভাবেও তাকে চিনি। সেই নারী একজন মুসলিমের লজ্জাশীলতার এই গুণ দেখে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি খেয়াল করেন অফিসের সবাই তার সাথে ফ্ল্যার্ট করে, পটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু একজন পুরুষ তাকে এড়িয়ে চলে। এতদিনে একবারও তার দিকে তাকায়নি। সেই নারী অবাক হলেন। একদিন জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমার দিকে তাকান না কেন?
তার ওই কলিগ উত্তর দিলেন, আমি মুসলিম। ইসলাম আমাকে বলে দিয়েছে, কোনো নারী যদি সামনে পড়ে, তোমার দৃষ্টিকে হেফাজত করো। দৃষ্টিকে নত করো। আর তাদের সাথে যদি কথা বলার প্রয়োজন হয়, সম্মানের সাথে কথা বলো। মুসলিম পুরুষের এমন লজ্জাশীল আচরণ দেখে সেই নারী ইসলাম গ্রহণ করেন। এখন তিনি নিয়মিত ইসলাম অনুশীলনসহ বেশ ভালোভাবে ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
আপনি যা বলবেন, পরিবেশ খেয়াল করে বুঝেশুনে বলুন। এমন কোনো কথা বলবেন না, যা শুনতে খারাপ লাগে এবং এর মধ্যে অশ্লীলতা আছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব বিষয়ে কখনোই খোলামেলা আলোচনা করেননি। আল্লাহ বলেন-যখন তারা হুজরা থেকে বের হয়; ভেতরে কী কী করে, কী কী হয়, সেটা তিনি বলেননি। আল্লাহ বলেন-যখন তোমরা স্ত্রীদের স্পর্শ করো, স্বামী কিন্তু স্ত্রীদের কেবল স্পর্শই করে না। আল্লাহ এসব ব্যাপার খোলামেলা আলোচনা না করার জন্য এমন প্রতীকী কথা বলে এর প্রতি নিরুৎসাহিত করেছেন।
এসব বিষয় আমরা যত বেশি খোলামেলা আলোচনা করব, অশ্লীলতার প্রচার তত বেশি হবে। অশ্লীলতা থামানোর জন্য এর প্রচার করতে হয় না, সেগুলোর কথা বিস্তারিত উল্লেখ করতে হয় না। যখন আপনি বিস্তারিত উল্লেখ করবেন, তখন 'লজ্জাশীল' গুণটির কথা আপনি ভুলে গেলেন। নবিজি বা সাহাবিগণ এই ধরনের কথা আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন, বিস্তারিত বলেননি।
একবার জনৈক মহিলা নবিজির কাছে গিয়ে হায়েজের গোসল সম্পর্কে মাসয়ালা জানতে চান। রাসূলুল্লাহ গোসলের নিয়ম বলে দেন-এক টুকরো কস্তুরী লাগানো নেকড়া দিয়ে পবিত্রতা হাসিল করো। মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে পবিত্রতা হাসিল করব? নবিজিকে একই প্রশ্ন তিনবার করা হলে প্রত্যেকবার তিনি একই উত্তর দেন। অতঃপর আয়িশা (রা.) মহিলাকে ডেকে নিয়ে বিস্তারিত বলেন।
নবিজি কিছু শব্দ উহ্য রেখে তাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মহিলা বুঝলেন না। ফলে আয়িশা (রা.) তাকে ব্যাপারটি বিস্তারিত বুঝিয়ে দেন। এ থেকে রাসূলুল্লাহর লজ্জাবোধের বিষয়টিও বোঝা যায়।
আপনি কীভাবে, কী রকম পোশাক পরছেন, তা থেকে আপনার লজ্জাবোধ সম্পর্কে অনুমান করা। আপনি কতটা ভদ্র-শালীন সেটা বোঝার প্রথম লক্ষণ হলো, আপনি কেমন পোশাক পরেছেন। নারী ও পুরুষ কেমন পোশাক পরবে এ নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা দেওয়া আছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন- 'হে বনি আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবে এবং সৌন্দর্যস্বরূপ প্রকাশ করবে। আর তাকওয়ার পোশাক, তা উত্তম। এগুলো আল্লাহর নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।'
আল্লাহর সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাতের মধ্যে আমরাই একমাত্র প্রাণী, যারা পোশাক পরি। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে এ নিয়ম নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য একে বিধান করে পাঠিয়েছেন লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য। আর এই পোশাকই যদি লজ্জাস্থান ঢাকতে না পারে, তাহলে পোশাকের কোনো মূল্য নেই। মা-বোনদের নিকট আমার অনুরোধ। আল্লাহ আপনাদের এমন কিছু দান করেছেন, যা আমাদের দান করেননি। আপনাদের যে সক্ষমতা দান করা হয়েছে, দায়িত্বও আপনাদের অনেক বেশি। যখন লজ্জাশীল আচরণ করবেন, তখন কোটি কোটি টাকার কসমেটিক্স শিল্পকে আপনি তোয়াক্কা করছেন না; এড়িয়ে চলছেন, অশ্লীলতাকে 'না' বলছেন।
তবে সবকিছুতেই আবার লজ্জাশীলতাকে প্রাধান্য দেবেন না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লজ্জাশীলতা শোভা পায় না। যেমন: দ্বীনি ইলম বা যেকোনো জ্ঞানের ব্যাপারে কোনো কিছু জানা। একটি বিষয় সম্বন্ধে আপনি বিস্তারিত জানেন না, জানার আগ্রহবোধ করছেন এবং দরকারও; কিন্তু কাউকে জিজ্ঞেস করতে লজ্জা পাচ্ছেন, সংকোচবোধ করছেন। তার মানে এই না, লজ্জার কারণে তা জানতে চাইবেন না; বরং লজ্জা ভেঙে ভদ্রভাবে যা যা জানা দরকার জিজ্ঞেস করবেন। এই সম্পর্কিত নবিজির একটি হাদিস দিয়েই আলোচনার ইতি টানছি। হাদিসটি আমাদের মুখস্থ রাখা উচিত। নবিজি বলেন, প্রতিটি ধর্মের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। আর ইসলামের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো লজ্জাশীলতা।
টিকাঃ
১৩৬ সূরা কাসাস: ২৫
১৩৭ সুনানে আবু দাউদ: ৪০১২
১৩৮ সহিহ মুসলিম: ৫৮
১৩৯ সহিহ বুখারি: ৬১১৭
১৪০ সহিহ বুখারি: ৩৪৮৪
১৪১ সহিহ বুখারি: ৩১৪
১৪২ সূরা আরাফ: ২৬
১৪৩ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৮১