📘 মুমিনের আখলাক > 📄 হাসিমুখে কথা বলা

📄 হাসিমুখে কথা বলা


সব সময় হাসিখুশি থাকা মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য। একজন মুমিন সারাক্ষণ গম্ভীর মুখে থাকতে পারে না। মাঝেমধ্যে সে হাসবে, আনন্দ করবে। জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) মদিনায় বসবাস করতেন। তিনি বলেন, যখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার দিকে তাকাতেন, তিনি মুচকি হাসতেন।
জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) প্রতিদিন অন্তত পাঁচবার মসজিদে নববিতে নামাজ পড়তে যেতেন। দিনের অন্যান্য সময়েও রাসূলুল্লাহর সাথে তাঁর দেখা হতো। তিনি বলেন-নবিজি যখনই তাঁর দিকে তাকাতেন, হাসিমুখে তাকাতেন। আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রা.) নামে আরেকজন সাহাবি ছিলেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর চাইতে বেশি মুচকি হাসি দিতে আর কাউকে দেখিনি।
নবিজি নিজে যেমন হাসিখুশি থাকতেন, তেমনই আমাদেরও হাসিখুশি থাকার উপদেশ দেন। অন্যের সাথে হাসিমুখে কথা বলাকে যেন তুচ্ছভাবে না দেখি, সেজন্য তিনি সতর্ক করেন। বলেন, কোনো নেক আমলকে হীন মনে করো না; হোক সেটা ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ।
আমরা যদি কারও সাথে হাসিমুখে কথা বলি, তাতেও সওয়াব আছে আর সেটা হলো সাদাকার সওয়াব। নবিজি বলেন, প্রতিটি ভালো কাজই সাদাকারূপে গণ্য। তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে দেখাসাক্ষাৎ করাও (সাদাকার অন্তর্ভুক্ত)।
আমি একটি বিষয় লক্ষ করেছি। তা হলো, যারা দ্বীনে ফেরে, ফেরার পর আকস্মিকভাবেই তাদের মেজাজ রুক্ষ হয়ে যায়। দিনের অধিকাংশ সময়ই মেজাজ উত্তপ্ত থাকে। মুখে হাসি দেখা যায় না। কেমন যেন রাগান্বিত, ধমকাধমকির মধ্যে থাকে। আমি জানি না তারা কোন সুন্নাহ পালন করে, এমন সুন্নাহ তারা কোথায় পেয়েছে!
ইসলাম আমাদের বলে, আমরা যেন সব সময় হাসিখুশি থাকি। অন্যের সাথে হাসিমুখে আনন্দচিত্তে কথা বলি। কোনো ক্ষেত্রে রাগ দেখানো বা ধমক দেওয়ার প্রয়োজন হলে ধমক দেবো, রাগ দেখাব। কিন্তু আমাদের আদর্শিক আচরণ হলো সব সময় সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলা।
সাইকোলজিস্টরা বলেন, হাসিখুশি থাকলে রক্তচাপ কমে যায়। এটি এমন একটি কাজ, যার প্রভাব আপনার পাশেরজনের ওপর পড়বে। অন্যজনও হাসিমুখে থাকবে। আপনি রাগান্বিত অবস্থায় থাকলে আপনার পাশেরজনও অবচেতন মনেই আপনার রাগ দেখে রাগান্বিত হবে। নবিজি মাঝেমধ্যে অট্টহাসি হাসতেন। এমনভাবে হাসতেন, সাহাবিরা তাঁর মাড়ির দাঁত দেখতে পেতেন।
তবে রাসূলুল্লাহ এমনভাবে হাসতেন না, যেভাবে হাসলে খারাপ দেখা যায়। ফজরের নামাজ পড়ে সাহাবিরা মসজিদে বসতেন। কেউ কেউ জাহেলিয়াতের সময়ের গল্প বলতেন, সবাই হাসতেন। নবিজিও ওই মজলিসের হাসিতে অংশগ্রহণ করতেন।
নবিজি প্রায় সময় কৌতুক বলতেন। সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনিও আমাদের সাথে কৌতুক করছেন? সাহাবিরা অবাক হতেন এই কারণে, নবিজির মতো একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষ কি তাদের সাথে কৌতুক করতে পারেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি কৌতুকচ্ছলে কখনো সত্য ছাড়া মিথ্যা বলি না।
নবিজি মজা করতেন বটে, তবে মজাচ্ছলে মিথ্যা বলতেন না। কাউকে হেয় করতেন না, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন না। একবার এক বৃদ্ধা নবিজির কাছে এসে অনুরোধ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কাছে দুআ করুন, আমি যেন জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, শুনুন! কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না!
এ কথা শুনে বৃদ্ধা কান্না জুড়ে দেয়। তখন নবিজি জানিয়ে দিলেন, আপনি বৃদ্ধা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। কারণ, জান্নাতে সবাই কুমারী হয়েই যাবে।
একবার এক সাহাবি এসে নবিজির কাছে একটি উট চান। নবিজি তাকে বলেন, আমি তোমাকে একটি উটনীর বাচ্চা দিচ্ছি। সাহাবি চাইলেন উট, রাসূলুল্লাহ দিতে চাইলেন উটনীর বাচ্চা! এটা শুনে সাহাবি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? এবার তিনি উত্তরে বললেন, প্রত্যেক উটই তো কোনো না কোনো উটের বাচ্চা!
জাহির (রা.) নামের একজন বেদুইন ছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে নবিজির কাছে হাদিয়া নিয়ে আসতেন। দেখতে তিনি কালো ছিলেন। চলে যাওয়ার সময় নবিজি বলতেন, জাহির আমাদের পল্লিবন্ধু। আর আমরা তাঁর শহুরে বন্ধু!
জাহির একবার বাজারে বেচাকেনা করছিলেন। নবিজি তাকে পেছন থেকে জাপটে ধরেন। তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। যখন বুঝতে পারলেন তাঁকে পেছন থেকে আর কেউ নন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাপটে ধরেছেন, তখন নিজের পিট রাসূলুল্লাহর বুকের সাথে মেলালেন।
নবিজি বাজারে হাঁক দিলেন, আমার এই গোলামটিকে কে কিনবে? জাহির (রা.) মন খারাপ করে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে বিক্রি করলে কেবল অচল মুদ্রাই পাবেন! রাসূলুল্লাহ তাঁর দুঃখ বুঝতে পারলেন। তিনি জাহির (রা.)-এর মনটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন। মানুষ তাঁকে মূল্যায়ন করে না, এটা ঠিক। কিন্তু যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনি? নবিজি বললেন, কিন্তু তুমি আল্লাহর নিকট অচল নও। আল্লাহর নিকট তোমার উচ্চমর্যাদা রয়েছে।
নবিজি প্রায়ই সাহাবিদের সাথে মজা করতেন, বিভিন্ন কথা বলে বলে তাঁদের আনন্দিত করতেন। তবে আমাদের কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে :
ক. আমরা যখন কারও সাথে মজা করব, খেয়াল রাখব সে কষ্ট পাচ্ছে কি না। মজাচ্ছলেও এমন কথা বলা যাবে না, যা শুনলে আরেকজন কষ্ট পায়।
খ. মজাচ্ছলে এমন কিছু করা যাবে না, যা দেখে আরেকজন ভয় পায়। যেমন : তেলাপোকা, সাপ-বিচ্ছু দেখিয়ে ভয় দেখানো ইত্যাদি।
নবিজির কয়েকজন সাহাবি একবার একটি সফরে গেলেন। পথমধ্যে একজন সাহাবি ঘুমিয়ে ছিলেন। আরেকজন সাহাবি তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলেন। এটা করেন কেবল মজা করার জন্যই। ঘুমন্ত সাহাবি ঘুম থেকে উঠলে কী ভাববেন? হয়তো এমনটাও ভাবতে পারেন—তাকে কেউ বন্দি করেছে বা গুম করার জন্য তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
ঘুমন্ত অবস্থায় বেঁধে ফেলার ফলে তিনি আচমকা ঘুম ভাঙার পর ভয় পেয়ে যান। এই ঘটনাটি নবিজির কানে পৌঁছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, একজন আরেকজনের সাথে মজা করে তো এমনটা করতেই পারেন। একজনকে ভয় দেখিয়ে হলেও তো বাকিরা আনন্দ পেল। কিন্তু না। রাসূলুল্লাহ এই ঘটনাটি শোনার পর কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, কোনো মুসলমানের জন্য আরেক মুসলমানকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো-সে নিজে হাসিখুশি থাকবে, অন্যকে হাসিখুশি রাখবে। সারাক্ষণ রাগত আর ভার মুখো হয়ে বসে থাকলে হবে না। ভালো থাকার জন্য হলেও মাঝেমধ্যে মানুষের সাথে মজা করতে হবে।
সাহাবিরা নবিজির মুখে ইন্তেকালের কয়েক দিন আগেও মুচকি হাসি লেগে থাকতে দেখেছিলেন।
নবিজির জীবনী বা সিরাত থেকে আমরা শিখতে পারি, আমাদেরও সব সময় হাসিখুশি থাকতে হবে। আমরা যত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাই হই না কেন, অঢেল টাকাপয়সার মালিক, সমাজের বহু বড়ো মর্যাদাবান ব্যক্তিত্বই হই না কেন, সর্বাবস্থায় হাসিমুখে থাকতে হবে।

টিকাঃ
৯৯ সহিহ বুখারি: ৩০৩৫
১০০ জামে আত-তিরমিজি: ৩৬৪১
১০১ সহিহ মুসলিম: ৬৫৮৪
১০২ জামে আত-তিরমিজি: ১৯৭০
১০৩ মুসনাদে আহমাদ: ৩৫৯৫
১০৪ মুসনাদে আহমাদ: ৮৭০৮
১০৫ শামায়েলে তিরমিজি: ১৭৯
১০৬ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৭
১০৭ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৮
১০৮ সুনানে আবু দাউদ: ৫০০৪

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 আশাবাদী হওয়া

📄 আশাবাদী হওয়া


মুমিনের অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট হচ্ছে, মুমিন সব সময় আশাবাদী থাকে। তার ওপর যেকোনো বিপদ আসুক না কেন, সে ভেঙে পড়ে না। সে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে। সে জানে, আল্লাহ তাকে পথ দেখাবেন। মুমিন কেবল নিজে নিজেই আশাবাদী থাকে না, অন্যকেও তাতে উদ্বুদ্ধ করে।
এটা তখনই সম্ভব, যখন একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখে। আপনি যত বেশি আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখবেন, জীবনে তত বেশি আশাবাদী হতে পারবেন। আর যদি আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা না রাখেন, তাহলে জীবন সম্পর্কেও আপনি নিরাশ হয়ে যাবেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-আমি সে রকমই, বান্দা আমার প্রতি যে রকম ধারণা রাখে।
আপনি যদি আল্লাহর প্রতি ইতিবাচক ধারণা রাখেন, তাহলে আল্লাহর তরফ থেকে ইতিবাচক কিছুই পাবেন। যদি আশা রাখেন আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেনই। যদি এমনটা মনে করেন- আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন না, তবুও আল্লাহ ক্ষমা করবেন। কিন্তু আপনি যেমনটা ধারণা রাখবেন, আল্লাহকে আপনার জন্য তেমনই পাবেন।
ইসলামপূর্ব আরবের লোকজন অনেক জিনিসকে কুলক্ষণ বলে মনে করত। আমাদের দেশেও দেখবেন, মানুষ অনেক জিনিসকে কুলক্ষণ মনে করে। যেমন : প্যাঁচা দেখা, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হোঁচট খাওয়া, পাখি ডাকা ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব কুলক্ষণ মনে রাখা বা এসব ভাবনায় নিজেকে প্রভাবিত হওয়াকে নিন্দা করেন; তৎকালীন আরবের লোকজন যেগুলোকে কুলক্ষণ বলে মনে করত। তিনি বলেন, প্যাঁচা ও কুধারণা (বিশ্বাসের বৈধতা) নেই। আমি সুধারণা পছন্দ করি।
নবিজির জীবনেও এর প্রয়োগ দেখা যায়। হুদাইবিয়ার সন্ধিতে তিনি যখন সুহাইল ইবনে আমরকে আসতে দেখে বলেন, তোমাদের কাজ তোমাদের জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছে। এই লোকটিকে প্রেরণের অর্থ হচ্ছে কুরাইশরা সন্ধি চায়। সুহাইল ইবনে আমর তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। নবিজি তাকে দেখে আশাবাদী হন, সুধারণা পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, তাকে পাঠানোর অর্থ হচ্ছে কুরাইশরা সন্ধি চায়। পরবর্তী সময়ে তা-ই হয়।
যেকোনো কিছুকে আমরা ইতিবাচকভাবে বা শুভলক্ষণ মনে করব কীভাবে? আলিমগণ দুটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন।
ক. কোনো একটা ঘটনা ঘটলে সেটা নেতিবাচক ধারণা না করে, কুলক্ষণ মনে না করে সুলক্ষণ মনে করতে হবে।
খ. সেটাকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। যেমন: আমার মনে হচ্ছে এর মধ্যে আল্লাহ কোনো কল্যাণ রেখেছেন।
আলিমগণ এ ব্যাপারে আমাদের বেশ কিছু উদাহরণও দিয়েছেন। যেমন: মনে করুন, আপনার ঘরের মধ্যে কিছু একটা হারিয়ে গেছে। সবাই মিলে খুঁজছেন। হঠাৎ আপনার সন্তান বলে উঠল, আমি মনে হয় পেয়ে গেছি। তখন আপনি সুধারণা রাখবেন, হয়তো হারানো জিনিসটি পাওয়া গেছে।
আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। দুআ শেষে বাইরে বের হয়ে দেখলেন, আকাশে রংধনু। এটাকে আপনি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে নিতে পারেন।

টিকাঃ
১০৯ সহিহ বুখারি: ৭৪০৫
১১০ সহিহ মুসলিম: ৫৬৯৬

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 অন্যের ব্যাপারে সুধারণা

📄 অন্যের ব্যাপারে সুধারণা


একজন মুমিন তার অস্পষ্ট কথাগুলোকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করে। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সাথে কথা বলি। দেখাসাক্ষাৎ এবং মেইল আদান-প্রদান করি। এসব ক্ষেত্রে কেউ কেউ এমন কথা বলতে পারে, যে কথার নানান অর্থ হতে পারে। কিন্তু মুমিন এসব অস্পষ্ট কথাগুলোর নেতিবাচক অর্থ দাঁড় করায় না। পবিত্র কুরআনে সূরা হুজরাতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কারণ, কোনো কোনো অনুমান পাপ!'
আপনি যখন কোনো বিষয়ে বা কারও ব্যাপারে মন্দ ধারণা করেন, সেটা সত্য কিংবা মিথ্যা হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জানিয়ে দেন, বেশির ভাগ অনুমান থেকে যেন আমরা দূরে থাকি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। ব্যতিক্রমের ব্যাপারটা নিয়ে পরে আলোচনা করছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধারণার ব্যাপার নিয়ে আমাদের সতর্ক করে বলেন, তোমরা কারও প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড়ো মিথ্যা।
ধরুন, আপনার বাসায় কেউ একজন বেড়াতে এলো। সে চলে যাওয়ার পর আপনি আপনার মোবাইল খুঁজে পাচ্ছেন না। ধারণা করে নিচ্ছেন, সে চুরি করেছে। আর এ কথা আশপাশের কয়েকজনকে বললেন। তারপর যে বাসায় এসেছিল, তাকেও জিজ্ঞেস করলেন, আমার মোবাইলটা কি দেখেছ?
দুদিন পর দেখা গেল আপনার বালিশের নিচে মোবাইলটা বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। আপনি বেমালুম ভুলে গিয়েছেন, এটা বিছানার ওপর বালিশের কাছে ছিল। দেখুন, ধারণার বশবর্তী হয়ে একজনের ব্যাপারে অপবাদ দিলেন। তাকে লজ্জা দিলেন। এখন কি আর তার সাথে কখনো ভালো সম্পর্ক হতে পারে?
আয়িশা (রা.)-এর ঘটনায় দেখা যায়, যারা অপবাদ রটিয়েছিল তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। অপবাদ রটনাকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা যেমন শাস্তির কথা উল্লেখ করেন, বাকিদের ব্যাপারেও তিনি বলেন-
'এ কথা শোনার পর মুমিন পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করেনি এবং বলেনি-এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ?'
এই আয়াতে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, ঘটনাটি শোনার পর সাহাবিরা কেন আয়িশা (রা.)-এর ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করেননি। তাঁরা এখনও কেন মন্দ ধারণা করেন?
উম্মে আইয়ুব (রা.) তাঁর স্বামী আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আয়িশা (রা.) সম্পর্কে যেসব কথা বলাবলি হচ্ছে সেগুলো শুনেছেন? আবু আইয়ুব আনসারি স্ত্রীর এমন প্রশ্ন শুনে তার অবস্থান জানিয়ে দিলেন এবং বললেন-হ্যাঁ, শুনলাম। তবে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
এ কথা বলে তিনি উদাহরণ দিলেন, আচ্ছা উম্মে আইয়ুব! বলো তো, তুমি এমন কাজ করতে পারতে? উম্মে আইয়ুব বললেন-নাউজুবিল্লাহ! না, কখনোই না, এমন কাজ আমি করতেই পারি না। এটা আমার জন্য অসম্ভব। আবু আইয়ুব স্ত্রীকে বোঝালেন-দেখো, তোমার চেয়ে আয়িশা (রা.) শতগুণে উত্তম ও মর্যাদাসম্পন্ন। তিনি এমন কাজ কীভাবে করতে পারেন?
আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) এমন উদাহরণের মাধ্যমে শেখালেন, কোনো গুজব বা ধারণাপ্রসূত কথা প্রমাণিত হওয়ার আগপর্যন্ত একজন মানুষের ব্যাপারে কীভাবে সুধারণা করতে হয়। নিজের স্ত্রীর উদাহরণ দিয়ে বোঝালেন-যেখানে তুমি এমন কাজ করতে পারো না, সেখানে আয়িশা (রা.) কীভাবে এমন কাজ করতে পারেন?
এখন প্রশ্ন হতে পারে, কীভাবে আমরা অন্যের ব্যাপারে সুধারণা রাখব?

টিকাঃ
১২০ সূরা হুজুরাত: ১২
১২১ সহিহ বুখারি: ৫১৪৩
১২২ সূরা নূর: ১২
১২৩ তাফসির ইবনে কাসির; সূরা নূরের ১২ নম্বর আয়াতের তাফসির।

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 ইসলাম নিয়ে গর্ববোধ করা

📄 ইসলাম নিয়ে গর্ববোধ করা


একজন মুমিন সব সময়ই তার ধর্ম নিয়ে গর্ববোধ করে। ইসলাম নিয়ে কখনোই হীনম্মন্যতায় ভোগে না। এটি মুমিনের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। কেউ কেউ মনে করতে পারেন-ইতঃপূর্বে আমি মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য বলেছি বিনয় দেখান। এখন যদি বলি আরেকটি বৈশিষ্ট্য গর্ব করা। তাহলে দুটি বৈশিষ্ট্য বিপরীত হয়ে গেল না?
না, এই দুটি বৈশিষ্ট্য পরস্পর বিপরীত না। মুমিন যখন নিজের ধর্ম নিয়ে গর্ব করবে, তখন সে নিজেকে নিয়ে গর্ব করবে না। সে বলবে না, আমি অন্যের চেয়ে ভালো মুসলিম বা বেশি আমলদার। সে গর্ব করবে এই ভেবে-আমি যে ধর্মের অনুসরণ করি, এই ধর্মই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। সে বলবে-আল্লাহ আমাকে এমন এক ধর্মের অনুসারী বানিয়েছেন, যে ধর্ম তাঁর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য। এই গর্বের কারণ সে নিজে না; বরং সে যা অনুসরণ করে তা। কুরআনে আল্লাহ বলেন- 'যে সম্মান চায়, তার জানা উচিত-আল্লাহর জন্যই সকল সম্মান।
সকল সম্মান আল্লাহর কাছেই। এই সম্মান আল্লাহ কাকে দেন? পবিত্র কুরআনে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন- 'সম্মান তো আল্লাহরই; আর তাঁর রাসূল ও মুমিনদের।'
সম্মানবোধ আর অহংকারের মধ্যে পার্থক্য আছে। ইসলাম নিয়ে গর্ব করা, নিজেকে সম্মানিত মনে করা আর অহংকার করা এক না। আমি যখন ইসলাম নিয়ে গর্ব করব, এর মানে দাঁড়ায়, আমি বলছি-আল্লাহ আমাকে ইসলামের পথ দেখিয়েছেন। আমি সুমহান দ্বীনের পথ অনুসরণ করছি, যে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে নবি-রাসূলগণ এসেছিলেন। এটা আমার কৃতিত্ব না। আমি এর জন্য অহংকার করছি না; বরং গর্ববোধ করছি। অহংকারের সঙ্গে 'আমার' কোনো সম্পর্ক নেই, আমি কীসের অনুসরণ করছি সম্পর্ক সেটার সাথে। এই ধরনের গর্ববোধ, আত্মসম্মান প্রত্যেক মুমিনের থাকা উচিত। একজন মুমিন কখনোই তার ধর্ম নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে না। নবিজি বলেন, কোনো মুমিন ব্যক্তির জন্য নিজেকে অপমানিত করাটা শোভনীয় নয়।
কেউ যদি কখনো ইসলাম নিয়ে হাসি-তামাশা করে, ধর্মের অবমাননা করে, অবশ্যই আমরা এর বিরুদ্ধে কথা বলব। কেউ যদি ধর্ম নিয়ে খোঁটা দেয়, সেখানে মুমিন কখনো লজ্জিত হতে পারে না। কারণ, তার ধর্ম নিয়ে সে আত্মবিশ্বাসী, প্রজ্ঞার সাথে এসব অপপ্রচারের জবাব দেবে।
অনেকেই দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য নিজের নাম, সন্তানের নামের সাথে ইসলামি কোনো নাম সন্নিবেশ করতে হীনম্মন্যতায় ভোগে। তারা মনে করে, যদি নামের সাথে ইসলামের কোনো নিদর্শন থাকে, তাহলে যদি ওই দেশে ঢুকতে না দেয়? দাড়ি রাখার দরুন যদি 'জঙ্গি' বলে, এই ভেবে অনেকেই দাড়ি রাখতে ভয় পায়। নামাজ পড়লে স্যার যদি কিছু মনে করেন, অফিসের বস যদি নারাজ হন-এই ভয়ে কেউ কেউ নামাজ পড়া বাদ দিয়ে দেয়।
তারা দ্বীনের চেয়ে মানুষকে বেশি মূল্য দেয়। দ্বীনের ব্যাপারে তারা আত্মবিশ্বাসী না। বিধিবিধান মানার ব্যাপারে গর্ববোধ করে না, কেমন যেন লজ্জাবোধ করে। এই ধরনের মনোভাব কোনো মুমিনের হতে পারে না।
রাসূল ও সাহাবিদের জীবনী পড়লে আমরা এমন দৃশ্য দেখতে পাই। তাঁদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। নামাজরত অবস্থায় ময়লা-আবর্জনা তাঁদের ওপর ঢেলে দেওয়া হয়েছে। আত্মীয়স্বজনকে করুণভাবে হত্যা করা হয়েছে। শারীরিক-মানসিক সব দিক থেকেই নির্যাতন করা হয়েছে। তবুও তাঁরা দ্বীনের ওপর অটল ছিলেন। কেউ তাঁদের আত্মবিশ্বাস থেকে সামান্য পরিমাণও টলাতে পারেনি।
এখনকার সময়ে দেখা যায়, ব্যক্তি তার সমাজ এবং দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করে। সব সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, অপ্রথম ও প্রধান পরিচয় হলো আমরা মুসলিম। বাকি অন্যান্য পরিচয় হলো মুসলিম পরিচয়ের পরের পরিচয়। এখন কেউ কেউ ভাবতে পারেন, তাই বলে কি আমরা দেশীয় সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করব না?
হ্যাঁ, অবশ্যই করবেন। তবে সেটা শর্তযুক্ত। ইসলাম আপনাকে যতটুকুর অনুমোদন দিয়েছে, ঠিক ততটুকুই। ধরুন, বাংলাদেশে পদ্মার ইলিশ পাওয়া যায়। এই ইলিশ খেতে এতই সুস্বাদু, পৃথিবীর অনেক দেশে নানান নদীর ইলিশ খেয়ে আপনি এতটা মজা পাননি। এজন্য গর্ববোধ করতে পারেন- আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে এমন এক দেশে বসবাসের সুযোগ দিয়েছেন, যে দেশের ইলিশ পৃথিবীর সব দেশের ইলিশের চেয়ে সুস্বাদু।
কিন্তু আপনি যেই মুহূর্তে আরেকটি দেশের মানুষের চেয়ে নিজেকে উত্তম মনে করবেন, অমুক লোকটি আরেক দেশে জন্মগ্রহণ করেছে বলে তাকে আপনার চেয়ে হীন মনে করবেন-সেটা সমস্যাজনক, ভেতরে অহংবোধের জন্ম নেবে।
ধরুন, আপনি ভাবছেন-অমুক ব্যক্তি পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছে বলে খারাপ বা সৌদি আরবের কেউ যদি মনে করে অমুক মুসলিম লোকটা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছে বিধায় সে খারাপ মুসলিম; এটা বর্ণবাদী মনোভাব। আবার আপনি যদি মনে করেন-আপনার গায়ের রঙের কারণে আপনি নাইজেরিয়ার মানুষের চেয়ে উত্তম, তাহলে আপনি বর্ণবাদী। তেমনই ইউরোপের কেউ যদি মনে করে তারা তাদের গায়ের রঙের কারণে পৃথিবীর বাকিদের চেয়ে উত্তম এবং সেরা; এটাও বর্ণবাদী মনোভাব। আমাদের একমাত্র শর্তহীন আনুগত্য ইসলামের জন্য। অন্য কোনো পরিচয়ের ক্ষেত্রে আমরা এমন আনুগত্য দেখাব না।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একবার জেরুজালেম যাবেন বলে প্রস্তুতি নেন। তাঁর হাতে হস্তান্তর করা হবে বায়তুল মুকাদ্দাসের চাবি। রওনা হন জীর্ণশীর্ণ জামা পরে। সাহাবিরা তাঁকে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন একটি ভালো জামা পরেন। কারণ, তিনি একটি বিত্ত ও সমৃদ্ধশালী অঞ্চলে যাচ্ছেন, সেখানে অনেক লোক আসবে তাঁর সাথে দেখা করতে। এমন পোশাক দেখে বাকিরা হয়তো তাঁকে অবজ্ঞা করতে পারে। সাহাবিদের পরামর্শ উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আমলে নিলেন না। তিনি বললেন, আমরা ছিলাম সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি। আল্লাহ আমাদের ইসলাম দ্বারা সম্মান দান করেছেন। সুতরাং, আল্লাহ আমাদের যা দ্বারা সম্মান দান করেছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো জিনিস দ্বারা যখন আমরা সম্মান অনুসন্ধান করব, তখনই তিনি আমাদের লাঞ্ছিত করবেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ, সম্মানিত, বিপুল সম্পদে ভরপুর অঞ্চলে যাওয়ার সময় পোশাক পরিবর্তন করেননি। যে ধরনের পোশাক পরে নবিজির যুগ, সাহাবিদের যুগ কাটান, সেই ধরনের পোশাক পরেই তিনি জেরুজালেম যান। কারণ, তিনি মনে করতেন, পোশাকের সাথে সম্মানের সম্পর্ক নেই। সম্মানের সম্পর্ক ইসলামের সাথে।
ইসলাম নিয়ে কখনোই হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না। ইসলাম এমন কোনো ধর্ম না যে, হীনম্মন্যতায় ভুগবেন। কেননা, আমরা যখন ইসলাম মেনে চলব, আল্লাহ আমাদের সম্মান দান করবেন। ইসলাম ছাড়া অন্য কোথাও সম্মান তালাশ করলে সম্মান খুঁজে পাব না; বরং আল্লাহ আমাদের অপদস্থ করবেন।
নামাজের সময় হলে নামাজে যান। আপনার 'বস' কী মনে করবেন, শিক্ষক কী মনে করবে এটা ভাবলে তো হবে না। যানবাহনে নামাজ পড়া লাগলে সেখানেই নামাজ শুরু করুন। লজ্জা পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
আজ থেকে ২০ বছর আগের ঘটনা। আমি একবার এয়ারপোর্ট যাই এক জায়গায় যাব বলে। দেখলাম একজন মহিলা 'ইয়োগা' (ব্যায়ام) করছে। যাত্রা শুরুর আগে আধা ঘণ্টা বিরতি পেয়েছিল, বিরতির সময়টা সে কাজে লাগাচ্ছে ব্যায়াম করে।
সেদিনই আমার ভেতর এ কথার উদ্রেক হয়-একজন মহিলা দুনিয়াবি একটি কাজ জনসম্মুখে করতে ভয় পাচ্ছে না, তার সংকোচ হচ্ছে না, সামান্য লজ্জাও পাচ্ছে না। আমি কেন শ্রেষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের প্রয়োজনে জনসম্মুখে নামাজ পড়তে পারব না?
এমন কোনো পরিস্থিতি যদি আসে, যেখানে রাস্তার পাশে আমাকে নামাজ পড়তে হবে, দাঁড়িয়ে যাব। কে কী বলবে, কে কী মনে করবে ভাবলে চলবে না। তবে কাজটা আমার ধর্মে প্রতি অনুরাগ ও প্রজ্ঞার সাথে করতে হবে। আশপাশে কোনো সিকিউরিটি থাকলে তাদের জানিয়ে দেবো, আমি নামাজ পড়ছি। অন্য কিছু মনে করার কারণ নেই।
আপনি নামাজ পড়লে এ নিয়ে অনেকেই ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে পারে। এমনটা ভাববেন না যে, আপনিই প্রথম। ইসলামের শুরু থেকেই এহেন কর্ম হয়ে আসছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যখন তোমরা নামাজের দিকে আহ্বান করো, তখন তারা একে উপহাস ও খেলা বলে মনে করে। এর কারণ-তারা নির্বোধ। '
নির্বোধরা ইসলাম নিয়ে সমালোচনা করবে, নামাজ পড়া নিয়ে সমালোচনা করবে। তাই বলে নির্বোধের কথায় পাত্তা দিলে চলবে না। আমরা এমন এক ধর্মের অনুসরণ করি, যেই ধর্ম শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং এই ধর্ম নিয়ে আমরা গর্বিত।

টিকাঃ
১৩১ সূরা ফাতির : ১০
১৩২ সূরা মুনাফিকুন: ৮
১৩৩ জামে আত-তিরমিজি: ২২৫৪
১৩৪ মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪৪৮১
১৩৫ সূরা মায়েদা: ৫৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00