📄 অন্যের দোষ গোপন রাখা
মুমিনের অন্যতম একটি গুণ হলো, সে অন্যের দোষ গোপন রাখে। একজন মুমিন অন্যের দোষত্রুটি কারও কাছে বলে বেড়ায় না। নাটকীয়তার আশ্রয় নেয় না। আরবিতে একে বলা হয় 'সিতির'। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-
'নিশ্চয়ই যারা এটা পছন্দ করে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব।'
আল্লাহ আরও বলেন-
'মন্দ কথার প্রচার আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে কারও ওপর জুলুম করা হলে সেটা ভিন্ন কথা।'
আল্লাহ কখনোই মন্দ কথা এবং মন্দ কাজ পছন্দ করেন না। আর এর প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ুক তা-ও তিনি চান না। তবে কারও ওপর জুলুম করা হলে বিচারের জন্য একাধিকজনকে জানানো যেতে পারে। যেমন: কাউকে যদি নিয়মিত চুরি করতে দেখেন, অন্যের অধিকার হরণ করতে দেখেন, তখন সেটা জনসম্মুখে বলতে অসুবিধা নেই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে এ রকম অসংখ্য ঘটনা দেখা যায়। তন্মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা হলো আয়িশা (রা.)-এর ব্যাপারে অপবাদের (ইফকের) ঘটনা। যারা গুজব রটিয়েছিল, তাদের ব্যাপারে যেমন আল্লাহ শাস্তির কথা উল্লেখ করেন, তেমনই বাকিদের ব্যাপারে বলেন-
'এ কথা শোনার পর মুমিন পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করেনি এবং বলেনি-এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ?'
আল্লাহ দোষত্রুটি গোপন করতে পছন্দ করেন। আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি নাম হলো, আস-সিত্তির। এর অর্থ, যিনি দোষত্রুটি গোপন রাখেন।
নবিজি বলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ লজ্জাশীল, গোপনীয়তা অবলম্বনকারী। তিনি লজ্জা ও গোপনীয়তা পছন্দ করেন।
নবিজির একজন সাহাবি ছিলেন। নাম ছিল মাইজ আসলামি (রা.)। তিনি একবার যিনা করে ফেলেন। এরপর তিনি অনুতপ্ত হন, শাস্তি পেতে চান। পরামর্শের জন্য যান আবু বকর (রা.)-এর কাছে। আবু বকর (রা.) বলেন-আল্লাহ তোমার পাপ গোপন রেখেছেন, এখন তুমি নিজে তোমার পাপ গোপন রাখো।
অতঃপর তিনি যান তাঁর বন্ধু হাজ্জাল (রা.)-এর কাছে। হাজ্জাল (রা.) মাইজ আসলামিকে নিয়ে যান নবিজির কাছে। মাইজ নিজের পাপের কথা কয়েকবার রাসূলুল্লাহর কাছে বলেন, তিনি তাঁকে যিনার শাস্তি দেন। শাস্তি দেওয়ার পূর্বে তিনি মাইজকে দোষারোপ না করে বরং হাজ্জালকে দোষারোপ করেন। কারণ, হাজ্জাল চাইলে মাইজ (রা.)-এর পাপ গোপন রাখতে পারতেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, হে হাজ্জাল! যদি তুমি এই খবরটি গোপন রাখতে, তাহলে তা তোমার জন্য ভালো হতো।
নবিজি হাজ্জাল (রা.)-সহ অন্য সাহাবিদের শেখালেন-তোমরা কেউ যদি কারও বড়ো কোনো পাপ গোপন রাখো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের পাপ গোপন রাখবেন। কারও পাপ বলে বেড়ানোর চেয়ে সেটা গোপন রাখাটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। নবিজি বলেন-কোনো বান্দা যদি অপর কোনো বান্দার দোষত্রুটি দুনিয়াতে গোপন রাখে, আল্লাহ তার দোষত্রুটি কিয়ামতের দিন গোপন রাখবেন।
আপনি জানতে পারলেন, আপনার কোনো মুসলিম ভাই বা বোন একটা পাপ করে ফেলেছে। আর সেটা গোপনে এসে সে আপনার কাছে শেয়ার করেছে কিংবা আপনি তাকে ওই কাজটা করতে দেখেছেন। এমনটি হলে তার দোষ গোপন রাখুন। আপনি যদি তার সেই দোষ বা পাপ কর্মটি গোপন রাখেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ আপনার দোষ গোপন রাখবেন। আল্লাহ যদি আপনার দোষ গোপন রাখেন, আপনার স্থান হবে জান্নাতে।
মুনাফিকের কাজ হলো অন্যের দোষত্রুটি খোঁজা এবং তা বলে বেড়ানো। কাউকে কোনো পাপ করতে দেখলে তারা সেটাকে ক্যামেরাবন্দি করে। পুরো দুনিয়াকে সেই পাপ দেখায়। এমন কাজের ব্যাপারে নবিজি সতর্কবার্তা জানিয়ে দেন। তিনি বলেন-হে লোক সকল! যারা কেবল মুখেই ঈমান এনেছ, কিন্তু অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের গিবত করবে না এবং তাদের দোষত্রুটি তালাশ করবে না। কেননা, যারা দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে, আল্লাহও তাদের দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ কারও দোষত্রুটি খুঁজলে তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপদস্থ করে ছাড়বেন। '
এই হাদিসটি খুবই ভীতিপ্রদর্শনকারী হাদিস। যারা সারাক্ষণ অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, রাসূলুল্লাহ তাদের মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ, তারা মুখে ঈমান আনলেও তাদের অন্তর ঈমান আনেনি।
এখনকার সময়ে আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন ও টিভি চ্যানেল সারাক্ষণ অন্যের দোষত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করছে। কোন সেলিব্রিটি কখন কী করেছে, সেটাই যেন তাদের নৈমিত্তিক আলোচনার বিষয়। মিডিয়ার দ্বারা প্রভাবিত এমন কাজ আমাদের মুসলিম সমাজকেও আক্রান্ত করেছে। ফলে মুসলিমরা তাদের মূল বৈশিষ্ট্য ভুলে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোষত্রুটি খোঁজায় লিপ্ত।
প্রত্যেকেই আমরা জীবনে কোনো না কোনো পাপ করেছি। ভুল করেছি। আবার কাউকে কাউকে পাপ করতে দেখেছি। এক্ষেত্রে ইসলাম আমাদের বলে, নিজেদের গোপন পাপ যেন আমরা গোপন রাখি এবং অন্যের গোপন পাপও যেন গোপন রাখি। কাউকে পাপকর্মে লিপ্ত থাকতে দেখলে অন্যকে বলার আগে তাকে বলতে পারি-ভাই, আপনি যেটা করছেন, এটা তো পাপ। আল্লাহর ওয়াস্তে ফিরে আসুন এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করুন।
কিন্তু সাধারণ নিয়ম হলো পাপকে গোপন রাখা। আমাদের এই সময়ে যেটা অনুপস্থিত। এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে-যদি আমরা অন্যের দোষ বলে বেড়াই, এতে কী এমন ক্ষতি হয়? হ্যাঁ ক্ষতি হয়, কিছু ব্যাপার নিয়ে তাহলে আলোচনা করা যাক:
টিকাঃ
৯১ সূরা নূর: ১৯
৯২ সূরা নিসা: ১৪৮
৯৩ সূরা নূর: ১২
৯৪ সুনানে আবু দাউদ: ৪০১২
৯৫ মুয়াত্তা ইমাম মালেক ১৫০৯; সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৭৭
৯৬ সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৯
📄 হাসিমুখে কথা বলা
সব সময় হাসিখুশি থাকা মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য। একজন মুমিন সারাক্ষণ গম্ভীর মুখে থাকতে পারে না। মাঝেমধ্যে সে হাসবে, আনন্দ করবে। জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) মদিনায় বসবাস করতেন। তিনি বলেন, যখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার দিকে তাকাতেন, তিনি মুচকি হাসতেন।
জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) প্রতিদিন অন্তত পাঁচবার মসজিদে নববিতে নামাজ পড়তে যেতেন। দিনের অন্যান্য সময়েও রাসূলুল্লাহর সাথে তাঁর দেখা হতো। তিনি বলেন-নবিজি যখনই তাঁর দিকে তাকাতেন, হাসিমুখে তাকাতেন। আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রা.) নামে আরেকজন সাহাবি ছিলেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর চাইতে বেশি মুচকি হাসি দিতে আর কাউকে দেখিনি।
নবিজি নিজে যেমন হাসিখুশি থাকতেন, তেমনই আমাদেরও হাসিখুশি থাকার উপদেশ দেন। অন্যের সাথে হাসিমুখে কথা বলাকে যেন তুচ্ছভাবে না দেখি, সেজন্য তিনি সতর্ক করেন। বলেন, কোনো নেক আমলকে হীন মনে করো না; হোক সেটা ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ।
আমরা যদি কারও সাথে হাসিমুখে কথা বলি, তাতেও সওয়াব আছে আর সেটা হলো সাদাকার সওয়াব। নবিজি বলেন, প্রতিটি ভালো কাজই সাদাকারূপে গণ্য। তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে দেখাসাক্ষাৎ করাও (সাদাকার অন্তর্ভুক্ত)।
আমি একটি বিষয় লক্ষ করেছি। তা হলো, যারা দ্বীনে ফেরে, ফেরার পর আকস্মিকভাবেই তাদের মেজাজ রুক্ষ হয়ে যায়। দিনের অধিকাংশ সময়ই মেজাজ উত্তপ্ত থাকে। মুখে হাসি দেখা যায় না। কেমন যেন রাগান্বিত, ধমকাধমকির মধ্যে থাকে। আমি জানি না তারা কোন সুন্নাহ পালন করে, এমন সুন্নাহ তারা কোথায় পেয়েছে!
ইসলাম আমাদের বলে, আমরা যেন সব সময় হাসিখুশি থাকি। অন্যের সাথে হাসিমুখে আনন্দচিত্তে কথা বলি। কোনো ক্ষেত্রে রাগ দেখানো বা ধমক দেওয়ার প্রয়োজন হলে ধমক দেবো, রাগ দেখাব। কিন্তু আমাদের আদর্শিক আচরণ হলো সব সময় সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলা।
সাইকোলজিস্টরা বলেন, হাসিখুশি থাকলে রক্তচাপ কমে যায়। এটি এমন একটি কাজ, যার প্রভাব আপনার পাশেরজনের ওপর পড়বে। অন্যজনও হাসিমুখে থাকবে। আপনি রাগান্বিত অবস্থায় থাকলে আপনার পাশেরজনও অবচেতন মনেই আপনার রাগ দেখে রাগান্বিত হবে। নবিজি মাঝেমধ্যে অট্টহাসি হাসতেন। এমনভাবে হাসতেন, সাহাবিরা তাঁর মাড়ির দাঁত দেখতে পেতেন।
তবে রাসূলুল্লাহ এমনভাবে হাসতেন না, যেভাবে হাসলে খারাপ দেখা যায়। ফজরের নামাজ পড়ে সাহাবিরা মসজিদে বসতেন। কেউ কেউ জাহেলিয়াতের সময়ের গল্প বলতেন, সবাই হাসতেন। নবিজিও ওই মজলিসের হাসিতে অংশগ্রহণ করতেন।
নবিজি প্রায় সময় কৌতুক বলতেন। সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনিও আমাদের সাথে কৌতুক করছেন? সাহাবিরা অবাক হতেন এই কারণে, নবিজির মতো একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষ কি তাদের সাথে কৌতুক করতে পারেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি কৌতুকচ্ছলে কখনো সত্য ছাড়া মিথ্যা বলি না।
নবিজি মজা করতেন বটে, তবে মজাচ্ছলে মিথ্যা বলতেন না। কাউকে হেয় করতেন না, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন না। একবার এক বৃদ্ধা নবিজির কাছে এসে অনুরোধ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কাছে দুআ করুন, আমি যেন জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, শুনুন! কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না!
এ কথা শুনে বৃদ্ধা কান্না জুড়ে দেয়। তখন নবিজি জানিয়ে দিলেন, আপনি বৃদ্ধা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। কারণ, জান্নাতে সবাই কুমারী হয়েই যাবে।
একবার এক সাহাবি এসে নবিজির কাছে একটি উট চান। নবিজি তাকে বলেন, আমি তোমাকে একটি উটনীর বাচ্চা দিচ্ছি। সাহাবি চাইলেন উট, রাসূলুল্লাহ দিতে চাইলেন উটনীর বাচ্চা! এটা শুনে সাহাবি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? এবার তিনি উত্তরে বললেন, প্রত্যেক উটই তো কোনো না কোনো উটের বাচ্চা!
জাহির (রা.) নামের একজন বেদুইন ছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে নবিজির কাছে হাদিয়া নিয়ে আসতেন। দেখতে তিনি কালো ছিলেন। চলে যাওয়ার সময় নবিজি বলতেন, জাহির আমাদের পল্লিবন্ধু। আর আমরা তাঁর শহুরে বন্ধু!
জাহির একবার বাজারে বেচাকেনা করছিলেন। নবিজি তাকে পেছন থেকে জাপটে ধরেন। তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। যখন বুঝতে পারলেন তাঁকে পেছন থেকে আর কেউ নন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাপটে ধরেছেন, তখন নিজের পিট রাসূলুল্লাহর বুকের সাথে মেলালেন।
নবিজি বাজারে হাঁক দিলেন, আমার এই গোলামটিকে কে কিনবে? জাহির (রা.) মন খারাপ করে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে বিক্রি করলে কেবল অচল মুদ্রাই পাবেন! রাসূলুল্লাহ তাঁর দুঃখ বুঝতে পারলেন। তিনি জাহির (রা.)-এর মনটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন। মানুষ তাঁকে মূল্যায়ন করে না, এটা ঠিক। কিন্তু যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনি? নবিজি বললেন, কিন্তু তুমি আল্লাহর নিকট অচল নও। আল্লাহর নিকট তোমার উচ্চমর্যাদা রয়েছে।
নবিজি প্রায়ই সাহাবিদের সাথে মজা করতেন, বিভিন্ন কথা বলে বলে তাঁদের আনন্দিত করতেন। তবে আমাদের কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে :
ক. আমরা যখন কারও সাথে মজা করব, খেয়াল রাখব সে কষ্ট পাচ্ছে কি না। মজাচ্ছলেও এমন কথা বলা যাবে না, যা শুনলে আরেকজন কষ্ট পায়।
খ. মজাচ্ছলে এমন কিছু করা যাবে না, যা দেখে আরেকজন ভয় পায়। যেমন : তেলাপোকা, সাপ-বিচ্ছু দেখিয়ে ভয় দেখানো ইত্যাদি।
নবিজির কয়েকজন সাহাবি একবার একটি সফরে গেলেন। পথমধ্যে একজন সাহাবি ঘুমিয়ে ছিলেন। আরেকজন সাহাবি তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলেন। এটা করেন কেবল মজা করার জন্যই। ঘুমন্ত সাহাবি ঘুম থেকে উঠলে কী ভাববেন? হয়তো এমনটাও ভাবতে পারেন—তাকে কেউ বন্দি করেছে বা গুম করার জন্য তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
ঘুমন্ত অবস্থায় বেঁধে ফেলার ফলে তিনি আচমকা ঘুম ভাঙার পর ভয় পেয়ে যান। এই ঘটনাটি নবিজির কানে পৌঁছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, একজন আরেকজনের সাথে মজা করে তো এমনটা করতেই পারেন। একজনকে ভয় দেখিয়ে হলেও তো বাকিরা আনন্দ পেল। কিন্তু না। রাসূলুল্লাহ এই ঘটনাটি শোনার পর কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, কোনো মুসলমানের জন্য আরেক মুসলমানকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো-সে নিজে হাসিখুশি থাকবে, অন্যকে হাসিখুশি রাখবে। সারাক্ষণ রাগত আর ভার মুখো হয়ে বসে থাকলে হবে না। ভালো থাকার জন্য হলেও মাঝেমধ্যে মানুষের সাথে মজা করতে হবে।
সাহাবিরা নবিজির মুখে ইন্তেকালের কয়েক দিন আগেও মুচকি হাসি লেগে থাকতে দেখেছিলেন।
নবিজির জীবনী বা সিরাত থেকে আমরা শিখতে পারি, আমাদেরও সব সময় হাসিখুশি থাকতে হবে। আমরা যত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাই হই না কেন, অঢেল টাকাপয়সার মালিক, সমাজের বহু বড়ো মর্যাদাবান ব্যক্তিত্বই হই না কেন, সর্বাবস্থায় হাসিমুখে থাকতে হবে।
টিকাঃ
৯৯ সহিহ বুখারি: ৩০৩৫
১০০ জামে আত-তিরমিজি: ৩৬৪১
১০১ সহিহ মুসলিম: ৬৫৮৪
১০২ জামে আত-তিরমিজি: ১৯৭০
১০৩ মুসনাদে আহমাদ: ৩৫৯৫
১০৪ মুসনাদে আহমাদ: ৮৭০৮
১০৫ শামায়েলে তিরমিজি: ১৭৯
১০৬ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৭
১০৭ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৮
১০৮ সুনানে আবু দাউদ: ৫০০৪
📄 আশাবাদী হওয়া
মুমিনের অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট হচ্ছে, মুমিন সব সময় আশাবাদী থাকে। তার ওপর যেকোনো বিপদ আসুক না কেন, সে ভেঙে পড়ে না। সে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে। সে জানে, আল্লাহ তাকে পথ দেখাবেন। মুমিন কেবল নিজে নিজেই আশাবাদী থাকে না, অন্যকেও তাতে উদ্বুদ্ধ করে।
এটা তখনই সম্ভব, যখন একজন মুমিন দৃঢ়ভাবে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখে। আপনি যত বেশি আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখবেন, জীবনে তত বেশি আশাবাদী হতে পারবেন। আর যদি আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা না রাখেন, তাহলে জীবন সম্পর্কেও আপনি নিরাশ হয়ে যাবেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-আমি সে রকমই, বান্দা আমার প্রতি যে রকম ধারণা রাখে।
আপনি যদি আল্লাহর প্রতি ইতিবাচক ধারণা রাখেন, তাহলে আল্লাহর তরফ থেকে ইতিবাচক কিছুই পাবেন। যদি আশা রাখেন আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দেবেনই। যদি এমনটা মনে করেন- আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করবেন না, তবুও আল্লাহ ক্ষমা করবেন। কিন্তু আপনি যেমনটা ধারণা রাখবেন, আল্লাহকে আপনার জন্য তেমনই পাবেন।
ইসলামপূর্ব আরবের লোকজন অনেক জিনিসকে কুলক্ষণ বলে মনে করত। আমাদের দেশেও দেখবেন, মানুষ অনেক জিনিসকে কুলক্ষণ মনে করে। যেমন : প্যাঁচা দেখা, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হোঁচট খাওয়া, পাখি ডাকা ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব কুলক্ষণ মনে রাখা বা এসব ভাবনায় নিজেকে প্রভাবিত হওয়াকে নিন্দা করেন; তৎকালীন আরবের লোকজন যেগুলোকে কুলক্ষণ বলে মনে করত। তিনি বলেন, প্যাঁচা ও কুধারণা (বিশ্বাসের বৈধতা) নেই। আমি সুধারণা পছন্দ করি।
নবিজির জীবনেও এর প্রয়োগ দেখা যায়। হুদাইবিয়ার সন্ধিতে তিনি যখন সুহাইল ইবনে আমরকে আসতে দেখে বলেন, তোমাদের কাজ তোমাদের জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছে। এই লোকটিকে প্রেরণের অর্থ হচ্ছে কুরাইশরা সন্ধি চায়। সুহাইল ইবনে আমর তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। নবিজি তাকে দেখে আশাবাদী হন, সুধারণা পোষণ করেন। তিনি মনে করেন, তাকে পাঠানোর অর্থ হচ্ছে কুরাইশরা সন্ধি চায়। পরবর্তী সময়ে তা-ই হয়।
যেকোনো কিছুকে আমরা ইতিবাচকভাবে বা শুভলক্ষণ মনে করব কীভাবে? আলিমগণ দুটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন।
ক. কোনো একটা ঘটনা ঘটলে সেটা নেতিবাচক ধারণা না করে, কুলক্ষণ মনে না করে সুলক্ষণ মনে করতে হবে।
খ. সেটাকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। যেমন: আমার মনে হচ্ছে এর মধ্যে আল্লাহ কোনো কল্যাণ রেখেছেন।
আলিমগণ এ ব্যাপারে আমাদের বেশ কিছু উদাহরণও দিয়েছেন। যেমন: মনে করুন, আপনার ঘরের মধ্যে কিছু একটা হারিয়ে গেছে। সবাই মিলে খুঁজছেন। হঠাৎ আপনার সন্তান বলে উঠল, আমি মনে হয় পেয়ে গেছি। তখন আপনি সুধারণা রাখবেন, হয়তো হারানো জিনিসটি পাওয়া গেছে।
আপনি আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। দুআ শেষে বাইরে বের হয়ে দেখলেন, আকাশে রংধনু। এটাকে আপনি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে নিতে পারেন।
টিকাঃ
১০৯ সহিহ বুখারি: ৭৪০৫
১১০ সহিহ মুসলিম: ৫৬৯৬
📄 অন্যের ব্যাপারে সুধারণা
একজন মুমিন তার অস্পষ্ট কথাগুলোকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করে। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সাথে কথা বলি। দেখাসাক্ষাৎ এবং মেইল আদান-প্রদান করি। এসব ক্ষেত্রে কেউ কেউ এমন কথা বলতে পারে, যে কথার নানান অর্থ হতে পারে। কিন্তু মুমিন এসব অস্পষ্ট কথাগুলোর নেতিবাচক অর্থ দাঁড় করায় না। পবিত্র কুরআনে সূরা হুজরাতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কারণ, কোনো কোনো অনুমান পাপ!'
আপনি যখন কোনো বিষয়ে বা কারও ব্যাপারে মন্দ ধারণা করেন, সেটা সত্য কিংবা মিথ্যা হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জানিয়ে দেন, বেশির ভাগ অনুমান থেকে যেন আমরা দূরে থাকি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। ব্যতিক্রমের ব্যাপারটা নিয়ে পরে আলোচনা করছি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধারণার ব্যাপার নিয়ে আমাদের সতর্ক করে বলেন, তোমরা কারও প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না। কেননা, খারাপ ধারণা সবচেয়ে বড়ো মিথ্যা।
ধরুন, আপনার বাসায় কেউ একজন বেড়াতে এলো। সে চলে যাওয়ার পর আপনি আপনার মোবাইল খুঁজে পাচ্ছেন না। ধারণা করে নিচ্ছেন, সে চুরি করেছে। আর এ কথা আশপাশের কয়েকজনকে বললেন। তারপর যে বাসায় এসেছিল, তাকেও জিজ্ঞেস করলেন, আমার মোবাইলটা কি দেখেছ?
দুদিন পর দেখা গেল আপনার বালিশের নিচে মোবাইলটা বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। আপনি বেমালুম ভুলে গিয়েছেন, এটা বিছানার ওপর বালিশের কাছে ছিল। দেখুন, ধারণার বশবর্তী হয়ে একজনের ব্যাপারে অপবাদ দিলেন। তাকে লজ্জা দিলেন। এখন কি আর তার সাথে কখনো ভালো সম্পর্ক হতে পারে?
আয়িশা (রা.)-এর ঘটনায় দেখা যায়, যারা অপবাদ রটিয়েছিল তাদের শাস্তি দেওয়া হয়। অপবাদ রটনাকারীদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা যেমন শাস্তির কথা উল্লেখ করেন, বাকিদের ব্যাপারেও তিনি বলেন-
'এ কথা শোনার পর মুমিন পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করেনি এবং বলেনি-এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ?'
এই আয়াতে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, ঘটনাটি শোনার পর সাহাবিরা কেন আয়িশা (রা.)-এর ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করেননি। তাঁরা এখনও কেন মন্দ ধারণা করেন?
উম্মে আইয়ুব (রা.) তাঁর স্বামী আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আয়িশা (রা.) সম্পর্কে যেসব কথা বলাবলি হচ্ছে সেগুলো শুনেছেন? আবু আইয়ুব আনসারি স্ত্রীর এমন প্রশ্ন শুনে তার অবস্থান জানিয়ে দিলেন এবং বললেন-হ্যাঁ, শুনলাম। তবে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
এ কথা বলে তিনি উদাহরণ দিলেন, আচ্ছা উম্মে আইয়ুব! বলো তো, তুমি এমন কাজ করতে পারতে? উম্মে আইয়ুব বললেন-নাউজুবিল্লাহ! না, কখনোই না, এমন কাজ আমি করতেই পারি না। এটা আমার জন্য অসম্ভব। আবু আইয়ুব স্ত্রীকে বোঝালেন-দেখো, তোমার চেয়ে আয়িশা (রা.) শতগুণে উত্তম ও মর্যাদাসম্পন্ন। তিনি এমন কাজ কীভাবে করতে পারেন?
আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) এমন উদাহরণের মাধ্যমে শেখালেন, কোনো গুজব বা ধারণাপ্রসূত কথা প্রমাণিত হওয়ার আগপর্যন্ত একজন মানুষের ব্যাপারে কীভাবে সুধারণা করতে হয়। নিজের স্ত্রীর উদাহরণ দিয়ে বোঝালেন-যেখানে তুমি এমন কাজ করতে পারো না, সেখানে আয়িশা (রা.) কীভাবে এমন কাজ করতে পারেন?
এখন প্রশ্ন হতে পারে, কীভাবে আমরা অন্যের ব্যাপারে সুধারণা রাখব?
টিকাঃ
১২০ সূরা হুজুরাত: ১২
১২১ সহিহ বুখারি: ৫১৪৩
১২২ সূরা নূর: ১২
১২৩ তাফসির ইবনে কাসির; সূরা নূরের ১২ নম্বর আয়াতের তাফসির।