📄 কথার আমানত
কেউ যদি আমাদের কোনো কথা বলার পর সেটা গোপন করতে বলে, তাহলে সেটাও একধরনের আমানত। যদি তার গোপন কথাটি কাউকে বলে দিই, তাহলে আমানতের খেয়ানত হবে।
নবিজি বলেন, সকল মজলিস আমানতস্বরূপ। আমরা একসাথে অনেকজন বসি, আড্ডা দিই। সেখানে নানান কথা-কারবার নিয়েই আলোচনা হয়। ওসব আলোচনার কিছু কিছু অংশ আবার অনেকেই ফেসবুকে পোস্ট আকারে লিখতে চায়। তখন লেখার পূর্বে ভেবে নিন কিংবা যার আলোচনার অংশবিশেষ পোস্ট করার কথা ভাবছেন, তাকে জিজ্ঞেস করে নিন। নবিজি বলেন, কোনো ব্যক্তি কোনো কথা বলার পর মুখ ঘোরালে (কেউ শুনছে কিনা তা পুনরায় পরখ করলে) তা আমানতস্বরূপ।
কেউ কোনো কথা বলার পর 'কথাটি গোপন রাখবেন' বলতে হবে কেন? আপনাকে সে বিশ্বাস করেই তো কথাটি বলেছে, সতর্ক করুক বা না করুন। কথার ধরন দেখেই যদি বোঝেন, এটি গোপন কথা; তাহলে অবশ্যই আপনি তা গোপন রাখুন।
মনে করুন, এক মজলিসে একজন আরেকজনের গিবত করল। সে কিন্তু গিবত করে গুনাহ কামিয়েছে। এখন যদি আপনি ওই গিবতের কথা, যাকে নিয়ে গিবত করা হয়েছে তার কানে পৌঁছে দেন, তখন সেটাও গুনাহের কাজ। একে বলা হয় 'নামিমাহ'। গিবত যেমন হারাম, তা অন্যজনকে জানানোও হারাম।
টিকাঃ
৭৯ সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৬৯
৮০ সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৬৮
📄 পরামর্শের ক্ষেত্রে আমানত
কেউ যদি আপনার কাছে পরামর্শ চায়, সেটাও একধরনের আমানত। যেমন, কেউ একজন এসে ব্যাবসার কিছু পরিকল্পনা আপনাকে জানাল। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী আপনি তাকে কিছু পরামর্শ দিলেন। অতঃপর আরেকজন ব্যবসায়ীকে যদি প্রথমজনের পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেন, সেটা হবে আমানতের খেয়ানত।
হাফসা বিনতে উমর (রা.) বিধবা হওয়ার পর উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাঁর জন্য পাত্র খোঁজেন। তিনি আবু বকর ও উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কাছে যান। কিন্তু দুজনের একজনও তাঁর প্রস্তাবে সাড়া দেননি। বন্ধুপ্রতীম দুজনই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করায় তিনি খুব ব্যথিত হন। অতঃপর নবিজি হাফসা (রা.)-কে বিয়ে করেন।
রাসূলুল্লাহর বিয়ের পর আবু বকর (রা.) তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কারণ জানান। তিনি বলেন, আপনার প্রস্তাব গ্রহণ না করায় আমার ওপর ব্যথিত হয়েছেন। আপনি যখন প্রস্তাব দেন, একটি কারণে তা প্রত্যাখ্যান করি। কারণ, আমি নবিজিকে তাঁর (হাফসা) সম্পর্কে আলোচনা করতে শুনেছি। তা ছাড়া নবিজির গোপন কথা প্রকাশ করতে চাইনি। যদি তিনি তাঁকে বাদ দিতেন, তবে আমি তাঁকে বিয়ে করতাম।
আবু বকর (রা.) রাসূলের সেই গোপন কথা সম্পর্কে এত সচেতন ছিলেন, তিনি তা তাঁর প্রিয় বন্ধু উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কেও বলেননি।
নবিজির খাদেম হওয়ার কারণে আনাস ইবনে মালেক (রা.) রাসূলের অনেক গোপন বিষয় সম্পর্কে জানতেন। কখনো-বা নবিজি নিজেই তাঁকে বলতেন। একবার নবিজি আনাস (রা.)-কে একটি গোপন কথা বলেন। ছোট বয়সেও তাঁর মধ্যে আমানতদারিতার পরিচয় পাওয়া যায়। নবিজির এই গোপন বিষয় সম্পর্কে তাঁর জন্মদাত্রী মা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু আমানতের খেয়ানত হবে বিধায় তিনি নিজের আপন মাকেও সেই কথাটি বলেননি।
টিকাঃ
৮১ সুনানে নাসায়ি: ৩২৪৮
৮২ সহিহ বুখারি: ৬২৮৯
📄 স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার আমানত
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার আমানতের খেয়ানত হলো সবচেয়ে নিকৃষ্টতম আমানতের খেয়ানত। নবিজি বলেন, কিয়ামতের দিন সে ব্যক্তি হবে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম পর্যায়ের, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়। অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়!
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার একান্ত গোপনীয় বিষয়গুলো হলো আমানত। সেই আমানত বন্ধু-বান্ধবী বা অন্য কারও সাথে শেয়ার করা যাবে না। যদি তারা নিজেদের একান্ত গোপনীয় ব্যাপারগুলো অন্যের সাথে শেয়ার করে, সেটা হবে সর্বনিকৃষ্ট পর্যায়ের আমানতের খেয়ানত।
তবে হ্যাঁ, প্রয়োজনে কিছু কথা বলা যেতে পারে। যেমন: ডাক্তারের কাছে যাওয়া বা পরামর্শ নেওয়া। তা ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে টানাপোড়েন হলে তা মিটমাটের জন্য তৃতীয় পক্ষের পরামর্শ নেওয়া যেতেই পারে। এইসব ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু সাধারণ নিয়ম হলো, গোপনীয়তা প্রকাশ করা যাবে না।
আমানত আর ঈমান অনেকটা পাশাপাশি। ঈমান ও আমানত একই ক্রিয়ামূল থেকে এসেছে। আমানত এমন একটা ব্যাপার, যা আপনি কাউকে কিছু বলে স্বস্তি লাভ করেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, আমি কারও নামাজ আর রোজা দেখে তাকে যাচাই-বাছাই করি না। কাউকে যাচাই করি তার আমানতদারিতা দেখে; নামাজ-রোজা তো সবাই করে।
আমানতদারিতার গুণ অর্জন করতে বছরের পর বছর লেগে যায়। কিন্তু এই গুণ ভাঙতে ছোট্ট একটি ভুলই যথেষ্ট। এজন্য আমাদের অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
টিকাঃ
৮৩ সহিহ মুসলিম: ৩৪৩৪