📘 মুমিনের আখলাক > 📄 রাগ নিয়ন্ত্রণ

📄 রাগ নিয়ন্ত্রণ


পূর্বের অধ্যায়ে আমরা 'হিলম' নিয়ে আলোচনা করেছি। হিলমের দুটি অর্থ নিয়েছিলাম-প্রজ্ঞা আর রাগ নিয়ন্ত্রণ। এখন আমরা রাগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করব।
আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি হলো-আল হালিম। আল্লাহর ক্ষেত্রে আল হালিম মানে যিনি তাঁর সৃষ্টির ওপর রাগ নিয়ন্ত্রণ করেন, যদি না তাঁর সৃষ্টি রাগ করার মতো কিছু করেছে। অর্থাৎ, মানুষ এমন কোনো কাজ করেছে, যার ফলে আল্লাহ মানুষের ওপর রাগান্বিত হতে পারেন। কিন্তু তিনি তো অসীম দয়ালু, রাগান্বিত না হয়ে বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। এজন্যই তাঁকে বলা হয় আল হালিম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহর চেয়ে বেশি ধৈর্যধারণকারী আর কেউ নেই। লোকেরা তাঁর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে, এরপরও তিনি তাদের বিপদমুক্ত রাখেন এবং রিজিক দান করেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নিজেকে বেশ কয়েকবার 'হালিম' বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন-
'তোমরা তাঁকে ভয় করো এবং জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল (হালিম)।'
আল্লাহ হলেন আল হালিম। তিনি রাগ করার মতো এমন কোনো কাজ বান্দা করলেও রাগান্বিত হন না। আল্লাহ যেমন আল হালিম, তেমনই যারা এই গুণে গুণান্বিত তিনি তাদের প্রশংসা করেন। পবিত্র কুরআনে নবি ইবরাহিম (আ.)-এরও প্রশংসা করেন। কারণ, তিনি ছিলেন এই গুণে গুণান্বিত।
নিজের রাগকে সংযত রাখা মুমিনের অন্যতম গুণাবলি। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এই গুণের প্রশংসা করেন এবং যারা নিজেদের রাগ সংযত করে, তাদের ব্যাপারে তিনটি পুরস্কারের ঘোষণা দেন। সেগুলো হলো-
১. ক্ষমা করে দেবেন।
২. জান্নাত দান করবেন এবং
৩. মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত করবেন।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمُوتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ. الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ * وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ.
'তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। (এগুলো তাদের জন্য) যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে, রাগ সংবরণ এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। '
এখানে উল্লেখ্য, যারা রাগ সংবরণ করে তাদের কথা বোঝাতে আল্লাহ যে শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা হলো-'কাজিমিনা গাইজা' (كَاظِمِينَ الْغَيْظَ); তিনি 'কাজিমিনাল গাদাভ' (كَاظِمِينَ الْغَضَبَ) শব্দটি ব্যবহার করেননি। তবে শব্দ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?
ক. 'কাজিমিনা গাইজা' মানে হলো, যখন আপনি রাগান্বিত হওয়া শুরু করেন, তখনই সেটা নিয়ন্ত্রণ করেন।
খ. 'কাজিমিনাল গাদাভ' মানে হলো, আপনি রাগ করার পর একসময় তা নিয়ন্ত্রণ করেন।
এখানে আল্লাহ তায়ালা বলেন-যারা রাগ হওয়ার সাথে সাথেই তা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার। এর মানে, আপনি রাগান্বিত হওয়ার পূর্বেই তা করবেন যেন আপনার রাগ 'গাদাভ' পর্যন্ত না পৌঁছায়। নবিজি বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছু সংবরণে নেই।
ধরা যাক, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে যদি আপনি এক গ্লাস ঠান্ডা পানি পান করেন, এর পর আপনার অনুভূতি কেমন হবে? আপনি কতটা সন্তুষ্ট হতে পারবেন? অদ্রূপ আপনার যদি রাগ ওঠে আর সেটা সংবরণ করেন, তা-ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
একবার জনৈক ব্যক্তি নবিজির কাছে পরামর্শ নিতে এলো। তিনি তাকে পরামর্শ দিলেন, রাগ করো না। লোকটি আরও উপদেশ নিতে চাইল। কিন্তু নবিজি প্রতিবারই তাকে বললেন, রাগ করো না। সে তখন বুঝতে পারল, নবিজি তাকে এই উপদেশই দিলেন। উপদেশ মাত্র একটি, কিন্তু গুরুত্ব অসীম।
পূর্বে আলোচনা করেছিলাম, হিলমের দুটি অর্থ হতে পারে। তবে এই দুটি গুণের মধ্যে একধরনের মিল আছে। যেমন: আপনি যদি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তাহলে প্রজ্ঞাবান হতে পারবেন না। প্রজ্ঞাবান হতে হলে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
একবার নবিজি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন, সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি কে? তাঁরা উত্তরে বললেন, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন— প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে পরাজিত করে; বরং সে-ই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে।
যে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, সে মূলত তিনটি শক্তির ওপর বিজয়ী হয়। সেগুলো হলো—
১. নিজের নফসকে পরাজিত করা।
২. নিজের সাথে থাকা শয়তানকে পরাজিত এবং
৩. তাকে যে রাগান্বিত করে, ওই লোকটির সাথে থাকা শয়তানকে পরাজিত করা।
আপনি যদি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে এক ঢিলে তিনটি পাখি শিকার করলেন!
নবিজির জীবনী পড়লে আপনি অবাক হবেন। দেখবেন, তাঁর জীবনে এত এত ঘটনা ঘটেছে এবং রাগান্বিত হওয়ার মতো অসংখ্য কারণও ছিল। কিন্তু তিনি নিজের রাগকে সাধারণভাবে প্রকাশ করেছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেছেন সূক্ষ্মভাবে।
আমরা দেখতে পাই, আমাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে শান্তশিষ্ট, তারাও মাঝেমধ্যে রাগান্বিত হয়। কিন্তু নবিজি ছিলেন এর ব্যতিক্রম। জীবনের কোনো সময়ে একটিবারের জন্যও তিনি নিজের রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাননি; তা পরিবারের সাথে হোক কিংবা সাহাবিদের সাথে।
হ্যাঁ, তিনি রাগান্বিত হয়েছেন। কিন্তু তা কখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। সাহাবিরা নবিজির চেহারা দেখেই বুঝতে পারতেন, তিনি রাগ করেছেন। তবে কখনোই তিনি কোনো কাজের মধ্যে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন না। আমাদের মধ্যে অনেকেই এমন আছে, যারা কিনা রাগান্বিত হলে মোবাইল ছুড়ে মারে, প্লেট-গ্লাস ভেঙে ফেলে। কিন্তু নবিজি এমনটা করতেন না।
একবার এক সাহাবি বুঝতে পারেন, নবিজি তাঁর ওপর রাগ করেছেন। তিনি দেখতে পান, রাসূলুল্লাহ হাসির মাধ্যমে তাঁর রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন। নবিজি হাসছেন ঠিকই, কিন্তু সেই হাসি ছিল রাগমিশ্রিত।
এখন আপনি ভাবতে পারেন, আমি বদমেজাজি। আমার রাগ হলে আমি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমারই-বা কী করার আছে! হ্যাঁ এটা ঠিক, প্রতিজন মানুষই আলাদা আলাদা মেজাজের অধিকারী। আমরা আবু বকর ও উমর (রা.)-এর দিকে তাকালেই দেখি-দুজন ছিলেন দুই প্রকৃতির মানুষ। একজন ঠান্ডা। আর অন্যজন ছিলেন গরম মেজাজের।
তারপরও মাঝেমধ্যে আবু বকর (রা.)-কে প্রচণ্ড রাগান্বিত হতে দেখা যেত। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় তিনি উমর (রা.)-এর চেয়েও বেশি রাগান্বিত ছিলেন। অন্যদিকে খলিফা হওয়ার পূর্বের উমর এবং পরের উমর ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। খলিফা হওয়ার পর তিনি আগের মতো কঠোর ছিলেন না। তখন থেকে তিনি তাঁর রাগ নিয়ন্ত্রণ করতেন।
যারা বলে-আমি গরম মেজাজের, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, তাদের জন্য উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর দৃষ্টান্তই উল্লেখ্য। যারা স্বভাবতই ঠান্ডা মেজাজের, আর যারা ত্যাগ-সাধনার পর এ গুণের অধিকারী হয়েছেন, দুজনের সওয়াব কিন্তু সমান হবে না। যিনি নিজের একান্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তিনি বেশি সওয়াব পাবেন। তার নেকের পাল্লা ভারি হবে। এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমরা কীভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি?

টিকাঃ
৬১ সহিহ বুখারি: ৬০৯৯
৬২ সূরা বাকারা: ২৩৫
৬৩ সূরা আলে ইমরান: ১৩৩-১৩৪
৬৪ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৮৯
৬৫ সহিহ বুখারি: ৬১১৬
৬৬ সহিহ বুখারি: ৬১১৪; সহিহ মুসলিম: ৬৫৩৫

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 ভালো কাজে অন্যকে সহযোগিতা

📄 ভালো কাজে অন্যকে সহযোগিতা


একজন মুমিন বিচ্ছিন্নবাদী নয়, সে সন্ন্যাসী জীবনযাপন করতে পারে না। মুমিনকে অবশ্যই সমাজে বসবাস করতে হয়। বৃহত্তর স্বার্থে একজন মুমিন আরেকজন মুমিনকে সহযোগিতা করে। কেউ যদি মনে করে, সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর ইবাদত করলে মনে হয় সহজে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যাবে, তাহলে এটা ভুল ধারণা। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে চাইলে সমাজে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে হবে। থাকতে হবে জামাতের সাথে। কুরআনে আল্লাহ সূরা আসরে তিন শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা হলো-
'যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।'
উদ্ধৃত আয়াতটির প্রথম দুই আমল হলো ব্যক্তিগত আমল, শেষের আমলটি সামষ্টিক আমল। সেটা আপনি একা করতে পারবেন না। সবার সাথে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করলে তবেই আপনি অন্যকে সত্যের উপদেশ দিতে পারেন, ধৈর্যের দাওয়াত দিতে পারেন।
আপনি অন্যকে সহযোগিতা করতে হলে একসাথে বসবাস করতে হবে। প্রত্যেক নবি-রাসূলগণ সমাজে বসবাস করেছেন। তাঁরা পৃথিবীতে এসেছেন সমাজ গঠন করতে, আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করতে। কেউই সমাজ ছেড়ে গুহায় বসবাস করতে মানুষকে নির্দেশ দেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনীতে পাওয়া যায়, তিনি মক্কা ও মদিনায় বিশাল একটা সমাজ গড়ে তোলেন। ইন্তেকালের পূর্বে ওই দুই সমাজেই তিনি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না। আর তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালোবাসার সঞ্চার করেছেন এবং তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়েছ।'
সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন, তারা প্রথমে পরস্পর বিচ্ছিন্ন ছিলেন। আল্লাহর অনুগ্রহের কারণে তারা পরস্পর ভাই ভাই হতে পেরেছিলেন। নবিজি মুমিনের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের জন্য বিল্ডিংয়ের ইটের মতো, যার এক অংশ আরেক অংশকে শক্তিশালী করে থাকে।
এই কথা বলে নবিজি তাঁর হাতের আঙুলগুলো একটি আরেকটির সাথে মিলিয়ে ওপরে ওপরে রাখলেন, বিল্ডিং নির্মাণের সময় যেমন একটি ইটের ওপর আরেকটি ইট রাখা হয়। আপনি একটি ইট দিয়ে একটি বিল্ডিং নির্মাণ করতে পারবেন না। এর জন্য অনেকগুলো ইটের প্রয়োজন। সবগুলো ইট পরস্পর জোড়া লাগালে তবেই বিল্ডিং নির্মাণ করতে পারবেন। মুমিনের উদাহরণও তেমন। একটি ভালো কাজ করতে গেলে সবাইকে একত্রিত হতে হবে। নিজ নিজ জায়গা থেকে আলাদা আলাদা অবস্থান করে বড়ো ধরনের কোনো ভালো কাজ করা সম্ভব নয়। এজন্য আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন-
'তোমরা সৎকাজ ও দ্বীনদারিতায় একে অন্যের সাহায্য করো।'
ইসলাম কোনো ব্যক্তিগত ধর্মের নাম নয়। সামষ্টিক ও সামাজিক ধর্মই মূলত ইসলাম। আপনি যদি মনে করেন একাকী নামাজ-রোজা করে দ্বীনদার হয়ে যাবেন, এটা ভুল ধারণা। আপনাকে জামাতের সাথে থাকতে হবে। নবিজি বলেন, আল্লাহর রহমতের হাত মুসলিমদের জামাতের ওপর থাকবে। আর যে ব্যক্তি জামাত থেকে পৃথক হয়ে যায়, শয়তান তার সঙ্গী হয়ে যায় এবং তাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেয়।
আমরা মুসলিম জামাতের সাথে বসবাস করব; আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য কখনোই জামাত বিচ্ছিন্ন থাকার প্রতি উৎসাহিত করে না। জামাত বিচ্ছিন্ন হলে ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে নবিজি একটি উদাহরণের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। পালের যে মেষটি দল থেকে আলাদা হয়ে যায় কিংবা যেটি খাবারের সন্ধানে দূরে সরে পড়ে বা যেটি অলস বলে এক কিনারায় বসে থাকে, নেকড়ে সেটিকে শিকার করে নেয়। তোমরা কখনো জামাত ছেড়ে গিরিপথে চলে যাবে না, জামাতবদ্ধ হয়ে মুসলিমদের সাথে থাকবে।
আমরা মুসলিম জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আমাদের ঈমানে ঘাটতি দেখা দেয়। ঈমানে ঘাটতি দেখা দেয় আমাদের সন্তানদের। আপনার সন্তানকে আপনি মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত করুন। মসজিদে নিয়ে যান। ওই পরিবেশের সাথে, মুসলিম জামাতের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিন।
জামাত মানে কেবল মসজিদে নামাজের জামাত মনে করলে হবে না। ভালো কাজের জন্য যখন একত্রিত হবেন, সেটাও জামাত। যেমন: গরিব-অসহায়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে একত্রিত হলেন। আবার দেশের যেকোনো সংকটের সময় মিসকিনদের সহযোগিতা করতে জামাতবদ্ধ হলেন। এটাও জামাতের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, মুমিনরা বৃহত্তর স্বার্থে একত্রিত হলে সেটাও আল্লাহর সুন্নাহ, নতুবা বৃহত্তর স্বার্থ বলতে কিছু থাকত না।
মুসলিম ইতিহাসে এমন কোনো আলিম নেই এবং এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, যিনি কিনা একাকী বা গুহায় বসবাস করে জীবন কাটিয়েছেন। অবশ্যই আপনাকে সমাজে বসবাস করতে হবে, সমাজের মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে।
আপনি কোনো একটি কাজ পছন্দ করেন, সেই কাজটি করতে চান। যারা ওই কাজে দক্ষ তাদের পরামর্শ নিন, তাদের জামাতে শরিক হোন। আমরা যখন কোনো কাজের নিয়তে একত্র হই, আমাদের শক্তি বেড়ে যায়। আমি হয়তো একটি কাজে দক্ষ, আরেকটি কাজে অদক্ষ। কিন্তু আমার সহযোগি হয়তো ওই কাজটাই খুব ভালোভাবে পারে।
একজন ভালো লিখতে পারে, আরেকজন ভালো ডিজাইন করতে পারে। দুজন একত্রিত হলে ভালো ডিজাইনের সাথে একটি ভালো লেখা প্রকাশিত হবে।
আপনি যখন মানুষের সাথে মেশা শুরু করবেন, কেউ না কেউ আপনাকে কষ্ট দেবে। কটু কথাও শোনা লাগতে পারে। তার মানে এই না, আপনি মানুষের সাথে মেশা বন্ধ করে দেবেন। নবিজি বলেন, যে মুমিন মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের জ্বালাতনে ধৈর্যধারণ করে, সে এমন মুমিন ব্যক্তির তুলনায় অধিক সওয়াবের অধিকারী হয়, যে কিনা মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের জ্বালাতনে ধৈর্যধারণ করে না।
মানুষের সাথে মেলামেশার ফলে মানুষের পক্ষ থেকে আপনার কাছে কষ্ট আসবেই, তাতে ধৈর্যধারণ করলে অবশ্যই সওয়াব পাবেন। আপনি ঘরে একা একা নির্জনে নিরিবিলি থাকার আর কোনো সুযোগ থাকল না। আপনাকে বের হয়ে আসতে হবে। মানুষের সাথে মিশতে হবে। কথা বলতে হবে। বিপদে অপরের পাশে দাঁড়াতে এবং ভালো কাজে সহযোগিতা করতে হবে।

টিকাঃ
৮৪ সূরা আসর: ৩
৮৫ সূরা আলে ইমরান: ১০৩
৮৬ সহিহ বুখারি: ৪৮১
৮৭ সূরা মায়েদা : ২
৮৮ সুনানে নাসায়ি: ৪০২০
৮৯ মুসনাদে আহমাদ: ২১৬০২
৯০ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০৩২

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 অন্যের দোষ গোপন রাখা

📄 অন্যের দোষ গোপন রাখা


মুমিনের অন্যতম একটি গুণ হলো, সে অন্যের দোষ গোপন রাখে। একজন মুমিন অন্যের দোষত্রুটি কারও কাছে বলে বেড়ায় না। নাটকীয়তার আশ্রয় নেয় না। আরবিতে একে বলা হয় 'সিতির'। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-
'নিশ্চয়ই যারা এটা পছন্দ করে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব।'
আল্লাহ আরও বলেন-
'মন্দ কথার প্রচার আল্লাহ পছন্দ করেন না, তবে কারও ওপর জুলুম করা হলে সেটা ভিন্ন কথা।'
আল্লাহ কখনোই মন্দ কথা এবং মন্দ কাজ পছন্দ করেন না। আর এর প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ুক তা-ও তিনি চান না। তবে কারও ওপর জুলুম করা হলে বিচারের জন্য একাধিকজনকে জানানো যেতে পারে। যেমন: কাউকে যদি নিয়মিত চুরি করতে দেখেন, অন্যের অধিকার হরণ করতে দেখেন, তখন সেটা জনসম্মুখে বলতে অসুবিধা নেই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে এ রকম অসংখ্য ঘটনা দেখা যায়। তন্মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা হলো আয়িশা (রা.)-এর ব্যাপারে অপবাদের (ইফকের) ঘটনা। যারা গুজব রটিয়েছিল, তাদের ব্যাপারে যেমন আল্লাহ শাস্তির কথা উল্লেখ করেন, তেমনই বাকিদের ব্যাপারে বলেন-
'এ কথা শোনার পর মুমিন পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করেনি এবং বলেনি-এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ?'
আল্লাহ দোষত্রুটি গোপন করতে পছন্দ করেন। আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি নাম হলো, আস-সিত্তির। এর অর্থ, যিনি দোষত্রুটি গোপন রাখেন।
নবিজি বলেন-নিশ্চয়ই আল্লাহ লজ্জাশীল, গোপনীয়তা অবলম্বনকারী। তিনি লজ্জা ও গোপনীয়তা পছন্দ করেন।
নবিজির একজন সাহাবি ছিলেন। নাম ছিল মাইজ আসলামি (রা.)। তিনি একবার যিনা করে ফেলেন। এরপর তিনি অনুতপ্ত হন, শাস্তি পেতে চান। পরামর্শের জন্য যান আবু বকর (রা.)-এর কাছে। আবু বকর (রা.) বলেন-আল্লাহ তোমার পাপ গোপন রেখেছেন, এখন তুমি নিজে তোমার পাপ গোপন রাখো।
অতঃপর তিনি যান তাঁর বন্ধু হাজ্জাল (রা.)-এর কাছে। হাজ্জাল (রা.) মাইজ আসলামিকে নিয়ে যান নবিজির কাছে। মাইজ নিজের পাপের কথা কয়েকবার রাসূলুল্লাহর কাছে বলেন, তিনি তাঁকে যিনার শাস্তি দেন। শাস্তি দেওয়ার পূর্বে তিনি মাইজকে দোষারোপ না করে বরং হাজ্জালকে দোষারোপ করেন। কারণ, হাজ্জাল চাইলে মাইজ (রা.)-এর পাপ গোপন রাখতে পারতেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, হে হাজ্জাল! যদি তুমি এই খবরটি গোপন রাখতে, তাহলে তা তোমার জন্য ভালো হতো।
নবিজি হাজ্জাল (রা.)-সহ অন্য সাহাবিদের শেখালেন-তোমরা কেউ যদি কারও বড়ো কোনো পাপ গোপন রাখো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের পাপ গোপন রাখবেন। কারও পাপ বলে বেড়ানোর চেয়ে সেটা গোপন রাখাটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। নবিজি বলেন-কোনো বান্দা যদি অপর কোনো বান্দার দোষত্রুটি দুনিয়াতে গোপন রাখে, আল্লাহ তার দোষত্রুটি কিয়ামতের দিন গোপন রাখবেন।
আপনি জানতে পারলেন, আপনার কোনো মুসলিম ভাই বা বোন একটা পাপ করে ফেলেছে। আর সেটা গোপনে এসে সে আপনার কাছে শেয়ার করেছে কিংবা আপনি তাকে ওই কাজটা করতে দেখেছেন। এমনটি হলে তার দোষ গোপন রাখুন। আপনি যদি তার সেই দোষ বা পাপ কর্মটি গোপন রাখেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ আপনার দোষ গোপন রাখবেন। আল্লাহ যদি আপনার দোষ গোপন রাখেন, আপনার স্থান হবে জান্নাতে।
মুনাফিকের কাজ হলো অন্যের দোষত্রুটি খোঁজা এবং তা বলে বেড়ানো। কাউকে কোনো পাপ করতে দেখলে তারা সেটাকে ক্যামেরাবন্দি করে। পুরো দুনিয়াকে সেই পাপ দেখায়। এমন কাজের ব্যাপারে নবিজি সতর্কবার্তা জানিয়ে দেন। তিনি বলেন-হে লোক সকল! যারা কেবল মুখেই ঈমান এনেছ, কিন্তু অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের গিবত করবে না এবং তাদের দোষত্রুটি তালাশ করবে না। কেননা, যারা দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে, আল্লাহও তাদের দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ কারও দোষত্রুটি খুঁজলে তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপদস্থ করে ছাড়বেন। '
এই হাদিসটি খুবই ভীতিপ্রদর্শনকারী হাদিস। যারা সারাক্ষণ অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, রাসূলুল্লাহ তাদের মুনাফিক বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ, তারা মুখে ঈমান আনলেও তাদের অন্তর ঈমান আনেনি।
এখনকার সময়ে আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন ও টিভি চ্যানেল সারাক্ষণ অন্যের দোষত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করছে। কোন সেলিব্রিটি কখন কী করেছে, সেটাই যেন তাদের নৈমিত্তিক আলোচনার বিষয়। মিডিয়ার দ্বারা প্রভাবিত এমন কাজ আমাদের মুসলিম সমাজকেও আক্রান্ত করেছে। ফলে মুসলিমরা তাদের মূল বৈশিষ্ট্য ভুলে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোষত্রুটি খোঁজায় লিপ্ত।
প্রত্যেকেই আমরা জীবনে কোনো না কোনো পাপ করেছি। ভুল করেছি। আবার কাউকে কাউকে পাপ করতে দেখেছি। এক্ষেত্রে ইসলাম আমাদের বলে, নিজেদের গোপন পাপ যেন আমরা গোপন রাখি এবং অন্যের গোপন পাপও যেন গোপন রাখি। কাউকে পাপকর্মে লিপ্ত থাকতে দেখলে অন্যকে বলার আগে তাকে বলতে পারি-ভাই, আপনি যেটা করছেন, এটা তো পাপ। আল্লাহর ওয়াস্তে ফিরে আসুন এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করুন।
কিন্তু সাধারণ নিয়ম হলো পাপকে গোপন রাখা। আমাদের এই সময়ে যেটা অনুপস্থিত। এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে-যদি আমরা অন্যের দোষ বলে বেড়াই, এতে কী এমন ক্ষতি হয়? হ্যাঁ ক্ষতি হয়, কিছু ব্যাপার নিয়ে তাহলে আলোচনা করা যাক:

টিকাঃ
৯১ সূরা নূর: ১৯
৯২ সূরা নিসা: ১৪৮
৯৩ সূরা নূর: ১২
৯৪ সুনানে আবু দাউদ: ৪০১২
৯৫ মুয়াত্তা ইমাম মালেক ১৫০৯; সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৭৭
৯৬ সহিহ মুসলিম: ৬৪৮৯

📘 মুমিনের আখলাক > 📄 হাসিমুখে কথা বলা

📄 হাসিমুখে কথা বলা


সব সময় হাসিখুশি থাকা মুমিনের একটি বৈশিষ্ট্য। একজন মুমিন সারাক্ষণ গম্ভীর মুখে থাকতে পারে না। মাঝেমধ্যে সে হাসবে, আনন্দ করবে। জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) মদিনায় বসবাস করতেন। তিনি বলেন, যখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার দিকে তাকাতেন, তিনি মুচকি হাসতেন।
জারির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) প্রতিদিন অন্তত পাঁচবার মসজিদে নববিতে নামাজ পড়তে যেতেন। দিনের অন্যান্য সময়েও রাসূলুল্লাহর সাথে তাঁর দেখা হতো। তিনি বলেন-নবিজি যখনই তাঁর দিকে তাকাতেন, হাসিমুখে তাকাতেন। আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রা.) নামে আরেকজন সাহাবি ছিলেন। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর চাইতে বেশি মুচকি হাসি দিতে আর কাউকে দেখিনি।
নবিজি নিজে যেমন হাসিখুশি থাকতেন, তেমনই আমাদেরও হাসিখুশি থাকার উপদেশ দেন। অন্যের সাথে হাসিমুখে কথা বলাকে যেন তুচ্ছভাবে না দেখি, সেজন্য তিনি সতর্ক করেন। বলেন, কোনো নেক আমলকে হীন মনে করো না; হোক সেটা ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ।
আমরা যদি কারও সাথে হাসিমুখে কথা বলি, তাতেও সওয়াব আছে আর সেটা হলো সাদাকার সওয়াব। নবিজি বলেন, প্রতিটি ভালো কাজই সাদাকারূপে গণ্য। তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে দেখাসাক্ষাৎ করাও (সাদাকার অন্তর্ভুক্ত)।
আমি একটি বিষয় লক্ষ করেছি। তা হলো, যারা দ্বীনে ফেরে, ফেরার পর আকস্মিকভাবেই তাদের মেজাজ রুক্ষ হয়ে যায়। দিনের অধিকাংশ সময়ই মেজাজ উত্তপ্ত থাকে। মুখে হাসি দেখা যায় না। কেমন যেন রাগান্বিত, ধমকাধমকির মধ্যে থাকে। আমি জানি না তারা কোন সুন্নাহ পালন করে, এমন সুন্নাহ তারা কোথায় পেয়েছে!
ইসলাম আমাদের বলে, আমরা যেন সব সময় হাসিখুশি থাকি। অন্যের সাথে হাসিমুখে আনন্দচিত্তে কথা বলি। কোনো ক্ষেত্রে রাগ দেখানো বা ধমক দেওয়ার প্রয়োজন হলে ধমক দেবো, রাগ দেখাব। কিন্তু আমাদের আদর্শিক আচরণ হলো সব সময় সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলা।
সাইকোলজিস্টরা বলেন, হাসিখুশি থাকলে রক্তচাপ কমে যায়। এটি এমন একটি কাজ, যার প্রভাব আপনার পাশেরজনের ওপর পড়বে। অন্যজনও হাসিমুখে থাকবে। আপনি রাগান্বিত অবস্থায় থাকলে আপনার পাশেরজনও অবচেতন মনেই আপনার রাগ দেখে রাগান্বিত হবে। নবিজি মাঝেমধ্যে অট্টহাসি হাসতেন। এমনভাবে হাসতেন, সাহাবিরা তাঁর মাড়ির দাঁত দেখতে পেতেন।
তবে রাসূলুল্লাহ এমনভাবে হাসতেন না, যেভাবে হাসলে খারাপ দেখা যায়। ফজরের নামাজ পড়ে সাহাবিরা মসজিদে বসতেন। কেউ কেউ জাহেলিয়াতের সময়ের গল্প বলতেন, সবাই হাসতেন। নবিজিও ওই মজলিসের হাসিতে অংশগ্রহণ করতেন।
নবিজি প্রায় সময় কৌতুক বলতেন। সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনিও আমাদের সাথে কৌতুক করছেন? সাহাবিরা অবাক হতেন এই কারণে, নবিজির মতো একজন ব্যক্তিত্ববান মানুষ কি তাদের সাথে কৌতুক করতে পারেন। জবাবে তিনি বলেন, আমি কৌতুকচ্ছলে কখনো সত্য ছাড়া মিথ্যা বলি না।
নবিজি মজা করতেন বটে, তবে মজাচ্ছলে মিথ্যা বলতেন না। কাউকে হেয় করতেন না, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন না। একবার এক বৃদ্ধা নবিজির কাছে এসে অনুরোধ করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর কাছে দুআ করুন, আমি যেন জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, শুনুন! কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না!
এ কথা শুনে বৃদ্ধা কান্না জুড়ে দেয়। তখন নবিজি জানিয়ে দিলেন, আপনি বৃদ্ধা অবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। কারণ, জান্নাতে সবাই কুমারী হয়েই যাবে।
একবার এক সাহাবি এসে নবিজির কাছে একটি উট চান। নবিজি তাকে বলেন, আমি তোমাকে একটি উটনীর বাচ্চা দিচ্ছি। সাহাবি চাইলেন উট, রাসূলুল্লাহ দিতে চাইলেন উটনীর বাচ্চা! এটা শুনে সাহাবি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! উটনীর বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? এবার তিনি উত্তরে বললেন, প্রত্যেক উটই তো কোনো না কোনো উটের বাচ্চা!
জাহির (রা.) নামের একজন বেদুইন ছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে নবিজির কাছে হাদিয়া নিয়ে আসতেন। দেখতে তিনি কালো ছিলেন। চলে যাওয়ার সময় নবিজি বলতেন, জাহির আমাদের পল্লিবন্ধু। আর আমরা তাঁর শহুরে বন্ধু!
জাহির একবার বাজারে বেচাকেনা করছিলেন। নবিজি তাকে পেছন থেকে জাপটে ধরেন। তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। যখন বুঝতে পারলেন তাঁকে পেছন থেকে আর কেউ নন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাপটে ধরেছেন, তখন নিজের পিট রাসূলুল্লাহর বুকের সাথে মেলালেন।
নবিজি বাজারে হাঁক দিলেন, আমার এই গোলামটিকে কে কিনবে? জাহির (রা.) মন খারাপ করে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে বিক্রি করলে কেবল অচল মুদ্রাই পাবেন! রাসূলুল্লাহ তাঁর দুঃখ বুঝতে পারলেন। তিনি জাহির (রা.)-এর মনটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন। মানুষ তাঁকে মূল্যায়ন করে না, এটা ঠিক। কিন্তু যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনি? নবিজি বললেন, কিন্তু তুমি আল্লাহর নিকট অচল নও। আল্লাহর নিকট তোমার উচ্চমর্যাদা রয়েছে।
নবিজি প্রায়ই সাহাবিদের সাথে মজা করতেন, বিভিন্ন কথা বলে বলে তাঁদের আনন্দিত করতেন। তবে আমাদের কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে :
ক. আমরা যখন কারও সাথে মজা করব, খেয়াল রাখব সে কষ্ট পাচ্ছে কি না। মজাচ্ছলেও এমন কথা বলা যাবে না, যা শুনলে আরেকজন কষ্ট পায়।
খ. মজাচ্ছলে এমন কিছু করা যাবে না, যা দেখে আরেকজন ভয় পায়। যেমন : তেলাপোকা, সাপ-বিচ্ছু দেখিয়ে ভয় দেখানো ইত্যাদি।
নবিজির কয়েকজন সাহাবি একবার একটি সফরে গেলেন। পথমধ্যে একজন সাহাবি ঘুমিয়ে ছিলেন। আরেকজন সাহাবি তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে ফেলেন। এটা করেন কেবল মজা করার জন্যই। ঘুমন্ত সাহাবি ঘুম থেকে উঠলে কী ভাববেন? হয়তো এমনটাও ভাবতে পারেন—তাকে কেউ বন্দি করেছে বা গুম করার জন্য তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
ঘুমন্ত অবস্থায় বেঁধে ফেলার ফলে তিনি আচমকা ঘুম ভাঙার পর ভয় পেয়ে যান। এই ঘটনাটি নবিজির কানে পৌঁছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, একজন আরেকজনের সাথে মজা করে তো এমনটা করতেই পারেন। একজনকে ভয় দেখিয়ে হলেও তো বাকিরা আনন্দ পেল। কিন্তু না। রাসূলুল্লাহ এই ঘটনাটি শোনার পর কঠিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, কোনো মুসলমানের জন্য আরেক মুসলমানকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো-সে নিজে হাসিখুশি থাকবে, অন্যকে হাসিখুশি রাখবে। সারাক্ষণ রাগত আর ভার মুখো হয়ে বসে থাকলে হবে না। ভালো থাকার জন্য হলেও মাঝেমধ্যে মানুষের সাথে মজা করতে হবে।
সাহাবিরা নবিজির মুখে ইন্তেকালের কয়েক দিন আগেও মুচকি হাসি লেগে থাকতে দেখেছিলেন।
নবিজির জীবনী বা সিরাত থেকে আমরা শিখতে পারি, আমাদেরও সব সময় হাসিখুশি থাকতে হবে। আমরা যত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাই হই না কেন, অঢেল টাকাপয়সার মালিক, সমাজের বহু বড়ো মর্যাদাবান ব্যক্তিত্বই হই না কেন, সর্বাবস্থায় হাসিমুখে থাকতে হবে।

টিকাঃ
৯৯ সহিহ বুখারি: ৩০৩৫
১০০ জামে আত-তিরমিজি: ৩৬৪১
১০১ সহিহ মুসলিম: ৬৫৮৪
১০২ জামে আত-তিরমিজি: ১৯৭০
১০৩ মুসনাদে আহমাদ: ৩৫৯৫
১০৪ মুসনাদে আহমাদ: ৮৭০৮
১০৫ শামায়েলে তিরমিজি: ১৭৯
১০৬ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৭
১০৭ শামায়েলে তিরমিজি : ১৭৮
১০৮ সুনানে আবু দাউদ: ৫০০৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00