📄 বীরত্বহিরতা
অষ্টম হিজরির ঘটনা। বাহরাইনের একটি প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট সাক্ষাৎ করতে আসে। কোনো ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই ইসলাম গ্রহণ করে এই গোত্র। অর্থাৎ তারা ইসলাম সম্পর্কে জানামাত্রই রাসূলুল্লাহর কাছে আসে এবং ইসলাম গ্রহণ করে।
সেই গোত্রের ১০-১৫ জনের একটি প্রতিনিধিদল মসজিদে নববিতে প্রবেশ করল। তারা নবিজির সঙ্গে দেখা করতে এতটা উদ্গ্রীব ছিল যে, মসজিদে প্রবেশের আগে উট বাঁধতে ভুলে গেল। ঢুকেই তারা নবিজির হাত-পায়ে চুমো খেলো। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বেশ ব্যতিক্রম। তাঁর নাম আশাজ ইবনে কায়েস (রা.)। সবার সাথে বাহরাইন থেকে এলেও তিনি একসঙ্গে মসজিদে প্রবেশ করেননি এবং বাকিরা যা যা করেছে, তা-ও তিনি করেননি।
আশাজ্জ (রা.) তাঁর উটটি বাঁধলেন। সফর করে ক্লান্ত থাকার ফলে গোসল করেন। সঙ্গ করে আনা দুটি জামা হতে পরিষ্কার দেখে একটি জামা পরলেন। আসার সময়ই তিনি নিয়ত করে এসেছিলেন-একটি সফরকালে আর অন্যটি নবিজির সাথে দেখা করার সময় পরবেন।
অতঃপর তিনি নবিজির সাথে দেখা করেন। যা যা জানা দরকার, খুব শান্ত-ধীর স্বরে এক এক করে প্রশ্ন করেন; অন্যদের মতো তাড়াহুড়ো করেননি। রাসূলুল্লাহ আশাজ্জ ইবনে কায়েসের এই গুণের প্রশংসা করে বলেন, হে আশাজ্জ! তোমার দুটি বিশেষ গুণ রয়েছে, যা আল্লাহ পছন্দ করেন। সেগুলো হলো-ধৈর্যশীলতা ও সহিষ্ণুতা; ধীরস্থিরতা।
আশাজ্জ ইবনে কায়েস (রা.) নিজের প্রশংসা শুনে নবিজিকে একটি বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করলেন। বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমিই কি এই গুণ অর্জন করেছি নাকি আল্লাহ আমাকে এই দুটি গুণের ওপর সৃষ্টি করেছেন? উত্তরে তিনি বলেন, আল্লাহ তোমাকে এই দুটি গুণের ওপর সৃষ্টি করেছেন।
এ কথা শুনে আশাজ্জ ইবনে কায়েস (রা.) বললেন, আলহামদুলিল্লাহ! কৃতজ্ঞতা আদায় করছি সেই আল্লাহর, যিনি আমাকে এমন দুটি স্বভাবের ওপর সৃষ্টি করেছেন; যাকে স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পছন্দ করেন।
নবিজি আশাজ্জ ইবনে কায়েস (রা.)-এর চিন্তাভাবনা-ধীরস্থির করে কাজ করাটা পছন্দ করেন।
একজন মুমিন তাড়াহুড়ো প্রবণ হয়ে চিন্তাভাবনা ছাড়াই কোনো কাজ করে না। মনে যা চায়, হুটহাট চাইলেই তা করে ফেলতে পারে না। তার প্রতিটি কাজই হবে প্রজ্ঞাপূর্ণ ও চিন্তামূলক। এই ব্যাপারে নবিজি বলেন-ধৈর্য ও স্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আর তাড়াহুড়ো শয়তানের পক্ষ থেকে।
ধৈর্যের সহিত কাজ করলে আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন। তাড়াহুড়োর কাজে কোনো বরকত নেই। তবে দ্বীনি কোনো কাজের ব্যাপারে আমরা চটজলদি করতে পারি। যেমন: কাউকে দান করতে গেলে বেশি সময় ধরে ভাবার কারণ নেই। সে যদি দান গ্রহণের উপযুক্ত হয়, তাকে দান করে দিন। আপনি নিয়ত করছেন দুই রাকাত নামাজ পড়বেন। সুযোগ পাওয়ামাত্রই পড়ে ফেলুন। গড়িমসি করে আজ পড়ব, কাল পড়ব বলে দেরি করার প্রয়োজন নেই। তাড়াহুড়ো প্রবণতার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মানুষের সম্পর্কে বলেন-
'মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়োর প্রবণতা দিয়ে।'
তাড়াহুড়ো করার কারণে কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ মানুষের সমালোচনা করেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ইউনুস (আ.)-এর কিছু ঘটনা।
ইউনুস (আ.) তাঁর কওমকে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেন। কিন্তু তারা তাঁর ডাকে সাড়া দিলো না। বারবার চেষ্টা করেও যখন কোনো ফলাফল আসছে না, তখন তিনি তাঁর জনপদ ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যাওয়ার পূর্বে তাঁর কওমকে বলে যান, তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর আজাব এসে উপস্থিত হবে।
তাঁর কওমের লোকেরা আল্লাহর আজাবের কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল। তারা আল্লাহকে মেনে নিল। ফলে শিরক ত্যাগ করল এবং আল্লাহর কাছ থেকে আজাব মুক্তির দুআ করতে লাগল। আল্লাহ তাদের দুআ কবুল করে তাদের ওপর থেকে কঠিন আজাব উঠিয়ে নেন।
অন্যদিকে ইউনুস (আ.) তাঁর কওমের ওপর রাগ করে সেই জনপদ থেকে চলে গিয়েছিলেন। এর জন্য তিনি আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষা করেননি। নবিগণের এমন সিদ্ধান্তের জন্য আল্লাহর অনুমতির প্রয়োজন হয়। তাঁরা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া হিজরত করতে পারেন না। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের জন্য নবিজিও আল্লাহর অনুমতির প্রয়োজন হয়েছিল।
অনুমতি ছাড়া ইউনুস (আ.)-এর এভাবে চলে যাওয়াকে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ উল্লেখ করেন 'পালিয়ে যাওয়া' হিসেবে। ইউনুস (আ.) আল্লাহর সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে তাড়াহুড়ো করেন। আর এমন তাড়াহুড়োর জন্য আল্লাহ তাঁকে পরীক্ষার মধ্যে ফেলেন।
অন্যদিকে ইউসুফ (আ.) জেলের মধ্যে ধৈর্যধারণ করেন। বাদশাহ ইউসুফ (আ.)-কে জেল থেকে মুক্তির আদেশ দিলেও তাঁর মধ্যে তাড়াহুড়োর প্রবণতা দেখা যায়নি। তিনি যে মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে জেলে যান, ওই মামলা থেকে আগে মুক্তি পেতে চান। তাই তিনি বলেন-
'তুমি তোমার মনিবের কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো, যে নারীরা হাত কেটেছিল, তাদের কী অবস্থা?'
ইউসুফ (আ.)-এর এমন ধৈর্যধীল অবস্থান এবং ধীরস্থিরতার ব্যাপারে জেনে স্বয়ং নবিজিও অবাক হন। তিনি ইউসুফ (আ.)-এর প্রশংসা করে বলেন-ইউসুফ (আ.) যত দিন জেলে কাটিয়েছেন, যদি আমি ততদিন কাটাতাম! আর আমার কাছে বাদশার আহ্বানকারী আসত, সেক্ষেত্রে অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দিতাম।
ইউসুফ (আ.) কেবল মুক্তির প্রস্তাব শুনেই জেল থেকে বের হননি। ফলে তিনি কলুষমুক্ত হয়েই বের হন। পরবর্তী সময়ে ওই বাদশাহ তাঁকে অর্থমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রী বানান। প্রজ্ঞা ও ধীরে-সুস্থে কাজ করার ফলে তিনি হাতেনাতে এর ফলাফল ভোগ করেন।
মুসা ও খিজির (আ.)-এর ঘটনায় আমরা দেখেছি, মুসা (আ.) বেশিক্ষণ ধৈর্যধারণ করতে পারেননি। তিনটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেই তিনি খিজির (আ.)-কে প্রশ্ন শুরু করেন। ফলে খিজির (আ.) ওই সময় তাঁদের শিক্ষা সফরের সমাপ্তি ঘটান। ঘটনাগুলো বর্ণনার সময় নবিজি মন্তব্য করেন, আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.)-এর ওপর রহম করুন। আমাদের কতই-না মনোবাঞ্জনা পূরণ হতো, যদি তিনি ধৈর্যধারণ করতেন। তাহলে আমাদের নিকট তাঁদের আরও ঘটনাবলি বর্ণনা করা হতো।
নবিজি আমাদের কোনো কাজের বিষয়ে তাড়াহুড়ো করতে যেমন নিষেধ করেন, তেমনই তাঁর স্ত্রীদেরও নিষেধ করেন। একবার নবিজির স্ত্রীগণ তাঁর কাছে দুনিয়াবি চাহিদার দাবি করেন। কিন্তু নবিজি সোজা জানিয়ে দেন, তিনি এমন জীবনযাপন পছন্দ করেন না। এর দরুন তিনি প্রায় এক মাস স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের আয়াত নাজিল করে এই বিষয়ের মীমাংসা করেন। তিনি বলেন-
'হে নবি! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন-যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা করো, তবে আসো, আমি তোমাদের ভোগবিলাসের ব্যবস্থা করে দিই এবং তোমাদের উত্তম পন্থায় বিদায় দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা করো, তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন। '
নবিজি প্রথমে তাঁর স্ত্রী আয়িশা (রা.)-কে বললেন, আমি তোমার কাছে একটি বিষয় উপস্থাপন করছি। তোমার মা-বাবার সাথে পরামর্শ না করা পর্যন্ত তুমি তাড়াহুড়ো করো না। তাড়াহুড়ো করলে তোমার লোকসান হবে। কেননা নবিজি আশঙ্কা করছিলেন, আয়িশা (রা.) তাড়াহুড়ো করে যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে যান! তাঁকে কুরআনের দুটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনানোর পর আয়িশা (রা.) জবাব দেন, এই ব্যাপারে আবার আমার মা-বাবার সাথে কী পরামর্শ করব? আমি তো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ও আখিরাতকেই বেছে নিচ্ছি।
এই ঘটনার মাধ্যমে এ কথা প্রতীয়মান হয়, নবিজি তাঁর স্ত্রী আয়িশা (রা.)-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে তাড়াহুড়ো করতে নিরুৎসাহিত করেন এবং মা-বাবার পরামর্শ নিতে বলেন। যদি তিনি তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতেন, ভুল হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
আমরা সব সময় যেকোনো সিদ্ধান্তই ভেবেচিন্তে এবং যথেষ্ট বোঝাপড়ার পর নেব। তাড়াহুড়ো করব না। তবে তিনটি ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকতে হবে। একেবারেই তাড়াহুড়ো করা যাবে না। সেগুলো হলো-
নামাজের সময়: আমরা যখন নামাজ পড়ব, তাড়াহুড়ো করা যাবে না। এমনকি নামাজে যাওয়ার সময় রাস্তায় দৌড়াতে পারব না। ধীরে-সুস্থে যেতে হবে।
আয়িশা (রা.) নবিজিকে নামাজের ভেতর এদিক-সেদিক তাকানো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন-এটা একধরনের ছিনতাই, যার মাধ্যমে শয়তান বান্দার নামাজ হতে অংশবিশেষ ছিনিয়ে নেয়। নামাজ আদায়ের সময় আপনি বুঝে-শুনে, সঠিক তিলাওয়াতের মাধ্যমে ধীরে-সুস্থে পড়বেন। তাড়াহুড়ো করবেন না, এদিক-সেদিক তো তাকাবেনই না।
দুআর ক্ষেত্রে: নবিজি বলেন, তোমাদের প্রত্যেক ব্যক্তির দুআ কবুল হয়ে থাকে; যদি সে তাড়াহুড়ো না করে আর বলে-আমি দুআ করলাম কিন্তু আমার দুআ তো কবুল হলো না।
অনেকেই দুআ করার পরই অধৈর্য হয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিক দুআর ফল পেতে চায়। এমনটা করলে আল্লাহ রাগ হন, দুআ কবুল করেন না। আপনি আপনার চাওয়ামতো দুআ করে যাবেন; কবুল হোক বা না হোক।
কারও ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে: কারও ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে গ্রহণের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো প্রবণ হওয়া যাবে না। আল্লাহ পবিত্র কুরআনের বেশ কিছু জায়গায় এই ব্যাপারে আমাদের সাবধান করে দিয়েছেন। আর কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নিলে যেন ভালোভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর সেটা করা হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও এই আশঙ্কায়, তোমরা অজ্ঞতাবশত হয়তো কোনো কওমকে আক্রমণ করে বসবে। ফলে পরবর্তী সময় তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে। '
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
'হে মুমিনগণ! যখন তোমরা আল্লাহর রাস্তায় বের হবে, যাচাই করে নেবে এবং যে তোমাদের সালাম দেবে দুনিয়ার জীবনের সম্পদের আশায়, তাকে বলবে না যে, তুমি মুমিন নও। '
আমরা কোনো সংবাদ শুনলে যেমন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেব, তেমনই কাউকে যদি কিছু করতে দেখি, তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জেনে নেব-সে এ কাজটা কেন করছে। নবিজির জীবনে এ রকম একটি ঘটনা দেখতে পাই। মক্কা বিজয়ের পূর্বে একজন বদরি সাহাবি (তাঁর নাম ছিল হাতিব ইবনে আবু বালতাআ রা.) মুসলিমদের মক্কা অভিযানের সংবাদ চিঠিতে লিখে মক্কায় জানিয়ে দিতে চান।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এটি মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে। মক্কায় আগام সংবাদ জানিয়ে দিচ্ছেন। চিঠিটি তিনি একজন মহিলার কাছে দেন। তা নিয়ে মহিলা মক্কার উদ্দেশে রওনা হন।
নবিজি ওহি মারফত খবরটি জানেন। তারপরও আলি ইবনে আবু তালিব ও জুবাইর ইবনে আবু বালতাআ (রা.)-কে পাঠালেন চিঠিটি উদ্ধার করতে। উদ্ধারের পর নবিজি হাতিব (রা.)-এর কাছে কারণ জানতে চান। তিনি বলেন-তাঁর পরিবার মক্কায় আছে, কুরাইশদের আগাম সংবাদ জানিয়ে দিচ্ছেন এই আশায় যে, মক্কায় আক্রমণ হলে তারা যেন তাঁর পরিবারকে সুরক্ষা দেয়।
হাতিব (রা.)-এর চিঠি প্রেরণের কারণ জানার আগপর্যন্ত মনে হতে পারে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। কিন্তু বিস্তারিত খুলে বলার পর মনে হয়, তিনি মূলত তাঁর পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তার দরুন চিঠি পাঠিয়েছেন। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ক্ষমা করে দেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহি লাভের সাথে সাথেই হাতিব ইবনে আবু বালতাআকে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেননি। তাড়াহুড়োও করেননি; বরং এর কারণ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।
তালাকের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, অনেকেই মেজাজ বিগড়ে বা কোনো প্রকার না ভেবেই তাড়াহুড়ো করে রাগের মাথায় স্ত্রীকে তালাক দেয়। এক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর যদি তারা তালাকের দৃঢ় ইচ্ছা করে নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।'
তালাকের 'দৃঢ় ইচ্ছা' কখন করা হয়? এটা কি রাগের মাথায়, তাড়াহুড়ো করে হয়? দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে বেশির ভাগ তালাক হয় তাড়াহুড়োর ফলে রাগের মাথায়!
একবার এক লোক আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কাছে এসে বলল, আমি আমার স্ত্রীকে রাগের মাথায় এক হাজার তালাক দিয়ে ফেলেছি। এখন কী করব? উত্তরে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তুমি তাড়াহুড়ো করে এমন এক কাজ করেছ, যা তোমার ধ্বংস ডেকে এনেছে! এখন এসেছ আমার কাছে ফতোয়া জানতে?
বিয়ে ও তালাকের ব্যাপারে কখনো তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেবেন না। এসব ক্ষেত্রে অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কীভাবে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্তগুলো নেব?
১. আপনি যখন রাগান্বিত থাকবেন, তখন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।
২. যখন কোনো কিছুর সংবাদ পাবেন, সাথে সাথে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন না। সময় নিন। সংবাদটি ভালোভাবে যাচাই করে নিন। ফেসবুকে বা উড়ো সংবাদে অনেক সময় মানুষ মিথ্যা গুজবের ওপর ভিত্তি করে অনেক বড়ো বড়ো লেখা লেখে। পরে পস্তাতে হয়। অথচ খানিক সময় নিলে এর আসল সত্যতা জানা যেত।
৩. পরামর্শ গ্রহণ করুন। বড়ো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে সমঝদার এমন কারও সাথে আলোচনার মাধ্যমে অবশ্যই পরামর্শ গ্রহণ করুন; যেমনটা নবিজি আয়িশা (রা.)-কে বলেছেন মা-বাবার পরামর্শ নিতে।
৪. বড়ো কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে ইস্তিখারা করুন। নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দুআ করুন। তাহলে দেখবেন সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে।
একজন মুমিন হুজুগে কোনো কাজ করে না। সে অবশ্যই ভেবেচিন্তে, পরামর্শ নিয়ে, ইস্তিখারার প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে কাজ করে।
টিকাঃ
৩৪ সহিহ মুসলিম: ২৫; সুনানে আবু দাউদ: ৫২২৫
৩৫ জামে আত-তিরমিজি: ২০১২
৩৬ সূরা আম্বিয়া: ৩৭
৩৭ সূরা ইউনুস: ৯৮
৩৮ সহিহ বুখারি: ২১০৮
৩৯ সূরা আস-সফফাত: ১৪০
৪০ সূরা ইউসুফ: ৫০
৪১ সহিহ বুখারি: ৬৯৯২
৪২ সহিহ বুখারি: ১২২
৪৩ সূরা আহজাব: ২৮-২৯
৪৪ সহিহ মুসলিম: ৩৫৭৩
৪৫ সহিহ বুখারি: ৭৫১
৪৬ সহিহ বুখারি: ৬৩৪০
৪৭ সূরা হুজুরাত: ৬
৪৮ সূরা নিসা ৪: ৯৪
৪৯ সহিহ বুখারি: ৬৯৩৯; সিরাত ইবনে হিশাম ৪/৩৭-৩৮; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/৪৮৮-৪৮৯
৫০ সূরা বাকারা: ২২৭
📄 প্রজ্ঞা
পূর্বের আলোচনার মাধ্যমে আমরা জেনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশাজ্জ ইবনে কায়েস (রা.)-এর দুটি গুণ পছন্দ করেন। তন্মধ্যে একটি হলো 'হিলম'। হিলম শব্দের আবার দুটি অর্থ। দুই অর্থে দুটি গুণ বোঝায়।
১. প্রজ্ঞা ও ২. রাগ নিয়ন্ত্রণ।
এখন আমরা আলোচনা করব প্রজ্ঞা নিয়ে। এটি এমন এক গুণ, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল পছন্দ করেন। এটি মুমিনের আখলাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তা ছাড়া আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি হলো, আল হাকিম। এর অর্থ করলে দাঁড়ায়-প্রজ্ঞাবান।
প্রজ্ঞার আরবি হলো 'হিকমা'। যে জিনিস যেখানে থাকার কথা, সেখানে রাখা বোঝাতে আরবরা হিকমা শব্দটি ব্যবহার করে। আলিমগণ হিকমার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন-কোনো কিছু এমনভাবে করা, যার ফলে ক্ষতি কমানো এবং লাভ বাড়ানো যায়। অর্থাৎ, দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য এমন কিছু করা, যার ফলে দুনিয়া ও আখিরাতে লাভ হয় বেশি, ক্ষতি হয় কম। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
'তিনি যাকে চান প্রজ্ঞা দান করেন। যাকে প্রজ্ঞা দেওয়া হয়, তাকে অনেক কল্যাণ দেওয়া হয়। আর বিবেকবানরাই এ উপদেশ গ্রহণ করে। '৫১ আল্লাহ লুকমান (আ.)-কে প্রজ্ঞা দান করেন। তিনি বলেন-
'আমি লুকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছিলাম। আর বলেছিলাম, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকো। '৫২ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিকমা দান করতে পারেন। এখন কারও মনে এ প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে-আল্লাহ যেহেতু আমাকে হিকমা দান করেননি, আমারই-বা কী করার আছে? পূর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছিলাম, চরিত্রের কিছু অংশ আল্লাহ দান করেন। আর কিছু অংশ অর্জন করে নিতে হয়। আল্লাহ আপনাকে হিকমা দান করেননি। তার মানে এই না, সেটা অর্জন করতে পারবেন না।
প্রত্যেকের যেমন শক্তিমত্তা আছে, তেমনই আছে দুর্বলতাও। আল্লাহ একেকজনকে একেকভাবে সৃষ্টি করেছেন। এমনটা কখনোই হতে পারে না, আপনাকে যে গুণ দেওয়া হয়নি সেটা অর্জনের চেষ্টা করবেন না। স্বভাবত যদি কোনো চারিত্রিক গুণ না-ই থাকে, তাহলে আপনি সেটা অর্জনের চেষ্টা করবেন। একইভাবে আমরা হিকমা বা প্রজ্ঞার গুণও অর্জন করতে পারি। কীভাবে? কুরআনের একটি আয়াতে আল্লাহ আমাদের দাওয়াত দেওয়ার পদ্ধতি বাতলে দেন। তিনি নির্দেশ দেন- 'তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করো এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক করো। নিশ্চয়ই একমাত্র তোমার রবই জানেন, কে তার পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হিদায়াতপ্রাপ্তদের তিনি খুব ভালো করেই জানেন।'
যদি এমন হতো-প্রজ্ঞার গুণ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেই গুণ অর্জন করতে পারব না, তাহলে আল্লাহ আমাদের এভাবে বলতেন না। তিনি যেহেতু প্রজ্ঞার সাথে দাওয়াত দিতে বলেছেন, তাই এ গুণ আমাদের মধ্যে না থাকলেও আমরা সেটা অর্জন করতে পারি।
হিকমার অনেকগুলো ভাগ আছে। সেগুলো হলো-
টিকাঃ
৫১ সূরা বাকারা: ২৬৯
৫২ সূরা লুকমান: ১২
📄 রাগ নিয়ন্ত্রণ
পূর্বের অধ্যায়ে আমরা 'হিলম' নিয়ে আলোচনা করেছি। হিলমের দুটি অর্থ নিয়েছিলাম-প্রজ্ঞা আর রাগ নিয়ন্ত্রণ। এখন আমরা রাগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করব।
আল্লাহর গুণবাচক নামগুলোর মধ্যে একটি হলো-আল হালিম। আল্লাহর ক্ষেত্রে আল হালিম মানে যিনি তাঁর সৃষ্টির ওপর রাগ নিয়ন্ত্রণ করেন, যদি না তাঁর সৃষ্টি রাগ করার মতো কিছু করেছে। অর্থাৎ, মানুষ এমন কোনো কাজ করেছে, যার ফলে আল্লাহ মানুষের ওপর রাগান্বিত হতে পারেন। কিন্তু তিনি তো অসীম দয়ালু, রাগান্বিত না হয়ে বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। এজন্যই তাঁকে বলা হয় আল হালিম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহর চেয়ে বেশি ধৈর্যধারণকারী আর কেউ নেই। লোকেরা তাঁর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করে, এরপরও তিনি তাদের বিপদমুক্ত রাখেন এবং রিজিক দান করেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে নিজেকে বেশ কয়েকবার 'হালিম' বলে উল্লেখ করেছেন। যেমন-
'তোমরা তাঁকে ভয় করো এবং জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল (হালিম)।'
আল্লাহ হলেন আল হালিম। তিনি রাগ করার মতো এমন কোনো কাজ বান্দা করলেও রাগান্বিত হন না। আল্লাহ যেমন আল হালিম, তেমনই যারা এই গুণে গুণান্বিত তিনি তাদের প্রশংসা করেন। পবিত্র কুরআনে নবি ইবরাহিম (আ.)-এরও প্রশংসা করেন। কারণ, তিনি ছিলেন এই গুণে গুণান্বিত।
নিজের রাগকে সংযত রাখা মুমিনের অন্যতম গুণাবলি। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এই গুণের প্রশংসা করেন এবং যারা নিজেদের রাগ সংযত করে, তাদের ব্যাপারে তিনটি পুরস্কারের ঘোষণা দেন। সেগুলো হলো-
১. ক্ষমা করে দেবেন।
২. জান্নাত দান করবেন এবং
৩. মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত করবেন।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمُوتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ. الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ * وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ.
'তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। (এগুলো তাদের জন্য) যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে, রাগ সংবরণ এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। '
এখানে উল্লেখ্য, যারা রাগ সংবরণ করে তাদের কথা বোঝাতে আল্লাহ যে শব্দ ব্যবহার করেছেন, তা হলো-'কাজিমিনা গাইজা' (كَاظِمِينَ الْغَيْظَ); তিনি 'কাজিমিনাল গাদাভ' (كَاظِمِينَ الْغَضَبَ) শব্দটি ব্যবহার করেননি। তবে শব্দ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?
ক. 'কাজিমিনা গাইজা' মানে হলো, যখন আপনি রাগান্বিত হওয়া শুরু করেন, তখনই সেটা নিয়ন্ত্রণ করেন।
খ. 'কাজিমিনাল গাদাভ' মানে হলো, আপনি রাগ করার পর একসময় তা নিয়ন্ত্রণ করেন।
এখানে আল্লাহ তায়ালা বলেন-যারা রাগ হওয়ার সাথে সাথেই তা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার। এর মানে, আপনি রাগান্বিত হওয়ার পূর্বেই তা করবেন যেন আপনার রাগ 'গাদাভ' পর্যন্ত না পৌঁছায়। নবিজি বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বান্দার ক্রোধ সংবরণে যে মহান প্রতিদান রয়েছে, তা অন্য কিছু সংবরণে নেই।
ধরা যাক, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে যদি আপনি এক গ্লাস ঠান্ডা পানি পান করেন, এর পর আপনার অনুভূতি কেমন হবে? আপনি কতটা সন্তুষ্ট হতে পারবেন? অদ্রূপ আপনার যদি রাগ ওঠে আর সেটা সংবরণ করেন, তা-ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়।
একবার জনৈক ব্যক্তি নবিজির কাছে পরামর্শ নিতে এলো। তিনি তাকে পরামর্শ দিলেন, রাগ করো না। লোকটি আরও উপদেশ নিতে চাইল। কিন্তু নবিজি প্রতিবারই তাকে বললেন, রাগ করো না। সে তখন বুঝতে পারল, নবিজি তাকে এই উপদেশই দিলেন। উপদেশ মাত্র একটি, কিন্তু গুরুত্ব অসীম।
পূর্বে আলোচনা করেছিলাম, হিলমের দুটি অর্থ হতে পারে। তবে এই দুটি গুণের মধ্যে একধরনের মিল আছে। যেমন: আপনি যদি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তাহলে প্রজ্ঞাবান হতে পারবেন না। প্রজ্ঞাবান হতে হলে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
একবার নবিজি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন, সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি কে? তাঁরা উত্তরে বললেন, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে। তখন রাসূলুল্লাহ বলেন— প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে পরাজিত করে; বরং সে-ই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে।
যে নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে, সে মূলত তিনটি শক্তির ওপর বিজয়ী হয়। সেগুলো হলো—
১. নিজের নফসকে পরাজিত করা।
২. নিজের সাথে থাকা শয়তানকে পরাজিত এবং
৩. তাকে যে রাগান্বিত করে, ওই লোকটির সাথে থাকা শয়তানকে পরাজিত করা।
আপনি যদি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে এক ঢিলে তিনটি পাখি শিকার করলেন!
নবিজির জীবনী পড়লে আপনি অবাক হবেন। দেখবেন, তাঁর জীবনে এত এত ঘটনা ঘটেছে এবং রাগান্বিত হওয়ার মতো অসংখ্য কারণও ছিল। কিন্তু তিনি নিজের রাগকে সাধারণভাবে প্রকাশ করেছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেছেন সূক্ষ্মভাবে।
আমরা দেখতে পাই, আমাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে শান্তশিষ্ট, তারাও মাঝেমধ্যে রাগান্বিত হয়। কিন্তু নবিজি ছিলেন এর ব্যতিক্রম। জীবনের কোনো সময়ে একটিবারের জন্যও তিনি নিজের রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাননি; তা পরিবারের সাথে হোক কিংবা সাহাবিদের সাথে।
হ্যাঁ, তিনি রাগান্বিত হয়েছেন। কিন্তু তা কখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। সাহাবিরা নবিজির চেহারা দেখেই বুঝতে পারতেন, তিনি রাগ করেছেন। তবে কখনোই তিনি কোনো কাজের মধ্যে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেন না। আমাদের মধ্যে অনেকেই এমন আছে, যারা কিনা রাগান্বিত হলে মোবাইল ছুড়ে মারে, প্লেট-গ্লাস ভেঙে ফেলে। কিন্তু নবিজি এমনটা করতেন না।
একবার এক সাহাবি বুঝতে পারেন, নবিজি তাঁর ওপর রাগ করেছেন। তিনি দেখতে পান, রাসূলুল্লাহ হাসির মাধ্যমে তাঁর রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছেন। নবিজি হাসছেন ঠিকই, কিন্তু সেই হাসি ছিল রাগমিশ্রিত।
এখন আপনি ভাবতে পারেন, আমি বদমেজাজি। আমার রাগ হলে আমি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমারই-বা কী করার আছে! হ্যাঁ এটা ঠিক, প্রতিজন মানুষই আলাদা আলাদা মেজাজের অধিকারী। আমরা আবু বকর ও উমর (রা.)-এর দিকে তাকালেই দেখি-দুজন ছিলেন দুই প্রকৃতির মানুষ। একজন ঠান্ডা। আর অন্যজন ছিলেন গরম মেজাজের।
তারপরও মাঝেমধ্যে আবু বকর (রা.)-কে প্রচণ্ড রাগান্বিত হতে দেখা যেত। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় তিনি উমর (রা.)-এর চেয়েও বেশি রাগান্বিত ছিলেন। অন্যদিকে খলিফা হওয়ার পূর্বের উমর এবং পরের উমর ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। খলিফা হওয়ার পর তিনি আগের মতো কঠোর ছিলেন না। তখন থেকে তিনি তাঁর রাগ নিয়ন্ত্রণ করতেন।
যারা বলে-আমি গরম মেজাজের, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, তাদের জন্য উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর দৃষ্টান্তই উল্লেখ্য। যারা স্বভাবতই ঠান্ডা মেজাজের, আর যারা ত্যাগ-সাধনার পর এ গুণের অধিকারী হয়েছেন, দুজনের সওয়াব কিন্তু সমান হবে না। যিনি নিজের একান্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তিনি বেশি সওয়াব পাবেন। তার নেকের পাল্লা ভারি হবে। এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আমরা কীভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি?
টিকাঃ
৬১ সহিহ বুখারি: ৬০৯৯
৬২ সূরা বাকারা: ২৩৫
৬৩ সূরা আলে ইমরান: ১৩৩-১৩৪
৬৪ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৮৯
৬৫ সহিহ বুখারি: ৬১১৬
৬৬ সহিহ বুখারি: ৬১১৪; সহিহ মুসলিম: ৬৫৩৫
📄 ভালো কাজে অন্যকে সহযোগিতা
একজন মুমিন বিচ্ছিন্নবাদী নয়, সে সন্ন্যাসী জীবনযাপন করতে পারে না। মুমিনকে অবশ্যই সমাজে বসবাস করতে হয়। বৃহত্তর স্বার্থে একজন মুমিন আরেকজন মুমিনকে সহযোগিতা করে। কেউ যদি মনে করে, সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর ইবাদত করলে মনে হয় সহজে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যাবে, তাহলে এটা ভুল ধারণা। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে চাইলে সমাজে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে হবে। থাকতে হবে জামাতের সাথে। কুরআনে আল্লাহ সূরা আসরে তিন শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা হলো-
'যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।'
উদ্ধৃত আয়াতটির প্রথম দুই আমল হলো ব্যক্তিগত আমল, শেষের আমলটি সামষ্টিক আমল। সেটা আপনি একা করতে পারবেন না। সবার সাথে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করলে তবেই আপনি অন্যকে সত্যের উপদেশ দিতে পারেন, ধৈর্যের দাওয়াত দিতে পারেন।
আপনি অন্যকে সহযোগিতা করতে হলে একসাথে বসবাস করতে হবে। প্রত্যেক নবি-রাসূলগণ সমাজে বসবাস করেছেন। তাঁরা পৃথিবীতে এসেছেন সমাজ গঠন করতে, আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করতে। কেউই সমাজ ছেড়ে গুহায় বসবাস করতে মানুষকে নির্দেশ দেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনীতে পাওয়া যায়, তিনি মক্কা ও মদিনায় বিশাল একটা সমাজ গড়ে তোলেন। ইন্তেকালের পূর্বে ওই দুই সমাজেই তিনি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না। আর তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ভালোবাসার সঞ্চার করেছেন এবং তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই ভাই হয়েছ।'
সাহাবিদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন, তারা প্রথমে পরস্পর বিচ্ছিন্ন ছিলেন। আল্লাহর অনুগ্রহের কারণে তারা পরস্পর ভাই ভাই হতে পেরেছিলেন। নবিজি মুমিনের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের জন্য বিল্ডিংয়ের ইটের মতো, যার এক অংশ আরেক অংশকে শক্তিশালী করে থাকে।
এই কথা বলে নবিজি তাঁর হাতের আঙুলগুলো একটি আরেকটির সাথে মিলিয়ে ওপরে ওপরে রাখলেন, বিল্ডিং নির্মাণের সময় যেমন একটি ইটের ওপর আরেকটি ইট রাখা হয়। আপনি একটি ইট দিয়ে একটি বিল্ডিং নির্মাণ করতে পারবেন না। এর জন্য অনেকগুলো ইটের প্রয়োজন। সবগুলো ইট পরস্পর জোড়া লাগালে তবেই বিল্ডিং নির্মাণ করতে পারবেন। মুমিনের উদাহরণও তেমন। একটি ভালো কাজ করতে গেলে সবাইকে একত্রিত হতে হবে। নিজ নিজ জায়গা থেকে আলাদা আলাদা অবস্থান করে বড়ো ধরনের কোনো ভালো কাজ করা সম্ভব নয়। এজন্য আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন-
'তোমরা সৎকাজ ও দ্বীনদারিতায় একে অন্যের সাহায্য করো।'
ইসলাম কোনো ব্যক্তিগত ধর্মের নাম নয়। সামষ্টিক ও সামাজিক ধর্মই মূলত ইসলাম। আপনি যদি মনে করেন একাকী নামাজ-রোজা করে দ্বীনদার হয়ে যাবেন, এটা ভুল ধারণা। আপনাকে জামাতের সাথে থাকতে হবে। নবিজি বলেন, আল্লাহর রহমতের হাত মুসলিমদের জামাতের ওপর থাকবে। আর যে ব্যক্তি জামাত থেকে পৃথক হয়ে যায়, শয়তান তার সঙ্গী হয়ে যায় এবং তাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেয়।
আমরা মুসলিম জামাতের সাথে বসবাস করব; আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য কখনোই জামাত বিচ্ছিন্ন থাকার প্রতি উৎসাহিত করে না। জামাত বিচ্ছিন্ন হলে ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে নবিজি একটি উদাহরণের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন। পালের যে মেষটি দল থেকে আলাদা হয়ে যায় কিংবা যেটি খাবারের সন্ধানে দূরে সরে পড়ে বা যেটি অলস বলে এক কিনারায় বসে থাকে, নেকড়ে সেটিকে শিকার করে নেয়। তোমরা কখনো জামাত ছেড়ে গিরিপথে চলে যাবে না, জামাতবদ্ধ হয়ে মুসলিমদের সাথে থাকবে।
আমরা মুসলিম জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে আমাদের ঈমানে ঘাটতি দেখা দেয়। ঈমানে ঘাটতি দেখা দেয় আমাদের সন্তানদের। আপনার সন্তানকে আপনি মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত করুন। মসজিদে নিয়ে যান। ওই পরিবেশের সাথে, মুসলিম জামাতের সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিন।
জামাত মানে কেবল মসজিদে নামাজের জামাত মনে করলে হবে না। ভালো কাজের জন্য যখন একত্রিত হবেন, সেটাও জামাত। যেমন: গরিব-অসহায়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে একত্রিত হলেন। আবার দেশের যেকোনো সংকটের সময় মিসকিনদের সহযোগিতা করতে জামাতবদ্ধ হলেন। এটাও জামাতের অন্তর্ভুক্ত। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, মুমিনরা বৃহত্তর স্বার্থে একত্রিত হলে সেটাও আল্লাহর সুন্নাহ, নতুবা বৃহত্তর স্বার্থ বলতে কিছু থাকত না।
মুসলিম ইতিহাসে এমন কোনো আলিম নেই এবং এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, যিনি কিনা একাকী বা গুহায় বসবাস করে জীবন কাটিয়েছেন। অবশ্যই আপনাকে সমাজে বসবাস করতে হবে, সমাজের মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে।
আপনি কোনো একটি কাজ পছন্দ করেন, সেই কাজটি করতে চান। যারা ওই কাজে দক্ষ তাদের পরামর্শ নিন, তাদের জামাতে শরিক হোন। আমরা যখন কোনো কাজের নিয়তে একত্র হই, আমাদের শক্তি বেড়ে যায়। আমি হয়তো একটি কাজে দক্ষ, আরেকটি কাজে অদক্ষ। কিন্তু আমার সহযোগি হয়তো ওই কাজটাই খুব ভালোভাবে পারে।
একজন ভালো লিখতে পারে, আরেকজন ভালো ডিজাইন করতে পারে। দুজন একত্রিত হলে ভালো ডিজাইনের সাথে একটি ভালো লেখা প্রকাশিত হবে।
আপনি যখন মানুষের সাথে মেশা শুরু করবেন, কেউ না কেউ আপনাকে কষ্ট দেবে। কটু কথাও শোনা লাগতে পারে। তার মানে এই না, আপনি মানুষের সাথে মেশা বন্ধ করে দেবেন। নবিজি বলেন, যে মুমিন মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের জ্বালাতনে ধৈর্যধারণ করে, সে এমন মুমিন ব্যক্তির তুলনায় অধিক সওয়াবের অধিকারী হয়, যে কিনা মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের জ্বালাতনে ধৈর্যধারণ করে না।
মানুষের সাথে মেলামেশার ফলে মানুষের পক্ষ থেকে আপনার কাছে কষ্ট আসবেই, তাতে ধৈর্যধারণ করলে অবশ্যই সওয়াব পাবেন। আপনি ঘরে একা একা নির্জনে নিরিবিলি থাকার আর কোনো সুযোগ থাকল না। আপনাকে বের হয়ে আসতে হবে। মানুষের সাথে মিশতে হবে। কথা বলতে হবে। বিপদে অপরের পাশে দাঁড়াতে এবং ভালো কাজে সহযোগিতা করতে হবে।
টিকাঃ
৮৪ সূরা আসর: ৩
৮৫ সূরা আলে ইমরান: ১০৩
৮৬ সহিহ বুখারি: ৪৮১
৮৭ সূরা মায়েদা : ২
৮৮ সুনানে নাসায়ি: ৪০২০
৮৯ মুসনাদে আহমাদ: ২১৬০২
৯০ সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০৩২