📄 ব্যবসার ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা
ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার্জনের জন্য বেশির ভাগ সময় মিথ্যার আশ্রয় নেয়। তারা বলে-পণ্যটি ১০০০ টাকা দিয়ে কিনেছি, কিন্তু আপনার কাছে একদমই কেনা দামে বেচে দিচ্ছি। অথচ দেখা যায়, পণ্যটি তারা কিনেছে ৭০০ টাকায়, আর বিক্রি করছে ৩০০ টাকা লাভে। মনে মনে তারা ভাবছে, মিথ্যা বলার কারণে তার ৩০০ টাকা লাভ হয়েছে। কিন্তু মিথ্যা বলার দরুন যে তার ব্যবসায় বরকত কমে গিয়েছে, সেটা সে বুঝতেই পারে না।
এ ব্যাপারে নবিজি বলেন, ক্রেতা-বিক্রেতা যদি সত্য বলে এবং পণ্যের অবস্থা ব্যক্ত করে, তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত হবে। আর যদি মিথ্যা বলে এবং দোষ গোপন করে, তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত মুছে ফেলা হবে।
সততার সাথে ব্যাবসা করলে ব্যবসায় যেমন লাভ হবে, তেমনই আল্লাহ সেই ব্যবসায় বরকত দান করবেন। আর মিথ্যাকে পুঁজি করে ব্যাবসা করলে মানুষজন একসময় না একসময় আপনার প্রতারণা ধরে ফেলবে। তখন আপনি দুনিয়াতে অপদস্থ তো হবেনই, আখিরাতেও এর ফল ভোগ করবেন।
তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। সেসব ক্ষেত্রে ইসলাম মিথ্যার আশ্রয় নেওয়াকে অনুমতি দিয়েছে। যেমন: স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। স্বামী তার স্ত্রীকে এমন একটি কথা বলল, যা মূলত সত্য নয়। তবে এই কথাটি তাদের মধ্যকার বন্ধন বাড়াবে, মোহনীয় সম্পর্কের নতুন স্রোত বয়ে আনবে। এসব ক্ষেত্রে এমন মিথ্যা বলা ইসলাম সমর্থন করে। যেমন: স্বামী তার স্ত্রীকে বলল, তোমার হাতের বিরিয়ানি পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু বিরিয়ানি। আর তুমি যেভাবে গরুর গোশত রান্না করো, আমি পৃথিবীর আর কোথাও গোশতের এমন স্বাদ পাইনি। কিংবা একটি সুন্দর মুহূর্তে স্বামী স্ত্রীকে কাছে ডেকে বলল, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে।
ইসলাম এসব মিথ্যাকে 'মিথ্যা' বলে মনে করে না। আপনি আপনার বাচ্চাদের প্রশংসা করেও এমন কিছু বলতে পারেন। তবে এমন মিথ্যার মাত্রা যেন বেশি না হয়।
দুজন মানুষের মধ্যে মন কষাকষি হলে তাদের একত্র করতে প্রয়োজনে মিথ্যা বলা যেতে পারে। যেমন: একজনকে বলতে পারেন, অমুক তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে ঠিকই, কিন্তু সে অনুতপ্ত হয়েছে। সে আমাকে বলল, তোমার সাথে কথা বলতে চায়। আবার অন্যজনকে গিয়ে বলুন, অমুক সেদিন যেমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, পরে এটার জন্য কষ্ট পেয়েছে। এখন সে চাচ্ছে তোমার সাথে কথা বলতে। চলো, তার সাথে গিয়ে কথা বলি।
এসব ক্ষেত্রে মিথ্যা বলতে অসুবিধা নেই। নবিজি তিনটি ক্ষেত্রে মিথ্যা বলার অনুমোদন দিয়েছেন। সেগুলো হলো-
১. একজনের সাথে আরেকজনের মন কষাকষি মিটিয়ে দেওয়ার সময়।
২. যুদ্ধের সময় এবং
৩. স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার সম্পর্ক মজবুত করতে মিথ্যার আশ্রয় নিলে।
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, সত্য বললে কী লাভ?
যখন সত্য বলবেন, সেই সত্য বলার মাধ্যমে নেকি অর্জন করবেন। আর যখন কিছু লিখবেন, তা যদি সঠিক হয় তবেই নেকি অর্জন করবেন। সত্য বললে আপাতদৃষ্টিতে আপনার কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন হলেও এর সুবিধা ভোগ করতে পারবেন দীর্ঘকাল।
কাব ইবনে মালেক (রা.)-এর ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য। তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার অজুহাত দেখাতে কেউ কেউ যখন মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি সত্যের ওপর অটল থাকেন। মিথ্যা বলাতে অনেকের অজুহাত গ্রহণ করা হয়েছিল, এদিকে সত্য বলায় তিনি পড়েছিলেন বিপদে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই সত্যবাদিতা তাঁকে পুরস্কৃত করে। এ ছাড়াও আল্লাহ তায়ালা তাঁর ঘটনা উল্লেখ করে কুরআনেও কয়েকটি আয়াত নাজিল করেন।
যখন মনে করবেন আল্লাহ আপনাকে দেখছেন, সবকিছু শুনছেন, তখনই আপনি সত্য বলতে পারবেন। কারণ, আপনিই আপনার ব্যাপারে অধিক জানেন। আর অন্য কেউ জানুক বা না জানুক, আল্লাহ জানেন প্রকৃত ঘটনা মূলত কী। আল্লাহ আপনাকে দেখছেন, ফেরেশতারা পর্যবেক্ষণ করছেন এই বোধ থাকলে জীবনের যে পরিস্থিতিই আসুক না কেন, আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়ে আপনি কখনোই মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না।
জান্নাতে যেতে চাইলে, আল্লাহর প্রিয়ভাজন হতে চাইলে সব সময় সত্য কথা বলুন। কেননা, সত্যবাদীদের স্থান জান্নাতে, মিথ্যাবাদীদের স্থান জাহান্নাামে।
টিকাঃ
৩১ সহিহ বুখারি: ২০৭৯
৩২ মুসনাদে আহমাদ : ২৬৭৩১
৩৩ সহিহ বুখারি: ৪৪১৮