📘 মুমিন কিভাবে দিন রাত অতিবাহিত করবে > 📄 তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ

📄 তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ


তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ একই ছালাত। রামাযানে রাতের প্রথমাংশে এই নফল ছালাত আদায় করা হয়, এজন্য একে তারাবীহ বলা হয়। একে হাদীছের পরিভাষায় 'ছালাতুল লায়ল' ও 'কিয়ামুল লায়ল' বলা হয়। আর অন্য ১১ মাসে রাতের এই ছালাতকে 'তাহাজ্জুদ' বলা হয়। সুতরাং তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পৃথক দু'টি ছালাত নয়। ৩১৩ এ ছালাত আদায় করার জন্য প্রত্যেক মুমিনের সচেষ্ট হওয়া উচিত। আবু উমামা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللَّيْلِ فَإِنَّهُ دَابُ الصَّالِحِيْنَ قَبْلَكُمْ وَهُوَ قُرْبَةٌ إِلَى رَبِّكُمْ وَمُكَفِّرَةٌ لِلسَّيِّئَاتِ وَمَنْهَاةٌ عَنِ الْإِثْمِ
'তোমাদের জন্য কিয়ামুল লায়ল বা রাতের ছালাত আদায় করা উচিত। রাতে ইবাদত করা হচ্ছে তোমাদের পূর্ববর্তী নেক লোকদের রীতি। তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের পন্থা, গোনাহ মাফের উপায় এবং অপরাধ, অশ্লীলতা হ'তে বিরত থাকার মাধ্যম'। ৩১৪
তিনি আরো বলেন,
رَحِمَ اللهُ رَجُلًا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّى ثُمَّ أَيْقَظَ امْرَأَتَهُ فَصَلَّتْ فَإِنْ أَبَتْ نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ وَرَحِمَ اللهُ امْرَأَةً قَامَتْ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّتْ ثُمَّ أَيْقَظَتْ زَوْجَهَا فَصَلَّى فَإِنْ أَبَى نَضَحَتْ فِي وَجْهِهِ الْمَاءَ
'আল্লাহ এমন ব্যক্তির প্রতি দয়া করেন যে ব্যক্তি রাতে উঠে ছালাত আদায় করে, স্বীয় স্ত্রীকেও জাগায় এবং সেও ছালাত আদায় করে। আর যদি সে উঠতে অস্বীকার করে তাহ'লে তার মুখের উপর পানি ছিটিয়ে দেয়। অনুরূপ আল্লাহ দয়া করেন সেই স্ত্রী লোকের প্রতি যে রাতে উঠে ছালাত আদায় করে। নিজের স্বামীকেও জাগায় এবং সেও ছালাত আদায় করে। আর যদি সে উঠতে অস্বীকার করে তাহ'লে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়'। ৩১৫
তিনি আরো বলেন,
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ غُرَفًا يُرَى ظَاهِرُهَا مِنْ بَاطِنِهَا وَبَاطِنُهَا مِنْ ظَاهِرِهَا أَعَدَّهَا اللَّهُ لِمَنْ أَلَانَ الْكَلَامَ، وَأَطْعَمَ الطَّعَامَ، وَتَابَعَ الصَّيَامَ، وَصَلَّى بِاللَّيْلِ وَالنَّاسُ نِيَامٌ -
'জান্নাতের মধ্যে এমন মসৃণ প্রাসাদ রয়েছে যার বাইরের জিনিস সমূহ ভিতর হ'তে এবং ভিতরের জিনিস সমূহ বাহির হ'তে দেখা যায়। সেসব প্রাসাদ আল্লাহ এমন ব্যক্তির জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন যে ব্যক্তি মানুষের সাথে নরম কথা বলে, ক্ষুধার্তকে খেতে দেয়, নিয়মিত ছিয়াম পালন করে এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন ছালাত আদায় করে'। ৩১৬ অন্যত্র
إِذَا أَيْقَظَ الرَّجُلُ أَهْلَهُ مِنَ اللَّيْلِ فَصَلَّيَا أَوْ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ جَمِيعًا كُتِبَا فِي الذَّاكِرِينَ وَالذَّاكِرَاتِ -
'যখন কোন ব্যক্তি রাতে স্বীয় স্ত্রীকে জাগায়, অতঃপর উভয়ে পৃথকভাবে অথবা একসাথে দুই রাক'আত ছালাত আদায় করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণকারী ও স্মরণকারিণীদের অন্তর্ভুক্ত হয়'। ৩১৭ রাসূল (ছাঃ) আরো বলেন, وَاعْلَمْ أَنَّ شَرَفَ الْمُؤْمِنِ قِيَامُهُ بِاللَّيْلِ 'আর জেনে রাখ যে, নিশ্চয়ই মুমিনের মর্যাদা হচ্ছে রাত্রি জাগরণ করা' (রাতে ছালাত আদায় করা)। ৩১৮

**টিকাঃ**
৩১৩. নায়লুল আওত্বার ২/২৯৫ পৃঃ; মির'আতুল মাফাতীহ ২/২২৪ পৃঃ।
৩১৪. তিরমিযী, মিশকাত হা/১২২৭, হাদীছ ছহীহ।
৩১৫. নাসাঈ, মিশকাত হা/১২৩০।
৩১৬. বায়হাক্বী, মিশকাত হা/১২৩২, হাদীছ ছহীহ।
৩১৭. ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৩৮, হাদীছ ছহীহ।
৩১৮. ছহীহুল জামে' হা/৭৩; ছহীহাহ হা/৮৩১।

📘 মুমিন কিভাবে দিন রাত অতিবাহিত করবে > 📄 বিতর ছালাত

📄 বিতর ছালাত


বিতর ছালাত সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ। ৩১৯ এশার ফরয ছালাতের পর হ'তে ফজর পর্যন্ত সুন্নাত ও নফল ছালাত সমূহ আদায়ের পরে বিতার আদায় করতে হয়। ৩২০ এ ছালাত অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বাড়ীতে বা সফরে কোন অবস্থায় বিতর ও ফজরের দু'রাক'আত সুন্নাত ছালাত ছাড়তেন না। ৩২১
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, صَلَاةُ اللَّيْلِ مَثْنَى مَثْنَى، فَإِذَا حَشِيَ أَحَدُكُمُ الصُّبْحَ صَلَّى رَكْعَةً وَاحِدَةً تُوتِرُ لَهُ مَا قَدْ صَلَّى - 'রাতের নফল ছালাত দুই দুই (রাক'আত)। অতঃপর যখন তোমাদের কেউ ফজর হয়ে যাবার আশংকা করবে, তখন সে যেন এক রাক'আত পড়ে নেয়। যা তার পূর্বেকার সকল নফল ছালাতকে বিতরে পরিণত করবে'। ৩২২ অন্য হাদীছে এসেছে, তিনি বলেন, الْوِتْرُ رَكْعَةٌ مِّنْ آخِرِ اللَّيْلِ 'বিতর রাত্রির শেষে এক রাক'আত মাত্র'। ৩২৩ আয়েশা (রাঃ) বলেন، وَكَانَ يُوتِرُ بِوَاحِدَة 'রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এক রাক'আত দ্বারা বিতর করতেন'। ৩২৪

**টিকাঃ**
৩১৯. ফিকহুস সুন্নাহ ১/১৪৩; নাসাঈ হা/১৬৭৬; মির'আত ২/২০৭; ঐ, ৪/২৭৩-৭৪।
৩২০. ফিকহুস সুন্নাহ ১/১৪৪; ছহীহ আত-তারগীব হা/৫৯২-৯৩।
৩২১. ইবনুল ক্বাইয়িম, যা-দুল মা'আ-দ (বৈরূত : মুওয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ২৯ সংস্করণ, ১৪১৬/১৯৯৬) ১/৪৫৬।
৩২২. বুখারী হা/৯৯০ 'বিতর' অধ্যায়; মিশকাত হা/১২৫৪ 'ছালাত' অধ্যায়, 'বিতর' অনুচ্ছেদ।
৩২৩. মুসলিম, মিশকাত হা/১২৫৫।
৩২৪. ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১২৮৫।

📘 মুমিন কিভাবে দিন রাত অতিবাহিত করবে > 📄 রাত্রিকালীন যিকর-আযকার

📄 রাত্রিকালীন যিকর-আযকার


আল্লাহ্র যিকর করা ইবাদত। যা মুমিনের জন্য অতি উপকারী। আল্লাহ বলেন، وَذَكِّرْ فَإِنَّ الذِّكْرَى تَنْفَعُ الْمُؤْمِنِينَ 'তুমি যিকর কর, কেননা যিকর মুমিনের উপকার করে' (যারিয়াত ৫১/৫৫)। আল্লাহ আরো বলেন, الَّذِينَ
(الَّذِيْنَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ) যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে' (আলে ইমরান ৩/১৯১)। আর রাত্রিকালে যিকর করার বিশেষ ফযীলত হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। ওবাদা বিন ছামিত (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ تَعَارَّ مِنَ اللَّيْلِ فَقَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ ثُمَّ قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي أَوْ قَالَ ثُمَّ دَعَا اسْتَجِيْبَ لَهُ فَإِنْ تَوَضَّأَ وَصَلَّى قُبِلَتْ صَلَاتُهُ.
'যে ব্যক্তি রাত্রে জেগে বলে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, তাঁরই রাজত্ব, তাঁরই জন্য প্রশংসা, তিনি সমস্ত বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান, আমি আল্লাহ্র পবিত্রতা বর্ণনা করছি, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্, আল্লাহ ব্যতীত কোন মা'বুদ নেই, আল্লাহ অতি মহান, আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত আমার কোন শক্তি ও সামর্থ্য নেই'। অতঃপর বলে, 'হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা কর। অতঃপর কোন প্রার্থনা করলে, আল্লাহ তার সে প্রার্থনা মঞ্জুর করেন এবং সে যদি ওযু করে ছালাত আদায় করে, আল্লাহ তার সে ছালাত কবুল করেন'। ৩২৫
উল্লেখ্য, আল্লাহ্র যিক্র করতে হবে নীরবে। আল্লাহ বলেন, وَاذْكُرْ رَبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُوْنَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ তোমার প্রভুকে সকাল-সন্ধ্যায় আপন মনে অত্যন্ত বিনীত ও ভীত সন্ত্রস্তভাবে স্মরণ কর, উচ্চ শব্দে নয়' (আরাফ ৭/২০৫)। তিনি আরো বলেন, ۚادْعُوا رَبَّكُمْ - تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً 'তোমাদের প্রভুকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এবং সংগোপনে ডাক' (আ'রাফ ৭/৫৫)। একদা এক সফরে ছাহাবীগণ আওয়াজ করে তাসবীহ পাঠ করলে রাসূল (ছাঃ) তাদের চুপে চুপে তাসবীহ পাঠের নির্দেশ দিয়ে বলেন 'তোমরা এমন সত্তাকে ডাকছ যিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা'। ৩২৬

**টিকাঃ**
৩২৫. বুখারী হা/১১৫৪; মিশকাত হা/১১৪৫।
৩২৬. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৩০৩।

📘 মুমিন কিভাবে দিন রাত অতিবাহিত করবে > 📄 রাত্রিকালীন দো’আ ও ইস্তেগফার

📄 রাত্রিকালীন দো’আ ও ইস্তেগফার


রাতে এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে, যখন আল্লাহর দরবারে দো'আ করলে, তা কবুল হয়। এজন্য রাতে জেগে আল্লাহ্র নিকটে দো'আ করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা যরূরী। আবু হুরায়রাহ (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِيْنَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْآخِرُ يَقُولُ مَنْ يَدْعُوْنِي فَأَسْتَجِيْبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفَرَ لَهُ -
'আমাদের প্রতিপালক প্রত্যেক রাতেই নিকটবর্তী আকাশে (১ম আকাশে) অবতীর্ণ হন, যখন রাতের শেষ তৃতীয় ভাগ অবশিষ্ট থাকে এবং বলতে থাকেন, কে আছে যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে যে আমার নিকট কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দান করব এবং কে আছে যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব'। ৩২৭
অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِنَّ فِي اللَّيْلِ لَسَاعَةً، لَا يُوَافِقُهَا رَجُلٌ مُسْلِمٌ يَسْألُ الله تَعَالَى خَيْراً مِّنْ أَمْرِ الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ، إِلَّا أَعْطَاهُ إِيَّاهُ، وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ
'রাত্রের মধ্যে এমন একটি সময় আছে, যদি কোন মুসলমান সে সময় লাভ করতে পারে এবং আল্লাহ্র নিকট ইহকাল ও পরকালের কোন কল্যাণ চায় আল্লাহ তাকে তা দান করেন। আর এই সময়টি প্রত্যেক রাতেই রয়েছে'। ৩২৮

**টিকাঃ**
৩২৭. বুখারী হা/১১৪৫; মুসলিম হা/৭৫৮; মিশকাত হা/১২২৩।
৩২৮. মুসলিম হা/৭৫৭; মিশকাত হা/১২২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00