📄 রাত আল্লাহ্র সৃষ্টির নিদর্শন
রাত আল্লাহ্র সৃষ্টির এক বড় নিদর্শন (ইসরা ১৭/১২)। একে আল্লাহ মানুষের আরাম-আয়েশ ও প্রশান্তির উপায় হিসাবে সৃষ্টি করেছেন (আন'আম ৬/৯৬; নাহল ১৬/৮-৬)। আল্লাহ রাতকে মানুষের জন্য আবরণ বা আড়াল হিসাবে সৃষ্টি করেছেন (ফুরক্বান ২৫/৫৭)। মহান আল্লাহ রাতের কোন অংশবিশেষ প্রকাশ না করে সর্বদা দিন কায়েমে সক্ষম। আবার দিনের কোন আভা বা আলোকচ্ছটা প্রকাশিত না করে সর্বদা রাত কায়েমে পূর্ণ ক্ষমতাবান (ক্বাছাছ ২৮/৭১-৭২)। যেমন মেরু অঞ্চলে ৬ মাস রাত ও ৬ মাস দিন থাকে।
📄 রাত্রে সংঘটিত ইসলামের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. মানবতার হেদায়াতের দিক-দিশারী ও হক-বাতিলের পার্থক্যকারী মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীম রাত্রে অবতীর্ণ হয়েছে। ২৬১
২. রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ইসরা ও মি'রাজ রাত্রিকালে সংঘটিত হয়েছে (ইসরা ১৭/১)।
৩. রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। ২৬২
তাই নীরবে-নিভৃতে মহান আল্লাহকে ডাকা ও তাঁর ইবাদত করার জন্য রাত অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
**টিকাঃ**
২৬১. দুখান ৪৪/৩; ক্বদর ৯৭/১; মুসনাদ আহমাদ ২/১১৩ পৃঃ।
২৬২. বুখারী হা/৭৪৯৪; মুসলিম হা/৭৫৮।
📄 রাত্রিকালে আযান
সূর্যাস্তের পর থেকে রাত শুরু হয় এবং ফজর উদিত হওয়ার সাথে সাথেই রাতের পরিসমাপ্তি ঘটে। আযান দেওয়াও ইবাদত। রাতে বিভিন্ন আযান প্রচারিত হয়। যেমন-
ক. মাগরিবের আযান:
সূর্যাস্তের পর মাগরিবের সময় হয়। সালামা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, تُصَلِّي مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم الْمَغْرِبَ إِذَا تَوَارَتْ بِالْحِجَابِ،
'আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গে সূর্যাস্তের সাথে সাথে মাগরিবের ছালাত আদায় করতাম'। ২৭০ অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাফে' বিন খাদীজ (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, كُنَّا تُصَلِّى الْمَغْرِبَ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم .فَيَنْصَرِفُ أَحَدُنَا وَإِنَّهُ لَيُبْصِرُ مَوَاقِعَ نَبْلِهِ 'আমরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে মাগরিবের ছালাত আদায় করে এমন সময় ফিরে আসতাম যে, আমাদের কেউ (তীর নিক্ষেপ করলে) নিক্ষিপ্ত তীর পতিত হবার স্থান দেখতে পেত'। ২৭১ বর্তমানে কেউ কেউ মাগরিবের আযান প্রচারে অত্যন্ত বিলম্ব করে থাকে, যা সুন্নাতের সম্পূর্ণ খেলাফ। বস্তুতঃ সূর্যাস্তের সাথে সাথেই মাগরিবের আযান দেওয়া অত্যাবশ্যক।
খ. এশার আযান :
পশ্চিম দিগন্তে শাফাক্ব বা লাল আভা মিলিয়ে যাওয়ার পর থেকেই এশার ওয়াক্ত শুরু হয়। শাফাক্ব বলতে সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে যে লাল চিহ্ন বা রেখা পরিদৃষ্ট হয় তাকে বুঝায়। এই শাফাক্ব মিলিয়ে যাওয়া হচ্ছে এশার ছালাতের আওয়াল ওয়াক্ত। ২৭৭ আর এশার শেষ সময় হচ্ছে অর্ধরাত পর্যন্ত ২৭৮ অথবা রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। ২৭৯ প্রকাশ থাকে যে, শাফাক্ব অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর এশার আযান দেওয়া যায়। তবে এশার ছালাত দেরী করেও আদায় করা যায়। ২৮০
গ. সাহারীর আযান:
রামাযানে এবং অন্য মাসেও সাহারীর আযান দেওয়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (ছ:) বলেন, (18) إِنَّ بِلالا يُؤَذِّنُ بِلَيْلٍ، فَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يُؤَذِّنَ ابْنُ أُمَّ مَكْتُوْمٍ، 'বেলাল রাত্রে আযান দিলে তোমরা পানাহার কর, যতক্ষণ না আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম আযান দেয়'। ২৮১ অন্য বর্ণনায় এসেছে, আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, وَكَانَ رَجُلاً أَعْمَى لَا يُنَادِى حَتَّى يُقَالَ لَهُ أَصْبَحْتَ أَصْبَحْت 'আব্দুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম (রাঃ) অন্ধ ছিলেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত আযান দিতেন না, যতক্ষণ তাকে বলা না হ'ত যে, তুমি সকাল করে ফেললে, সকাল করে ফেললে'। ২৮২ অপর একটি হাদীছে এসেছে, عَنْ أَنَسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَذَلِكَ عِنْدَ السُّحُوْرِ يَا أَنَسُ إِنِّي أُرِيدُ الصَّيَامَ أَطْعِمْنِي شَيْئًا. فَأَتَيْتُهُ بِتَمْرٍ وَإِنَاءٍ فِيهِ مَاءً وَذَلِكَ بَعْدَ مَا أَذَّنَ بِلالُ فَقَالَ يَا أَنَسُ انْظُرْ رَجُلاً يَأْكُلُ مَعِى . فَدَعَوْتُ زَيْدَ بْنَ ثَابِتِ فَجَاءَ فَقَالَ إِنِّي قَدْ شَرِبْتُ شَرْبَةَ سَوِيْقٍ وَأَنَا أُرِيدُ الصَّيَامَ. فَقَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَنَا أُرِيدُ الصَّيَامَ. فَتَسَخَّرَ مَعَهُ ثُمَّ قَامَ فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ خَرَجَ إِلَى الصَّلاةِ.
'আনাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সাহারীর সময় বললেন, হে আনাস! আমি ছিয়াম পালনের ইচ্ছা করছি, আমাকে কিছু খাওয়াও। আমি রাসূলের নিকটে খেজুর ও পানির পাত্র নিয়ে আসলাম। এটা বেলালের আযান দেওয়ার পরে ছিল। অতঃপর তিনি বলেন, হে আনাস! কোন লোককে খুঁজে দেখ, যে আমার সাথে আহার করবে। আমি যায়েদ বিন ছাবিতকে ডাকলে, তিনি এসে বললেন, আমি এইমাত্র ছাতুর শরবত পান করেছি এবং ছিয়াম পালনেরও ইচ্ছা করেছি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আমিও ছিয়ামের ইচ্ছা পোষণ করেছি। তখন তিনি রাসূলের সাথে সাহারী করলেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে দু'রাক'আত ছালাত আদায় করে (ফজর) ছালাতের জন্য মসজিদ অভিমুখে গমন করলেন'। ২৮৩ এখানে রামাযান ও অন্যান্য মাসের কোন পার্থক্য করা হয়নি। বরং আনাস (রাঃ) বর্ণিত এ দীর্ঘ হাদীছে রামাযান ব্যতীত অন্য মাসের বিষয়টি সুস্পষ্ট রূপে প্রতিভাত হয়েছে।
রাত্রে প্রচারিত উপরোক্ত সময় আযান দিয়ে মুমিন অশেষ ছওয়াবের অধিকারী হ'তে পারেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,
الْمُؤَذِّنُ يُغْفَرُ لَهُ مَدَّ صَوْتِهِ وَيَشْهَدُ لَهُ كُلُّ رَطْبٍ وَيَابِسٍ وَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ مَنْ صَلَّى وَشَاهِدُ الصَّلَاةِ يُكْتَبُ لَهُ خَمْسٌ وَعِشْرُوْنَ صَلَاةً وَيُكَفِّرُ عَنْهُ مَا بَيْنَهُمَا -
'মুয়াযযিনের কণ্ঠের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করা হবে এবং (কিয়ামতের দিন) তার কল্যাণের জন্য প্রত্যেক সজীব ও নির্জীব বস্তু সাক্ষ্য দিবে এবং এই আযান শুনে যত লোক ছালাত আদায় করবে সবার সমপরিমাণ নেকী মুয়াযযিনের হবে। আর যে ব্যক্তি ছালাত আদায়ের জন্য উপস্থিত হবে, তার জন্য পঁচিশ ছালাতের নেকী লেখা হবে এবং তার দুই ছালাতের মধ্যকার গুনাহ ক্ষমা করা হবে'। ২৮৪
**টিকাঃ**
২৭০. বুখারী হা/৫৬১।
২৭১. বুখারী হা/৫৫৯।
২৭৭. মুসলিম হা/৬১৩।
২৭৮. বুখারী হা/৫৭২; মুসলিম হা/৬১২।
২৭৯. বুখারী হা/৫৬৯, ৮৬৪; মুসলিম হা/৬১২-৬১৩।
২৮০. বুখারী হা/৫৭১।
২৮১. বুখারী হা/৬২৩।
২৮২. বুখারী হা/৬১৭, ২৬৫৬।
২৮৩. নাসাঈ হা/২১৬৭, সনদ ছহীহ।
২৮৪. আহমাদ, আবুদাউদ, ইবনু মাজাহ; নাসাঈ, হা/৬৬৭; মিশকাত হা/৬৬৭, সনদ ছহীহ।
📄 মাগরিব আযানের পর দু’রাক’আত ছালাত
মাগরিবের আযানের পরে দু'রাক'আত ছালাত আদায় করা মুস্তাহাব। রাসূল (ছাঃ) বলেন, صَلُّوْا قَبْلَ صَلَاةِ الْمَغْرِبِ. قَالَ فِي الثَّالِثَةِ لِمَنْ شَاءَ، 'তোমরা মাগরিবের (ফরযের) আগে ছালাত আদায় করবে। তৃতীয়বারে তিনি বললেন, যে ইচ্ছা করে'। ২৭২ অন্যত্র তিনি বলেন, صَلُّوْا قَبْلَ الْمَغْرِبِ رَكْعَتَيْنِ. ثُمَّ قَالَ صَلُّوْا قَبْلَ الْمَغْرِبِ رَكْعَتَيْنِ لِمَنْ شَاءَ - 'তোমরা মাগরিবের (ফরযের) পূর্বে দু'রাক'আত ছালাত আদায় করবে। অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমরা মাগরিবের (ফরযের) পূর্বে দু'রাক'আত ছালাত আদায় করবে, যে ইচ্ছা করে'। ২৭৩ অন্য হাদীছে এসেছে, আনাস (রাঃ) বলেন, كان الْمُؤَذِّنُ إِذَا أَذَّنَ قَامَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم يَبْتَدِرُونَ السَّوَارِي حَتَّى يَخْرُجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَهُمْ كَذَلِكَ يُصَلُّوْنَ الرَّكْعَتَيْنِ قَبْلَ الْمَغْرِبِ، وَلَمْ يَكُنْ بَيْنَ الْأَذَانِ وَالْإِقَامَةِ شَيْءٌ- যখন আযান দিত, তখন নবী করীম (ছাঃ)-এর ছাহাবীগণের মধ্যে কয়েকজন নবী করীম (ছাঃ)-এর বের হওয়া পর্যন্ত (মসজিদের) খুঁটির নিকট গিয়ে দাঁড়াতেন এবং এ অবস্থায় মাগরিবের পূর্বে দু'রাক'আত ছালাত আদায় করতেন। অথচ মাগরিবের আযান ও ইক্বামাতের মধ্যে কিছু (সময়) থাকত না'। ২৭৪
শায়খ বিন বায (রহঃ) বলেন, والصلاة بعد أذان المغرب وقبل الإقامة سنة لقول النبي صلى الله عليه وسلم : صَلُّوا قَبْلَ صَلَاةِ الْمَغْرِبِ. قَالَ فِي الثَّالِثَةِ لِمَنْ شَاءَ، رواه البخاري، وكان أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم إذا أذن للمغرب بادروا بصلاة ركعتين قبل الإقامة، والنبي صلى الله عليه وسلم يشاهدهم ولا ينهاهم عن ذلك بل قد أمر بذلك كما في الحديث المذكور آنفا - 'মাগরিবের আযানের পরে ও ইক্বামতের পূর্বের ছালাত রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী- 'তোমরা মাগরিবের (ফরযের) আগে ছালাত আদায় করবে। তৃতীয়বারে তিনি বললেন, যে ইচ্ছা করে' (বুখারী হা/১১৮৩, ৭৩৬৮)-এ কারণে সুন্নাত। আর ছাহাবীগণ মাগরিবের আযান হ'লে ইক্বামতের পূর্বে এ ছালাত আদায়ের জন্য প্রতিযোগিতা করতেন। এমতাবস্থায় যে নবী করীম (ছাঃ) উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি তাদেরকে এথেকে নিষেধ করেননি। বরং এ সম্পর্কে তিনি আদেশ দিয়েছেন যেরূপ ইতিপূর্বে উল্লিখিত হাদীছে রয়েছে'। ২৭৫
শায়খ মুহাম্মাদ বিন ছালেহ আল-উছায়মীন (রহঃ) বলেন, صلاة ركعتين قبل صلاة المغرب أي بين الأذان والإقامة سنة، لكنها ليست راتبة، فلا ينبغي المحافظة عليها دائماً - 'মাগরিবের (ফরয) ছালাতের পূর্বে দু'রাক'আত ছালাত তথা আযান ও ইক্বামতের মধ্যবর্তী ছালাত সুন্নাত। কিন্তু তা রাতেবা নয়। সুতরাং নিয়মিতভাবে তা আদায় করা সমীচীন নয়'। ২৭৬
**টিকাঃ**
২৭২. বুখারী হা/১১৮৩, ৭৩৬৮; মিশকাত হা/১১৬৫।
২৭৩. আবুদাউদ হা/১২৮১; ছহীহুল জামে' হা/৩৭৯১।
২৭৪. বুখারী হা/৬২৫; ছহীহ ইবুন হিব্বান হা/২৪৮৯।
২৭৫. মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায ৭/১৭১।
২৭৬. ফাতাওয়া ইবনে উছায়মীন, ১৪/২৭২।