📘 মুমিন কিভাবে দিন রাত অতিবাহিত করবে > 📄 যোহর ছালাত আদায় করা

📄 যোহর ছালাত আদায় করা


সূর্য মাথার উপর থেকে পশ্চিম দিকে ঢলে পড়লেই যোহরের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং বস্তুর নিজস্ব ছায়ার এক গুণ হ'লে শেষ হয়। ৪৬
ক. ফরযের পূর্বের ও পরের সুন্নাত ছালাত আদায় করা: যোহরের ফরযের পূর্বে দু'রাক'আত ৪৭ বা চার রাক'আত সুন্নাত ছালাত আদায় করা যায়। ৪৮ রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ صَلَّى أَرْبَعًا قَبْلَ الظُّهْرِ وَأَرْبَعًا بَعْدَهَا لَمْ تَمَسَّهُ النَّارُ 'যে ব্যক্তি যোহরের ফরয ছালাতের পূর্বে চার রাক'আত এবং ফরযের পরে চার রাক'আত ছালাত আদায় করবে, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না'। ৪৯ অন্যত্র তিনি বলেন, مَنْ حَافَظَ عَلَى أَرْبَعِ رَكَعَاتٍ قَبْلَ الظُّهْرِ وَأَرْبَعِ بَعْدَهَا حُرُمَ عَلَى النَّارِ 'যে ব্যক্তি নিয়মিতভাবে যোহরের পূর্বে চার রাক'আত এবং পরে চার রাক'আত ছালাত আদায় করবে, তার জন্য জাহান্নাম হারাম করা হবে'। ৫০
খ. যোহরের ফরয : যোহর ছালাত আদায়ের ব্যাপারে মহান আল্লাহ্ নির্দেশ, أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ إِلَى غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْآنَ الْفَجْرِ إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا - 'সূর্য অপরাহ্নে ঢলে পড়ার পর থেকে রাত্রির অন্ধকার পর্যন্ত তুমি ছালাত কায়েম কর এবং ফজরের ছালাত আদায় কর। নিশ্চয়ই ফজরের ছালাত (রাত্রি ও দিবসের ফেরেশতাগণের মাধ্যমে) সাক্ষ্যপ্রাপ্ত হয়' (বানী ইসরাঈল ১৭/৭৮)। তিনি আরো বলেন, وَلَهُ الْحَمْدُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَعَشِيًّا وَحِينَ تُظْهِرُونَ 'এবং অপরাহ্নে ও যোহরে। বস্তুতঃ তাঁরই জন্য সকল প্রশংসা নভোমণ্ডলে ও ভূমণ্ডলে' (রূম ৩০/১৮)।

**টিকাঃ**
৪৬. বুখারী হা/৫৪১; মুসলিম হা/৬১২; মিশকাত হা/৫৮১, 'ছালাতের ওয়াক্তসমূহ' অনুচ্ছেদ; আবুদাউদ হা/৩৯৮; তিরমিযী, মিশকাত হা/৫৮৩।
৪৭. বুখারী হা/১১৬৫, ১১৮০; তিরমিযী হা/৪২৫, ৪৩৩; মিশকাত হা/১১৬০।
৪৮. তিরমিযী হা/৪১৪; ইবনু মাজাহ হা/১১৪০, সনদ ছহীহ।
৪৯. মুসনাদ আহমাদ হা/২৬৮০৭; নাসাঈ হা/১৮১৭, সনদ ছহীহ।
৫০. আবুদাউদ হা/১২৬৯; ইবনু মাজাহ হা/৪২৮; নাসাঈ হা/১৮১৬; মিশকাত হা/১১৬৭।

📘 মুমিন কিভাবে দিন রাত অতিবাহিত করবে > 📄 আছর ছালাত আদায় করা

📄 আছর ছালাত আদায় করা


বস্তুর মূল ছায়ার এক গুণ হওয়ার পর হ'তে আছরের ওয়াক্ত শুরু হয় এবং দু'গুণ হ'লে শেষ হয়। তবে সূর্যাস্তের প্রাক্কালের রক্তিম সময় পর্যন্ত আছর পড়া জায়েয আছে। ৫১

ক. ফরযের পূর্বে সুন্নাত ছালাত আদায় করা : আছরের পূর্বে দুই বা চার রাক'আত সুন্নাত ছালাত আদায় করা যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, يُصَلَّى قَبْلَ الْعَصْرِ أَرْبَعَ رَكَعَاتِ, ‘নবী করীম (ছাঃ) আছরের (ফরয ছালাতের) পূর্বে চার রাক'আত ছালাত আদায় করতেন’। ৫২ অন্য হাদীছে এসেছে, كان - يُصَلِّى قَبْلَ الْعَصْرِ رَكْعَتَيْنِ - ‘তিনি আছরের (ফরয ছালাতের) পূর্বে দু'রাক'আত ছালাত আদায় করতেন’। ৫৩

খ. আছরের ফরয ছালাত : আছরের ছালাত আদায়ের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, حَافِظُوْا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلاةِ الْوُسْطَى وَقُوْمُوا لِلَّهِ قَانِتِين 'তোমরা ছালাত সমূহ ও মধ্যবর্তী ছালাতের ব্যাপারে যত্নবান হও এবং আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে বিনীতভাবে দণ্ডায়মান হও' (বাক্বারাহ ২/২৩৮)। মধ্যবর্তী ছালাত বলতে আছর ছালাতকে বুঝানো হয়েছে। ৫৪
আছর ছালাত ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত গোনাহের কাজ, যার ফলে আমল বিনষ্ট হয়ে যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, - مَنْ تَرَكَ صَلَاةَ الْعَصْرِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ ‘যে ব্যক্তি আছরের ছালাত ছেড়ে দেয়, তার আমল বিনষ্ট হয়ে যায়'। ৫৫ অন্য বর্ণনায় আছে, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আছর ছালাত পরিত্যাগ করে তার আমল বিনষ্ট হয়ে যায়’। ৫৬ অন্যত্র তিনি বলেন, مَنْ فَاتَتْهُ صَلَاةُ الْعَصْرِ فَكَأَنَّمَا
'যে ব্যক্তির আছরের ছালাত ছুটে গেল, তার পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ যেন ছিনতাই হয়ে গেল'। ৫৭

যোহর-আছর জমা করা: সফরে থাকা অবস্থায় যোহর-আছর ৪ রাক'আত ও মাগরিব-এশা ৫ রাক'আত পৃথক এক্বামতের মাধ্যমে সুন্নাত ও নফল ছাড়াই জমা ও কুছর করে তাক্বদীম ও তাখীর দু'ভাবে পড়ার নিয়ম রয়েছে। অর্থাৎ শেষের ওয়াক্তের ছালাত আগের ওয়াক্তের সাথে 'তাক্বদীম' করে অথবা আগের ওয়াক্তের ছালাত শেষের ওয়াক্তের সাথে 'তাখীর' করে একত্রে পড়বে। ৫৮
ভীতি ও ঝড়-বৃষ্টি ছাড়াও অন্য কোন বিশেষ শারঈ ওযর বশতঃ মুক্বীম অবস্থায়ও দু'ওয়াক্তের ছালাত কুছর ও সুন্নাত ছাড়াই একত্রে জমা করে পড়া যায়। ৫৯ যেমন যোহর ও আছর পৃথক এক্বামতের মাধ্যমে ৮ এবং মাগরিব ও এশা অনুরূপভাবে ৭ রাক'আত। ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হ'ল, এটা কেন? তিনি বললেন, যাতে উম্মতের কষ্ট না হয়'। ৬০
ইস্তেহাযা বা প্রদর রোগগ্রস্ত মহিলা ও বহুমূত্রের রোগী বা অন্যান্য কঠিন রোগী, বাবুর্চী এবং কর্মব্যস্ত ভাই-বোনেরা মাঝে-মধ্যে বিশেষ ওযর বশতঃ সাময়িকভাবে এ সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। ৬১
হজ্জের সফরে আরাফাতের ময়দানে কোনরূপ সুন্নাত-নফল ছাড়াই যোহর ও আছর একত্রে যোহরের আউয়াল ওয়াক্তে পৃথক এক্বামতে কুছর ও 'জমা তাক্বদীম' করে এবং মুযদালিফায় মাগরিব ও এশা একত্রে এশার সময় পৃথক এক্বামতে 'জমা তাখীর' করে জামা'আতের সাথে অথবা একাকী পড়তে হয়। ৬২ সফরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সুন্নাত সমূহ পড়তেন না। ৬৩ অবশ্য বিতর, তাহাজ্জুদ ও ফজরের দু'রাক'আত সুন্নাত ছাড়তেন না। ৬৪

**টিকাঃ**
৫১. আবুদাউদ হা/৩৯৩; তিরমিযী হা/১৪৯; মিশকাত হা/৫৮৩; ছহীহ ইবনে খুযায়মাহ হা/৩২৫ ‘পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের সময়’ অনুচ্ছেদ; ছহীহুল জামে' হা/১৪০২।
৫২. তিরমিযী হা/৪২৯, ১১৬১; মিশকাত হা/১১৭১-৭২, সনদ হাসান।
৫৩. আবু দাউদ হা/১২৭২; মিশকাত হা/১১৭২, সনদ হাসান।
৫৪. বুখারী হা/২৯৩১, ৪৫৩৩; মুসলিম হা/৬২৯; আবুদাউদ হা/৪১০-১১; তিরমিযী হা/২৯৮২।
৫৫. বুখারী হা/৫৫৩, ৫৯৪; নাসাঈ হা/৪৭৪; মিশকাত হা/৫৯৫।
৫৬. ছহীহ আত-তারগীব হা/৪৭৯।
৫৭. নাসাঈ হা/৪৭৮; ছহীহ আত-তারগীব হা/৪৮১।
৫৮. বুখারী, মিশকাত হা/১৩৩৯; আবুদাউদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/১৩৪৪।
৫৯. ফিকহুস সুন্নাহ ১/২১৫।
৬০. (أَرَادَ أَنْ لَا يُخْرِجَ أَمَّنَهُ) বুখারী হা/১১৭৪ 'তাহাজ্জুদ' অধ্যায়-১৯, অনুচ্ছেদ-৩০; মুসলিম হা/১৬৩৩-৩৪; নায়লুল আওত্বার ৪/১৩৬; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৮।
৬১. নায়লুল আওতার ৪/১৩৬-৪০; ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/২১৭-১৮।
৬২. বুখারী, মিশকাত হা/২৬১৭, ২৬০৭ 'হজ্জ' অধ্যায়, 'আরাফা ও মুযদালিফা থেকে প্রত্যাবর্তন' অনুচ্ছেদ-৫; আহমাদ, মুসলিম, নাসাঈ, নায়ল ৪/১৪০।
৬৩. মুত্তাফাক্ব 'আলাইহ, মিশকাত হা/১৩৩৮ 'সফরের ছালাত' অনুচ্ছেদ-৪১; ফিকহুস সুন্নাহ ১/২১৬।
৬৪. ইবনুল ক্বাইয়িম, যা-দুল মা'আদ ৩/৪৫৭ পৃঃ।

📘 মুমিন কিভাবে দিন রাত অতিবাহিত করবে > 📄 জুম’আর ছালাত আদায় করা

📄 জুম’আর ছালাত আদায় করা


জুম'আর ছালাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছালাত। এ ছালাত থেকে অলসতাকারীদের ঘর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ৬৫ অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন, لَيَنْتَهِيَنَّ أَقْوَامٌ عَنْ وَدْعِهِمُ الْجُمُعَاتِ أَوْ لَيَحْتِمَنَّ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ ثُمَّ لَيَكُونُنَّ مِنَ الْغَافِلِينَ ‘অবশ্যই মানুষ জুম'আ পরিত্যাগকারী হওয়া থেকে বিরত হবে অথবা তাদের হৃদয়ে আল্লাহ মোহর মেরে দিবেন। অতঃপর তারা গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’। ৬৬ তিনি আরও বলেন, مَنْ تَرَكَ الْجُمُعَةَ ثَلَاثَ جُمَعٍ مُتَوَالِيَاتٍ فَقَدْ نَبَذَ الْإِسْلَامَ وَرَاءَ ظهره ‘যে ব্যক্তি অবহেলা করে পরপর তিন জুম'আ পরিত্যাগ করল, সে ব্যক্তি ইসলামকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করল’। ৬৭ অন্যত্র তিনি বলেন, مَنْ تَرَكَ ثَلَاثَ جُمَعٍ تَهَاؤُنَا بِهَا طَبَعَ اللَّهُ عَلَى قَلْبِهِ ‘যে ব্যক্তি বিনা ওযরে তিন জুম'আ পরিত্যাগ করল, আল্লাহ তার অন্তরে মোহর মেরে দেন’। ৬৮ অন্য বর্ণনায় এসেছে, مَنْ تَرَكَ ثَلَاثَ جُمُعَاتٍ مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ كُتِبَ مِنَ الْمُنَافِقِينَ ‘যে ব্যক্তি বিনা ওযরে তিন জুম'আ পরিত্যাগ করল, তাকে মুনাফিকদের তালিকাভুক্ত করা হবে’। ৬৯ অন্যত্র বলা হয়েছে যে, 'সে মুনাফিক'। ৭০

জুম'আর ছালাতের ফযীলত :
জুম'আর দিন সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। এদিন আল্লাহ্র কাছে অত্যন্ত মহিমান্বিত। এদিন নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ, আসমান-যমীন, বায়ু, পাহাড়-পর্বত ও সমুদ্র সবই ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ভয়ে ভীত থাকে'। ৭১ জুম'আর রাতে বা দিনে কোন মুসলিম মারা গেলে আল্লাহ তাকে কবরের ফিৎনা হ'তে রক্ষা করেন'। ৭২ এ দিন আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করা হয়। এ দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় এবং এ দিনে তাঁকে জান্নাত থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এদিনে তাঁর তওবা কবুল হয় এবং এদিনেই তাঁর মৃত্যু হয়। এদিনেই শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে ও ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে। এদিনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর প্রতি অধিক হারে দরূদ পাঠ করতে হয়। ৭৩
এ দিনে ইমামের মিম্বরে আরোহন করা হ'তে জামা'আতে ছালাত শেষে সালাম ফিরানোর মধ্যবর্তী সময়ে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন বান্দার যেকোন বৈধ দো'আ আল্লাহ কবুল করেন। ৭৪ দো'আ কবুলের এই সময়টির মর্যাদা লায়লাতুল কদরের ন্যায় বলে হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জুম'আর পূর্ণ দিনই ইবাদতের দিন। অন্য হাদীছ অনুযায়ী ঐদিন আছর ছালাতের পর হ'তে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দো'আ কবুল হয়। ৭৫ অতএব জুম'আর সমস্ত দিন দো'আ-দরূদ, তাসবীহ-তাহলীল, যিকর-তেলাওয়াত ও ইবাদতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করা উচিত। ৭৬ উক্ত সময়ে খতীব স্বীয় খুৎবায় এবং ইমাম ও মুক্তাদীগণ স্ব স্ব সিজদায় ও শেষ বৈঠকে তাশাহ্হুদ ও দরূদের পরে সালামের পূর্বে আল্লাহ্র নিকটে প্রাণ খুলে দো'আ করবেন। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই সময়ে বেশী বেশী দো'আ করতেন। ৭৭
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, لَا يَغْتَسِلُ رَجُلٌ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، وَيَتَطَهَّرُ مَا اسْتَطَاعَ مِنْ طُهْرٍ، وَيَدَّهِنُ مِنْ دُهْنِهِ، أَوْ يَمَسُّ مِنْ طِيْبِ بَيْتِهِ ثُمَّ يَخْرُجُ، فَلَا يُفَرِّقُ بَيْنَ اثْنَيْنِ، ثُمَّ يُصَلِّى مَا كُتِبَ لَهُ، ثُمَّ يُنْصِتُ إِذَا تَكَلَّمَ الإِمَامُ، إِلَّا غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجُمُعَةِ الْأُخْرَى
যে ব্যক্তি জুম'আর দিন গোসল করে সাধ্যমত পবিত্র হয়ে তেল ও সুগন্ধি মেখে মসজিদে এল, দু'জনের মাঝে ফাঁকা করল না এবং সাধ্যমত নফল ছালাত আদায় করল। অতঃপর চুপচাপ ইমামের খুৎবা শ্রবণ করল ও জামা'আতে ছালাত আদায় করল, তার পরবর্তী জুম'আ পর্যন্ত গোনাহ মাফ করা হয়'। ৭৮ অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'আরও তিনদিনের গোনাহ মাফ করা হয়'। ৭৯
مَنْ غَسَّلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَاغْتَسَلَ وَبَكَّرَ وَابْتَكَرَ وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ وَدَنَا مِنَ الإِمَامِ فَاسْتَمَعَ وَلَمْ يَلْغُ كَانَ لَهُ بِكُلِّ حَطْوَةٍ عَمَلُ سَنَةٍ أَجْرُ صِيَامِهَا وَقَيَامِهَا - যে ব্যক্তি জুম'আর দিন ভালভাবে গোসল করে। অতঃপর সকাল সকাল মসজিদে যায় পায়ে হেঁটে, গাড়ীতে নয় এবং ইমামের কাছাকাছি বসে ও মনোযোগ দিয়ে খুৎবা শ্রবণ করে এবং অনর্থক কিছু করে না, তার প্রতি পদক্ষেপে এক বছরের ছিয়াম ও কিয়ামের অর্থাৎ দিনের ছিয়াম ও রাতের বেলায় নফল ছালাতের সমান নেকী হয়'। ৮০

ক. আগেভাগে মসজিদে গমন: জুম'আর দিনে আগেভাগে মসজিদে গমন করা অতি ফযীলতপূর্ণ কাজ। রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِذَا كَانَ يَوْمُ الْجُمُعَةِ وَقَفَتِ الْمَلَائِكَةُ عَلَى بَابِ الْمَسْجِدِ يَكْتُبُوْنَ الأَوَّلَ فَالْأَوَّلَ، وَمَثَلُ الْمُهَجِّرِ كَمَثَلِ الَّذِي يُهْدِى بَدَنَةً، ثُمَّ كَالَّذِي يُهْدِى بَقَرَةً، ثُمَّ كَبْشًا، ثُمَّ دَجَاجَةً، ثُمَّ بَيْضَةً، فَإِذَا خَرَجَ الإِمَامُ طَوَوْا صُحُفَهُمْ، وَيَسْتَمِعُوْنَ الذِّكْرَ - ফেরেশতাগণ মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন ও মুছল্লীদের একের পর এক (নেকী) লিখতে থাকেন। এদিন সকাল সকাল যারা আসে, তারা উট কুরবানীর সমান নেকী পায়। তার পরবর্তীগণ গরু কুরবানীর, তার পরবর্তীগণ ছাগল কুরবানীর, তার পরবর্তীগণ মুরগী কুরবানীর (আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করার) ও তার পরবর্তীগণ ডিম কুরবানীর (দানের) সমান নেকী পায়। অতঃপর খতীব দাঁড়িয়ে গেলে ফেরেশতাগণ দফতর গুটিয়ে নেন ও খুৎবা শুনতে থাকেন'। ৮১

খ. খুৎবার পূর্বে সাধ্যমত সুন্নাত আদায় করা : মসজিদে প্রবেশের পর তাহিয়াতুল মসজিদ ছালাত আদায়ের পর ইমাম খুৎবার জন্য মিম্বরে ওঠার পূর্ব পর্যন্ত সাধ্যমত সুন্নাত ছালাত আদায় করা যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, من اغتسل ثم أتى الجمعة فصلى ما قدر له ثم أنصت حتى يفرغ من خطبته ثم يصلي معه غفر له ما بينه وبين الجمعة الأخرى وفضل ثلاثة أيام ব্যক্তি গোসল করে জুম'আর ছালাতে আসল, অতঃপর সাধ্যমত (সুন্নাত) ছালাত আদায় করল, অতঃপর ইমামের খুৎবা শেষ হওয়া পর্যন্ত নীরব থাকল, তারপর ইমামের সাথে (জুম'আর) ছালাত আদায় করল, এতে তার দু'জুম'আর মধ্যকার দিনসমূহের এবং আরো তিন দিনের পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়'। ৮২

গ. মনোযোগ সহকারে খুৎবা শ্রবণ করা : জুম'আর দিনে ওযু করে মসজিদে এসে সুন্নাত ছালাত আদায়ের পর মনোযোগ সহকারে খুৎবা শ্রবণ করা যরূরী। রাসূল (ছাঃ) বলেন, من توضأ فأحسن الوضوء ثم أتى الجمعة فاستمع وأنصت غفر له ما بينه وبين الجمعة وزيادة ثلاثة أيام - উত্তমরূপে ওযু করে জুম'আয় আসে এবং মনোযোগ সহকারে খুৎবা শ্রবণ করে ও নীরব থাকে, তার ঐ জুম'আ থেকে (পরবর্তী) জুম'আ পর্যন্ত এবং অতিরিক্ত আরো তিন দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়'। ৮৩

ঘ. অনর্থক কাজ না করা : জুম'আর দিনে খুৎবা চলাকালে কথা বলা, কাউকে চুপ করতে বলা বা কোন অনর্থক কাজ করা উচিত নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, إذا قلت لصاحبك أنصت يوم الجمعة والإمام يخطب فقد لغوت 'জুম'আর দিন ইমামের খুৎবা চলাকালে তুমি তোমার সাথীকে যদি বল, চুপ কর, তবে তুমি অনর্থক কাজ করলে'। ৮৪

ঙ. ঘাড় মাড়িয়ে অতিক্রম না করা : জুম'আর দিনে মুছল্লীদের ঘাড় টপকিয়ে সামনে যাওয়া ঠিক নয়। আব্দুল্লাহ বিন বুসর (রাঃ) বললেন, একদা জুম'আর দিন এক ব্যক্তি লোকদের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। নবী করীম (ছাঃ) এ সময় খুৎবা দিচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, اجلس فقد آذيت 'তুমি বসো, তুমি লোকদের কষ্ট দিয়েছো'। ৮৫

**টিকাঃ**
৬৫. বুখারী হা/৬৫৭; মুসলিম হা/৬৫১-৫২; মিশকাত হা/১৩৭৮ ‘জুম'আ ওয়াজিব হওয়া' অনুচ্ছেদ।
৬৬. মুসলিম হা/৮৬৫; ইবনু মাজাহ হা/৭৯৪; নাসাঈ হা/১৩৭০; মিশকাত হা/১৩৭০।
৬৭. আবু ইয়া'লা, ছহীহ আত-তারগীব হা/৭৩৩; ছহীহাহ হা/৩২০১।
৬৮. আবুদাউদ হা/১০৫২; নাসাঈ হা/১৩৮৯; ছহীহুল জামে' হা/৬১৪৩; মিশকাত হা/১৩৭১।
৬৯. ছহীহ আত-তারগীব হা/৭২৯; ছহীহুল জামে' হা/৬১৪৪।
৭০. ছহীহ ইবনু খুযায়মা হা/১৮৫৭, সনদ হাসান ছহীহ।
৭১. ইবনু মাজাহ হা/১০৮৪; মিশকাত হা/১৩৬৩ 'জুম'আ' অনুচ্ছেদ, সনদ হাসান।
৭২. আহমাদ হা/৬৫৮২; তিরমিযী হা/১০৭৪; মিশকাত হা/১৩৬৭ 'জুম'আ' অনুচ্ছেদ।
৭৩. আবুদাউদ হা/১০৪৭; নাসাঈ হা/১৩৭৪; ইবনু মাজাহ হা/১০৮৫; মিশকাত হা/১৩৬১, ১৩৬৩; ছহীহুল জামে' হা/২২১২।
৭৪. মুসলিম হা/৮৫২; মিশকাত হা/১৩৫৭, 'জুম'আ' অনুচ্ছেদ।
৭৫. তিরমিযী হা/৪৮৯; মিশকাত হা/১৩৬০, 'জুম'আ' অনুচ্ছেদ।
৭৬. ইবনুল কাইয়িম, যা-দুল মা'আদ ১/৩৮৬।
৭৭. মুসলিম হা/৪৮২; মিশকাত হা/৮৯৪ 'সিজদা ও তার ফযীলত' অনুচ্ছেদ।
৭৮. বুখারী হা/৮৮৩, ৯১০; মুসলিম হা/৮৫০; মিশকাত হা/১৩৮১-৮২, 'পরিচ্ছন্নতা অর্জন ও সকাল সকাল মসজিদে যাওয়া' অনুচ্ছেদ।
৭৯. মুসলিম হা/৮৫৭; মিশকাত হা/১৩৮১-৮২, 'পরিচ্ছন্নতা অর্জন ও সকাল সকাল মসজিদে যাওয়া' অনুচ্ছেদ।
৮০. আবুদাউদ হা/৩৪৫; নাসাঈ হা/১৩৮৪; ইবনু মাজাহ হা/১০৮৭; মিশকাত হা/১৩৮৮; ছহীহুল জামে' হা/৬৪০৫।
৮১. বুখারী হা/৯২৯, ৩২১১; মুসলিম হা/৮৫০; মিশকাত হা/১৩৮৪।
৮২. মুসলিম হা/৮৫৭; 'খুৎবা শ্রবণ করা ও নীরব থাকার ফযীলত' অনুচ্ছেদ; মিশকাত হা/১৩৮২।
৮৩. মুসলিম হা/৮৫৭; 'খুৎবা শ্রবণ করা ও নীরব থাকার ফযীলত' অনুচ্ছেদ; আবুদাউদ হা/১০৫০; মিশকাত হা/১৩৮৩।
৮৪. মুসলিম হা/৮৫১; 'খুৎবা শ্রবণ করা ও নীরব থাকার ফযীলত' অনুচ্ছেদ; ইবনু মাজাহ হা/১১০; নাসাঈ হা/১৪০২।
৮৫. আবুদাউদ হা/১১১৮; নাসাঈ হা/১৩৯৯; ছহীহুল জামে' হা/৭১৪।

📘 মুমিন কিভাবে দিন রাত অতিবাহিত করবে > 📄 ছিয়াম পালন করা

📄 ছিয়াম পালন করা


ছিয়াম দিনের বেলায় পালনীয় ইবাদত সমূহের মধ্যে অন্যতম ফযীলতপূর্ণ ইবাদত। ছিয়াম দু'ধরনের। যথা- ১. ফরয ও ২. নফল। নিম্নে উভয় প্রকার ছিয়াম সম্পর্কে আলোচনা করা হ'ল।

ক. ফরয ছিয়াম পালন করা : ছিয়াম ইসলামের তৃতীয় বা চতুর্থ রুকন এবং ফরয ইবাদতের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ বিশ্বাসীগণ! তোমাদের উপর ছিয়াম ফরয করা হ'ল, যেমন তা ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা আল্লাহভীরু হ'তে পার' (বাক্বারাহ ২/১৮৩)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرُ مُبَارَكَ فَرَضَ اللَّهُ عَزَّ ،وَجَلَّ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ 'তোমাদের নিকটে বরকতময় রামাযান মাস এসেছে। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের উপরে এ মাসের ছিয়াম ফরয করেছেন'। ৮৬

খ. নফল ছিয়াম : নফল ইবাদতের মধ্যে নফল ছিয়াম অতীব ফযীলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ صَامَ يَوْمًا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بَعْدَ اللهُ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيْفًا- 'যে ব্যক্তি আল্লাহ্ উদ্দেশ্যে একটি দিন ছিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার চেহারাকে জাহান্নামের আগুন হ'তে ৭০ বছরের পথ দূরে রাখবেন'। ৮৭ অন্য বর্ণনায় ১০০ বছরের পথ দূরে রাখবেন বলা হয়েছে। ৮৮ ৮৯
বছরের বিভিন্ন সময়ে নফল ছিয়াম রাখা যায়। বিভিন্ন সময়ের সাথে যুক্ত হওয়ায় এগুলির ফযীলতও ভিন্নতর। নিম্নে বিভিন্ন নফল ছিয়াম সমূহ উল্লেখ করা হ'ল।

মাসিক ছিয়াম:
১. শা'বান মাসের ছিয়াম : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রামাযানের ফরয ছিয়ামের পর শা'বান মাসেই একটানা নফল ছিয়াম পালন করতেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন,
فَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلَّا - رَمَضَانَ وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ 'আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে রামাযান মাস ব্যতীত অন্য কোন মাসে পুরো মাস ছিয়াম রাখতে দেখিনি। আর শা'বান মাসের চেয়ে অন্য কোন মাসে এত অধিক ছিয়াম রাখতে দেখিনি'। ৯০
তিনি আরো বলেন, لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَصُومُ شَهْرًا أَكْثَرَ مِنْ - شَعْبَانَ فَإِنَّهُ كَانَ يَصُوْمُ شَعْبَانَ كُلَّهُ 'রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) শা'বান মাসের চেয়ে অধিক ছিয়াম কোন মাসে পালন করতেন না। তিনি পুরো শা'বান মাসই ছিয়াম পালন করতেন'। ৯১ এখানে পূর্ণমাস ছিয়াম রাখার অর্থ হচ্ছে মাসের অধিকাংশ। ৯২
উম্মু সালামা (রাঃ) বলেন, مَا رَأَيْتُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَصُومُ شَهْرَيْنِ - مُتَتَابِعَيْنِ إِلَّا شَعْبَانَ وَرَمَضَانَ 'নবী করীম (ছাঃ)-কে শা'বান ও রামাযান ব্যতীত একাধারে দুই মাস ছিয়াম পালন করতে দেখিনি'। ৯৩
অনুরূপভাবে আয়েশা (রাঃ) বলেন, مَا رَأَيْتُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِي شَهْرٍ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ كَانَ يَصُوْمُهُ إِلَّا قَلِيْلًا بَلْ كَانَ يَصُوْمُهُ كُلَّهُ 'শা'বান মাসের মত আর কোন মাসে এত অধিক নফল ছিয়াম রাখতে আমি রাসূল (ছাঃ)-কে দেখিনি। এ মাসের কিছু ব্যতীত পুরো মাসই তিনি ছিয়াম রাখতেন'। ৯৪
শা'বান মাসের কয়েক দিন ব্যতীত ছিয়াম পালন করা রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য খাছ ছিল। উম্মতের জন্য তিনি প্রথম অর্ধাংশ পসন্দ করেছেন। তিনি বলেন, إِذَا كَانَ النِّصْفُ مِنْ شَعْبَانَ فَلَاصَوْمَ حَتَّى يَجِيَّ رَمَضَانُ - ‘শা'বান মাসের অর্ধেক অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে রামাযান না আসা পর্যন্ত আর কোন ছিয়াম নেই'। ৯৫ তবে কেউ ছিয়াম রাখতে অভ্যস্ত হ'লে সে রাখতে পারে।

২. শাওয়াল মাসের ছিয়াম : রামাযানের ছিয়াম পালনের পরে শাওয়াল মাসে ৬টি ছিয়াম রাখা অতি গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ - ‘যে ব্যক্তি রামাযানের ছিয়াম রেখেছে এবং পরে শাওয়ালের ছয়টি ছিয়াম রেখেছে, সে যেন সারা বছর ছিয়াম রাখল'। ৯৬ অন্য হাদীছে এসেছে, مَنْ صَامَ سِتَّةَ أَيَّامٍ بَعْدَ الْفِطْرِ كَانَ تَمَامَ السَّنَةِ (مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا) ‘যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের পর ছয় দিন ছিয়াম রাখল, তা পূর্ণ বছর ছিয়াম রাখার সমতুল্য। কেউ কোন সৎকাজ করলে, সে তার দশ গুণ পাবে’ (আন'আম ৬/১৬০)। ৯৭ তিনি আরো বলেন, جَعَلَ اللَّهُ الْحَسَنَةَ بِعَشَرَةٍ فَشَهْرٌ بِعَشَرَةِ أَشْهُرٍ وَسِتَّةُ أَيَّامٍ بَعْدَ الْفِطْرِ تَمَامُ السَّنَةِ ‘আল্লাহ নেকীকে দশগুণ করেন। সুতরাং রামাযান মাস দশ মাসের সমান এবং ঈদোত্তর ছয়দিনে পূর্ণ বছরের সমান হয়'। ৯৮ অন্যত্র তিনি আরো বলেন, صِيَامُ شَهْرِ رَمَضَانَ بِعَشَرَةِ أَشْهُرٍ وَصِيَامُ سِتَّةِ أَيَّامٍ مِنْ شَوَّالٍ بِشَهْرَيْنِ فَذَلِكَ صِيَامُ سَنَةٍ ‘রামাযান মাসের ছিয়াম দশ মাসের সমান এবং শাওয়ালের ছয়দিনের ছিয়াম দু'মাসের সমান, এ হ'ল পূর্ণ বছর ছিয়াম'। ৯৯

৩. যিলহজ্জ মাসের ছিয়াম: নফল ছিয়ামের মধ্যে যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের ছিয়ামের মর্যাদা অত্যধিক। যিলহজ্জের প্রথম দশকের ছিয়ামের ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ يَعْنِي الْعَشْرَ، قَالُوا يَارَسُولَ اللهِ وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ قَالَ وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيْلِ اللَّهِ إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَالِكَ بِشَيْءٍ-
'আল্লাহর নিকট যিলহজ্জ মাসের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক পসন্দনীয় নেক আমল আর নেই। ছাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদও নয়? তিনি বললেন, না, আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান ও মাল নিয়ে বের হয়ে ফিরে আসেনি (তার শাহাদত হওয়া এর চেয়েও অধিক মর্যাদাপূর্ণ)'। ১০০
নবী করীম (ছাঃ)-এর কোন এক স্ত্রী বলেন, كَانَ رَسُوْلُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ وَيَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ أَوَّلَ اثنَيْنِ مِنَ الشَّهْرِ وَالْحَمِيْسَ 'রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যিলহজ্জ মাসের নয় তারিখ পর্যন্ত, আশূরার দিন, প্রত্যেক মাসে তিনদিন, মাসের প্রথম সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম রাখতেন'।

৪. প্রতি মাসে তিনদিন ছিয়াম: প্রতি মাসে তিনদিন ছিয়াম পালন করা রাসূল (ছাঃ)-এর নিয়মিত ও পসন্দনীয় আমল। তিনদিন ছিয়াম রাখার বিনিময়ে পুরো মাস ছিয়াম রাখার সমান নেকী পাওয়া যায়। আবূ যার (রাঃ) হ'তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, مَنْ صَامَ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَذَالِكَ صِيَامُ الدَّهْرِ فَأَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ تَصْدِيقَ ذَالِكَ فِي كِتَابِهِ: مَنْ جَاءَ Rafe ao act formal بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا الْيَوْمُ بِعَشْرَةِ أَيَّامٍ ছিয়াম রাখে তা যেন সারা বছর ছিয়াম রাখার সমান। এর সমর্থনে আল্লাহ তাঁর কিতাবে নাযিল করেন, 'যদি কেউ একটি ভাল কাজ করে তার প্রতিদান হ'ল এর দশগুণ' (আন'আম ৬/১৬০)। সুতরাং এক দিন দশদিনের সমান'। ১০১
চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে এই ছিয়াম রাখা সুন্নাত। যেমন- রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আবূ যার (রাঃ)-কে বলেন, হে আবূ যার! তুমি প্রতি মাসে তিন দিন ছিয়াম রাখতে চাইলে তের, চৌদ্দ ও পনের তারিখে রাখ'। ১০২ তবে কোন কারণে ঐ তিনদিন ছিয়াম রাখতে না পারলে অন্য দিনেও রাখা যাবে। ১০৩

বিশেষ দিনের ছিয়াম:
৫. আরাফার দিনের ছিয়াম: আরাফার দিনের ছিয়াম সম্পর্কে নবী করীম صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ إِنِّي أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ اللَّتِي قَبْلَهُ 1 (18) GRE وَالسَّنَةَ اللَّتِي بَعْدَهُ. আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন'। ১০৪
উল্লেখ্য যে, আরাফায় অবস্থানকারী হাজীগণ এ দিন ছিয়াম পালন করবেন না। এছাড়া পৃথিবীর অন্যত্র অবস্থানকারী সকল মুসলমান গুরুত্বপূর্ণ এই নফল ছিয়াম পালন করে অশেষ নেকী অর্জনে সচেষ্ট হবেন।

৬. আশূরার ছিয়াম: আশূরার ছিয়াম তথা মুহাররমের ১০ তারিখের ছিয়ামও অধিক ফযীলতপূর্ণ। ইহুদীরাও এ দিন ছিয়াম পালন করত। ফেরাউনের কবল থেকে মূসা (আঃ)-এর নাজাতের শুকরিয়া স্বরূপ এ ছিয়াম রাখা হয়। কারবালার প্রান্তরে হুসাইন (রাঃ)-এর শাহাদতকে কেন্দ্র করে এ ছিয়াম পালন করলে শুধু কষ্ট করাই সার হবে। কারণ তার অর্ধ শতাব্দী পূর্বেই ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হ'তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মদীনায় এসে ইহুদীদেরকে আশূরার ছিয়াম পালন করতে দেখে এর কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, هَذَا يَوْمٌ صَالِحٌ هَذَا يَوْمٌ a free fal نَجِّى اللهُ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ عَدُوِّهِمْ فَصَامَهُ مُوسَى -
দিনে আল্লাহ তা'আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুদের কবল থেকে মুক্তি দান করেছিলেন, ফলে মূসা (আঃ) এ দিনে ছিয়াম পালন করেছেন'। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,- فَأَنَا أَحَقُّ بِمُوْسَى مِنْكُمْ فَصَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ 'আমি তোমাদের চেয়ে মূসা (আঃ)-এর (আদর্শের) অধিক হক্বদার। অতঃপর তিনি এ দিনে ছিয়াম পালন করেন ও ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন'। ১০৫
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَحَرَّى صِيَامَ يَوْمٍ فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِهِ إِلَّا هَذَا الْيَوْمَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ وَهَذَا الشَّهْرَ يَعْنِي شَهْرَ - رَمَضَانَ 'আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে আশূরার ছিয়ামের ন্যায় অন্য কোন ছিয়ামকে এবং এই মাস অর্থাৎ রামাযান মাসের ন্যায় অন্য কোন মাসকে প্রাধান্য দিতে দেখিনি'। ১০৬
২য় হিজরীতে রামাযান মাসের ছিয়াম ফরয হ'লে রাসূল (ছাঃ) এই নির্দেশ শিথিল করে দেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) প্রথমে আশূরার ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন। পরে যখন রামাযান মাসের ছিয়াম ফরয করা হয় তখন আশূরার ছিয়াম ছেড়ে দেয়া হ'ল। যার ইচ্ছা সে পালন করত, যার ইচ্ছা সে ছেড়ে দিত। ১০৭ আশূরার ছিয়াম মুহাররমের ৯, ১০ অথবা ১০, ১১ তারিখে রাখা যায়। তবে ৯, ১০ তারিখে রাখাই উত্তম। ১০৮
এ ছিয়ামের ফযীলত প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, وَصِيَامُ يَوْمٍ عَاشُوْرَاءِ احْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ - আল্লাহ্র নিকটে আশা রাখি যে, তা বিগত এক বছরের পাপ মোচন করে দিবে'। ১০৯

৭. দাউদ (আঃ)-এর ছিয়াম : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দাউদ (আঃ)-এর ছিয়ামকে সর্বোত্তম বলেছেন। তিনি বলেন, لَأَصَوْمَ فَوْقَ صَوْمٍ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامُ شَطْرَ - الدَّهْرِ صُمْ يَوْمًا وَأَفْطِرْ يَوْمًا 'দাউদ (আঃ)-এর ছিয়ামের উপরে উত্তম ছিয়াম নেই। তা হচ্ছে অর্ধেক বছর। (সুতরাং) একদিন ছিয়াম পালন কর ও একদিন ছেড়ে দাও'। ১১০

সাপ্তাহিক ছিয়াম : সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবারের ছিয়ামের অনেক গুরুত্ব রয়েছে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম রাখতেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হ'ল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আপনি সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম রাখেন। তিনি বলেন, تُعْرَضُ الْأَعْمَالُ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ وَالْخَمِيسِ فَأُحِبُّ أَنْ يُعْرَضَ عَمَلِي - وَأَنَا صَائِمٌ 'প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার আমলনামা সমূহ আল্লাহ্র নিকটে পেশ করা হয়। আমি পসন্দ করি যে, ছিয়াম অবস্থায় আমার আমলনামা আল্লাহ্র নিকটে পেশ করা হোক'। ১১১

**টিকাঃ**
৮৬. বুখারী হা/৮, ৪৫১৪; মুসলিম হা/১৬; তিরমিযী হা/২৬০৯।
৮৭. নাসাঈ হা/২১১৮; মিশকাত হা/১৯৬২; ছহীহুল জামে' হা/৫৫।
৮৮. বুখারী হা/২৮৪০; মুসলিম হা/১১৫৩; মিশকাত হা/২০৫৩।
৮৯. নাসাঈ হা/২২৫৪; ছহীহাহ হা/২২৬৭, ২৫৬৫; ছহীহুল জামে' হা/৬৩৩০।
৯০. বুখারী হা/১৯৬৯; মুসলিম হা/১১৫৬; নাসাঈ হা/২৩৫১; মিশকাত হা/২০৩৬।
৯১. বুখারী হা/১৯৭০; নাসাঈ হা/২১৭৯।
৯২. ফাৎহুলবারী ৪/২১৪; মির'আত ৬/৪৪৩ পৃঃ।
৯৩. তিরমিযী হা/৭৩৬ ইবনু মাজাহ হা/১৬৪৮; নাসাঈ হা/২১৭৫, ২৩৫২; মিশকাত হা/১৯৭৬, সনদ ছহীহ।
৯৪. আবুদাউদ হা/২৪৩৫; তিরমিযী হা/৭৩৬; নাসাঈ হা/২১৭৮, সনদ ছহীহ।
৯৫. ইবনু মাজাহ হা/১৬৫১; তিরমিযী হা/৭৩৮; মিশকাত হা/১৯৭৬, সনদ ছহীহ।
৯৬. মুসলিম হা/১১৬৪; তিরমিযী হা/৭৫৯; ইবনু মাজাহ হা/১৭১৫; মিশকাত হা/১৯৪৯; ছহীহুল জামে' হা/৬৩২৭।
৯৭. ইবনু মাজাহ হা/১৭১৫; ছহীহুল জামে' হা/৬৩২৮; ছহীহ আত-তারগীব হা/১০০৭।
৯৮. আহমাদ হা/২২৪৬৫; ছহীহ আত-তারগীব হা/১০০৭; ইরওয়া ৪/১০৭, সনদ ছহীহ।
৯৯. নাসাঈ, সুনানুল কুবরা, হা/২৮৭৩; ছহীহুল জামে' হা/৩৮৫১; ছহীহ আত-তারগীব হা/১০০৭।
১০০. ইবনু মাজাহ হা/১৭২৭; তিরমিযী হা/৭৫৭, সনদ ছহীহ।
১০১. তিরমিযী হা/৭৬২; ইবনু মাজাহ হা/১৭০৮; ছহীহ আত-তারগীব হা/১০৩৫।
১০২. তিরমিযী হা/৭৬১, সনদ হাসান ছহীহ।
১০৩. মুসলিম হা/১১৬০; মিশকাত হা/২০৪৬।
১০৪. মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৪৬; তিরমিযী হা/৭৪৯; ইবনু মাজাহ হা/১৭৩০।
১০৫. বুখারী হা/২০০৪।
১০৬. বুখারী হা/২০০৬।
১০৭. বুখারী হা/১৮৯৩, ২০০১, ২০০২, ৩৮৩১, ৪৫০২, ৪৫০৪।
১০৮. আশূরায়ে মুহাররম ও আমাদের করণীয়, পৃঃ ৩, টীকা-৮ দ্রঃ।
১০৯. মুসলিম, মিশকাত হা/১৯৪৬, ৪/২৫১।
১১০. বুখারী হা/১৯৮০।
১১১. তিরমিযী হা/৭৪৭, সনদ ছহীহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00