📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 হুদায়বিয়ার সন্ধির বর্ণনা

📄 হুদায়বিয়ার সন্ধির বর্ণনা


হিজরী ৬ষ্ঠ সালে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, নাবী চৌদ্দশত সাহাবী নিয়ে উমরাহ করার উদ্দেশ্যে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। প্রথমে কুরাইশদের খবরাখবর সংগ্রহ করার জন্য একজন গোয়েন্দা মক্কায় পাঠালেন। উসফান নামক স্থানে পৌঁছে তিনি জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তিনি আরও জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা তাকে কাবার কাছেই পৌঁছতে দিবেনা এবং তাঁর সাথে তারা প্রচন্ড লড়াইয়ে লিপ্ত হবে। নাবী সাহাবীদের সাথে পরামর্শে বসলেন। আবু বকর এর পরামর্শ ছিল, কুরাইশদেরকে কোন প্রকার ছাড় দেয়া যাবেনা। তারা যদি রাস্তায় আটকিয়ে দেয়, তাহলে প্রয়োজনে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। রসূল আবু বকরের এই মতকেই পছন্দ করলেন এবং সামনে অগ্রসর হতে থাকলেন। হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছে নাবী উছমান কে এই খবর দেয়ার জন্য মক্কায় পাঠালেন যে, আমরা যুদ্ধ করার জন্য মক্কায় আসছিনা। উমরাহ পালন করাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। সুতরাং আমাদের পথ ছেড়ে দাও। কিন্তু কুরাইশরা এই কথার মোটেই মূল্যায়ন করলনা। তারা বলল- আমরা তোমার কথা শুনলাম। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা শুরু হল। আলোচনা সামনে অগ্রসর হচ্ছিল। এক পর্যায়ে সন্ধির পরিবর্তে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। উভয় পক্ষের লোকেরা পরস্পর তীর ও পাথর নিক্ষেপে লিপ্ত হল। এই পর্যায়ে নাবী এর কাছে খবর পৌঁছল যে, কুরাইশরা উছমান কে হত্যা করে ফেলেছে। মুসলমানেরা এই খবর শুনে রসূান্বিত হলেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। তারা একটি গাছের নীচে একত্রিত হয়ে রসূল এর হাতে এই মর্মে বায়আত নিলেন যে, তারা যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং কোনক্রমেই এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ না নিয়ে মদীনায় ফেরত যাবেন না। কিন্তু একটু পরেই সহীহ-সালামতে উছমান মক্কা হতে ফেরত আসলেন। উছমান এর আগমণে পরিস্থিতি শান্ত হল। পুনরায় নতুন করে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা শুরু হল। আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে নিম্নে বর্ণিত শর্তে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধি চুক্তি রচিত হল। ইসলামের ইতিহাসে এটি হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তসমূহ

📄 হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তসমূহ


সন্ধির প্রধান প্রধান শর্তগুলো ছিল এই-

> মদীনার মুসলমান ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে দীর্ঘ দশ বছর পর্যন্ত সকল প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ থাকবে।
> এই বছর মুসলমানেরা উমরাহ না করেই মদীনায় ফেরত যাবেন।
> আগামী বছর তারা মক্কায় আগমন করতে পারবেন। এ সময় তারা সাথে তীর ও বর্শা আনতে পারবেন না। আত্মরক্ষার জন্য শুধু কোষবদ্ধ তলোয়ার সাথে রাখতে পারবে।
> মক্কায় তারা কেবল তিন দিন অবস্থান করতে পারবেন। তিন দিন পার হওয়ার সাথে সাথে মক্কা থেকে বের হয়ে চলে যেতে হবে।
> এই দশ বছরের মধ্যে মক্কার কোন লোক যদি মুসলমান হয়ে মদীনায় আশ্রয় নেয় তাহলে মদীনাবাসীগণ তাকে আশ্রয় দিবে না। পক্ষান্তরে মদীনার কোন লোক যদি মক্কায় চলে আসে তাহলে মক্কাবাসীগণ তাকে মদীনায় ফেরত দিবে না।

চুক্তির এই শেষ শর্তটি মেনে নেওয়া মুসলমানদের জন্য খুবই কঠিন ছিল। তারা নাবী এর কাছে বলতে লাগলেনঃ হে আল্লাহর নাবী! আমরা কি এই শর্তটিও মেনে নিব? নাবী বললেন- তাদের যে লোক মুসলমান হয়ে আমাদের কাছে চলে আসবে, আমরা তাকে তাদের নিকট ফেরত দিব। আল্লাহ তা'আলা তার কোন না কোন ব্যবস্থা করবেন। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর নাবী মুসলমানদেরকে আদেশ দিলেন যে, তোমরা দাঁড়িয়ে যাও, কুরবানী করে ফেল এবং মাথা কামিয়ে ফেল।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 হুদায়বিয়ার সন্ধির সাথে সংশিলিষ্ট কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

📄 হুদায়বিয়ার সন্ধির সাথে সংশিলিষ্ট কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা


> এই সন্ধির পর মক্কার খোযাআ গোত্র নাবী এর সাথে যোগ দিল আর বনী বকর কুরাইশদের পক্ষ নিল।
> হুদায়বিয়ার বছর এই হুকুম নাযিল হল যে, ইহরাম অবস্থায় কেউ যদি অসুবিধার কারণে মাথা কামাতে বাধ্য হয়, তাহলে তাকে ফিদইয়া স্বরূপ তিন দিন সিয়াম রাখতে হবে, অথবা সাদকাহ করতে হবে অথবা একটি কোরবানী করতে হবে। বিধানটি নাযিল হয়েছিল কা'ব বিন উজরাকে কেন্দ্র করে।
> এই সন্ধির ঘটনায় নাবী মাথা মুন্ডনকারীদের জন্য তিনবার এবং চুল খাটোকারীদের জন্য একবার দু'আ করেছেন।
> এই ঘটনার সময় দশ জনের পক্ষ হতে একটি উট এবং সাতজনের পক্ষ হতে একটি গরু কোরবানী বৈধ হওয়ার বিধান জানা যায়।
> এই ঘটনায় সূরা ফাতাহ নাযিল হয়।
> রসূল যখন মদীনায় ফেরত আসলেন, তখন একদল মু'মিন মহিলা আগমন করলেন। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে নিষেধ করলেন। এর মাধ্যমে মহিলাদেরকে ফেরত পাঠানোর বিধান মানসুখ (রহিত) হয়ে যায়। আবার কেউ বলেছেন- এ বিষয়ে কুরআনের মাধ্যমে সুন্নাতকে খাস করা হয়েছে। এ মতটি খুব শক্তিশালী। আবার কেউ কেউ বলেছেন- শুধু পুরুষদেরকেই ফেরত দেয়ার ব্যাপারে চুক্তি হয়েছিল। তবে মুশরিকরা উভয় শ্রেণীর ক্ষেত্রেই শর্তটি কার্যকর রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 হুদায়বিয়ার ঘটনায় যে সমস্ত ফিকহী মাসায়েল জানা যায়

📄 হুদায়বিয়ার ঘটনায় যে সমস্ত ফিকহী মাসায়েল জানা যায়


হুদায়বিয়ার ঘটনায় দলীল পাওয়া যায় যে, হজ্জের মাস সমূহেও উমরাহ করা জায়েয। হজ্জের ন্যায় উমরাহ্এর ক্ষেত্রেও মীকাত হতে ইহরাম বাঁধা উত্তম। এতে আরও দলীল পাওয়া যায় যে, উমরাতে কোরবানীর জানোয়ার সাথে নেয়া সুন্নাত। কোরবানীর জন্তুতে দাগ লাগানোও সুন্নাত; এটি মুছলা বা অঙ্গহানীর শামিল হবেনা। আল্লাহর দুশমনদের মধ্যে ক্রোধের জ্বালা প্রবেশ করানো জায়েয। সেনাপতির উচিত শত্রুদের দেশে গোয়েন্দা প্রেরণ করা। প্রয়োজন বশত যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রাপ্ত ও চুক্তিবদ্ধ মুশরিকদের সহায়তা নেওয়া জায়েয। সেনাপতির উচিত সঠিক মতামত খুঁজে বের করার জন্য সাধারণ সৈনিক ও জনগণের সাথে পরামর্শ করা। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই মুশরিকদের শিশু সন্তানদেরকে বন্দী করা জায়েয আছে। অন্যায় কথার প্রতিবাদ করা জরুরী। যদিও সেই কথাটি অবুঝ মানুষ কিংবা কোন পশুকে লক্ষ্য করে বলা হয়। কেননা হুদায়বিয়ার দিন রসূল এর উটনী কাসওয়া যখন বসে পড়ল, তখন লোকেরা বলল যে, রসূল এর উটনী কাসওয়ার অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। রসূল তাদের কথার প্রতিবাদ করে বললেন- কাসওয়ার অভ্যাস খারাপ হয়নি। পূর্বেও তার অভ্যাস খারাপ ছিলনা। বরং একে সেই আল্লাহ্ তা'আলাই রুখে দিয়েছেন, যিনি আবরাহার হস্তিবাহিনীকে রুখে দিয়েছিলেন।²⁶⁷ দ্বীনি বিষয়কে জোরালোভাবে উপস্থাপন করার জন্য শপথ করা জায়েয আছে।

মুশরিক এবং পাপী লোকেরাও যদি আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতি আহবান জানায়, তাহলে আল্লাহর নিদর্শনের সম্মান রক্ষার্থে তাদের সাথে সহযোগিতা করা জায়েয আছে। হুদায়বিয়ার দিন কতিপয় সাহাবীর হৃদয় সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। উমার তো সেই দিন উমরাহ না করেই হুদায়বিয়া থেকে ফেরত আসাতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক সেই দিন রসূল এর ন্যায় জবাব প্রদান করেছিলেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, আবু বকর সাহাবীদের মধ্যে সর্বাধিক উত্তম, সর্বাধিক জ্ঞানী এবং আল্লাহ্ রসূল ও আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ছিলেন।

এতে আরও জানা গেল যে, নাবী হুদায়বিয়ার ডান দিক থেকে বের হয়েছিলেন। এতে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হারামের সীমানার মধ্যে এবং এর যেকোন স্থানে সলাত পড়লেই বাড়তি ছাওয়াব পাওয়া যাবে। নাবী এর বাণী- "মাসজিদুল হারামের এক সলাত অন্যন্য মাসজিদের এক লাখ সলাত থেকেও উত্তম"।²⁶⁸ এখানে শুধু মাসজিদকে খাস করা হয়নি। যে ব্যক্তি মক্কার নিকটবর্তী কোন স্থানে অবতরণ করবে, তার উচিৎ হবে হারামের সীমানার বাইরে অবস্থান করা এবং সলাতের সময় হলে হারামের সীমানার মধ্যে সলাত আদায় করা। মুসলমানদের স্বার্থে ইমাম নিজেই শত্রুদের সাথে সন্ধির প্রস্তাব করতে পারেন। মুগীরা বিন শুবা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের সাথে বসবাস করত। অতঃপর সে তাদের সাথে গাদ্দারী করে তাদের সম্পদ হস্তগত করে নিয়েছিল। তাই নাবী সেই মালের প্রতি কোন প্রকার দৃষ্টিপাত করেন নি।

সেই দিন আবু বকর উরওয়া বিন মাসউদকে লক্ষ্য করে কড়া কথা বলেছিলেন। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রয়োজনে কঠোর শব্দ ব্যবহার করা জায়েয আছে। বহিরসূত লোক কিংবা কাফেরদের দূতরা বেআদবী করলে বিশেষ স্বার্থে তাতে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। হুদায়বিয়ার ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া যায় যে, নেকফাল (শুভ লক্ষণ) গ্রহণ করা মুস্তাহাব। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মুসলমানদের বিশেষ স্বার্থ অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে মুশরিকদের সাথে চুক্তি করা জায়েয আছে। মাথা কামানো হাজ্জ ও উমরার অনুষ্ঠানের অন্তর্ভূক্ত এবং চুল ছোট করার চেয়ে কামানো উত্তম। হাজ্জ বা উমরাহ সম্পাদনের ইচ্ছায় সফররত ব্যক্তি যেই স্থানে বাধাপ্রাপ্ত হবে সেখানেই কোরবানীর জন্তু যবেহ করবে। হুদায়বিয়ার সন্ধির এই অংশ অর্থাৎ নারীদেরকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত দ্বারা মানসুখ হয়ে গেছে। চুক্তি মোতাবেক কোন মুসলমানকে কাফেরদের দূতের হাতে ফেরত দিলে সেই মুসলিম যদি রাস্তায় সেই দূতদেরকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে কিসাস স্বরূপ ঐ মুসলমানকে হত্যা করা আবশ্যক নয়। মুরতাদের কাছে তাওবা পেশ না করেই তাকে হত্যা করা জায়েয আছে। বিশেষ করে যেই মুরতাদের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য হয়। নাবী মক্কা বিজয়ের দিন মুরতাদ আব্দুল্লাহ্ বিন আবী সারহকে হত্যা করেছিলেন। তাকে তাওবা করার আহবান জানাননি।

টিকাঃ
২৬৭. পবিত্র কাবা ঘর ও মক্কা নগরীর রয়েছে সুমহান মর্যাদা। আল্লাহ্ তা'আলা পৃথিবীর সকল স্থানের উপর মক্কা নগরীকে শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রাধান্য দিয়েছেন। সুতরাং সৃষ্টির লগ্ন থেকেই মানব জাতি কাবা ঘর ও মক্কা নগরীকে সম্মান দিয়ে আসছে। কাবা ঘর ও মক্কা নগরীর প্রতি এই সম্মান শুধু জিন-ইনসানের মধ্যেই সীমিত নয়; বরং পশুপাখির হৃদয়েও আল্লাহ্ তা'আলা কাবা ঘরের প্রতি সম্মান ঢেলে দিয়েছেন। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উটনী বুঝতে সক্ষম হয়েছিল যে, সামনে অগ্রসর হলে এবং মক্কায় প্রবেশ করলে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হতে পারে এবং কাবার সম্মান নষ্ট হতে পারে। তাই উটনী বসে গিয়েছিল। এর আগে আবরাহার হস্তিবাহিনীও একই কারণে কাবায় প্রবেশ করা হতে বিরত ছিল।
২৬৮. ইবনে মাজাহ, তাও. হা/১৪০৬

ফন্ট সাইজ
15px
17px