📄 মুনাফেক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে দোররা না মারার কারণ
আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইকে দুরা না লাগানোর কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে আলেমদের থেকে কয়েকটি মত বর্ণিত হয়েছে। ১) মুমিনরা দুনিয়াতে অপরাধ করলে দুনিয়াতে যদি তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয় তাহলে সেই শাস্তি গুনাহর কাফফারা স্বরূপ। আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই যেহেতু মুনাফেক ছিল এবং তার জন্য যেহেতু পরকালে কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে, তাই তাকে দুরা লাগানো হয়নি। ২) সাক্ষী ব্যতীত কারও উপর শরিয়তের নির্ধারিত শাস্তি কায়েম করা যায়না। তার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট কোন সাক্ষী না থাকায় তাকে শাস্তি দেয়া সম্ভব হয়নি। ৩) ব্যভিচারের অপবাদের শাস্তি যেহেতু বান্দার হকের সাথে সম্পৃক্ত, আর আয়িশা যেহেতু তার শাস্তি দাবী করেন নি, তাই সে শাস্তি হতে রেহাই পেয়েছিল। ৪) বলা হয়ে থাকে যে, হদ কায়েম করার চেয়ে অধিক বৃহৎ স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য তার উপর শাস্তি কায়েম করা হয়নি। কারণ সে ছিল স্বীয় গোত্রের নেতা। তাই তাকে হত্যা করা হলে মুসলিমদের ঐক্য নষ্ট হতে পারে।
এই যুদ্ধ হতে ফেরার পথেই আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই তার সাথীদের সাথে কুৎসা রটিয়েছিল। যায়েদ বিন আরকাম এই খবর নাবী কে বলে দিলেন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা যায়েদ বিন আরকামের সত্যতায় এবং মুনাফেক সরদারকে মিথ্যুক প্রতিপন্ন করে সুরা মুনাফিকুন নাযিল করেন। নাবী তখন যায়েদকে বললেন- সুসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহ্ তা'আলা তোমার প্রশংসায় কুরআন মজীদে সূরা মুনাফিকুন নাযিল করেছেন।
📄 খন্দকের যুদ্ধের ঘটনা
পঞ্চম হিজরীর শাওয়াল মাসে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইহুদী নেতারা মক্কার কুরাইশদের কাছে গমন করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতে লাগল। অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন আরব গোত্রের ১০ হাজার স্বশস্ত্র যোদ্ধা প্রস্তুত হয়ে গেল। সংবাদ পেয়ে নাবী সালমান ফারসীর পরামর্শে মদীনার চার পার্শে খন্দক তথা পরীখা খননের পর তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে মদীনার মূল শহরের বাইরে বেরিয়ে পড়লেন।
ইতিমধ্যেই কুরাইশ বাহিনী মদীনার নিকটবর্তী হয়ে গেল এবং চতুর্দিক থেকে মদীনাকে ঘেরাও করে ফেলল। পূর্ণ একমাস তারা কঠোরভাবে মদীনাকে অবরোধ করে রাখল। পরিশেষে আল্লাহ্ তা'আলা কাফেরদের উপর বিরাট এক বাতাস প্রেরণ করলেন। এতে করে তাদের অন্তরে ভয়-ভীতি প্রবেশ করল। তারা আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি নিয়ে ফেরত গেল।
মুশরিকরা চলে যাওয়ার পর নাবী জানতে পারলেন যে, বনী কুরায়যার ইহুদীরা চুক্তি ভঙ্গ করেছে। মুসলিম বাহিনী সেখানে পৌঁছার পর ইহুদীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হল। যার ভাগ্যে হত্যা নির্ধারিত ছিল সে নিহত হল। বাকীরা অপমানিত হয়ে মুসলিমদের হাতে বন্ধী হল।
📄 উরায়নার ঘটনা
আনাস বিন মালিক বলেন- একদা উরায়না কিংবা উল্ল গোত্রের কিছু লোক নাবী এর কাছে আগমণ করল। অসুস্থতার কারণে নাবী তাদেরকে উটের দুধ এবং পেশাব পান করতে আদেশ করলেন। কিছু দিন পর সুস্থ হয়ে তারা নাবী এর রাখালকে হত্যা করল এবং পশুগুলো নিয়ে পালিয়ে যেতে লাগল। নাবী তাদেরকে পাকড়াও করার জন্য একদল সাহাবীকে প্রেরণ করলেন। নাবী এর আদেশে তাদের হাত-পা কেটে দেয়া হল এবং তাদের চক্ষুগুলো ফুঁড়ে দেয়া হল।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন- এই ঘটনা থেকে জানা গেল, (১) উটের পেশাব পান করা জায়েয। (২) যে সমস্ত পশুর গোশত খাওয়া হালাল সে সমস্ত পশুর পেশাব পবিত্র। (৩) সন্ত্রাসী কোন মানুষকে যেভাবে হত্যা করবে, তাকে সেভাবেই হত্যা করতে হবে।
📄 হুদায়বিয়ার সন্ধির বর্ণনা
হিজরী ৬ষ্ঠ সালে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, নাবী চৌদ্দশত সাহাবী নিয়ে উমরাহ করার উদ্দেশ্যে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। প্রথমে কুরাইশদের খবরাখবর সংগ্রহ করার জন্য একজন গোয়েন্দা মক্কায় পাঠালেন। উসফান নামক স্থানে পৌঁছে তিনি জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তিনি আরও জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা তাকে কাবার কাছেই পৌঁছতে দিবেনা এবং তাঁর সাথে তারা প্রচন্ড লড়াইয়ে লিপ্ত হবে। নাবী সাহাবীদের সাথে পরামর্শে বসলেন। আবু বকর এর পরামর্শ ছিল, কুরাইশদেরকে কোন প্রকার ছাড় দেয়া যাবেনা। তারা যদি রাস্তায় আটকিয়ে দেয়, তাহলে প্রয়োজনে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। রসূল আবু বকরের এই মতকেই পছন্দ করলেন এবং সামনে অগ্রসর হতে থাকলেন। হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছে নাবী উছমান কে এই খবর দেয়ার জন্য মক্কায় পাঠালেন যে, আমরা যুদ্ধ করার জন্য মক্কায় আসছিনা। উমরাহ পালন করাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। সুতরাং আমাদের পথ ছেড়ে দাও। কিন্তু কুরাইশরা এই কথার মোটেই মূল্যায়ন করলনা। তারা বলল- আমরা তোমার কথা শুনলাম। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা শুরু হল। আলোচনা সামনে অগ্রসর হচ্ছিল। এক পর্যায়ে সন্ধির পরিবর্তে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। উভয় পক্ষের লোকেরা পরস্পর তীর ও পাথর নিক্ষেপে লিপ্ত হল। এই পর্যায়ে নাবী এর কাছে খবর পৌঁছল যে, কুরাইশরা উছমান কে হত্যা করে ফেলেছে। মুসলমানেরা এই খবর শুনে রসূান্বিত হলেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। তারা একটি গাছের নীচে একত্রিত হয়ে রসূল এর হাতে এই মর্মে বায়আত নিলেন যে, তারা যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং কোনক্রমেই এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ না নিয়ে মদীনায় ফেরত যাবেন না। কিন্তু একটু পরেই সহীহ-সালামতে উছমান মক্কা হতে ফেরত আসলেন। উছমান এর আগমণে পরিস্থিতি শান্ত হল। পুনরায় নতুন করে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা শুরু হল। আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে নিম্নে বর্ণিত শর্তে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধি চুক্তি রচিত হল। ইসলামের ইতিহাসে এটি হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত।