📄 গাযওয়ায়ে হামরাউল আসাদ
উহুদ যুদ্ধ শেষে যখন মক্কার মুশরিকরা ফেরত গেল, তখন মুসলমানদের মুখে মুখে এ কথা বলাবলি হতে লাগল যে, মুশরেকরা পুনরায় মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই খবরটি তাদের কাছে খুব বিরাট কষ্টকর মনে হল। কেননা নাবী আলী বিন আবু তালেবকে বলে রেখেছিলেন যে, তুমি খেয়াল রাখ, তাদের গতিবিধি লক্ষ্য কর এবং দেখ তারা কি করতে চায়। তারা ঘোড়া থেকে নেমে উটের উপর আরোহন করে তাহলে বুঝতে হবে যে, তারা মক্কায় চলে যাচ্ছে। আর যদি ঘোড়ায় আরোহন করে উটকে চালিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে বুঝতে হবে যে, তারা পুনরায় মদীনা আক্রমন করবে। আলী বলেন- আমি তাদের সন্ধানে বের হলাম এবং তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলাম। দেখলাম, তারা ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে উটের উপর আরোহন করে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে।
মক্কার মুশরিকরা যখন ফেরত যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করল, তখন আবু সুফিয়ান মুসলমানদেরকে লক্ষ্য করে বলতে লাগল- আগামী বছর আমাদের ও তোমাদের মাঝে বদর প্রান্তরে মুলাকাত হবে। রসূল তখন মুসলিমদেরকে লক্ষ্য করে বললেন- তোমরা বল হ্যাঁ, ঠিক আছে, আমরাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি। অতঃপর তারা চলতে লাগল।
কিছু দূর গিয়ে তারা পরস্পর বলাবলি করতে লাগল এবং তাদের একজন অন্যজনকে এই বলে দোষারোপ করতে লাগল- আমরা মুসলমানদেরকে দুর্বল করে দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তাদেরকে এমন অবস্থায় রেখে আসলাম যে, তারা দ্বিতীয়বার শক্তি জোগাড় করতে সক্ষম হবে। চল আবার ফেরত গিয়ে তাদের মূলোৎপাটন করে আসি। এই খবর রসূল এর কাছে এসে পৌঁছলে তিনি মানুষের মাঝে ঘোষণা করে দিলেন যে, তোমরা পুনরায় জিহাদের জন্য প্রস্তুত হও। তিনি আরও বললেন- তবে আমাদের সাথে শুধু তারাই বের হবে, যারা উহুদ যুদ্ধে শরীক ছিল।
হামরাউল আসাদ নামক স্থান পর্যন্ত পৌঁছে আবু সুফিয়ান মদীনাগামী এক মুশরিককে দিয়ে রসূলকে হুমকি পাঠালেন। মুসলমানদের কাছে খবরটি পৌঁছার পর তারা বলল- حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ "আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট; তিনি কতই না চমৎকার কর্মসম্পাদনকারী। অতঃপর ফিরে এল মুসলমানরা আল্লাহ্র অনুগ্রহ নিয়ে, তাদের কিছুই অনিষ্ট হল না। তারা আল্লাহ্র ইচ্ছার অনুগত হল। বস্তুতঃ আল্লাহ্র অনুগ্রহ অতি বিরাট"।
টিকাঃ
২৬৪. সূরা আল-ইমরান-৩: ১৭৩-১৭৪
📄 বিরে মাউনা
চতুর্থ হিজরীর সফর মাসেই বি'রে মাউনার ঘটনা সংঘটিত হয়। নজদ অঞ্চল থেকে আবু বারা নামক একজন মুশরিক নাবী এর নিকট আগমণ করলে তিনি তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দেন। আবু বারা নিরাপত্তা দেয়ার অঙ্গীকার করলে রসূল তাঁর সাথে ৪০ জন (মতান্তরে ৭০ জন) সাহাবীকে পাঠিয়ে দিলেন। তারা ছিলেন মুসলমানদের খুব সম্মানী ও কুরআন পাঠদানে পারদর্শী। 'বিরে মাউনা' নামক স্থানে পৌঁছে হারাম বিন মিলহানকে তাঁরা আমের বিন তুফাইলের কাছে রসূল -এর চিঠিসহ প্রেরণ করলেন। এই পাপিষ্ঠ হারাম বিন মিলহানকে বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করল। অতঃপর সে বনী সুলাইমের লোকদেরকে সাথে নিয়ে সাহাবীদেরকে ঘেরাও করে সকলকেই হত্যা করে ফেলল।
📄 গাযওয়ায়ে বনী মুস্তালেক এবং ইফ্কের (অপবাদের) ঘটনা
বনী মুসতালেকের যুদ্ধেই আয়িশা এর গলার হার হারিয়ে যায়। খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে তিনি কাফেলা থেকে পিছিয়ে পড়েন এবং সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাহায্যে কাফেলার সাথে মিলিত হন। মুনাফেক নেতা আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অপবাদ রটিয়ে দিল। এই ঘটনার পর পূর্ণ একমাস অহী আসা বন্ধ ছিল। পরিশেষে যখন আয়িশা এর পবিত্রতায় কুরআন নাযিল হল এবং নাবী তা পাঠ করলেন তখন তাঁর নির্মল চরিত্র ও ঈমানী দৃঢ়তার প্রমাণ মিলল। অহীর মাধ্যমে যখন আয়িশা এর পবিত্রতা প্রমাণিত হয়ে গেল তখন নাবী অপবাদ আরোপকারীদেরকে হদ প্রয়োগ করলেন।
টিকাঃ
২৬৫. সূরা নূর-২৪:১৬
📄 আয়িশা (রাঃ) এর চারিত্রিক পবিত্রতা সম্পর্কে অবগত হওয়া সত্ত্বেও নবী (সাঃ) এ ব্যাপারে মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন কেন?
এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে যে, আয়িশা এর চারিত্রিক পবিত্রতা সম্পর্কে নাবী সর্বাধিক অবগত হওয়া সত্ত্বেও অপবাদের ঘটনায় তিনি এত তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করলেন কেন? এর উত্তর হল আল্লাহ্ তা'আলা এই ঘটনার মাধ্যমে সেই হিকমতগুলো প্রকাশ করতে চেয়েছেন, যা এতে লুকায়িত ছিল। সেই সাথে এটি ছিল নাবী এবং তাঁর সকল উম্মাতের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত একটি পরীক্ষা স্বরূপ। এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা একদল লোকের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং অন্য একদল লোকের পতন ঘটান।
যাতে করে আল্লাহ্ তা'আলার হিকমত পরিপূর্ণরূপে প্রকাশিত হয় এবং নাবী এর পরীক্ষা পূর্ণতা লাভ করে। তাই পূর্ণ একমাস অহী বন্ধ রাখা হয়েছিল। সেই সাথে সত্যবাদীদের ঈমান যাতে বৃদ্ধি পায় এবং তারা যেন ন্যায়পরায়ণতা ও মুমিনদের প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করেন। মুনাফেকদের নিফাকী ও মিথ্যাচারিতা যেন আরও বৃদ্ধি পায় এবং তাদের অন্তরের গোপন অবস্থা যেন সকলের সামনে প্রকাশিত হয়ে যায়। সেই সাথে আয়িশা ও তাঁর পিতা-মাতার দ্বীনদারী যেন পূর্ণতা লাভ করে এবং আবু বকরের পরিবারের উপর যেন আল্লাহর নিয়ামত পূর্ণতা লাভ করে, তারা যেন নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করতে বিনীত হয়ে কেবল আল্লাহর দিকেই ধাবিত হয়, তাঁর কাছেই আশা করে এবং সৃষ্টির উপর ভরসা না করে কেবল আল্লাহর আশা-ভরসা করে।
সুতরাং আয়িশা এর পিতা-মাতা যখন বললেন- উঠ! আল্লাহর রসূল এর কাছে যাও এবং তাঁর শুকরিয়া আদায় কর। কারণ আল্লাহ্ তা'আলা তোমার পবিত্রতায় অহী নাযিল করেছেন তখন তিনি বললেন- এটা হতেই পারেনা। তিনি বলেছিলেন- আল্লাহর শপথ! আমি এ ব্যাপারে কখনই তাঁর শুকরিয়া আদায় করবনা। আমি শুধু সেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব, যিনি আমার পবিত্রতায় কুরআন নাযিল করেছেন।
আল্লাহ্ তা'আলা যদি তৎক্ষণাৎ তাঁর রসূলকে ইফকের ঘটনার প্রকৃত অবস্থা জানিয়ে দিতেন, তাহলে এই হিকমত ও আহকামগুলো জানা যেতনা এবং এ ব্যাপারে কারও পক্ষে কিছুই জানা সম্ভব হতনা।
সেই সাথে আল্লাহ্ তা'আলা আরও চেয়েছিলেন যে, স্বীয় রসূল এবং তাঁর পরিবারের মর্যাদা প্রকাশ করবেন, নিজেই তাদের উপর আরোপিত অভিযোগের প্রতিবাদ করবেন এবং শত্রুদের দোষারোপের জবাব দিবেন। কেননা তারা নাবী পরিবারের প্রতি একটি অশোভনীয় ও ভিত্তিহীন কথা চালিয়ে দিচ্ছিল।
মুনাফেকরা যেহেতু নাবী কে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যেই অপবাদ রটিয়েছিল, সেই হিসাবে তাঁর পক্ষে আয়িশা এর আরোপিত অপবাদের জবাব দেয়া সমীচিন ছিল না। অথচ তাঁর কাছে আয়িশা এর পবিত্রতার ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিলনা এবং অন্যান্য মুমিনদের তুলনায় তাঁর কাছে আয়িশা এর দোষমুক্ত থাকার প্রমাণাদি অধিক পরিমাণে ছিল। তবে সীমাহীন ধৈর্যের পরিচয় দিতে গিয়ে এবং সত্যের উপর অবিচল থাকতে গিয়ে আল্লাহর ফয়সালা আসা পর্যন্ত চুপ থেকেছেন।
কিন্তু যখন অহী আগমণ করল, তখন অপবাদ আরোপকারীদেরকে দুরা মারার হুকুম করলেন। তবে মুনাফেক নেতা আব্দুল্লাহ্ ইবনে উবাইকে তা থেকে রেহাই দেয়া হল।