📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 মদীনায় মুহাম্মাদ (সাঃ)

📄 মদীনায় মুহাম্মাদ (সাঃ)


রসূল মক্কা হতে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেছেন, এ কথা আনসারগণ যথা সময়েই জানতে পেরেছেন। নবুওয়াতের ১৩তম বর্ষে রবীউল আওয়াল মাসের সোমবারের দিন আল্লাহর রসূলকে স্বাগত জানালেন। কুবায় পৌঁছে তিনি বনী আমর বিন আওফ গোত্রে অবতরণ করলেন। তিনি সেখানে কুবা মাসজিদ প্রতিষ্ঠা করলেন। জুমআর দিন মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন এবং বনী সালেমের উপত্যকায় জুমআর সলাত আদায় করলেন। উটনীটি আল্লাহর আদেশে চলে বর্তমানে যেখানে মাসজিদে নববী অবস্থিত সেখানে গিয়ে বসে পড়ল। তিনি আবু আইয়্যুব আনসারীর বাড়িতে অবতরণ করলেন। মদীনায় প্রিয় নাবীর আগমনে আনন্দের স্রোত বইতে লাগল।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 মসজিদে নববীর নির্মাণ

📄 মসজিদে নববীর নির্মাণ


ইমাম যুহরী বলেন- বর্তমানে যেখানে মাসজিদে নববী অবস্থিত সেখানে এসেই নাবী এর উটনী বসে পড়েছিল। সেই স্থানেই তাঁর হিজরতের পূর্বে মুসলিমগণ সলাত আদায় করতেন। এই জায়গাটি ছিল আসআদ বিন যুরারার প্রতিপালনাধীন সাহল ও সুহাইল নামক দুইজন ইয়াতীম বালকের। তাতে সে সময় উট বাঁধা হত। নাবী জায়গাটি খরীদ করে তাতে মাসজিদ নির্মাণের ব্যাপারে কথা বললেন। বালক দু'টি বলল- বরং আমরা তা বিনা মূল্যে দান করতে চাই। কিন্তু নাবী তা বিনা মূল্যে নিতে অস্বীকার করলেন। পরিশেষে তিনি উহা দশ দীনারের বিনিময়ে ক্রয় করে নিলেন।

সে সময় মাসজিদে নববীর চারটি দেয়াল ছিল। কোন ছাদ ছিলনা। কিবলা ছিল বাইতুল মাকদিস। রসূল এর মদীনায় আগমনের পূর্বে আসআদ বিন যুরারা সেখানে মুসলিমদেরকে সলাত ও জুমআ পড়াতেন। সেখানে ছিল গারকাদ ও খেজুর গাছ এবং মুশরিকদের কবর। রসূল এর আদেশে মুশরিকদের কবরগুলোকে উঠিয়ে ফেলা হয় এবং খেজুর ও অন্যান্য গাছগুলোকে কেটে কিবলার দিকে সারিবদ্ধভাবে রেখে দেয়া হয়। মাসজিদটি কিবলার দিক থেকে পিছনের দেয়াল পর্যন্ত একশ হাত লম্বা ছিল। বাকী দুই দিকেও অনুরূপ বা তার চেয়ে একটু কম ছিল। ভিত্তিমূল ছিল তিন হাত পরিমাণ। এর উপরই মুসলিমগণ তা কাঁচা ইট দিয়ে তৈরী করেছেন। রসূল ও তাদের সাথে নির্মাণ কাজে অংশ গ্রহণ করেছেন এবং পাথর ও ইট বহন করেছেন। এ সময় তিনি নিম্নের লাইনগুলো পাঠ করতেন-

اللهم لا عَيْشَ إِلا عَيْشُ الآخِرة + فَاغْفِرْ لِلأَنْصَارِ وَالمُهَاجِرَةُ
"হে আল্লাহ! আখিরাতের জীবনই আসল জীবন। তুমি আনসার ও মুহাজিরদেরকে ক্ষমা কর"। তিনি আরও বলতেন-
هَذَا الحِمَالُ لا حِمَالُ خَيْبَر + هَذَا أَبَرُّ رَبَّنَا وَأَطْهَرُ
“এগুলো খায়বার থেকে আগত খেজুর বা পণ্যের বোঝা নয়; বরং এগুলো ইটের বোঝা এবং এই কাজ আমাদের প্রভুর আনুগত্যের প্রতি ও পবিত্র জীবনের প্রতি উৎসাহ দানকারী"। সাহাবীগণও রসূল- এর সাথে ইট বহন করতেন আর এই ধরণের ছন্দ পাঠ করতেন। তাদের কেউ কেউ বলতেন-
لَئِنْ قَعَدْنَا وَالرَّسُولُ يَعْمل + لَذَاكَ مِنَّا العَمَلُ المُضَلَّلُ
"আমরা যদি বসে থাকি, আর আল্লাহর রসূল কাজ করেন, তাহলে আমাদের জন্য হবে এটি মারাত্মক ভুল।

তিনি বাইতুল মাকদিসের দিকে মাসজিদের কিবলা নির্ধারণ করেন। পিছনের দিকে তিনটি দরজা রাখেন। আরেকটি দরজা রাখেন, যার নাম ছিল বাবে রহমত। তৃতীয় আরেকটি দরজা রাখেন, যা দিয়ে রসূল মাসজিদে প্রবেশ করতেন। খেজুরের কাঠ দিয়ে এর খুঁটি নির্মাণ করেন আর ছাদে খেজুর গাছের শাখা স্থাপন করেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল- আপনি কি এর উপর ছাদ নির্মাণ করবেন না? তিনি বললেন- না, বরং এটি মুসা এর চালাঘরের ন্যায়ই থাকবে।

মাসজিদে নববীর পাশেই তিনি তাঁর স্ত্রীদের ঘরও কাঁচা ইট দিয়ে তৈরী করেন। খেজুরের শাখা ও কাঠ দিয়ে তার ছাদ নির্মাণ করেন। গৃহ নির্মাণ শেষে তিনি আয়িশা এর সাথে সেই নব নির্মিত ঘরে বাসর করেন, যেটি তিনি মাসজিদে নববীর পূর্ব প্রান্তে নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী সাওদার জন্য আরেকটি গৃহ নির্মাণ করেন।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রচনা

📄 আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রচনা


অতঃপর নাবী আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রচনা করলেন। তাদের সংখ্যা ছিল ৯০ জন। তাদের অর্ধেক ছিলেন মুহাজির ও বাকী অর্ধেক ছিলেন আনসার। পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলেও মৃত্যুর পরে তারা একে অন্যের সম্পদের ওয়ারিছ হতেন। বদরের যুদ্ধের ঘটনা পর্যন্ত এই নিয়ম বলবৎ ছিল। পরবর্তীতে যখন কুরআনের এই আয়াত নাযিল হল- (وَأُولُوا الأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْลَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ) "বস্তুতঃ আত্মীয়দের কতক কতকের চেয়ে আল্লাহ্র বিধান মতে অধিক হকদার"। (সূরা আনফাল-৮:৭৫) তখন থেকে মৃত্যুর পর ওয়ারিছ হওয়ার বিষয়টি শুধু আত্মীয়দের মাঝেই সীমিত হয়ে গেল। কেউ কেউ বলেন- দ্বিতীয়বার তিনি শুধু মুহাজিরদের কতকের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রচনা করেন।

এইবার তিনি আলীকে নিজের ভাই বানিয়ে নিলেন। কিন্তু প্রথম বার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রচনার ঘটনাটিই প্রমাণিত। দ্বিতীয়বার তিনি যদি কাউকে ভাই বানাতেন তাহলে তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বন্ধু, হিজরতের ও গারে ছাওরের সাথী এবং সর্বোত্তম সাহাবী আবু বকরই তাঁর ভাই হওয়ার অধিক হকদার হতেন। তাঁর ব্যাপারে রসূল বলেছেন-
لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذاً مِنْ أَهْلِ الأَرْضِ خَلِيلاً لا تَخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلاً وَلَكِنْ أَخِي وَصَاحِبِي
"আমি যদি যমীনের কাউকে বন্ধু বানাতাম তাহলে আবু বকরকেই বানাতাম। কিন্তু সে আমার ভাই ও সাথী"। এটি ইসলামের সাধারণ ভ্রাতৃত্ব হলেও আবু বকর ছিলেন এর সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। যেমন ছিলেন তিনি সাহাবীদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি। রসূল বলেন- আমার আগ্রহ হয় যে আমাদের ভাইদেরকে দেখি। সাহাবীগণ বললেন- হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি বললেন- তোমরা আমার সাহাবী। আমার ভাই হচ্ছে এমন ব্যক্তিগণ, যারা আমার পরে আসবে এবং আমার প্রতি ঈমান আনয়ন করবে। তারা এখনও আমাকে দেখেনি।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 মদীনার ইহুদীদের সাথে চুক্তি

📄 মদীনার ইহুদীদের সাথে চুক্তি


নাবী মদীনার ইহুদীদের সাথে একটি সন্ধি চুক্তি রচনা করলেন। এই মর্মে নাবী ও তাদের মাঝে একটি লিখিত চুক্তিও সম্পাদিত হল। ইহুদীদের একজন বড় আলেম ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন সালাম। তিনি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন। অন্যরা কুফরীর মধ্যেই রয়ে গেল। মদীনাতে ছিল তিনটি ইহুদী গোত্র। বনু কায়নুকা, বনু নযীর এবং বনু কুরায়যা। এই তিনটি ইহুদী গোত্র রসূল -এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, চুক্তি ভঙ্গ করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু তিনি অনুগ্রহ করে বনু কায়নুকাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। তবে বনু নযীরকে মদীনা হতে বহিস্কার করেছেন এবং বনু কুরায়যাকে হত্যা করেছেন। আর বনু কুরায়যার অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুদেরকে দাসে পরিণত করেছেন। বনু নযীরের ব্যাপারে সূরা হাশর এবং বনু কুরায়যার ব্যাপারে সূরা আহযাব নাযিল হয়েছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px