📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 মি’রাজের রাত্রে নবী (সাঃ) কি আল্লাহকে দেখেছেন?

📄 মি’রাজের রাত্রে নবী (সাঃ) কি আল্লাহকে দেখেছেন?


মিরাজের রাতে নাবী তাঁর প্রভুকে দেখেছেন কি না, এই ব্যাপারে সাহাবীগণ মতভেদ করেছেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তাঁর প্রভুকে দেখেছেন। ইবনে আব্বাস থেকে সহীহ সনদে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তাঁর প্রভুকে অন্তর দিয়ে দেখেছেন। আয়িশা এবং আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ দেখার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তারা উভয়েই বলেন- "নিশ্চয়ই তিনি তাকে আরেকবার দেখেছেন"-এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে জিবরীল। আবু যার থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি রসূলকে জিজ্ঞেস করেছেনঃ আপনি কি আপনার প্রভুকে দেখেছেন? উত্তরে তিনি বলেছেন- আমি তো নূর দেখেছি। তাঁকে কিভাবে দেখব? অর্থাৎ রসূল এর মাঝে এবং তাঁর রবের মাঝে নূরের একটি পর্দা অন্তরায় হয়েছিল। অন্য শব্দে বর্ণিত হয়েছে, রসূল বলেন- আমি একটি নূর দেখেছি। ইমাম দারামী না দেখার ব্যাপারে সাহাবীদের ইজমা বর্ণনা করেছেন।
শাইখুল ইসলাম আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন- ইবনে আব্বাস এর কথা, তিনি তাঁর প্রভুকে দেখেছেন এবং তিনি তাঁকে তাঁর অন্তর দিয়ে দেখেছেন- এই কথা দু'টি পরস্পর বিরোধী নয়। কেননা রসূল থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন- আমি আমার সুমহান ও বরকতময় প্রভুকে দেখেছি। এটি মিরাজের রাতের ঘটনা নয়; এটি মদীনায় হিজরতের পর স্বপ্নযোগে সংঘটিত হয়েছে।
এর উপর ভিত্তি করেই ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল বলেন- নাবী সত্যিই তাঁর প্রভুকে দেখেছেন। কেননা নাবীদের স্বপ্নও সত্য হয় এবং অবশ্যই তা বাস্তবে পরিণত হয়। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল এটি বলেন নি যে, তিনি জাগ্রত অবস্থায় চর্মচক্ষু দিয়ে দেখেছেন। যারা তাঁর থেকে এটি বর্ণনা করেছেন, তারা ভুল করেছেন। কিন্তু তিনি একবার বলেছেন- মুহাম্মাদ তাঁর প্রভুকে দেখেছেন। আরেকবার বলেছেন- অন্তর দিয়ে দেখেছেন। সুতরাং তাঁর থেকে দু'টি বর্ণনা এসেছে। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল থেকে তৃতীয় আরেকটি বর্ণনা এসেছে যে, তিনি তাঁর প্রভুকে কপালের চোখ দিয়ে দেখেছেন। এটি তাঁর কতিপয় ছাত্রের অতিরঞ্জিত বর্ণনা। এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ এর সুস্পষ্ট উক্তি রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে তৃতীয় বর্ণনাটি পাওয়া যায়না।
আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস বলেন- তিনি তাঁর প্রভুকে অন্তর দিয়ে দুইবার দেখেছেন। তিনি আল্লাহর এই বাণী দিয়ে দলীল গ্রহণ করেছেনঃ "রসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি সে বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে? নিশ্চয়ই সে তাকে আরেকবার দেখেছিল”। (সূরা নাজম-৫৩:১১-১৩) প্রকাশ্য কথা এই যে, তিনি এই আয়াতগুলো দিয়েই দলীল গ্রহণ করেছেন। নাবী থেকে এ বিষয়ে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, এই আয়াতে যাকে দেখার কথা বলা হয়েছে তিনি হচ্ছেন জিবরীল। নাবী তাঁকে আসল আকৃতিতে দুইবার দেখেছেন। ইবনে আব্বাসের এ কথাই অর্থাৎ তিনি তার প্রভুকে অন্তর দিয়ে দুইবার দেখেছেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের দলীল। তিনি বলেন- মুহাম্মাদ তাঁর প্রভুকে অন্তরের চোখ দিয়ে দেখেছেন; কপালের চোখ (চর্মচোখ) দিয়ে নয়।
আল্লাহ্ তা'আলার বাণীঃ "অতঃপর নিকটবর্তী হল ও ঝুলে গেল"। এখানে যেই নিকটবর্তী হওয়ার কথা বলা হয়েছে তার সম্পর্ক সূরা ইসরাতে বর্ণিত মিরাজের ঘটনার সাথে নয়। সুতরাং কুরআনে বর্ণিত নিকটবর্তী হওয়া দ্বারা জিবরীলের নিকটবর্তী হওয়া উদ্দেশ্য। আয়িশা ও ইবনে মাসউদ থেকে এরূপই বর্ণিত হয়েছে। আয়াতের পূর্বাপর বিবরণ থেকেও তাই বুঝা যায়।
আর হাদীছে যেই নিকটবর্তী হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাতে সুস্পষ্ট যে, তিনি তাঁর মহান প্রভুর নিকটবর্তী হয়েছিলেন। সুতরাং সূরা নাজমের ঘটনার সাথে হাদীছে বর্ণিত মিরাজের ঘটনার কোন দ্বন্দ নেই। সূরা নাজমে বর্ণিত হয়েছে যে, নাবী জিবরীলকে দুইবার আসল আকৃতিতে দেখেছেন। একবার আকাশে সিদরাতুল মুনতাহায়। আরেকবার যমীনে।
মিরাজের রাতে আল্লাহর যে সকল বড় বড় নিদর্শন দেখেছেন সকাল বেলা তিনি তা লোকদেরকে বলতে লাগলেন। তারা এই ঘটনাকে কঠোরভাবে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিল এবং তাঁকে কষ্ট দিল। কুরাইশরা তাকে বাইতুল মাকদিসের বর্ণনা দিতে বলল। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর সামনে বাইতুল মাকদিস উন্মুক্ত করলেন। তিনি তাতে দৃষ্টি দিয়ে সব বলে দিলেন। তারা তাঁর একটি কথাও অস্বীকার করতে পারলনা। তিনি কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফেলা সম্পর্কেও খবর দিলেন। তিনি কুরাইশদেরকে এ কথাও বলে দিলেন যে, উমুক দিন তারা ফেরত আসবে। দেখা গেল তিনি যেভাবে খবর দিয়েছিলেন সেভাবেই সত্যে পরিণত হল। কিন্তু তাতেও তারা মুহাম্মাদ এর প্রতি ঈমান আনয়ন করে নি। বরং তাদের সীমালংঘন আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 নবী (সাঃ) এর মদীনায় হিজরতের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট

📄 নবী (সাঃ) এর মদীনায় হিজরতের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট


নাবী এর মদীনায় হিজরত এমন একটি ঘটনা, যার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বন্ধু ও শত্রুদের মধ্যে পার্থক্য করেছেন এবং তাঁর একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেছেন। এর মাধ্যমেই তাঁর দ্বীনকে সম্মানিত করেছেন এবং তাঁর রসূলকে সাহায্য করেছেন।
ইমাম যুহরী বলেন- মুহাম্মাদ বিন সালেহ আসেম বিন উমার ও ইয়াযিদ বিন রুমান এবং অন্যান্য রাবীর মাধ্যমে আমাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, রসূল মক্কাতে নবুওয়াতের প্রথম তিন বছর গোপনে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন। চতুর্থ বছর প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর থেকে দশ বছর পর্যন্ত মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেছেন। প্রতি বছর হজ্জের মৌসুমে হাজীদের তাঁবুতে গমণ করতেন। এমনি উকায, মাজিন্নাহ এবং যুল মাজাযের বাজারে ও বিভিন্ন মেলার মৌসুমেও লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং তাঁকে হেফাজত করার আবেদন করতেন। যাতে তিনি আল্লাহর পয়গাম নির্ভিগ্নে পৌঁছাতে পারেন। এর বিনিময়ে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। কিন্তু তিনি কোন সাহায্যকারী ও সাড়াদানকারী পেলেন না। পরিশেষে তিনি প্রত্যেক কবীলার (গোত্রের) কাছে এবং তাদের বাসস্থানে যেতে লাগলেন। তিনি বলতেন- হে লোক সকল! তোমরা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ বল। তাহলেই তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারবে এবং এর মাধ্যমে তোমরা আরবদের শাসক হতে পারবে। অনারবরা তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে। আর মৃত্যুর পর তোমরা জান্নাতে রাজকীয় জীবন যাপন করতে পারবে। আবু লাহাব তাঁর পিছনে পিছনে চলত এবং লোকদেরকে বলতঃ তোমরা এর অনুসরণ করোনা। সে বেদ্বীন ও মিথ্যুক। ফলে লোকেরা মুহাম্মাদ এর কথা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করত এবং তাঁকে কষ্ট দিত। লোকেরা বলতঃ তোমার গোত্রের লোকেরাই তোমার সম্পর্কে অধিক অবগত। তারা তো তোমার অনুসরণ করেনি। তারপরও তিনি দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতেন এবং বলতেন- হে আল্লাহ্! তুমি চাইলে এরূপ হতনা।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 আকাবার প্রথম বায়আত

📄 আকাবার প্রথম বায়আত


অতঃপর নাবী হজ্জের মৌসুমে মিনার 'আকাবায়' (গিরি পথে) মদীনার আনসার গোত্রের ছয় জন লোকের সাথে মিলিত হলেন। তাদের সকলেই ছিলেন খাযরাজ গোত্রের। তারা হচ্ছেন আসআদ বিন যুরারা, জাবের বিন আব্দুল্লাহ্, আওফ বিন হারিছ, রাফে বিন মালিক, কুতবা বিন আমের এবং উকবা বিন আমের। তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা ইসলাম কবুল করল। অতঃপর মদীনায় ফেরত গিয়ে তারাও ইসলামের দাওয়াত দেয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করল। মদীনায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়ল এবং প্রতিটি ঘরেই ইসলাম প্রবেশ করল। পরের বছর মদীনা থেকে ১২ জন লোক আসল। জাবের ব্যতীত আগের বছরের সকলেই এই দলের অন্তর্ভূক্ত ছিল।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 আকাবার দ্বিতীয় বায়আত

📄 আকাবার দ্বিতীয় বায়আত


এই বৎসর হজ্জের মৌসুমে মুসলিম অমুসলিম মিলে মদীনার আনসারদের থেকে প্রচুর সংখ্যক লোক মক্কায় আগমণ করল। তারা রাতের অন্ধকারে পূর্ব নির্ধারিত সময় মোতাবেক রসূল এর সাথে গোপনে মিলিত হলেন। তারা সংখ্যায় ছিলেন ৭৩ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা। এবার আকাবার (দ্বিতীয়) বায়আত সংঘটিত হল। বারা বিন মা'রুর সর্বপ্রথম বায়আত করলেন। সেই রাত্রে নাবী তাদের থেকে ১২ জন নকীব (অধিনায়ক) নিযুক্ত করলেন। বায়আত শেষে তারা তলোয়ার হাতে নিয়ে মিনায় বসবাসকারী মুশরিকদের উপর হামলা করার জন্য রসূল এর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করল। কিন্তু তিনি তাদেরকে সেই অনুমতি দেননি।

ফন্ট সাইজ
15px
17px