📄 তাওয়াফে ইফাযাহ (হজ্জের তাওয়াফ)
অতঃপর নাবী আরোহী অবস্থায় যোহরের পূর্বে মক্কায় ফেরত আসলেন এবং তাওয়াফে ইফাযাহ (হজ্জের তাওয়াফ) করলেন। এটিই হচ্ছে তাওয়াফে যিয়ারত। এ ছাড়া তিনি আর কোন তাওয়াফ করেন নি। এর সাথে তিনি সাঈ করেন নি। ১৩৬ এটিই হচ্ছে সঠিক কথা। এতে এবং বিদায়ী তাওয়াফেও তিনি রমল করেন নি। তিনি শুধু তাওয়াফে কুদুমে রমল করেছেন।
অতঃপর তিনি যমযমের কাছে আসলেন। সেখানে লোকেরা পানি পান করছিল। তিনি বললেন— যদি এই আশঙ্কা না থাকত যে লোকেরা তোমাদেরকে পরাস্ত করে ফেলবে, তাহলে আমি নিজে নেমেও তোমাদের সাথে লোকদেরকে পানি পান করাতাম। লোকেরা তাঁকে পানির বালতি দিল। তিনি দাঁড়িয়ে তা থেকে পান করলেন। এই হাদীস দ্বারা কতক আলেম দলীল দিয়ে বলে থাকেন যে, বিনা প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পান করা নিষিদ্ধ। তবে প্রয়োজন বশতঃ দাঁড়িয়ে পান করা জায়েয আছে। এটিই অধিক সুস্পষ্ট ও সঠিক মত। সহীহ বুখারীতে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত আছে যে, বিদায় হজ্জের বছর উটের উপর আরোহন করে নাবী কাবা ঘরের তাওয়াফ করেছেন। এ সময় লাঠি দিয়ে তিনি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতেন। ঐ হাদীছে এও রয়েছে যে, লোকেরা যাতে তাঁকে দেখতে পারে এবং মাসআলা জিজ্ঞেস করতে পারে সেই জন্যই তিনি আরোহন করে ছিলেন। কারণ লোকেরা তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। এটি বিদায়ী তাওয়াফের ঘটনা ছিলনা। কারণ তিনি রাত্রে এ তাওয়াফ করেছেন। এটি তাওয়াফে কুদুমও ছিলনা। কারণ তাওয়াফে কুদুমে তিনি রমল করেছেন। আর এ কথা কেউ বলেন নি যে, উটের উপর আরোহন করে তিনি রমল করেছেন। অতঃপর তাওয়াফ শেষে তিনি মিনায় ফিরে গেলেন।
তিনি যোহরের সলাত কোথায় পড়েছেন? মক্কায়? না মিনায়? এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আয়িশা ও সেই দিন মাত্র একটি তাওয়াফ এবং মাত্র একটি সাঈ করেছেন। তাঁর হাজ্জ এবং উমরাহর জন্য একটি তাওয়াফ ও একটি সাঈ যথেষ্ট ছিল। সেই দিন সাফিয়াও তাওয়াফ করেছিলেন। তাওয়াফ শেষে তাঁর ঋতুস্রাব শুরু হয়ে গেল। এই তাওয়াফই তাঁর বিদায়ী তাওয়াফের জন্য যথেষ্ট ছিল। সুতরাং তারা আলাদাভাবে বিদায়ী তাওয়াফ করার সুযোগ পেলেন না। এর ফলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল যে, কোন মহিলা যদি তাওয়াফে কুদুমের পূর্বে ঋতুবতী হয়ে যায়, তাহলে সে হজ্জে কিরান করবে। তার জন্য মাত্র একটি তাওয়াফ ও মাত্র একটি সাঈ যথেষ্ট। আর যদি তাওয়াফে ইফাযার পরে ঋতুবতী হয়ে যায়, তাহলে তার বিদায়ী তাওয়াফ করার প্রয়োজন নেই।
টিকাঃ
১৩৬. এ থেকেই দলীল নেয়া হয় যে, কেরান ও ইফরাদ হজ্জকারীর একটি সাঈ যথেষ্ট। চাই তাওয়াফে ইফাযার পূর্বে করা হউক বা পরে। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওয়াফে কুদুমের সাথে তা করেছিলেন এবং সেটাকেই যথেষ্ট মনে করেছিলেন।
📄 ১১, ১২ এবং ১৩ তারিখে জামারায় পাথর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে নবী (সাঃ) এর পবিত্র সুন্নাত
অতঃপর তিনি সে দিনই মিনায় ফেরত গিয়ে তথায় রাত্রি যাপন করলেন। পরের দিন সকাল হলে তিনি সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলেন। সূর্য ঢলে যাওয়ার সাথে সাথে তিনি জামারাতের দিকে হেটে গেলেন। এই সময় তিনি বাহনে আরোহন করেন নি। প্রথমে তিনি মাসজিদে খাইফের নিকটবর্তী জামারায়ে উলার (প্রথম জামারাতের) কাছে গেলেন এবং তাতে পরপর সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন। প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের সময় তিনি আল্লাহু আকবার বললেন। সাতটি পাথর নিক্ষেপ শেষে তিনি জামারাকে পিছনে রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন এবং কিবলামুখী হয়ে দু'আ শুরু করলেন। এই দু'আয় তিনি তাঁর উভয় হাত উঠালেন। তারপর তিনি জামারায়ে উসতায় (মধ্যম জামারায়) আসলেন এবং তাতেও প্রথমটির ন্যায়ই সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন।
এখানে পাথর নিক্ষেপ করার পর তিনি বাম দিকে সরে আসলেন এবং কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে উভয় হাত তুলে প্রথম বারের ন্যায়ই দু'আ করলেন। অতঃপর তিনি জামারায়ে কুবরায় (বড় জামাড়ায়) গেলেন এবং উপত্যকার মাঝখানে দাঁড়ালেন। এ সময় তিনি কাবাকে বামে রেখে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন। পাথর মারা শেষে তিনি সেখানে অবস্থান না করে সরসূরি পিছনে ফিরে আসলেন। সলাত শেষে দু'আ করার ব্যাপারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি।
টিকাঃ
১৩৭. বর্তমান সময়ে পাক, ভারত, বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বিরাট একটি অংশের মুসলিমগণ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সলাতের পরই হাত তুলে দলবদ্ধভাবে দুআ করে থাকে। এই ভাবে দুআ করার কথা কোন সহীহ হাদীছে বর্ণিত হয় নি। এটি সুন্নাত বা মুস্তাহাব নয়; বরং এটি সুস্পষ্ট বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।
📄 বিদায় হজ্জের বছর দু‘আ করার জন্য নবী (সাঃ) কোথায় কোথায় অবস্থান করেছেন?
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন- নাবী বিদায় হজ্জের বছর দু'আ করার জন্য ছয়টি স্থানে অবস্থান করেছেন। (১) 'সাফা'এর উপর (২) মারওয়ার উপর (৩) আরাফায় (৪) মুযদালিফায় (৫) জামারায়ে উলায় (ছোট জামারায়) এবং (৬) জামারায়ে উসতায় (মধ্যম জামারায়)।
📄 হাজীদের সেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে কিংবা অন্য কোন শরঈ ওযর থাকলে মিনায় রাত্রি যাপন করা জরুরী নয়
আব্বাস হাজীদেরকে পানি পান করানোর জন্য মিনার রাতসমূহ মক্কায় কাটানোর অনুমতি চাইলে তিনি তাঁকে অনুমতি দিয়েছেন। উটের রাখালগণ মিনার বাইরে উটের নিকট রাত্রি যাপনের অনুমতি চাইলে তিনি তাদেরকেও অনুমতি দিয়েছেন। তিনি তাদেরকে কুরবানীর দিন এবং বাকী দুই দিনের পাথর এক সাথে দুই দিনের যে কোন এক দিন মারার অনুমতি দিয়েছেন।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন- কেউ যদি তার সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে কিংবা অসুস্থ ব্যক্তির সেবায় নিয়োজিত থাকে অথবা নিজে অসুস্থ থাকার কারণে মিনায় রাত্রি যাপন করা অসম্ভব হয়, তাহলে রাখাল ও পানি সরবরাহ কারীদের ব্যাপারে বর্ণিত হাদীছের উপর ভিত্তি করে উপরোক্ত লোকদের জন্যও মিনায় রাত্রি যাপন করা জরুরী নয়।