📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 ভাগে কুরবানী করা

📄 ভাগে কুরবানী করা


কয়জনের পক্ষ হতে একটি গরু অথবা একটি উট কুরবানী করা জায়েয হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাফেঈ এবং ইমাম আহমাদ এর প্রসিদ্ধ মতে সাত জনের পক্ষ হতে একটি গরু অথবা একটি উট কুরবানী করা জায়েয আছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন— দশ জনের পক্ষ হতে তা জায়েয আছে। এটি হচ্ছে ইসহাক-এর মত। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এ ব্যাপারে বিভিন্ন হাদীস উল্লেখ করার পর বলেন— উক্ত হাদীসগুলোকে তিন পদ্ধতির যে কোন একটি পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। (১) উট ও গরু সাত জনের পক্ষ হতে কুরবানী করার হাদীসগুলো অধিক সংখ্যক রাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং সেগুলো অধিক বিশুদ্ধ। (২) এও বলা যেতে পারে যে, গণীমতের মাল বন্টনের সময় এক উটকে তিনি দশটি ছাগলের সমান করেছেন। যাতে সুষ্ঠুভাবে তা বণ্টন করা যায় এবং তাতে কোন অসুবিধা না হয়। আর কুরবানীতে সাত জনের পক্ষ হতে একটি উট বা একটি গরু করার বিধান হচ্ছে শরীয়তের একটি বিশেষ নির্ধারণ। (৩) কোন বর্ণনায় সাত জনের পক্ষ হতে আবার কোন বর্ণনায় দশজনের পক্ষ হতে একটি উট কুরবানী করার বা একটি উটকে সাতটি বা দশটি বকরীর সমান করা স্থান, কাল ও উটের বিভিন্নতার কারণে হয়েছে। সুতরাং কোন নির্দিষ্ট সময় ও বিশেষ স্থানে উট বড় হওয়ার কারণে এবং ছাগল ছোট হওয়ার কারণে একটি উটকে দশটি ছাগলের সমান করেছেন এবং দশজনের পক্ষ হতে তা কুরবানী করার কথা বলেছেন। ১৩৪

তিনি মিনায় মানহারে (কুরবানীর স্থানে) কুরবানীর পশু যবেহ করেছেন এবং মুসলিমদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, মিনার সকল স্থানই মানহার (যবেহ করার স্থান) মক্কার গলিসমূহ মানুষের চলার রাস্তা এবং কুরবানী করার জায়গা। ১৩৫ এতে দলীল রয়েছে যে, হাজীদের কুরবানীর পশু যবেহ করার স্থান শুধু মিনা নয়; বরং মক্কার যে কোন স্থানে যবেহ করলেই চলবে। কারণ নাবী বলেছেন— আমি এখানে অবস্থান করেছি। তবে আরাফার সকল স্থানই উকুফের (অবস্থানের) জায়গা। নাবী এর কাছে মিনাতে সূর্যের তাপ থেকে বাঁচার জন্য একটি তাঁবু স্থাপন করার অনুমতি প্রার্থনা করা হলে তিনি অনুমতি দেন নি। বরং তিনি বললেন— মিনার যে স্থানে যে ব্যক্তি আগে পৌঁছবে সে ব্যক্তিই উক্ত স্থানের বেশী হকদার। মিনায় সকল মুসলিমের অংশীদারিত্ব রয়েছে। আর যে ব্যক্তি মিনার কোন স্থানে অন্য ব্যক্তির পূর্বেই পৌঁছে যাবে সেই সে স্থানে অবস্থানের অধিক হকদার, যতক্ষণ না সে তা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। তবে সে আগে অবস্থান নেওয়ার কারণে সেই স্থানের মালিক হয়ে যাবেনা।

তিনি যখন কুরবানী পূর্ণ করলেন তখন তিনি নাপিত ডেকে মাথা কামালেন এবং বললেন— হে মা'মার! তোমার হাতে রয়েছে খুর। আল্লাহর রসূল তোমার কাছে স্বীয় কানের লতি সোপর্দ করে দিচ্ছেন। তখন সে বলল— হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম! এটি হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ হতে আমার উপর বিশেষ একটি নেয়ামত ও রহমত। নাবী বললেন— হ্যাঁ, তাই। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল এটি বর্ণনা করেছেন। নাবী তখন বললেন— তাহলে শুরু কর। এই বলে তিনি মাথার ডান দিকের প্রতি ইঙ্গিত করলেন। মাথার ডান দিক কামানো হলে তিনি চুলগুলো নিকটস্থ লোকদের মধ্যে বিতরণ করে দিলেন। অতঃপর তিনি নাপিতকে বাম দিকের প্রতি ইঙ্গিত করলে সে মাথার বাম দিকও কামিয়ে ফেলল। এ সময় তিনি বললেন— এখানে আবু তালহা আছে কি? অতঃপর তিনি বাম দিকের চুল আবু তালহাকে দিয়ে দিলেন।

এরপর তিনি মাথা মুন্ডকারীদের জন্য তিনবার এবং চুল ছোটকারীদের জন্য মাত্র একবার মাগফিরাতের দু'আ করলেন। এ থেকে প্রমাণিত হল মাথা মুন্ডানো মূলত একটি ইবাদত; ইহরাম অবস্থায় যা নিষিদ্ধ ছিল তা থেকে মুক্ত হওয়ার মাধ্যম নয়।

টিকাঃ
১৩৪. আর গরুতে কোন অবস্থাতেই সাত পরিবারের সাত জনের বেশী অংশ গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই। কোন কোন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, নাবী নয়জন স্ত্রীর পক্ষ হতে মাত্র একটি গরু কুরবানী করেছেন। আবার কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তিনি সেদিন তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ হতে গরু কুরবানী দিয়েছেন। এই বর্ণনা থেকে প্রত্যেক স্ত্রীর পক্ষ হতে একটি করে গরু কুরবানী দেয়ার কথা সহজেই অনুমেয়। কারণ এখানে সাধারণভাবে গরু শব্দটি উল্লেখ আছে। সংখ্যা উল্লেখ নেই। অথবা বলা যেতে পারে যে, তিনি তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের সাতজনের পক্ষ হতে একটি গরু কুরবানী দিয়েছেন। বাকী দুই জনের ব্যাপারে অন্য কিছু হয়েছিল। অথবা বাকী দুইজন বিভিন্ন প্রকার হজ্জ থেকে এমন হজ্জ করেছেন, যাতে আদৌ কুরবানী ওয়াজিব ছিল না। আল্লাহই ভাল জানেন।
১৩৫. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়ঃ আরাফাতের সব জায়গাই হাজীদের উকুফ (অবস্থান) করার স্থান।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 তাওয়াফে ইফাযাহ (হজ্জের তাওয়াফ)

📄 তাওয়াফে ইফাযাহ (হজ্জের তাওয়াফ)


অতঃপর নাবী আরোহী অবস্থায় যোহরের পূর্বে মক্কায় ফেরত আসলেন এবং তাওয়াফে ইফাযাহ (হজ্জের তাওয়াফ) করলেন। এটিই হচ্ছে তাওয়াফে যিয়ারত। এ ছাড়া তিনি আর কোন তাওয়াফ করেন নি। এর সাথে তিনি সাঈ করেন নি। ১৩৬ এটিই হচ্ছে সঠিক কথা। এতে এবং বিদায়ী তাওয়াফেও তিনি রমল করেন নি। তিনি শুধু তাওয়াফে কুদুমে রমল করেছেন।

অতঃপর তিনি যমযমের কাছে আসলেন। সেখানে লোকেরা পানি পান করছিল। তিনি বললেন— যদি এই আশঙ্কা না থাকত যে লোকেরা তোমাদেরকে পরাস্ত করে ফেলবে, তাহলে আমি নিজে নেমেও তোমাদের সাথে লোকদেরকে পানি পান করাতাম। লোকেরা তাঁকে পানির বালতি দিল। তিনি দাঁড়িয়ে তা থেকে পান করলেন। এই হাদীস দ্বারা কতক আলেম দলীল দিয়ে বলে থাকেন যে, বিনা প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পান করা নিষিদ্ধ। তবে প্রয়োজন বশতঃ দাঁড়িয়ে পান করা জায়েয আছে। এটিই অধিক সুস্পষ্ট ও সঠিক মত। সহীহ বুখারীতে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত আছে যে, বিদায় হজ্জের বছর উটের উপর আরোহন করে নাবী কাবা ঘরের তাওয়াফ করেছেন। এ সময় লাঠি দিয়ে তিনি হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতেন। ঐ হাদীছে এও রয়েছে যে, লোকেরা যাতে তাঁকে দেখতে পারে এবং মাসআলা জিজ্ঞেস করতে পারে সেই জন্যই তিনি আরোহন করে ছিলেন। কারণ লোকেরা তাঁকে ঘিরে রেখেছিল। এটি বিদায়ী তাওয়াফের ঘটনা ছিলনা। কারণ তিনি রাত্রে এ তাওয়াফ করেছেন। এটি তাওয়াফে কুদুমও ছিলনা। কারণ তাওয়াফে কুদুমে তিনি রমল করেছেন। আর এ কথা কেউ বলেন নি যে, উটের উপর আরোহন করে তিনি রমল করেছেন। অতঃপর তাওয়াফ শেষে তিনি মিনায় ফিরে গেলেন।

তিনি যোহরের সলাত কোথায় পড়েছেন? মক্কায়? না মিনায়? এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আয়িশা ও সেই দিন মাত্র একটি তাওয়াফ এবং মাত্র একটি সাঈ করেছেন। তাঁর হাজ্জ এবং উমরাহর জন্য একটি তাওয়াফ ও একটি সাঈ যথেষ্ট ছিল। সেই দিন সাফিয়াও তাওয়াফ করেছিলেন। তাওয়াফ শেষে তাঁর ঋতুস্রাব শুরু হয়ে গেল। এই তাওয়াফই তাঁর বিদায়ী তাওয়াফের জন্য যথেষ্ট ছিল। সুতরাং তারা আলাদাভাবে বিদায়ী তাওয়াফ করার সুযোগ পেলেন না। এর ফলে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল যে, কোন মহিলা যদি তাওয়াফে কুদুমের পূর্বে ঋতুবতী হয়ে যায়, তাহলে সে হজ্জে কিরান করবে। তার জন্য মাত্র একটি তাওয়াফ ও মাত্র একটি সাঈ যথেষ্ট। আর যদি তাওয়াফে ইফাযার পরে ঋতুবতী হয়ে যায়, তাহলে তার বিদায়ী তাওয়াফ করার প্রয়োজন নেই।

টিকাঃ
১৩৬. এ থেকেই দলীল নেয়া হয় যে, কেরান ও ইফরাদ হজ্জকারীর একটি সাঈ যথেষ্ট। চাই তাওয়াফে ইফাযার পূর্বে করা হউক বা পরে। কেননা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওয়াফে কুদুমের সাথে তা করেছিলেন এবং সেটাকেই যথেষ্ট মনে করেছিলেন।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 ১১, ১২ এবং ১৩ তারিখে জামারায় পাথর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে নবী (সাঃ) এর পবিত্র সুন্নাত

📄 ১১, ১২ এবং ১৩ তারিখে জামারায় পাথর নিক্ষেপের ক্ষেত্রে নবী (সাঃ) এর পবিত্র সুন্নাত


অতঃপর তিনি সে দিনই মিনায় ফেরত গিয়ে তথায় রাত্রি যাপন করলেন। পরের দিন সকাল হলে তিনি সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলেন। সূর্য ঢলে যাওয়ার সাথে সাথে তিনি জামারাতের দিকে হেটে গেলেন। এই সময় তিনি বাহনে আরোহন করেন নি। প্রথমে তিনি মাসজিদে খাইফের নিকটবর্তী জামারায়ে উলার (প্রথম জামারাতের) কাছে গেলেন এবং তাতে পরপর সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন। প্রতিটি পাথর নিক্ষেপের সময় তিনি আল্লাহু আকবার বললেন। সাতটি পাথর নিক্ষেপ শেষে তিনি জামারাকে পিছনে রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হলেন এবং কিবলামুখী হয়ে দু'আ শুরু করলেন। এই দু'আয় তিনি তাঁর উভয় হাত উঠালেন। তারপর তিনি জামারায়ে উসতায় (মধ্যম জামারায়) আসলেন এবং তাতেও প্রথমটির ন্যায়ই সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন।
এখানে পাথর নিক্ষেপ করার পর তিনি বাম দিকে সরে আসলেন এবং কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে উভয় হাত তুলে প্রথম বারের ন্যায়ই দু'আ করলেন। অতঃপর তিনি জামারায়ে কুবরায় (বড় জামাড়ায়) গেলেন এবং উপত্যকার মাঝখানে দাঁড়ালেন। এ সময় তিনি কাবাকে বামে রেখে সাতটি পাথর নিক্ষেপ করলেন। পাথর মারা শেষে তিনি সেখানে অবস্থান না করে সরসূরি পিছনে ফিরে আসলেন। সলাত শেষে দু'আ করার ব্যাপারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়নি।

টিকাঃ
১৩৭. বর্তমান সময়ে পাক, ভারত, বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বিরাট একটি অংশের মুসলিমগণ পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সলাতের পরই হাত তুলে দলবদ্ধভাবে দুআ করে থাকে। এই ভাবে দুআ করার কথা কোন সহীহ হাদীছে বর্ণিত হয় নি। এটি সুন্নাত বা মুস্তাহাব নয়; বরং এটি সুস্পষ্ট বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

📘 মুখতাসার যাদুল মায়াদ 📄 বিদায় হজ্জের বছর দু‘আ করার জন্য নবী (সাঃ) কোথায় কোথায় অবস্থান করেছেন?

📄 বিদায় হজ্জের বছর দু‘আ করার জন্য নবী (সাঃ) কোথায় কোথায় অবস্থান করেছেন?


আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম বলেন- নাবী বিদায় হজ্জের বছর দু'আ করার জন্য ছয়টি স্থানে অবস্থান করেছেন। (১) 'সাফা'এর উপর (২) মারওয়ার উপর (৩) আরাফায় (৪) মুযদালিফায় (৫) জামারায়ে উলায় (ছোট জামারায়) এবং (৬) জামারায়ে উসতায় (মধ্যম জামারায়)।

ফন্ট সাইজ
15px
17px