📄 হতে হবে বজ্রসম
বর্তমানে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরিই ইসলামের বিপরীত। কেউ দ্বীনি লেবাস আপন করে নিলেই তাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে সমাজ। দ্বীন যেন কেবল মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কিংবা ৭০ বছরের বুড়ো-বুড়িদের জন্যই! জেনারেল পড়ুয়া কোনো যুবক দাড়ি রাখলে, টাখনুর ওপর পাজামা পরলে বা কোনো যুবতি হঠাৎ নিকাব-হাত-পা মোজা পরিধান করা শুরু করলেই ব্যস! অকাজের মানুষগুলোর গোবর-মগজে উঁকি দিতে থাকবে হাজারো প্রশ্ন। দ্বীনের এই লেবাসকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হয় অনেক কষ্ট করে। দ্বীনি ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে সাধারণ ইসলামিক বইটা পর্যন্ত ঘরে রাখা কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে। এমনই এক বিষময় সমাজে আমরা টিকে আছি আল্লাহর ইচ্ছায়। অনেকেই হেনস্তার শিকার হয় অকারণে, বিনা দোষে। এই হেনস্তার হার অবশ্য নারীদের তুলনায় পুরুষদের বেশি। বিশ্বব্যাপি প্রতিনিয়ত গুম হচ্ছে, কারাগারে বন্দি হচ্ছে ইসলামের পথে একনিষ্ঠ ঝান্ডাবাহী আলিম ও দ্বীন মেনে চলা সাধারণ মানুষগণ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটও অভিন্ন। হক কথা বলতে মানা এই সমাজে। তবু এত বাধা-বিঘ্নের পরও বীরের বেশে দ্বীনকে টিকিয়ে রাখতে নিজের বুকের তাঁজা রক্ত উৎসর্গ করার মানসিকতা রাখেন অনেকেই।
বর্তমান প্রেক্ষিতে মুসলিমরা শোষিত, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত। এমতাবস্থায় উম্মাহর জন্য উমার বিন খাত্তাব, খালিদ বিন ওয়ালিদের মতো মানুষ প্রয়োজন। প্রয়োজন সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর মতো লড়াকু পুরুষ। তাহলেই তো এই উম্মাহ আবার মাথা চাড়া দিয়ে জাগবে। তাহলেই সম্ভব হবে সমস্ত কুফরের মস্তকে বাঁকা তলোয়ারের আঘাত হানা। তার অর্থ কি এই দাঁড়াচ্ছে যে, উম্মাহর জেগে ওঠার পিছনে কেবল পুরুষেরা বাহবার অধিকারী? না, এর পিছনে নারীদের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর তা হচ্ছে নিজেদের পুরুষদেরকে প্রেষণাদান। সমাজ কখনই মুসলিমদের জন্য অনুকূল ছিল না। ভবিষ্যতেও কখনো মুসলিমদের জীবনে শান্তি নেমে আসবে না যদি না আমরা আমাদের কর্মপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাই। তাই নিজে দ্বীনের আহকামসমূহ পালনের পাশাপাশি অন্যদেরকে দ্বীনের দা'ওয়াহ দিতে হবে, অন্যদেরকে মন্দ কাজ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। হক্ক কথার প্রচার-প্রসার করতে হবে। এতে বিপদ আসবে জীবনে অন্ধকার ছায়ার মতো। কত নারী-পুরুষ কারাগারের নির্মম প্রকোষ্টে নিষ্পেষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত, কেবল রবের ওপর পরিপূর্ণ ঈমান আনার কারণে। তাই বলে কি দ্বীন ছেড়ে দেবে? তা কি সম্ভব?
একজন দ্বীনদার পুরুষ যখন কারা-জীবন আলিঙ্গন করে নেয় তখন তার মা-স্ত্রীর ওপর দিয়ে কি ঝড় প্রবাহিত হয় তা কেবল মা'বুদ আর তাঁর সেই বান্দাগণই জানেন। একজন দ্বীনদার নারী কারাগারে কতটা কুরবানি দিয়ে যান, রবের সামনে দাড়িয়ে তার মধ্যরাতের অশ্রুই সেটা বলে দিতে পারে। রব যদি বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলে আর এমন যদি হয়েই যায়, অবশ্যই সবর করতে হবে, আর সত্যিকার অর্থেই নারীদেরকে সবর শেখানোর কিছুই নেই, এটা তো তাদের সহজাত। ঈমানের ওপর মজবুত থাকা কাম্য, কারাগার মন্দ কিছু না যদি সেটা হয় দ্বীনের জন্য। আমাদের পূর্বসূরিদেরকে দেখলেই আমরা সেটা আঁচ করতে পারি। নিশ্চয় সবরের পর সুমিষ্ট কিছুই অপেক্ষা করছে। প্রিয়, জান্নাতে জান্নাতি পরিবারদেরকে কেউই আলাদা করতে পারবে না, সেখানে তো কারাগার বলে কিছু নেই...
আল্লাহ-এর বিধানকে সমুন্নত রাখতে, মুসলিম ভাই-বোনদের রক্তের হেফাজত করতে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল-কে যারা অপমান করবে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য একজন মুসলিম পুরুষ সর্বদা প্রস্তুত থাকবে এটাই মুসলিমের ফিতরাহ হওয়া চাই। আর শরী'আতের দিক থেকে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তা অনেক সময় ফরযের পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় রবের আহ্বানে বান্দার সাড়া দেওয়ার মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে তার নিজের চক্ষুশীতলকারী স্ত্রীটি, যাকে সে তার জীবনের চেয়ে অধিক ভালোবাসে, যেই স্ত্রীর প্রতি তার মুহাব্বাত শৃঙ্গসম। পদস্খলনের জন্য স্ত্রীর একটি বাক্য; 'যেয়ো না'-ই যথেষ্ট।
কিন্তু মুসলিমাহ নারীদের উচিত নিজের আবেগের ওপর আল্লাহর ইচ্ছা ও উম্মাহর খইরকে প্রাধান্য দেওয়া। এটাই তো বিশ্বাসের দাবি, বিশ্বাসীদের সিফাত। তাই স্বামীকে সর্বদা আশ্বাস দিয়ে যেতে হবে, সময় যখন আসবে তখন সে যাতে উম্মাহর সিংহ হয়ে লড়ে যেতে পারে, যাতে রক্ত বিসর্জন দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ না করে। এই দুনিয়ার কিই বা দাম? জান্নাত তো তাদের জন্য অপেক্ষমাণ যারা আল্লাহর সন্তুটির জন্য দুনিয়াবি সুখকে পা দিয়ে ঠেলে দিয়েছে।
📄 সন্তানকে বীর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে
আমরা সালাফদের জীবনী পড়েছি। টুকরো টুকরো অনেক গল্পের মাধ্যমে জেনেছি যে, তাদের বড় করে তোলার পিছনে কেমন ছিল তাদের মায়েদের অবদান। তাদেরকে বীরের সজ্জায় কীভাবে সাজিয়েছেন তাদের মায়েরা। আমাদের সমাজে আজ এমন নারীর খুব প্রয়োজন যাদের জঠোরে সালাহউদ্দীনের মতো বীরেরা জন্মাবে। যারা মানসিকতা রাখবে অধিক সন্তান প্রসবের মাধ্যমে উম্মাহর সংখ্যাধিক্য ঘটানোর। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগ থেকেই মা চিন্তিত থাকবে কীভাবে সন্তানকে আসন্ন ফিতনার টর্নেডো থেকে রক্ষা করা যায়। কীভাবে তাকে এই সমাজের আবর্জনাগুলো দূর করার জন্য গড়ে তোলা যায়। কীভাবে সন্তানের বুকে যোদ্ধার বর্ম জড়িয়ে দেওয়া যায়। মায়েদের মন-মগজে যেন একটা বিষয়ই ঘুর-পাক খেতে থাকে— ছোট্ট শিশুটা, মায়ের তর্জনী ধরে দাঁড়ায়, আঙুল ছেড়ে দিলে ভূলণ্ঠিত হয়, এভাবেই একদিন সন্তান শিখবে, শিখতে শিখতে একদিন সে আল্লাহর সৈনিক হয়ে তলোয়ার হাতে নেবে। সন্তানেরা শৌর্যে-বীর্যে বলবান হয়ে উঠবে মায়েরই কোমল আঁচলতলে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি আসন্ন। দিন যত গড়াচ্ছে পরিস্থিতি ততই আঁধার রাত্রির ঘুটঘুটে অন্ধকারে পরিণত হচ্ছে। সেই নিদান অন্ধকারে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে মশাল ধরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব মায়েদেরই। এজন্য প্রয়োজন সন্তানের জন্মের পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি, প্রয়োজন সন্তানের সঠিক তারবিয়াত।
📄 সন্তানের তারবিয়াত
একটা সময় নারীর সমস্ত স্বপ্ন জন্ম নেয় তার স্বামীকে ঘিরে। নানান বাধা-বিপত্তি পার হয়ে সে অবশেষে তার স্বামীকে খুঁজে পায়। এরপরেই নারীর জীবনের আরেকটি মোড় এসে হাজির হয়। যেখানে সে রাজকুমারী থেকে পরিণত হয় রানিতে। নানান দায়িত্ব চলে আসে তার কাঁধে। কারণ সে তখন রাব্বিয়াতুল বাইত। একটা সময় তার জীবনে নতুন আরেক স্বপ্নের সংযোজন ঘটে। অন্তরে তখন মা হওয়ার তাড়না জাগে। ছোট্ট কোনো শিশু নজরে আসলেই তার স্বপ্নগুলো আরো প্রকট হয়ে কাছে এসে হাতছানি দিতে থাকে। আর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের নিমিত্তেই তার জন্য শুরু হয় আরেক নতুন প্রস্তুতি। তবে সন্তানের তারবিয়াত বা প্যারেন্টিং এর শুরুটা সন্তান জন্মেরও অনেক আগে থেকেই শুরু করা উচিত।
• সন্তানের বাবা নির্বাচন- সন্তানের তারবিয়াতের প্রস্তুতির শুরুটা হওয়া উচিত বিয়ের আগ থেকেই। কারণ বিয়ের মাধ্যমে নারীরা পরোক্ষভাবে তাদের আসন্ন সন্তানের বাবাকেই নির্বাচন করে। সেক্ষেত্রে সন্তানের বাবা নির্বাচনের বেলায় তাঁর দ্বীনদারিতার পাশাপাশি পিতা হিসেবে অন্যান্য বিষয়গুলোও মাথায় রাখা যেতে পারে। অর্থাৎ সন্তানের বাবার বিবেক-বুদ্ধি, মহানুভবতা, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, শক্তি-সামর্থ্য, শারীরিক গঠন, বিচক্ষণতা ইত্যাদি। আল্লাহর রাসূল বলেন, (দেহমনে) সবল মু'মিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মু'মিন অপেক্ষা বেশি প্রিয়। [৭]
• মায়ের মা হওয়ার আগের প্রস্তুতি- বিয়ের পরে প্রত্যেকটা নারীর অন্তরে শিশুদের প্রতি এক পরম আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এ আগ্রহ থেকেই তারা অতি দ্রুতই তাদের মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সময়টাতে একজন নারীর অনেক পড়াশোনা করা উচিত সন্তানের তারবিয়াত নিয়ে। সেই সাথে নিজে নিজে আগে ভাগেই জল্পনা- কল্পনা করে রাখা উচিত যে আদরের সন্তানকে ইসলামের ছাঁচে গড়ে তুলতে ভবিষ্যতে সে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এতে সামনে পথচলা সহজ হবে। তাই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই তাকে নিয়ে চিন্তা করার জন্য সময় নেওয়া উচিত।
• তারবিয়াতে অপরিপক্কতা- সন্তানের সঠিক তারবিয়াত মহৎ এবং বৃহৎ একটা বিষয়। তাই হুট করেই সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে আসাটা বোকামি। এই সিদ্ধান্তে পৌছাবার আগে মা বাবাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে এ বিষয়ে। সন্তানের সাইকোলোজি, ইসলামী আলোকে মা-বাবার দায়িত্ব প্রতিটা বিষয় তাকে বুঝে নিতে হবে। এ ছাড়াও দ্বীনদার নারী এবং পুরুষেরা সাধারণত অল্প বয়সে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। এর ফলে অনেকের মাঝে সাংসারিক বিষয়ে বেশ অপরিপক্কতা রয়েই যায়। মা-বাবা বুঝতেই পারে না সন্তান প্রতিপালনে কে-কীভাবে-কী দায়িত্ব পালন করবে। একদিকে বাবা বুঝতে পারে না বাচ্চার মায়ের এখন কী প্রয়োজন, অপরদিকে মা ভুগতে থাকে এই কষ্টে যে, তার স্বামী কেন তাকে বুঝে না। তাই সন্তান নেওয়ার পূর্বে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে পারস্পরিক সমঝোতারও প্রয়োজন রয়েছে। সন্তান হওয়ার পর উভয়ের করণীয়, সন্তানের স্বাস্থ্যের বিষয়ে আগে থেকেই আলোচনা করে একে অপরকে বুঝিয়ে দেওয়া, তারবিয়াতের জন্য পরিকল্পিত পদক্ষেপগুলো একে অপরের সাথে আলোচনা করা ইত্যাদি বিষয়ে উভয়ের মতের মিল দরকার। এই কারণে স্বামী ও স্ত্রীর বুঝের উপর নির্ভর করে বিয়ের পর থেকে সন্তান নেওয়া পর্যন্ত কমপক্ষে দেড়-দুই বছর সময় নেওয়া যেতে পারে।
◆ ভালোবাসায় ছেদ- একজন দ্বীনি পুরুষ হাজারো ফিতনা অতিক্রম করে তার জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পায়। এ অবস্থায় বিয়ের পরে নারীদের উপর অনেক দায়িত্ব চলে আসে তার স্বামীর চরিত্রকে হিফাজতের জন্য। বিয়ের পরে পরিপূর্ণ ভালোবাসা দিয়ে স্বামীকে আগলে রাখতে হবে। কিন্তু এ ভালোবাসায় ছেদ পড়ে তখনই যখন তাদের মাঝে আরেকটা ছোট্ট ভালোবাসা এসে সেখানে ভাগ বসায়। বিয়ের প্রথম কয়েক বছর পুরুষেরা সর্বোক্ষণ তাদের স্ত্রীদেরকে কাছে পেতে চায়। কিন্তু সন্তানকে সময় দিতে গিয়ে যখন তার স্ত্রী তাকে সময় দিতে না পারে তখন সেটা পুরুষদের জন্য মানসিক অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমনকি ফিতনায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়। এ কারণে সন্তান নেওয়ার পরও স্বামীর চাহিদার দিকে স্ত্রীর যথেষ্ট নজর দিতে হবে। একজন আরেকজনকে অধিক জানতে হবে এবং বুঝতে হবে। সন্তান দুনিয়ায় এসে পড়ার পর স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য সময় বের করে আনা কিছুটা কঠিন। তাই বিয়ের পর থেকে সন্তান নেওয়ার আগ পর্যন্ত পরস্পরকে বোঝা ও জানার মোক্ষম সময়। নিজেদের একান্ত কিছু মুহূর্তের জন্য সময় হাতে রাখা উচিত। তারপর যখন নিজেরা একে অপরের দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে তখন তাদের আরেক আদুরে ভালোবাসাকে আল্লাহর ইচ্ছায় পৃথিবীতে স্বাগত জানানো যেতে পারে।
◆ গর্ভে প্রাণের সঞ্চার- অনেক প্রহর গুনতে গুনতে রাব্বে কারিমের ইচ্ছাতে ইউরিন স্ট্রিপে ডাবল দাগের দেখা মিলে। স্বামী-স্ত্রীর জন্য সেদিনটি পরম আনন্দের। এদিকে শুরু হয়ে যায় মায়েদের আসল দায়িত্ব নেওয়ার পালা। সন্তানকে দ্বীনের ছাঁচে ঢেলে প্রকৃত অর্থে মানুষ করার শুরুটা গর্ভকাল থেকেই আরম্ভ হোক-
• এ সময়টা মায়েদের জন্য খুবই দামি এবং নাজুক একটি সময়। গর্ভাবস্থায় মায়েদের জন্য আমলে অধিক মশগুল হওয়া উচিত। দৈনিক ফরয, সুন্নাহ সলাতের পাশাপাশি কিছু নফল আমলও বাড়ানো যেতে পারে。
• পূর্বে যাই-ই হোক না কেন গর্ভাবস্থায় এসে আমলে আর কোনো হেলা করা যাবে না। কারণ তার এই সময়টাতে সে যা আমল করবে এর প্রভাব তার সন্তানের ওপরও পড়বে। গর্ভাবস্থায় মায়েদের বেশিরভাগ সময় কুরআন পাঠে মশগুল থাকা উচিত। পড়তে না পারলে তিলাওয়াত শোনাও যেতে পারে। চার মাসের মাথায় ছোট দেহটাতে আত্মার সঞ্চার ঘটে। তখন তারা শ্রবণশক্তি অর্জন করে। এই সময় থেকেই যদি তাকে সারাক্ষণ কুরআন শোনানো হয় তাহলে জন্মের পূর্ব থেকেই আল্লাহর ইচ্ছায় তার অন্তরে কুরআন গেঁথে যাবে।
• অনেক মায়েরা চিন্তা করতে থাকেন যে, তারা অসুস্থ এখন কিছু করা যাবে না। অথচ এ সময়কে অসুস্থতা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কেননা এটি স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরবর্তীতে আমরা জানতে পারব ইন শা আল্লাহ।
• অনেক মায়েরাই এ সময়ে শয়তানের নানান ওয়াসওয়াসায় ভুগে। কারণ দুর্বল সময়গুলোতে শয়তান সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় থাকে। শয়তান নানানভাবে দুর্বলতার অজুহাত দেখিয়ে মায়েদেরকে আমল থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে এবং নানাভাবে অন্তরে হতাশা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়। তাই এই সময়ে মায়েদের শয়তানের ওয়াসওয়াসা চিনতে হবে। সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন জিকিরগুলো নিয়মিত করতে হবে। প্রয়োজনে মাঝে মাঝে নিজের ওপর রুক্বিয়াহও করা যেতে পারে।
• এ সময়ে বাবা-মা উভয়েরই নিজেদের মাঝে সকল অশুদ্ধ বাচ্য, অহেতুক কথা এবং কাজ বর্জন করার অনুশীলন এখন থেকেই করতে হবে।
• অনেকের বাসায় টিভি থাকে। এই সময়ে টিভির ঘর থেকে সর্বোচ্চ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
• শয়তানের ফাঁদে পড়ে বাজনাওয়ালা গান, ভিডিও দেখার ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে।
• সম্ভব হলে বেশি বেশি সিয়াম এবং সাদাকার মাধ্যমে সময়গুলোকে আরো মূল্যবান করে তোলা যেতে পারে।
• গর্ভাবস্থায় দু'আর কোনো বিকল্প নেই। এই সময়টাতে সন্তানের সুস্থতা, তার ভবিষ্যতের জন্য অধিক দু'আ করে যেতে হবে।
• আঁদুরের আগমন- হঠাৎ আঁদুরে সোনার পৃথিবী দেখার প্রবল ইচ্ছাকে আর কিছুতেই দমিয়ে রাখা গেলো না। মায়ের গর্ভ থেকে সজোরে এক চিৎকার দিয়ে ছুটে বের হয়ে এলো পৃথিবী দেখবে বলে। মা বাবার জন্য আরো এক আনন্দের দিনের সংযোজন ঘটে এভাবেই। সন্তানকে ঘিরে শুরু হয় তাদের পূর্বের সকল প্রস্তুতির বাস্তব প্রয়োগ-
• শিশুদের সামনে খুব সংযত হয়ে থাকতে হবে যাতে তারা কোনো খারাপ কিছুর সম্মুখীন না হয়। স্বামী-স্ত্রীদের নিজেদের মাঝে ঝগড়া বিবাদ বন্ধ করতে হবে। এগুলো সন্তানদের ওপর ছোটকাল থেকেই কুপ্রভাব ফেলে। সন্তান যখন সামান্য বুঝতে শুরু করবে তারও আগ থেকেই বাবা মায়ের উচিত সন্তানদের সামনে সুন্দর, শুদ্ধ ও সাবলীল ভাষায় কথা বলা।
• সন্তানের সামনে বাবা মায়ের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটানো কঠিনভাবে পরিত্যাগ করতে হবে।
• অনেক সময় মায়েরা সন্তানের সামনেই পোশাক পরিবর্তন করতে শুরু করে কিংবা ওড়না ছাড়া অবস্থান করে। এ বিষয়গুলো মায়েদের কঠোরভাবে বর্জন করতে হবে। কারণ তারা বাচ্চা বলে কিছু বুঝেনা বিষয়টা আসলে এমন নয়। ওরা যা দেখে তা ওদের অবচেতন মনে ঠিকই থেকে যায় এবং এগুলোর প্রভাব পড়ে পরবর্তীতে। তাই এই সময় থেকেই উক্ত ব্যাপারাগুলোতে সাবধান থাকতে হবে।
• গান, মিউজিক, কার্টুন ইত্যাদির সাথে কোনোভাবেই সন্তানকে সাক্ষাৎ করানো যাবে না। এ ব্যাপারে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের আগে থেকেই বোঝাতে হবে।
• শিশুকে খাওয়ানো এবং ঘুম পারানোর সময় অনেক মায়েরা মোবাইলে কার্টুন, গান ইত্যাদি ছেড়ে দেন। কিন্তু এসকল অন্তঃসারশূন্য কার্টুন বাচ্চাদের উপরে বিরূপ প্রভাব ফেলে। কার্টুন দেখতে দেখতে এসবের প্রতি বাচ্চাদের অতি আকর্ষণ তার দ্বীন মানার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া বাচ্চারা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতি খুব সহজেই আসক্ত হয়ে যায়। ফলে মানুষদের সাথে কথাবার্তা, চলাচল ও উঠাবসা বন্ধ হওয়ার মাধ্যমে শৈশবকাল থেকেই তারা অন্তর্মুখী হয়ে যায়। অনেকক্ষেত্রে এটি শিশুর কথা বলা শেখার পথে বাঁধাও হয়ে দাঁড়ায়।
• ছোট্ট বয়স থেকেই মায়েদের উচিত বাচ্চাকে সকল কিছু সুন্নাহ মেনে করানোর। যেমন- কার্টুন জাতীয় চেহারাওয়ালা পোশাক কঠোরভাবে পরিহার করা, সকাল বিকাল এবং ঘুমানোর জিকিরগুলো বাচ্চাকে শুনিয়ে শুনিয়ে করা, প্রতিটা কাজের আগে এবং পরের দু'আগুলো বাচ্চাকে শুনিয়ে পড়া, গোসল করানোর সময় সুন্নাহ মেনে বাচ্চাকে ওযু করিয়ে নেওয়া যেতে পারে, ছেলে বাচ্চা হলে প্যান্ট টাখনুর উপরে পরানো, মেয়ে বাচ্চা হলে বাইরে বের হওয়ার সময় হিজাব পরানো ইত্যাদি অভ্যাস ছোটকাল থেকেই গড়তে হবে।
• কারো সামনে ছেলে বা মেয়ে শিশুকে প্যান্ট ছাড়া কিংবা খালি গায়ে রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে।
• স্বলাত এবং কুরআন পড়ার সময় বাচ্চাকে সামনে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করা উচিত যাতে তার অন্তরে এই বিষয়গুলো ছোটকাল থেকে গেঁথে যায়। বাচ্চা বিরক্ত করুক তারপরও যতটুকু সম্ভব এ সময়গুলোতে বাচ্চাকে কাছে রাখার চেষ্টা করতে হবে。
• বেড়ে ওঠা- ছোট্ট ছোট্ট পায়ে আগাতে আগাতে সে বড় হতে থাকে। তাকে ঘিরে যত প্রস্তুতি সেগুলোও যেন কমতে থাকে। কিন্তু বেখেয়াল হয়ে পড়লে চলবে না। এই ভয়ংকর ফিতনার জামানায় নিজের সন্তানকে পবিত্রতার চাদরে আগলে রাখা খুবই দুরূহ ব্যাপার। তবুও বাবা-মায়েদের এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। একেবারে শিশু বয়স থেকেই যে অভ্যাসগুলো গঠন করা হয়েছিল সেগুলোর পাশাপাশি এই বেড়ে উঠার সময়গুলোতে আরো বেশ কিছু বিষয়ের সংযোজন ঘটে। কারণ এ সময় সন্তান আর শিশু থাকে না। সে অনেক কিছু বুঝতে শিখে এবং অতিরিক্ত অনেক কিছু করার সামর্থ্য তৈরি হয়। এজন্য সন্তান কি শিখছে এবং কি করছে সে বিষয়ে বাবা-মায়ের সম্যক অবগত থাকতে হবে।
• প্রথমত সন্তানের সাথে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে মাঝে মাঝে সন্তানদের সাথে নিজেদেরও বাচ্চা হয়ে যেতে হবে। যেমন: সন্তানের সাথে খেলাধুলা করা, সন্তানের অপ্রয়োজনীয় কথাগুলোও খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে জবাব দেওয়া, মাঝে মাঝে নিজেও সন্তানের সাথে নানান গল্প করা ইত্যাদি। যাতে সে বুঝতে পারে যে তার মা বাবা তাকেও অন্যান্যদের মতোই গুরুত্ব দেয়। তাকে বোঝাতে হবে সেও বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। তাকে বোঝাতে হবে যে, তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি হচ্ছে তার মা অথবা বাবা। যেকোনো বিষয় অন্য কাউকে বলার আগে তার মাকে যাতে নির্দ্বিধায় বলতে পারে, তাকে সেরকম পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।
• সন্তানের সাথে গল্প করার ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে যে, গল্পের বিষয়বস্তু যাতে শিক্ষণীয় হয়। যেমন: কুরআনের ঘটনাসমূহ, নবী-রাসূলদের জীবনী, সাহাবা-সাহাবিয়াতদের জীবনী, ইমাম-সালাফ-খলাফদের জীবনী, পূর্ববর্তী আলিমদের বিভিন্ন ঘটনা ইত্যাদি। পাশ্চাত্য সমাজে ওয়াল্ট ডিজনি, ঈশপের গল্প ইত্যাদি ব্যাপকভাবে প্রচলিত যা থেকে সন্তানের নৈতিক শিক্ষা অর্জন অভাবনীয়। এমনকি অনেক সময় এসব গল্প কাহিনীর মাঝে কুফরী-শিরকি ধারণা, অশ্লীলতা, অবাধ্যতা ইত্যাদি প্রচার করা হয়। তাই সেগুলো অবশ্যই বর্জনীয়।
• আদর এবং বন্ধুত্বের সাথে মায়ের রাগী চেহারাটাও যাতে তার স্মৃতিতে থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। যাতে সে মা-বাবার মূল্যায়ন করতে ভুলে না বসে। সেজন্য প্রয়োজন মাফিক শাসনও করতে হবে। সরাসরি প্রহার করা থেকে যতটা বিরত থাকা যায় ততই উত্তম। ভুল করলে ভেবে চিন্তে এমন শাস্তি প্রদান করা যেতে পারে যেই শাস্তিগুলোর মাঝে শিক্ষা রয়েছে。
• বাচ্চাকে সময়মতো বুকের দুধ ছাড়াতে হবে। আর যখন বাচ্চার মস্তিষ্কের মোটামুটি উন্নতি হয়ে যায় তখন থেকে দুগ্ধপান করানোর সময় কক্ষ অন্ধকার করে বা বাচ্চার চোখের উপর কোনো কাপড় রেখে দুধপান করানো যেতে পারে। কেননা, অধিকাংশ শিশুর ক্ষেত্রে নারীদের বক্ষের বিষয়ে ধারণা আসে মায়েদের থেকেই। আর সেই ধারণা থেকেই খুব অল্প বয়স হতেই বাচ্চাদের মাঝে নারীদের বক্ষের প্রতি একটা কৌতূহল কাজ করতে শুরু করে।
• সন্তানেরা বড় হলে তাকে ইবাদাতের প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তাদের জন্য মা-বাবা বাসার ভিতরের কোনো একটা জায়গায় মাসজিদের মতো বানিয়ে দিতে পারে। আর সেই জায়গাটা থাকবে কেবল তাদেরই অধীনে। ছোট্ট জায়নামায, ছোট্ট মুসহাফ দিয়ে সেই ঘরটা সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা যেতে পারে। যাতে বাচ্চারা সেই ঘরে অধিক সময় ব্যয় করতে আগ্রহী হয়।
• ছোট্টকাল থেকেই মা বাবার উচিত সন্তানের জন্য একটি আলাদা কক্ষ নির্ধারণ করে দেওয়া। আলাদা থাকার ব্যাপারে তাদেরকে উৎসাহিত করতে হবে। বাচ্চাকে আলাদা ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি করাতে হবে খুব ছোট থেকেই। তিন/চার বছর বয়স থেকেই বাচ্চার জন্য সেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দশ বছর বয়স হলে হঠাৎ ঘর আলাদা করে দিলে অনেক বাচ্চাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। এক্ষেত্রে বাবা মা নিজেদের ঘরে খুব ছোট বয়স থেকেই শিশুর জন্য আলাদা আরেকটি কটের (বাচ্চাদের খাট) ব্যবস্থা করতে পারে। নিজেদের শোবার খাটের পাশে সেটি স্থাপন করবে, যাতে সর্বোক্ষণ চোখে চোখে রাখা সম্ভব হয়। এভাবে আস্তে আস্তে তাকে তার কক্ষে স্থানান্তর করতে হবে। তার ঘরটা যথাসম্ভব আকর্ষণীয় করে সাজিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে যাতে সে তার ঘরে ঘুমাতে আগ্রহী হয়।
• বাচ্চাকে খেলাধুলার পরিবেশও দিতে হবে। মা বাবার খুব কাছের দ্বীনি ভাই-বোন যাদের নিজেদেরও সন্তান রয়েছে এমন ভাই-বোনের সন্তানদের সাথে খেলার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
• ছেলে এবং মেয়ে নির্জনে একত্রিত হয়ে যাতে খেলাধুলা না করতে পারে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। এমনও কিছু ঘটনা খবরের কাগজে আসে যেখানে খুব অল্প বয়সেই শিশু তাদের বিপরীত লিঙ্গের কোনো বাচ্চার সাথে অস্বাভাবিক যৌন আচরণ করে। [৮]
• বাচ্চাদেরকে ছোট্টকাল থেকেই যুহুদ তথা, দুনিয়ার প্রতি বিমুখিতা এবং অপচয় না করার বুঝ দিতে হবে খুব সুন্দরভাবে। অপ্রয়োজনীয় কিছু কিনতে চাইলেই তাকে যুহুদ এবং অপচয়ের বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে থামাতে হবে। আর এই বিষয়গুলোই পরবর্তীতে তার জীবনের প্রতি পরতে পরতে কাজে আসবে ইন শা আল্লাহ।
সন্তানের সঠিক ও সুষ্ঠ তারবিয়াতের উপরই নির্ভর করছে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও এই উম্মাহর বিজয়। তাই সন্তান প্রতিপালনের মতো জীবনের এই অবিচ্ছেদ্য অংশকে হেলা না করে তাদের পিছনে সময় ব্যয় করুন। তাদের শারীরিক, মানসিক উন্নতির পাশাপাশি আত্মারও পরিচর্যা করে যান আত্মার মালিকের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী। সন্তানদের অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করুন, পরিচর্যা করুন, তার পিছনে শ্রম দিন। শ্রম বিসর্জন শেষে গভীর রাতে মুসল্লায় বসে রবের সামনে দুটি রিক্ত হাত তুলে অশ্রুসিক্ত নয়নে দু'আ করুন- “ইয়া রব, আমাদের ও আমাদের সন্তানদের অন্তরে ঈমানের অঙ্কুরোদগম ঘটিয়ে দিন......"
টিকাঃ
[৭] বুখারি- ২৬৬৪; ইবন মাজাহ- ৭৯, ৪১৬৮; মুসনাদে আহমাদ- ৮৫৭৩, ৮৬১১
[৮] www.kalerkantho.com/amp/online/lifestyle/2020/01/23/866046