📄 চোখে কাজল, আইলাইনার, মাশকারা কিংবা সুরমা প্রয়োগের বিধান
নারীদের জন্য চোখে কাজল, আইলাইনার, মাশকারা কিংবা সুরমা প্রয়োগ করা জায়েয। অনেকে চোখে সুরমা দেওয়া মুস্তাহাব ও সুন্নাহ বলেছেন।
এক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে যে, যদি কোনো আইলাইনার, কাজল ও মাশকারা ওযু- গোসল করার সময় পানি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয় তাহলে সেসব মুছে নিয়ে তারপর ওযু-গোসল করতে হবে।[৮]
ইমাম মুনজিরি তাঁর 'আত তারগীব ওয়াত তারহীব' কিতাবে পুরুষ ও নারীর চোখে সুরমা দেওয়া মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে আলাদা অধ্যায় উল্লেখ করেছেন। চোখে সুরমা দেওয়াকে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম চেহারার সৌন্দর্যবর্ধক বলে অভিহিত করেছেন। এর পাশাপাশি চোখের জন্যও বেশ উপকারী বলে উল্লেখ করেছেন, বিশেষ করে ঘুমানোর পূর্বে। তাই বাজারে যেসব কাজল ও আইলাইনার পাওয়া যায় তা ব্যবহার না করে নারীরা সুরমা ব্যবহার করতে পারে।
তবে সর্বক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, চোখে সুরমা, কাজল বা আইলাইনার দেওয়ার পর গাইরে মাহরামদের সামনে যাতে তা প্রদর্শিত না হয়ে যায়।[৯]
কেননা আল্লাহ বলেন,
(ولا يبدين زينتهن إلا ما ظهر منها)
স্বাভাবিকভাবে যা প্রকাশযোগ্য তা ব্যতীত নারীদের যেন (গাইরে মাহরামদের সামনে) কোনো সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য প্রকাশিত না হয়ে যায়। [১০]
এই আয়াতের তাফসীরে ইবনু আব্বাস থেকে ইমাম ত্ববারানী ১৬১-সহ বহু মুফাসসির তাদের তাফসীরের কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, তাদের সৌন্দর্য দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে,
هي الكحل والخاتم
কুহল (তথা সুরমা, আইলাইনার ও কাজল) এবং হাতের আংটি।
টিকাঃ
[৮] সহীহ মুসলিম- ১২১৮; তাবঈনুল হাক্বায়েক (হাশিয়ায়ে শিলবী সহ)- ১/৩৩১; ফাতহুল কাদীর, ইবনুল হুমাম- ২/৩৪৭; মাওয়াহিবুল জালীল, হাত্ত্বাব ৪/২৩০; শরহু মুখতাসারিল খলীল, খিরাশী- ৪/১৪৮; মুগনীল মুহতাজ, শুরবীনি- ৩/৪০০; আল গরারুল বাহিয়্যাহ, যাকারিয়া আনসারী- ৪/৩৪৯; আল মাজমু- ১/৩৩৪; আল মুগনী- ১/১০৬; শরহুল মুনতাহাল ইরাদাত, বুহুতী- ২/১১৪
[৯] তাফসীরে ইবনু কাসীর- ৩/২৭৪ সূরা নুর- ৩১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা; আদ্বওয়াউল বায়ান- ৬/২০০
[১০] সূরা নূর- ৩১
📄 সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে মেয়েদের মেকাপ ও প্রসাধনী ব্যবহারের বিধান
ইসলাম সাজসজ্জা ও পরিপাটিভাবে চলাফেরার ব্যাপারে সর্বদাই উৎসাহ দিয়ে থাকে। তবে অবশ্যই তা শরী'আতের গণ্ডির মধ্যে থেকে। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে নারীদের বিভিন্ন হালাল কসমেটিকস, প্রসাধনী, ক্রিম, স্নো, পাউডার, মেকাপ ইত্যাদি ব্যবহার করা দোষণীয় নয়। এর মাধ্যমে যদি চেহারা দাগমুক্ত হয় অথবা চেহারায় পরিবর্তন আসে তাতেও কোনোসমস্যা নেই। তবে শর্ত হচ্ছে, সেসব বস্তুতে কোনো নাপাক উপাদান মিশ্রিত থাকতে পারবে না। [১১]
আল্লাহ বলেন,
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِي لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ)
বলুন কে হারাম করেছে আল্লাহর সাজসজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্যবস্তুসমূহকে? আপনি বলুন, এসব নিয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মু'মিনদের জন্যে এবং কিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্যে। এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্য যারা বুঝে। [১২]
সাহাবীয়াতগণও আপন স্বামীকে সন্তুষ্ট করার জন্য সাজসজ্জা করতেন।
وقَدِمَ علي من اليمن ببدنِ النبي صلى الله عليه وسلم، فوجد فاطمة رضي الله عنها ممَّن حَلَّ؛ وَلَبِسَت ثيابًا صَبِيعًا
বিদায়ী হজ্জে আলী ইয়ামান থেকে নবীজি -এর কুরবানীর পশু মক্কায় নিয়ে আসেন, সে সময় তিনি দেখলেন ফাতিমা ইহরাম খুলে হালাল হয়ে গিয়েছেন এবং তিনি (সাজসজ্জা করে) রঙিন কাপড় পরিধান করেছেন এবং চেহারায় সুরমা লাগিয়েছেন। [১৩]
এরূপ সাজগোজের ক্ষেত্রেও শর্ত হচ্ছে নারীরা গাইরে মাহরামদের সামনে তা প্রকাশ করবে না। যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিকাঃ
[১১] আউনুল মাবুদ- ৫/২৭৬
[১২] সূরা আ'রাফ- ৩২
[১৩] সহীহ মুসলিম- ১২১৮; কাশফুল মুশকিল মিন হাদীসিস সহীহাইন, ইবনুল জাওযী- ৩/৬৪
📄 চুলে খিজাব বা হেয়ার কালার ব্যবহারের বিধান
সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য নারীরা কালো খিজাব ব্যতীত অন্যান্য রঙের খিজাব দিয়ে চুল রাঙাতে পারে। এক্ষেত্রে ফাসিক ও কাফির নারীদের অনুকরণ করে চুল রাঙানো যাবে না। কারণ ফাসিক ও কাফিরদের সাদৃশ্যতা গ্রহণ জায়েয নয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার থেকে বর্ণিত, রাসূল ইরশাদ করেছেন-"যে ব্যক্তি যাদের সাদৃশ্যতা গ্রহণ করে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।”[১৪]
টিকাঃ
[১৪] সুনানে আবু দাউদ- ৪০৩৩; মুসনাদুল বাজ্জার- ২৯৬৬; মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক- ২০৯০৮৬
📄 নারীদের ক্ষেত্রে চুল কাটার বিধান
নারীদের চুলের ক্ষেত্রে শারী'আতের মৌলিক নীতিমালা হলো: ◆ নারীরা চুল লম্বা রাখবে। হাদীস থেকে জানা যায় যে, উম্মাহাতুল মু'মিনীন চুল লম্বা রাখতেন। ◆ এ পরিমাণ খাটো করবে না যে, পুরুষের চুলের মতো হয়ে যায়। হাদীসে পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বনকারিণী নারীর প্রতি অভিসম্পাত করা হয়েছে। ◆ চুল কাটার উদ্দেশ্য যদি হয়ে থাকে এই যে, রাস্তায় বের হলে মানুষেরা; বিশেষত: পুরুষেরা দেখে তাকে সুন্দর বলবে, তার দিক থেকে নজরই ফিরাতে পারবে না ইত্যাদি; তাহলে তার জন্য চুল কাটা হারাম। ◆ চুল কাটার ক্ষেত্রে বিজাতীয়দের অনুকরণ করবে না। কারণ হাদীসে বিজাতীয়দের অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
অতএব যে নারীর চুল এত লম্বা যে, কিছু অংশ কাটলে পুরুষের চুলের সাথে সাদৃশ্য হবে না তার জন্য ওই পরিমাণ কাটা জায়েয হবে। পক্ষান্তরে যার চুল তত লম্বা নয়; বরং অল্প কাটলেই কাঁধ সমান হয়ে যাবে এবং পুরুষের বাবরী চুলের মতো দেখা যাবে তার জন্য অল্প করেও কাটার অনুমতি নেই। তবে জটিল অসুস্থতার কারণে, চিকিৎসার প্রয়োজনে অভিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তারের পরামর্শে চুল ছোট করা, এমনকি জরুরতবশত কামানোরও অনুমতি রয়েছে।
চুল বেশি বড় হলে, যেমন: কোমর সমান চুল থাকলে চার আঙুলের বেশি পিঠের মাঝামাঝি করে কাটা জায়েয। তবে সর্বাবস্থায় ফ্যাশনের অনুকরণ করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
উপরোক্ত মূলনীতির আলোকে নারীরা তাদের চুল খাটো করতে পারবে। এজন্য সময়েরও কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আর কেউ নাজায়েয পরিমাণ কেটে ফেললে বা বিজাতীয় অনুকরণে চুল কেটে ফেললে তাওবা করতে হবে। [১৫]
টিকাঃ
[১৫] সহীহ বুখারী- ৩৪৫৬, ৭০৭৯; জামে তিরমিযী- ১/১০৩, হাদীস- ৩০১৩; সুনান আবি দাউদ- ৪০৩১; সহীহ মুসলিম- ১/১৪৮; তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম- ১/৪৭২; আল মুফাসসাল ফী আহকামিল মারআতি ওয়াল বায়তিল মুসলিম- ৩/৪০০; খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ৪/৩৭৭; আদ্দুররুল মুখতার- ৬/৪০৭ থেকে ৪১৬; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাদ্দুর- ৪/২০৩; আল মাজমূ লিন নববী- ৪/৪৬৯; আল ফাতাওয়াল মারআহ, শায়খ বিন বায, পৃষ্ঠা- ১৬৫