📄 লিপিস্টিক ব্যবহারের বিধান
লিপিস্টিকে যদি হারাম বা নাজায়েয কোনো উপাদান ও পদার্থের অস্তিত্ব না থাকে তাহলে নারীদের জন্য ঠোঁটে লিপিস্টিক ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই।
উল্লেখ্য যে, কিছু লিপিস্টিক ওয়াটারপ্রুফ হওয়ায় ঠোঁটে একপ্রকার প্রলেপ বা আবরণ পড়ে। ফলে তা ওযু ও গোসলের সময় ওই অংশে পানি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়। তাই এরূপ লিপিস্টিক না মুছে ওযু ও ফরয গোসল করলে তা আদায় হবে না। তবে যেসকল হালাল উপাদানে তৈরিকৃত লিপিস্টিক ওয়াটারপ্রুফ/পানি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয় না তাতে ওযু ও গোসল সিদ্ধ হবে। [১]
টিকাঃ
[১] রদ্দুল মুহতার- ১/২৮৮ থেকে ২৮৯; আল মুদাওয়ানাহ- ১/১২৪; হাওয়াশী তুহফাতুল মিনহাজ- ১/১৮৭; কাশশাফুল কিনা- ১/৯৯; ফতোয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ (অনলাইন)- ৫৭৫৫০; কিতাবুল ফাতাওয়া, খালিদ সাইফুল্লাহ রহমানী- ৬/৫৮ ও ৫৯; ফতোয়ায়ে বিননূরটাউন (অনলাইন)- ১৪৪০০৪২০১১৬১
📄 লিপিস্টিক তৈরিতে পশুর চর্বি, অ্যালকোহল ব্যবহৃত হলে তার বিধান
◆ লিপস্টিক তৈরিতে যদি হালাল পশুর চর্বি ব্যবহৃত হয় তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু এতে হারাম পশুর চর্বি ব্যবহৃত হলে এবং সেই উপাদানের অস্তিত্ব লিপিস্টিকে বিদ্যমান থাকলে উক্ত লিপিস্টিক ব্যবহার করা জায়েয নেই।
তবে যদি বিভিন্ন হালাল-হারাম উপাদানের মিশ্রণ ঘটিয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পরিশোধনের মাধ্যমে উক্ত বস্তুর মৌলিকত্ব নিঃশেষ করে দেওয়া হয় বা পরিবর্তন করা হয় তাহলে সেটিকে আর হারাম বলা যাবে না এবং তা ব্যবহারও করা যাবে। যেমন: মদকে যখন লবন বা অন্য কিছু দ্বারা সির্কা বানিয়ে ফেলা হয়, তখন সেটি নিকট হালাল হয়ে যায়। উক্ত বিধান অন্যান্য প্রসাধনীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
৪ মাযহাবের সকল ফক্বীহ এই ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন যে, ইস্তেহালার[২] মাধ্যমে হারাম ও নাপাক পদার্থও হালালে পরিণত হয়।[৩] হজরত আবুদ দারদা থেকে বর্ণিত,
ذَبَحَ الْخَمْرَ النِّينَانُ وَالشَّمْسُ
মাছ ও সূর্যের তাপ মদকে হালাল করে দেয়।[৪]
অর্থাৎ মদের মাঝে মাছ দিয়ে তা রৌদ্রে রেখে দিলে তাতে আর মদের মৌলিকত্ব বাকি থাকে না, তখন সেটি সির্কা হয়ে যায়। তাই এটি খাওয়া হালাল।
আবুদ দারদাসহ সাহাবীদের একটি জামা'আত এভাবে সির্কা বানাতেন। আর এ ব্যাপারে ইমাম ইবনু হাজার আসক্বালানী সুবিস্তর আলোচনা করেছেন।[৫]
عَنْ جَابِرٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: خَيْرٌ خَلِكُمْ خَلٌّ خَمْرِكُمْ
জাবের বিন আব্দুল্লাহ-এর সূত্রে নবী থেকে বর্ণিত, "উত্তম সির্কা সেটি, যেটি মদ থেকে প্রস্তুত করা হয়।[৬]
• লিপিস্টিকে ব্যবহৃত এলকোহল যদি খেজুর ও আঙুর ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু দ্বারা তৈরিকৃত হয়ে থাকে তাহলে তা ব্যবহারে সমস্যা নেই। কেননা যে সমস্ত এলকোহল খেজুর বা আঙুর দ্বারা প্রস্তুত করা হয়নি, সে সমস্ত বস্তু নেশা আসার আগ পর্যন্ত ব্যবহার জায়েয। এটি ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ -এর মত।[৭]
টিকাঃ
[২] ফিক্বহী পরিভাষায়- যে প্রক্রিয়ায় বা বিক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো হারাম কিংবা নাপাক পদার্থের নিজস্ব গুণাগুণ ও মৌলিকত্বকে নিঃশেষ বা পরিবর্তন করে দেওয়া হয় তাকে ইস্তেহালা বলে। (আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, যুহাইলী ১/২৫০; আল মাওসূয়াতুল ফিকহিয়্যাহ কুয়েতিয়্যাহ ৩/২১৩)
[৩] আল মাবসূত্ব- ২৪/২২; ফাতহুল কাদীর- ১/২০০; আল ইনায়াহ, বাবারতী- ১০/১০৬; তাবঈনুল হাক্বায়েক, যাঈলাঈ- ৬/৪৮,২২০; ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া- ৫/৪১০; মাজমাউল আনহুর- ৪/২৫১; ফাতোয়ায়ে মাহমুদিয়া-২৭/২১৮; বুহুসুন ফী কযায়া ফিক্বহিয়্যাহ মু'আসারাহ- ৩৪১; আশ শারহুল কাবীর (মা'আ হাশিয়াতুদ দাসূক্কী), দারদীর- ১/৫২; শরহু মুখতাসারিল খলীল, খিরাশী- ১/৮৮; আয যাখীরাহ, করাফী- ৪/১১৮ ও ১৮৮; আত তাজ ওয়াল ইকলীল, মুওয়ার্ক- ১/৯৭ আল মাজমু, নববী- ২/৫৭৮; মুগনীল মুহতাজ, শারবীনী- ১/৮১; নিহায়াতুল মুহতাজ লির রামালি- ৮/১২; আল ইনসাফ, মারদাউই- ১/২৩০,৩১৮; আল মুগনী- ৯/১৭৩; মাওসূয়াতুল ফিকহিয়্যাহ কুয়েতিয়্যাহ- ১০/২৭৮
[৪] সহীহ বুখারী-২/৯৬
[৫] ফাতহুল বারী- ১/৬১৭-৬১৮
[৬] মারেফাতুস সুনান ওয়াল আসার লিল বায়হাকী- ১১৭২৩, এই বর্ণনাটি মুগীরাহ ইবনু যিয়াদ একক সূত্রে বর্ণনা করেন এবং তিনি হাদীস শাস্ত্রে অত শক্তিশালী নন। নসবুর রয়াহ (বুগইয়াতুল আলমাঈর হাশিয়া ও শাইখ আওয়ামার তাহক্বীক সহ)- ৪/৩১১
[৭] ফাতহুল কদীর- ৮/১৬০; ফাতওয়ায়ে আলমগীরী- ৫/৪১২; আল বাহরুর রায়েক- ৮/২১৭ ও ২১৮; ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ২৭/২১৯; তানভীরুল আবসার মা'আত দুররিল মুখতার- ২/২৫৯; ফতোয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ (অনলাইন)- ৪৯৭৩৯; তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম- ১/৩৪৮, ৩/৩৩৭; ফিকহুল বুয়ু- ১/২৯৮
📄 চোখে কাজল, আইলাইনার, মাশকারা কিংবা সুরমা প্রয়োগের বিধান
নারীদের জন্য চোখে কাজল, আইলাইনার, মাশকারা কিংবা সুরমা প্রয়োগ করা জায়েয। অনেকে চোখে সুরমা দেওয়া মুস্তাহাব ও সুন্নাহ বলেছেন।
এক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে যে, যদি কোনো আইলাইনার, কাজল ও মাশকারা ওযু- গোসল করার সময় পানি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয় তাহলে সেসব মুছে নিয়ে তারপর ওযু-গোসল করতে হবে।[৮]
ইমাম মুনজিরি তাঁর 'আত তারগীব ওয়াত তারহীব' কিতাবে পুরুষ ও নারীর চোখে সুরমা দেওয়া মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে আলাদা অধ্যায় উল্লেখ করেছেন। চোখে সুরমা দেওয়াকে ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম চেহারার সৌন্দর্যবর্ধক বলে অভিহিত করেছেন। এর পাশাপাশি চোখের জন্যও বেশ উপকারী বলে উল্লেখ করেছেন, বিশেষ করে ঘুমানোর পূর্বে। তাই বাজারে যেসব কাজল ও আইলাইনার পাওয়া যায় তা ব্যবহার না করে নারীরা সুরমা ব্যবহার করতে পারে।
তবে সর্বক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, চোখে সুরমা, কাজল বা আইলাইনার দেওয়ার পর গাইরে মাহরামদের সামনে যাতে তা প্রদর্শিত না হয়ে যায়।[৯]
কেননা আল্লাহ বলেন,
(ولا يبدين زينتهن إلا ما ظهر منها)
স্বাভাবিকভাবে যা প্রকাশযোগ্য তা ব্যতীত নারীদের যেন (গাইরে মাহরামদের সামনে) কোনো সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য প্রকাশিত না হয়ে যায়। [১০]
এই আয়াতের তাফসীরে ইবনু আব্বাস থেকে ইমাম ত্ববারানী ১৬১-সহ বহু মুফাসসির তাদের তাফসীরের কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, তাদের সৌন্দর্য দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে,
هي الكحل والخاتم
কুহল (তথা সুরমা, আইলাইনার ও কাজল) এবং হাতের আংটি।
টিকাঃ
[৮] সহীহ মুসলিম- ১২১৮; তাবঈনুল হাক্বায়েক (হাশিয়ায়ে শিলবী সহ)- ১/৩৩১; ফাতহুল কাদীর, ইবনুল হুমাম- ২/৩৪৭; মাওয়াহিবুল জালীল, হাত্ত্বাব ৪/২৩০; শরহু মুখতাসারিল খলীল, খিরাশী- ৪/১৪৮; মুগনীল মুহতাজ, শুরবীনি- ৩/৪০০; আল গরারুল বাহিয়্যাহ, যাকারিয়া আনসারী- ৪/৩৪৯; আল মাজমু- ১/৩৩৪; আল মুগনী- ১/১০৬; শরহুল মুনতাহাল ইরাদাত, বুহুতী- ২/১১৪
[৯] তাফসীরে ইবনু কাসীর- ৩/২৭৪ সূরা নুর- ৩১ নং আয়াতের ব্যাখ্যা; আদ্বওয়াউল বায়ান- ৬/২০০
[১০] সূরা নূর- ৩১
📄 সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে মেয়েদের মেকাপ ও প্রসাধনী ব্যবহারের বিধান
ইসলাম সাজসজ্জা ও পরিপাটিভাবে চলাফেরার ব্যাপারে সর্বদাই উৎসাহ দিয়ে থাকে। তবে অবশ্যই তা শরী'আতের গণ্ডির মধ্যে থেকে। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যে নারীদের বিভিন্ন হালাল কসমেটিকস, প্রসাধনী, ক্রিম, স্নো, পাউডার, মেকাপ ইত্যাদি ব্যবহার করা দোষণীয় নয়। এর মাধ্যমে যদি চেহারা দাগমুক্ত হয় অথবা চেহারায় পরিবর্তন আসে তাতেও কোনোসমস্যা নেই। তবে শর্ত হচ্ছে, সেসব বস্তুতে কোনো নাপাক উপাদান মিশ্রিত থাকতে পারবে না। [১১]
আল্লাহ বলেন,
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِي لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَذَلِكَ نُفَصِّلُ الآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ)
বলুন কে হারাম করেছে আল্লাহর সাজসজ্জাকে, যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্যবস্তুসমূহকে? আপনি বলুন, এসব নিয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মু'মিনদের জন্যে এবং কিয়ামতের দিন খাঁটিভাবে তাদেরই জন্যে। এমনিভাবে আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি তাদের জন্য যারা বুঝে। [১২]
সাহাবীয়াতগণও আপন স্বামীকে সন্তুষ্ট করার জন্য সাজসজ্জা করতেন।
وقَدِمَ علي من اليمن ببدنِ النبي صلى الله عليه وسلم، فوجد فاطمة رضي الله عنها ممَّن حَلَّ؛ وَلَبِسَت ثيابًا صَبِيعًا
বিদায়ী হজ্জে আলী ইয়ামান থেকে নবীজি -এর কুরবানীর পশু মক্কায় নিয়ে আসেন, সে সময় তিনি দেখলেন ফাতিমা ইহরাম খুলে হালাল হয়ে গিয়েছেন এবং তিনি (সাজসজ্জা করে) রঙিন কাপড় পরিধান করেছেন এবং চেহারায় সুরমা লাগিয়েছেন। [১৩]
এরূপ সাজগোজের ক্ষেত্রেও শর্ত হচ্ছে নারীরা গাইরে মাহরামদের সামনে তা প্রকাশ করবে না। যেমনটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
টিকাঃ
[১১] আউনুল মাবুদ- ৫/২৭৬
[১২] সূরা আ'রাফ- ৩২
[১৩] সহীহ মুসলিম- ১২১৮; কাশফুল মুশকিল মিন হাদীসিস সহীহাইন, ইবনুল জাওযী- ৩/৬৪