📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 ইদ্দত

📄 ইদ্দত


ইদ্দত মানে গণনা। অর্থাৎ, তালাকের নির্ধারিত দিন গণনা করা। স্ত্রী তালাকপ্রাপ্তা হলে বা তার স্বামীর মৃত্যু হলে নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য উক্ত নারীকে এক বাড়িতে অবস্থান করতে হয়, এ সময়ে সে অন্যত্র যেতে পারে না এবং অন্য কোথাও বিবাহ বসতে পারে না; এমনকি বিবাহের প্রস্তাবও গ্রহণ করতে পারে না। একেই 'ইদ্দত' বলে। আর ইদ্দত পালনকারী নারীকে বলা হয় 'মু'তাদ্দাহ'। ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায় (১/৫৫২) বর্ণিত রয়েছে,
هِيَ انْتِظَارُ مُدَّةٍ مَعْلُومَةٍ يَلْزَمُ الْمَرْأَةَ بَعْدَ زَوَالِ النِّكَاحِ حَقِيقَةً أَوْ شُبْهَةَ الْمُتَأَكِدِ بِالدُّخُولِ أَوِ الْمَوْتِ كَذَا فِي شَرْحِ النُّقَايَةِ لِلْبُرْ جُنْدِي رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً نِكَاحًا جَابِرًا فَطَلَّقَهَا بَعْدَ الدُّخُولِ أَوْ بَعْدَ الْخَلْوَةِ الصَّحِيحَةِ كَانَ عَلَيْهَا الْعِدَّةُ

ইদ্দত হলো, স্বাভাবিক বিবাহ-বিচ্ছেদের পর বা খালওয়াতে সহীহার (তথা স্বামী-স্ত্রী সহবাসের নিকটবর্তী আচরণ বা নির্জনে বসবাসের) পর অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর মহিলা কর্তৃক শরী'আত নির্ধারিত নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা (অন্য কোথাও বিয়ে না বসা)। স্ত্রীর জন্য আবশ্যক হলো ইদ্দতের সময় তিনি অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। এই কারণে যে, স্বামী যদি ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে পুনরায় নিজের কাছে রাখার বা ফিরিয়ে আনার ইচ্ছাপোষণ করে, তাহলে সে রাখতে ও ফিরিয়ে আনতে পারবে। তবে ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে এই অধিকারটি বিলুপ্ত হবে।

উল্লেখ্য যে, এই বিষয়টি শুধু এক তালাক ও দুই তালাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তিন তালাক দিয়ে ফেললে এই অধিকার আর থাকে না। এ ছাড়া, ফক্কিহদের মতে রাজঈ ও বায়িন তালাকপ্রাপ্তা মহিলা ইদ্দত পালন করা অবস্থায় স্বামীর পক্ষ থেকে ভরণপোষণ ও খোরপোশ পাবে। এর বিপরীতে সহীহ মুসলিম, সুনানে নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদে ফাতিমা বিনতে কায়স থেকে যে বর্ণনা পাওয়া যায় অধিকাংশ সাহাবী (তাদের মাঝে অন্যতম হচ্ছেন উমার, ইবনে মাসউদ, যাইদ ইবনে সাবেত, আয়েশা) তাবেঈ ও ফক্বিহগণ তা গ্রহণ করেননি। বরং উক্ত হাদীসের বিপরীতে তারা ভিন্ন হাদীস ও সূরা তালাকের প্রথম আয়াত দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। তবে যে মহিলার স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে বিধায় ইদ্দত পালন করছে এমন ইদ্দত অবস্থায় মহিলার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর পরিবারের জন্য জরুরি নয়। [১৮]

আবু ইসহাক বলেন,

কُنْتُ مَعَ الْأَسْوَدِ بْنِ يَزِيدَ جَالِسًا فِي الْمَسْجِدِ الْأَعْظَمِ وَمَعَنَا الشَّعْبِيُّ فَحَدَّثَ الشَّعْبِيُّ بِحَدِيثِ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَمْ يَجْعَلْ لَهَا سُكْنَى وَلَا نَفَقَةً ثُمَّ أَخَذَ الْأَسْوَدُ كَفَّا مِنْ حَصَى فَحَصَبَهُ بِهِ. فَقَالَ وَيْلَكَ تُحَدِّثُ بِمِثْلِ هَذَا قَالَ عُمَرُ لَا نَتْرُكُ كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّنَا صلى الله عليه وسلم لِقَوْلِ امْرَأَةٍ لَا نَدْرِي لَعَلَّهَا حَفِظَتْ أَوْ نَسِيَتْ لَهَا السُّكْنَى وَالنَّفَقَةُ قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ)

আমি আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদের সঙ্গে সেখানকার বড় মসজিদে বসা ছিলাম। শা'বীও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি ফাতিমাহ বিনতু কায়স হতে বর্ণিত হাদীস প্রসঙ্গে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোশের সিদ্ধান্ত দেননি। তখন আসওয়াদ তার হাতে এক মুঠো কংকর নিয়ে শা'বীর দিকে নিক্ষেপ করলেন। এরপর বললেন, সর্বনাশ! তুমি এমন ধরনের হাদীস বর্ণনা করছ? (অথচ) উমার রা. বলেছেন, আমরা আল্লাহর কিতাব এবং আমাদের নবী ﷺ-এর সুন্নাত এমন একজন মহিলার উক্তির কারণে ছেড়ে দিতে পারি না। আমরা জানি না, সে স্মরণ রাখতে পেরেছে নাকি অথবা ভুলে গিয়েছে যে তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোশ রয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ থেকে বহিষ্কার করে দিও না এবং তারাও যেন ঘর থেকে বের না হয়। তবে তারা স্পষ্ট কোনো অশ্লীলতায় লিপ্ত হলে ভিন্ন কথা।" [১৯]

হাদীসে উল্লেখিত পূর্ণ আয়াতটি হলো :

يَأْتِهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَن يَأْتِينَ بِفَحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا)

হে নবী (বলো), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ইদ্দত হিসাব করে রাখবে, তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোনো স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর জুলুম করে। তুমি জানো না, হয়তো সেটার পর আল্লাহ (ফিরে আসার) কোনো সমাধান দেখিয়ে দেবেন। [২০]

আয়াতটিতে ইদ্দত চলাকালীন অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে কী রকম ব্যবহার করতে হবে তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদেশ করা হয়েছে যে, স্ত্রীদেরকে তাদের গৃহ থেকে যাতে বহিষ্কার করা না হয়। এখানে তাদের গৃহ বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যে পর্যন্ত তাদের বসবাসের হক পুরুষের দায়িত্বে থাকে, সেই পর্যন্ত গৃহে তাদের অধিকার আছে। তবে মহিলা কোনো ফাহেশা ও অশ্লীল (যিনা ও ব্যভিচারের) কাজে লিপ্ত হয়ে বের হয়ে গেলে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা।

টিকাঃ
[১৮] সহীহ মুসলিম- ১৪৮০; আল ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার- ৩/২৬০; ফাতহুল কাদীর- ৩/৩৩৯; হাশিয়ায়ে ইবনে আবেদীন- ৩/৬৪০; মিরকাতুল মাফাতীহ- ৬/৪৪২-৪৪৯; শারহুস সগীর- ১/৫২২; হাশিয়াতুদ দাসূকী- ২/৫১৫; তুহফাতুল মুহতাজ- ৮/২৫৯-২৬০; নিহায়াতুল মুহতাজ- ৭/১৫২-১৫৪; আল ইনসাফ (আল মুকনি ও শারহুল কবীরসহ)- ২৪/৩১২-৩১২
[১৯] সহীহ মুসলিম- ১৪৮০
[২০] সূরা তালাক- ১

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 ইদ্দতের সময়কাল

📄 ইদ্দতের সময়কাল


◇ প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা ঋতুস্রাব (মাসিক) থেকে পবিত্র হওয়ার পর তালাকপ্রাপ্তা হলে তার জন্য ইদ্দতের সময়কাল হলো, সে যে পবিত্রতায় আছে তা থেকে পূর্ণ তিন মাসিক (ঋতুস্রাব) শেষ হওয়া পর্যন্ত। অতএব তার তিন ঋতু শেষ হলে সে যথেচ্ছা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এই ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে অন্যত্র বিবাহ করা হারাম। কুরআনে এসেছে,

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ )

অর্থাৎ তালাকপ্রাপ্তা মহিলাগণ নিজেরা তিন কুরু (অর্থাৎ তিন মাসিক ও ঋতুস্রাব) পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। [২১]

◇ নাবালেগা অথবা কোনো অসুস্থতার কারণে ঋতুস্রাব হয় না, এমন নারী তালাকপ্রাপ্তা হলে তার ইদ্দত হলো তিন মাস। এ সময়ের মধ্যে সে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে না।

◇ স্ত্রীর বয়স যদি এত বেশি হয় যে তার মাসিক (ঋতুস্রাব) বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তাহলে তারও ইদ্দত তিন মাস। এ সময়ের মধ্যে সে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে না।

◇ স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয় আর এমতাবস্থায় যদি সে তালাকপ্রাপ্তা হয়, তাহলে তার ইদ্দত হলো গর্ভের বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত। [২২]

উল্লেখ্য যে, গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দিলে স্বামীর জন্য অপরিহার্য হলো, বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর যাবতীয় খরচ বহন করা যাতে বাচ্চার কোনো ক্ষতি না হয়। আর বাচ্চা প্রসব করার সাথে সাথে স্ত্রী তালাক হয়ে যায় এবং তার ভরণপোষণের দায়িত্ব আর স্বামীর ওপর থাকে না বিধায় ওই বাচ্চাকে দুধ পান করানো স্ত্রীর জন্য আবশ্যক নয়। অতএব সেই পুরুষ তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীকে দুধ পান করাতে বললে সেই দুধ পান করানোর পূর্ণ সময়ের ভরণ-পোষণ ও তার থাকা-খাওয়া সহ সকল ব্যবস্থা উক্ত পুরুষের করে দিতে হবে। [২৩]

◇ স্বামী যদি তার স্ত্রী রেখে মারা যায়, তাহলে তার ইদ্দত হলো ৪ মাস ১০ দিন। এ সময়ের মধ্যে সে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে না।[২৪]

◇ কোনো স্ত্রীর স্বামী যদি নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। অর্থাৎ বহুদিন হলো স্বামীর কোনো খোঁজখবর নেই, বেঁচে আছে না মারা গিয়েছে তাও জানা যায় না; এমন নারী তার স্বামীর জন্য ৪ বছর অপেক্ষা করবে, এর মধ্যে যদি স্বামী মারা গেছে এমন কোনো সংবাদ না পাওয়া যায় তাহলে ৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর চাইলে সে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে।

উল্লেখ্য যে, স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর স্ত্রী কত দিন অপেক্ষা করবে এই ব্যাপারে ইমামদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা -এর মতে ৯০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। [২৫] তবে এই মাসআলায় হানাফী মাযহাবের উলামায়ে মুতাআখখিরীন ইমাম মালেক -এর মাযহাবের ওপর ফতোয়া দিয়েছেন। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর সংবাদটি মুসলিম কাযীর নিকট গিয়ে স্ত্রী পেশ করবে। এবং তার সাধ্যানুযায়ী নিখোঁজ স্বামীকে তালাশ করার পর যদি খোঁজ না পায়, তাহলে কাযী স্ত্রীকে চার বছর অপেক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেবে। যদি এর মধ্যে ফিরে এসে যায়, তাহলে ভালো। আর যদি ফিরে না আসে, তাহলে কাযী তার স্বামীর মৃত্যুর হুকুম দেবে।

কেননা, উমার ফারুক বলেন, নিখোঁজ স্বামীর জন্য স্ত্রী চার বৎসর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। [২৬] এছাড়া উসমান, আলী এবং অনেক তাবেয়ী থেকেও অনুরূপ ফতওয়া রয়েছে। [২৭] অতঃপর স্ত্রী ইদ্দত পালন করে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে।

স্ত্রী দ্বিতীয় বিবাহ করার পর যদি হঠাৎ প্রথম স্বামী ফিরে আসে, তাহলে উক্ত নারীর জন্য দ্বিতীয় স্বামীর নিকট থাকা জায়েয হবে না। কেননা প্রথম স্বামী ফিরে আসার কারণে দ্বিতীয় বিবাহ বাতিল হয়ে যায়। অতঃপর দ্বিতীয় বিবাহ বাতিল হবার কারণে ইদ্দত পালন করতে হবে। ইদ্দত পালন করার পর উক্ত মহিলা প্রথম স্বামীর স্ত্রী হবে। [২৮]

টিকাঃ
[২১] সূরা বাক্বারাহ- ২২৮
[২২] সূরা তালাক- ৪
[২৩] সূরা তালাক- ৬
[২৪] সূরা বাকারা- ২৩৪
[২৫] আল লুবাব ফি শারহিল কিতাব
[২৬] বাইহাক্বী, হাদীস- ১৫৩৪৫; আল মুহাল্লা- ৯/৩১৬
[২৭] মুহাল্লা-৯/৩২৪
[২৮] মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস- ১২৩২৫; বাইহাক্বী, হাদীস- ১৫৩৪৭, ১৫৩৪৮; আহসানুল ফতোয়া- ৫/৪৬৭; ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১৬/৩৪২; রাদ্দুল মুহতার- ৪/২৯৫-৯৬; হীলাতুন নাজিযাহ, আশরাফ আলী থানবী; শারহুল মিনহাজ আলা মুখতাসারিল খালিল- ২/৩৭৫; শারহুস সাগীর- ২/৬৯৪; হাশিয়ায়ে দাসুকী- ২/৪৭৯; মানারুস সাবীল- ২/৮৮

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 মু‘তাদ্দাহ নারীর করণীয় ও বর্জনীয়

📄 মু‘তাদ্দাহ নারীর করণীয় ও বর্জনীয়


স্বামীর মৃত্যু, তিন তালাক বা তালাকে বায়েন এবং তালাকে রজঈর ক্ষেত্রে ইদ্দত পালন করা অবস্থায় নিম্নোক্ত বিষয়াবলি লক্ষণীয়:

◇ ইদ্দত পালনকারী নারী সকল প্রকার সৌন্দর্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে。

◇ আতর, পারফিউম তথা সুগন্ধি জাতীয় কোনো কিছু ব্যবহার করবে না। তবে তেল, সাবান, রোগ-ব্যাধি নিরাময়ের জন্য ওষুধ ইত্যাদি ব্যবহারে অসুবিধা নেই; যদিও তাতে সুগন্ধি থাকে। কারণ, এগুলো মূলত সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয় না。

◇ সুরমা, কাজল ইত্যাদি ব্যবহার না করা。

• মেহেদী, খেজাব বা আলাদা রং ব্যবহার করা যাবে না。

• সৌন্দর্য বর্ধনকারী পোশাক পরিধান করবে না。

• কোনো ধরনের অলংকার যেমন: দুল, চুড়ি, নাকফুল, আংটি, নূপুর ইত্যাদি ব্যবহার না করা。

◇ নারী যদি গর্ভবতী হয়ে থাকে তাহলে উপর্যুক্ত নিষেধাজ্ঞাসমূহ সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে。

• রজঈ, বায়েন ও তিন তালাক প্রাপ্তা নারী এ অবস্থায় দিন ও রাতে কোথাও বের হতে পারবে না। তবে যার স্বামী মারা গিয়েছে সে দিনে ও রাতের প্রাথমিক কিছু অংশে ভরণপোষণের তাগিদে বের হতে পারবে। [২৯]

টিকাঃ
[২৯] সূরা বাকারা- ২৩৪-২৩৫; বাদায়েউস সানায়ে- ৪/৫২৩ থেকে ৫২৬; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াহ- ১/৫৫৮ থেকে ৫৫৯; আল ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার- ৩/২৪১ থেকে ২৪৫; আদ দুররুল মুখতার- ১০/৩৬১ থেকে ৩৬৮; হিদায়া-২/৪২৩, ৩/৪২৭

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 বিধবা নারীর ইদ্দতের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু বিষয়

📄 বিধবা নারীর ইদ্দতের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু বিষয়


বিধবার ইদ্দতের সময় কী কী বিষয়ের ওপর শরী'আতের দিকনির্দেশনা রয়েছে তা নিয়ে বহু ভুল বোঝাবুঝি জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সমাজে এসব মনগড়া নিষেধাজ্ঞাকে শরী'আহর বিধানের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। এমনই কিছু বিধান জেনে নেয়া যাক যেগুলো সমাজে অবহেলিত-

• বিধবা তার স্বামীর মৃত্যুর পর চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করবে। স্বামীর মৃত্যুতে শোক পালনের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন,

وَالَّذِينَ يُتَوَفَّوْنَ مِنكُمْ وَيَذَرُونَ أَزْوَاجًا يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرً)

[৩০] আর তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে এবং নিজেদের স্ত্রীদেরকে ছেড়ে যাবে, তখন সে স্ত্রীদের কর্তব্য হলো, নিজেকে চার মাস দশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখা।

স্বাধীন নারীর স্বামী মারা গেলে তার ইদ্দত হচ্ছে ৪ মাস ১০ দিন। এ ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যু চাঁদের প্রথম তারিখে হলে সেদিন থেকে চাঁদের মাসের হিসেবে (মাস ৩০ দিনে হোক কিংবা ২৯ দিনে) চার মাস দশ দিন ধরা হবে。

পক্ষান্তরে যদি মৃত্যু মাসের মাঝখানে হয়, সে ক্ষেত্রে সেই নারী প্রথম মাসের বাকি দিনগুলো ইদ্দত পালন করবে এবং চন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী আরও তিন মাস (দিনের সংখ্যা ৩০ হোক কিংবা কম হোক) দশ দিন ইদ্দত পালন করবে। আর প্রথম মাসের যে দিনগুলো ছুটে গেছে সে দিনগুলো হিসাব করার দুটো পদ্ধতি রয়েছে-

• ওই মাসকে হিসাবে ৩০ দিন ধরা, বাস্তবিকপক্ষে মাস ৩০ দিনবিশিষ্ট হোক কিংবা ২৯ দিনবিশিষ্ট। সুতরাং বিধবা নারী যদি ২০ দিন ইদ্দত পালন করে থাকে, তাহলে পঞ্চম মাসে তিনি বাকি দশ দিন পূর্ণ করবে。

• প্রথম মাসের যে কয়দিন ছুটে গেছে পঞ্চম মাসে কেবল সে কয়দিন পূর্ণ করবে; সেই মাস ৩০ দিনবিশিষ্ট হোক কিংবা ২৯ দিনবিশিষ্ট। [৩১]

• বিধবা নারী স্বামীর মৃত্যুর শোক পালনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের বাড়িতে থাকবে। এমনকি এ সময় যদি সে তার পিতার বাড়িতে অবস্থান করে আর স্বামীর মৃত্যুর খবর পায় তাহলে নিজ বাড়িতে ফিরে আসবে। তবে একান্ত প্রয়োজনে (যেমন: বিপদের আশঙ্কা, প্রয়োজনবশত বাড়ি পরিবর্তন, চিকিৎসা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা ইত্যাদি জরুরি কাজে) অন্যত্র যেতে পারবে। এছাড়া গরিব হলে এবং বাইরে গিয়ে কাজকর্ম ব্যতীত খাওয়া-পরার ব্যবস্থা না থাকলে দিনের বেলায় কাজের জন্য বাইরে যেতে পারবে, কিন্তু রাতের বেলায় তাকে বাড়িতেই থাকতে হবে। বিশেষ প্রয়োজন হলে দিনে ও রাতের প্রাথমিক অংশে বাইরে যেতে পারবে। বাড়িতে নিজেদের একাধিক ঘর বা একাধিক কামরা থাকলে যেকোনো ঘর বা কামরায় থাকতে পারবে। নির্দিষ্ট একটি স্থানেই আবদ্ধ থাকা জরুরি নয়। বাড়ির বারান্দা বা উঠানেও বের হতে পারবে। [৩২]

• স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ পেতে দেরি হলে সংবাদ পাওয়ার পূর্বে যে সময় অতিবাহিত হয়েছে সেটাও ইদ্দতের ভেতর অতিবাহিত হয়েছে বলে ধরা হবে; আর ইদ্দতের পূর্ণ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সংবাদ পেলে আর তাকে ইদ্দত পালন করতে হবে না। তার ইদ্দত পূর্ণ হয়ে গেছে বলেই ধরা হবে。

◇ ইদ্দতের সময় তার সাধারণ পোশাক পরা এবং সাজসজ্জা এড়ানো উচিত। সে মেকাপ-গহনা, আড়ম্বর, জাঁকজমকপূর্ণ ও জৌলুসপূর্ণ পোশাক পরিধান করবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সে অপরিচ্ছন্ন থাকবে। স্বামী মারা যাওয়ার আগে স্বাভাবিকভাবে যে পোশাক পরিধান করত তা-ই পরিধান করবে। তবে শুধু সাদা বা শুধু কালো পোশাক পরিধান করতে হবে এমন ধারণা সঠিক নয়。

◇ ইদ্দত চলাকালীন অবস্থায় সুস্পষ্ট শব্দে ও বাক্যে বিয়ের প্রস্তাব প্রদান বা সরাসরি বিয়ে থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে স্বামী মারা গিয়েছে এমন নারীর ইদ্দত চলাকালীন অবস্থায় বিবাহের প্রস্তাবনার ইঙ্গিতমূলক কাজ ও বাক্য ব্যবহার করা যাবে। যেমন: তাকে হাদিয়া পাঠানো, তার কাছে কোনো মাধ্যমে নিজের গুণ ও বৈশিষ্ট্য এভাবে ব্যক্ত করা যাতে বোঝা যায় যে, সেই নারী বিয়ে করতে ইচ্ছুক。

সকল আলেমের ইজমা মতে, তালাকে রজঈ প্রাপ্তা মু'তাদ্দাহ নারীর ক্ষেত্রে কোনো পুরুষকে ওপরে উল্লেখিত অনুরূপ বাক্য বলে বা কাজ করে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া জায়েয নেই। এমনকি হানাফী মাযহাবে বায়েন তালাকপ্রাপ্তা নারীদের ক্ষেত্রেও একই মাসআলা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কেবল ওই মু'তাদ্দাহ নারীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যার স্বামী মারা গিয়েছে。

• স্ত্রী ব্যতীত এ সকল বিধান মৃতের অন্য কোনো নিকটাত্মীয়ের জন্য প্রযোজ্য নয়। [৩৩] আবু সালামার মেয়ে যয়নব বলেন, শাম থেকে আবু সুফিয়ান -এর মৃত্যু-সংবাদ আসার পর তৃতীয় দিন (তাঁর মেয়ে উম্মুল মুমিনীন) উম্মে হাবিবা কিছু হলুদ বা জাফরান (অন্য বর্ণনায় সুগন্ধি) আনতে বললেন। অতঃপর তা আনা হলে তিনি তা তার চেহারার দুপাশে, দুগালে এবং দুবাহুতে মাখলেন। অতঃপর বলেন, এটা করার আমার কোনো দরকার ছিল না। কিন্তু আমি এজন্যই এমনটি করলাম কারণ রাসূল বলেছেন,
لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ، إِلَّا عَلَى زَوْجٍ ، فَإِنَّهَا تُحِدُّ عَلَيْهِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا
যে নারী আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস রাখে, তার জন্য স্বামী ছাড়া কারও মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করা বৈধ নয়। আর স্বামীর মৃত্যুতে সে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে। [৩৪]

টিকাঃ
[৩০] সূরা বাকারা- ২৩৪
[৩১] হাশিয়ায়ে ইবনু আবেদীন- ১০/২৮; দারুস সাক্কাফাহ, আল মুগনী- ৮/৮৫; গুরারুল আযকার ফী শারহি দুরারিল বিহার, পৃষ্ঠা- ২২৩; ফাতহুল কাদীর- ৪/১৪১; বাহরুর রায়েক- ৪/১৪৩; কাশাফুল কিনা- ৫/৪১৮; আল মাওসূয়াতুল ফিকহিয়্যাহ কুয়েতিয়্যাহ- ২৯/৩১৫; আল জাওহারাতুন নায়্যিরাহ- ২/১৫৪
[৩২] ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াহ- ১/৫৫৯; বাহরুর রায়েক- ৪/২৫৮; আল ইনায়াহ শারহুল হিদায়া- ২/৬০০; আল বিনায়াহ শারহুল হিদায়া- ৫/৫৮৩
[৩৩] তাবঈনুল হাকায়েক, যাইলাঈ- ৩/৩৫; আল বিনায়া, আইনী- ৫/৬২২; বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ইবনু রুশদ- ৩/১৪২; আয যাখীরাহ, করাফী- ৪/২৬০; রওযাতুত ত্বলেবীন, নববী- ৮/৪০৮; হাশিয়ায়ে কলইউবী ওয়া উমাইরাহ- ৪/৫৪; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, বুহুতী- ৩/২০৩; মাতালিবু উলিন নুহা, রহিবানী- ৫/৫৭৯
[৩৪] সহীহ বুখারী- ১২৮১, ১২৮২, ৫৩৩৪, ৫৩৩৪; সহীহ মুসলিম- ১৪৮৬, ১৪৮৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00