📄 তালাক
তালাকের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, কোনো বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেওয়া।[৫] শরী'আতের পরিভাষায় সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট কিংবা তার স্থলাভিষিক্ত অস্পষ্ট কোনো শব্দ বা বাক্য মুখে উচ্চারণ করে কিংবা লিখিতভাবে বৈবাহিক বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া বা সম্পর্ক বিচ্ছেদ করার নাম হচ্ছে তালাক। উল্লেখ্য যে, তালাক দেওয়ার অধিকার কেবল স্বামীরই রয়েছে; তবে স্বামী কাউকে তালাকের দায়িত্ব ন্যস্ত করলে তা-ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। যেমন:
• তালাকুল ওয়াকালা- প্রতিনিধির মাধ্যমে তালাক দেওয়া।
• তালাকুত তাফউইয- স্ত্রীকে স্বামীর পক্ষ থেকে যেকোনো মুহূর্তে শর্তসাপেক্ষে কিংবা বিনা শর্তে তালাক নেওয়ার অধিকার অর্পণ করা।
আবার কখনো কখনো বিশেষ অবস্থায়, প্রয়োজনে ও কারণে তার অনুমতি ব্যতীতই শরঈ কাযী (বিচারক) বিবাহ বিচ্ছেদ করাতে পারে। [৬]
তালাকের শব্দগুলো ২ ভাগে বিভক্ত: (১) صریح বা তালাকের সুস্পষ্ট শব্দ। (২) كناية বা তালাক দেওয়া ও হওয়ার ক্ষেত্রে অস্পষ্ট শব্দসমূহ।
তালাক দেওয়া বা হওয়ার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট শব্দ ও বাক্যসমূহ: 'তুমি তালাক' বা 'আমি তোমায় তালাক দিয়ে দিলাম', 'আমার ওপর তুমি হারাম', 'যা তোকে ছেড়ে দিলাম', 'আমার জন্য ওয়াজিব হলো তোমায় তালাক দেওয়া' ইত্যাদি বলার দ্বারা তালাকে বায়িন হয়ে যাবে। 'তোমার শরীর/দেহ/তোমার রূহ/তোমার চেহারা/তোমার লজ্জাস্থান তালাক বা আমার ওপর হারাম', কেউ ১/২/৩ আঙুল উঠিয়ে বলল, 'তুমি এভাবে তালাক'; তাতেও তালাক পতিত হবে। তবে সে ক্ষেত্রে ১ আঙুল ওঠানোর দ্বারা এক তালাক, ২ আঙুল ওঠানোর দ্বারা দুই তালাক এবং ৩ আঙুল ওঠানোর দ্বারা তিন তালাকই পতিত হবে। [৭] অনুরূপভাবে 'যাও তোমাকে রাখব না', 'তালাক, তালাক, তালাক', 'বায়িন তালাক' বা 'তিন তালাক'; এমন শব্দগুলো বলার দ্বারা তিন তালাককে বায়িন হয়ে যাবে।
তালাক দেওয়া বা হওয়ার ক্ষেত্রে অস্পষ্ট শব্দ ও বাক্যসমূহ: যদি কেউ রাগের মাথায় অথবা তালাকের আলোচনা চলাকালীন নিচের শব্দগুলো উল্লেখ করে এবং স্ত্রীকে তালাকের নিয়তে এসব উচ্চারণ করে থাকে, তাহলে তালাক হয়ে যাবে। যেমন:
• যা, আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যা।
• আজ থেকে আমার বাড়ি খালি করে দিবি।
• যা, তুই এখান থেকে চলে যা।
• আজ থেকে তুই আমার থেকে পর্দা করবি।
• যা, আজ থেকে তুই একা আর আমিও একা। আজ থেকে তুই আজাদ/মুক্ত।
• আজ থেকে তোর দায়িত্ব তোর, আমারটা আমার। আজ থেকে আমার সমস্ত দায়িত্ব থেকে তোকে মুক্ত করে দিলাম।
• যা, আজ থেকে তুই তোর তালাকের মাসিক (ঋতুস্রাব) গনা শুরু কর।
• যা, আজ থেকে বাপের বাড়ি থাকবি।
• যা, অন্য কোনো স্বামী দেখ; ইত্যাদি।
এর মধ্যে এমন কিছু শব্দ আছে যার দ্বারা এক তালাকে রজঈ হয়, আবার কখনো বায়িন তালাকও হয়। এসব ক্ষেত্রে এমন কোনো শব্দ মুখে চলে এলে এর সঠিক মাসআলা বিজ্ঞ মুফতী অথবা স্থানীয় দারুল ইফতা থেকে জেনে নিতে হবে। [৮]
টিকাঃ
[৫] আস সিহাহ- ৪/১৫১৮; আল মিসবাহুল মুনীর- ২/৫৭৩; লিসানুল আরাব- ১০/২২৫; তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম- ১/৯৬
[৬] বাদায়েউস সানায়ে- ৪/৩৩২; রদ্দুল মুহতার- ৪/৪২৪; আল খিরাশী আলা মুখতাসারি খলীল- ৩/১১; আল কাফী- ২/৫৭১; আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাতুল কুয়েতিয়া- ২৯/৫; মুগনীল মুহতায- ৩/২৭৯; কাশশাফুল কিনা- ৫/২৩২; আল মুগনী- ৭/৩৬৩
[৭] সহীহ বুখারী- ১৯০৮, ৫৩০২; সহীহ মুসলিম- ১০৮০, ১০৮৬; আল ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার- ৩/১৮০-১৮১; বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২৭১-২৮১; আল বিনায়াহ শারহুল হিদায়া- ৫/৩১১; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াহ- ১/৪৪৭; ফাতোয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৪/৪৬৩, নং- ৬৬৭৮; রদ্দুল মুহতার- ৪/৫৩০
[৮] বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২৮১, ২৯৭; আল ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার- ৩/১৮৫; রদ্দুল মুহতার- ৪/৫৩২
📄 তালাকের অবস্থা ও পন্থা
তালাকের কয়েকটি প্রেক্ষাপট ও অবস্থা রয়েছে। তদানুসারে কখনো কখনো তালাক দেওয়া জুলুম, কখনো মুস্তহাব, কখনো-বা ওয়াজিব।
◇ তালাকে জুলুম
যখন স্ত্রী কোনো অন্যায় না করবে বরং সে সতীসাধ্বী থাকবে এবং স্বামীর অনুগত হয়ে চলবে, এমতাবস্থায় স্বামীর জন্য স্ত্রীকে তালাক দেওয়া জুলুম ও অন্যায় হবে।
আল্লাহ বলেন,
فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا
যদি তারা তোমাদের আনুগত্য করে তাহলে তোমরা তাদের ওপর কোনো অন্যায় রাস্তা অবলম্বন কোরো না। [৯]
◇ মুস্তাহাব তালাক
স্ত্রী যদি ফরয নামায আদায় না করে অথবা দ্বীনের যেকোনো ফরয বিধান আমলে না নেয় ও তাতে অভ্যস্ত না হয়; তাহলে তাকে তালাক দেওয়া মুস্তাহাব। অনুরূপভাবে স্ত্রী যদি স্বামীর জন্য যেকোনো বিষয়ে প্রতিনিয়ত কষ্ট প্রদানের কারণ হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রেও এই বিধান। [১০]
◇ ওয়াজিব তালাক
স্বামী যখন স্ত্রীর হক পূরণ করার ক্ষেত্রে অপারগ ও অক্ষম হয় তখন স্বামীর জন্য স্ত্রীকে তালাক দেওয়া ওয়াজিব। [১১]
তালাকের তিনটি সুরত ও পন্থা রয়েছে :
১. আহসান তথা সর্বোত্তম পন্থা: স্ত্রী হায়েয থেকে পবিত্র হলে তার ওই পবিত্রতার সময়ের মধ্যে কোনোপ্রকার সহবাস ব্যতীতই এক তালাক প্রদান করা। এরপর থেকে পরবর্তী তিন হায়েয (ঋতুস্রাব) তথা স্ত্রীর ইদ্দত শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে এবং এর মধ্যে স্ত্রীর সাথে সহবাস করবে না। এই ধরনের তালাকের হুকুম হলো, ইদ্দত ও সময় শেষ হলে স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে এবং নতুন বিবাহ ছাড়া তারা দুজনে আর একসাথে হতে পারবে না।
২. হাসান তথা উত্তম পন্থা: স্ত্রীকে তার তিন পবিত্রতার পিরিয়ডে (মাসে) কোনো সহবাস ছাড়াই এক এক করে পর্যায়ক্রমে মোট তিনটি তালাক দেওয়া। তৃতীয় তালাকের পর পবিত্রতা শেষ হলে সম্পূর্ণ তালাক হয়ে যাবে এবং অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিয়ে হয়ে পুনরায় বিচ্ছেদ না ঘটলে তারা দুজনে আর একত্রিত হতে পারবে না (এ সম্পর্কে সামনে আলোচনা আসবে)।
৩. বিদআত ও হারাম তালাক : একসাথে একই মাসে, ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে অথবা এক মজলিসেই এক বাক্যে দুই কিংবা তিন তালাক প্রদান করা, স্ত্রীর হায়েয ও ঋতুস্রাবের সময় তাকে তালাক প্রদান করা; এসব পন্থায় ও অবস্থায় তালাক দেওয়ার কারণে ব্যক্তি গুনাহগার হবে। সেই সাথে এতে তালাকও পতিত হয়ে যাবে। আর একসাথে তিন তালাক দেয়ার কারণে তার দ্বারা তালাকে মুগাল্লাযা হয়ে যায় বিধায় হিলা/হিল্লা ছাড়া ওই স্ত্রী তার জন্য হারাম। ইদ্দতকালীন স্বামী চাইলেও স্ত্রীকে আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না। [১২]
টিকাঃ
[৯] সূরা নিসা- ৩৪
[১০] ফতোয়ায়ে শামী- ৪/৪১৬
[১১] ফতোয়ায়ে শামী- ৪/৪১৭
[১২] সূরা তালাক- ১; সহীহ বুখারী- ৫২৫১; সহীহ মুসলিম- ১৪৭১; মুসান্নাফে ইবনে আব্দির রাযযাক- ১০৯৬৯; সুনানুল কুবরা, বাইহাক্বী- ১৪৯৫৫; সুনানে দারে কুতনী- ৩৯২১-৩৯২৪; আল ইখতিয়ার লি তা'লিলিল মুখতার- ৩/১৭০-১৭১; মু'জামু লুপাতিল ফুকাহা, পৃষ্ঠা- ২৯২; নাইলুল আওত্বার, শাওকানী- ৩/২৬৩-২৬৯
📄 তালাকের প্রকারভেদ
তালাকের চারটি প্রকারভেদ রয়েছে। সেগুলো হলো:
১. তালাকে রজঈ : 'রজঈ' (رجعي) এর শাব্দিক অর্থ হলো: ফিরিয়ে নেওয়া, প্রত্যাবর্তন করা। কিছু কিছু সময় তালাকের শব্দ বলার পরও স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। যে তালাকের পরও স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া যায়, তাকে তালাকে রজঈ বলে। অর্থাৎ, যে তালাক প্রদান করলে স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার থেকে যায় এবং স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে পুনরায় নিজের বন্ধনে ফিরিয়ে আনতে পারে। সে ক্ষেত্রে উক্ত স্ত্রীর সাথে ইদ্দত চলাকালীন অবস্থায় নিরিবিলি অবস্থান করা কিংবা নিরিবিলি অবস্থানের দিকে আকর্ষণকারী কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়া অথবা যৌন উত্তেজনার সাথে স্পর্শ করা বা চুমু দেয়া কিংবা 'আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম' বলার মাধ্যমেও রজা'য়াত বা ফিরিয়ে আনা সাব্যস্ত হয়। এতে স্ত্রী সম্মত থাকুক কিংবা না থাকুক। [১৩] উল্লেখ্য যে, 'স্বারীহ' বা সুস্পষ্ট তালাক (তালাক শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে) এভাবে বলা যে, "তুমি তালাক" কিংবা "আমি তোমাকে তালাক দিলাম।" এসকল শব্দ দ্বারা তালাক দিলে তালাকে রজঈ পতিত হয়।
২. তালাকে বায়িন: এমন তালাক যা প্রদান করলে স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার থাকে না, বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। তবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিক্রমে (হিলা ব্যতীত) নতুনভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে। উল্লেখ্য যে, তালাকের সাথে যদি কোনোপ্রকার অতিরিক্ততা বা কঠোরতার গুণ যুক্ত করা হয়, তাহলে তালাকে বায়িন হয়। যেমন: কেউ বলল, 'তোমার প্রতি তালাকে বায়িন' কিংবা 'তোমাকে অকাট্য তালাক'। তবে তিন তালাকের নিয়ত করলে তিন তালাকই পতিত হবে। অন্যথায় এক তালাকে বায়িন হবে। তালাকে বায়িন পতিত হলে পুনরায় মোহর ধার্য করে বিবাহ সম্পাদন না করলে ইদ্দত শেষে উক্ত স্ত্রী অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। [১৪]
৩. তালাকে মুগাল্লাযা: এমন তালাক যার কারণে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে ওই স্ত্রী অপর কোনো ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে, অতঃপর ওই স্বামী তার সাথে নিরিবিলি অবস্থান করার পর বা সহবাস করার পর তালাক দিলে অথবা স্বামী মৃত্যুবরণ করলে পুনরায় উক্ত স্ত্রী প্রথম স্বামীর সাথে উভয়ের সম্মতিক্রমে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।
৪. তালাকে তাফউইয়/তাফবীয : التفويض এর শাব্দিক অর্থ হলো- অর্পণ করা, সমর্পণ করা, দায়িত্ব প্রদান করা ইত্যাদি। আর তালাকে তাফউইযের অর্থ হলো, স্বামী কর্তৃক তালাকের দায়িত্ব ও ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করা।
◇ খুলা তালাক : 'খুলা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে অপসারণ করা বা সরিয়ে দেওয়া। পারিভাষিক অর্থে, স্বামীর পক্ষ থেকে কোনো কিছুর বিনিময়ে বা শর্তে অথবা বিনা শর্তে ও বিনিময় ব্যতীত স্ত্রীর নিকট বিবাহ-বিচ্ছেদের দায়িত্ব অর্পণ করার নাম হচ্ছে খুলা।
উল্লেখ্য যে, যদি স্ত্রীর সীমালঙ্ঘন বা অন্যায়ের কারণে (খুলা) তালাক দিতে হয়, সে ক্ষেত্রে স্বামী তার থেকে তালাকের বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে। উভয়ের সম্মতিক্রমে যে পরিমাণ বিনিময়ের ওপর একমত হবে, তা-ই নেওয়া বৈধ। তবে এ ক্ষেত্রেও বিনিময়টি বিয়েতে ধার্যকৃত মহরের বেশি না হওয়া উত্তম।[১৫]
সাবিত ইবনু কায়সের স্ত্রী নবী -এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, চরিত্রগত বা দ্বীনি বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের ওপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভেতরে থেকে কুফরী করা অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ বললেন, তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বলল, হ্যা। রাসূলুল্লাহ (সাবিত ইবনু কায়সকে) বললেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ করো এবং তোমার স্ত্রীকে এক তালাক দিয়ে দাও। [১৬]
তবে বিশেষ কোনো শরঈ কারণ ছাড়াই স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর খুলা তালাক চাওয়া উচিত নয়। হাদীসে আছে, নবী বলেন,
الْمُخْتَلِعَاتُ هُنَّ الْمُنَافِقَاتُ
খোলা তালাক দাবিকারিণী নারীরা মুনাফিক। [১৭]
টিকাঃ
[১৩] সূরা বাকারা- ২২৮, ২৩১; আল ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার- ৩/২০৩
[১৪] ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৩/৩১৫; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াহ- ১/৩৭৫, ১/৪৭২; বাহরুর রায়েক- ৩/৩০; রদ্দুল মুহতার- ২/৩৫৫; নাহরুল ফায়েক- ২/৩৫৫
[১৫] বাদায়েউস সানায়ে- ৪/৩৭২; ফাতহুল কাদীর- ৩/২০০; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াহ- ১/৫১৫; আলবাহরুর রায়েক -৪/৮৩; আহকামুল কুরআন- ২/৮৯; রদ্দুল মুহতার- ৩/৪৪৫; আলফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু- ১/৩৩৮; আল মাওসু'আতুল ফিকহিয়্যাতুল কুয়েতিয়া- ২৯/৬; দুররুল মুখতার- ২/৮৬০; বিদায়াতুল মুজতাহিদ- ২/৭২; মিনাহুল জালীল- ২/১৮২; মুগনীল মুহতায- ২/২৬২; হাশিয়াতুত দাসুকী- ২/৩৪৭
[১৬] সহীহ বুখারী- ৫২৭৩
[১৭] সুনানে তিরমিযী- ১১৮৬; এ হাদীসটিকে উল্লেখিত সনদসূত্রে ইমাম তিরমিযী গরীব বলেছেন। এর সনদ খুব একটা মজবুত নয়। তিনি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ হতে আরও বর্ণিত আছে, "যেসকল নারী স্বামীর নিকট হতে কোনো বিবেচনাযোগ্য কারণ ছাড়াই খোলা তালাক গ্রহণ করে, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।"
📄 ইদ্দত
ইদ্দত মানে গণনা। অর্থাৎ, তালাকের নির্ধারিত দিন গণনা করা। স্ত্রী তালাকপ্রাপ্তা হলে বা তার স্বামীর মৃত্যু হলে নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য উক্ত নারীকে এক বাড়িতে অবস্থান করতে হয়, এ সময়ে সে অন্যত্র যেতে পারে না এবং অন্য কোথাও বিবাহ বসতে পারে না; এমনকি বিবাহের প্রস্তাবও গ্রহণ করতে পারে না। একেই 'ইদ্দত' বলে। আর ইদ্দত পালনকারী নারীকে বলা হয় 'মু'তাদ্দাহ'। ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায় (১/৫৫২) বর্ণিত রয়েছে,
هِيَ انْتِظَارُ مُدَّةٍ مَعْلُومَةٍ يَلْزَمُ الْمَرْأَةَ بَعْدَ زَوَالِ النِّكَاحِ حَقِيقَةً أَوْ شُبْهَةَ الْمُتَأَكِدِ بِالدُّخُولِ أَوِ الْمَوْتِ كَذَا فِي شَرْحِ النُّقَايَةِ لِلْبُرْ جُنْدِي رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً نِكَاحًا جَابِرًا فَطَلَّقَهَا بَعْدَ الدُّخُولِ أَوْ بَعْدَ الْخَلْوَةِ الصَّحِيحَةِ كَانَ عَلَيْهَا الْعِدَّةُ
ইদ্দত হলো, স্বাভাবিক বিবাহ-বিচ্ছেদের পর বা খালওয়াতে সহীহার (তথা স্বামী-স্ত্রী সহবাসের নিকটবর্তী আচরণ বা নির্জনে বসবাসের) পর অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর মহিলা কর্তৃক শরী'আত নির্ধারিত নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা (অন্য কোথাও বিয়ে না বসা)। স্ত্রীর জন্য আবশ্যক হলো ইদ্দতের সময় তিনি অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। এই কারণে যে, স্বামী যদি ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে পুনরায় নিজের কাছে রাখার বা ফিরিয়ে আনার ইচ্ছাপোষণ করে, তাহলে সে রাখতে ও ফিরিয়ে আনতে পারবে। তবে ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে এই অধিকারটি বিলুপ্ত হবে।
উল্লেখ্য যে, এই বিষয়টি শুধু এক তালাক ও দুই তালাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তিন তালাক দিয়ে ফেললে এই অধিকার আর থাকে না। এ ছাড়া, ফক্কিহদের মতে রাজঈ ও বায়িন তালাকপ্রাপ্তা মহিলা ইদ্দত পালন করা অবস্থায় স্বামীর পক্ষ থেকে ভরণপোষণ ও খোরপোশ পাবে। এর বিপরীতে সহীহ মুসলিম, সুনানে নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদে ফাতিমা বিনতে কায়স থেকে যে বর্ণনা পাওয়া যায় অধিকাংশ সাহাবী (তাদের মাঝে অন্যতম হচ্ছেন উমার, ইবনে মাসউদ, যাইদ ইবনে সাবেত, আয়েশা) তাবেঈ ও ফক্বিহগণ তা গ্রহণ করেননি। বরং উক্ত হাদীসের বিপরীতে তারা ভিন্ন হাদীস ও সূরা তালাকের প্রথম আয়াত দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। তবে যে মহিলার স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে বিধায় ইদ্দত পালন করছে এমন ইদ্দত অবস্থায় মহিলার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর পরিবারের জন্য জরুরি নয়। [১৮]
আবু ইসহাক বলেন,
কُنْتُ مَعَ الْأَسْوَدِ بْنِ يَزِيدَ جَالِسًا فِي الْمَسْجِدِ الْأَعْظَمِ وَمَعَنَا الشَّعْبِيُّ فَحَدَّثَ الشَّعْبِيُّ بِحَدِيثِ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَمْ يَجْعَلْ لَهَا سُكْنَى وَلَا نَفَقَةً ثُمَّ أَخَذَ الْأَسْوَدُ كَفَّا مِنْ حَصَى فَحَصَبَهُ بِهِ. فَقَالَ وَيْلَكَ تُحَدِّثُ بِمِثْلِ هَذَا قَالَ عُمَرُ لَا نَتْرُكُ كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّنَا صلى الله عليه وسلم لِقَوْلِ امْرَأَةٍ لَا نَدْرِي لَعَلَّهَا حَفِظَتْ أَوْ نَسِيَتْ لَهَا السُّكْنَى وَالنَّفَقَةُ قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ)
আমি আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদের সঙ্গে সেখানকার বড় মসজিদে বসা ছিলাম। শা'বীও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি ফাতিমাহ বিনতু কায়স হতে বর্ণিত হাদীস প্রসঙ্গে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোশের সিদ্ধান্ত দেননি। তখন আসওয়াদ তার হাতে এক মুঠো কংকর নিয়ে শা'বীর দিকে নিক্ষেপ করলেন। এরপর বললেন, সর্বনাশ! তুমি এমন ধরনের হাদীস বর্ণনা করছ? (অথচ) উমার রা. বলেছেন, আমরা আল্লাহর কিতাব এবং আমাদের নবী ﷺ-এর সুন্নাত এমন একজন মহিলার উক্তির কারণে ছেড়ে দিতে পারি না। আমরা জানি না, সে স্মরণ রাখতে পেরেছে নাকি অথবা ভুলে গিয়েছে যে তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোশ রয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ থেকে বহিষ্কার করে দিও না এবং তারাও যেন ঘর থেকে বের না হয়। তবে তারা স্পষ্ট কোনো অশ্লীলতায় লিপ্ত হলে ভিন্ন কথা।" [১৯]
হাদীসে উল্লেখিত পূর্ণ আয়াতটি হলো :
يَأْتِهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَن يَأْتِينَ بِفَحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا)
হে নবী (বলো), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ইদ্দত হিসাব করে রাখবে, তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোনো স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর জুলুম করে। তুমি জানো না, হয়তো সেটার পর আল্লাহ (ফিরে আসার) কোনো সমাধান দেখিয়ে দেবেন। [২০]
আয়াতটিতে ইদ্দত চলাকালীন অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে কী রকম ব্যবহার করতে হবে তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদেশ করা হয়েছে যে, স্ত্রীদেরকে তাদের গৃহ থেকে যাতে বহিষ্কার করা না হয়। এখানে তাদের গৃহ বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যে পর্যন্ত তাদের বসবাসের হক পুরুষের দায়িত্বে থাকে, সেই পর্যন্ত গৃহে তাদের অধিকার আছে। তবে মহিলা কোনো ফাহেশা ও অশ্লীল (যিনা ও ব্যভিচারের) কাজে লিপ্ত হয়ে বের হয়ে গেলে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা।
টিকাঃ
[১৮] সহীহ মুসলিম- ১৪৮০; আল ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার- ৩/২৬০; ফাতহুল কাদীর- ৩/৩৩৯; হাশিয়ায়ে ইবনে আবেদীন- ৩/৬৪০; মিরকাতুল মাফাতীহ- ৬/৪৪২-৪৪৯; শারহুস সগীর- ১/৫২২; হাশিয়াতুদ দাসূকী- ২/৫১৫; তুহফাতুল মুহতাজ- ৮/২৫৯-২৬০; নিহায়াতুল মুহতাজ- ৭/১৫২-১৫৪; আল ইনসাফ (আল মুকনি ও শারহুল কবীরসহ)- ২৪/৩১২-৩১২
[১৯] সহীহ মুসলিম- ১৪৮০
[২০] সূরা তালাক- ১