📄 পুরুষদের বহুগামী চিন্তাধারা, এই অবস্থায় নারী হিসেবে করণীয়
পুরুষেরা সাধারণত বহুগামী স্বভাবের হয়ে থাকে। অর্থাৎ, তারা একাধিক নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এভাবেই তারা সৃষ্ট। ব্যতিক্রম থাকতে পারে, সেটা উদাহরণ হিসেবে আনা যায় না। সকলেই এরকম না তবে অধিকাংশই। আর এ কারণে বিয়ের কিছু বছরের মাথায় বেদ্বীনদের মাঝে দেখা যায় পরকীয়া কিংবা পতিতালয়ে গমনের প্রবণতা। তবে আলহামদুলিল্লাহ বিবাহিত দ্বীনদার পুরুষদের মাঝে পতিতালয়ে গমনের মতো স্পর্ধা নেই। তবে পরকীয়ায় জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায় যেহেতু প্রথমেই উল্লিখিত হয়েছে একের অধিক নারীর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া পুরুষদের সহজাত। আর এ কারণেই আল্লাহ বহুবিবাহের বিধান দিয়েছেন যাতে প্রয়োজন বা ফিতনার আশঙ্কা হলে পুরুষেরা আল্লাহর বেঁধে দেওয়া সীমানার বাহিরে গিয়ে হারামের দিকে অগ্রসর না হয়ে বিবাহের মাধ্যমে হালাল করে নেয়।
বিয়ের পর স্বামী যাতে পরকীয়ায় জড়াতে না পারে সেদিকে খেয়াল রেখে স্ত্রীদের বেশ কিছু করণীয় রয়েছে-
• স্ত্রীদের উচিত স্বামীদেরকে এমনভাবে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে রাখা যাতে অন্য কোনো নারীর প্রতি তার কোনো চাহিদাই তৈরি না হয়। এই বিষয়ে উপরে কিছুটা আলোচনা হয়েছে, তবে পরবর্তী দারসে এ নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হবে ইন শা আল্লাহ।
◆ স্ত্রীদের উচিত সর্বক্ষেত্রে স্বামীদেরকে নজরদারিতার মধ্যে রাখা যাতে কোনোভাবেই সে গুনাহে জড়াতে না পারে। এক্ষেত্রে স্বামীর সাথে একটা পারস্পরিক বোঝাপড়ায় আসা যেতে পারে। তার সাথে বিষয়গুলো নিয়ে স্বাভাবিক হয়ে পরামর্শ করা, একে অপরের মুঠোফোন, ল্যাপটপ, সামাজিক মাধ্যম ইত্যাদিতে যাতে উভয়েরই সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার থাকে এ বিষয়ে আলোচনা করে নেওয়া যেতে পারে।
◇ কিন্তু এর মানে এই না যে, তাকে প্রতিটি বিষয়ে সন্দেহ করতে হবে। সন্দেহ করলে সম্পর্কের মাধুর্যতা নষ্ট হবে। তাই সন্দেহ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রিয়তমের প্রতি সবসময় ভালো ধারণা রাখতে হবে।
• যদি স্বামী তার স্ত্রীকে নিজের মুঠোফোন, ল্যাপটপ, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদিতে প্রবেশাধিকার দিতে না চান তাহলে জোর-জবস্তি করা উচিত হবে না। অথবা যদি কিছু বিষয় এড়িয়ে যেতে চান তাহলে ভেবে নিতে হবে যে, স্বামী নিরাপত্তাজনিত কারণে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন। হয়তো তার এমন কোনো গোপন নেক আমল রয়েছে যা স্ত্রীর সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাক এটা স্বামী চান না।
• স্বামীর কাছে নিজের গাইরাত (রক্ষণশীল ঈর্ষাপরায়নতা)- এর কথা এভাবে উল্লেখ করা যে, স্ত্রী তার স্বামীকে এতোটাই ভালোবাসেন যে, তিনি অন্য কোনো পরনারীর দিকে নজর দেবেন এটা স্ত্রী চান না।
◇ স্বামী যদি নিজ থেকে তার পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তির কথা জানিয়ে সাহায্য চায় তাহলে সেটা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না বরং তাকে আশ্বাস দেওয়া উচিত যে স্ত্রী তাকে যথাসম্ভব সাহায্য করবে।
• স্বামীর পূর্বের হারাম সম্পর্ক, পর্নআসক্তি ছিল কিনা এসব জিজ্ঞাস করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এসব প্রকাশ হয়ে গেলে স্ত্রীর সামনে স্বামীর হায়া কমে যেতে পারে। তাই স্বামী নিজ থেকে সাহায্য চেয়ে যদি কিছু না বলে তাহলে তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গোপন কিছু জানার চেষ্টা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। কেননা মুসলিমদেরকে আদেশ করা হয়েছে যাতে কেউ নিজেদের পাপ প্রকাশ না করে।
• যদি স্বামী নিজ থেকে পরকীয়ার কথা জানায় অথবা কাউকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার আশা ব্যক্ত করে অথবা তার দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে উল্লেখ করে তাহলে তার এই ইচ্ছাকে সম্মান করা উচিত। যদি মেনে নিতে কষ্ট হবে বলে মনে হয় তাহলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু এতে কাজ না হলে আল্লাহ্-এর বিধানের উপর বিশ্বাস ও তাক্বদীরের উপর ভরসা রেখে স্বামীর মতে সায় দেওয়া উচিত। কেননা এটা তার হক্ক যেহেতু আল্লাহই তার জন্য সুযোগ রেখে দিয়েছেন। আর নিশ্চয় আল্লাহ্ উত্তম পরিকল্পনাকারী।
সার্ভেতে অংশগ্রহণকারীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো যে পরকীয়া, পর্নোগ্রাফি বা এ জাতীয় ফিতনা থেকে বাঁচতে বহুবিবাহ কতটুকু কার্যকরী বলে তারা মনে করে। প্রায় ৩৩.৭৫% পুরুষের মতে বহুবিবাহের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। প্রায় ৯% বলেছেন মোটামুটি প্রয়োজন। অংশগ্রহণকারীর মাঝে কয়েকজনের ভাষ্য তুলে ধরা হচ্ছে-
• বহুবিবাহের ব্যাপক প্রচলন ঘটানো জরুরি। পরকীয়া, পর্নোগ্রাফিসহ এধরনের ফিতনায় এটা আল্লাহর ইচ্ছায় খুব বেশি কার্যকর হবে বলে আশা করি। বহুবিবাহের ব্যাপারে ভাইদের এবং বোনদের উভয়পক্ষকেই এগিয়ে আসা উচিত এবং সামাজিকভাবে এর ব্যাপক প্রচলন ঘটিয়ে বহুবিবাহ নিয়ে আমাদের সমাজে যে ট্যাবু রয়েছে তা দূর করা উচিত।
• একটি বিয়েই যথেষ্ট বলে মনে করি।
• বহুবিবাহ একটি ভালো সমাধান হতে পারে যেহেতু একজন স্ত্রী থাকলে তার সাথে মিলন কোনো কারণে বন্ধ থাকলে তা পুরুষদের জন্য সবর করা কষ্টের হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে পুরুষেরা ফিতনায় পড়ে যেতেই পারে। একাধিক স্ত্রী থাকলে এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে পর্নআসক্তি সমাধান না করে বহুবিবাহ করলেও নানাবিধ সমস্যা লেগেই থাকতে পারে বলে আমার মনে হয়।
• বহু বিবাহ সমাজ থেকে অনেকটা উঠে যাওয়ার ফল- বিবাহের পরেও পর্নোর প্রতি আসক্তি। মানুষ বিয়ের পরেও পর্নদেখছে কারণ একজনে হয়তো তার সব চাহিদা পূর্ণ হচ্ছে না। সামর্থ্য থাকলে বহু বিবাহ ভালো সমাধান।
• ছেলেরা ফিতরাতগতভাবেই একাধিক নারীর সঙ্গ চায়। একজন স্ত্রী হলে, মনে মনে আরো তিনটা চায়, যদিও সে নিজে মানুষ কেবল একজন। হালালভাবে একটির বেশি স্ত্রী না পেলে হারামভাবে ইন্টারনেটে অনেক নারীকে ফ্রিতে দেখতে পাওয়া যায়। চাকরি/ব্যবসা আর একজন স্ত্রীকে সময় দিয়ে গায়ে শক্তি বাকি থাকলে অনেকেই এই ফ্রি সময়ে এই হারামের দিকে চলে যেতে পারে। একাধিক স্ত্রী থাকলে একজনের পরে আরেকজনকে সময় দিয়ে আর অন্য হারাম কিছুতে মন দেওয়ার সময় থাকে না।
• বর্তমান সময়ে বা যুগে কোনো মেয়েই তার স্বামীর বহুবিবাহ খুশি মনে মেনে নেবে না। তবে আমার মতে দুটা বিয়ে করা যেতে পারে যদি উভয়জনকে ন্যায়ভাবে চালানোর সামর্থ্য থাকে।
◆ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এর প্রচলন খুবই জরুরি। আমি অবিবাহিত, তবুও বহুবিবাহের বাসনা লালন করি!
◆ আমার মনে হয় সাহায্যকারী হলে একজনই যথেষ্ট আমার জন্য, বাকিটা আল্লাহু 'আলাম।
◆ বহুবিবাহ কুরআন এ বর্ণিত হালাল বিধান। যাকে এতটা অপছন্দ করা হয় যতোটা গীবত, সুদ, ঘুষ, পরকীয়াকেও করা হয় না।
📄 ইসলামের বহুবিবাহের বিধান
ইসলামে পুরুষদের ৪টি পর্যন্ত বিবাহের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে তবে শর্ত হচ্ছে, সকল স্ত্রীর যথাযথ হক আদায় করতে হবে, পরস্পরের মাঝে সার্বিকভাবে ইনসাফ করতে হবে। তবে কোনো পুরুষের যদি মনে হয় যে, ইনসাফ কায়েম করতে সে ব্যর্থ ও অক্ষম হবে তাহলে তার জন্যে একাধিক বিয়ে জায়েয নেই। আল্লাহ বলেন,
فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً)
বিবাহ করো নারীদের মধ্য হতে যাকে তোমাদের ভালো লাগে- দুই, তিন অথবা চারটি। আর যদি আশঙ্কা কর যে (স্ত্রীদের মাঝে) সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে (মাত্র) একটি (বিবাহ করো)।[১১]
এই আয়াতে বোঝা যাচ্ছে যে, কোনো মুসলিম পুরুষ ইচ্ছা করলে একের অধিক বিয়ে (চারের বেশি নয়) করতে পারবে। কিন্তু তাতে শর্ত হলো, তাকে তার স্ত্রীদের মাঝে সুবিচার অর্থাৎ একই রকম ভালোবাসা, একই মানের খাদ্য, বস্ত্র প্রদান করতে হবে এবং তাদের একের উপর অপরকে প্রাধান্য দেওয়া চলবে না। আর যে একাধিক বিয়ে করতে ইচ্ছুক কিন্তু তার মনে হচ্ছে যে, সে তার স্ত্রীদের মাঝে সুবিচার রক্ষা করতে পারবে না তাহলে তাকে একটি বিয়েতেই সন্তুষ্ট থাকতে বলা হচ্ছে। স্ত্রীদের মাঝে সুবিচার করা নিশ্চয় কঠিন কাজ। আল্লাহ মানুষকে সাবধান করে বলেছেন,
(ولن تستطيعوا أن تعدلوا بين النساء ولو حرصتم)
তোমরা যতই আগ্রহ রাখো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে সক্ষম হবে না। [১২]
অর্থাৎ বোঝা গেল, একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে হবে। একজনের ওপর অন্যজনকে প্রাধান্য দিয়ে কারও হক নষ্ট করা যাবে না। তবে উপরি-উক্ত আয়াতে উল্লেখিত ইনসাফের দুটি অংশ। প্রথম অংশে আল্লাহ বলছেন, পুরুষেরা পরিপূর্ণভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। এখানে বোঝানো হচ্ছে, ভালোবাসা ও স্বাভাবিক মনের টান যা অবস্থার ভিত্তিতে অদল-বদল, কম-বেশি হবেই। কোনো মানুষই দুজনকে সব দিক থেকে সমান ভালোবাসতে পারে না। কখনো কখনো প্রথমজনের প্রতি কিছুটা বেশি ভালোবাসা অনুভূত হবে, কখনো আবার দ্বিতীয়জনের প্রতি। ভালোবাসা, মায়া, অন্তরের টান নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পুরুষ কেন, কোনো মানুষেরই নেই। সুতরাং মানসিক টান ও প্রবৃত্তিগত আবেগ কারও প্রতি কিছুটা অধিক থাকা আদল বা ইনসাফের বিপরীত নয়। কেননা, তা মানবমনের ক্ষমতার বাইরে।
তবুও যতটুকু সম্ভব তাকওয়া অবলম্বন করে চললে আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন বলেই আয়াতের শেষে উল্লেখ করেছেন। দ্বিতীয় অংশের উদ্দেশ্য হলো, শরী'আহ নির্ধারিত অধিকার যেমন: ভরণ-পোষণ, সময় দেয়া, রাত্রিযাপন, সহবাস, ইত্যাদির ব্যাপারে ইনসাফ বজায় রাখার ব্যাপারে তাগাদা দেয়া হয়েছে-যা নিশ্চিত করা কঠিন কিছু না। এ ব্যাপারে নবী বলেন,
من كانت له امرأتان فمال إلى إحداهما جاء يوم القيامة وشقه مائل
যে ব্যক্তির দুজন স্ত্রী আছে, কিন্তু তার মধ্যে একজনের দিকে ঝুঁকে যায়, এরূপ ব্যক্তি কিয়ামতের দিন অর্ধদেহ ধসা অবস্থায় উপস্থিত হবে। [১৩]
টিকাঃ
[১১] সূরা নিসা- ৩
[১২] সূরা নিসা- ১২৯
[১৩] আবু দাউদ- ২/২৪২; তিরমিযী- ৩/৪৪৭; ইবনু মাজাহ- ১/৬৩৩; নাসাঈ- ৭/৬৪; মুসনাদে আহমাদ- ২/৩৪৭; মুস্তাদরাকে হাকেম- ২/১৮৬; সহীহ ইবনে হিব্বান- ৪১৯; বুলুগুল মারাম- ৩/৩১০
📄 বর্তমান সমাজে বহুবিবাহের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি
উপরোক্ত আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ পুরুষদের জন্য বহুবিবাহের বিধান উল্লেখ করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন হাদীসের মাধ্যমেও এই বিষয়টি প্রমাণিত যে, একজন পুরুষের জন্য সর্বাধিক ৪টি বিয়ে করা জায়েয। আর পূর্বের দারস থেকে আমরা জেনেছি যে, কেউ যদি এই বিষয়টি অস্বীকার করে অথবা আল্লাহ না-ইনসাফী করেছেন বা এই বিধানকে সেকেলে, অপ্রয়োজনীয়, বর্তমান সময়ের জন্য প্রযোজ্য নয়, আমাদের ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষদের জন্য নয়; এরকম কিছুও যদি বলে তাহলে তার ঈমান চলে যাবে।
বহুবিবাহ এমন একটি রীতি যা পূর্বে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল এবং এখনও আরবসহ বিভিন্ন সমাজে প্রচলিত রয়েছে। আজ থেকে ৭০-৮০ বছর পূর্বেও আমাদের দেশে এই রীতি সাধারণভাবেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু আজ এসে আল্ট্রামডার্ন (!) মানুষগুলোর কাছে এই বিধানটি হয়ে গেছে স্পর্শকাতর। অথচ আল্লাহর বিধান হিসেবে এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।
এই বিষয়টা নিয়ে অনেক দ্বীনদার বোনও একদমই কথা বলতে চান না। কিন্তু আমাদের বোঝা উচিত, জানা উচিত যে আমাদের মগজ কয়েক দফা ধোলাই হয়ে গিয়েছে বিধায় আমরা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও চিন্তা লালন করছি বেধর্মীদের মতো। যে নারীগণ দ্বীনকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে মেনে নিয়েছেন তাদের মাঝেও এই বিধানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি থাকে কিছুটা এমন যে, "আল্লাহ বিধান আরোপ করেছেন তাই মানতে হচ্ছে।" অনেকেই আবার সরাসরি বিরোধিতাও করে বসেন। বিষয়টা আজ যতটা স্পর্শকাতর হয়েছে ততটা স্পর্শকাতর হওয়ার কথা ছিল না। আসল ব্যাপার হচ্ছে, কালের পরিক্রমায় বিষয়টাকে অস্বাভাবিক করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বেশি দূর না, আমাদের দাদা-নানাদের যুগের খোঁজ নিলেই জানা যাবে যে, অনেকের দাদা-নানা একাধিক বিয়ে করেছেন। সেই সময়ের নারীদের মাঝে দ্বীনের বুঝ ততটা ছিল না। স্বভাবগতভাবেই সেই যুগের নারীগণ লজ্জাশীল ছিলেন, ইবাদতকারিণী ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ইলমের সহজলভ্যতা, দা'ঈদের দাওয়াতের প্রসারতা, দ্বীনি বই পুস্তকের কালজয়ী সাফল্যসহ বহুমুখী কারণে এসময়ের দ্বীনদার নারীদের মাঝে পূর্ববর্তীদের তুলনায় দ্বীনের প্রতি অধিক মুহাব্বত লক্ষ্য করা যায়। তবুও পূর্বেকার নারীদের দ্বীনের কম বুঝ থাকা সত্ত্বেও স্বামীদের বহুবিবাহের ব্যাপারটাকে খুশি মনে তারা মেনে নিয়েছে কিন্তু বর্তমানের নারীরা তুলনামূলক দ্বীনের অধিক বুঝ সম্পন্ন হয়েও বিষয়টাকে মেনে নিতে পারছে না।
বিষয় হচ্ছে, আজ থেকে এক শতাব্দী পূর্বেও বহুবিবাহ ছিল মুসলিমদের জন্য আর বাকি আট-দশটা বিধানের মতোই সাধারণ একটি বিধান। কিন্তু কালের পরিক্রমায় পাশ্চাত্য সমাজ তাদের বিধি-বিধান ইসলামের বিধানের বিপরীতে পেশ করতে সক্ষম হয়েছে। আর আমরা সেসবই গোগ্রাসে গিলেছি, এখনও গিলছি। কয়েক দফা পাশ্চাত্যের ধবল ধোলাই খেয়ে আমাদের মগজ দফারফা হয়ে গিয়েছে। তাই আজকে আমাদের নিকট আল্লাহর প্রদত্ত বিধানের তুলনায় কাফির, মুশরিকদের বিধান অধিক পছন্দনীয় মনে হয়।
একাধিক বিয়ে খ্রিস্টানধর্মে নিষিদ্ধ একটি বিষয়।[১৪] এদিকে নারীবাদীদের গাত্রদাহের বিষয়ও বটে। তাই বিষময় পাশ্চাত্য সমাজ তাদের বহুবিবাহের রীতির প্রতি বিতৃষ্ণাকে আমাদের উপর চাপাতে চেয়েছে খুব সূক্ষ্মভাবে। এর পিছনে বড় আরেকটা কারণও রয়েছে। কারণটা হচ্ছে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর একাধিক বিবাহ। আমরা জানি, বিভিন্ন কারণে এবং আল্লাহর ইচ্ছায় আল্লাহ রাসূল ﷺ একাধিক বিবাহ করেছেন; যেটা কাফির, জিন্দিক ও মুরতাদদের কাছে ইসলামকে খাটো করার জন্য খুব লোভনীয় একটি টপিক। তারা চেয়েছিল এই বিষয়টি নিয়েই মুসলিমদের অন্তরে আঘাত করবে, মুসলিমদেরকে রাসূল ﷺ-এর একাধিক বিয়ে নিয়ে লজ্জিত করবে। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব হয়েছে যখন মুসলিমরা এই চর্চা থেকে বিমুখ হয়েছে। আজ আমরা নিজেরা এই বিধান থেকে বিমুখ ও এই বিধানটাকে আমরা নিজেরাই খাটো করে দেখতে শুরু করেছি। আমাদের ভাবা উচিত ছিল যে, যেই বিধানের চর্চা শ্রেষ্ঠ মানবের, সেই বিধানকে খাটো করে দেখাটা শরী'আতের নিক্তিতে কতটুকু সঠিক? যখন কাফির ও নাস্তিকগোষ্ঠী রাসূল ﷺ এর চরিত্রে আঘাত করে ও তাঁর বৈবাহিক জীবনের বিষয়টিকে বাজেভাবে ফুটিয়ে তুলে তখন মুসলিমরা লজ্জিত হয়। অথচ রাসূল ﷺ-এর সময়ের কাফিরেরা কত-শত ট্যাগ জুড়ে দিয়েছিল পবিত্র নামটির পরে কিন্তু তাদের কেউই কখনও নবীজি ﷺ-এর একাধিক বিয়ে নিয়ে তাঁর চরিত্রে আক্রমণ করেনি। কারণ সেই সমাজে সেটা স্বাভাবিক চর্চা ছিল। আমাদের মাঝে আজও যদি সেই চর্চা জীবিত থাকতো তাহলে তারা এই বিষয় নিয়ে কথা তুলে আমাদের আবেগকে আঘাত করতে পারত না এবং হুজুর ﷺ-এর শাহী নামের সাথে কলঙ্কময়ী কথা বলার স্পর্ধা দেখাতে পারত না। তারা যখন ইসলামের বহুবিবাহের বিধান নিয়ে সমালোচনা করে তখন তারা একটি বিষয়ের ওপর খুব ঘটা করে আলোকপাত করে থাকে যে, খোদ মুসলিম নারীরাই আল্লাহর বিধানের সমালোচনা করে এবং তারাই এই বিধান মানতে নারাজ, এমতাবস্থায় তাদের ছুড়ে দেওয়া সমালোচনার পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো আসলেই কি আর কিছু থাকে?
টিকাঃ
[১৪] https://bit.ly/2ENgqdx
📄 বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে বহুবিবাহ
সমাজে বেহায়াপনা এখন তুঙ্গে। রাস্তাঘাটে বেপর্দা মেয়ে, ব্যাভিচারের সহজলভ্যতা, হারাম সম্পর্ক, পর্নোগ্রাফির সাইটগুলোতে অতি সহজ এক্সেস এমন আরও অনেক ফিতনা বর্তমানে উপস্থিত যেগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের সময়ে ছিল না। এই অবস্থায় বর্তমানে পুরুষদের কতটা ঈমানী পরীক্ষা দিতে হয় তা অভাবনীয়।
আজ উম্মাহর নারীদের যে দায়িত্ব থাকার কথা ছিল, সেই দায়িত্ব ভুলে গিয়ে নারীরা উল্টো নিজেদের আবেগকেই প্রাধান্য দিয়ে চলেছে। অথচ আবেগ চাইলেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বহুবিবাহ নিয়ে যেই জুজু সমাজে বিষফোঁড়া হয়ে আছে তা দূর করা প্রয়োজন। তাই আমাদেরকে বহুবিবাহের কিছু ইতিবাচক দিক জেনে রাখা আবশ্যক।
• এটা একটা মৃতপ্রায় বিধান, যা জীবিত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এজন্য বোনেদের এ ব্যাপারে নিজেদের মনের সকল সংকীর্ণতা দূর করে ফেলা উচিত।
◆ আল্লাহ্-এর সন্তুষ্টির জন্য উম্মাহর খেদমতে নারীকে এই বিধান মেনে নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। এমতাবস্থায় একাধিক স্ত্রী মানে অধিক সন্তান। আর অধিক সন্তান মানে উম্মাহর সংখ্যা বৃদ্ধি আর রাসূল এর ঠোঁটে গর্বের হাসি। বহুবিবাহের অনেক সুবিধা রয়েছে, আর উম্মাহর জন্য দিন দিন এর প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
◆ দ্বীনদারেরা নিজেদের সন্তানদেরকে যেই শিক্ষা দেয় বেদ্বীনিরা সেই শিক্ষা দিতে পারে না। বর্তমানে দ্বীনের বুঝসম্পন্ন মানুষ সম্পূর্ণ জনসংখ্যা, এমনকি মুসলিম জনসংখ্যার তুলনায় অনেক কম। এদিকে, বর্তমানে নারীদের মাঝে সন্তান-ধারণ ক্ষমতা পূর্ববর্তীদের তুলনায় অনেকটাই কমে এসেছে। এর পিছনেও রয়েছে পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্র। পুঁজিবাদী সমাজ অনেক কৌশল করে নারীদের সন্তান প্রসবের ক্ষমতাকে দমিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে একজন নারীর জন্য দু-তিনটি সন্তান প্রসব করাও কষ্টসাধ্য হয়ে দাড়িয়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে বহুবিবাহ হতে পারে মোক্ষম হাতিয়ার। একাধিক স্ত্রী থেকে অধিক সন্তানগ্রহণের মাধ্যমে উম্মাহর মাঝে যোগ্য আলিম, দা'ঈ, মুজাহিদের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে। উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে সংখ্যা গরিষ্ঠতা একটা বড় শক্তি।
◇ অনেক এতিম, তালাকপ্রাপ্তা, বিধবা, শারীরিক ত্রুটিপূর্ণ, অধিক বয়স্ক মেয়েদের জন্য বিয়েটা অনেক কঠিন হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বহুবিবাহ সমাধান হতে পারে।
• অনেক নারীর সন্তান হয় না। এই অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ের মাধ্যমে সন্তান লাভ করা সম্ভব হয়।
• পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যাও হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিন দিন এই অনুপাত বেড়েই চলছে। পুরুষদের মৃত্যুহার নারীদের তুলনায় অধিক অপরদিকে পুরুষদের জন্মহার নারীদের চেয়ে কম। আবার যেই হারে মুসলিম নিধন হচ্ছে, এতে পুরুষদের সংখ্যা কমতে থাকবে বলেই ধারণা করা যাচ্ছে। এখনই এমনটা অনেক মুসলিম অধ্যুষিত স্থানে দেখা যাচ্ছে যে, নারীদের বিবাহের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে পুরুষদের সংখ্যা স্বল্পতা।[১৫] এমতাবস্থায় বহুবিবাহের বিধান মেনে নিতে না পারলে উম্মাহর নারীদের অনেক বড় একটা অংশ অবিবাহিতই থেকে যাবে, সমাজের ভারসাম্য ব্যাহত হয়ে পড়বে এবং তা অসুস্থ একটি সমাজে পরিণত হবে।
• নারীদের হায়েয, গর্ভবতী অবস্থা, নিফাস ইত্যাদি কারণে পুরুষদের দৈহিক মিলন থেকে বিরত থাকতে হয়। যা অনেক পুরুষের জন্য কিছুটা কষ্টকর হতে পারে। অনেক নারীর সক্ষমতা কম থাকায় স্বামীর চাহিদা যথাযথভাবে পূর্ণ করতে তারা অক্ষম হয়। সেক্ষেত্রে স্বামীর অনেক সম্ভাবনা থাকে পাপে জড়িয়ে যাওয়ার। এই অবস্থায় বহুবিবাহ সমাধান।
এত সুন্দর একটা বিধান, যাতে রয়েছে একাধিক সমাধান। যদিও এর এরকম আরও বহু সুবিধা রয়েছে যা আলোচনা করে শেষ করা যাবে না। আমাদের মন্দ ঈর্ষাকে যদি আমরা সাময়িক এই দুনিয়ার কয়েকদিনের জীবনে দমিয়ে রাখতে পারি, তাহলে সেটা উম্মাহর জন্য অসংখ্য ফায়দা বয়ে আনতে পারে আল্লাহর অনুমতিক্রমে।
উপরের বিষয়টি সকলকে বহুবিবাহের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে উল্লেখ করা হয়নি। বরং আল্লাহর বিধানের যুক্তিসমূহ উপস্থাপনপূর্বক এটা জানিয়ে দেওয়াই উদ্দেশ্য যে, এই বিধান কতই না শাশ্বত। আল্লাহ প্রদত্ত বিধানই আমাদের জন্য সর্বাধিক উত্তম, সেটা আমরা বুঝতে পারি কিংবা না পারি, বিশ্বজাহানের মালিক আল্লাহ ঠিকই বুঝে শুনে বিধানসমূহ আরোপ করেছেন। তাই নিজের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধ জ্ঞানের ওপর ভরসা না করে আমাদের উচিত সেই মহান সত্তার উপর ভরসা রাখা, যার জ্ঞানের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
টিকাঃ
[১৫] https://www.middleeasteye.net/news/syrias-era-women-war-leaves-streets-empty-men